Golpo romantic golpo আদিল মির্জাস বিলাভড

আদিল মির্জাস বিলাভড পর্ব ১৫


আদিল মির্জাস বিলাভড

— ১৫

জিহাদের হঠাৎ এমন আচরণ মোটেও স্বাভাবিক লাগেনি রোযার কাছে। কয়েকটি বছরের পরিচয় তাদের। কিছু একটা ঘাপলা আছে বুঝতে অসুবিধে হচ্ছে না। সেদিনই তো বলল, গ্রাম থেকে ওর বাবা-মা ফিরলে তারপর বিয়ের আলাপ হবে। এখন আবার হঠাৎ করেই সুর পাল্টাবে কেনো? কেনো বলবে, ওর বাবা-মা ছাড়াই বিয়েটা এখুনি সেরে ফেললে ভালো হয়? রোযার ব্যাকুল ভাবে বিয়েটা করার পরিষ্কার কারণ আছে। কিন্তু জিহাদের কারণ কী? ও কেনো এমন সন্দেহজনক আচরণ করবে? উদ্ভট নয় বিষয়টা? বরাবরই জিহাদ নিজের বাবা-মায়ের বাধ্য ছেলে। বিশেষ করে ওর মায়ের! একটামাত্র সন্তান তো। খুব আদরের। সেই ছেলে হঠাৎ কেনো বাবা-মা ব্যতীত বিয়ে করতে চাইবে? রোযার মাথায় ভেতরে সন্দেহের পোকামাকড় কিলবিল করছে। এমনিতেও সে স্বভাবগত সন্দেহবাতিক মানুষ। ছোটো ছোটো বিষয়কে তিল থেকে তাল বানানোর মতো ঘটনাও সে ঘটিয়েছে। আপাতত ভীষণ অশান্তিতে দমবন্ধ হয়ে আসছে। বুকের ভেতর ধড়ফড় করছে। ঘাড়টা বামদিকে ঘুরিয়ে সময়টা দেখে নিলো। রাতের দুটো ছাব্বিশ। আগামীকাল হৃদির জন্য ভীষণ গুরুত্বপূর্ণ দিন। বাচ্চাটা তার আশা করে থাকবে। জন্মদিনে যে তাকে যেতেই হবে। নাহলে আজ ভোরেই সে রওনা হতো জিহাদের বাসার উদ্দেশ্যে। নিজে গিয়ে যাচাই-বাছাই করতো। আয়াত তালুকদার রোযার থেকে কিছু লুকোচুরি করে পার পাবে ভেবেছে? অসম্ভব! আজকের দিন সহ আগামীকাল যাক শুধু! সে হাত ধুয়ে নামবে। প্রয়োজনে জিহাদের গ্রামে যাবে। রোযা শুধু মনেপ্রাণে আশা করছে, প্রার্থনা করছে —তার সন্দেহের বিন্দুমাত্র স্পর্শই যেন জিহাদের ভেতর না থাকে। সে খুব করে চায়, তাদের বিয়েটা হোক। সুন্দর একটা সংসার হোক। জিহাদের স্বপ্নের সাথে যে তারও অনেক স্বম্ন জড়িত। রাতভর আলোচনা করা তাদের ভবিষ্যত কল্পনা, তাদের স্বপ্নগুলো — আকাঙ্খা গুলো মিথ্যে না হোক।

ফোনটা বাজছে। রোযা তাকাল পাশে। ফোনটা লাল রঙের বালিশটার পাশে। স্ক্রিনে ভাসছে জিহাদের নাম্বার। অনবরত কল করে যাচ্ছে। ভীষণ মরিয়া লাগছে ওকে। কেনো? এতে যে তার সন্দেহের মাত্রা ঘূর্ণিঝড়ের রূপান্তরিত হচ্ছে। ও কি বুঝতে পারছে না? চেনে না রোযাকে? জানে না সে অল্পতেই সন্দেহের জালে ফেঁসে যায়? এতোগুলো কলের একটা কলও রোযা ধরল না। তাকাল জানালার দিকে। স্লাইড করা কাচটা। পর্দা সরানো। মৃদু বাতাস প্রবেশ করছে। চাঁদটা দেখা যাচ্ছে। অর্ধখণ্ডিত চাঁদের চারিপাশে জ্বলজ্বল তারাদের সমাবেশ।

