Golpo romantic golpo আদিল মির্জাস বিলাভড

আদিল মির্জা’স বিলাভড পর্ব ৩৪


আদিল মির্জা’স বিলাভড
— ৩৪

দুপুরের আজান পড়েছে। উত্তপ্ত সূর্যটা কুড়েঘরের ওপরে। ঝুমুরের মুখটা কেমন আতঙ্কে নীল হয়ে এসেছে। ও তড়িঘড়ি করে জাপ্টে ধরেছে শান্তর অশালীন হাত দুটো। হাত দুটো থামানো গেলেও মুখটা কোনোভাবেই থামানো যাচ্ছে না। লোকটা এতো অসহ্যকর কেনো? এতো খারাপ কেনো? দূরে থেকেও ওর প্রাণ নেয়, আবার কাছে এসেও। এইযে ওর ভীষণ সংবেদনশীল ঘাড়ে ডুবে থাকা মাথাটা এখুনি সরানো বাধ্যতামূলক যে। নাহলে ঝুমুর হয় অজ্ঞান হবে, না-হয় শ্বাসপ্রশ্বাসের অভাবে ম রেটরে যাবে। সাগরে ডুবতে বসা নাবিকের মতো হাঁসফাঁস করে অবশেষে চোখমুখ বুজে চিৎকার করে ওঠে –

‘খালা তুমি!’

শান্ত একমুহূর্তের জন্য স্থির হয়ে পড়ে। অসন্তুষ্ট হয়েই চোখ মেলে তাকায়। পলক ফেলার আগেই ঝুমুর বিড়ালের মতো ছিটকে সরে আসে। পালাতে চায় তখুনি। পারল কই? শান্ত কতটা অবলীলায় শক্ত করে ধরল হাতটা। ওর এইসব কীর্তি যে পুরনো হয়ে গিয়েছে। একই চাল আর কতো চেলে বোকা বানাবে শান্তকে? ভীত ঝুমুরকে আপদমস্তক দেখতে দেখতে এগুচ্ছিল যেই, তখুনি পকেটের ফোনটা ভাইব্রেট হতে শুরু করল। এটা শান্তর একান্তগত ফোন। জরুরি প্রয়োজনে কল আসে। হাত ধরে রেখে, ঝুমুরের দিকে চেয়ে থাকা অবস্থাতেই শান্ত ফোন বের করল। কল রিসিভ করে কানে ধরতেই চোখমুখের অভিব্যক্তি পরিবর্তন হয়ে গেল। নরমসরম হাতটা ছেড়ে দিলো। কিছুক্ষণ আগের বেয়ারা ভাবটা আর নেই। চোয়াল শক্ত, চোখের চাহনিও কেমন ধারালো। ঝুমুর এই শান্তকে জমের মতো ভয় পায়। দু-পা পেছনে চলে যেতে চাইলেই — শান্ত পুনরায় ধরল ওর হাতটা। ফোনে কথা বলতে বলতেই তাকাল কাজল রাঙানো চোখ দুটিতে। কী সরল আর সুন্দর! শান্তর রাগটা নিভে গেলো অমনি। ফোনটা কান থেকে কিছুটা সরালো। ঝুমু্রের গা ঘেঁষে দাঁড়াল ফের। চুমু বসাল চোখে, কপালে। ফিসফিস করে আওড়াল –

‘অনেক অজুহাত না? বিয়েটা হতে দে। শিকল দিয়ে বাঁধব তোকে আমার সাথে। ছোটাব তোর এই পালাইপালাই স্বভাব।’

কথাগুলো শোনা মাত্রই ঝুমুরের শরীরটা শক্ত হলো। পেছনের টিনের ওপর ভার ছেড়ে দিল। চোখ বুজে রাখল আরও শক্ত করে। শান্ত কথা বলতে বলতে বেরিয়ে গিয়েছে অনেকটা সময় হচ্ছে। ততক্ষণেও নিজেকে সামলে উঠতে পারেনি মেয়েটা। দরজাটা খোলাই ছিলো। ভাইয়াকে বের হতে দেখেই দুয়ারে এসে দাঁড়িয়েছে সুপ্তি। ঝুমুরের ওমন অবস্থা দেখে শব্দ করে হেসে বলে –

‘কীরে! ওভাবে দাঁড়িয়েই থাকবি? মে রেছে নাকি?’

ঝুমুর চমকে উঠল। তাকাল সতর্ক চোখে। নিজেকে স্বাভাবিক করতে চাইল। অথচ পরমুহূর্তেই সুপ্তি কেমন মুখ ঢেকে নাক সিঁটকাল –

‘ছিহ্, কী অশ্লীল তোরা!’

