আদিল মির্জা’স বিলাভড
— ৩৫
সবটা ঘুটঘুটে অন্ধকার আর নিস্তব্ধতার চাদরে মোড়ানো। এসময়ে নিচের তলার উত্তরদিকের সামনের ঘরের দরজাটায় নরম করাঘাত পড়ে। জাহানারা বেগম ধীরেসুস্থে হাতের তাসবিহ-তে চুমু খেয়ে পাশে রাখেন যত্নের সাথে। মৃদুস্বরে বলেন –
‘আসো, দাদুভাই।’
শান্ত প্রবেশ করতে নিয়েই চিন্তিত গলায় বলে যায়, ‘এখনো ঘুমাওনি কেনো দাদিমা? কতো রাত হলো! কী এমন গুরুত্বপূর্ণ কথা যা বলার জন্য সকাল পর্যন্ত অপেক্ষা করা গেলো না?’
শান্ত ইতোমধ্যে এসে বসেছে জাহানারা বেগমের কাঁধ ঘেঁষে। নরম, চামড়া কুঁচকানো ডান হাতটা নিজের দু-হাতে তুলে নিয়ে ঠোঁট ছুঁয়ে বলেই গেলো –
‘নিজের যত্ন নাও না ঠিক মতন। আমি রাগ হচ্ছি।’
হাসেন বৃদ্ধা। বা-হাতে আদর করে দেন নাতির গালটা। বলেন, ‘ঘুম আসতেসে না। মনডা খচখচ করতেসে।’
শান্ত বুঝল। চুপ থাকল কিছুটা সময়। দীর্ঘশ্বাস ফেলল কেমন। আওড়াল, ‘কী নিয়ে?’
‘ওদের সম্পর্কডা স্বাভাবিক লাগল না, দাদুভাই। মাইয়াডারে কি জোর করছো? মনে তো তাই হইল।’
শান্ত অনেকটা সময় ধরে কোনো জবাব দেয় না। তাড়া দেন না জাহানারা বেগমও। ভাবতে দেন নাতিকে। আদিল মির্জার ব্যক্তিগত বডিগার্ড হিসেবে শান্তর দায়িত্ব এই ব্যাপারটা এড়িয়ে যাওয়া। সবসময়ইতো এড়িয়েছে। তবে আজ এড়ায় না। চোখে ভাসে আজকের ঘটিত দৃশ্যগুলো। অবশেষে ফিনফিনে পাতলা গলায় অনেককিছু আড়াল করে ভাসাভাসা ভাবে কিছুটা জানায়। জাহানারা বেগম চুপচাপ শোনেন। কিছু বলেন না সঙ্গে সঙ্গে। তাকান শান্তর চোখে। সময় নিয়ে বলেন –
‘কাহিনী আরও আছে মন কইতেসে দাদুভাই। সব আমারে বলো নাই। যতটা সুন্দর করে কইলা ওতটা সুন্দর না। মাইয়াডা বড্ড ভালো। কতো ভালোবাসে বাচ্চাডারে। ওই ভালোবাসার উছিলায় মাইয়াডার সুন্দর হৃদয়ডা নিয়ে খেলা করতেসে না? এইডা কি ঠিক? ঠিক না। কাজটা ভালো করো নাই। একটা পরিবাররে এমন বাজেভাবে ভাঙলা! এমন ভাবে জোরজবরদস্তি করলা! জোর করে কি কিছু হয়? হয় ন….’
জাহানারা বেগম আর বলতে পারলেন না। শান্ত দাঁড়িয়ে পড়েছে। চোখমুখ অস্বাভাবিক শান্ত। রাতের আঁধারের চেয়েও গভীর শোনায় ওর কণ্ঠে বলা একেকটা শব্দ –
‘আমার বস শুধু তারেই চেয়েছে, দাদিমা। তিনি ভালোবাসেন…ব্যস এতটুকুই যথেষ্ট। এখানে আর কোনো কিন্তু, কী আর কোনো ভাবনার স্থান নেই! প্রয়োজনে এমন আরও দশটা পরিবার ভেঙে গুড়িয়ে ফেলব।’
জাহানারা বেগম দীর্ঘশ্বাস ফেলেন। শান্তর হাতটা টেনে ফের বসান পাশে। শান্ত নিজেও ক্লান্ত ভঙ্গিতে মাথাটা রাখে বৃদ্ধার কোলে। চোখ বুজে অনেকটা সময় নিয়ে বলে –
‘আদিল মির্জার হিংস্রতা যার সামনে নুইয়ে পড়ে তাকে এতটুকু জোর তো মেনে নিতেই হবে।’
জাহানারা বেগম আওড়ান, ‘আমার চেষ্টা থাকব মাইয়াডারে স্বাভাবিক করার। আমার যে বড্ড ইচ্ছা ওই তিনজনের একটা হাসিখুশি পরিবার দেখার।’
শান্ত নিজেও যে ওস্বপ্ন দেখে। বাবা-মায়ের ওই আদরের চাদরের আড়ালে বড়ো হওয়া হাসিখুশি আদিল সম্ভবত আর কখনো ফিরবে না। প্রতিশোধের নেশায় যে সে অন্ধকারের বড্ড গভীরে পৌঁছে গিয়েছে। ফেরার, থামার আর রাস্তা নেই। এগিয়েই যেতে হবে। কালো অন্ধকারের এই দুনিয়ায় এগুলোর এই পথে তার সুখ হয়ে ম্যাডাম থেকে যাক অনন্তকাল। হোক তার বসের এই অন্ধকার পৃথিবীর একটুকরো চাঁদের আলো।
.
