‘আদিল মির্জা’স বিলাভড’
— ২৭
ওমন এক অস্বাভাবিক দৃশ্যে মরিয়ম বেগম এতটাই দ্রুতো গতিতে মাথা নোয়ালেন যে ঘাড়ের রগে বিশ্রী এক টান লাগে। ব্যথায় দমবন্ধ হয়ে এলেও তার অভিব্যক্তির পরিবর্তন হয় না। নড়েন না একচুলও। তার ওমন শিথিল শরীরেই প্রথমে চোখ গেলো রোযার। দেখল রান্নাঘরের ওদিকে আরও দুটো মাথা নুইয়ে আছে। ব্যস মুহূর্তে লজ্জা গাঢ় হয়। চোখমুখ বুজে ফেলল শক্ত করে। অনেকক্ষণ ধরে ও বোয়ালমাছের মতো মুষড়েছিলো। সুযোগে ওই প্রশস্ত, শক্ত কাঁধে দুটো ঘুষিও মে রে বসেছিল। এতে কাজের কাজ কিছু তো হলোই না, উল্টো ওর সাথে ভীষণ এক অন্যায় হয়ে গেলো। এমন এক বিশ্রী কাণ্ডের ভুক্তভোগী হয় যে রাগে – দুঃখে কেমন শরীরটাই আঁটসাঁট হয়ে এলো। একজন পুরুষ মানুষ কতটা লম্পট, দুশ্চরিত্রের হয়ে থাকলে এমন একটা কাজ করতে পারে? রোযা ভয়ে আর নড়ারই সাহস সঞ্চয় করতে পারল না। দাঁতে দাঁত পিষে শুধু পড়ে রইল প্রশস্ত কাঁধে। আদিলের নেয়া প্রত্যেকটা দৃঢ় কদমের সাথে ওর পেট গাঢ়ভাবে ছুঁয়ে গেলো নগ্ন কাঁধটা। প্রত্যেকটা স্পর্শে তড়তড় করে বাড়ল রোযার রাগ, লাজ। ও কী একটা কামড় বসিয়ে দেবে? একটুকরো মাংস ছিনিয়ে নেয়ার মতন করে? কিন্তু কামড়টা ভীষণ এক গভীর, কাতর ব্যাপার। রোযা মোটেও নিজের ঠোঁট, মুখ এই লম্পটের ধারেকাছেও নিতে চায় না। এইপর্যায়ে ওর কণ্ঠ জেদ ভেঙে অসহায় হয়েই এলো কেমন –
‘নামান আমাকে। নামান, প্লিজ!’
আদিল শুনল না। নামাল না। উল্টো সিঁড়িতে পা ফেলল। এবারে ভীষণ দ্রুতো গতিতে উঠছে। রোযা চটজলদি ভয়ে খামচে ধরল শক্তপোক্ত কাঁধ। পরমুহূর্তেই উপলব্ধি করল হাতের তলায় থাকা উত্তপ্ত নগ্ন শরীর। কী বেলেহাজ পুরুষ মানুষ! উদম শরীরে নাচতে নাচতে চলে এসেছে। পরনে কোনোরকমে একটা প্যান্ট। রোযার মনে হচ্ছে ওটা যেকোনো সময় খুলে যেতে পারে। ইশ! ও যখন দেখল দোতলায় উঠে এসেছে হাঁফ ছেড়ে বাঁচল। দু-পা ঝেড়ে নামতে চাইলে আশ্চর্যজনকভাবে তখনো নামাল না আদিল। রোযাকে কিংকর্তব্যবিমুঢ় করে সে ফের সিঁড়ি ধরেছে। গন্তব্য যে তিনতলায় তা বুঝতে আর বাকি নেই। আতঙ্কে ওর চোখমুখ ফ্যাকাসে হয়ে এলো অমনি। ধড়ফড়িয়ে ওঠা কণ্ঠে সমানে চাপা হুংকার ছাড়ল –
‘আদিল মির্জা, আই’ল কিল ইউউউ। আই’ল শুট ইউ! আই উইল!’
