Golpo romantic golpo উড়াল মেঘের ভেলায়

উড়াল মেঘের ভেলায় পর্ব ২৩(সমাপ্ত)


উড়ালমেঘেরভেলায়

লেখনীতে— #ঝিলিক_মল্লিক

পর্ব_২৩

[কপি করা কঠোরভাবে নিষিদ্ধ।]

রানিয়ার মাথা চক্কর দিচ্ছে। লোকটার কি মাথা গেল নাকি মিশন থেকে এসে! নিশ্চয়ই কোথাও মাথায় ধাক্কা-টাক্কা খেয়েছে। নাহলে এমন মতিভ্রম তো জনাব আহমেদ আভিয়ানের হওয়ার কথা নয়!
রানিয়া হা করে সামনের দিকে তাকিয়ে আছে। অবাক চাহনি ওর। তা অবশ্য হওয়াটাই স্বাভাবিক। এমন দৃশ্য কখনো কল্পনাও করেনি রানিয়া। মামাবাড়ির পেছনে দক্ষিণ দিক ঘেঁষে নদীর যেই রেখা চলে গিয়েছে, সেই নদীর পাড়ে খোলা মাঠের ধারে সাজানো আলোকবাতি। দূর হতে দেখেই বোঝা যায়, খুব সুন্দর করে সাজানো হয়েছে জায়গাটা। একটা কাঠের টেবিল। কাঠের টেবিলের চারটি ফুলের খুঁটিও একইভাবে আলোকিত। রানিয়া চোখ বড় বড় করে দেখতে লাগলো। টেবিলের ওপরে কিছু জিনিস রাখা। তারমধ্যে সাদা বক্সটা সর্বপ্রথম চোখে পরলো ওর। সেই বক্সের চারপাশে গোলাপের পাপড়ি সুন্দর করে ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। দেখতে খুব সুন্দর লাগছে। আবার চারপাশে আলোকসজ্জা। সবকিছু মিলিয়ে একেবারে চোখ ধাঁধানো সুন্দর। এমন ঘটনার আকস্মিকতায় রানিয়া কি করবে ঠিক বুঝে উঠতে পারে না। ওর কেমন প্রতিক্রিয়া দেখানো উচিত, সেটাও বুঝতে পারছে না। দ্বিধায় পড়ে গেছে ও। ততক্ষণে আভিয়ান ওকে পাশ কাটিয়ে ফুল-আলো দ্বারা সজ্জিত জায়গায় এগিয়ে গিয়ে টেবিলের ওপরে উল্টো করে রাখা গ্লাসগুলো সোজা করে দিতে লাগলো। রানিয়া মোহান্বিতের ন্যায় এগিয়ে গেল সেদিকে। আভিয়ানের পাশে দাঁড়িয়ে চুপচাপ মনোযোগ সহকারে দেখতে লাগলো ওর সকল কার্যক্রম। হঠাৎ খেয়াল করলো, গ্লাসের পাশে একটা লম্বা বোতল রাখা। বোতলের নকশাটা দেখা মাত্রই রানিয়ার ভাবনায় অ্যালকোহলের কথা চলে আসলো স্বয়ংক্রিয়ভাবেই। ওর তো চক্ষু চড়াকগাছ! বিস্ময় মিশ্রিত কন্ঠে আভিয়ানকে জিজ্ঞাসা করলো, “এটা কি আভিয়ান?”

“কী ভাবছো তুমি?”

আভিয়ান টেবিলে সবকিছু সাজাতে সাজাতে পাল্টা প্রশ্ন করলো। রানিয়া মিয়মান কন্ঠে জবাব দিলো, “আপনারা ব্যাটামানুষেরা যেটা খান, সেটাই।”

“উহুঁ। অ্যালকোহল মানেই যে সব ছেলেরা খায়— এই ধারণাটা পুরোপুরি ভুল। বরং, ওসব জিনিস খায় ছাপড়ি পোলাপানেরা। নিজেদেরকে পশ দেখানোর জন্য খায় ওরা। আমরা ওসব খাই না। আর আমাদের প্রফেশনে ওসব খাওয়ার ওপরে নিষেধাজ্ঞা আছে। তবে নিষেধাজ্ঞা না থাকলেও কখনো ছুঁয়েও দেখতাম না। অ্যালকোহলের চাইতেও এতো নেশালো জিনিস সামনে থাকতে ওসব ছুঁতে যাব কোন দুঃখে?”