‘আপনার মেয়ে ও। আপনার যদি এমন নির্লজ্জতা দেখাতে নুন্যতম লজ্জা, অসুবিধে না-হয় তবে আমার হবে কেনো?’
রোযার রাগান্বিত, ঝাঁজাল কণ্ঠের সামনে বড্ড নির্বিকার আদিল। রোযার নরম হাতটা টেনে এনে নিজের ছাঁচা চোয়াল ছোঁয়াতেই চট করে শ্বাসটা গলায় আটকে গেলো। চোখ বুজল আপনাআপনি। শক্ত শরীরটার ওই পরিবর্তনটুকু রোযাও অনুভব করতে পারে। কাঁপে ওর হাতটা। সরিয়ে আনতে চাইল, পারল কোথায়! আদিল ছাড়ল তো না বরঞ্চ আরও দাবিয়ে ধরে রাখল। আষ্ঠেপৃষ্ঠে মিশিয়ে রাখল উন্মুক্ত বুকের সাথে। ওভাবেই ফিসফিস করে প্রশ্ন করল –
‘রাইফেল চেনেন?’
রোযা চোখ রাঙাল। বুঝল না এধরণের তর্কবিতর্কের মাঝে রাইফেল নামের জিনিসটার কী কাজ? আদিল নরম হাতটা চোয়াল থেকে নিজের উষ্ণ ঠোঁটের ওপর আনে। তালুতে ঠোঁট ডুবিয়ে বলে গেলো –
‘আপনার চোপাটা আমার রাইফেলের মতো। কথাগুলো রাইফেল থেকে বেরুনো বুলেটের মতো। এতো ধারালো!’
রোযার ইচ্ছে করে শক্ত একটা কামড় বসিয়ে দিতে। দাঁত কিড়মিড় করে শুধু। একপর্যায়ে হার মানে। ওর দমবন্ধ হয়ে আসছে। এতো বাজেভাবে জড়িয়ে রেখেছে! শ্বাস নিতে হিমশিম খেতে হচ্ছে। অবশেষে আওড়ায় ডুবতে বসা নাবিকের মতো –
‘ছাড়ুন! আমি ঘুমাব।’
আদিল জবাব দেয় না। মুখটা পুনরায় ডোবায় রোযার ভীষণ সংবেদনশীল ঘাড়ের মধ্যে। ওখানে ছাচা চোয়ালটা ঘষে দিতেই রোযা থরথর করে কেঁপে ওঠে। চোখমুখ বুজে মৃদুস্বরে আর্ত নাদও করে। আদিল মাথা তুলে তাকাল। রোযা চোখ বুজে রেখেছে। চাঁদের নিভুনিভু আলোয় কেমন চিকচিক করছে! আদিলের ধূসর চোখের মণিতে চাঁদ ভাসে, ভাসে তারা। মুখ বাড়াতেই রোযা আতঙ্কে মাথাটা ঘুরিয়ে ফেলে। আদিলের গম্ভীর স্বর নিভুনিভু শোনায় –
‘অভ্যাস করে নাও, রোজ-আ। ইউল হ্যাভ টু টলারেট মি ইভেন মোর।’
রোযা বোঝে, ছাড় নেই। বোকার মতো এই অসভ্যের সাথে কথাবার্তা চালানো বেকার। অগত্যা জেদ ধরে চোখমুখ বুজে ঘুমের ভান ধরল। শিরশির করে গেলো ঘাড়ের আশপাশটা। সাড়া দিলো না ও। একটা শব্দও করল না। অথচ ঘুমের ভান ধরতে ধরতে সত্যিই ঘুমিয়ে পড়ল। ক্লান্ত যে! সারাটাদিন ছোটাছুটিতে গেলো। ওর আঁটসাঁট শরীরটা ধীরেধীরে জলের মতো মিশে গেলো। আদিল ভীষণ সন্তর্পণে নরম শরীরটা দু-হাতে বুকে মিশিয়ে নিয়ে বরফের মতো জমে থাকল। নড়ল না, হাত চালালো না। অপলক দেখল সুন্দর মুখটা। তালু সমান দূরত্বটুকুও যেন অনেক বড়ো দূরত্ব। সে মাথাটা আরও এগিয়ে নেয়। এখন নাকে নাক স্পর্শ করার মতন দূরত্ব মাত্র! শ্বাসপ্রশ্বাসের সাথে শ্বাসপ্রশ্বাস মিলেমিশে একাকার।
.