আদিলের অভিব্যক্তির আহামরি পরিবর্তন হয় না। থামায় না কদম। বেয়ে উঠছে প্রত্যেকটা সিঁড়ি, হাঁটা অব্যাহত রেখে সেভাবেই মাথাটা ঘুরিয়ে বোধহয় তাকাল। রো্যার চোখমুখ ক্রমশ নীল হচ্ছে! হবে না? মনের আঙিনায় ভীষণ গোপনে থাকা ব্যাপারটা ঘটতে পারে এতটুকু ভাবনাই ওর মস্তিষ্ক আসাড় করতে যে যথেষ্ট! এতক্ষণ যাবত এই লোকের অত্যাচার ও সহ্য করে গেছে ঝামেলা করে সবার নজরে আসতে চায় না বলে। এযাত্রায় আর কিছুর ধার ধারল না। হিসহিসিয়ে নামতে চেয়ে দু-হাতে আদিলের গলা টিপে ধরল। অনুভব করল তাকে ধরার স্টাইল পরিবর্তন হয়ে গেছে। বাচ্চা কোলে নেয়ার মতন একটা পজিশনে ও। ওই লোকের হাত কোথায়? ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে বেচারি পরমুহূর্তে লজ্জায়, আতঙ্কে চিৎকার করে ওঠে –
‘আয়ায়ায়া, লম্পট। লম্পট। লম্পট। নামান, এক্ষুণি নামান। নামান, নয়তো মে রে ফেলব আপনাকে। অসভ্য, অসভ্য। ছিইইইহ্।’
আদিল তপ্ত চোখে যখন মাথাটা ঘুরিয়ে তাকাল রোযার ফুটন্ত আগুনের মতো ফুটতে থাকা মুখে আঁধার নামল। কাঁপল ঠোঁট। আদিলের ওমন ভেজা, গাঢ়, গভীর… রক্তিম চোখের দৃষ্টি ওর যে অজানা, বড্ড অচেনা। ওর হাতের নিচে থাকা শরীর থেকে মনে হলো আগুন বেরুচ্ছে। ঘনঘন নেয়া শ্বাসপ্রশ্বাসের দরুন ভালোভাবে উপলব্ধি করতে পারছে আদিলের বুকের ওঠানামার গতি। অস্বাভাবিক সবকিছু! রোযার মুখটা কুমরোর মতো লাল হয়ে উঠল। চোখমুখ দিয়ে আগুন ঝরিয়ে আদিলকে পুড়িয়ে ফেলার মতো সিস্টেম থাকলে এতক্ষণে আদিল পুড়ে ম রে যেতো। আদিল দৃষ্টি ফিরিয়ে নিলো। উদ্দেশ্য করে বলল –
‘সেইভ ইউর এনার্জি, মিসেস আদিল। আপনার ভালোর জন্য বলছি। আপনার কাজে লাগবে পরে।’
রোযার আতঙ্কিত মুখটা আদিল আর দেখল না। সোজা এলো তৃতীয় তলায়। করিডোর পেরিয়ে এসে সোজা প্রবেশ করেছে তার রুমের ভেতর। বিশাল বড়ো, গোল আকৃতির ওমন নরম তুলতুলে বিছানাতেই ফেলল এতক্ষণ ধরে ভীষণ পরিশ্রমের সাথে মুষড়ে নামতে চাওয়া রোযার পাতলা শরীরটা। রোযার পিঠ ছুঁতেও পারেনি গাঢ়ভাবে পরমুহূর্তেই ও ব্যাঙের মতো লাফিয়ে উঠতে চাইলে – বাঁধ সাধল আদিলের পেশিবহুল হাত। একহাত রুক্ষ ভাবে প্যাঁচিয়ে ধরল পাতলা কোমরটা। টেনে শুইয়ে দিলো ফের। রোযার চিৎকার চ্যাঁচামেচি হঠাৎ ধপ করে আগুন নিভে যাওয়ার মতো থেমে গেলো। পেট ছুঁয়েছে শীতল কিছু। চোখ নামিয়ে ওই দৃশ্য দেখে থমকে গেলো মুহূর্তে। ঢোক গিলল থরথর করে কেঁপে। আদিল পি স্তলের ট্রিগার প্রেস করে মুখটা নামিয়ে আনল। র ক্তিম ধূসর চোখ দুটো ক্রমান্বয়ে লাল হতে থাকল। কণ্ঠ নেমে এলো ভীষণ খাদে –
‘হাহ..বলুউন মিসেস…কী বাঁচাতে চান? জীবন নাকি সতিত্ব?’
