Golpo romantic golpo আদিল মির্জাস বিলাভড

আদিল মির্জা’স বিলাভড পর্ব ২৪


আদিল মির্জা’স বিলাভড…
— ২৪

নিরালায় গড়ে ওঠা রুচিসম্মত, সেকেলে এই তালুকদার বাড়িটি একতলা মাত্র। বাড়ির দুয়ার পথেই শিউলিফুলের গাছ আছে। কলেজে থাকাকালীন শখ করে লাগিয়েছিল রোযা। ছোটো একটা বাগানের পাশাপাশি গাড়ি পার্ক করার জায়গা আছে ভেতরে। বেশ নিরিবিলি, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন সবটা। বেশ পুরাতন এই বাড়িটি আজিজুল সাহেবের বাবা বানিয়েছিলেন। একসময় বেশ অর্থ-সম্পত্তি ছিলো তাদের। ধরতে গেলে আজিজুল সাহেবই ধ্বংস করেছেন নিজের অসুস্থতার পেছনে। এতে তার আফসোসের শেষ নেই। প্রায়শই বিলাপ জুড়ে দেন, তিনি হয়তোবা মা রা গেলেই ভালো হতো। অন্তত যা অর্থ-সম্পত্তি ছিলো তা দিয়ে স্ত্রী-সন্তানদের জীবন সুন্দর কাটতো, আয়েশের ওপর কাটতো। ওমন টানাপোড়েনের মধ্যে দিয়ে যেতে হতো না। তার মেয়ের কাঁধে পড়তো না রাজ্যের দায়িত্ব। সংসার সামলানোর পেরেশানি। তারওপর আবার আজিজুল সাহেবের চিকিৎসার খরচা তো ছিলোই। হাজার হাজার টাকার ঔষধ খেতে হতো রোজ। মেয়েটা কী পরিমাণ কষ্ট করে এসেছে ভাবতেই আজিজুল সাহেবের বুকের ভেতরটা চিনচিন করে ওঠে! ভীষণ ব্যথা করে বুক। অস্বস্তি হয়, চোখ জ্বালাপোড়া করে। নিজেকে কী ভীষণ অসহায় লাগে!

তারওপর এখন আবার জুটেছে এই সন্ত্রা স নামক নতুন আতঙ্ক! কী করবেন তিনি? ভীষণ সাধারণ একজন মানুষ আজিজুল সাহেব। শান্ত গোছের পুরুষ। অযথা একটা গালিও যে দেওয়া-নেওয়া করে না! সেখানে ওমন এক খানদানি সন্ত্রা সের বি রুদ্ধে কী-বা করতে পারবেন? কতটুকু আওয়াজই বা তুলতে পারবেন? পুলিশ থেকে মন্ত্রীও তো ওই স ন্ত্রাসের হাতের কাছের মানুষ। পকেটে নিয়ে ঘোরেম উল্টো ঝামেলা করলে তারা মা রা পড়বে। আর আর…স্বীকৃতি দিতেও দারুণ লজ্জা লাগছে যে আজিজুল সাহেব রীতিমতো ভয়ে এইটুকুন হয়ে গিয়েছেন। মাথার কাছে চার-পাঁচটা পি স্তল যে তাঁক করাতে পারে, তাকে কীভাবে ভয় না পাবেন? কীভাবে রক্ষা করবেন তার মেয়েকে? বাবা হিসেবে কোনো দায়িত্বই যে তিনি পূরণ করতে পারলেন না। ছোটোবেলা থেকে মেয়েটা তার সবকিছু একা সহ্য করে এসেছে, একাই লড়াই করে এসেছে। আজিজুল সাহেবের চোখের কোণ বেয়ে জল গড়াল। আড়ালে তা মুছেও ফেললেন বাম হাতের উল্টোপিঠ দিয়ে। কম্পিত ডান হাতটা বাড়িয়ে ঘুমন্ত মেয়ের মাথায় হাত রাখলেন।