ভোরের কোমল আলো ধীরে ধীরে জানালার ফাঁক গলে ভেতরে প্রবেশ করছে। আলোটা খুব মৃদু, কুয়াশায় ভেজা। পাখির ডাক ভেসে বেড়াচ্ছে। হালকা বাতাসে দুলছে পর্দাগুলো। সেই দুলুনিতে সূর্যের নরম আলো কখনো রোযার মুখে তো কখনো চুলে এসে পড়ছে। এমনিতেও ঘুমটা কেমন ছাড়াছাড়া ছিলো। কপালের ভাঁজগুলো ঘুমের মধ্যেও শান্ত হয়মি। সামনের শক্ত, উন্মুক্ত বুকটায় ঘুমের ঘোরে মুখ ডলতেই কেমন থমকায়। ওর ঘুমটা এবেলায় বাজেভাবে ছুটে যায়। ধড়ফড়িয়ে মাথা তুলতেই চমকে ওঠে। শ্বাস গলায় আটকে যায়। আদিল ডানকাত হয়ে, ডান হাতের তালুতে মাথা রেখে ওর দিকেই অপলক দৃষ্টিতে চেয়ে আছে। নির্ঘুম চোখদুটো র ক্ত লাল। মণির চারপাশে শিরা পর্যন্ত ভেসে উঠেছে। রোযা দ্রুতো সরে আসে। ওর এমন ধড়ফড়ানোতে জেগে ওঠে হৃদিও। বাচ্চাটা মৃদু গলায় ঘুমের তালেই ডাকছে। দুটো শব্দ আওড়ে মিটিমিটি ভাবে চোখ মেলে চেয়েছে। অস্পষ্ট দৃষ্টি আদিলের ওপর পড়তেই রোযার মতোই ধড়ফড়িয়ে উঠে বসে ও। মায়ের মতো আতঙ্কে নয় বরঞ্চ খুশিতে। পরমুহূর্তেই রোযাকে পাশ কাটিয়ে আদিলের উন্মুক্ত বুকের ওপর ঝাপিয়ে পড়ে –
‘ড্যাড!’
মেয়েকে বুকে নিয়ে নাকমুখে শব্দ করল মাত্র, ‘উম! গুডমর্নিং।’
‘গুডমর্নিং। তুমি এখানে ঘুমিয়েছো? আমাদের সাথে?’
হৃদির চোখমুখে অবিশ্বাস। একবার আদিলের মুখে তাকাচ্ছে তো আরেকবার রোযার চোখমুখের দিকে। আনন্দে ওর চোখদুটো চিকচিক করছে। রোযার দিকে চেয়ে কেমন বোকার মতো হাসছে। রোযা দৃষ্টি নুইয়ে ফেলে। আদিল ইতোমধ্যে মেয়েকে বুকে জড়িয়ে চোখ বুজেছে। রোযার ভেতরটা তখনো ধড়ফড় করে যাচ্ছে যে। এই লোক কি তবে সারারাত ঘুমোয়নি? চেয়েছিল? রোযার দিকে? এতটুকু ভাবনাতেই যে ওর শ্বাস গলায় আটকে যাচ্ছে। হৃদি হাত বাড়িয়ে ডাকল –
‘মম, আসো..আসো না।’
রোযা নিজেকে স্বাভাবিক রাখতে চেয়ে বলে, ‘তুমি আরেকটু ঘুমিয়ে নাও, মা। আমি এখানেই আছি।’