রোযা শিউরে উঠল পি স্তলের গাঢ় স্পর্শে। চোখমুখ বুজে মাথা খাটাল। আওলে-ঝাওলে ভঙ্গিতে কোনোরকমে আওড়াল,
‘মেয়েদের সাথে যে পুরুষ জোর খাটায় সে পুরুষ না। সে এক….’
আদিল মাথাটা একেবারে নামাল এবারে। তার উষ্কখুষ্ক ঠোঁট জোড়া ছুঁয়ে দিলো রোযার লাল টকটকে কানের লতি। কথা কেড়ে নিলো কেমন –
‘কাপুরুষ। আপনার স্বামী কাপুরুষ।’
বলতে বলতে তার গাঢ় দৃষ্টি পুরো রোযাতেই বুলিয়ে অবশেষে ওর ভ্যাবাচেকা খাওয়া মুখে থামল। আদিল আওড়াল মুগ্ধ হয়ে গভীর স্বরে –
‘স্নো এজ হোয়াইট, স্নো-হোয়াইট।’
কী অশ্লীল শোনাল! রোযার কান ঝাঁঝাঁ করে উঠল। বোধবুদ্ধি নিজেদের কাজ চালানোর আগে হাত চলল। ওর মুখের সামনে থাকা লম্পটে মুখটায় ঘুষি বসাতে চাইলে আদিল কেমন আমোদেই ধরে ফেলল একহাতে। নিজ একহাতে ওর দু-হাতই চেপে ধরল মাথার ওপর। রোযা হিসহিসিয়ে উঠল। কতবড় লু চ্চা! হৃদির ওমন মিষ্টি, অবুঝ ডাকটাকে কী বানিয়েছে! পরমুহূর্তেই চোখজোড়ার দৃষ্টি ঝাপসা হয়ে এলো। ক্রমশ মাথাটা সরাতে চাইল কানের কাছে ওমন ঘনঘন শ্বাস নেয়া আদিল থেকে। বড়ো করে ঢোক গিলে অনিশ্চয়তা নিয়ে বলল –
‘আমি জানি, আপনি আমাকে মার বেন না। ভয় দেখাচ্ছেন শুধু।’
আদিল তাকাল ফর্সা ঘাড়ের দিকটায়। আওড়াল, ‘ভুল জানো রোজ-আ।’
‘হৃদির আমাকে প্রয়োজন। আপনি আমাকে নিশ্চয়ই মার…’
কোমরে চেপে ধরে পি স্তলের ট্রিগার হঠাৎ করে প্রেস করে দিলো আদিল। রোযা ওই শব্দে আর্ত নাদ করে ওঠে। থরথর করে কাঁপে পুরো শরীর। হৃৎপিণ্ড তখনো লাফাচ্ছে পাগলের মতো। কিছু হয়নি অনুভব করে যখন ভয়ে ভয়ে তাকাল দেখল আদিল ফাঁকা পি স্তলটা এবারে লোড করছে –
‘মাই মিস্টেক!’
বলতে বলতে পি স্তলটা ফের চেপে ধরল। তবে এবারে পেটের কাছটায়। পুনরায় প্রশ্ন করল গাঢ় চোখে চেয়ে, শীতল কণ্ঠ খাদে নামিয়ে –
‘তো, কী বাঁচিয়ে নিচ্ছেন? প্রাণ নাকি সতিত্ব?’
রোযা চোখমুখ বুজে চুপ থাকল। স্পষ্ট শুনল আদিলের ট্রিগার প্রেস করার শব্দ। ভয়ে কাঁপল ফের। ম র বে? কখনো না। ও বেঁচে থাকবে। বেঁচে থেকে র ক্ত চুষে খাবে এই লম্পটের। অবশেষে দাঁত কিড়মিড়িয়ে আওড়াল –
‘প্রাণ…প্রাণ…’
আদিল সন্তুষ্টির সাগরে ভেসে গিয়ে তৃপ্তিতে চোখ বুজল। মৃদুস্বরে হাসলও। মুহুর্তে দ্রুতো গতিতে মুখ ডোবাতে চাইল চোখের সামনে থাকা ফর্সা, মসৃন ঘাড়ের মধ্যিখানে। ওসময় নীরবতা ভাঙল বাচ্চার কান্নার তীব্র আর্ত নাদে –
‘মম! মাম্মাম….মাম্মাম..আর ইউ গোন? ডিড ইউ লাইড টু মিই!’
