এক টুকরো মেঘ
পর্বঃ০২
কলমেসোনালিকাআইজা
⛔কপি করা সম্পুর্ন নিষিদ্ধ। চাইলে শেয়ার দিয়ে পাশে থাকতে পারেন।⛔
মনের ভেতর এক প্রকার আতঙ্ক কাজ করছে মেঘার। অস্বস্তিতে মন, প্রাণ, হৃদয় আষ্টেপৃষ্টে জড়িয়ে ধরেছে। এতগুলো বছর পর প্রেমের সাথে দেখা। অথচ প্রথম দেখাটাও কেমন যেনো গোলমেলে হয়ে গেলো। “প্রেম এহসান” উঁচু নাক ওয়ালা এটিটিউডের ডিব্বা। সে কি বিষয়টা সহজ ভাবে নেবে? ভাবতে ভাবতে দোতলার স্বচ্ছ কাঁচের সিঁড়ি বেয়ে নিচে নেমে এলো মেঘা। ডাইনিং টেবিলে সবাই বসে অপেক্ষা করছে মেঘার জন্য। নিচে নামতেই পরশ এহসানকে দেখে সকল চিন্তা ভাবনা মাথা থেকে বেরিয়ে গেলো মেঘার। সে ছুটে চলে গেলো নিচে। দীর্ঘ আট বছর পর ভাগ্নিকে পেয়ে মাত্রাতিরিক্ত খুশি দেখালো পরশ এহসানকে। তিনি টেনে মেঘাকে নিজের পাশের চেয়ারে বসালেন। মাথায় আলতো করে হাত বুলিয়ে দিয়ে বললেন,
—“আমার মামনি তো অনেক বড়ো হয়ে গেছে। তোমার বাবা মা কেমন আছে?”
—“ভালো আছে মামা। মা তো সারাদিন তোমার কথা বলে।”
—“হ্যা, শুধু বলা পর্যন্তই। ভাইয়ের কাছে তো আর আসবে না। শুধু দূর থেকে স্বরন করবে।”
ভদ্রলোকের কন্ঠে ছিলো স্পষ্ট অভিযোগের রেশ। চোখের মনিতে ভেসে উঠলো একমাত্র বোনকে দেখার ব্যাকুলতা। খুব অল্প বয়সে বাবা মাকে হারান তিনি। তখন থেকেই ছোটো বোনটাকে বুকে আগলে ধরে বড়ো করেছেন। যোগ্য পাত্রের হাতে বোনের দায়িত্ব তুলে দিয়ে পাড়ি জমিয়েছেন কোরিয়ার পথে। এরপর যত সময় এগিয়ে গেলো, ভাই বোনের মধ্যে কেবল দুরত্বই তৈরি হলো। সংসারের মায়াজালে জড়িয়ে এখন কেবল ফোনে কথা হয় মাত্র। দেখা সাক্ষাৎও কমে গেছে বহুগুণ। পরশ এহসানের মলিন মুখটা দেখে মুখের হাসি উবে গেলো মেঘার। সে আলতো করে মামার একটা বাহু জড়িয়ে ধরে বলল,
—“মন খারাপ করো না তো মামা। আমাকে একবার এখানে সেটেল্ড হতে দাও। এরপর বাবা, মা দুজনকেই কোরিয়া নিয়ে আসবো। এরপর থেকে আমরা সবাই এখানেই থাকবো। তুমি খুশি হবে তো?”