হৃদি হাসল দু-গাল ভরে। চোখ বুজল বাবার বুকে ওপরে থাকা অবস্থাতেই। ঘুম হয়নি ওর। ঘড়ির কাঁটা মাত্র ছটায়। রোযা ধীরেসুস্থে নামল বিছানা থেকে। ফ্লোরে আদিলের শার্ট পড়ে আছে। রোযা ওটা ডিঙিয়ে চলে যেতে নিয়েও ফিরে এসে শার্টটা তুলে ওয়াশরুমের দিকে কদম বাড়াল। কয়েক কদম এগিয়ে যখন ফিরে তাকাল আদিলের শক্ত, চওড়া পিঠ দৃষ্টিতে এলো। সূর্যের আলোয় মনে হলো কাঁধের বাজপাখিটা জেগে আছে। এখুনি ওড়াল দেবে। কী ভয়ংকর ওটা দেখতে! রোযা দ্রুতো দৃষ্টি নামাল। চটজলদি ছুটল ফের।
—
জব্বার শিকদারের চওড়া গলা ভেসে বেড়াচ্ছে বাড়ির আনাচে-কানাচে। দুটো ফ্লোর জুড়ে হট্টগোল চলছে। ছোটাছুটি, চেঁচামেচিতে বাড়িটা প্রাণে থৈথৈ করছে। রোযা তৈরি হয়ে সবেমাত্র রুম ছেড়ে বেরিয়েছিল মাত্র। ওমনি দেখতে পেলো সিঁড়িগোড়ার ওদিকে একঝাঁক মাথা। সুপ্তি কিছু মেয়েদের দলবল নিয়ে এদিকেই উঁকিঝুঁকি দিচ্ছে সমানে। যেই রোযাকে দেখল তখুনি ছুটে এসে ধরল হাতটা।
‘ভাবি, আমরা আপনার অপেক্ষাতেই ছিলাম। আসুন..আসুউউউন। দাদিমা কখন থেইকা আপনার কথা জিজ্ঞেস করে যাইতেসে।’
রোযা মুগ্ধ হয়ে দেখতে থাকল নিচের তলা। এতো এতো লোকজন! বিয়েবাড়ির একটা চমৎকার আমেজ এই সাতসকালে অনুভব করা যাচ্ছে। জাহানারা বেগম বসেছিলেন সোফায়। বড়ো ছেলের বউকে হুকুম করছিলেন। রোযাকে নামতে দেখে প্রাণোচ্ছল গলায় হাসেন। হাতের ইশারায় পাশে এসে বসতে বলেন। রোযা এসে বসতেই ওর হাতটা ধরে নরম গলায় জিজ্ঞেস করেন –
‘ভালো ঘুম হইসে তো নাতবউ?’
রোযা ভদ্রতাসূচক মাথা দোলাবে তখুনি সুপ্তি মুখ ঢেকে বলে, ‘দাদিমা, সম্ভবত না। দেখছো না কেমন মশা কামড়েছে ভাবিকে। কতো বড়ো মশা বাবাহ!’
রোযা চমকে তাকাল পাশে। সুপ্তি চেয়ে আছে ওর ঘাড়ের দিকে। জাহানারা বেগমও মাথাটা কাছে এনে ভালোভাবে পর্যবেক্ষণ করতে চাইলেন। রোযার আর বুঝতে বাকি রইল না। দ্রুতো আঁচল টানল। ঢাকল কাঁধ! ততক্ষণে জাহানারা শব্দ করে হাসতে হাসতে বলেন –
‘এমন শরম পাইতে হইব না গো। জামাই সোহাগ করব না তো কে করব?’