আদিলের চাপা কণ্ঠও মেয়ের আর্ত নাদের পরপরই শোনা গেলো, ‘শীট!’
হৃদির কান্না থামানোর চেষ্টা চালাচ্ছেন মরিয়ম বেগম। সম্ভবত রুমে নেয়ার চেষ্টা করছেন। ওপরে আসতে দিতে চাচ্ছেন না। তার মৃদু স্বরে বলা প্রত্যেকটা শব্দ শোনা যাচ্ছে। রোযা যেন একটু আলোর দেখা পেলো। ততক্ষণাৎ আদিলকে ঠেলে সরিয়ে উঠতে চাইল। আদিল সরল না। অস্বাভাবিক চোখে চেয়ে আছে শুধু। হৃদি সম্ভবত কাঁদতে কাঁদতে ওপরে আসছে। হেঁচকি তুলছে –
‘ড্যাড! ড্যাড!’
রোযা পাশে ফিরে তাকিয়ে দেখল দরজাটা আধখোলা। সতর্ক হলো মুহূর্তে। চোখ রাঙিয়ে চ্যাঁচাল –
‘ছাড়ুন। সরুন।’
এবারের ধাক্কায় আদিল অসহ্য ভঙ্গিতেই সরে এলো। রোযা তাকিয়ে দেখার প্রয়োজনবোধ করল না আদিলের শক্ত মুখ। এলোমেলো ভঙ্গিতে বিছানা ছেড়ে ছুটল দরজার দিকে। হৃদি তখুনি এসে দাঁড়িয়েছে। কেঁদেকেটে চোখের জলে চোখমুখ ভাসিয়ে ফেলেছে। হেঁচকি তুলছে সমানে। র ক্তিম মুখটা দেখেই কাঁপল ওর হৃদয়। সূক্ষ্ণ যন্ত্র ণাটা আবারও অনুভব করতে পারল। রোযাকে দেখেই হৃদি ঝাপিয়ে পড়তে চাইলে রোযা দ্রুতো হাঁটু গেড়ে বসে ওকে বুকে সযত্নে আগলে নিলো। ব্যগ্র হলো ওর মাথা বুলিয়ে শান্ত করতে। মৃদু, আদুরে ভঙ্গিতে ফিসফিস করে গেলো –
‘কান্না করছে কেনো আমার মা? বলেছি না যাবো না তোমাকে ছেড়ে, হুম? ডোন্ট ইউ ট্রাস্ট মি?’
হৃদির কান্না থেমেছে। ছোটোখাটো শরীরটা অল্প কাঁপছে শুধু। রোযার ঘাঢ়ে মুখ গুঁজে ভাঙা গলায় আওড়াল –
‘ঘুম ভাঙতেই দেখি তুমি নেই, মা। আমি ভয় পেয়েছি।’
রোযা তখুনি ভেজা গালে চুমু খেলো। ওকে জড়িয়েই উঠে দাঁড়াল। অনুভব করল তার পেছনে দাঁড়ানো আদিলের অস্তিত্ব। সতর্ক ভঙ্গিতে দ্রুতো হৃদিকে নিয়ে হাঁটা ধরল। ভয় পাচ্ছিল, এই বুঝি এই লোক ফের ওকে আটকে রাখবে। মান্য করবে না নিজের মেয়ের উপস্থিতিও। কিন্তু না। আদিল আর কিছু বলেনি, করেনিও। রোযা করিডোর পেরিয়ে সিঁড়ি বেয়ে নেমে এলো দোতলায়। স্বস্তির শ্বাস ফেলল। দোতলায় দাঁড়িয়ে আছেন মরিয়ম বেগম। তার হাতে খাবারের ট্রে। সারাদিনে রোযা কিচ্ছুটি মুখে তোলেনি। যতবার মরিয়ম বেগম খাবার এনেছেন, ও ফেরত পাঠিয়েছিল। ক্ষুধায় ওর মাথা ঘুরপাক খাচ্ছে। মানেই হয় না অভুক্ত থাকার আর। মরিয়ম বেগম পিছুপিছু রুমে এলেন। খাবার পরিবেশন করলেন টি-টেবিলের ওপর। হৃদিকে কোলে নিয়েই খেতে বসল রোযা। ওর দ্রুতো খাওয়ার ভঙ্গিতে হাসি ফুটে উঠল মরিয়ম বেগমের ঠোঁট জুড়ে। হৃদি কৌতূহল হয়ে হঠাৎ প্রশ্ন করল –
‘তুমি ড্যাডের সাথে কী করছিলে, মম?’