ঝুমুর লজ্জায় হতভম্ব হয়। ঘুরে দাঁড়ায় চটজলদি। মুখটা আড়াল করে ঠোঁটে হাত রাখে। না, ফোলেনি তো। কাটেওনি। তাহলে! তখুনি সুপ্তির চাপা হাসির আওয়াজ ভেসে আসে। বুঝতে পারল, মজা নিচ্ছে মেয়েটা! ঝুমুরের রাগ হয়। অথচ ও রাগ দেখাতেই পারে না। সুপ্তি ঝড়ের বেগে এসে ধরে ওর হাতটা। টেনে নিয়ে বেরুতে বেরুতে চাপা কণ্ঠে বলে যায় –

‘তুইতো লুকিয়ে ছিলি তাই দেখিসনি। শান্ত ভাইয়ার বস যখন বসার ঘরে প্রবেশ করল মনে হলো এই বিশাল বাড়িটা ছোটো হয়ে গেছে। এতো ক্ষ মতা একটা মানুষের কীভাবে থাকতে পারে? জানিস, আমরা উপস্থিত কেউ ভালোভাবে শ্বাস নিতে পারছিলাম না ভয়ে? বাবা-চাচা সবাই কেমন এইটুকুন হয়েছিল? আর তখুনি দাদিমা ফাটিয়ে দিয়েছে।’

বলেই হাসল শব্দ করে। ভীষণ উচ্ছ্বাস নিয়ে পুরো কাহিনী খুলে বলল। অবাক হচ্ছে ঝুমুর। আগ্রহ নিয়ে শুনছে। সুপ্তি তখনো বলে যায় –

‘আমরা ভেবেছিলাম না বস বয়স্ক? মোটেও না। ভাইয়ার বয়সেরই। ভীষণ রকমের সুদর্শন জানিস? আর উনার স্ত্রী! মাথা নষ্ট সুন্দর রে। এতো সুন্দরী উনার স্ত্রী। আমিতো চোখ ফেরাতে পারছিলাম না। আর বাচ্চাটা! মনে হলো পুতুল! কী সুন্দর ফটরফটর করে ইংরেজিতে কথা বলে! তুই বাচ্চাটাকে দেখলেই গলে যাবি।’

ঝুমুরের আগ্রহ আকাশ ছুঁয়েছে। ও মন খারাপ করে ফেলে, ‘আমিতো দেখতে পারলাম না।’

সুপ্তি ওকে নিয়ে ইতোমধ্যে বাড়িতে প্রবেশ করেছে। বসবার ঘরটা পুরোপুরি ফাঁকা নয়। আজ বাড়িতে অনেক মানুষ। এদিক-ওদিক ছড়িয়ে ছিটিয়ে একেকজন একেক কাজ করছে। সবাই ব্যস্ত। এই সুযোগেই সুপ্তি আড়ালে ওকে টেনে নিয়ে সিঁড়ি ধরল। ঝুমুর ধড়ফড়িয়ে তাকাল আশেপাশে। চাপা স্বরে বলল –

‘কী করতে চাচ্ছিস? উনি বারবার করে বলেছেন ওপরে যেতে না।’

সুপ্তি রীতিমতো ঝুঁকে আছে। ওভাবেই উঠছে ওপরে। ফিসফিস করে বলছে –

‘কিছু বলবে না। চোপ থাক।’

ঝুমুর সংকোচ করে পুনরায়, ‘ওপরে অনেক লোক। কীভাবে যাবো? উনি জানলে বকবেন। ফিরে যাই চল। দুপুরে খেতে নামবে না? তখন দেখে নেব।’

সুপ্তি শুনল না। ঝুমুরকে টেনে নিলো নিজের সাথে। দোতালায় বড়ো চাচিকে দেখে দ্রুতো পিলারের পেছনে লোকাল দুজন। সে দৃষ্টির বাইরে যেতেই তিনতলার সিঁড়ি ধরল। এখান থেকেই বোঝা যাচ্ছে থমথমে এক নীরবতা তিনতলা জুড়ে। সিঁড়িগোড়ার মাথাতেই কালো পোশাকের কয়েকজনকে দেখা যাচ্ছে। ঝুমুর দাঁড়িয়ে পড়ল ভয়ে। সুপ্তি চোখ রাঙাল। মেয়েটা অতিমাত্রায় ভীতু! ওকে টেনে পেরুল বাদবাকি সিঁড়িগুলো। শেষ সিঁড়িতে দাঁড়িয়ে পড়তে বাধ্যই হলো একরকম। তাদের সামনেই একজন এসে দাঁড়িয়েছে। তাদের দিকে না চেয়েই গমগমে গলায় বলল –

‘ফিরে যান।’

সুপ্তি দ্রুতো ঝুমুরকে সামনে ঠেলে বলল, ‘শান্ত ভাইয়ার হবু স্ত্রী উনি। চিনেছেন?’