সুপ্তি টেনে ধরল রোযার হাতটা। আপনি থেকে সোজা তুমিতে নেমে কেমন আদর করে বলল –
‘ভাবি, চলো ঝুমুরদের বাড়ি যাই। পাশেই, বেশি দূর না।’
তিনতলার অর্ধেক বডিগার্ড তখন নিচে নেমে গেছে। প্রধান দরজার সামনে দাঁড়িয়েছে। ওদের প্রধান ক্লান্ত। ওখান থেকেই না তাকিয়ে কাটকাট গলায় জানাল –
‘ম্যাডামের বাড়ি থেকে বেরুনো নিষেধ।’
রোযা তর্কে গেলো না। সুপ্তির হাত ধরে আস্তে করে বলল, ‘পরে যাবো। হৃদি উঠুক? ও উঠে আমাকে না দেখলে কান্নাকাটি করবে।’
সুপ্তি গতকালই দেখেছে বাচ্চাটা কেমন মা পাগল। তাই আর ও-বিষয়ে কথা বাড়াল না। রোযাকে বাড়ির ভেতরটা দেখাতে শুরু করল। এধরনের বাড়িগুলো রোযার ভীষণ পছন্দের! আগেকার রাজবাড়ির মতন। প্রত্যেক পিলার, দেয়ালে এতো চমৎকার কারুকার্য। মুগ্ধ চোখে দেখেও ক্লান্ত হওয়া সম্ভব না। পুরো বাড়িটা ঘুরে যখন ছাঁদে এলো দেখতে পেলো নতুন মুখ। একটি মেয়ে দাঁড়িয়ে আছে। বেশ সুন্দর দেখতে। লম্বা চুল, ফর্সা গায়ে রং। লম্বাচওড়া, সামান্য স্বাস্থ্য আছে। বয়সটা বিশের ওপরে হবার সম্ভাবনা দারুণ। রোযার দিকেই চেয়ে আছে মেয়েটা। কিছুটা অদ্ভুত সেই দৃষ্টি। অঙ্গভঙ্গিও! সুপ্তি হেসে বলল –
‘আমার বড়ো ফুফুর, বড়ো মেয়ে। কাজল আপু, এসো পরিচয় হও।’
মেয়েটা এলো বেশ সময় নিয়ে। এসে যখনদাঁড়াল সামনে, আড়চোখে রোযার মুখের দিকেই চাই্ল বারেবারে। সুপ্তি বলে যাচ্ছে –
‘শান্ত ভাইয়ার বসের স্ত্রী, রোযা ভাবি। গতকাল তো পরিচয় হওনি। আজ হয়ে নাও। ভাবি কিন্তু ভীষণ মিষ্টি।’
সুপ্তির উচ্ছ্বাসের সামনে মেয়েটা কিছুটা নির্বিকার। কথাবার্তাও তেমন বাড়াল না। রোযার আগ্রহ এভাবেও কম। ভদ্রতা দেখাল না। সোজা ঘুরে নেমে গেলো। ওমনি সুপ্তি ছুটল রোযার পেছনে। রোযার হাত জড়িয়ে ভালোভাবে তাকাল মুখের দিকে। অবশেষে গলা নামিয়ে বলল –
‘রাগ করো না ভাবি। কাজল আপু এমন না। আজ কী হয়েছে কে জানে! মন খারাপ বোধহয়।’
রোযা এড়াল কাজল নামের মেয়েটার ব্যাপার। অন্য ব্যাপারে কথা বলতে বলতে যখন নিচের ফ্লোর এসে পৌঁছাল, ক্লান্ত সামনে এসে দাঁড়াল। রোজকারের মতো হাতে কোনো অ স্ত্র নেই। মাথা নুইয়ে ধীরে বলে শুধু –
‘ম্যাডাম, স্যার ডাকছেন।’
রোযা মাথা তুলে তাকাতেই একজোড়া ধূসর চোখের দৃষ্টিতে দৃষ্টি মিলল। আদিল দাঁড়িয়ে আছে উদোম শরীরে। ওর কোলে হৃদি। হাত নাড়িয়ে ইশারায় ডাকছে সমানে। রোযা দৃষ্টি নোয়াতে গিয়ে হকচকাল। দৃষ্টি গাঢ় করতেই দোতলার পিলারের পেছনে কারও উপস্থিতি লক্ষ্য করল। কিছুক্ষণ আগে ছাঁদে যেই মেয়েটাকে দেখে এলো, ওই মেয়েটাই। আড়াল হয়ে আছে। রোযার মনে পড়ল গতকালও সম্ভবত এই মেয়েটাকে ও দোতালার পিলারের পেছনে দেখেছিল। এমন লুকোচুরি করছে কেনো? আর দেখছেই বা কী? হৃদি ইতোমধ্যে চেঁচিয়ে উঠেছে –
‘মম, কাম আপস্টেয়ার্স।’
রোযা আর ওসব নিয়ে ভাবল না। সিঁড়ি ধরল দ্রুতো। এতটুকু সময়তেই বাচ্চাটা হেরে গলায় সমানে ডেকেই গেলো। যা শুনে নিচতলা থেকে জাহানারা বেগম সহ বাকিরা শব্দ করে হাসছে।
.
‘বস!’
আদিল ল্যাপটপ থেকে দৃষ্টি তুলে তাকাল। শান্তকে দেখে ডান ভ্রু তুলল ওমনি। এলেন, ক্লান্ত সহ বাকিরা ফিক করে হেসে ফেলেছে। শান্তর পরনে একটা সাদা লুঙ্গি। গামছাটা কাঁধে। ভীষণ করুণ গলায় অনুরোধ করল –
‘বস, নিচে আসুন না।’
আদিল হাত নাড়িয়ে পুনরায় ল্যাপটপে ব্যস্ত হয়। শান্ত মানল না। ধপ করে হাঁটু ভেঙে বসল। একটা শব্দও আর বলল না। তবে ওর দৃঢ়তা আকাশছোঁয়া। আদিল না গেলে ওর গায়েহলুদ হবে না, ব্যস! অগত্যা আদিল ল্যাপটপ বন্ধ করে উঠে দাঁড়াল। শান্তর খুশি আর কে দেখে। বসের পিছু পিছু ছোটে ও। বাকিরাও এগুচ্ছে। সিঁড়ি বেয়ে নামতে নামতে আদিলে্র চোখমুখ গম্ভীর হয়। চারিপাশে চেয়ে ডাকে –
‘শান্ত! তোর ম্যাডাম কোথায়?’