অবুঝ প্রশ্নে তোপে রোযার মুখের খাবার মাথার তালুতে ওঠে। সমানে কেশে ওঠে। মরিয়ম বেগম দ্রুতো পানির গ্লাস এগিয়ে দেন। গ্লাসের পানিটুকু গিলে শান্ত হয়ে অবশেষে রোযা তাকাল হৃদির দিকে। পিটপিটিয়ে চেয়ে আছে জবাবের আশায়। রোযা অসহায় বড়ো –
‘গল্প।’
হৃদি খুশি হলো। রোযার কোলে নড়েচড়ে বসে বলল, ‘এরপর থেকে আমাকেও নেবে কেমন? আমি তোমাদের সাথে গল্প করব।’
মরিয়ম বেগম ঠোঁটে ঠোঁট টিপে রেখেছেন। রোযা বিতৃষ্ণা গোপন করে কোনোরকমে খাবারগুলো গিলে ওঠে। গল্প? রোযা ওই গল্পকে আগু ন লাগিয়ে দিতে চায়। ভস্ম করে ফেলতে চায়।
.
মিঠা মিঠা রোদ্দুরের স্পর্শে রোযার ঘুমটা ছুটে আসে। সদ্য ঘুম ভাঙা চোখ দুটো সূর্যের কিরণ মুহূর্তে সহ্য করতে পারে না। সময় লাগে। যখন পুরোপুরি চোখ মেলে তাকায়, ঘড়ির কাঁটা সবে নটায়। দৃষ্টি নিজের বুকের দিকে নিতেই হৃদির মুগ্ধ দৃষ্টিতে দৃষ্টি মিলে। বাচ্চাটা চেয়ে আছে তার বুকে বিড়ালছানার মতন লেপ্টে থেকে। ওর ছোটো হাত দুটো রোযার হাতের ওপরে। রোযাকে চাইতে দেখে গাল ভরে হেসে বলল –
‘গুড মর্নিং, মম।’
রোযা মৃদুস্বরে হেসে আরও গাঢ়ভাবে জড়িয়ে নেয় বুকের সাথে, ‘কখন ঘুম ভাঙল আমার সোনার? আমাকে ডাকোনি কেনো?’
হৃদি মুগ্ধ হয়ে আওড়াল, ‘তুমি কতো সুইটলি ঘুমোচ্ছিলে। আই কুড’ন্ট বিয়্যের ইট।’
রোযার বুক ভরে এলো। ও মাথা নুইয়ে এলোপাথাড়ি চুমু খেলো বাচ্চার সারা মুখ জুড়ে। হৃদি খিলখিল করে হাসল। ওর হাসির শব্দে নড়ল দুয়ারের বাইরে দাঁড়ানো মরিয়ম বেগম। এযাত্রায় নক করলেন দরজায়। এই রুমের দরজা এর আগে কখনো লক হয়েছে? হয়নিতো। আজই প্রথম! তিনি অপ্রস্তুত হয়ে শুধু সময় গুনছিলেন। অবশেষে শব্দ পেয়ে তবেই করাঘাত করলেন। রোযা শব্দ শুনে বিছানা ছাড়ল। হিপ ছোঁয়া সিল্কি চুলগুলো রোদের আলোয় ঝলমল করছে। ওগুলো এলোমেলো ভঙ্গিতে খোঁপা করতে করতে দরজা খুলে দিলো। মরিয়ম বেগম শ্রদ্ধেয় গলায় বলেন –
‘ম্যাডাম, শুভ সকাল। ফ্রেশ হয়ে ব্রেকফাস্টের জন্য নামুন। স্যার অপেক্ষায়।’
রোযা অপ্রস্তুত হয়ে বলল, ‘আমি ব্রেকফাস্ট করব না। হৃদিকে রেডি করে দিচ্ছি। ওকে নিয়ে যান।’
মরিয়ম বেগম ইতস্তত করে জানান, ‘স্যার আপনাকেও নামতে বলেছেন, ম্যাডাম।’