রোযার মাথাটা আজিজুল সাহেবের কোলে। ও ঘুমিয়েছে কিছুক্ষণ আগেই! ভীষণ ছটফট করছিল। মেয়েটা খুব আদরের তাদের। অনেক আদরেই একটু বেঁকে গেছে। লক্ষ্মীর পাশাপাশি কিছুটা ত্যাড়া। এই ত্যাড়ামি তাদের গোষ্ঠীর কারও ছিলো বলে মনে হয় না। আজিজুল সাহেব, নিপা বেগম দুজানাই ভীতু ধাঁচের সাধারণ মানুষ। যাদের গণ্ডি এই বারিধারা পর্যন্তই। সেখানে মেয়েটা কীভাবে যে এমন হলো! কোনোকিছুই ওর ওপর জোর করানো সম্ভব হয় না। বলেকয়েও শোনানো যায় না। তা স্বীদ্ধান্ত হোক, কিংবা রিকোয়েস্ট। নিজের ইচ্ছের ওপর সব করবে। তাই কখনোই জোর খাটাননি বাবা-মা হিসেবে তারা। স্বাধীনতা দিয়েছিলেন যে খুব।
ঘুমের ঘোরেও রোযা কেমন ভ্রু-দ্বয় কুঁচকে রেখেছে! অশান্তিতে মৃদুস্বরে কিছু একটা আওড়াচ্ছে! আজিজুল সাহেব হাত বাড়িয়ে ওর কপালটা মালিশ করে দিলেন। মুহূর্তে মিশে গেলো রোযার কপালের ভাঁজ। আরও আরাম করে মাথাটা গুঁজেছে বাবার কোলে।

দুয়ারের কাছেই অনেকক্ষণ ধরে দাঁড়িয়ে আছেন নিপা বেগম। নীরবে কাঁদছেন! ভীষণ অসহায় অনুভব করছেন। তখন আতঙ্কে একটা শব্দও তিনি করতে পারেননি। অথচ চোখের সামনে ওই স ন্ত্রাস তার মেয়েকে বিয়ে করে ফেলল! মেয়ের সামনে যতোই তিনি স্বাভাবিক থাকুক না কেনো! তিনি স্বাভাবিক নেই! মাথা ভনভন করছে রাতের দৃশ্য গুলো ভাবতেই। তার মেয়েটা কীভাবে থাকবে ওমন একজন লোকের সাথে? যে কথায়-কথায় পি স্তল মাথায় ধরে! খু ন করতে চায় আশেপাশের সব মানুষ! যার হাতে গোটা দেশের ক্ষ মতা আছে। সে যখন ইচ্ছে তাদের গোটা পরিবারকে মে রে সহজেই একরাতের মধ্যে গু ম করে দিতে পারে! কীভাবে আতঙ্কিত না হবেন নিপা বেগম? বাবা-মা হিসেবে তারা যে ব্যর্থ!

রাজু মায়ের আঁচল টেনে ধরে রেখেছে। চোখমুখ এইটুকুন হয়ে আছে ছেলেটার।
অগোচরে সম্ভবত কেঁদেছে। আজকের পর থেকে তার বোন আর তার কাছে থাকবে না ভাবতেই ওর গলাটা রোধ হয়ে আসছে। বোনের সুন্দর ঘুমন্ত মুখখানা দেখে ও ফিসফিস করে বলে –

‘আমরা চলো পালিয়ে যাই, মা। আপুকে নিয়ে দূরে কোথাও চলে যাই।’

প্রত্যুত্তরে নিপা বেগম ছলছল চোখে ছেলের মাথাটা বুলিয়ে দেন। নিঃশব্দে কাঁদেন কেবল। আঁচলে মুখ গুঁজে আড়চোখে দেখতে পেলেন ওই বিশালদেহী বডিগার্ডের সতর্ক দৃষ্টি। কী বিশ্রীরকমের পাহারা দিয়ে রেখেছে! ঘরের ভেতরও ছাড়েনি। এমন একটা ভাব যেন তারা বড়ো কোনো অপরাধী! অপরাধী তো তোরা, গুন্ডার দলবল! তিনি ফ্যাচফ্যাচ করে কেঁদে আওড়ান –

‘ওই গুন্ডার ঘরে গুন্ডা, আমার মেয়েটাকেই পেয়েছিল খারাপ নজর দেওয়ার জন্য? আমার লক্ষ্মী মেয়েটার কী দুর্ভাগ্য! কী কপাল! ওই বাড়িতে কাজে যাওয়াটাই আমার মেয়েটার জন্য কাল হয়ে দাঁড়াল।’

বলতে বলতে ভদ্রমহিলা অশ্রুসিক্ত চোখে তাকালেন বা-দিকে। শান্তর চোখে চোখ মিলতেই ভয়ে এইটুকুন হয়ে গেলেন। দ্রুতো ঢুকলেন রুমের ভেতর। শান্ত দাঁড়িয়েছিল ছোটোখাটো ড্রয়িংরুমের এককোণে। না চেয়েও স্পষ্ট শুনতে পেলো নিপা বেগমের বলা একেকটি কথা। ভদ্রমহিলা ভয়ে-ভয়ে, ইনিয়েবিনিয়ে অনেকরকম ভঙ্গিতেই বকে যাচ্ছেন ওদের। বিশেষ করে আদিল মির্জাকে। যখন উপস্থিত ছিলো তখন তো মুখ দিয়ে শ্বাস ফেলতেও ভয় পাচ্ছিল। আর এখন দেখো! তোতাপাখির মতো কিচিরমিচির করে যাচ্ছে! ধৈর্য সহকারে ভদ্রমহিলার বকাঝকা শুনেও নির্বিকারের চূড়ান্তে শান্তম বরাবরই ওর মুখের চামড়া ওর বসের মতোই মোটা। লজ্জার ল-ও লাগছে না। উল্টো মিষ্টি হাসি ঝোলানো ঠোঁটে। স্বপণ সিগারেট ধরাতে পারছে না। কারণ ওরা বাড়ির ভেতর। তাই শুধু সিগারেটটা আঙুলের ফাঁকে ঘোরাচ্ছে। একফাঁকে আওড়াল –