শান্ত নাক চুলকে বলে, ‘পেছনের বারান্দার দিকে বস।’
আদিলের কদম থমকাল, ‘কেনো?’
এলেন জবাব দেয় এবার, ‘শান্তর ফিউচার ওয়াইফের গায়েহলুদ হচ্ছে। ওদিকেই মেয়েমানুষরা সব।’
‘পুরুষ আছে ওখানে কোনো?’
শান্ত দ্রুতো বলে, ‘না বস। একটা পুরুষ কেনো, ছেলে বাচ্চাও নেই। আর পুরোটা আটকানো।’
পুনরায় বড়ো বড়ো কদম বাড়াল আদিল। ইতোমধ্যে বড়ো উঠোন জুড়ে গায়েহলুদের বন্দবস্ত করা হয়েছে। একটা পিঁড়িতে গিয়ে বসে শান্ত। ওকে ঘিরে ধরেছে মা- চাচিরা। নাসির শিকদার চেয়ার বসিয়েছেন সামনেই। আদিল গিয়ে বসল ওখানে। তার পেছনে ক্লান্ত, এলেন। শান্তর গায়ে হলুদ মাখানো হচ্ছে। পাশাপাশি অদ্ভুত সব গান গাচ্ছেন মহিলারা। শান্ত আড়চোখে একবার তাকাল। ঠোঁট নড়ল ওর। কিছু বলতে চেয়েও তবে আর শেষমেশ কিচ্ছুটি বলতে পারল না। হঠাৎ আদিল উঠে দাঁড়াল। এগিয়ে এলো। শান্ত চমকানোর আগেই এক বাটি হলুদ একহাতে নিয়ে শান্তর মুখে লেপ্টে দিলো। মুহূর্তে আনন্দে শান্তর চোখদুটো চিকচিক করল। অনুভূতি সামলে উঠতে সময় লাগল যে। ইতোমধ্যে হৈচৈ শুরু হয়েছে। উঠোন জুড়ে সব বডিগার্ডসদের উচ্ছ্বাসে আলাদাই একটা পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। সবগুলো দলবেঁধে এসে কোলে তুলে নিয়েছে শান্তকে। এলেন একফাঁকে হলুদের পানিটা সোজা ঢালল শান্তর গায়ের ওপর। সৈয়দ সবার মধ্যে ভীষণ লুকিয়ে খুলে দিয়েছে লুঙ্গির নট। শান্তর হাসি ধপ করে নিভে গেলো। ধড়ফড়িয়ে চেঁচাল –
‘মানইজ্জত খাবি নাকি! সর..সর। নামা হালারপো হালারা।’
ও দু-হাতে কোনোরকমে লুঙ্গিটা পেঁচিয়ে নিয়েছে। আদিল পুনরায় গিয়ে বসেছে চেয়ারে। বিশাল বড়ো বক্সে তখন গান বাজছে। ওই গানের সুরে এলোপাতাড়ি ওরা মিলেমিশে ভেজা উঠোনে নাচছে। ওদের সামনে শান্ত। ওর লুঙ্গি তোলা নাচে সামিল হয়েছেন স্বয়ং নাসির শিকদার। আদিল এলোমেলো ভঙ্গিতে একটা ব্লুটুথ কানে ঢোকাল। এবং ঢুকিয়েই থমকে গেলো। ওমন উল্লাসের মধ্যেও শান্ত লক্ষ্য করল বসের তাজ্জব মুখ। হঠাৎ আদিল দাঁড়াতেই ক্লান্ত, এলেন ছুটে এলো। এলো শান্তও। আদিল দ্রুতো গলায় প্রশ্ন করল –
‘ওদিকটা দেখার উপায় আছে?’