হৃদি তুখুনি ছুটে এসে ধরল রোযার হাত। উচ্ছ্বাস নিয়ে ক্রমান্বয়ে তাগাদা দিলো –
‘মা, আমরা ফ্যামিলি। একসাথে খাবো। মা, আমরা একসাথে খাবো। ড্যাড, মম অ্যান্ড হৃদি। ইয়েএএ, মম লেট’স গো।’
মরিয়ম বেগম নরম দৃষ্টিতে দেখলেন বাচ্চার আনন্দিত উচ্ছ্বাস। দৃষ্টি তুলে যখন তাকালেন রোযার দিকে, ওর চোখমুখে তখন অসহায়। দীর্ঘশ্বাস লুকিয়ে হৃদিকে নিয়ে ওয়াশরুম গেলো। মরিয়ম বেগম অপেক্ষা করলেন। রোযা বেশি সময় নিলো না। বেলা নয়টা, হৃদি এখনো কিছুই খায়নি। এইজন্যই তাড়াহুড়ো করে ওকে তৈরি করে বেরুলো রুম ছেড়ে। ওকে খাইয়ে আবার এগারোটার ভেতর ওর স্কুলে যেতে হবে। সাপ্তাহিক মিটিংয়ের জন্য। এতদিন রোযা এজ আ ন্যানি হিসেবে উপস্থিত থাকতো। অথচ আজ থেকে ওর মা হিসেবে! এখুনি কেমন এক অনুভূতি হচ্ছে। হৃদি অবশ্য গত রাতে তোতাপাখিত মতন বলে গেছে –
‘সবাই জানবে আমার মা আছে। সবার মতো আমার মা-ও থাকবে। আম সো হ্যাপি।’
ওকে ঘুম পাড়াতে বেশ কসরত করতে হয়েছে রোযাকে। মেয়েটা পারলে সারারাত জেগে থেকে গল্প করতো। তবে বেশি জেগে থাকতে পারেনি। কিছুক্ষণ কিচিরমিচির করে ঘুমিয়ে পড়েছিল।
.
‘কী করব, বস? এবারও বুকে পাঠিয়ে দেবো? বুড়োটা বেশ পিছু লেগেছে এবার। ওর অ্যাসিস্ট্যান্ট ঘনঘন কল করছে। কী খেল দেখাতে চাইছে কে জানে! বলছে, হি ওয়ান্টস টক উইদ ইউ।’
আদিল নির্বিকার মুখে বলে, ‘হি?’
‘আইনমন্ত্রী আব্দুল মান্নান। কী করব এটাকে?’
শান্তর প্রশ্নে আদিল তুক্ষুনি জবাব দেয় না। তাকিয়ে রয় নামতে থাকা রোযার দিকে। হৃদিকে কোলে নিয়ে নামার জন্য সিঁড়িতে পা রেখেছে। খোঁপা করে রাখা চুলগুলো ছুটে পিঠে ছড়িয়ে পড়েছে। যখুনি এদিকে চাইছে, কপালে চারপাঁচেক ভাঁজ পড়ছে। চোখমুখ কুঁচকে ফেলছে। আদিল উঠে দাঁড়াল চেয়ার ছেড়ে। বড়ো বড়ো কদমে চোখের পলকে সিঁড়ি বেয়ে এসে দাঁড়াল রোযার সামনে। হতবিহ্বল রোযার থেকে কোলে নিলো হৃদিকে। হৃদির উচ্ছ্বাস বাড়ে এতে –
‘ড্যাড! উই উইল ইট টুগেদার।’
আদিল সিঁড়ি বেয়ে নামতে নামতে জবাব দেয়, ‘হুম।’
মেয়েকে কোলে নিয়েই ডায়িংয় গিয়ে বসল আদিল। তার চেয়ারের পেছনেই শান্ত। হাতে ভীষণ সুন্দর একটা ইনভাইটেশন কার্ড। আদিল অদূরের স্থির দাঁড়িয়ে থাকা রোযার দিকে চেয়েই তখনকার শান্তর প্রশ্নের জবাবে বলল –
‘কখন করছে প্রোগ্রাম?’