ক্লান্ত তাকাল না। দৃষ্টি নুইয়ে রাখল। কণ্ঠ কিছুটা ভদ্র হলো অবশ্য। খড়খড়ে ভাবটা নেই, ‘কী প্রয়োজন?’

সুপ্তি মিষ্টি করে হাসল। আরও ঠেলল ভয়ে সিঁটিয়ে যাওয়া ঝুমুরকে, ‘আমরা বসরানি, প্রিন্সেসের সাথে দেখা করতে চাচ্ছিলাম।’

ক্লান্তর ঠোঁট বেঁকে গেল। বসরানি! অদ্ভুত সম্বোধন বটে! ও বিনয়ের সাথে বলতে চাইল –

‘পারমিশন নেই। আপনারা প্লিজ ফিরে…’

তখুনি পেছন থেকে ভীষণ সুন্দর এক কোকিলা কণ্ঠে বলা কথাগুলো ভেসে এলো, ‘কী হয়েছে?’

ক্লান্ত চেপে দাঁড়াল সামনে থেকে। ঝুমুর ভয়ে ভয়ে তাকাল সামনে। চোখের পলক ফেলল কয়েকবার রীতিমতো। অনেক সুন্দর এক নারী সামনে থেকে এগিয়ে আসছে। পরনে শাড়ি। কী সুন্দর চুল! গায়ের রং। সূর্যের আলো পড়েছে তার ওপর। কেমন ঝলমল করছে নারীটি! ঝুমুর কিছুটা বেকুবই হয়েছে। ড্যাবড্যাব করে তাকিয়েই থাকল কেমন। সুপ্তি ঠোঁট ভিজিয়ে আস্তে করে সতর্কের সাথে বলে –

‘আমায় চিনেছেন? ওইযে নিচে কথা বললাম যে? মনে…পড়ে?’

রোযা মৃদু হাসে। এগিয়ে আসে কয়েক কদম। বলে, ‘চিনব না কেনো? নিচে দেখা হলো তো। আসুন না, দাঁড়িয়ে আছেন কেনো?’

বলতে বলতে ও তাকাল ক্লান্ত সহ বাকি বডিগার্ডসদের দিকে। ক্লান্ত অসহায়! ও দৃষ্টি অনুভব করে দৃষ্টি নুইয়ে রেখেই জানায় –

‘বসের নিষেধাজ্ঞা ছিলো, ম্যাডাম।’

রোযা আশ্চর্য না হয়ে পারে না। যাদের বাড়ি তাদের ওপরই নিষেধাজ্ঞা? এই লোক এতো নির্লজ্জ কেনো! রোযা কথা বাড়াল না। পুনরায় বলল –

‘আসুন না।’

সুপ্তি বাকি দুটো সিঁড়ি লাফিয়ে উঠল। ঝটপট ধরল রোযার হাতটা। উচ্ছ্বাস নিয়ে আবদার সুরে বলে, ‘আমি সুপ্তি, শান্ত ভাইয়ার চাচাতো বোন। আমাকে তুমি করে বলুন, প্লিজ।’

রোযা দেখল এইটুকুন মেয়েটাকে। বয়স বড়োজোর কতো হবে, ঊনিশ বা কুড়ি! বা এরচেয়েও কম। অল্পবয়সী মেয়েদের প্রতি ওর আলাদারকমের স্নেহ আসে। তারওপর সেই মেয়ে যদি হয় এতো মিষ্টি আর চঞ্চল! রোযা মাথা দুলিয়ে তাকাল পেছনে। ঝুমুর তখনো বিড়ালছানার মতো দাঁড়িয়ে আছে। সুপ্তির পুরো বিপরীত ওই মেয়েটা। সুপ্তির পরনে সুতির কামিজ, পাখির মতন চঞ্চল। অথচ অপরজনের পরনে স্কার্ট, ছোটো কুর্তি, মাথায় ওড়না। কিছুটা চাপা, লাজুক। অন্যরকম সুন্দর। বিড়ালের মতো ড্যাবড্যাব করে তাকেই দেখছে আড়েআড়ে। রোযা আওড়ায় –