চোখ বুজে, দীর্ঘশ্বাস ফেলে রোযা। ফোনটা বন্ধ করে রাখে। মাথাটা এলিয়ে দেয় নরম বালিশে। আগামীকালের জন্য ভালোভাবে যত্ন নেয়া চুলগুলো মৃদু ভেজা, ছাড়া। ব্রাউন রঙের চুলগুলো ছড়িয়ে পড়ে লাল বেডশিটে। মাথার ওপরের কালো রঙের ফ্যানটা ঘুরছে। দৃষ্টি গিয়ে থাকে তার সাইড টেবিলে। হৃদির সাথে তার ছবিটা ভীষণ আগের। পরিবর্তন করে নতুন একটা লাগানো দরকার। ভাবতে ভাবতে ক্লান্ত চোখদুটো বুজতেই চোখে ভাসে হৃদির মুখখানি। সেদিন ফেরার পথে মেয়েটা আধঘুমন্ত অবস্থাতেও তাকে গম্ভীর কণ্ঠে বারবার করে বলছিল –

‘আমি অপেক্ষায় থাকব, স্নো-হোয়াইট। ডোন্ট বি লেইট। খবরদার!’

রোযা হেসে ফেলে ওর ওমন বাচ্চা বাচ্চা কণ্ঠের গাম্ভীর্যতায়। প্রশ্ন করেছিল মিহি কণ্ঠে –

‘লেইট হলে কী করবে তুমি?’

হৃদি আরও গম্ভীর হয়ে বলেছিল, ‘মাই ড্যাড হ্যাজ আ গান।’

তখন প্রায় রোযার চোয়াল ঝুলে এসেছিল। আশ্চর্যের শিখরে পৌঁছে আতঙ্কে প্রশ্ন করেছিল –

‘তুমি আমাকে শ্যুট করতে চাও?’

হৃদি ঘুমের সাগরে তলিয়ে যেতে নিয়ে আওড়াল, ‘ড্যাডকে বলব স্নো-হোয়াইটকে গান দেখিয়ে ধরে আনতে। ভয় পেয়ে আর যেতেই চাইবে না আমাকে ছেড়ে।’

রোযা ফিক করে হেসে উঠল বাচ্চাবাচ্চা কণ্ঠের কথাগুলো মনে করে। পরমুহূর্তেই বিরক্তও হলো। র’ক্তের কতো শক্তি তাই না? যেমন বাপ, তেমনি মেয়ে! ওতটুকু বয়সে এও বুঝে ফেলেছে। বাবা-মেয়ে দুটোই বিপজ্জনক।

.

সাতসকাল বেলার স্নিগ্ধ নীরবতা ভাঙল নিপা বেগমের অভিযোগের স্বরে –

‘না খেতে খেতেই ওমন কাঠির মতো বানিয়েছে শরীরটা। ফু দিলেই মনে হয় উড়ে যাবে। খাওয়াদাওয়ার কোনো শৃংখলা নেই। বাজে কয়টা? এখনো ঘুমোচ্ছে। খেয়ে তারপর নাহয় ঘুমা, তা-না!’

রাজু খাচ্ছে। পরোটা গোরুর ঝোলে ডুবিয়ে মুখে পুরতে নিয়ে, মাথা না তুলেই বলে –

‘চিকন না মা, ওটা জিরো ফিগার। ডায়েট মেইনটেইন করে বানাতে হয়।’

তেলেবেগুনে জ্বলে ওঠেন নিপা বেগম। হাতের কাছেই থাকায় ছেলের মাথায় শক্ত করে থাবড়া বসালেন। রাজু আঁতকে ওঠে মাথাটা সরিয়ে পুনরায় খাওয়ায় মন বসালো। আজ তার মন ভালো। ভীষণ খুশি সে। মায়ের মা’রধরও আজ অমৃত লাগছে। নিপা বেগম চেঁচিয়ে যাচ্ছেন –

‘অসভ্যের ঘরে অসভ্য। ওসব কী কথা? জিরো ফিগারের তুই কী বুঝিস রে!’