‘রাত দশটা ত্রিশ থেকে।’
রোযাকে ওমন একই ভাবে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে হৃদি অধৈর্য হয়ে চ্যাঁচাল –
‘মম, আসো।’
রোযার সত্য বলতে আর একটা কদম বাড়াতে ইচ্ছে করছিলো না। ওই লোকটার আশেপাশেও ও যেতে চায় না। গতকালের ভয় ওর মস্তিষ্ক স্পষ্ট মনে রেখেছে। মনে পড়লেই রাগ বাড়ছে তড়তড় করে। একটা মানুষ কী নির্লজ্জ হতে পারে! আবার অন্যদিকে হৃদির ওমন আগ্রহী দৃষ্টিও ও অবহেলা করতে পারছে না। অনিচ্ছুক হওয়া সত্ত্বেও কদম বাড়াল অবশেষে। বসতে চাইল কিছুটা দূরে। তখুনি হৃদি পাশের চেয়ার দেখিয়ে বলল –
‘মম, এখানে বসো।’
রোযা দম নিয়ে এগিয়ে গিয়ে বসল। আদিলের পাশের চেয়ারেই। স্বাভাবিক থাকার চেষ্টা করল। অগ্রাহ্য করতে চাইল পাশের দাম্ভিক শরীরটা। তবে কীভাবে অগ্রাহ্য করবে? হৃদি বাবার কোলে বসে রোযাকেই টানছে, রোযাকেই দেখছে। আদিল খেতে খেতে আলাপ চালিয়ে গেলো শান্ত, এলেনের সাথে। কী সম্পর্কে কথা বলছে রোযা জানে না। ও অনেক দিন পর ধ্রুবকে দেখতে পেলো। হৃদির বডিগার্ড। ওইতো মাথা নুইয়ে দাঁড়িয়ে আছে দরজার মাথায়। রোযা একফাঁকে বলল –
‘আমি বেরুতে চাচ্ছিলাম।’
আদিলের কথা থামল। তাকাল রোযার মুখের দিকে।
‘কেনো? কী দরকার?’
রোযা জেদি চোখে তাকাল। কী দরকার মানে? ও কি নিজের ইচ্ছেতে বেরুতে পারবে না? বন্দী থাকবে সবসময়? মুহূর্তে চোখমুখ কালো করে বলল –
‘আমার প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র আনতে বাড়ি যেতে হবে।’
আদিলের খাওয়া শেষ। নেপকিন দিয়ে মুখ মুছে তাকাল মেয়ের দিকে। হৃদি কোল থেকে নামতে চাইছে। ওকে নামিয়ে উঠে দাঁড়াল আদিল। শান্তর হাত থেকে ধূসর রঙা কোট নিয়ে পরতে পরতে বলল –
‘দরকার নেই। দুপুর দিকে শপের ম্যানেজার আসবে শপিং বুকলেট নিয়ে। যা যা প্রয়োজন, অর্ডার দেম। ডেলিভারি করে যাবে বিকেলের মধ্যে।’
রোযা অসন্তুষ্ট হলো। পুনরায় দৃঢ় গলায় জানাল, ‘আমার গুরুত্বপূর্ণ জিনিসপত্র আনার আছে।’
আদিল কিছুক্ষণ চেয়ে থাকল জেদি জেদি মুখখানির দিকে। অবশেষে বলল, ‘আধঘণ্টা…এর ভেতর ব্যাক করা চাই। গাড়ি…’
বাকি কথা শুনল না রোযা। ভোঁতা মুখে ত্যাড়ামি করে গেলো –
‘আমি রিকশা নিয়ে একাই যেতে পারব।’
থমথমে এক নীরবতা বইল। অনেকটা সময় আর একটা শব্দ হলো না। শান্তর ঘাম ছুটে গেছে প্রায়। আদিল মির্জার মুখে মুখে এতো কথা বলার স্পর্ধা কখনো কারও হয়েছে? হয়নি। এলেন আড়চোখে তাকাল বসের মুখের দিকে। আদিল শুধুই তাকিয়ে আছে। রোযাও ওমন নীরবতায় মিইয়ে গিয়েছে। বেশি বলে ফেলেছে কী? আদিল অনেকটা সময় নিয়ে অবশেষে ডাকল –
‘শান্ত!’