“কোন জিনিস সেটা?”

প্রশ্নটা করে রানিয়া নিজেই বোকা বনে গেল। কয়েক মুহূর্ত পরে ওর উপলব্ধি হলো, কথাটা আভিয়ান ওকেই ইঙ্গিত করে বলেছে। ততক্ষণে আভিয়ান বিপরীত পাশের চেয়ার টেনে রানিয়ার বসার ব্যবস্থা করেছে। এরপর সামনের চেয়ারে নিজে গিয়ে বসেছে। রানিয়া ওর দিকে তাকিয়ে থেকে প্রশ্ন করলো, “আপনি কি আমার সাথে ফ্লার্টিং করার চেষ্টা করছেন আভিয়ান?”

আভিয়ান মুচকি হেঁসে জবাব দেয়, “ফ্লার্টিং হয়ে গেল নাকি?”

রানিয়া ভ্রুক্ষেপ করে না। ঠোঁট টিপে আভিয়ানের দিকে একধ্যানে তাকিয়ে থাকে। আভিয়ান সেই কাঁচের বোতলটা থেকে তরল পদার্থ গ্লাসে ঢালতে ঢালতে রানিয়াকে উদ্দেশ্য করে বললো, “তাছাড়াও, তুমি যেটাকে অ্যালকোহল ভেবে বিভ্রান্ত হচ্ছো, সেটা অ্যালকোহল নয়। বরং, নন-অ্যালকোহলিক ড্রিংকস। তোমার মতো পাগল হইনি যে, তোমার প্রেগন্যান্সি টাইমে আমি তোমার জন্য অ্যালকোহল নিয়ে চলে আসবো। তাছাড়াও, পাগলামি তুমি এমনিতেই যথেষ্ট করো। ওসব খাইয়ে আরো তোমার বাড়তি পাগলামি দেখার মতো পাগল নাকি আমি?”

“কী বললেন? আমি পাগল?”

“হ্যাঁ তুমি পাগল।”

রানিয়া তেতে ওঠে। কিছু বলার পূর্বেই আভিয়ান চেয়ার ঠেলে উঠে দাঁড়ায়। তারপর নিচে নেমে বুকে হাত গুঁজে রানিয়াকে উদ্দেশ্য করে প্রশ্ন করে, “একটা ম্যাজিক হবে। তুমি কি দেখতে চাও?”

“কীসের ম্যাজিক?”

“আগে বলো, দেখতে চাও কিনা।”

আভিয়ানের কথাবার্তা, কাজকর্ম, চাল-চলন — সবটাই আজ বড্ড অন্যরকম। প্রচুর কৌতূহল জাগাচ্ছে রানিয়ার মনে। অবশ্য কৌতূহলী এবং বিস্মিত হওয়ার-ই কথা। আভিয়ান আজ ওকে “জান” বলে ডেকেছে! সাধারণত প্রেমিক পুরুষেরা তাদের প্রেমিকাদের এভাবে সম্বোধন করে। আরো কত প্রেমরূপী নামে ডাকে। অথচ আভিয়ানের মুখ থেকে এসব ডাকনাম তো দূর— কখনো প্রেম মিশ্রিত সামান্য আওয়াজও পাওয়া যায়নি। ব্যাপারটা রানিয়াকে বড্ড বেশি যন্ত্রণা দিতো। ওর মনে হতো, আভিয়ান কেন আর সবার মতো নয়! লোকটা কি পারে না ওর জন্য প্রেমিক পুরুষ হয়ে উঠতে? এই নিয়ে আফসোসের কমতি ছিল না রানিয়ার। অথচ আজ— আজ যখন আভিয়ান তার চিরচেনা রূপ থেকে বেরিয়ে এসে সম্পূর্ণ অপরিচিত অথচ রানিয়ার সর্বদা আকাঙ্ক্ষিত রূপে এসে ওর সামনে দাঁড়িয়েছে; তখন রানিয়া বেকুব বনে গিয়েছে। এই অনাকাঙ্ক্ষিত বিষয়টা হজম করতে একটু বেশিই কষ্ট হচ্ছে। এই-যে এতো রাতে এভাবে এতোসব জাঁকজমকপূর্ণ আয়োজন— এগুলো কি ওর জন্য? আর এই আয়োজন কি এই কঠোর সত্ত্বার ব্যক্তিই করেছে? নাকি অন্য কারো পরিকল্পনায় সবটা? রানিয়ার জানতে ইচ্ছা করছে। আভিয়ানকে জিজ্ঞাসাও করে নিতো ইতিমধ্যেই। কিন্তু তার আগেই আভিয়ান উঠে কোথায় যেন চলে গেছে সবে। যাওয়ার আগে রানিয়াকে বলে গেছে, যেন এখান থেকে কোথাও না যায়। কিছুক্ষণ অপেক্ষা করতে বলেছে। শীঘ্রই চলে আসবে ও।
.
.
আভিয়ান ফিরলো মিনিট দশেক পরে। সময়টা মনে মনে আন্দাজ করে নিয়েছে রানিয়া। আভিয়ান যখন ফিরেছে, তখন ওর এক হাত পেছন দিকে মুড়ে রাখা ছিল, অর্থাৎ আড়াল করা। রানিয়া কৌতূহলী দৃষ্টি ফেলে সেদিকে তাকিয়ে রইলো। আভিয়ানের হাতে কি আছে, সেটা দেখার চেষ্টা করলো। আভিয়ান মৃদু হেঁসে বললো, “রোসো বাবা। দেখাচ্ছি তো আমি। এতো তাড়ার কী আছে?”