রাজু চোখ তুলে তাকাল বেকুবের মতো, ‘মা! এটা টুয়েন্টি টুয়েন্টি ফাইভ! আর আমি বাচ্চা না। এটা বুঝব না? তোমার মেয়ের ডায়েট চার্টের ওপরেই বড়ো করে লেখা, আ জার্নি টু হ্যাভ আ জিরো ফিগার।’

রাজু বাম হাতের আঙুল দিয়ে জিরো বানিয়েও দেখাল। নিপা বেগম পুনরায় হাত তুলতেই প্লেট নিয়ে ঝড়ের বেগে সরে এলো বেচারা। আজিজুল সাহেব হাসছেন। শব্দ করেই। এতে নিপা বেগম আরও খেপলেন। কিছুক্ষণ গলা উঁচিয়ে চেঁচামেচি করে স্বামীকেও দু-চারটে কথা শুনিয়ে তবেই শান্ত হলেন। রাজু ততক্ষণে খেয়ে উঠেছে। ছেলের ওমন হাসিখুশি মুখ, চঞ্চলতা নিপা বেগমের চোখে পড়ল। রান্নাঘর থেকে কিছুক্ষণ লক্ষ্য করে এবার জিজ্ঞেস করে বসলেন –

‘এই ছেলে! হলোটা কী? এমন করছিস কেনো?’

রাজুর সুন্দর মুখে হাসি ধরছে না। ভীষণ উত্তেজনা নিয়ে বলল, ‘আপুর মুখ থেকে শুধু শুনেছি, ফোনে দেখেছি কিন্তু সচক্ষে এই প্রথম মির্জা বাড়ি দেখব। আদিল মির্জাকে দেখব, হৃদিকে দেখব।’

মুহূর্তে বিচলিত হলেন নিপা বেগম। চোখমুখ চিন্তা নিয়ে তাকালেন সোফায় বসা স্বামীর চোখমুখে। আজিজুল সাহেবও চিন্তায় পড়লেন। আদিল মির্জা তো সাধারণ কেউ নন। সাধারণ বাড়িও নয় ওটা। তাদের যাওয়াটা কী ঠিক হবে? কোনো ঝামেলায় পড়বেন না তো? আজিজুল সাহেব স্ত্রীকে আশ্বস্ত করলেন –

‘চিন্তা করো না। রোযা যেহেতু যেতে বলছে, সমস্যা হওয়ার কথা না।’


‘আদিল মির্জা স্পিকিং!’

ফোনের ওপাশে নীরবতা বয়ে যাচ্ছে। আদিল নির্বিকার মুখে কান থেকে ফোন সরাতে নিতেই ওপাশ থেকে মেয়েলি ভাসাভাসা কণ্ঠের নরম ডাক পড়ল –

‘আদিল!’

আদিলের মুখের পরিবর্তন হয় না। পলক পড়ে না। একই ভঙ্গিতে ফোনটা ফের কানে ধরে। তবে প্রয়োজনবোধ করে না জবাব দেবার। নীরবে অপেক্ষা করে অপরপক্ষের প্রয়োজনীয় কথাটুকু শোনার।

‘আজ আমিরার বার্থডে।’

প্রত্যুত্তরে এবারেও নীরব আদিল। ওপাশে দীর্ঘশ্বাস ফেলার ধ্বনি শোনা গেলো। ভেসে এলো ডুকরে ওঠা স্বর –

‘আই মিস মাই চাইল্ড, আদিল। একটু কথা বলতে দাও প্লিজ?’

আদিল তাকাল ডেস্কের ওপরে থাকা সংবাদপত্রের ওপর। ফ্রন্ট পেইজে বড়ো করে একজন দম্পতির ছবহেডলাইন দেয়া,

‘পরপারে পাড়ি জমালেন অর্থমন্ত্রী আব্দুস সোবহান চৌধুরী। ভেঙে পড়েছেন তার পরিবার।’

ছবিতে একজন বৃদ্ধা। যার বয়স কমসে কম সত্তর। পাশের রূপবতী নারী মনে হচ্ছে যৌবনে আছেন এখনো। নারীর পাশে ছোটো করে লেখা, ঋণা সদাগর। আদিল দৃষ্টি ফিরিয়ে আনল। তাকাল সামনে। সে দাঁড়িয়ে আছে অফিসরুমের পশ্চিমের কাচের দেয়ালের সামনে। নিচে আয়োজনের প্রস্তুতি চলছে। বডিগার্ডসদের ছড়াছড়ি পুরোটা এড়িয়া জুড়ে। পার্কিং এড়িয়াটা বাড়ানো হচ্ছে।
সিসিটিভি ক্যামেরা গুলো পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। ম্যানেজমেন্টের লোকদের চোখের সামনে রেখে কাজ করানো হচ্ছে। আদিল ওদিকে চেয়েই ধীরেসুস্থে শান্তভাবে আওড়াল –

