আদিল মির্জা’স বিলাভড
— ৩১
ঝাড়বাতিটার সফেদ আলো সোজা পড়েছে আদিলের শক্তপোক্ত মুখের ওপর। তার কঠিন, চোখা চোয়াল নরম দু-হাতে ধরে খিলখিল করে হাসছে হৃদি। হাসতে হাসতে মিশে গেছে বুকের সাথে। বিড়ালের মতন চোখদুটো আনন্দে চিকচিক করছে। ও মুগ্ধ চোখে দেখছে শান্ত, এলেন ওদের বাচ্চামো। কীভাবে নাচছে আর গাইছে! পুরো লিভিংরুম প্রাণে থৈথৈ করছে। বেড়াতে যাবে জানতে পেরে আনন্দে দিশেহারা মেয়েটা। একপর্যায়ে ওদের নাচগান থামে, সবটা নীরব হয়। দু-হাতে বাবার গলা জড়িয়ে উচ্ছ্বাস নিয়ে তাকায় দোতলায়। জ্বলজ্বলে চোখে চেয়ে ব্যাকুল গলায় বলে –
‘মম, বেড়াতে যাবো আমরা। ডিড ইউ হিয়ার?’
রোযা মাথা দুলিয়ে বোঝায়, শুনেছে। হৃদি হাত নাড়িয়ে ডাকে, ‘আসো, আসো না। শোনো না।’
রোযা আড়চোখে তাকায় লম্বাচওড়া দেহের দিকে। আদিলের পরনে ছাই রঙা স্যুট। পেছনে অবহেলায় ভরে রাখা রিভলভারটা অল্পখানি দেখা যাচ্ছে। ওটায় র ক্ত লাগা সম্ভবত। রোযা দৃষ্টি সরিয়ে আনে। লোকটা বেরুবে ফের। আজ সারাদিন তো বাড়ি ছিলো না। কিছুক্ষণ আগে ফিরেই পুনরায় বেরুতে যাচ্ছে। তাহলে মাত্র কিছুক্ষণের জন্য ফিরেছে কেনো? বুদ্ধিমতী রোযা গভীরে ভাবার সাহস করে না। হৃদির ক্রমাগত ডাকে অবশেষে কদম বাড়ায়। করিডোর পেরিয়ে সিঁড়ি বেয়ে নামতে ধরে। আদিল ঘুরে দাঁড়িয়েছে। তাকিয়ে আছে তার দিকেই। ধারালো ওই দৃষ্টি উপলব্ধি করেই রোযার ভেতরটা শুকিয়ে আসে। কদমও থেমে যেতে চায়। ছন্নছাড়া দৃষ্টি তুলে যখন তাকাল দৃষ্টিতে দৃষ্টি মিলল। ধূসর চোখে চেয়ে, আশপাশ কেমন ধোঁয়াশার চাদরে মুড়িয়ে গেলো। সবটা অপ্রাসঙ্গিক হয়ে এলো। রোযা দৃষ্টি সরিয়ে আনে। নেমে আসতেই আদিল কাছে দাঁড়াল। মেয়ের গালে ঠোঁট ছুঁয়ে বলে –
‘মমের কাছে যাও, সোনা। আই হ্যাভ ওর্ক টু ডু।’
রোযা যখন হাত বাড়াতে চাইল, হৃদি আরও গভীরভাবে জড়িয়ে ধরল আদিলের গলা। মুখ গোমড়া করে কেমন মুরব্বিদের মতো বলল –
‘কোথায় ছিলে সারাদিন? হ্যাভ ইউ ইটেন? হুম?’