শান্ত বোকার মতো চেয়ে থাকল। আদিলের কথা বুঝতে একটু সময় লাগল। বুঝতেই ওর মুখটা হা হয়ে এলো। এলেন গুঁতো মার তেই চটজলদি বলে –
‘দাদিমার রুম দিয়ে দেখা যায়।’
আদিল কদম বাড়াল বাড়ির ভেতর। বসের তাড়া দেখে আশ্চর্য বাকিরাও। শান্ত লুঙ্গি তুলে ছুটছে। পাঁচমিনিটের পথ ওর দুমিনিটে অতিক্রম করেছে। জাহানারা বেগম রুমে নেই। রুমের ভেতরে আদিলের সাথে শুধু শান্ত আর এলেন প্রবেশ করেছে। জানালাটা খোলা। পরিষ্কার ভাবে মেয়েদের চেঁচামেচি শোনা যাচ্ছে। ঝুমুর তখনো অনুনয় করে যাচ্ছে –
‘ভাবি, তুমি আমাকে ভালোবাসোনা? হু..? বলো?’
রোযার অসহায় কণ্ঠ, ‘বাসি..কিন্তু!’
হৃদি গোঙাচ্ছে রীতিমতো, ‘মম, আই ওয়ানা সিইই। আই রিয়্যালি ওয়ান্ট টু সি ইউ ড্যান্স!’
আদিল এসে দাঁড়াল জানালার সামনে। দৃষ্টি প্রথমেই পড়ল রোযার ওপর। পরনে হলুদ রঙের জর্জেটের শাড়ি। চুলগুলো কোমরের নিচে দুলছে। জাহানারা বেগমের পরিয়ে দেয়া গহনা গুলোই শোভা পাচ্ছে নাকে, কানে, গলা আর হাতে। অবশেষে রোযা অসহায় ভাবে মাথা দোলাল। শাড়ির আঁচলটা গুঁজে নিলো কোমরে। বক্সে গান ছাড়া হয়েছে। রোযা গানের সুর ধরে নাচ শুরু করতেই আদিলের হাত থেকে ব্লুটুথটা শব্দ করে ফ্লোরে পড়ে গেলো।
‘ইয়ে রূপ রাং মেরা~ জাদ হ্যায় ফিতনো কি,
আরে নিয়াত বা্দাল গায়ি~ জানে কিতনো কি…
হাসকে জিধার ম্যায় আপনী, নাজার উঠা দু,
উধার বানে আফসানে…
হাঁ মিলেঙ্গে তুঝকো, গালি গালি,
মেরে নাম কে দিওয়ানে…..
হুঁ… এইসি-ওয়াইসি ম্যায় নেহি রাজা
তেরে জ্যায়সে কিতনে হ্যায় যা যা!’
বরাবরই রোযা ভীষণ সচেতন। সেন্সিটিভ। অন্যরকম অনুভূতি হতেই, নাচতে নাচতে হঠাৎ করেই ওর দৃষ্টি সামনে পড়ল। থমকাল পা-জোড়া। ধূসর চোখজোড়া চিনতে একমুহূর্তই যে যথেষ্ট! ওই দৃষ্টিতে দৃষ্টি মিলতেই রোযার দমবন্ধ হয়ে আসে। জমে গেল পুরো শরীর। আদিল ইতোমধ্যে ওখান থেকে সরে গিয়েছে। অথচ রোযা নড়তে পারে না দীর্ঘসময়। ওর শ্বাস তখনো গলায় আটকে আছে। সুপ্তি এসে টেনে ধরল হাতটা –
‘এই ভাবি, নাচ থামালে কেনো? কী চমৎকার হয়েছে জানো? আমিতো ম রে যাচ্ছি! কী সুউউউন্দর!’
রোযার দুনিয়াটা ঘুরছে সমানে। ওর চোখমুখের অবস্থা করুণ। হঠাৎ করে দু-হাতে চোখমুখ ঢেকে ও সোজা চেয়ারে গিয়ে বসে পড়ল। লজ্জায়, আতঙ্কে ওর কান্না পাচ্ছে। সবাই তো বলল, এখানে বাড়তি কেউ আসতে পারবে না। দেখতে পারবে না অন্যকেউ। এই জায়গাটা নিরাপদ। অথচ এখন! এখন যে ওর সর্বনাশ হয়ে গেলো। সুপ্তির পাশাপাশি ঝুমুরও এসে দাঁড়াল রোযার সামনে। ওর দু-গালে সুন্দর করে হলুদ মাখানো।
‘কী হয়েছে ভাবি? হঠাৎ কী হলো?’