‘আচ্ছা, ডাকব। আর উনি…’

সুপ্তি দ্রুতো টেনে আনে ঝুমুরকে। ওকে সামনে ঠেলে বলে, ‘ও একটু না অতিমাত্রায় লাজুক, বসরানি।’

রোযা থতমত খায়। বসরানি! এই আবার কেমন সম্বোধন! সুপ্তি বোধহয় বুঝল রোযার তাজ্জব হওয়ার কারণ। অমনি বেচারি অসহায় হয়ে বলে –

‘আমি দুঃখিত, বসরানি। বুঝছি না আপনাকে কী বলে ডাকা যায়!’

রোযা হেসে ফেলল। বলল, ‘যা ইচ্ছে ডাকো, তবে এটা নয়। আপু ডাকতে পারো।’

ঝুমুর আড়েআড়ে চেয়ে এবারে আস্তে করে বলে, ‘ভাবি ডাকতে পারব?’

সুপ্তির চোখ দুটো জ্বলজ্বল করে উঠল মুহূর্তে। সাহস পেয়ে পুনরায় ধরল রোযার হাতটা। ডাকল –

‘ভাবি, ওকে চিনেছেন? ও কিন্তু শান্ত ভাইয়ার হবুস্ত্রী। মেয়েটা লাজুক তবে একবার মিশে গেলে আপনাকে জ্বালিয়ে খাবে। লুকিয়ে লুকিয়ে ও অনেক দুষ্টু আছে।’

ঝুমুর লজ্জায় মাথা নুইয়ে ফেলে। রোযা হাসে। ছোঁয় ঝুমুরের মিষ্টি গান। ইতোমধ্যে ওদের নিয়ে রুমে প্রবেশ করেছে। ঢুকেই দেখতে পেলো হৃদি চোখমুখ অন্ধকার করে নামছে বিছানা থেকে। মাত্রই ঘুম ভেঙেছে ওর। রোযাকে দেখতে পেয়েই ডাকে –

‘মম…’

রোযা এগিয়ে এসে কোলে তুলে নিলো ওকে। হৃদি দু-হাতে জড়িয়ে ধরল রোযার গলা। বাচ্চার ফোলাফোলা চোখে ঠোঁট ছুঁয়ে, এলোমেলো চুলগুলো একহাতে গুছিয়ে দিতে নিয়ে আওড়াল রোযা –

‘ঘুম ভেঙে গেলো কেনো এখুনি? আরেকটু ঘুমাতে।’

হৃদি গোঙাল রোযার বুকে মিশে গিয়ে। আওড়াল, ‘তুমি নেই যে!’

রোযা অসহায় এক্ষেত্রে, ‘এখানেই তো ছিলাম, মা।’

‘আমি তোমায় পাচ্ছিলাম না, মম। আই ওয়াজ লুকিং ফর ইউ।’

রোযার ভেতরটা মুষড়ে উঠল। ও লক্ষ্য করেছে, হৃদির এই অদ্ভুত আচরণ! এই যেন একধরণের মানসিক চাপ। সে বাচ্চাটার চোখের আড়াল হলেই ও ভয় পায়। হয়তোবা দীর্ঘসময় কাজ সেরে ওকে একা রেখে বাড়িতে ফেরার কারণেই বাচ্চাটার এমন মানসিক অবস্থা। এখনো হয়তোবা ভাবে, ও আড়াল হয়েছে মানে ফিরে গেছে তাদের বাসায়। রোযা শক্ত করে জড়িয়ে রাখল ওকে। ফিসফিস করে বলল –

‘মা বলেছি না তোমাকে ছেড়ে কোথাও যাবো না? হুম?’

হৃদি ইতোমধ্যে চোখ বুজে ফের ঘুমিয়েছে। আস্তে করে শ্বাস নিচ্ছে। এবার আর ওকে কোল থেকে নামাল না রোযা। ওকে কোলে নিয়েই তাকাল ঝুমুর, সুপ্তির দিকে। ওরা দাঁড়িয়ে ড্যাবড্যাব করে দেখছে। রোযা ধীরে বলে –

‘সরিই, সরি। বসো প্লিজ। আসো…’

ঝুমুর, সুপ্তি বসল গিয়ে সোফায়। রোযা হৃদিকে কোলে নিয়েই বসল ওদের সামনে। আলাপে ব্যস্ত হলো তিনজন। তাদের এতো কথা, হাসির আওয়াজে হৃদির ঘুম ভাঙল না। বেশ গভীর ভাবেই কোলে ঘুমালো। রোযা খেয়াল করেছে, সে পাশে থাকলে চারিপাশে ঝড় বইলেও ঘুম ভাঙবে না ওর। অথচ সে সরে গেলে, পিনপতন নীরবতায়ও এই মেয়ের ঘুম ভেঙে যায়। বিষয়টা আলৌকিক বটে।

.