আদিল তাকাল রোযার ইতস্তত মুখের দিকে। হাঁসফাঁস করছে। দৃষ্টি তুলে তাকাচ্ছে না। ওই মুখে চেয়েই আওড়ায়, ‘আই হ্যাভন্ট।’
হৃদি কোল থেকে নামল তখুনি। ঝটপট দু-হাতে টেনে ধরল বাবার হাতটা। গদগদ কণ্ঠে জানাল –
‘আজ মম রেঁধেছিল। কতো ইয়াম্মি হয়েছে জানো? খাবে এসো।’
এইটুকুন মেয়ের হাতের টানে আদিল বাধ্যভাবে এগুচ্ছে। শান্ত বাদে বাকিরা সব বেরিয়ে গেছে। মরিয়ম বেগম ডাইনিং সাজাতে ব্যস্ত হয়েছেন। তবে আগ বাড়িয়ে খাবার সার্ভ করছেন না। রান্নাঘরে যাচ্ছেন না। শান্ত একফাঁকে চেয়ার টেনে দাঁড়িয়েছে ডাইনিংয়ের পেছনে। আদিল আড়চোখে রোযার মিইয়ে আসা মুখ দেখতে দেখতে গায়ের কোট খুলে শান্তর হাতে দিয়ে অবশেষে বসল। রোযা কদম বাড়াল রান্নাঘরের দিকে। হৃদির পছন্দের মোরগপোলাউ রেঁধেছিল। অল্প করেই। তারপরও অনেকটা রয়ে গেছে। সামান্য গরম করে ব্যস্ত হাতে বাড়ল প্লেটে। যখন খাবার নিয়ে কাছে এলো, তার সামনে রাখল… আদিলের ওইমুহূর্তে বলতে ইচ্ছে করল –
‘তুমি দূরে থাকতে চাও, আর দেখো পুরো পৃথিবী তোমাকে আমার কাছেই নিয়ে আসছে। শুধু আমি নই, পৃথিবীও চায় তুমি আমার যত্ন নাও, আমার বাধ্য হও, আমায় ভালোবাসো।’
রোযা কিছুটা সরে দাঁড়িয়ে আছে। দৃষ্টি নোয়ানো। আদিল তাকাল প্লেটের দিকে। অনেকটা সময় শুধু দেখলোই। হৃদি বাবার ঊরুর ওপর বসে আছে। ব্যস্ত গলায় বলে –
‘ড্যাড, খেয়ে দেখো। অনেক মজা হয়েছে।’
শান্তর সাহায্যে আদিল হাত ধুলো। চামচ রেখে হাত দিয়েই খেলো। পুরো প্লেটের খাবার শেষ করল ধীরেসুস্থে। খেয়ে যখন উঠল ততক্ষণে এলেন এসে কানের কিছু বলে গেছে। ওদের হাবভাবে তাড়াহুড়ো। নেপকিন দিয়ে মুখ মুছতে নিয়েই আদিল শেষবারের মতো রোযার দিকে চেয়ে ব্যস্ত ভঙ্গিতে বেরিয়ে গেছে। পরমুহূর্তেই একসাথে অনেকগুলো গাড়ি বেরিয়ে যাবার আওয়াজ ভেসে বেড়াল। রোযা তখনো দাঁড়িয়ে দেখল ফাঁকা প্লেটটা। মরিয়ম বেগম কেমন মিষ্টি করে হাসছেন। হাসতে হাসতে ডাইনিং পরিষ্কার করছেন। একপর্যায়ে আস্তে করে বলেও ফেললেন –
‘স্যারকে এমন তৃপ্তি নিয়ে আমি কখনো খেতে দেখিনি।’
রোযার ধড়ফড় করে যাওয়া হৃৎপিণ্ড ছটফট করে উঠল এযাত্রায়। সব কেমন অদ্ভুত লাগল। চোখের পাতায় তখনো ভেসে বেড়াল আদিলের ধূসর চোখের গাঢ় দৃষ্টি। যতবার তাকায়, রোযার পুরো গোছানো পৃথিবীটা ধ্বসে যায়। তার সত্তা নড়ে ওঠে। হৃদি বাইরে থেকে ছুটে এসে জাপ্টে ধরল রোযার পা-টা। জ্বলজ্বল চোখে চেয়ে হাসছে কেমন –
‘মম, দেখো তিতান বড়ো হয়ে গেছে।’
নিজেকে সামলাল রোযা। তাকাল সামনে। দুয়ারে এসে দাঁড়িয়েছে একটা তিতান। তিতানের পেছনে থোর। দুজন ওখানটায় বসল পা ভেঙে। সম্ভবত হৃদির পেছন পেছন এসেছে। দেখতে যতটা ভয়ংকর, জানতে পারলে ততটাই নরম, আহ্লাদী। রোযা প্রায়শই ওদের মাথা বুলিয়ে দেয়। কেমন তার হাতে মিইয়ে যায়। এযাত্রায়ও যখন সামনে বসে মাথা ছুঁয়ে দিলো তার কোলে মিশে গেলো। মিহি কণ্ঠে ঘেউঘেউ করে গেলো আহ্লাদ পেতে।
.