‘নিজেদের চমৎকার লেভেলের ভিলেন – ভিলেন লাগছে। বাংলা ছায়াছবির ভিলেন।’

ক্লান্ত বেশ আমোদেই মেনে নিয়েছে ভাগ্যকে। অনুভূতি শূন্য গলায় বলে –

‘ভিলেন নয়? এক ভদ্রলোকের বাড়িতে ঢুকে তাদের মাথায় পিস্তল ধরে আছি –তাদের মেয়েকে উঠিয়ে নেয়ার জন্য। পুরাই ডিপজলের ছায়াছবি।’

স্বপণ যোগ করে ওর কথার পিঠে, ‘যেখানে ডিপজল শাবনুরকে ফোর্সড করে টু গেট ম্যারিড। শাবনুর জীবন দিয়ে দেবে তাও ডিপজলের সাথে বিবাহের বন্ধনে জড়াবে না। আহারে! পিটিফুল শাবনুর!’

শান্ত থমথমে গলায় বলে, ‘মিলতেসে মিলতেসে। কাহিনী মিলতেসে কিন্তু মিলতেসে।’

ক্লান্ত সুর মেলাল, ‘সম্ভবত নায়ক অন্য কেউ থাকে। ডিপজল হচ্ছে ভিলেন। ভিলেন শাবনুরকে পায় না। হাদারাম নায়ক পায়। আহারে, পিটিফুল শাবনুর।’

স্বপণ বিনয়ের সাথে ওর সুর মিলিয়ে বলল, ‘কিন্তু এখানে কাহিনী উল্টে গেছে। নায়ক-ভিলেন সবই এখানে একজন। সাঙ্গপাঙ্গ নিয়ে ঠিকই বিয়ে করে ফেলছে।’

শান্ত দীর্ঘশ্বাস ফেলল। পিস্ত লটা কাপড় দিয়ে মুছতে মুছতে দেয়ালে পিঠ ছোঁয়াল। ধীর গলায় বলল –

‘তোরা কার কথা বলছিস রে?’

স্বপণ মুখ বাঁকাল। তাকাল গিরগিটির মতো রূপ পাল্টানো শান্তকে। ভেঙাল, ‘তোর কার কথা বলছি বলে মনে হচ্ছে?’

‘বাংলা ছায়াছবির ডিপজল আর শাবনুর।’

ক্লান্ত দ্রুতো বলে, ‘হ্যাঁ। ওইটাই বলতেসিলাম।’

শান্ত নির্বিকার, ‘ওহ।’

স্বপণ, ক্লান্ত নিজেদের মধ্যে মুখ চাওয়াচাওয়ি করে চুপ মেরে গেলো। ডিপজলের পাশাপাশি চোখে ভাসল তাদের বসের সুদর্শন মুখ, লম্বাচওড়া পেটানো দেহ খানা। হালকা কেশে গলাটা পরিষ্কার করে স্বপণ বলল –

‘ছবির কাহিনীটা অত্যাধিক ফ্যান্টাস্টিক।’

শান্ত তাকাল। ভ্রু তুলে বলল, ‘ওহ।’

ক্লান্ত আওড়াল, ‘চোপাটা বন্ধ করি। বসের কানে গেলে পু তে ফেলবে।’

.

নিপা বেগম স্বাভাবিক থাকার চেষ্টা করছেন। সারারাত চোখের পাতা এক করেননি। চেষ্টা করেও একফোঁটা ঘুমাতে পারেননি। ভোর থেকে রান্নাঘরে টুকটুক করে কাজ করছেন। পরোটা বানিয়েছেন। পরোটার সাথে খাওয়ার জন্য মুরগি ভুনা করেছেন। সাথে আলুভাজি, ডিমপোজ। রাজু চুপচাপ এসে বসেছে চেয়ার টেনে। মাথাটা নোয়ানো কেমন। একটা শব্দও করল না। আজিজুল সাহেব আগে থেকেই বসে আছেন। দৈনন্দিনের মতো আজ আর হাতে সংবাদপত্র নেই। শূন্যে চেয়ে আছেন শুধু। নিপা বেগম ব্যস্ত হাতে রান্নাঘর থেকে নাস্তা এনে সাজাচ্ছেন টেবিলে। ঘড়ির কাঁটা ঘুরছিল আটটা তেত্রিশে।