দীর্ঘ দুয়েক ঘণ্টার মিটিং শেষ করেছে আদিল। মেজাজটা প্রচন্ডরকমের খারাপ। গটগটে কদমে রুমে প্রবেশ করেতেই মেজাজটা হিমালয় ছুঁলো। কপালে ভাঁজ পড়ল চারপাঁচেক। রুম ফাঁকা পুরো। শান্ত আর এলেনও থতমত খেয়েছে। আদিল রুম থেকে দ্রুতো কদমে বেরিয়ে ক্লান্তকেও পেলো না। গলা তুলে ডাকবে তার পূর্বেই কানে ভাসল হৃদির রিনরিনে কণ্ঠের হাসির আওয়াজ! নিচ থেকে আসছে। আদিল এগুলো কয়েককদম। দাঁড়াল করিডোরের রেলিং ঘেঁষে। এখান থেকে পুরো নিচতলা দেখা যায়। ডাইনিং এরিয়াটাও স্পষ্ট। ওখানে খাবার পরিবেশনের কার্যক্রম চলছে। ডাইনিংয়ের পাশেই রোযা দাঁড়িয়ে আছে। পরনে আগের শাড়িটা নেই। বরঞ্চ নতুন, একটা সাদা শাড়ি, যার পাড় লাল রঙের। ব্লাউজটাও লাল। হাতে একটা প্লেট ধরিয়ে দিয়েছে সম্ভবত। ওর হতবিহ্বল চোখমুখের সামনে জাহানারা বেগম লাঠি ধরে দাঁড়িয়ে আছেন। চোখমুখ উজ্জ্বল বৃদ্ধার –

‘নাতবউ, জামাইয়ের মন, সোহাগ পাইতে হইলে খালি রূপে চলে না গো। কাজকর্ম জানতে হয়। এইযে, দেহো তারা কেম্নে ভাত বাড়ে। শেখো এগুলা। এইভাবে বাইড়া, সোহাগ কইরা জামাইয়েরে খাওয়াইবা। দেখবা জামাই কেমন তোমার আঁচলে থাকে।’

শান্ত, এলেন…ওদের মুখটা শুকিয়ে গেছে। বিশেষ করে শান্তর। দাদিমা ওকে বোধহয় মে রেই ফেলবেন তার কীর্তিকলাপ দিয়ে! শান্ত আড়চোখে তাকাল বসের মুখের দিকে। আদিল একটা শব্দও করেনি যেহেতু তাই ও চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকল শ্বাস বন্ধ করে। ওদিকে রোযা যে অসহায়ের চূড়ান্তে। এই কোথায় ও ফেঁসে গেলো! কী হচ্ছে ওর সাথে? সবাই ওকে এমন বউ বানানোর জন্য উঠেপড়ে লেগেছে কেনো? ও মনে মনে বিড়বিড় করে,

‘আমি চাইনা ওই লোকের সোহাগ, মন। চাই না আমার আঁচলে থাকুক। কখনো না। কখনো না।’

জাহানারা বেগম তখনো বলে যাচ্ছেন, ‘নাতবউ, দাদুভাই আইলে এম্নে বাইড়া খাওয়াইবা কেমন? শিখাইলাম যেইভাবে…ঠিক ওইভাবে। এগুলা বউমানুষের কাজ।’

রোযা যতটুকু চিনেছে আদিল মির্জাকে, এই লোক এখানে এসে খাওয়ার মানুষ না। এইদিকে ও বেঁচে যাবে। ভাবতে ভাবতে যেই স্বস্তির শ্বাস ফেলবে তখুনি একাধারে কিছু পায়ের শব্দ শোনা গেলো। বসবার ঘরের সবাই তাকাল। তাকাল রোযাও। অমনি শ্বাস আটকাল গলায়। আদিল নামছে, পেছনে শান্ত-এলেন। তাকে দেখেই থমথমে নীরবতা নামল বসবার ঘর জুড়ে। চুপসে আছেন শিকদাররাও। ভিন্ন আবার জাহানারা বেগম। তিনি দিব্যি হেসে হেসে হাত নাড়িয়ে ডাকলেন –