‘ফোকাস ওন ইইর ডেড হাজবেন্ড, মিসেস সোবহান। আমিরার মা নেই —ডিড ইউ ফরগেট? ডোন্ট ক্রস ইউর লিমিটস অ্যান্ড মাই পেসেন্স।’

ওপাশ থেকে আর একটি শব্দও শোনার প্রয়োজনবোধ করল না আদিল। কল কেটে ফোনটা ছুঁড়ে ফেলল সোফায়। মৃদু শব্দ হলো। ঘড়ির কাঁটা ঘুরছে দুটো বিয়াল্লিশে। অক্টোবরের এই সময়টায় সূর্যের তাপ থাকে নরম। আজও ব্যতিক্রম নয়। সোনালী রোদ্দুর এসে পড়েছে আদিলের গম্ভীরমুখে। ধূসর রঙা চোখজোড়া জ্বলজ্বল করছে। মনে হচ্ছে, মণি দিয়ে আগুন বেরুচ্ছে। আদিলের পেছনেই দাঁড়িয়ে ছিলো শান্ত আর এলেন। শান্তর চোখমুখ গম্ভীর হয়ে আছে। ভ্রুয়ের মাঝে চার-পাঁচেক ভাঁজ ফেলে বলেই বসল –

‘বুড়োটা ম রতে দেরি, আর তার রং পাল্টাতে দেরি হয়নি। শেইমলেস!’

এলেন ভড়কাল, ভয় পেলো। চকিতে শান্তর হাতে চিমটি কাটল। তাকাল আদিলের চওড়া পিঠে। আদিল ফিরে তাকাল না। অনেকটা সময় পরে আদেশ ছুঁ’ড়ল দাঁতে দাঁত পিষে –

‘সিকিউরিটি টাইট কর। গেস্ট লিস্টের বাইরে কাউকে এলাউ করা হবে না। নট ইভেন আ সিঙ্গেল ফ্লাই।’

এলেন আর শান্ত শক্ত গলায় বলল, ‘ইয়েস বস।’

শান্ত একটু ভাবল। বলল, ‘বস, প্রিন্সেসের পাশে সিকিউরিটি বাড়াব? আর মিস রোয….’

শান্তর কথার মধ্যে আদিল ভারী, থমথমে গলায় বলল, ‘সেন্ড সামওয়ান আফটার রোযা।’

এলেন তৎক্ষণাৎ বুঝল না তাদের বস কাকে মিন করেছে। শুধু নামের সম্বোধন শুনে অজানা লাগল। শান্তর চোয়াল ঝুলে আসার পাশাপাশি গলার স্বর নেমে এলো, ‘কে রোযা? ওহ… ওহোও, মিস রোযাই তো, তাই না বস?’

এলেন ঠোঁট কামড়ে ধরল। আদিল ফিরে তাকাতেই শান্ত সৈনিকের মতো সোজা হয়ে স্যালুট ঠুকে বলল –

‘কাউকে পাঠাই তবে। আফটার রোযা। নট মিস রোযা। জাস্ট রোযা।’

আদিল গম্ভীরমুখে দু কদম এগিয়ে আসতেই দ্রুতো বেরিয়ে গেল শান্ত। এলেনও ভদ্র ভাবে শান্তর পেছন পেছন বেরিয়ে গেল দরজাটা শব্দহীন ভাবে লাগিয়ে। আদিল ডান হাতের আঙুলের সাহায্যে কপাল মালিশ করল। ধরাল একটা সিগারেট। গিয়ে বসল ডেস্কের চেয়ারে। ড্রয়ারে একটা ছবি উল্টে রাখা। গা চেয়ারে এলিয়ে দিয়ে অন্যহাতে ছবিটি হাতে তুলে নিলো। ছবিটি রোযার। ড্রাইভ করছে। চোখে ভাসল রোযার ড্রাইভিং করা অঙ্গভঙ্গি। আশ্চর্যজনক ভাবেই গতকাল আদিল ফলো করেছিল রোযার গাড়িটা। তার কোনো ইন্টেনশন ছিলো না। হঠাৎ সামনে পড়েছে। লাল রঙের গাড়িতে সানগ্লাস চোখে দিয়ে ড্রাইভ করতে থাকা রোযাকে অন্যরকম লাগছিল। মির্জা বাড়িতে দৃষ্টি নুইয়ে চলা রোযা থেকে ভিন্ন। হৃদিকে বাঁচানোর সময় যেই তেজস্বিনী রূপ দেখিয়েছিল, ওটাই বিদ্যমান থাকে যখন ড্রাইভ করে। আকর্ষণীয় লাগছিল। আর সবসময় এমন ডলডআপ হয়ে থাকে কেনো? যেন মির্জা বাড়ির বাইরেটা র‍্যাম্পওয়াক। আদিল বিড়বিড় করে –

‘ড্যাম্নইট।’

.