রোযা তখুনি বেরিয়ে এলো। পরনে ঢিলেঢালা নাইটস্যুট। এলোমেলো চুল মাথার তালুতে খোঁপা করে রাখা। ওর চোখ সোজা গিয়ে পড়ল শান্তর ওপর। দরজার সামনে দাঁড়িয়ে আছে সৈনিকের মতো। কে বলবে ওরা সারারাত জেগে এমন সৈনিকের মতো পাহারায় দাঁড়িয়ে ছিলো? দেখে বোঝার উপায় নেই যে! রোজকারের মতন জোশ নিয়ে আছে। ক’জন বডিগার্ড আছে? শুধু ওরা তিনজনই কী? ভাবতে ভাবতে রোযা এগুলো দরজার দিকে। বাইরে উঁকি দিতেই ওর মুখের রং বদলাল। রাগ বাড়ল তড়তড় করে। বাড়িটা ডাকাতদের মতো পাহারা দিয়ে রেখেছে! সবগুলোকে গু লি করে উড়িয়ে দিলে কেমন হয়? রোযা সুযোগ বুঝে কেড়ে নেবে নাকি পিস্ত ল্টা? উড়িয়ে দেক লম্পটের সহচরীদের! সবগুলো একসাথে জাহান্নামে যাক। এদের আগে ওই বড়ো লম্পটকে গু লি করে উড়ানো উচিত! ইশ, রোযার বড্ড আফসোস হয় আজকাল। সেদিন একটার জায়গায় দু-তিনটে চড় মারা উচিত ছিলো। সবসময় তো আর সুযোগ পাওয়া যায় না।

‘ম্যাডাম, আমাদের দ্রুতো বেরুতে হবে।’

জবাবে রোযা চোখ রাঙাল শুধু। শান্তকে এড়িয়ে এলো ডাইনিং টেবিলের সামনে। আজিজুল সাহেব, নিপা বেগম শ্বাস আটকে, সতর্ক হয়ে দাঁড়িয়ে ছিলেন। রোযা টেনে বসালো বাবা-মাকে। নিজে তাদের মধ্যে বসে খেতে শুরু করল।চিন্তাভাবনা পরে। আপাতত পেট ভরে খাওয়াদাওয়া করা যাক। পরোটা ছিঁড়তে গিয়ে ওর দৃষ্টি পড়ল নিজ হাতের অনামিকা আঙুলে। ডায়মন্ডের আংটি-টা জ্বলজ্বল করছে। খোদাই করা নামটা বিষের মতো ঠেকল! বিলাভড! বিলাভড না কচুউ! কতো ঢং! খাওয়া বাদ রেখে আগে আংটি খুলল আঙুল থেকে। হাত উঁচিয়ে ছুঁড়ে ফেলতে গিয়েও শেষমেশ ফেলল না। দামী ভীষণ! পরে যদি বলে, আংটির টাকা শোধ করো! তখন কী হবে? রোযা কোনোরকমের ঝুঁকি নেয় না। আংটি খুলে পাশেই রাখল।

নিপা বেগমের গলা দিয়ে খাবার নামছে না। তিনি কোনোরকমে একটু পানি গিলে মেয়ের মুখের দিকে চেয়ে থাকলেন। রোযা দীর্ঘশ্বাস ফেলে। তাকায় মায়ের চোখে। এরপর বাবার! আস্তে করে বলে অবশেষে –

‘শান্ত হও।’

নিপা বেগম আবার কাঁদতে বসবেন এমন অবস্থা, ‘কীভাবে হবো? মনকে কীভাবে বোঝাব? আমার মেয়ের জীবনটা পুরো নষ্ট হওয়ার পথে!’

রোযা অনেকটা সময় চুপ থাকল। মস্তিষ্কে চলল আদিল মির্জার কাণ্ডকারখানার সব দৃশ্য! হৃদিকে বাঁচানোর দিন থেকেই ওই লোকের দৃষ্টি পড়েছিল তার ওপর। তারপর থেকে রোযার জীবনটাই পরিবর্তন হয়ে গেছে। প্রাপ্তবয়স্ক নারী রোযা! একজন পুরুষের দৃষ্টি, কীর্তিকলাপ বোঝার জ্ঞান আছে। ওই লোক যে ওকে পছন্দ করে তা বুঝতে আর খাতাকলমের প্রয়োজন পড়বে না। রোযা দীর্ঘশ্বাস ফেলে। বলে –