রোযা নিজেকে সামলে নিলো। যেন কিছুই হয়নি। স্বাভাবিক কণ্ঠে বলে, ‘এবার নাচো তোমরা। আমি দেখব। নাচো, নাচো।’
সুপ্তির গান পছন্দ করা আছে। ও দাঁড়ায় গিয়ে সবার মধ্যিখানে। পুনরায় নাচ-গান শুরু হয়েছে। অথচ রোযা উপভোগ করতে পারল না। শূন্যে চেয়ে থাকল বোকার মতো। হৃদি কোলে বসে দু-হাতে তালি দিচ্ছে। ঘনঘন দু-হাতে ধরছে রোযার মুখ। মুগ্ধ গলায় বারবার বলছে –
‘মম, তোমাকে তখন ডলের মতন লাগছিল।’
বাচ্চা বাচ্চা প্রশংসায় রোযার গলাটা আরও শুকিয়ে গেলো।
—
সন্ধ্যার সময় অথচ মনে হচ্ছে গভীর রাত। কালো মেঘে ঢেকে আছে পুরোটা আকাশ। ভয়ংকর বৃষ্টি নামবে বোধহয়। ইলেক্ট্রিসিটি চলে গিয়েছে। সবটা ঘুটঘুটে অন্ধকার। সুপ্তি, ঝুমুর সহ বাকিরা বিকেলেই একসাথে আলোচনা করেছিল তারা পুরানবাড়ি যাবে। ওটা ঝুমুরদের বাড়ি। এইতো, মাত্র পাঁচমিনিটের পথ। বাড়ির উত্তরদিকের ঘরের বারান্দা দিয়ে যেই জঙ্গলটা যায়..ওটার রাস্তা ধরেই। একদম নিরাপদ। পুরাটাই শিকদার বাড়ির সীমানা। এসব শুনে অবশেষে রোযা রাজি হয়। এখান থেকে এখানেই তো। তারওপর, এখানে কী আর এমন হবে? এটাতো শহর না। অগত্যা হৃদিকে নিয়ে ও ওদের সাথে উত্তরদিকের ঘরে পৌঁছাল। বারান্দাটা একদম জমিন লাগানো। সহজেই নামা যায়। হৃদিকে নিয়ে নামতেই ও খটখট করে হাসল। হাসল রোযাও। বাতাসে উড়োউড়ি কাণ্ড। ধুলোবালিতে চারিপাশ কেমন আরও অন্ধকার হয়ে গেলো। ঝুমুর তখন ধরে রেখেছে রোযার হাত। বলে যাচ্ছে –
‘মা তোমার কথা শুনে কী পরিমাণ আগ্রহী হয়েছিল জানো না! তোমাকে দেখার তার বড়ো ইচ্ছে। দেখিও, তোমাকে দেখলে কী খুশিটাই না হয়!’
সুপ্তির হাতে লণ্ঠন ছিলো। এযাত্রায় লণ্ঠনটা নিভে গেলো ধপ করে। জঙ্গলের গাছপালায় আঁধার আরও দৃঢ় দেখাল। হৃদির চোখে বালু যেতে পারে ভেবে ওকে আঁচল দিয়ে ঢেকে কোলে নিয়েছে রোযা। জঙ্গলটা ছোটোখাটোই। দু-ধারে যে রাস্তা গিয়েছে এখান থেকে বোঝা যাচ্ছে। আকাশে ফাটল ধরল। পড়ল তীব্র বজ্রপাত। রোযা আঁতকে ওঠে –
‘ভয় পেয়েছো, মা?’
হৃদি হাসছে তখনো, ‘উহুঁ। তুমি আছো না।’
রোযা মৃদু হাসে। কিছু বলতে নিতেই… হঠাৎ, চোখের পলকে চারিপাশ থেকে অনেকগুলো গাড়ির তীব্র আওয়াজে কেঁপে ওঠে ভূমি পর্যন্ত। রোযা সতর্কও হতে পারল না। পি স্তলের শব্দে জঙ্গলের পশুপাখি শব্দ করে উড়ে বেড়াল মাথার ওপরে।
চলবে ~~~
® নাবিলা ইষ্ক।
Share On:
TAGS: আদিল মির্জা’স বিলাভড, নাবিলা ইস্ক
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
আদিল মির্জাস বিলাভড পর্ব ৪
-
আদিল মির্জাস বিলাভড পর্ব ১৭
-
আদিল মির্জাস বিলাভড পর্ব ১৯
-
আদিল মির্জা’স বিলাভড পর্ব ৩০
-
আদিল মির্জাস বিলাভড পর্ব ১
-
আদিল মির্জা’স বিলাভড পর্ব ২৬
-
আদিল মির্জ’স বিলাভড পর্ব ২৮
-
আদিল মির্জাস বিলাভড পর্ব ১৪
-
আদিল মির্জাস বিলাভড পর্ব ২২
-
আদিল মির্জাস বিলাভড পর্ব ১৫