সুবর্ণা ইসলাম একজন গুণী মেকআপ আর্টিস্ট। সচরাচর জনপ্রিয় মডেলদের কাজ করে থাকেন। তবে এবার ভিন্ন ক্লাইন্ট নিয়েছেন। শিল্পপতি আদিল মির্জার একমাত্র সন্তানের আজ জন্মদিন। তাকেই চমৎকার ভাবে তৈরি করা সুবর্ণার কাজ। সে নিজের টিম নিয়ে পৌঁছেছে মাত্রই। কড়া সুরক্ষার একেকটি ধাপ পেরুতে পেরুতেই যেন বেলা শেষের পথে। হাত ঘড়িতে বেলা চারটা। তার হাতে দু-ঘণ্টা সময় আছে। গাড়ি থেকে নামতেই দেখল সামনে লম্বাচওড়া, গম্ভীরমুখের শান্তকে।

শান্তর কানে ব্লুটুথ। ব্লুটুথে কাকে যেন কিছু একটা হুকুম করে এগিয়ে এলো মেকআপ আর্টিস্টকে আপ্যায়ন করতে। হাত বাড়িয়ে স্বাগতমের ইশারা করল। সুবর্ণা লোকজন নিয়ে প্রবেশ করলেন অট্টালিকার মতো বাড়ির ভেতর। জন্মদিনের জন্য বিশেষ ভাবে সাজানো হচ্ছে পুরো নিচের ফ্লোর। সোফা, ডাইনিং সব সরানো হয়েছে। সিঁড়ি ধরে ফ্লোর পর্যন্ত লাল কারপেট বেছানো হয়েছে। সিঁড়ির হাতলে ফুলের সমাহার। মাথার ওপরের ঝাড়বাতিটা সু-বিশাল। বাড়ির ভেতরে তখনো কাজ চলছে ব্যস্ত গতিতে। সুবর্ণা নিজের এতটুকু জীবনে অনেক বড়লোকি কাণ্ডকারখানা দেখেও এতে আশ্চর্য, বিমোহিত হোন। বাইরে থেকে মুগ্ধ চোখে দেখতে দেখতেই এসেছেন যে।

শান্ত তাদের নিয়ে আসে সোজা দোতলায়। হৃদির রুমে। হৃদির হাতে তার সমান লম্বা একটা ব্যাঙ পুতুল। ওটা ধরে পা ঝুলিয়ে বসে আছে সোফায়। মরিয়ম বেগমকে কিছুক্ষণ পরপর প্রশ্ন করছে রোযার সম্পর্কে। এসেছে কি-না! অসহায় মরিয়ম বেগম বলে যাচ্ছেন –

‘আসলে তো সর্বপ্রথম এখানেই আসবে।’

এতে মেয়েটা গাল ফুলোয়। অসন্তুষ্ট হয়। বিড়বিড়িয়ে বলে, ‘এখনো কেনো আসছে না?’

সুবর্ণা প্রবেশ করেই দেখেন পুতুলের মতো দেখতে একটা বাচ্চাকে। দু-গাল ফুলিয়ে অনবরত কথা বলছে। শান্ত এসে মিষ্টি করে বলে –

‘প্রিন্সেস, ইউ হ্যাভ টু গেট রেডি। ইনি হচ্ছেন, আপনার মেকআপ আর্টিস্ট।’

ওদিকে ধ্যান দিলো না হৃদি। দু-চোখ ভরতি আশা নিয়ে দ্রুতো প্রশ্ন করল –

‘বডিগার্ড আংকেল, স্নো-হোয়াইট কোথায়? আপনি কি তাকে বলেননি দ্রুতো আসতে?’