‘সম্ভবত সে আমাকে প…পছন্দ করে। আশা করা যায় জীবন ঝুঁকিতে পড়বে না।’

আজিজুল সাহেব অসন্তুষ্ট হলেন বড্ড। ফটাফট বলে বসলেন, ‘বিয়াইত্তা ছিলো। আবার এক বাচ্চার বাপও। কোনোদিক দিয়েই মেনে নেওয়া যাচ্ছে না। আমার বুকটা ভার হয়ে আছে।’

শান্ত পানির বোতলে মুখ লাগিয়েছিল। মুখে পানি সহ বেচারা সমানে কাশল। মুখের পানি ছড়িয়ে-ছিটিয়ে পড়েছে। রোযা বিরক্তি নিয়ে তাকাতেই শান্ত ফের নির্বিকার হলো। ওইযে, তার বসের পাশাপাশি তাদেরও মোটা চামড়া। এসব গায়ে লাগে না। তবে আদিল মির্জা থাকলে নিশ্চিত বলতো –

‘বুক ভার লাগছে যেহেতু, আসুন…একটা গু লি ঢুকিয়ে দিই। আর ভার ভার লাগবে না। আরাম আরাম লাগবে।’

.

না চাইতেও রোযার ফোনের স্ক্রিনের ওপর দৃষ্টি পড়ে। সে দেখে জিহাদের মেসেজটা। গতকাল রাত থেকে ও মেসেজ, কল সমানে করে যাচ্ছে। রোযা দেখেনি। উল্টো ব্লক করে রেখেছিল। আজ নতুন নাম্বার দিয়ে একটিমাত্র করেছে। আপাতত সেটা ভাসছে স্ক্রিনে –

‘রোযা, আমার সাথে দেখা করো। পার্কের পাশে। প্লিজ! গুরুত্বপূর্ণ কথা আছে। আদিল মির্জার সম্পর্কে। আম ওয়েটিং ফর ইউ।’

রোযা মুহূর্তে সচেতন হয়। সামান্য দ্বিধা করে। যদি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় না হয়? এমনিতেই যদি ডাকে? তখন না হয় আরও কিছু প্যাদানী ওটাকে দেয়া যাবে। সেদিন মনের মাধুরি মিশিয়ে পেটানো সম্ভব হয়নি। তাকে ঠকানো! এই রোযা তালুকদারকে!

শান্ত সতর্ক হয় মুহূর্তে। কঠোর ভাবে প্রশ্ন করে, ‘ম্যাডাম, আপনার আমাদের সাথে যেতে হবে। আপ…’

রোযা শোনে না। ও তৈরি হয়ে বেরিয়েছে। হাতে গাড়ির চাবি। শুধু ম্লান কণ্ঠে বলে, ‘আমার একটু কাজ আছে। সরে দাঁড়ান।’

শান্ত সরে না। উল্টো স্বপণ, ক্লান্ত দুয়ার ব্লকড করে রাখে। বাইরে আদেশ ছোড়ে –

‘গাড়ি স্টার্ট দে। আমরা ফিরব।’

রোযা ওদের খেয়াল করে ভালোভাবে। ওদের আচরণে অনেক পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে। আগের মতো নেই। আগে জোরপূর্বক ধরেবেঁধে হলেও রোযাকে আদেশ মানাতে চাইতো। কিন্তু আজ! ওরা দূরত্ব বজায় রাখছে। তাকানো দূরের বিষয়, কাছেও ঘেষছে। দূর থেকে যা বলার বলে যাচ্ছে। একে-দুইয়ে মিলিয়ে রোযা আপ্লূত হয়। ফায়দা তোলে মুহুর্তে। বলে –

‘কী? জোর করবে? ধরবে আমাকে? থামাবে? থামাও তাহলে।’

কথাটুকু শেষ করে রোযা ওদের দিকেই কদম বাড়াল। যেন ধাক্কাধাক্কি করে হলেও ও বেরুবে। প্রায় কাছাকাছি আসতেই স্বপণ, ক্লান্ত সরে দাঁড়ায়। ওরা সব তাজ্জব যে! শান্ত পিছু ছোটে। ব্যস্ত গলায় বলে –

‘ম্যাডাম, আমাদের বাধ্য করবেন না ফোর্সড করতে। গাড়িতে উঠে বসুন।’

রোযা শুনল না। সোজা এসে থামল নিজের গাড়ির সামনে। শান্ত তখনো দূরত্ব বজায় রেখেছে। মুখেই শাসাতে ব্যস্ত। রোযা দরজা খুলে ড্রাইভিং-য়ে উঠে বসে। গাড়ি স্টার্ট করে। শান্ত ধমকায় তাদের লোকদের –

‘মেইন গেইট বন্ধ কর।’