রাতের একটা পয়তাল্লিশ। ড্রাইভওয়ের দু-পাশের ল্যাম্পপোস্ট জ্বলে আছে। মৃদু হলদে আলোয় সবটা স্বপ্নলোকের প্রতিরূপ যেন। গার্ডেন লাইট পোস্টের সামনে আদিল বসে আছে। চেয়ারে বসা তার বাম পায়ের ওপর ডান পা-টা বেশ অবহেলায় রাখা। কালো গ্লোভসে ঢাকা হাত জোড়া ব্যস্ত সোনালি রঙের রিভলভারের গায়ে শুকিয়ে থাকা র ক্তের দাগ মোছায়। সেই হাতজোড়া থামে শান্তর হঠাৎ দু-হাঁটু ভেঙে সামনে বসাতে। নরম, সবুজ ছাঁটা ঘাসের ওপরে বসা ওর চোখজোড়া তখনো নোয়ানো। আদিল অবশ্য দৃষ্টি তুলে তাকায় না। শান্ত এইপর্যায়ে হাত বাড়িয়ে নেয় রিভলভারটা। নিজেই ভীষণ যত্নের সাথে পরিষ্কার করছে। লাল র ক্ত উঠতে বেশ সময় নিচ্ছে। শুকিয়ে মিশে আছে যে রিভলভারের গায়ে। শভ্র রঙা রুমালটা ট কটকে লাল র ক্তে কী বিভৎস দৃশ্যে পরিণত হয়েছে! আদিল হাত বাড়াতেই এলেন একটা সিগারেট, পাজখাই খোদাই সোনালি রঙের লাইটার এগিয়ে দিলো। সিগারেট ধরাতে নিয়ে আদিল থামল। তাকাল বাড়ির দরজার দিকে। ক্লান্ত বসের দৃষ্টি পেয়ে তখুনি বড়ো দরজাটা টেনে আটকে ফেলল। দৃষ্টি ফিরিয়ে নিয়ে আদিল দু-হাতে ধরাল ট্রেজারার নামের সিগারেটটা। নাকমুখে মুঠো ভরতি ধোঁয়া ছুড়তে ছুড়তে প্রশ্ন করল –
‘মেয়েটা তোর কাজিন?’
আদিলের পায়ের কাছে বসা শান্তর হাতজোড়া থামল। জবাব দিতে মুখ খোলার আগেই এলেন টিটকারির ভঙ্গিতে বলে ফেলল –
‘খালাতো বোন, বস। দুষ্টু বয়, শান্ত। বোনের সাথে লাইন মেরেছে।’
স্বপন বেশ আশ্চর্যের সাথে বলে, ‘ও লাইন মা রার টাইম পেলো কখন?’
ধ্রুব হতবিহ্বল হয়ে বলে, ‘সারাবছর থেকেছে তো এখানেই। বাড়ি ফিরেছে ক-বার?’
শান্ত কটমট করে ওদের দিকে একপলক তাকিয়ে পুনরায় আদিলের দিকে তাকাল। আস্তে করে বলল –
‘খালাতো বোন। আমার অনেক ছোটো। নাম ঝুমুর।’
শান্ত থামে, বাতাসের মতো ফিসফিস করে বলে –
‘ওকে আমি ভালোবাসি। ভীষণ ভালোবাসি। ও আমার, এমন এক ঘোষণা আমি দিয়ে এসেছি পুরো গ্রাম জুড়ে। কেমন ডেসপারেট আমি বোঝা যাচ্ছে?’
এলেন ফিক করে হেসে ফেলল। পালাক্রমে হাসল বাকিরাও। আদিলের ধূসর চোখজোড়াও হাসে সামান্য। উঠতে নিয়ে বলে –
‘ব্যাংকে টাকা দিয়েছি। আজ রাতেই চলে যা। আয়োজন কর গিয়ে। আরও টাকা লাগলে জানাস আমাকে।’
শান্ত দ্রুতো চেপে ধরে আদিলের ঊরু। উঠতে দেয় না। আদিল অগত্যা বসে ফের। জিজ্ঞেস করে ভারি গলায় –
‘কিছু বলবি?’