ভদ্রলোকের ঠোঁটের কোণে এক চিলতে হাসি দেখা গেলো। তিনি আদুরে ভঙ্গিতে মেঘার মাথায় হাত বুলিয়ে দিলেন। ঠিক সেই মুহুর্তে স্বচ্ছ কাঁচের সিঁড়ি দিয়ে নামতে দেখা গেলো প্রেমকে। আচমকা সবাই ভুত দেখার মতো চমকিত দৃষ্টিতে তাকালো সিঁড়ির দিকে। সকলের দৃষ্টি অনুসরণ করে মেঘাও চাইলো সেই দিকে। সিঁড়ি দিয়ে নামতে দেখা যাচ্ছে প্রেমকে। পড়নে কালো রঙের হুডি। সেই সাথে কালো জিন্স। কানে হেডফোন লাগিয়ে নজর ফোনের দিকে স্থির রেখেছে। সিঁড়ির প্রতিটি ধাপে লম্বা চুলগুলো পুরো কপাল জুড়ে দোল খাচ্ছে। ক্লিন সেভ গালটা স্বচ্ছ কাঁচের মতো চকচকে। যদিও ছেলেদের সাধারণত খোঁচা খোঁচা দাঁড়িতে বেশি মানায়। তবে প্রেমের এই লুকটাও যেনো ওর সাথে মারাত্মক স্যেট হয়েছে।
সকলের ভাবনার মাঝেই প্রেম ধুপধাপ কদম ফেলে চলে এলো নিচে। একটা চেয়ার টেনে ধপ করে বসে পড়লো সেখানে। নজর জোড়া তখনও মোবাইল স্ক্রিনে নিবদ্ধ। হাবভাব দেখে মনে হচ্ছে সে এই মুহুর্তে ভিডিও গেইম খেলায় ব্যাস্ত। দিলরুবা বেগম স্বাভাবিক ভাবেই এক বাটি স্যুপ এগিয়ে দিলেন প্রেমের সামনে। সেকেন্ডের ব্যবধানে বাটিটা ফ্লোরে ছুড়ে ফেলে দিলো প্রেম। আকস্মিক কাঁচ ভাঙার শব্দে চমকে উঠলো উপস্থিত সকলে। দিলরুবা বেগম শক্ত কন্ঠে বললেন,
—“এসব কি ধরনের বিহেভিয়ার প্রেম? তুমি খাবার ফেলে দিলে কেনো?”
প্রেমের বেপরোয়া জবাব,
—“প্রেম এহসান কাউকে কৈফিয়ত দেন না।”
—“তুমি দিনদিন বেয়াদবির মাত্রা ছাড়িয়ে যাচ্ছো প্রেম। মায়ের সাথে কেউ এমন বিহেব করে?”
এই পর্যায়ে চেয়ার লাথি মেরে উঠে দাঁড়ালো প্রেম। তলোয়ারের মতো ধারালো নজরে তাকালো দিলরুবা বেগমের দিকে। গলা ছেড়ে চেঁচিয়ে উঠে বলল,
—“আপনি বোধহয় নিজের পরিচয় ভুলে যাচ্ছেন। আপনি কেবলমাত্র আমার বাবার দ্বিতীয় স্ত্রী। কিন্তু আমার মা আপনি নন। ভবিষ্যতে কোনোদিন নিজেকে আমার মা বলে দাবি করবেন না। এই অধিকার আমি আপনাকে দেইনি।”
কাঠকাঠ কন্ঠে কথাগুলো বলেই ধুপধাপ কদম ফেলে চলো গেলো সোজা দোতলায়। পরশ এহসানের বুক চিরে বেরিয়ে এলো এক লম্বা দীর্ঘ শ্বাস। দিলরুবা বেগম নিজের স্বামীর দিকে তাকিয়ে বললেন,
—“আপনি কিছু বলবেন না? আপনার ছেলে এতগুলো মানুষের সামনে আমাকে অপমান করে গেলো।”
—“দোষটা সবার আগে তোমার রুবা।”
—“বাহ্, এখানেও আমিই দোষী।”
—“অবশ্যই তুমি দোষী। তুমি খুব ভালো করে জানো প্রেম তোমাকে পছন্দ করে না। ওর আশেপাশে তোমার অবস্থান সহ্য করতে পারে না। এ বাড়িতে আসলে ওর খাবার আয়রা অথবা সার্ভেন্ট সার্ভ করে। তাহলে আজ এমন কি হলো যে তুমি নিজে থেকে ওকে খাবার সার্ভ করতে গেছো? তুমি জানোই, তোমার হাতের খাবার প্রেম খাবে না। তাহলে কেনো করলে এমন?”