‘দাদুভাই, আহো আহো। বহো, খাইয়া নাও। বেলা ফুরাইয়া গেলো প্রায়।’

রোযাকে চমকে আদিল কদম বাড়াল ডাইনিংয়ের দিকে। ওকে পাশ কাটিয়ে গিয়ে বসল বড়ো রাজকীয় চেয়ারটায়। জাহানারা বেগম লাঠিতে ভর দিয়ে দাঁড়িয়ে থেকেই রোযাকে হুকুম করে গেলেন –

‘নাতবউ, আগাও আগাও। ভাত বাইড়া দেও।’

রোযা তাকাল আদিলের দিকে। মুহুর্তে দৃষ্টিতে দৃষ্টি পড়ল। লোকটা যে চেয়েই আছে ওরদিকে। অথচ ঘরভরতি সবার দৃষ্টি তাদের ওপরেই। সকলের সম্মুখে এভাবে চেয়ে থাকাটা কী ভালো দেখায়? মোটেও না। রোযার লজ্জা লাগছে। জাহানারা বেগম পুনরায় তাড়া দিলে ও অবশেষে কদম বাড়াল। উড়তে থাকা লাল আঁচলটা সামলে গিয়ে দাঁড়াল আদিলের পাশে। সামনের প্লেটটা উল্টে ভাত বেড়ে দিলো। একে-একে সামনে রাখল তরকারি বৌল গুলো। জাহানারা বেগম হাসতে হাসতে বলেন –

‘নাতবউ, হাঁস ভুনাটা দাও আগে। আমার বড়ো পোলার বউয়ের হাতের এই হাঁসভুনা অমৃত।’

রোযা ধোঁয়া উড়তে থাকা তরকারি থেকে কিছুটা বেড়ে দিলো। জাহানারা বেগম আবারও বললেন –

‘নাতবউ, একগ্লাস পানি দিয়ে রাইখো আগে।’

রোযা একগ্লাস পানি ঢেলে সামনে দিয়ে খেয়াল করল আদিল খেতে শুরু করেনি। চুপচাপ একদৃষ্টিতে চেয়ে আছে ওর হাতজোড়ার দিকে। যা ব্যস্ত খাবার বাড়তে। মুহুর্তে ও থমকাল, থমকাল আদিলের দৃষ্টিও। অবশেষে দৃষ্টি ফেরাল সে। তাকাল ঘরভরতি লোকজনের দিকে। গম্ভীরমুখে বলল –

‘বসুন আপনারাও।’

নাসির শিকদার দ্রুতো নিজের ভাইদের নিয়ে বসে পড়লেন। আদিল এবারে তাকাল রোযার দিকে। তার পাশেই দাঁড়িয়ে আছে। বলে –

‘বসো।’

রোযা শুনল না। দাঁড়িয়ে থাকল। আদিল আর শব্দ নষ্ট করল না। বরাবরই এক কথা দু-বার সে বলতে পছন্দ করে না। ঘর ভরতি লোকজনের চোখের সামনেই ডান হাতটা বাড়িয়ে রোযার পাতলা কোমরটা জড়িয়ে একটানে বসাল তার পাশের চেয়ারটায়। টেবিলের নিচে আড়াল হওয়া কোমরে তখনো শক্তপোক্ত হাতটা প্যাঁচিয়ে আছে। রোযা কিংকর্তব্যবিমুঢ় হয়। লজ্জায় ওর দমবন্ধ হয়ে আসে প্রায়। তড়িঘড়ি করে সরায় হাতটা। মাথা তুলে আর তাকাতে পারল না পুরোটা সময়। অথচ কিছুই যেন হয়নি এমনভাবেই আদিল খেতে শুরু করেছে নিঃশব্দে।

.

‘মম, আই অ্যাম এনজয়িং স্টেইং হিয়ার।’

রোযা হাসে। হৃদির চুল বাঁধতে বাঁধতে বলে, ‘তাই? সবাইকে ভালো লেগেছে?’