শান্ত বোঝানোর চেষ্টা করল, ‘আজ মিসেস রোযার পরিবারও আসবে। তাদের নিয়ে পৌঁছাতে তো একটু দেরি হবে তাই না? ইতোমধ্যে গাড়ি পাঠানো হয়েছে। আপনি তৈরি হয়ে দেখবেন সে চলে এসেছে।’

এতে হৃদি সন্তুষ্ট হলো। উঠে গিয়ে বসল ড্রেসিংটেবিলের সামনে। বাচ্চা বাচ্চা চেহারাটা প্রত্যাশায় জ্বলজ্বল করছে। শান্ত সুবর্ণা সহ তার টিমকে কিছু নির্দেশনা দিয়ে তবেই বেরিয়ে এলো। দরজার সামনে রেখে গেল ক্লান্তকে। আপাতত ও গার্ড করবে এখানটা। শান্ত গার্ডেনে এসে খোঁজ করল এলেনের। এলেন তখন ইতোমধ্যে বেরিয়েছে আদিলের আদেশে। কীসের জন্য? শান্ত জানে না। সে ব্যস্ত হলো কল দিতে।

———

‘এখনো বসে আছিস যে? এতো কী ভাবছিস মা? কোনো সমস্যা হয়েছে?’

নিপা বেগম ভীষণ চিন্তিত হয়ে আছেন। সারাদিন মেয়েটা কেমন ভাবনায় বিভোর। কী হয়েছে, বলছেও না! খাওয়াদাওয়ার ঠিকঠাকানা নেই। আজকের পার্টিতে পরে যাওয়ার সবকিছু বিছানার ওপর সাজিয়ে রাখা। অথচ তৈরি না হয়ে মেয়েটা বসেই আছে শূন্যে চেয়ে।

‘না বললে কীভাবে জানব, বলতো?’

রোযা অসহায় হয়ে ফিরে তাকাল। দুর্বল হেসে বলল, ‘কী হবে, মা? মন খারাপ হতে পারে না?’

‘কারণ তো থাকবে তাই না? কারণ বল।’

রোযা ভালোভাবে দেখল জামদানি পরে তৈরি হওয়া নিপা বেগমকে। চট করে উঠে এসে চুমু খেলো গালে। মুগ্ধ হয়ে বলল –

‘বাহ, মিসেস তালুকদারকে তো আ’গুন লাগছে। মাশাআল্লাহ, মাশাআল্লাহ কারো নজর না লাগুক।’

বলতে বলতে মিছিমিছি চোখ থেকে কাজল নিয়ে নিপা বেগমের নাকের পেছনে ছোঁয়াল। বাচ্চাদের মতো খিলখিল করে হাসছেন নিপা বেগম। মেয়ের কাঁধে লজ্জিত ভঙ্গিতে ঠেলে বেরিয়ে যেতে উতলা হলেন –

‘শুধু মস্করা। তাড়াতাড়ি তৈরি হতে শুরু কর। বেলা ছোটো। সূর্য ডুবছে। কয়টা বাজে দেখেছিস?’

রোযা অন্যমনস্ক ভঙ্গিতে তাকাল। ছয়টা ইতোমধ্যে। সত্যি বলতে রোয়ার যেতে ইচ্ছে হচ্ছে না। আদিল মির্জার জন্য! ওই লোক কেনো পাঠাবে গার্ডস, গাড়ি? কেনো জোরপূর্বক গার্ডস দাঁড়িয়ে থাকবে বাড়ির বাইরে? মনে হচ্ছে তাকে ধরেবেঁধে নেয়া হচ্ছে। এখানে স্বাধীনতা কোথায়? হৃদির জন্য তাকে দেরি করে হলেও যেতে হচ্ছে। নাহলে রোযাকে গার্ডস কেনো, নিজে হুকুম করেও নেয়াতে পারতো না। বরাবরই সে নিজের ওপর চাপিয়ে দেয়া স্বীদ্ধান্ত অথবা জোরজবরদস্তি সহ্য করে না। উল্টো জেদি হয়, ত্যাড়া হয়। এইজন্য নিপা বেগম, আজিজুল সাহেবও মেয়েকে প্রশ্রয় দিয়ে এসেছেন। মতামতের কদর করেছেন।

‘আপু, কেমন লাগছে আ—’

রাজুর কথা বন্ধ হলো। ফ্যালফ্যাল করে দেখল বড়ো বোনকে। রোযা তখন ড্রেসিং টেবিলের সামনে বসে নিজের লম্বা ব্রাউন রঙের চুলগুলো কার্ল করছিল নিচের দিক দিয়ে। লাল রঙের জর্জেট শাড়িটা, শাড়ির ব্লাউজ পিস দিয়ে বানানো ব্যাকলেস ব্লাউজ দিয়েই পরেছে। লাইট মেক-আপ করা। এখনো লিপস্টিপ দেয়নি। রাজু জানে, ছোটো বেলা থেকেই দেখছে তার বোন অত্যন্ত সুন্দর। গায়ের রংটা দুধের মতো। আর আজ তো!