—“আমি তো ওর ভালোর জন্যই……..! “
—“তুমি এবার অন্তত দয়া করো রুবা। প্রেমের ভালো তোমার চাইতে হবে না। ওর ভালো মন্দ ভাবার জন্য আমি আছি। ছেলেটা আমার বছরে এই একটা দিন বাড়িতে আসে। সেটাও তোমার সহ্য হচ্ছে না। এখন এই মাঝ রাতেই ছেলেটা বাড়ি ছেড়ে চলে যাবে হয়তো।”
দিলরুবা বেগমকে মাঝপথে থামিয়ে দিয়ে কথাগুলো বললেন তিনি। এরপর ধুম করে উঠে সোজা নিজের রুমের দিকে পা বাড়ালেন। আপাতত খাওয়ার রুচি হারিয়ে গেছে তার। পারিবারিক এই কলহ মনটাকে দিন দিন বিষিয়ে তুলছে। স্বামীকে চলে যেতে দেখে রাগে ফুঁসে উঠলেন দিলরুবা বেগম। দাঁত কটমট করতে করতে তিনিও পা বাড়ালেন গেস্ট রুমের দিকে। মিনিটের ব্যবধানে পুরো ডাইনিং জুড়ে পিনপতন নীরবতা ছড়িয়ে পড়লো। টেবিলে বর্তমানে কেবল আয়রা আর মেঘাই অবশিষ্ট আছে। একটা ছোট্ট করে দম নিয়ে আয়রার দিকে তাকালো মেঘা। চঞ্চল মেয়েটা কেমন যেনো শান্ত নদীর মতো চুপ হয়ে গেছে। আয়রার কাঁধে আলতো করে হাত রেখে মেঘা প্রশ্ন করলো,
—“ব্যপারটা কি হলো বলতো আয়রা? হঠাৎ করে বাড়িতে ঝড় হয়ে গেলো কেনো?”
—“নতুন কিছু নয় আপু। জ্ঞান হওয়ার পর থেকেই ভাইয়া আর মায়ের মধ্যে লড়াই হতে দেখেছি। সৎ মা কি না? এজন্য হয়তো ভাইয়া মেনে নিতে পারে না। মায়ের জন্যই ভাইয়া এই বাসায় থাকা বন্ধ করে দিয়েছে। বুসান থেকে অনেকটা দূরে সেই শিউলে ফ্ল্যাট নিয়ে একা থাকে। আজ বড়ো মায়ের মৃত্যু বার্ষিকি। বছরের এই একটা দিনই ভাইয়া এই বাড়িতে আসে। এরপর মায়ের সাথে কোনো না কোনো ঝামেলা হয়ে সেই রাতেই আবার শিউলে ফিরে যায়। এভাবেই চলছে সবকিছু। আমরা এগুলোতে অভ্যস্ত।”
কথাগুলো একদমে বলে শেষ করলো আয়রা। বলতে বলতে মলিন মুখটা আরও বেশি মলিন হয়ে গেলো মেয়েটার। মেঘা কিছুক্ষণের জন্য একেবারে চুপ হয়ে গেলো। পরশ এহসানের দ্বিতীয় বিয়ে নিয়ে প্রেমের শুরু থেকেই ঘোর আপত্তি ছিলো। এই নিয়ে বাবা ছেলের মধ্যে চরম মনমালিন্য হয়েছে। এই খবর মেঘা সহ মেঘার পুরো পরিবার জানে। পরশ এহসানের দ্বিতীয় বিয়ে প্রেম মেনে নিতে পারেনি। আর না মেনে নিতে পেরেছে দিলরুবা বেগমকে। নিজের মায়ের জায়গা অন্য কেউ দখল করার পর থেকেই প্রেম বেপরোয়া, উগ্র আর চরম বেয়াদবে পরিণত হয়েছে। মেঘা ভেবেছিলাম হয়তো সময়ের সাথে সাথে সবকিছু স্বাভাবিক হয়ে গেছে। কিন্তু সম্পর্ক গুলো যে পূর্বের তুলনায় আরও বেশি অবনতি ঘটেছে সেটা মেঘার ধারণার বাইরে ছিলো। ভাবতে ভাবতে ফোঁস করে নিঃশ্বাস ছাড়লো মেঘা। ঠোঁট উল্টে কিছু একটা ভাবলো। এরপর উঠে অন্য একটা বাটিতে খানিকটা রামিয়ন (কোরিয়ান নুডলস) নিয়ে পা বাড়ালো দোতলার পথে। পেছন থেকে আয়রা চেঁচিয়ে উঠলো,
—“কোথায় যাচ্ছো তুমি?”