তবে তা আর সম্ভব হয় না। রোযাদের পুরাতন এই দরজায় সমস্যা আছে। ভাঙা আর কী! আজিজুল সাহেব ভীষণ মেহনতের সাথে রোজ মেরামত করে তালা মারতেন। তাই ওটা টেনে মুহূর্তের ভেতর বন্ধ করতে ব্যর্থ! রোযা গাড়ি টেনে বেরিয়ে গেলো। পেছনে শান্ত দীর্ঘশ্বাস ফেলল। নিজের লোকদের ইশারা করে সব গাড়িতে উঠে বসল। তিনটা গাড়ি ট্রেনের গতিতে বেরিয়ে গেলো। পিছু নিলো রোযার লাল গাড়িটার। শান্ত ড্রাইভারকে হুকুম করতে করতে ব্লুটুথ কানেক্ট করে কানে ঢোকায়। কল লাগায় এলেনকে।

এলেন তীব্র দ্বিধাদ্বন্দে আবদ্ধ। খচখচানিটা বেড়ে যাচ্ছে ক্রমশ। কী করবে বুঝে উঠতে পারছে না! আদিল মির্জা তখন মিটিংয়ে ব্যস্ত। ক্লায়েন্ট ইতালির। ভীষণ গুরুত্বপূর্ণ এই সময়ে এমন সংবাদ কীভাবে দেবে? বা দেওয়াটা ঠিক হবে কি-না? সচরাচর গুরুত্বপূর্ণ সময়ে অতি প্রয়োজন ব্যতীত ব্যাঘাত ঘটানো মৃত্যুসম। কিন্তু! এলেন তাকাল সামনে। গ্লাস ওয়ালের বাইরে দাঁড়ানো ও স্পষ্ট দেখতে পেলো আদিলকে। লম্বা টেবিলের মাথায়, সিংহের মতো নিজ আসনে বসে আছে পায়ের ওপর পা তুলে। পরনে শুভ্র রঙা থ্রিপিস স্যুট। হাতের পিস্ত লটা ঘুরিয়েফিরিয়ে কিছু একটা বলছিল। কঠিন, দৃঢ় ওই দৃষ্টিতে রাজ্য সমান আদেশ!

এলেনের চোখে ভাসে গতকালের দৃশ্য! ব্যস! ওমনি সীদ্ধান্ত নিয়ে নেয় ও। দেরি করে না আর! দরজা ঠেলে ঢোকে। মুহুর্তে উপস্থিত বারোজন পুরুষ-নারীর আলোচনা বন্ধ হয়। আদিল ভ্রু তুলে তাকায়। এলেন কাছে গিয়ে বসের কানে মুখ নিয়ে জানায় সবটা। আদিলের চেহারার পরিবর্তন হয় না তেমন। নির্বিকার মুখখানা ধাপে ধাপে শুধু গম্ভীর হতে থাকে। এলেন কথা শেষ করতে পারেনি পূর্বেই আদিল স্বাভাবিকভাবেই দাঁড়াল। বসে থাকা বাকিরাও দাঁড়িয়ে পড়েছে। আদিল সামনের জনের দিকে হাত বাড়াল। হ্যান্ডশেক করে জানল –

‘ডিল। উই উইল ডিসকাস দ্য রিমেইনিং পার্টস নেক্সট উইক।’

আদিল কেবিন থেকে বেরুলো দ্রুতো কদমে। গলার টাইটা একটানে খুলে ছুঁড়ে মার ল মেঝেতেই। রাগে কপালের র গ কাঁপছে। ওর পেছনে বডিগার্ডসদের সারি। পুরো করিডোর জুড়ে আতঙ্কের সৃষ্টি করছে। পার্কিং এরিয়াতে ইতোমধ্যে গাড়ির দরজা মেলে ধরা হয়েছে। আদিল ধমকে উঠল চলন্ত অবস্থায় –

‘একটা চার ফুটের মেয়েকে ম্যানেজ করতে পারছে না!’

এলেন অপ্রস্তুত হয়। আওড়ায়, ‘ম্যাডাম…ম্যাডামকে কীভাবে…’

আদিল পেসেঞ্জার সিটে উঠে বসে না। ড্রাইভিং সিটের দরজা মেলে ধরে। এলেন দ্রুতো ড্রাইভারকে বেরুনোর ইশারা করতেই লোকটা জুবুথুবু মে রে বেরোয়। আদিল উঠে বসে ড্রাইভিং সিটে। পাশে এলেন বসতে বসতে বলে –

‘বস আমি ড্রাইভ করছি!’