শান্ত ইতস্তত করে অবশেষে মিনমিনে গলায় বলে –
‘আম..আমি আপনাকে ছাড়া যাচ্ছি না, বস। পরে যদি আপনি না যান?’
চারিপাশটা কেমন থমথমে হয়ে এলো। শান্ত সহ বাকিরাও শ্বাস আটকে দৃষ্টি নুইয়ে রাখল। কিছুক্ষণ আগের হাসিঠাট্টার শব্দ আর নেই। পিনপতন নীরবতা বইল চারিপাশ জুড়ে। আদিল দীর্ঘশ্বাস ফেলল। বলল –
‘বলেছিতো যাবো।’
শান্ত অনুরোধ করল, ‘একসাথে যাই, বস? প্লিজ? প্লিজ, বস?’
তখুনি অদূর থেকে ক্লান্ত শব্দ করল। দরজাটা খোলা হচ্ছে। শান্ত আড়চোখে চেয়ে চাপা গলায় জানায়, ‘ম্যাডাম আসছেন।’
আদিল নড়ে না। তৎক্ষণাৎ ফিরে তাকায়ও না। আলগোছে সিগারেটটা ফেলে দেয় শুধু।
‘শুনুন।’
রিভলভারটা আদিলের আঙুলের ফাঁকে দুলছিল তখন। ডাক শুনে এযাত্রায় হাত থামে। সে ফিরে তাকায়। রোযা নরম গতিতে হেঁটে আসছে তার দিকে। পরনে একটা সিল্কের পাতলা নাইট গাউন। ফর্সা, মসৃন শরীরে মিশে আছে। ওপরে একটা চাদর জড়িয়ে রেখেছে। যখন হাঁটে গাউনটা কী চমৎকার ভাবে দোলে! চুলগুলো বিনুনিতে বাধ্যভাবে বাঁধা হলেও, সামনের গুলো চোখমুখের খুব কাছে উড়ছে। রোযা আস্তে করে ওগুলোকে কানে গুঁজে নিচ্ছে।
‘কথা ছিলো।’
ইতোমধ্যে শান্ত, এলেন ওরা কিছুটা দূরে সরে গিয়ে ঘুরে দাঁড়িয়েছে। আদিল একধ্যানে আপদমস্তক রোযাকে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখে। রোযার হাঁসফাঁস, লাজ বাড়িয়ে অবশেষে গম্ভীরমুখে বলে –
‘শুনছি।’
রোযা আড়চোখে তাকাল রিভলভারটার দিকে। যতবার ওর দৃষ্টি ওটায় পড়ছে, হৃদয় ধড়ফড়িয়ে উঠছে। গ লা কাটা মুরগির মতো ছটফট করছে প্রাণপাখি। কী ভয়ংকর! নিজেকে ওই দৃশ্যে স্বাভাবিক রাখাটাই কেমন দুঃসাধ্যের মতো।
‘বলছিলেন কোথাও একটা যাবেন? কতদিন থাকবেন? ওই সময়টুকু আমি আমার বাসায় থাকতে চাই।’
আদিল মুহূর্তে উঠে দাঁড়াল। রোযা সতর্ক হলো। তবে আদিলকে ওমনভাবে কদম বাড়াতে দেখেও আজ আর পেছাল না। জেদ নিয়ে চেয়ে থাকল। নিজের বাড়িকে ও নিজের বাড়ি বলতে পারবে না? অবশ্যই বলবে। একশোবার বলবে। আদিল একদম কাছে এসে দাঁড়ায়। দূরত্ব ঘুচিয়ে, কণ্ঠ নামিয়ে বলে –
‘কি চাও? আমি লোকজন পাঠিয়ে ওই বাড়িটা ভেঙে গুড়িয়ে ফেলি? মিশিয়ে দিই?’