—“তোর বেয়াদব ভাইকে আদব শেখাতে।”
বলতে বলতে সোজা দোতলায় পৌঁছে গেলো মেঘা। এক হাতে নুডলসের বাটি ধরে, অন্য হাতটা নক করার উদ্দেশ্য দড়জায় রাখলো। দড়জা লক করা না থাকায় হাত রাখতেই দুম করে খুলে গেলো দড়জাটা। আচমকা দড়জা খুলে যাওয়ার ভয়ে খানিকটা কেঁপে উঠলো মেঘা। সঙ্গে সঙ্গে কেউ একজন টেনে মেঘাকে ভেতরে ঢুকিয়ে নিলো। টানটা জোরে লাগায় পায়ের ভারসাম্য হারালো মেঘা। যার ফলাফল স্বরুপ গরম গরম রামিয়নের বাটিটা ছিটকে পড়লো টাইলসের ঝকঝকে ফ্লোরে। মেঘার পিঠ ঠেকলো শক্ত দেয়ালের সাথে। ঘটনার আকস্মিকতায় ভড়কে গেলো মেঘা। পরিস্থিতি বুঝতে পিটপিট করে চাইলো। সহসাই চোখের সামনে ধরা দিলো প্রেমের লাল হয়ে যাওয়া রাগী চেহারা। দেয়ালের দুই পাশে হাত রেখে নিজের বাহুডোরে আবদ্ধ করে নিয়েছে মেঘাকে। কন্ঠ হতে ঝড়ছে ক্রোধের স্ফুলিঙ্গ,
—“কেনো এসেছিস এখানে?”
ঘটনার আকস্মিকতায় হকচকিয়ে গেছে মেঘা। কণ্ঠনালী ভেদ করে কোনো আওয়াজও যেনো বের হতে চাইছে না। বহু কষ্টে টেনেটুনে বলল,
—“খা..খাবার দিতে এসেছিলাম।”
—“এই রুমে কেনো এসেছিস সেটা জানতে চাইনি। কোরিয়াতে কেনো এসেছিস সেটা জানতে চেয়েছি। কি উদ্দেশ্য তোর? সব হারিয়ে তো আমি নিঃস্বই। নতুন করে কি কেড়ে নিতে এসেছিস তুই?”
প্রেমের এমন আজব প্রশ্ন শুনে মাথা ঘুরে উঠলো মেঘার। ভেতরে ভেতরে কিছুটা অপমান বোধও করলো। এই লোকটা কি কোনো ভাবে মেঘাকে লোভী ভাবছে? ভাবনাটা মাথায় আসতেই মেঘা ফুঁসে উঠে জবাব দিলো,
—“আপনার সম্পদের ওপর ভাগ বসাতে আসিনি আমি। নিজের নিশ্চিত একটা ক্যারিয়ার গড়তে এসেছি শুধু। ভার্সিটিতে ভর্তি প্লাস একটা পার্ট টাইম জব পেলেই এই বাসা থেকে চলে যাবো। আজীবন থাকবো না এখানে।”
—“আমার অনুমতি ছাড়া আমার ঘরে কেনো এসেছিলি?”
মেঘা নিজের কথা শেষ করার আগেই প্রশ্নটা করে বসলো প্রেম। এই পর্যায়ে কিছুটা থমকে গেলো মেঘা। খানিকটা লজ্জা বোধ চারিদিক থেকে ঘিরে ধরলো মেঘাকে। সেই অনাকাঙ্ক্ষিত দৃশ্যের কথা মনে করে হাসফাস করে উঠলো ভেতরটা। খানিকটা লজ্জা নিয়ে বলল,
—“তখনকার জন্য স্যরি। আমি আসলে ইচ্ছে করে কিছু দেখিনি।”
—“কি দেখেছিস তুই? আর কতটুকু দেখেছিস?”