আদিল যেন শোনেনি। গাড়ি স্টার্ট করে। বিল্ডিং থেকে বেরিয়ে আর আগেপাছে তাকায় না। একটানে ড্রাইভ শুরু করে। নীরব রাস্তা জুড়ে ঝড় বয়ে গেলো আচমকা। সারি সারি কালো গাড়ি একসঙ্গে রাস্তা পিষে ছুটছে হাওয়ার গতিতে।
এলেনের হাতে দুটো ফোন। একটা থেকে ম্যানেজার জানাল –

‘ভো’দাইটা পার্কে বসে আছে সকাল থেকে। কে জানে কার জন্য?’

অন্যদিকে শান্ত জানাল, ‘আমরা পার্কের দিকে যাচ্ছি। ম্যাডাম ইজ সো গুড এট ড্রাইভিং!’

আদিলের চোয়াল শক্ত হয়! সেকেন্ডের জন্য চোখ বুজে নেয় তীব্র রাগ সামলাতে। মাথার ভেতরটা দপদপ করছে! গাড়ির স্পিড বাড়ে সর্বোচ্চ। রীতিমতো এক্সি ডেন্ট হওয়ার মতো অবস্থা রাস্তায়! একেকটা গাড়ি নিজেদের প্রাণ বাঁচিয়ে কুল পাচ্ছে না। এলেনের মনে হলো, আধঘন্টার রাস্তা চোখের পলকে পেরিয়েছে। সামনে তাকাতেই চমকে ওঠে এলেন। ওইতো সামনে থেকে আসছে লাল রঙের গাড়িটা। গাড়ির আশেপাশে, পেছনে তাদের লোকেরা। মধ্যেই পার্ক। লাল গাড়িটা এসে কেবলই থামবে পার্কের সামনে ওসময় সোজা আদিলের গাড়ি ধেয়ে গিয়ে ক্রাশ খায় রোযার গাড়ির সাথে। তীব্র শব্দের পাশাপাশি লাল গাড়িটার সামনের অংশ থেতলে যায়। রোযা আতঙ্কে ধড়ফড়িয়ে ওঠে। রীতিমতো পেছাতে চাইলে…সামনের গাড়িটা স্বেচ্ছায় টেনে সমানে পিছিয়ে নিতে থাকে। রোযা হতবিহ্বল! ও পাশে তাকাল বডিগার্ডসদের উদ্দেশ্যে। একটাও নেই। সবগুলো সরে গেছে! রোযা কাঁচ নামিয়ে চিৎকার করল –

‘পাগল নাকি?’

জবাবে শুধু পালাক্রমে একতরফা আক্র মণ সামলাতে হলো ওকে। ভালোভাবে তাকাতেই শ্বাস আটকে এলো। ড্রাইভিং-য়ে বস মুখ চিনতে অসুবিধে হলো না। পুনরায় বিপরীত থেকে তীব্রভাবে আক্রম ণ করতেই স্টিয়ারিং-তে থাকা রোযার হাত ভয়ে থরথর করে কাঁপল। ও পাশ কাটাতে চাইলে যেন আক্রম ণ ধারালো হয়।

অগত্যা রোযা গাড়ি থামাতে বাধ্য হতবে বেরুলো না। আদিলও গাড়ি থামিয়েছে। দরজাটা খুলে যখন বেরুলো পাশাপাশি বেরুলো বাকি সব বডিগার্ডসও। পুরো রাস্তাটাই ব্লকড! রোযা পুনরায় দ্রুতো গাড়ি স্টার্ট করে। ও এই সুযোগে একটানে বেরিয়ে যেতে চাইলেও সম্ভব হয় না। সামনেই শান্ত, এলেন সহ বাকিরা এসে দাঁড়িয়েছে। আদিল এসে সোজা নামানো কাচের জানালা দিয়ে হাত ঢুকিয়ে দরজা আনলকড করে। একটানে বের করল রোযাকে। বেচারি ভালোভাবে দাঁড়াতেও পারেনি। টেনেহিঁচড়ে নিতে চাইলে ও পায়ে ব্যথা পায়। ককিয়ে ওঠে! ছিঁলে যায় পায়ের চামড়া! আদিল থামল। শক্ত চোখ দেখল র ক্তিম, জেদি চোখজোড়া। বাঘিনীর মতো চেয়ে আছে কেমন! আদিলের সতর্ক চোখ যায় অদূরে। জিহাদ চেঁচিয়ে ছুটে আসছে। আদিল চোখের পলকে রোযাকে কোলে তুলে কদম বাড়াল গাড়ির দিকে। অগ্রাহ্য করল ওর চেঁচামেচি, মুষড়ামুষড়ি।

‘আপনি আমার সাথে এমন করতে পারেন্ না!’