রোযা আঁতকে ওঠে। অবিশ্বাস্ ভাসা সুন্দর চোখ দুটোতে চেয়ে আদিল আওড়ে যায়,
‘ডোন্ট টেস্ট মাই পেইশনস, মিসেস আদিল। একই কথা দ্বিতীয়বার রিপিট করতে হলে কিন্তু ভিন্নভাবে জানাব। পদ্ধতিটা পছন্দ হবে না।’
একটা মানুষ এতটা অমানবিক কীভাবে হয়? এতো নিষ্ঠুর? রোযা চোখ বন্ধ করে রাগটুকু গিলে নিয়ে দু-কদম পেছাল এবারে। বিরক্ত চোখে চেয়ে নিজেকে শুধরে বলল –
‘বাবার বাড়িতে থাকতে চাই।’
আদিল পুনরায় কদম বাড়াল। দূরত্ব ঘুচিয়ে ফেলল চোখের বলকে। রোযা দ্রুতো পিছিয়ে যেতে চাইলে পুরুষালি রুক্ষ হাতে টেনে ধরল তার পাতলা কোমরটা। মনে হলো, ভেঙে গুড়িয়ে দেবে কোমরটা! নিজের শক্তপোক্ত বুকের সাথে দমবন্ধ করে মে রে ফেলার মতো করে চেপে ধরল। অগ্রাহ্য করল রোযার অস্থিরতা। ফাঁকা হাতে থুতনিটা ধরে মাথা উঁচু করিয়ে চোখে চোখ রাখতে বাধ্য করাল আদিল। তার ধূসর চোখের ওই গাঢ় দৃষ্টিতে রোযা বেশিক্ষণ চেয়ে থাকতে পারে না। অদ্ভুত এক ভয়, অস্থিরতা চেপে ধরে। অশান্ত হয় হৃদয়। দৃষ্টি ফিরিয়ে আনতেই আদিলের আদেশ পড়ে –
‘তাকাও, আমার চোখে তাকাও রোজ-আ।’
রোযা তাকায় না। ছাড়া পেতে ছটফট করে ওঠে। পরমুহূর্তেই থুতনিতে আদিলের হাতের দৃঢ়তায় চোখ ভিজে ওঠে ওর। ছলছল চোখে যখন তাকায় ততক্ষণে আদিল অধৈর্য হয়ে পড়েছে। মাথাটা নুইয়ে রোযার মুখের কাছে এসেছে। নাকে নাক স্পর্শ করে। ইঞ্চিখানেক মাথা বাড়ালেই ঠোঁটে ঠোঁট ছোঁবে। তার ফেলা ঘনঘন তপ্ত শ্বাস পড়ে রোযার ঠোঁটের ওপর –
‘আমি যেখানে যাবো, তুমিও সেখানেই যাবে। আমি এইমুহূর্তে ম রে গেলে, তোমাকে সাথে নিয়ে ম রব। ছাড়ব না। তোমাকে আমি ছাড়ব না। আমার থেকে এই জনমে তোমার নিস্তার নেই।’
বাহুডোরে আঁটকে থাকা রোযার শরীরটা কেঁপে ওঠে, ঠকঠক করে। ধড়ফড় করে হৃৎপিণ্ড। কেমন এক বিশ্রী, তীক্ষ্ণতম অনুভূতিতে ভেসে চোখজোড়া বন্ধ করে রাখে শক্ত করে। নিভু গলায় আওড়ে বসে –
‘কেনো করেন এমন?’