একের পর এক প্রশ্নে নাজেহাল হয়ে গেলো মেঘা। লজ্জা বোধে কান দুটো জ্বলতে শুরু করেছে। তার ওপর প্রেম এতোটা কাছাকাছি আসায় বুকের ভেতর টিপটিপ আওয়াজও বেড়ে গেছে। মেঘা হাসফাস করে উঠে বলল,
—“কিছু দেখিনি। প্লিজ সরুন। আমার হাসফাস লাগছে।”
প্রেম তৎক্ষনাৎ সরলো না। মুখ থেকে কোনো কথাও বের করলো না। স্ট্যাচুর মতো কাঠকাঠ হয়ে দাঁড়িয়ে রইলো সেভাবেই। চোখের দৃষ্টি কাঁচের মতো স্বচ্ছ। সমুদ্রের ন্যায়ে গভীর চোখ দুটোতে কত শত না বলা কথা। মেঘার এলোমেলো চোখের দৃষ্টি আটকে গেলো সেই স্বচ্ছ দুই চোখে। বোঝার চেষ্টা করলো চোখের পাতায় ভাসতে থাকা শব্দহীন কথাগুলো। তবে কিছু বুঝে ওঠার আগেই আচমকা প্রেমের চেহারার রঙ বদলে গেলো। চোয়াল জোড়া শক্ত করে কাঠকাঠ কন্ঠে বললো,
—“আউট। তোর মুখ যেনো আমি দ্বিতীয়বার না দেখি।”
প্রেমের এই হুটহাট মুড সুইং দেখে, হকচকিয়ে গেলো মেঘা। কিছু বলতে মুখ খুলবে তার আগেই এক প্রকার ধাক্কা মেরে মেঘাকে বের করে দিলো নিজের ঘর থেকে। সঙ্গে সঙ্গে শব্দ করে দড়জা আটকে দিলো। প্রেমের এই কঠোর আচরণ মনে বেশ গভীর দাগ কাটলো মেঘার। এমন কুকুর বেড়ালের মতো তাড়িয়ে দেওয়ার কি আছে? এটা কি কোনো সুস্থ মস্তিষ্কের মানুষের আচরণ? রাগে দুঃখে হনহন করে নিজের জন্য বরাদ্দকৃত রুমের দিকে চলে গেলো মেঘা। এই লোকটা আসলেই বেয়াদব। একে কেউ ভালো করতে পারবে না।
কিছুক্ষণ সময় কেটে গেলো পিনপতন নীরবতায়। ফ্লোরে ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়ে থাকা রামিয়নের দিকে কিছুক্ষণ এক ধ্যানে তাকিয়ে রইলো প্রেম। চোখ মুখ কেমন যেনো পাগলাটে, অস্বাভাবিক লাগছে। মুহুর্তের ব্যবধানে এক হাঁটু মুড়ে নিচে বসলো। একপাশে পড়ে থাকা চপস্টিকটা হাতে নিয়ে ফ্লোরে পড়ে থাকা রামিয়ন নুডলস তুলে মুখে পুড়ে নিলো। সঙ্গে সঙ্গে তৃপ্তি সহকারে চোখ দুটো বন্ধ করে নিলো প্রেম। যেনো জীবনের প্রথম কোনো সুস্বাদু খাবারের সন্ধান পেয়েছে সে। এতো মজাদার খাবার সে এর আগে কোনোদিন খায়নি। অদ্ভুত ভাবে ফ্লোরে পড়ে থাকা পুরো নুডলসটাই খেয়ে নিলো প্রেম। শেষ পর্যায়ে তৃপ্তির ঢেঁকুর তুলে বলল,
—“ইট’স ঠু মাচ টেস্টি।”
–