রানিয়া তবু উঁকি দেওয়া থামালো না৷ আভিয়ান ওর এমন বাচ্চামো আচরণ দেখে মুচকি হাসলো। রানিয়াকে হাত ধরে চেয়ার থেকে উঠিয়ে এনে ঘাসের ওপর দাঁড় করিয়ে দিলো। এরপর আচনক ওর সামনে হাঁটু গেঁড়ে বসে পেছন থেকে হাতটা বের করে এনে ওর সামনে একটা বিশাল বড় ফ্লাওয়ার বুকে ধরে বললো, “উইল ইউ বি মাইন ফর লাইফটাইম?”

রানিয়া স্তম্ভিত হয়ে তাকিয়ে রইলো আভিয়ানের দিকে। হাতের ফ্লাওয়ার বুকে-টা বিশাল বড়। আন্দাজ-আনুমানিক কম করে হলেও একশোটা ফুল রয়েছে তাতে। লাল রঙের গোলাপ। রানিয়ার ভীষণ প্রিয়। সাথে সাদা রঙের র‍্যাপিং পেপার দিয়ে সুন্দর করে মোড়ানো। দেখতে মোহনীয়। রানিয়া শাড়িও পরেছে রেড ওয়াইন শেডের। ব্লাউজ তার চাইতে কিঞ্চিৎ গাঢ়। ঠোঁটে লাল খয়েরী লিপস্টিক। অজান্তেই থিমের সাথে মিলে গেছে। ব্যাপারটা সবেমাত্র খেয়াল হলো রানিয়ার।
আভিয়ান জবাবের আশায় রানিয়ার দিকে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। ও যে এতো সুন্দর করে বলতে পারে, সেটা রানিয়ার ধারণাতেই আসেনি কোনোদিন। রীতিমতো দ্বিধায় পরে গেছে। আনন্দে আত্মহারা ও। কি করবে ঠিক বুঝে উঠতে পারছে না। উপলব্ধি করলো, চোখের কোণে চিকচিকে রূপালি অশ্রুকণা এসে জমেছে। সাধারণত, খুব বেশি আনন্দিত হলে তবেই মানুষ এভাবে অশ্রু বিসর্জন করে। আভিয়ান ওকে নিশ্চুপ থাকতে দেখে ঠোঁট চেপে বললো, “নিরবতা সম্মতির লক্ষ্মণ ধরে নিলাম মিসেস রানিয়া মাহমুদা। তবে, তুমি না চাইলেও তোমাকে সারাজীবন আমার সাথেই থাকতে হবে। আস্ক করা তো জাস্ট একটা ফর্মালিটি। নাথিং এলস।”

রানিয়া কপট বিরোধিতা করে বললো, “আপনি কিন্তু চেঞ্জ হলেন না।”

কথাটা শোনামাত্র রানিয়াকে হুট করেই কাছে টেনে নিয়ে আভিয়ান ওর কানের কাছে মুখে এগিয়ে নিয়ে ফিসফিসিয়ে বলে, “চেঞ্জ হতে বলছো জানেমান? আনরোমান্টিক হয়ে যাব? তোমাকে কিছু বলবো না, তোমার কাছে আর আসবো না— এমন হয়ে যেতে বলছো?”