‘আপু, তোমাকে ভীষণ বাজে দেখাচ্ছে! ইশ!’

রোযা হেসে ফেলল। দেখল রাজু তৈরি হয়ে এসে দাঁড়িয়েছে দরজার সামনে। কালো শার্ট ইন করে পরেছে। শার্টের ওপর ভেস্ট। ভেস্টের ওপর কোট। হ্যান্ডসাম লাগছে বেশ। নিজের কাজে ফের ব্যস্ত হয়ে বলল –

‘তাই? তোকেও বাজে দেখাচ্ছে। ওইযে মা বানরটা আছে না? সেবার এলো বাড়ির সামনে? চুলের উকুন টুকাতো? ওটার মতো লাগছে।’

রাজু মুখ ভেঙাল। বেশ চমৎকার ভাবে একসাইডে চুল ভাঁজ করার ভঙ্গিমা করে আত্মবিশ্বাস নিয়ে বলল –

‘আমাকে সুদর্শন লাগছে। মেয়েদের হার্টবিট বাড়ানোর মতো।’

হাতের চিরুনিটা ছুঁড়ে মা’রতেই রাজু সরে গেল হাসতে হাসতে। ওদিকে বাইরে থেকে গার্ডস তাড়া দিচ্ছে একটু পরপর। পারছে না ঘরে প্রবেশ করে তাদের তুলে নিয়ে যেতে। এতেই রোযার রাগ, জেদ বেড়েছে। সে ইচ্ছে করে আরও দেরি করছে। কোন সাহসে এতো জোরপূর্বক আচরণ দেখাবে!

হঠাৎ শোরগোল শুনে রোযা উঠে এসে দাঁড়াল দরজার সামনে। ইতোমধ্যে সাতটা বাজছে। তাদের সদরদরজার সামনে এলেন এসে দাঁড়িয়েছে। ভীষণ বিনয়ের সাথে বলল –

‘মিস রোযা, আপনাকে এখুনি সাথে আসতে হবে।’

রোযা রাগ হবে এরপূর্বেই এলেন ফের বলল, ‘প্রিন্সেস আপনাকেই বারবার খুঁজছেন।’

রোযা শান্ত হলো। বড়ো করে শ্বাস টেনে নিলো। হৃদির জন্য অন্তত তাকে হজম করতে হবে। সে ইতোমধ্যে তৈরি। রুমে ঢুকে জাস্ট লিপগ্লস্টা দিলো লিপস্টিকের ওপর। কালো, লালের মিশেলের ক্লাচটা নিলো ফোনের পাশাপাশি। জুতোজোড়া পরে বেরিয়ে এলো। আজিজুল সাহেব, নিপা বেগম, রাজু গাড়িতে উঠে বসেছে। এলেন আগ্রহের সাথে মেলে ধরেছে গাড়ির দরজা। তখন অবচেতনে একবার চোখ তুলে তাকালেও, দ্বিতীয়বার থেকে আর একবারও চোখ তুলে তাকায়নি। মাথা নত রেখেছে। রোযার এই বিষয় গুলো ভীষণ ভালো লাগে।

গাড়িতে উঠে বসতে দেরি, চলতে নয়। হাওয়ার বেগে ড্রাইভার ড্রাইভ করছে। করবে না? জেদের বশে সে আসলেই দেরি করেছে। হৃদি নিশ্চয়ই রাগ করবে? কিন্তু ও তো বাচ্চা মানুষ। বোঝে কম। রোযা বাইরের মানুষ দিনশেষে। এতোটা ঘনিষ্ঠতা এমন দিনেও কি মানায়?


চলবে ~~
® #নাবিলা_ইষ্ক।

Share On:

TAGS: ,



CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
Related Posts
 

0 Responses

Leave a Reply