আদিল আরও ঘনিষ্ঠ ভাবে জড়িয়ে নেয় পাতলা শরীরটা। নিজের মধ্যে মিশিয়ে ফেলতে চাইল। চোয়াল ছেড়ে, এলোমেলো চুলগুলো কানের পেছনে নরম ভাবে গুছিয়ে দিতে নিয়ে গভীর স্বরে বলল –
‘শোনার সাহস আছে? সহ্য করতে পারবে? তোমাকে পাবার জন্য আমি কোনপর্যায়ে চলে যেতে পারি তার ধারণাও তুমি সইতে পারবে না। মানতে পারবে না।’
রোযার দমবন্ধ হয়ে আসে। ও চমকে চোখ মেলে চাইতেই একজোড়া র ক্তিম, হিংস্র দৃষ্টিতে আটকা পড়ে। নিজ অজান্তেই চোখের জলে গাল ভিজে ওঠে ওর। আদিল মুহূর্তে হামলে পড়ল। রুক্ষ ভাবে চোখের পলকে শুষে নিলো চোখের জলগুলো। রোযা ছটফটিয়ে চোখ বন্ধ করে। দু-হাতে সরাতে চাইল চওড়া বুক। আদিল একপর্যায়ে নিজেই ছেড়ে দিলো। সরে এলো। ঘুরে পুনরায় চেয়ারে বসতে বসতে বলল নির্জীব কণ্ঠে –
‘আগামীকাল রওনা হবো। যা যা প্রয়োজন প্যাক করে নাও।’
রোযা আর দাঁড়াল না। তাকাল না। ফোন চাওয়ার সাহসটুকুও যে আর অবশিষ্ট নেই যে! সিংহ তাড়া করেছে এমনভাবেই দ্রুতো কদমে ভেতরের দিকে ছুটল। আদিল তাকিয়ে থাকল ওই যাওয়ার পথেই। ক্লান্ত দুয়ারের পাশে দমবন্ধ করে দাঁড়িয়ে আছে। দৃষ্টি নোয়ানো ওর।
শান্ত দেখল বসের গম্ভীরমুখ। শুনেছে, বসের শেষের কথাটুকু। পরশু রওনা দিবে তারা। আনন্দে শান্তর ভেতরটা রীতিমতো কাঁপছে। সে এমন আশা রাখার দুঃসাহসও যে করেনি। শুধু অনুরোধটুকু করতে চেয়েছিল। বিপরীতে ‘না’ শোনার জন্যও নিজেকে প্রস্তুত রেখেছিল। সেই সুদূর রাজপুর গিয়ে তার বিয়ে খাবে বস, এতটা গুরুত্বপূর্ণ লোক নিজেকে কখনো মনে করেনি। কিন্তু আশেপাশের সবাই বলতো, শান্ত ভীষন কাছের কেউ। বস তাকে অনেক গুরুত্ব দেয়। ছোটো ভাইয়ের মতো মনে করে। তা সবসময় হেসে উড়িয়েছে শান্ত। তেমন আস্কারা দেয়নি ওসব চিন্তাভাবনার। আচ্ছা, কতগুলো বছর ধরে শান্ত বসের পাশে? দশ – বারো নাকি আরও বেশি? শান্ত তখন যে ভীষণ ছোটো ছিলো। কতো বছর ছিলো যেন? এই বারো সম্ভবত! আর তার বসের? এই সতেরো… বস তো তার পাঁচ বছরের বড়ো মাত্র। ওই সময় এসে শান্ত এক যুবক দেখেছে। পরিষ্কার এক যুবক! কালচে এই দুনিয়াটা তখনো ছুঁতে পারেনি যাকে। স্কুল থেকে ফিরে তখনো যে মায়ের আচল টেনে ধরে থাকতো। আবদার করতো, বায়না ধরতো।
শান্তর চোখের পাতায় হঠাৎ করে ভেসে ওঠে তার জীবনের সবচেয়ে হৃদয়বিদারক দৃশ্যটুকু। ভাসা ভাসা, সাদাকালো ওসব এখন। গোটা মির্জা বাড়ি জুড়ে সেদিন পুলিশ দিয়ে ভরতি. এমপি থেকে মন্ত্রী সবার আগ্রহ তখন এই বাড়িতেই। প্রবল বৃষ্টির মধ্যেও সাগরের স্রোতের মতো সকল রাজনীতিবিদ, উচ্চবর্গের মানুষদের যাতায়াত। বাড়ির সামনে দুটো খাটিয়া পাশাপাশিই রাখা। লাশের গা সাদা কাপড়ে ঢাকা। তাজা লাল র ক্ত ভেসে উঠেছে সাদা কাপড়ে। সেই দৃশ্যে, শান্ত আজও ভুলতে পারে না তার বসের আহাজারি। স্কুল থেকে হাস্যোজ্জ্বল মুখে ফেরা যুবকের আর্তচিৎকার আজও প্রায়শই তার ঘুম ভাঙিয়ে দেয়। ওই আর্তচিৎকার, ওই ভাঙা কণ্ঠের কান্নার শব্দ আজও ওর বুকের ভেতরটা ক্ষ ত বিক্ষ ত করে ফেলে। ওইদিনের পরে তো সবটাই পরিবর্তন হয়ে গেলো। সব….
.
রাজপুর।
বাংলাদেশের ভীষণ ভেতরের এক সেকেলে গ্রাম। যেখানে চলে না আইনি শাসন। পড়ে না মন্ত্রণালয়ের দৃষ্টি। পুরোটা গ্রাম জুড়ে এখনো জমিদারদের শাসন চলছে। গ্রামটার বর্তমান জমিদার নাসির শিকদার। শিকদার বংশ এই প্রথম জমিদার পদে আছেন। তার কারণও আছে। তারা জন্মগত শাসক নন। কোনো দাপুটে খানদান নন। বরং, ছোটো ভাইয়ের একমাত্র ছেলের দাপটে তারা আজ এই অবস্থানে আছেন। এই গ্রামে যেই বিশাল হাসপাতাল, স্কুল, কলেজ আছে? সব শহরের এক নামকরা শিল্পপতির করে দেওয়া। এখানকার সব পরিষ্কার ইটপাথরের রাস্তাও তার করে দেওয়া। সেই লোকের হয়েইতো কাজ করে তার ভাইপো, শান্ত শিকদার। বডিগার্ড যে! কাছের বডিগার্ড।
সেই থেকে এই গ্রামে এখন শিকদারদের শাসন। একরকমের মান্যগণ্য করা হয় তাদের। গ্রামের সবকিছুতেই তাদের মতামত আবশ্যক। নর্থ নদীর গা ঘেঁষে দাঁড়ানো জমিদারি বাড়িটাই শিকদারদের। তারা চার ভাই, চার বোন। বোনেরা সব বিবাহিত। আশেপাশেই তাদের শ্বশুর বাড়ি। তারা চার ভাই এই বিশাল চারতলা পুরনো আমলের বাড়িটাতেই থাকেন। আজ বাড়ি জুড়ে একধরনের অস্থিরতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। চাপা গুঞ্জন বেড়ে যাচ্ছে দিনের আলো বাড়ার সাথে সাথে। জব্বার শিকদার বড়ো ভাইদের টেনে নিয়ে দু-দফায় আলাপে বসেছেন। তাদের এমন চাপা আলাপের মধ্যেই হাজির হলেন বাহাদুর হাওলাদার। ভদ্রলোক সকাল থেকে শিকদার বাড়ি্তে এই নিয়ে চার বার এলেন। প্রত্যেকবার ফিরে গেছেন শিকদারদের না পেয়ে। এবারে পেয়ে উচ্ছ্বাসে ফেটে পড়লেন। দ্রুতো এগিয়ে এসে বসলেন পাশের ফাঁকা চেয়ারটায় –
‘শান্ত নাকি আইতেসে? ওর সাথে নাকি ওই প্রভাবশালী লোকও আইব? হাছা নাকি?’
বাহাদুর হাওলাদার এই বাড়ির বড়ো মেয়ে জামাই। হাওলাদার বাড়িটাও কাছেই। পাঁচ মিনিটের রাস্তা। জব্বার সাহেব গম্ভীরমুখে মাথা দুলিয়ে বলেন –
‘কইলো তো। কালই আইসা পৌঁছাইব।’
বাহাদুর সাহেব অবিশ্বাস নিয়েই চাপা গলায় বললেন, ‘আমার তো বিশ্বাসই হয় না শান্ত আইসা ওই ঝুমুররেই বিয়ে করতেছে। শহরে কতো বড়লোক ঘরের মাইয়ারা আছে। আছে না জব্বার ভাই? আপনিই কন! শান্ত দেখতে, শুনতে কম? রাজপুত্রের মতন দেহায়।’
জব্বার সাহেব চোখমুখ কুঁচকে ফেললেন। বরাবরই তিনি ছোটোবোনের এই মেয়েকে ভীষণ স্নেহ করেন। পারেন না শুধু নিজের কাছে রাখতে। এইধরণের কথা তার ভালো লাগল না। অন্যদিকে লুৎফর শিকদার দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলেন –
‘আমারও তেমন একটা ইচ্ছা নাই। কিন্তু আমাগো পোলা তো ঝুমুর বলতেই অজ্ঞান। মাইয়াও হাতের কাছে বড়ো হইছে। লক্ষ্মী মাইয়া। মেনে নিতে তাই আপত্তিও নাই।’
মাথা দোলালেন নাসির শিকদার। বললেন, ‘ঝুমুর কোথায়? ওরে এই বাড়িতে আনাও। শান্ত আইসাই দেখবার চাইব।’
জব্বর সাহেব শব্দ করে হেসে ফেললেন। বললেন, ‘মাইয়াডা কী কইছে কে জানে! পোলা আমার সেই ক্ষ্যাপা। এসে নাকি ওরে মার ব এইজন্য মাইয়া এই বাড়ির আশেপাশেও ঘেঁষে না। ভয় পাইতেসে।’
লুৎফর সাহেব বলেন, ‘নাজমারে বইল ওর জামাই নিয়া বাড়িতে আইতে। বিয়েশাদি এইখান থেকেই হইব। ওদের টাকাপয়সা খরচা করতে নিষেধ করছে শান্ত। পরে পোলা ঝামেলা করব।’
‘ঝুমুর রায়হানের বড়ো আদরের মাইয়া। চোখে হারায়। ওয় রাজি হইব না। মাইয়ার বিয়েতে খরচা করবোই।’
জব্বর সাহেব ইতোমধ্যে স্ত্রীকে ডেকে আদেশ করেছেন কাজের লোকদের নিয়ে দোতালার ওই আলিশান ঘরের ধোয়ামোছার কাজ শুরু করতে। ওই ঘরের সবকিছু চকচকে চাই। সবকিছু নতুন চাই।
.
কবুতরের উড়োউড়ু বারান্দা জুড়ে। পাখিদের কিচিরমিচির শোনা যাচ্ছে। সেসবের মধ্যে দিয়ে দিয়ে ছোটা মেয়েলি বদনে ভীষণ ঘেয়ারের স্কার্ট, ফতুয়া। একটা ওড়না মাথায় টানা ছিলো, যা আপাতত পড়ে আছে কাঁধে। নুপুরের আওয়াজ দেয়ালে দেয়ালে ভাসছে। রায়হান সেই আওয়াজে হাসেন। হাতের পত্রিকা রেখে ফিরে তাকান। ঝুমুর এসে দাঁড়িয়েছে দেয়ালের পেছনে। কাজল রাঙা চোখজোড়া বের করে রেখেছে কেবলই। রায়হান সাহেব ডাকেন –
‘কী? আহো মা।’
ঝুমুর লাজে এগুতে পারে না। দাঁড়িয়েই থাকে। রায়হান সাহেব হাসতে হাসতে বলেন, ‘আম্মা, আপনিই ঠিক। আমিই ভুল। আইতেসে আপনার রাজপুত্তর আপনারে বিয়া করতে।’
ঝুমুর শক্ত করে বুঝে ফেলল চোখজোড়া। পুরো দুনিয়াটাই দুলে উঠল ওর। আস্তে করে একটা শব্দ আওড়াতে পারে শুধু –
‘কখন?’
‘আগামীকাল। খবর দিয়ে গেলো নাসির ভাই।’
ঝুমুর তখুনি ছুটে ভেতরে চলে গেলো। তার হাস্যোজ্জ্বল কণ্ঠের সুর পুরো বাড়িতে ভেসে বেড়াল।
চলবে ~
® নাবিলা ইষ্ক।
Share On:
TAGS: আদিল মির্জাস বিলাভড, নাবিলা ইস্ক
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
আদিল মির্জা’স বিলাভড পর্ব ২৬
-
আদিল মির্জাস বিলাভড পর্ব ২২
-
আদিল মির্জাস বিলাভড পর্ব ৮
-
আদিল মির্জাস বিলাভড পর্ব ১৪
-
আদিল মির্জাস বিলাভড পর্ব ১৬
-
আদিল মির্জাস বিলাভড পর্ব ১৮
-
আদিল মির্জা’স বিলাভড পর্ব ২৯
-
আদিল মির্জা’স বিলাভড পর্ব ২৪
-
আদিল মির্জাস বিলাভড পর্ব ৭
-
আদিল মির্জাস বিলাভড পর্ব ১৫