“আপনি তো বরাবরই আনরোমান্টিক৷ রোমান্টিক ছিলেন কবে?”

“আসো তাহলে তোমাকে রোমান্টিক হয়ে দেখাই।”

রানিয়ার কোমর আরো শক্ত করে পেঁচিয়ে ধরে একেবারে নিজের বুকের সাথে মিশিয়ে নিলো আভিয়ান। গালে একটানা দীর্ঘক্ষণ চুমু খেয়ে ওর মাথা বুকে চেপে ধরে আলতোভাবে হাত বুলিয়ে দিতে লাগলো। রানিয়া বুক থেকে মাথা তুলে আভিয়ানের মুখের দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন করলো— “আপনি কি এতোসব আয়োজন আমার জন্য করেছেন?”

“তোমার জন্য করবো না তো আর কার জন্য করবো? আমার কি আরেকটা বউ আছে?”

রানিয়া আভিয়ানের বুকে আলতোভাবে কিল-ঘুষি বসিয়ে দিতেই আভিয়ান ঠোঁট টিপে হাসে। রানিয়ার কোমর জড়িয়ে ধরে ওকে ঘুরাতে লাগলো। তারপর থামিয়ে দিয়ে ওর কপালে নিরেটভাবে একটা চুমু খেয়ে চেয়ারে বসিয়ে দিলো। নিজে পুনরায় সামনাসামনি রাখা অপর পাশের চেয়ারটায় বসলো।
টেবিলের ওপর একটা সাদা রঙের বক্স রাখা ছিল। আভিয়ান বক্সটা খুলতেই দেখা গেল, তারমধ্যে একটা সাদা রঙের কেক। আভিয়ান বক্সটা টেনে রানিয়ার সামনে রাখলো। রানিয়া দেখলো, সাদা রঙের কেকের ওপরে লাল নজেল দিয়ে সুন্দর করে ইংরেজিতে লেখা — “ফর দ্য সুইটেস্ট মম অব মাই আনবর্ন বেবি।”

রানিয়া এতোক্ষণ বহুকষ্টে নিজেকে সামলে রেখেছিল। তবে এবার আর আটকাতে পারলো না। উঠে গিয়ে আভিয়ানের বুকে ঝাঁপিয়ে পড়ে হাউমাউ করে কেঁদে ফেললো। আভিয়ান ওকে জাপ্টে জড়িয়ে ধরে নরম সুরে বললো, “কাঁদছো কেন রানিয়া?”

রানিয়া কান্না থামালো না। একটানা বেশ কিছুক্ষণ কাঁদলো। আভিয়ান কিছু বললো না। কাঁদতে দিলো ওকে। একসময় কান্না থামিয়ে ও বললো, “জানেন আভিয়ান, আমরা মেয়েরা কেমন?”

“কেমন?”