রাত তখন গভীর। টিকটিক করে চলতে থাকা ঘড়ির কাটা ছুঁয়ে দিয়ে গেছে রাত তিনটার ঘর। এসির নিচে নরম বিছানার ছোয়া পেয়ে আরামে ঘুমিয়ে আছে মেঘা। দেখেই বোঝা যাচ্ছে মেয়েটা এই মুহুর্তে গভীর ঘুমে বিভোর। এই মাঝ রাতের গভীর প্রহরে আচমকাই মেঘার ঘরে আগমন ঘটলো কোনো ব্যাক্তির। ডিম লাইটের লাল আলোয় পুরুষালী আবছা ছায়া দেখা গেলো শুধু। ছায়াটা ধীরে সুস্থে এগিয়ে এলো ঘুমন্ত মেঘার দিকে। বিছানার কাছাকাছি আসতেই ফ্লোরে হাঁটু মুড়ে বসে পড়লো। কয়েক সেকেন্ড তাকিয়ে রইলো মেঘার মুখের দিকে। ঘুমের মাঝেই কপালে কয়েকটা ভাজ পড়েছে মেঘার। মনে হচ্ছে মারাত্মক সিরিয়াস কোনো স্বপ্ন দেখছে মেয়েটা। এবং স্বপ্নটা যে মোটেও সুখকর নয় সেটা মেঘার মুখের ভাব ভঙ্গিতেই বোঝা যাচ্ছে। ছায়াটা হঠাৎ করেই ঝুঁকে গেলো মেঘার দিকে। মেঘার গলায় পড়ে থাকা ছোট্ট লকেটটা নিয়ে কিছু একটা করলো। শোনা গেলো অত্যন্ত ঠান্ডা এবং নিচু আওয়াজ,
—“মাইহার্ট! দূর থেকে শাস্তি কম হচ্ছিল বুঝি? তাই চূড়ান্ত ভাবে পোড়াতে কাছে চলে এসেছিস? বিগত আট বছরে তোর দহনে অনেক তড়পেছি আমি। জ্বলতে জ্বলতে কয়লা হয়ে গেছে এই বুক। এবার আমার পালা। আগামী আট বছর তুই আমার চেয়ে দ্বিগুণ তড়পাবি। আই প্রমিস হার্ট!”
মুহুর্তেই হালকা নড়েচড়ে উঠলো মেঘা। ঘুমের মাঝেই কেমন যেনো অস্বস্তি হচ্ছে তার। হাসফাস লাগছে ভিষণ। মেদহীন উদরে আঙ্গুলের আলতো ছোঁয়া অনুভব হচ্ছে। এই অদ্ভুত অনুভুতি গুলো মেঘার ছটফটানি বাড়িয়ে দিলো বহুগুণ। অস্বস্তিতে ঘুমটা ছুটে গেলো তৎক্ষনাৎ। সঙ্গে সঙ্গে লাফিয়ে শোয়া থেকে উঠে বসলো মেঘা। চোখ মেলেই চিৎকার করে উঠলো,
—“কে? কে এই ঘরে?”
কিন্তু আশ্চর্য! পুরো ঘরে এক মেঘা ছাড়া আর দ্বিতীয় কেউ নেই। অথচ মেঘা একটু আগেই এই ঘরে দ্বিতীয় কোনো ব্যক্তির উপস্থিতি স্পষ্ট অনুভব করেছে। সেকেন্ডের ব্যবধানে কোথায় গেলো সে? তবে কি পুরোটাই মেঘার স্বপ্ন ছিলো? ভাবতে ভাবতে আবারও সোজা হয়ে শুয়ে পড়লো মেঘা। পায়ের নিচ থেকে কম্ফোর্টার নিয়ে মাথা সহ মুড়ি দিয়ে শুলো। মেঘার ছোটো থেকেই ভুত প্রেতে চরম ভয়। এই বিদেশের মাটিতেও ভুত প্রেত আছে নাকি? এ তো আজব ব্যপার স্যপার।
চলবে?
(সাইলেন্ট পাঠকেরা দয়া করে রেসপন্স করবেন। কোথাও কোনো ভুল থাকলে ধরিয়ে দেবেন। গল্পের সবে শুরু, তাই বর্ণনা বেশি। মূল কাহিনিতে ঢুকলে আশাকরি সবার ভালো লাগবে। সবার জন্য ভালোবাসা রইলো। হ্যাপি রিডিং।)
Share On:
TAGS: এক টুকরো মেঘ, সোনালিকা আইজা
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE