আদিল মির্জা’স বিলাভড
— ৩২
‘তুমি কি আসলেই আমার বাবা? না, তুমি বাবা নামের কলঙ্ক! তুমি….’
আলমগীর সওদাগর হাত ওঠালেন চোখের পলকে। শক্তপোক্ত সেই চড়ের ভার সামলাতে না পেরে টি-টেবিলের ওপর ছিঁটকে পড়ল ঋণা। ফর্সা গালটা লাল হয়ে গেলো মুহূর্তে। ও হিংস্র বাঘিনীর মতো মাথা তুলতেই দ্বিতীয় দফায় কাঁপতে কাঁপতে চড় মা রলেন আলমগীর সাহেব। ঋণা চিৎকার করে ওঠে –
‘আমাকে বাঁচতে না দিলে আমিও তোমাকে বাঁচতে দেবো না ড্যাড!’
আলমগীর সাহেব খেঁকিয়ে উঠলেন, ‘কীভাবে বাঁচতে চাস? আদিল মির্জার দাসী হয়ে? যোগ্যতা তো হলো না নিজের মায়ায় ফালানোর। সুযোগ তো দিয়েছিলাম। মেয়েটাও তো তোকে চেনেই না। জানেও না ওর মা আছে। যে বেঁচে আছে!’
ঋণা চিৎকার করে যায় সমানে, ‘তুমি দিয়েছো আমাকে চিনতে? আমার জীবন তুমিই নষ্ট করেছো। তুমিইই! আমার সব কেড়েছো তুমি!’
একদলা থু থু ফেললেন আলমগীর সাহেব, ‘আমি? সোবহান চৌধুরীকে বিয়ে করতে চাইল কে? কে এসে বলেছিল সে রাতে, মন্ত্রীর বউ হতে চায়? উচ্চপর্যায়ে যেতে চায়?’
ঋণা থমকে গেলো। দু চোখ ভরে এলো ওর। বসে পড়ল ঝলমলে টাইলসের মেঝেতে। আলমগীর সাহেব বলে গেলেন তখনো –
‘এখন এমন আহ্লাদ কইরা মাথা খাস না ঋণা। পুরা গেইমটা নষ্ট হইতেসে। আমার এতো এতো টাকা! বুইড়ার ফেলে যাওয়া সম্পত্তি আমাদের হওয়া চাই। আমাদের!’
ঋণা ক্লান্ত চোখে তাকাল। হঠাৎ হাঁটুতেই হেঁটে গিয়ে আষ্ঠেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ধরল বাবার পা জোড়া। অস্পষ্ট, করুণ গলায় আকুতি করল কেমন –
‘ড্যাড, তুমি যা বলবা আমি করব! আমার আদিলকে আমার কাছে ফিরিয়ে দেও। আমার মেয়েকে ফিরিয়ে দাও। আমার সংসার ফিরিয়ে দাও ড্যাড।’
আলমগীর সওদাগর চোখ বুজলেন। চুপ থাকলেন কিছুক্ষণ। নীরবতা ভাঙল তার অন্যরকম কণ্ঠে, ‘অসম্ভব না। আদিলকে দুর্বল করতে পারলেই সম্ভব।’
‘দুর্বল?’
‘ওকে টলাতে হবে। তাহলেই সম্ভব। বাধ্য হবে আমাদের।’
ঋণা মাথা দায়, ‘যা বলবা আমি করব। আগে ওই মেয়েকে সরাও। আমি হিংসায় জ্বলে যাচ্ছি। আমি শেষ হয়ে যাচ্ছি।’
আলমগীর সাহেব দু-হাতে মেয়েকে ধরে ওঠালেন। চোখে চোখ রেখে দৃঢ় গলায় বললেন –
‘সরিয়ে দেবো। সব হবে। তুই চৌধুরী বাড়িতে ফের। সম্পত্তি আমাদের চাই ঋণা। এইমুহূর্তে হাল ছাড়লে চলবে না।’
ঋণা দু-হাতে চোখমুখ মুছল। আওড়াল, ‘লোক পাঠাও, আমি ওই মেয়েকে মৃ ত চাই। আমার আদিল, আমার মেয়ের পাশে যে আসবে আমি ওকে পৃথিবী থেকে চিরকালের জন্য মুছে দেব।’
‘শান্ত হ। রেডি হয়ে চৌধুরী বাড়ি যা। পরিস্থিতি অনুকূলে আন।’
ঋণার চোখমুখে হিংস্রতা ফুটে উঠল। সিঁড়ি বেয়ে চলে গেলো ওপরে। আলমগীর সওদাগর তখুনি ইশারা করলেন শাহাদাত ফোনটা বাড়িয়ে দিতে দিতে হঠাৎ করে বলল –
‘বস, নৈবেদ্যকে এই ব্যাপারটা না জানালে ভালো হয়। ওকে বাইরের কাজে এয়াখেন আপাতত।’
আশ্চর্যজনক ভাবে আজ আর তর্কে গেলেন না আলমগীর সাহেব। ফোনটা নিয়ে দ্রুতো কল লাগালেন। ওপাশটা যেন কলের অপেক্ষাতেই ছিলো। এক রিং-য়ে কল রিসিভ হলো। আলমগীর সাহেব রাতের আঁধারের মতো নিভু গলায় বলেন –
‘রেওয়াজ, রিস্কটা নেব। লোকজন পাঠাও।’
—
শহরের কোলাহলপূর্ণ সড়কপথের বুক চিরে ধেয়ে চলা একইরঙের গাড়িগুলোর গর্জনে কেঁপে উঠল ভূমি, চারপাশ। কম করে হলেও নয়টা গাড়ি দ্রুতো বেগে ছুটছে রাস্তার ধুলোবালি পিষে। গাড়ির কর্কশ শব্দে কান ধরে এলো পথযাত্রীদের। ভয়ে সিঁটিয়ে গেলো তাদের দেহ। হঠাৎ পেছন থেকে এতোগুলা গাড়িকে অতিক্রম করে সামনে ছুটে এলো Kawasaki Ninja H2R নামের বাইকটি। তৎক্ষনাৎ পাশের গাড়ির সাথে প্রায় ছুঁইছুঁই অবস্থা হয়েও হলো না। পরমুহূর্তেই এক্সেলেটর ঘুরিয়ে সামনে চলে গেলো বাইকটা। শান্ত অতি বেগে ছুটতে ছুটতে বাইকের এক্সেলেটর ঘোরাতে নিয়েই ফিরে তাকাল। হেলমেটের ভাইজর ওঠানো, চোখদুটো দেখা যাচ্ছে। ও একহাতের দু আঙুল কপালে ঠেকিয়ে ইশারা করে, বাইকের বেগ আরও বাড়াল। বাতাসের সাথে পাল্লা দিয়ে মিশে গেলো পুরো। চোখের পলকে, চোখের আড়াল হয়ে এলো বাইকটা। শহরের অলিগলি পিষে ছুটল নিজের গন্তব্যের উদ্দেশ্যে। বেপরোয়া সেই বাইকের গতির সাথে পাল্লা দেবার সামর্থ্য কারও নেই যেন। সামনের প্রত্যেকটা যানবাহন অতিক্রম করে ছোটা শান্তর চোখমুখ এযাত্রায় ঢাকা। হেলমেটের ভাইজর নামানো। কয়েকটি ঘণ্টার পথ শান্তর অতি বেগের রাইডের কাছে মাত্র দু-ঘণ্টা বিশ মিনিট ছুঁইছুঁই।
সামনেই রাজপুরের সাইনবোর্ডের ঠিক ওপরে হেলে আছে র ক্তিম সূর্যটা। শান্তর বাইকের গতিতে বাতাসের জোর বাড়ে। তাতে নড়ে ওঠে সাইনবোর্ড। ধুলোবালিতে সবটা ধোঁয়ার মতো আঁধারে হয়। সেই আঁধার ভেদ করে ঢোকে গ্রামের চেনাপরিচিত অলিতে-গলিতে ঢোকে বাইকটা। শান্ত বাইক চালাতে চালাতেই খুলে ফেলে হেলমেট। প্রাণভরে শ্বাস নেয় ও। ব্যস্ত ভঙ্গিতে তাকাল আশেপাশে। বছরেও গ্রামে পা পড়ে না যে! অদূরেই চা-পানের দোকানগুলো সব। ওখানটায় দলবল নিয়ে দাঁড়িয়ে ছিলেন জব্বার শিকদার। ধেয়ে আসা বাইকটা দেখে হৈচৈ পড়ে গেলো তাদের মধ্যে। জব্বার সাহেব দ্রুতো মুখের পানটা পাশেই ফেলে দিলেন। তড়িঘড়ি করে লুঙ্গিটা উঁচিয়ে কদম বাড়ালেন সামনে! ভদ্রলোকের মুখ জুড়ে গর্ব, প্রাণোচ্ছল হাসির স্পর্শ। শান্ত সোজা বাইকটা থামাল জব্বার সাহেবের পাশে। বাইক সাইড স্ট্যান্ডে দাঁড় করিয়ে নেমেই ধেয়ে আসা বাবাকে একহাতে জড়িয়ে ধরল। জব্বার সাহেব তখন আবেগপ্রবণ হয়ে আছেন। কতকাল দেখেন না ছেলেকে!
‘কেমন আছো, আব্বা? শুকাইয়া গেছো কেমন!’
নাসির শিকদার পেছনেই ছিলেন। ভাইপুতের ওমন তাগড়া, নিয়মিত ব্যায়াম করা সুঠাম দেহ দেখে বাঁকাচোখেই তাকালেন ছোটো ভাইয়ের দিকে। মানুষের চোখ নাকি গোরুর? কোন দিকে দিয়ে শুকনো লাগছে? শান্ত শব্দ হেসে ফেলে চাচার এমন প্রতিক্রিয়া দেখে। বলে –
‘ভালো আছি, আব্বা। তুমি কেমন আছো? মা কেমন আছে?’
জব্বার সাহেব তখনো ছেলেকে ভালোভাবে দেখতে ব্যস্ত আছেন। গতবার শান্ত এসেছিল ডান পায়ে বড়ো জখ ম নিয়ে। যতবারই আসে, শরীরের কোথাও না কোথাও জখ ম থাকবেই ছেলেটার। তাই ভালোভাবে দেখছিলেন। ব্যস্ত হয়ে বললেন –
‘সবাই ভালো আছে।’
শান্ত তাকাল চাচাদের দিকে। কদম বাড়িয়ে এক এক করে জড়িয়ে সালাম জানাল। লুৎফর সাহেব চাপড়ে দিলেন ভাইপোর কাঁধ। বুক ফুলিয়ে বলেন –
‘আমার গর্ব, আমার সিংহ!’
শান্ত হাসে। ওর প্রফুল্ল দৃষ্টি হঠাৎ পড়ে সামনে। মুখটা চুপসে যায় অমনি। বাবা-চাচাদের সাঙ্গোপাঙ্গদের হাতে ক্যাটক্যাট গাঁদা ফুলের মালা। বিহ্বল হয়ে প্রশ্ন করে –
‘এসব কার জন্য?’
নাসির সাহেব প্রসন্ন হয়ে বললেন, ‘কার জন্য আবার? বসের জন্য! ওহ হ্যাঁ, কীরে বাপজান। বস কই?’
বলতে বলতে তারা সবাই ঘাড় বেঁকিয়ে আশেপাশে তাকালেন। শান্ত কিছুক্ষণ থম মেরে রইল। আশ্চর্য চোখে দেখল বাবা-চাচাদের ভীষণ আকুল চোখমুখ। ভাগ্যিস ও আগে আগে এসেছে! নাহলে এই রাজপুরের মাটি ওর রক্তে ভাসিয়ে দিতো আদিল মির্জা! সর্বনাশ! শান্ত হাঁসফাঁস করে আদেশ করল ছেলেপুলেদের উদ্দেশ্যে –
‘এই, এগুলারে দ্রুতো নদীতে ভাসা! চোখের সামনে থেকে সরা।’
জব্বার সাহেব আশ্চর্য হয়ে প্রশ্ন করেন, ‘কেনো আব্বা? আপ্যায়নের জন্য আনাইছি। তাজা ফুল। দেখো না চকচক করতেসে? তোমার দাদি তো বাড়িতে প্লেট সাজাইছে আমাগো বংশের নিয়ম ধইরা। প্লেটে শরবত, মিষ্টি, ফু….’
শান্তর হৃদয় থমকে যায়। ধড়ফড়িয়ে তাকিয়ে আর্ত নাদ করে উঠল, ‘আব্বা!’
লুৎফর সাহেব দ্রুতো বলেন, ‘কীরে! এগুলোতে কি বস রাগবেন? খুশি হইবেন না? তার লাইজ্ঞাই তো এতো আয়োজন। বাড়ির গেইট সাজাইছি তো। সে ঢুকতে নিলে ফুল পড়ব ঝপঝপ করে তার ওপর। একটা গান বাজাব তখন? সাউন্ড বক্সটা এখুনি গোছানো যাইব।’
বাহাদুর হাওলাদার পেছন থেকে মাথাটা বের করে গদগদ হয়ে বলেন, ‘এই রে শান্ত, বসের কেমন গান পছন্দ? বসের সাথে কেডা কেডা আসতেসে? হেয় কি একাই রে?’
শান্ত ঢোক গিলল। সে তো ভুলেই বসেছিল এই শিকদার বংশ একটা পাগলের কারখানা! ওর পুরো খানদানটাই পাগল। কল্পনা করল ও ওই দৃশ্য যেখানে আদিল মির্জার মাথায় ফুল পড়ছে। শান্তর গায়ে কাঁটা দিয়ে উঠল। ও স্পষ্ট দেখছে আদিল মির্জার থমথমে চোখমুখ। র ক্ত লাল দৃষ্টি। রিভলভার বের করে সোজা দশ বারোটা গু লি ছুড়ছে! শান্ত দ্রুতো বড়ো চাচাকে বলে –
‘চাচা, কিচ্ছু করা লাগবে না। বাসায় চলো। ফুলটুল, বংশীয় প্লেট ওসব সরাও। সবকিছু থাকা চাই স্বাভাবিক।’
লুৎফর সাহেব সংকোচ করলেন, ‘ওমন বড়ো একজন মানুষ আইব এই পেত্থম। আপ্যায়ন করমু না? কেমন দেখায়? উনি আমাদের অকৃতজ্ঞ ভাবব না?’
শান্ত দীর্ঘশ্বাস ফেলল। বাবা-চাচাদের বোঝানোর সুরে বলল, ‘ভাববে না, চাচা। ভাববে না। সব স্বাভাবিক চাই। যেমন রোজ থাকে। ঘণ্টা খানেকের মাথায় পৌছে যাবে বস। চলো বাড়ি চলো। দেখি সব ঠিকঠাক আছে কি-না! কথাও আছে অনেক।’
বাহাদুর সাহেব মুখ গোমড়া করলেন। পানসে গলায় বললেন, ‘ঠিকঠাক থাকব না কেন? কতো আলোচনা করা হইসে জানোস?’
শান্ত ভেতরে দীর্ঘশ্বাস ফেলল। এমন আলোচনা না করাই উত্তম। ওকে ওপরে পাঠানোর এই আলোচনা বিষ হয়ে গলায় ঠেকল। নির্ঘাত পাশে এলেন, স্বপণ ওরা থাকলে বোধহয় হাসতে হাসতে ম রে যেতো। আল্লাহ ওকে বাঁচিয়ে দিয়েছেন এযাত্রায়। আজ আগে আগে এসেছিল বলে! একসাথে এলে কী অঘটনটাই না ঘটতো।
.
শিকদার বাড়ি ঘিরে ধরেছে আগ্রহী গ্রামবাসীরা। তাদের উৎসুক দৃষ্টি ভেতরে। গ্রাম জুড়ে একটাই চর্চা তখনো ভেসে বেড়াচ্ছিল। শিকদার বাড়ির কাচা মাটির উঠোন জুড়ে কবুতরের হাঁটাহাঁটি। পাখিদের উড়োউড়ি। দুপুরের সময়। মস্তবড়ো উঠানে এসে থামল রবিউল। কবুতর গুলো উড়ে পালাল। অনেকটা পথ দৌড়ে এসেছে বেচারা। এখনো জোরে জোরে শ্বাস নিচ্ছে। এই বাড়ির বিশ্বস্ত কাজের লোক ও। বাড়ির আনাচে কানাচে ভেসে বেড়াল ওর উচ্ছ্বাস নিয়ে চিৎকার করে বলা কথাটুকু –
‘ভাইজান আইয়া পড়ছে।’
বারান্দায় ছুটে এসে পৌঁছানো ঝুমুরের শরীরটা সঙ্গে সঙ্গে দোতলার পিলারের আড়ালে থমকাল। বাতাসে দুলল ওর স্কার্ট। মাথার ওড়নাটা খসে পড়ে গেলো। নিজেকে আরও লুকিয়ে রাখল কেমন। মিশে দাঁড়াল পিলারের সাথে। বুকের ওঠানামার গতি বেশ দ্রুতো। মাথাটা বাড়িয়ে আড়ে আড়ে তাকাল। ক্রমান্বয়ে শব্দ করছে ওর হৃৎপিণ্ড। ওর এমন অবস্থা দেখে হেসে ফেলল এই বাড়ির মেয়েরা। সুপ্তি ঠোঁট টিপে কাঁধে কাঁধ ছুঁয়ে আওড়াল –
‘এখন থেকেই ডাকব নাকি ভাবি?’
ঝুমুরের লজ্জা বাড়ল। আকাঙ্খা আকাশ ছুঁলো। চোখমুখ বুজে রাখল শক্ত করে। জবাব দিতে পারল না ও। তখুনি নিচ থেকে ভেসে এলো কান্নার শব্দ। খালা কাঁদছেন! তারমানে! ঝুমুর তৃষ্ণার্ত পথিকের মতো আকুল দৃষ্টিতে তাকাল নিচে। সবার সামনে, সদর দরজার কাছে দাঁড়ানো লম্বাচওড়া, সুদর্শন পুরুষটিকে পলকহীন চোখে দেখল। চোখজোড়া ভিজে এলো তৎক্ষণাৎ। গাল জোড়া ভেসে গেলো জলে। ইতোমধ্যে বাড়ির সবগুলো মেয়ে দৌড়ে নামছে নিচের উদ্দেশ্যে। ওদের চেঁচামেচিতে প্রাণ ফিরে পেলো যেন বাড়িটা। অথচ ঝুমুরের পা-জোড়া নড়ল না। চোখের পলক পড়ল না। হঠাৎ শান্ত মাথা তুলে তাকাতেই ও সরে গেলো। কান্না করতে করতে নিঃশব্দে হাসল। অনেকটা সময় পরে যখন মাথাটা অল্প বাড়িয়ে শুধু কাজলরাঙা চোখ বের করে তাকাল, অমনি একজোড়া দৃঢ়, রাখঢাক ব্যতীত গভীর চোখের দৃষ্টিতে দৃষ্টি মিলে গেলো। শ্বাস গলায় আটকে গেলো ঝুমুরের। মুহুর্তে চোখজোড়া বুজে ফেলল। মাথাটা দ্রুতো গতিতে সরিয়ে এনে মেশাল পিলারের সাথে।
.
আয়েশা বেগম কেঁদেকেটে অস্থির হয়ে আছেন। ছেলেকে দু-হাতে জড়িয়ে রেখেছেন শক্ত করে। শান্ত চটপট মায়ের কপালে ঠোঁট ছুঁয়েছে। মাথা বুলিয়ে বেশ অনেককিছু বলে শান্ত করতে চাচ্ছে। ওর চোখমুখ জুড়ে প্রশান্তি। জব্বার সাহেব আস্তে করে বলেন এযাত্রায় –
‘আহ, হইলো তো। এইবার থামো। পোলাডারে ঢুকবার দেও।’
ব্যস্ত ভাবে আঁচলে চোখমুখ মুছে হাসেন আয়েশা বেগম। ছেলেকে নিয়ে কদম বাড়াতে বাড়াতে চারিপাশে চেয়ে বলেন –
‘ঝুমুর কই?’
সুপ্তি হেসে দোতলায় ইশারা করে বলে, ‘লুকিয়ে আছে। ওইযে!’
হেসে অসহায় ভাবে মাথা নাড়ান ভদ্রমহিলা। আওড়ান, ‘মাইয়াডা এতো লাজুক!’
শান্ত আর তাকাল না। সোজা ঢুকল ভেতরে। ব্যস্ত কদমে এসে দাঁড়াল বসবার ঘরে। কাঠের সোফায় বসে আছেন জাহানারা বেগম। বয়সটা এখন আর ধরাবাঁধা নেই। তবে সম্ভবত সত্তর ছুঁয়েছে। কোমর বেঁকে গেছে। দাঁড়াতে বেশ হিমশিম খেতে হয়। তবে একটা লাঠির সাহায্যে এখনো বেশ নিজে নিজে চলতে পারেন। এতো দিন পর নাতিকে দেখতেই তার চোখজোড়া সামান্য ভরে আসে। হাত দুটো মেলতেই শান্ত পাশে বসে জড়িয়ে ধরল দাদিকে। ইতোমধ্যে বসবার ঘর জুড়ে এই বাড়ির প্রত্যেকটি সদস্য উপস্থিত। এমনকি শান্তর ফুপু, ফুপা সহ ফুপাতো ভাই-বোনেরাও। সামনেই নাসির শিকদার বসেছেন। পাশে জব্বার সাহেব, লুৎফর সাহেব আর রেদোয়ান সাহেব। আয়েশা বেগম টি-টেবিলের টেবিলের ওপরে রাখেন ট্রে-টা। শান্ত শরবতের গ্লাসটা তুলে নিলো। একটানে শেষ করে অবশেষে তাকাল বাবা – চাচাদের দিকে। নাসির সাহেবফিসফিস করে বলেন –
‘তিনতলা পুরোডা ফাঁকা করাইছি। পরিষ্কার করাইছি। সব নতুন। হ্যাঁ রে বাপজান, তোর বসের সাথে আর কে আইতেসে? বাচ্চাটা?’
শান্তর ভীষণ গম্ভীরমুখেই বলে, ‘বস, ম্যাডাম আর প্রিন্সেস আসছেন। আর বডি…’
জব্বার সাহেব আশ্চর্য হয়ে গেলেন, ‘ম্যাডাম?’
শান্ত আস্তে করে বলে, ‘বস বিয়ে করেছেন।’
নাসির সাহেব মাথা দোলালেন। চেয়ে থাকলেন। শান্ত বলে গেলো –
‘এখানে সবাই উপস্থিত আছে, আমি স্পষ্ট করে বলে দিচ্ছি। নিজেদের সীমার মধ্যে থাকার চেষ্টা করা হয় যেন। তিনতলায় যাওয়া নিষিদ্ধ ততদিন, যতদিন আমার বস এই বাড়িতে আছেন।’
নাসির সাহেব দ্রুতো মাথা দোলালেন। ব্যাপারটা কতটুকু গুরুত্বপূর্ণ তিনি বুঝতে পারছেন না। কখনো দেখেননি এই আদিল মির্জাকে। তবে যতটুকু শুনেছেন, জেনেছেন.. তাতেই ধারণা আছে ভালো। শান্ত ঘড়ির দিকে তাকাল। তখুনি কানে ভাসল একগুচ্ছ গাড়ির তীব্র শব্দ। এতো দ্রুতো পৌঁছে গেলো!
.
পুনরায় উঠোনে হাঁটাচলা করা কবুতরদের আতঙ্কে উড়োউড়ির শব্দ ভেদ করে শোনা গেলো গাড়ির কর্কশ শব্দ। গাড়িগুলো সারিবদ্ধভাবে থেমেছে শিকদার বাড়ির ভেতরে। বেশ দাম্ভিকতার সাথে। ইতোমধ্যে কালো পোশাকের বডিগার্ডস দিয়ে ভরে আছে পুরো জায়গাটা। দরজায় পাহারাদার হয়ে দাঁড়িয়েছে ধ্রুব, ক্লান্ত। এলেন সতর্ক চোখে চারপাশটা দেখে নিচ্ছে। স্বপণ ইতোমধ্যে হাঁটছে জায়গা জুড়ে। এমন দৃশ্যে হতবাক শিকদার বাড়ির সকলে। এতক্ষণ যাবত আগ্রহী সবাই সিঁটিয়ে গিয়েছে। কারও রা-শব্দ নেই। কোনো অস্তিত্বই নেই যেন। শান্ত দ্রুতো এসে দাঁড়িয়েছে একদম মধ্যের বড়ো, কালো গাড়িটার সামনে। খুলে ধরল দরজাটা। আদিল বেরিয়ে এলো সাথে সাথে। ধূসর চোখের কঠিন দৃষ্টি ঘুরল চারিপাশটা জুড়ে। দৃষ্টি ঘুরিয়ে যখন শান্তর ওপর পড়ল, শান্ত ডাকল আস্তে করে –
‘বস!’
আদিল মাথা দুলিয়ে ফিরে তাকাল গাড়ির ভেতরে। শান্ত তখনো দরজা মেলে ধরে রেখেছে। হৃদি চঞ্চল কদমে বেরিয়ে বড়ো বড়ো চোখে চারিপাশটা দেখছে। ভীষণ সুন্দর সিল্কের ফ্রোক পরে আছে। পায়ে শুভ্র রঙা স্লিপার বুটস। চুলটা চমৎকার এক হেয়ারস্টাইলে বাঁধা। পুতুলের মতো লাগছে দেখছে। শান্তকে দেখেই বাচ্চাটা বলে –
‘বডিগার্ড আংকেল, মম বলেছে আমরা তোমার বিয়ে খেতে এসেছি তোমার। তুমি কি বিয়ে করছো?’
শান্তর মুখে হাসি ধরে না। ও সাহস করে দু-হাত বাড়াতেই হৃদি কোলে উঠে গেলো। গলা জড়িয়ে ধরল দু-হাতে। জবাবের আশায় চেয়েই থাকল। শান্ত হেসে বলল –
‘হ্যাঁ।’
হৃদির কৌতূহল থামল না, ‘কাকে বিয়ে করছো তুমি? ওয়্যার ইজ শি?’
‘প্রিন্সেস কি দেখা করতে চাচ্ছে?’
‘হুম, আই ওয়ানা সি হার।’
শান্ত জবাব দিতে দিতে আড়চোখে দেখল বসে শক্ত মুখ। বেশ নারাজ লাগছে তাকে। গাড়ির ভেতরে থাকা নারী তখনো বের হয়নি। আবারও চোপাটা চালিয়েছে নাকি ম্যাডাম? শান্ত দ্রুতো হৃদিকে নিয়ে সরে গেলো। অদূরের দুয়ারে এতোগুলো মানুষ দেখে হৃদি আগ্রহ হয়ে প্রশ্ন করেই গেলো –
‘ওরা কারা বডিগার্ড আংকেল?’
শান্ত তাকাল। সবাই ফ্যালফ্যাল দৃষ্টিতে এদিকেই চেয়ে আছে। হাসল ও। হৃদির নাক ছুঁয়ে বলল, ‘দে আর মাই ফ্যামিলি।’
.
রোযা ওপর পাশ দিয়ে বেরুতে চেয়ে অনুভব করল বাইরে থেকে দরজার ওপাশটা আটকে রাখা। আদিল যেখানে দাঁড়িয়ে আছে, ওখানটা দিয়ে বেরুতে হবে। অথচ লোকটা সরছে না। দাঁড়িয়ে আছে কেমন! ওভাবে দরজা আটকে দাঁড়িয়ে থাকলে ও কীভাবে বেরুবে? তখুনি আদিলের থমথমে কণ্ঠের আদেশ পড়ে –
‘বেরুনো হচ্ছে না কেনো?’
রোযা অবশেষে কাছে এলো এপাশের দিকে। আওড়ায়, ‘সরুন।’
আদিল নামমাত্র সরে। রোযা আর তর্কে যায় না। ও লক্ষ্য করেছে আজ লোকটার অদ্ভুত কীর্তিকলাপ। ঠিক কেনো এমন করছে এখনো ধরতে পারেনি। একটা আন্দাজ অবশ্য করতে পারছে। রোযা বেরিয়ে আসতেই বেশ সাবলীলভাবে ওর কোমরটা একহাতে জড়িয়ে ধরল আদিল। শাড়ি পরায় উন্মুক্ত কোমর ধরতে বরং সুবিধাই হলো। অথচ ছুঁয়েই আদিলের চোয়াল শক্ত হলো। রোযার কোমর ছোঁয়া হাতটা কেমন থমকে গেলো। রোযাও হতবিহ্বল! চোখমুখ সাবলীল রেখেই, আশেপাশে চেয়ে আঁচলের নিচে দিয়ে কোমর ছোঁয়া পুরুষালি হাতটা আলতোভাবে সরাতে চাইল। আদিল তখনও হতবিহ্বল। কণ্ঠ নামিয়ে জিজ্ঞেস করে –
‘কোমরে এটা কী?’
রোযা শক্ত করে চোখ বুজে নেয়। নিজেকে ও মনে মনে একশো একটা গালি দেয়! কী দরকার ছিলো শাড়ি পরার? এতো সুন্দর করে তৈরি হওয়ার? আর কেনোই বা বেলি চেইন পরতে গেলো? ওর ওপর তো এমনিতেই শকুনের নজর আছেই! জবাব না দিয়ে রোযা সরতে চাইল। আদিল তখন কোমরটা ছুঁয়ে বোঝার চেষ্টা করছে। ওমন রুক্ষ হাতের স্পর্শ থামাতে শক্ত করে ধরে হাতটা। আদিল সোজা রোযার সামনে এসে দাঁড়াল। আড়াল করল ওকে। পেছনে একগাদা গাড়ি, সামনে আদিল। পুরোপুরি ভাবে আড়াল করা রোযার কোমরের শাড়িটুকু মুহুর্তে সরাল। উন্মুক্ত কোমরে পার্লের চিকন চেইন। রোযা চোখ বুজে মাথাটা ঘুরিয়ে রেখেছে। ওর ঘাড় লাল হয়ে এসেছে। দু-হাতে কোমর ঢাকতে চেয়ে দাঁতে দাঁত পিষে যা বলে তা শোনার মতো অবস্থয় আদিল নেই। তখনো তাজ্জব চোখে দেখছে পৃথিবীর অন্যতম সুন্দর দৃশ্য। গলা শুকিয়ে মরুভূমির মতো খাঁ খাঁ করছে কেমন! রোযা মৃদু ধাক্কা দিতেই বোধ ফিরল যেন। রোযা দাঁতে দাঁত পিষে বলে –
‘আপনি আমার সাথে এমন করতে পারেন না!’
আদিলের চোখ জুড়ে মুগ্ধতা। যা ওমন রুক্ষ ব্যবহারে, কথাতেও কাটে না। বরঞ্চ বাড়ে, হিমালয় ছোঁয়।
‘আমি আরও অনেক কিছুই করতে পারি, রোজ-আ। আর করবোও।’
রাগে রোযার ঠোঁট কাঁপে। দু-হাতে চওড়া বুক সরাতে চেয়ে বলে, ‘আমি ফিরে যাবো। সরুন।’
‘কোথায়?
রোযার চোখ রাঙাল, ‘অবশ্যই আমার বাড়িতে।’
আঙুলে আংটি শোভা পাওয়া হাতটা নিজের হাতের মুঠোয় নেয় আদিল। পুরু ঠোঁট ছোঁয়ায় আংটি পরিহিত আঙুলের ভাঁজে ভাঁজে –
‘সারাদিনে যতবার সম্ভব হবে নিজের বাম হাতে আমার পরানো আংটিটা দেখবেন। ওতে স্পষ্ট করে আপনার পরিচয় লেখা আছে, মিসেস মির্জা। উত্তর পাবেন, কোথায় আপনার বাড়ি।’
রোযা মুখ ঘুরিয়ে ফেলল। আদিল এযাত্রায় নিজেই সরল।তবে ছাড়ল না। ডান হাতটা ধরেই রাখল। কদম বাড়াল সামনে। রোযা এতো মানুষের সামনে আর ঝামেলা করতে চায় না। লজ্জায় তো ওকেই পরতে হয়। হাঁটার তালে দুলল ওর শাড়ির কুঁচিগুলো। মসলিন কাপড়ের নেভিব্লু রঙের শাড়িটা গায়ে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে।
.
বসবার ঘর জুড়ে এতো মানুষ যে শান্তই লজ্জায় পড়ে গেলো। আড়চোখে তাকাল বসের মুখের দিকে। আদিল নির্বিকার বেশ। সোজা এসে ঢুকেছে ভেতরে। সাবলীলভাবেই চারিপাশটা লক্ষ্য করে তাকাল সামনে দাঁড়ানো জব্বার শিকদারের দিকে। ভদ্রলোক তখুনি সোজা হয়ে বললেন –
‘আসসালামু আলাইক, বস।’
আদিল সালামের জবাব দিয়ে চুপ করে গেলো। নাসির শিকদার দ্রুতো বললেন, ‘বসেন, বস… বসেন না।’
আদিল কথা শুনল, রোযাকে টেনে নিয়ে গিয়ে বসল। রোযা বসে তাকাতেই দেখল মুগ্ধ দৃষ্টিগুলো। স্ত্রীলোকেরা সব তার দিকেই ড্যাবড্যাব করে চেয়ে আছে। নিজেদের মধ্যে বেশ ফুসুরফাসুর করা হচ্ছে। হৃদি তখুনি শান্তর কোল থেকে নেমে এসে রোযার পাশ ঘেঁষে বসল। ঠোঁট ফুলিয়ে আওড়াল –
‘মম, আমার ঘুম পাচ্ছে।’
রোযা দু-হাতে মুখটা আদর করে দিয়ে চাপা গলায় বলে, ‘এইতো, একটু পরেই ঘুমাবে।’
আদিলের আর ধৈর্য্য নেই বসে থাকবার। সে উঠবে ওসময় লাঠির শব্দ শোনা গেল। লাঠির সাহায্যে এগিয়ে আসছেন জাহানারা বেগম। শান্তর শ্বাস গলায় আটকে গেলো অমনি। কিছু বলবে পূর্বেই জাহানারা বেগম কাইকুই করতে করতে এসে তাকালেন আদিলের দিকে। বললেন –
‘ওমা, এই দেহি ছোকরা! তোরা যেইভাবে কইলি আমি ভাবলাম বয়স্ক লোক।’
শান্ত দ্রুতো এগিয়ে এসে ধরতে চাইল দাদির হাত। অথচ ওর আগেই জাহানারা বেগম বৃদ্ধা হাতে ভীষণ মায়া নিয়ে আদিলের মাথা বুলিয়ে গালটা টেনে
ধরলেন –
‘কী গো, নাতি! ভালো আছোনি?’
থমথমে এক নীরবতা নামল বসবার ঘর জুড়ে। চেহারার রং পাল্টাল উপস্থিত সবার। নাসির শিকদার তো দাঁড়িয়ে গিয়েছেন। এলেনের মুখটা হা হয়ে আছে। শান্তর থতমত মুখখানার কপালে ঘাম জমল। ওমন ভয়ংকর নীরবতা ভাঙল রোযার ফিক করে হেসে ওঠার মৃদু শব্দে।
চলবে ~~
® নাবিলা ইষ্ক।
Share On:
TAGS: আদিল মির্জাস বিলাভড, নাবিলা ইস্ক
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
আদিল মির্জাস বিলাভড পর্ব ৬
-
আদিল মির্জ’স বিলাভড পর্ব ২৮
-
আদিল মির্জাস বিলাভড পর্ব ২১
-
আদিল মির্জাস বিলাভড পর্ব ১২
-
আদিল মির্জাস বিলাভড পর্ব ১৬
-
আদিল মির্জাস বিলাভড পর্ব ৮
-
আদিল মির্জাস বিলাভড পর্ব ২০
-
আদিল মির্জা’স বিলাভড পর্ব ২৫
-
আদিল মির্জা’স বিলাভড পর্ব ২৬
-
আদিল মির্জাস বিলাভড পর্ব ২২