শান্ত দ্রুতো দু-কদম এগিয়ে এসে বলে, ‘জি বস।’
আদিল থমথমে গলায় আদেশ ছোড়ে –
‘একটা রিকশা কিনে নিয়ে আয়। ওটা চালিয়ে ম্যাডাম যেখানে যেতে চায় নিয়ে যা। কাজ শেষ হলে ফিরিয়ে নিয়ে আসবি।’
রোযার চোয়াল ঝুলে আসে। শান্ত ভীষণ উচ্ছ্বাস নিয়ে বলে –
‘ইয়েস বস।’
তখুনি দ্রুতো কদমে বেরিয়ে গেলো। যেন আসলেই রিকশা কিনে নিয়ে আসবে। রোযা আশ্চর্য, হতবাক। মুখটা হা হয়ে আছে। ওর থতমত মুখের দিকে আদিল আর তাকায় না। ব্যস্ত কদমে বেরিয়ে যাচ্ছে। পিছনে ছুটেছে এলেন। দুয়ারে ক্লান্তর পাশাপাশি ধ্রুবও আছে আজ।
.
ঘণ্টাখানেকের মধ্যে মির্জা বাড়ির ড্রাইভওয়ে পিষে একটা ব্রান্ড নিউ রিকশা চালিয়ে প্রবেশ করেছে শান্ত। একদম দেশি রিকশা। হলদে রঙের। কালারফুল সব প্লাস্টিকের ফুলটুল ঝুলছে। শান্ত রিকশাটা বাড়ির সামনে এনে থামাল। চোখমুখ উজ্জ্বল ওর। রোযা তখুনি বেরিয়ে এসেছে হৃদিকে নিয়ে। হৃদির স্কুলের মিটিং সেরে এরপর বাড়ির উদ্দেশ্যে যাবে ভেবেছিল। শান্ত তখন প্যান্টের ওপরে একটা নতুন লুঙ্গি পরেছে। তার পুরো লুকটা এমন —চোখে সানগ্লাস, পেটানো শরীরে স্যুট আর নিচে শুভ্ররঙা লুঙ্গি। ও সুন্দরভাবে উঠে বসেছে ফের। রোযা এসে রিকশায় উঠে বসলেই টান দিয়ে বেরিয়ে যাবে এমন ভঙ্গি। অপেক্ষা করতে করতে কিলিং কিলিং শব্দ তুলছে রিকশায়। রোযা হতভম্ব হয়ে দেখল ওই দৃশ্য। কিছুক্ষণ ও একটা শব্দও করতে পারল না। রাগে-রাগে-দুঃখে ওর কান্নাই পেলো! সবগুলো একই গোয়ালের গোরু। তার জীবন জাহান্নাম করতে শপথ নিয়েছেন যেন। চোখ রাঙিয়ে হনহনিয়ে গিয়ে উঠে বসল গাড়িতেই। ওই রিকশা আর রিকশাওয়ালা নিয়ে বেরুলে মানুষ তাদের পাগল ছাড়া আর কিছু বলবে না!
শান্ত বোধহয় কিছুটা নিরাশ হলো। বেচারা আড়চোখে গাড়ির দিকে চেয়ে নেমে এসে একটানে খুলল লুঙ্গিটা। দীর্ঘশ্বাস ফেলে লুঙ্গিটা স্বপণের হাতে ধরিয়ে বলল –
‘রিকশাটা বেঁচে দিস না। থাকুক আজকের জন্য। ফিরে এটা চালাব। দেখি চারটা খ্যাপ মেরে কয়েকটা পয়সা কামানো যায় কি-না।’
চলবে ~~
® নাবিলা ইষ্ক।
Share On:
TAGS: আদিল মির্জাস বিলাভড, নাবিলা ইস্ক
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
আদিল মির্জাস বিলাভড পর্ব ১৩
-
আদিল মির্জাস বিলাভড পর্ব ৮
-
আদিল মির্জাস বিলাভড গল্পের লিংক
-
আদিল মির্জা’স বিলাভড পর্ব ২৪
-
আদিল মির্জাস বিলাভড পর্ব ১০
-
আদিল মির্জাস বিলাভড পর্ব ৯
-
আদিল মির্জাস বিলাভড পর্ব ১৯
-
আদিল মির্জাস বিলাভড পর্ব ১৮
-
আদিল মির্জাস বিলাভড পর্ব ৫
-
আদিল মির্জাস বিলাভড পর্ব ২১