“আমরা বড্ড বেশি ভালোবাসার কাঙাল। একটুখানি ভালোবাসা পাওয়ার জন্য আমরা সব করতে রাজি। সবকিছু সহ্য করতে পারি। আমরা ফুলের মতো কোমল। আমাদেরকে কেউ একটু ভালোবাসা দিলেই আমরা তার জন্য নিজের সবটা উজাড় করে দিই৷ বিশেষত, সবচেয়ে কাছের মানুষের ভালোবাসা পাওয়ার জন্য আমরা কিভাবে মুখিয়ে থাকি জানেন? অনবরত ছটফট করতে থাকি। আমিও ব্যতিক্রম নই। আপনার ভালোবাসা পাওয়ার জন্য সেই প্রথম থেকে ছটফট করেছি। আপনি যত বেশি কঠোর হয়েছেন, আমি ততো বেশি কাঙাল হয়েছি। আপনার ভালোবাসা পাওয়ার জন্য আমি জেদ ধরে কিনা করেছি! এজন্য এই ব্যাপারটা যখন আচনক ঘটছে আমার সাথে, তখন স্বাভাবিকভাবে গ্রহণ করা সহজ হচ্ছে না। মনে হচ্ছে, সবটা ভ্রম। আমার মোহ। না-হয় রাতের কোনো ভুলভাল স্বপ্ন। রাত কেটে গেলেই বোধহয় এই স্বপ্ন ভেঙে যাবে, সকল মোহ কেটে যাবে। আর আমি দেখবো, আপনি সেই কঠোর ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট আহমেদ আভিয়ান। যে কিনা শুধু রুলস এন্ড রেগুলেশনের মধ্যে রাখতে জানে, সবকিছু সীমাবদ্ধ করতে জানে। যার কিনা আমার প্রতি কঠোরতা ব্যতীত আর কোনো অনুভূতি নেই। এজন্য চাইছি, এই রাতটা শেষ না হোক। এই মধুর স্বপ্ন ভেঙে না যাক।”

“এগুলো কোনো স্বপ্ন নয় রানিয়া। সবটাই বাস্তব। এদিকে দেখো, আমার দিকে তাকাও। শাহ আহমেদ আভিয়ান দাঁড়িয়ে আছে তোমার সামনে৷ কোনো রুড আর্মাড অফিসার নয়, বরং তোমার স্বামী আহমেদ আভিয়ান। এখন আমি শুধুমাত্র তোমার স্বামী হিসেবে তোমার সামনে দাঁড়িয়ে আছি। যে তোমাকে ভালোবাসে, সবসময় তোমাকে ভালোবেসেছে। বুঝতে পারছো?”

আভিয়ান রানিয়ার কাঁধ ঝাঁকিয়ে কথাগুলো বলে৷ রানিয়া মাথা নেড়ে বোঝালো যে, হ্যাঁ সে বুঝতে পেরেছে৷ আভিয়ান ওর কাঁধ ধরে চোখে চোখ রেখে বললো, “তোমাকে কিছু কথা বলতে চাই, যা কখনো বলা হয়নি। শুনবে তুমি?”

“হ্যাঁ, শুনবো।”

“জানো রানিয়া, আমাদের প্রফেশনের দুই তৃতীয়াংশ মানুষ প্রফেশনাল লাইফ এমনকি নিজেদের ব্যক্তিজীবনে অনেক বেশি কঠোর হয়ে থাকে। স্পেশালি, যাদের কাঁধে দায়িত্বের বোঝা আর মাথায় প্রেশারটা বেশি থাকে। তুমি তো ট্রেইনিং টাইমসহ বিভিন্ন সময়ে শুধুমাত্র আমার বাইরের রুড বিহেভিয়ারটাই দেখেছো, এমনকি প্রত্যেকে সেটাই দেখে৷ অথচ কোনোদিন কি কেউ আমাদের ইন্টারনাল সিচুয়েশন জানতে চায়? সবাই শুধু আমাদের বাইরের আবরণটা দেখে, অথচ ভেতরটা আজ অবধি পড়ে দেখেনি কেউ। কেন আমরা এতোটা কঠোর, তা কেউ জানতে চায়নি কোনোদিন। তুমি কি জানো, সারাবিশ্বে প্রতিবছর কতজন সোলজার সুইসাইড করে মানসিক অশান্তির জন্য? অগণিত। এই সংখ্যা এতোটাই বেশি যে ওয়ার্ল্ডওয়াইড ম্যাগাজিনের রিপোর্টেও এটা সাধারণত উঠে আসে না। সোলজাররা তাদের পরিবার, দেশ সবকিছুর জন্য সেক্রিফাইস করে; বাট নো ওয়ান স্যাক্রিফাইসিজ ফর দেম। দেয়ার ইজ নো ওয়ান ফর দেম; নো ওয়ান ইভেন থিঙ্কস অ্যাবাউট দেম। আমরা আসলে আমাদের পুরো লাইফ সেক্রিফাইস করি। কিন্তু বিনিময়ে শুধু কি চাই জানো? কেউ আমাদের ভালোবাসুক, আমাদের জন্য থাকুক, আমাদেরকে বুঝুক। কিন্তু আফসোসের বিষয় হলো, এমন কাউকে সহজে পাওয়া যায় না। কেউই আমাদের বুঝতে পারে না। আমাদের কঠোরতার আড়ালে বিধ্বস্ত হৃদয়টা কেউ দেখতে পায় না।”

কথা বলতে বলতে আভিয়ানের গলা ধরে আসে৷ কন্ঠস্বর কেমন যেন জড়িয়ে যেতে থাকে৷ এই আবছা আলো-আঁধারির মাঝেও রানিয়া ভীষণভাবে উপলব্ধি করতে পারে আভিয়ানের কথাগুলো। বুঝতে পারে, আভিয়ানের চোখের কোণে দুর্লভ রূপালি তরল পদার্থ চকচক করছে৷ রানিয়া কোনোকিছু ভাবে না। সেই মুহুর্তেই আভিয়ানের গলা জড়িয়ে ধরে ওকে নিজের সাথে মিশিয়ে নেয়। আভিয়ানের চুলে হাত বুলিয়ে দিতে দিতে প্রশ্ন করে, “কাঁদছেন আভিয়ান?”

“না।”

আভিয়ানের ধরা গলা। রানিয়া শান্ত স্বরে বলে, “স্বীকার করতে দোষ কোথায়?”

“পুরুষ মানুষ যে।”

“পুরুষ মানুষ বলে কি কাঁদতে নেই? স্ত্রী-র সামনে কীসের এতো লুকোচুরি? একটা কথা বললেন না আপনি? যে আপনাদের জন্য কেউ ভাবে না— কথাটা একদিক থেকে ঠিক হলেও আবার ভুলও। অনেকের ভাগ্য ভীষণ ভালো হয় জানেন তো। তাদের জন্য ভাবার মানুষ থাকে। এই যেমন, আপনার জন্য আমি আছি। আপনি অবিশ্বাস করলেও আছি। আপনি মানুন বা না মানুন, আপনার জন্য ভাবি আমি৷ আপনাকে ভালোবাসি বলেই ভাবি, আর জীবনের শেষ পর্যন্ত আপনার কাছে থেকেও যাবো দেখবেন৷ আপনার কঠোরত্ব আমার মনে আপনার প্রতি জন্মানো ভালোবাসা এক ফোঁটাও কমিয়ে দেবে না৷ আপনি আজ যত ইচ্ছা কাঁদুন আভিয়ান। মন হালকা হবে। আমি এখানে আছি আপনার পাশে, আপনার সব কোথা শোনার জন্য।”

আভিয়ানকে চেয়ার টেনে বসিয়ে দিলো রানিয়া। নিজে ওর সামনে দাঁড়ালো। আভিয়ানের মাথা টেনে নিয়ে নিজের পেটের সাথে মিশিয়ে নিলো৷ ওর গলা জড়িয়ে ধরে রেখে মাথার চুলে আলতোভাবে হাত বুলিয়ে দিতে লাগলো। আভিয়ান রানিয়ার কোমর জড়িয়ে ধরে ওর পেটে মাথা চেপে রেখে এবার নিজের ইচ্ছামতো জীবনে এই প্রথমবার মন খুলে কেঁদে নিলো। শেষবার কোন ছোটবেলায় কেঁদেছিল, সে খেয়াল নেই ওর; তারপর আজ। অথচ রানিয়ার সামনে কাঁদতে একটুও অস্বস্তি বা দ্বিধা হচ্ছে না ওর। মেয়েটা কত সহজ করে দিলো বিষয়টা!

আভিয়ান কিছু সময় পরে মাথা তুলে রানিয়ার কোমর সেভাবেই জড়িয়ে ধরে রেখে বললো, “স্যরি রানিয়া। আমি তোমাকে হার্ট করতে চাইনি। এতোদিন রুডলি বিহেভ করার জন্যও স্যরি। আর কখনো সজ্ঞানে এমন হবে না দেখো। প্রথমত, তুমি আমার স্ত্রী, তারপর আমার বাচ্চার মা। তোমার ইমোশন আগে। তারপর সবকিছু। তুমি না থাকলে বাচ্চা আসতো কোত্থেকে?”

রানিয়া মুচকি হেঁসে আভিয়ানকে জড়িয়ে ধরে বলে, “যাক, জনাবের মনে তাহলে আমার জন্য ফিলিংসও আছে।”

আভিয়ান উঠে দাঁড়িয়ে বলে, “আছে কিনা দেখতে চাও? প্রাকটিক্যালি দেখাবো, হু?”

আভিয়ানের ঠোঁটের কোণে বাঁকা হাসি। লোকটা এতো বাজে কথা বলে! রানিয়াকে রীতিমতো লজ্জায় ফেলে দেয়। ও আভিয়ানের বুকে আলতোভাবে ঘুষি মেরে মুখ লুকিয়ে লজ্জা মিশ্রিত কন্ঠে বলে, “ছিহ। এখন হবে না এসব।”

“একটা আসছে আসুক। ওটার পরে আরেকটার প্রসেসিং করবো না-হয়। আমার ধৈর্য বহুত ভাই। প্যারা নিও না।”

রানিয়া বুঝলো, আভিয়ান ঠিক কি বলতে চাইছে। বিপরীতে কিছু বললো না ও। অগোচরে হাসলো কিঞ্চিৎ।
রাতের দ্বিতীয় প্রহরে আভিয়ান এই সুন্দর পরিবেশে, সুন্দর মুহূর্তে রানিয়াকে নিয়ে কেকটা কাটলো। এরপর ওকে কেক খাইয়ে দিয়ে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে বললো, “এভাবে সারাজীবন থেকো আমার হয়ে।”

“যদি না থাকি?”

“বেঁধে রাখবো তাহলে।”

“অসভ্য লোক।”

রানিয়া আভিয়ানের বুকে ধাক্কা দেয়৷ যত দূরে সরিয়ে দিতে চায়, আভিয়ান তার চাইতে বেশি কাছে টেনে এনে বলে, “আমি অসভ্য হলে তুমি বেয়াদব।”

“আমি বেয়াদব?”

“হ্যাঁ, তুমি।”

“আমি বেয়াদব না।”

“তাহলে কী?”

“আপনার বাচ্চার মা।”

“বাচ্চার নাম কিন্তু আমি রাখবো রানিয়া।”

“না আমি রাখবো আভিয়ান।”

“না আমি রাখবো।”

“না আমি. . .”

তর্ক-বিতর্ক চলতে লাগলো। অদূরে নদীর ওধারে ফানুস উড়ে গেল আকাশে। দু’জনের সেই সুন্দর মুহুর্তের সাক্ষী হয়ে রইলো উড়াল মেঘের ভেলার ন্যায় উড়তে থাকা ফানুসটা।

সমাপ্ত

নোটবার্তা: অতঃপর গল্পটির যাত্রা এখানেই শেষ হলো। খুব সুন্দর ছিল যাত্রাটি। আর লেইট হওয়ার প্রথম কারণ— আমি অসুস্থ ছিলাম কিছুদিন, এরপর বেগম খালেদা জিয়ার মৃত্যুর শোক। হাদি ভাইয়ের মৃত্যুর পরেও আমি লেখা অফ রেখেছিলাম কিছু সময়ের জন্য। সবকিছু মিলিয়ে বিরতি পড়ে গেছে। আশা করবো, ক্ষমাসুন্দর দৃষ্টিতে দেখবেন৷ আপনাদের সাথে এই গল্পের জার্নিটা দারুণ ছিল। আমি কিন্তু বিরতি নিচ্ছি না। আগামীকাল অথবা পরশু থেকেই নতুন গল্প দিবো ইন শা আল্লাহ। গল্পটা কিছু পর্ব লেখা আছে আমার। এজন্য বিরতি নেবো না। সেটাও ডিফেন্স সম্পর্কিত গল্প। বলুন তো, মেজর মেজবাহ ইফতেখারকে কবে থেকে পড়তে চান? আমার লেখা সবচেয়ে ট্রু জেন্টেলম্যান নায়ক হতে চলেছে সে। আমি তাকে নিয়ে খুব বেশি এক্সাইটেড। অন্যতম কারণ হলো, বাস্তবে মেজবাহ আছে।

Share On:

TAGS: ,



CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
Related Posts
 

0 Responses

Leave a Reply