ঘুমঘুম চোখে মেয়েটা আওড়ে যায় –

‘হুম, আমাকে কতো আদর করে সবাই। আই লাইক দেম, মা।’

চুলটা বাঁধা শেষ করে ওর গালে ঠোঁট ছুঁয়ে আওড়াল রোযা, ‘আই অলসো লাইক দেম। এবার ঘুমাও। বেশ রাত হয়েছে। আজ সারাদিন ছোটাছুটি করেছো।’

হৃদি বালিশে মাথা রাখার কয়েক সেকেন্ডেই ঘুমিয়ে পড়েছে। রোযা আড়চোখে তাকায় দরজার দিকে। দরজাটা ভেতর থেকে আটকেও ওর কেমন দ্বিধা হচ্ছে। ভয় হচ্ছে অজানা। দেয়াল ঘড়ির দিকে চোখ রাখে একবার। রাতের একটা প্রায়। রোযা আস্তে করে বিছানা ছাড়ে। কিছুটা শব্দ হলেও, দ্রুতো ছোটো সোফাটা টেনে নিয়ে রাখল দরজার সামনে। নিশ্চয়ই এই রাতবিরেত শব্দ করে ঢুকতে পারবে না আর! ঢুকলেও হৃদি উঠে যাবে। তাহলেই তো রোযা নিরাপদ! রোযা বিছানার দিক যেতে যেতে পুনরায় তাকাল দরজার দিকে। একটা সোফা যেন কম! ও টি-টেবিলটাও টেনে নিয়ে গিয়ে রাখল দরজার কাছে, সোফার পাশে। হৃদি গোঙাল এতো শব্দে। রোযার বাতি বন্ধ করে অবশেষে বিছানায় এলো। হৃদিকে বুকে নিয়ে শুয়ে পড়ল। মানসিক শান্তি লাগছে বেশ। বারান্দার দরজা খোলা, পর্দা উড়ছে। আকাশে মস্তবড়ো চাঁদ। চাঁদের আলোয় নিভুনিভু আলো রুম জুড়ে। হৃদির মাথা বুলাতে বুলাতে চোখ বুজল নিজেও।

.

আদিল দরজা ঠেলে যখন বুঝল লকড, সে মোটেও আশ্চর্য হয়নি। এটাই তার ধারণায় ছিলো। তবে যখন শান্তর থেকে চাবি নিয়ে লক খুলে, দরজা হালকা ঠেলতেই বুঝল দরজার পেছনে কাঁচের কিছু দেয়া…ঠেললে ভয়ানক শব্দ হচ্ছে, আরও হবে তখুনি চোখমুখ থমথমে হয়ে এলো। শান্ত, এলেন, ক্লান্ত, ধ্রুব…ওরা বসের শক্তপোক্ত মুখ দেখে কয়েককদম পেছনে চলে গেছে আরও। আদিল কিছুমুহূর্ত দাঁড়িয়ে থাকল। অযথা আর সময় অপচয় করল না এখানে। বরঞ্চ জিজ্ঞেস করল –

‘আর কীভাবে রুমে ঢোকা যাবে?’

শান্ত ঢোক গিলল। আওড়াল, ‘বস, বারান্দা দিয়ে।’

আদিল কদম বাড়াল তখুনি। দ্রুতো তার পেছনে ছুটল বাকিরাও। পুরো বাড়ি নিস্তব্ধ হলেও, উঠোনে নাসির শিকদার আর জব্বার শিকদার… দু-ভাই আলাপ করছিলেন পাশাপাশি। ওসময় আদিলকে দেখে দুজানাই তটস্থ হয়ে দাঁড়ালেন। শান্ত ইশারায় বোঝাল বাবা-চাচাদের সরে যেতে। অথচ অবুঝ দুজন আরও আগ্রহ নিয়ে এলেন সামনে –

‘বস, কী দরকার? কী দরকার, কন।’

আদিলের চামড়া বরাবরই পাতলা। সে আওড়াল, ‘রুমে যাব।’

নাসির শিকদার আশ্চর্য হোন, ‘অ্যাহ? বস রুম তো তিনতলায়। দরজা আছে তো।’

শান্ত বাপ-চাচাকে টেনে নিজের পেছনে আনল। এলেন সহ কয়েকজন মিলে ইতোমধ্যে এতো বড়ো মইটা নিয়ে এসেছে। এটা ছিলো বাড়ির পেছনে। প্রয়োজনের জন্যই বানানো। এটার উচ্চতা তিনতলা পর্যন্ত। বাঁশের শক্তপোক্ত মই এটা। এলেন, ধ্রুব, ক্লান্ত মই ধরে রেখেছে। শান্তও গিয়ে ধরল। নাসির শিকদার কিছুই বুঝলেন না। তবে ওরা যেহেতু ধরেছে তিনি বাদ যাবেন কেনো? লুঙ্গিটা তুলে বেঁধে নিয়ে নিজেও গিয়ে ধরলেন মই। ভাইয়ের দেখাদেখি জব্বর শিকদারও ধরেছেন। শান্ত হতাশ! নাসির শিকদার চাপা গলায় ভাইপোকে বলে চললেন –

‘এতো রাইতে বস কি করে? দরজা রাইখা বারান্দা দিয়ে রুমে যায়? বস মানুষের ব্যাপার স্যাপার আমি বুজি না বাপু।’

আদিল স্যুট খুলে জমিনেই ফেলেছে। টাই-টাও এদিকেই পড়ে আছে। শার্টের হাতা ফোল্ড করে কদম বাড়াল। চড়ল মই। তার ভারে এই মই আবার ভেঙে না যায়! মইয়ের সাত নম্বর সিঁড়িতে পা রাখতেই মচমচ করে শব্দ হলো। তবে পুরোপুরি ভাঙল না। বেশ আমোদেই সবগুলো সিঁড়ি বেয়ে উঠতে পারল তিনতলার বারান্দায়। ভাগ্যিস বারান্দার দরজাটা খোলা। পর্দা উড়ছে। আদিল সোজা ঢোকে রুমের ভেতরে। চাঁদের টিমটিম আলোতে স্পষ্টই দেখা গেলো রোযাকে। হৃদিকে বুকে জড়িয়ে বেশ আরামের ঘুম ঘুমোচ্ছে। পরনে ভীষণ পাতলা, সিল্কের নাইটি। আপাতত কাঁধ থেকে সরে আছে অনেকটা। চুল ছাড়া, যা ছড়িয়ে আছে বিছানা জুড়ে। আদিল দাঁড়িয়ে দেখল অনেকটা সময়। পা নড়ল না, দৃষ্টি পড়ল না। যখন নড়ল, সেকেন্ডের ভেতর শার্ট খুলল সে। খুলল হাতঘড়ি, পায়ের জুতো। অধৈর্য্যের মতোই রোযার পেছনে শুয়ে পড়ল। জড়িয়ে ধরল কোমরটা। মিশিয়ে নিলো নিজের সাথে। রোযার পাতলা ঘুম মুহূর্তে ভেঙে গেছে ওই উষ্ণ স্পর্শে। ও আতঙ্কে বাকরুদ্ধ। আদিল ততক্ষণে মুখটা ডুবিয়েছে মসৃণ ঘাড়ে। ঠোঁট ছুঁয়ে যাচ্ছে অধৈর্য্য ভঙ্গিতেই। রোযা সামান্য ধস্তাধস্তি করতেই জাপ্টে ধরল পুরো ওকেই। মুখটাও চেপে ধরল এক হাতে। আওড়াল কণ্ঠ খাদে নামিয়ে –

‘হৃদি উঠে যাবে।’

রোযা নড়ার সাহস করল না। অন্ধকারে ফ্যালফ্যাল করে চেয়ে আছে। একপর্যায়ে অবিশ্বাস নিয়ে আওড়ায় –

‘কীভাবে এলেন?’

দরজা দিয়ে তো আসেনি। এলে শব্দ হতো, রোযা নিশ্চয়ই শুনতো। তাহলে! রোযা তাকাল বারান্দার দিকে। বারান্দার কথা মাথায় ছিলো না। আর ও কীভাবে জানবে এই লোক তিনতলার বারান্দা দিয়ে উঠবে! বেয়ে বেয়ে তিনতলায় ওঠার পুরুষ তো তাকে কোনোদিক দিয়েই লাগে না। আদিল ঘনঘন তার ঘাড়ে নেশার মতো শ্বাস টেনে নিচ্ছে। ওকে আষ্ঠেপৃষ্ঠে নিজের সাথে মিশিয়েই রাখল। আপত্তিকর ওই জায়গাটায় সেই সেদিনের মতো চড় মার তেই রোযার চোখ বড়ো বড়ো হয়ে আসে। ও ধড়ফড়িয়ে উঠতে চাইলেও পারল না। হাঁসফাঁস করল গলা কা টা মুরগির মতো।

‘দরজা লাগাবেন না আর, মিসেস মির্জা। আমি কিন্তু আপনাকে ছাড়া একা শোব না। আপনি নিশ্চয়ই চাইবেন না হৃদি দেখুক ওর মাকে আমি কতটা চাই? হুম?’


চলবে ~~
® নাবিলা ইষ্ক।

Share On:

TAGS: ,



CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
Related Posts
 

0 Responses

Leave a Reply