শান্ত পেসেঞ্জার সিটের দরজা মেলে ধরেছে। রোযাকে জোরপূর্বক বসিয়ে, আদিলও উঠে বসল। ইতোমধ্যে গাড়ি স্টার্ট হয়েছে। ছুটেছে সামনে। আদিল জানালার কাঁচে দিয়ে দেখতে পেলো চলন্ত গাড়ির পেছনে ছুটতে থাকা জিহাদকে। ডাকছে! রোযা বোধহয় উপলব্ধি করল কিছু। ও মাথাটা ঘুরিয়ে জানালা দিয়ে তাকাতে চাইলে আদিল মুহূর্তে শক্ত করে ধরল ওর চোয়াল। মসৃন ভঙ্গিতে ফিরিয়ে আনে নিজের দিকে। ছলছল চোখে নিজের দৃঢ় দৃষ্টি মিলিয়ে বিড়বিড়িয়ে বলে –

‘আমি সব পারি। জোর খাটানো সহ্য হয় না, হুম? সহ্য করে নিতে শিখুন। আমি আমার ওপর জোর খাটাতে ভীষণ পছন্দ করি… অ্যান্ড ইউ আর….. মাই ননন মিসেস আদিল।’

রোযা চোখ রাঙাল। কিছু বলবে এরপূর্বেই আদিল রুক্ষ ভঙ্গিতে ছাড়ল ওর চোয়াল। ধরল ওর নরম হাতটা। অনামিকা আঙুলে নেই তার দেয়া আংটি। আদিল নীরবে তাকায় শুধু। দৃষ্টি দিয়ে প্রশ্ন করছে। রোযা জবাব দেয় না। জেদ ধরে চেয়ে আছে। থমথমে নীরবতা ভাঙল আদিলের অনুভূতি শূন্য কণ্ঠে –

‘যেই আঙুলে আমার দেয়া আংটি সভা পায় না, ওই আঙুল রাখার কী দরকার? কে টে ফেলি?’

রোযার চোখ দুটো বড়ো বড়ো হয়ে আসে। মুখটা হা হয়ে গেছে। শিরদাঁড়া বেয়ে নামে ভয়ের স্রোত। ওর আতঙ্কিত মুখে চেয়ে আদিল হাতটা বাঁকিয়ে ধরল। ব্যথায় ভেজা চোখে জল জমল রোযার। ও রীতিমতো জানার কাঁচের সাথে মিশে গেছে। আদিল ঝুঁকে আছে ওর ওপর। শীতল গলায় প্রশ্ন করল –

‘আংটি কোথায়?’

জবাব না পেয়ে সঙ্গে সঙ্গে হাতের ওপর ভয়াবহ জোর দিতেই রোযা ককিয়ে আওড়াল, ‘গা-গাড়িতে। আমার ব্যাগে।’

আদিল ছাড়ল না হাত। ওভাবেই, রোযার মুখের ওপর থেকেই ডাকে শুধু, ‘শান্ত!’

শান্ত বুঝে নেয়। স্বপণ রোযার ভাঙা গাড়িটা চালাচ্ছিল আদিলের গাড়ির পাশাপাশি। শান্ত ব্লুটুথে জানাতেই স্বপণ চলন্ত গাড়ি থেকেই জানালা দিয়ে ব্যাগ ট্রান্সফার করে দিয়েছে। শান্ত না ফিরেই পেসেঞ্জার সিট থেকে বাড়িয়ে ধরল ব্যাগটা। আদিল নেয় না। চেয়ে থাকে রোযা এড়িয়ে বেড়ানো চোখে। রোযার ইচ্ছে করল মুক্ত বাম হাতে একটা চড় মা রতে গুন্ডাটাকে। অসভ্য কোথাকার! ও একপলক চেয়ে বলে –

‘ছাড়ুন।’

আদিল যেন শোনে না। অপেক্ষায় যেমন! রোযা চোখ বুজে মেনে নেয় নিয়তি। লজ্জায় ওর মাথা কাটা যাচ্ছে। ওমন জলদস্যুর বাহুতে আটকে থেকে হাত বাড়িয়ে নিলো ব্যাগটা। মুক্ত বাম হাতে কোনোরকমে তাড়াহুড়োতে বের করল আংটি।

‘ধরুন আপনার আংটি। সরুন এবার।’

আদিল সরল না। তবে বেঁকিয়ে ধরা হাতটা ছাড়ল। স্বস্তির শ্বাস ফেলল রোযা। ওর হাতটা বোধহয় ভেঙেই ফেলেছে। আদিল রুক্ষ ভঙ্গিতে চোখের পলকে আংটি-টা ফের পরিয়ে দিলো রোযার অনামিকা আঙুলে।

‘নেক্সট টাইম সোজা হাত কে টে ফেলব।’

খাওয়াদাওয়া একরকম বন্ধই করে দিয়েছে মেয়েটা। কিছুতেই ওর মনোযোগ নেই। পছন্দের ডিজনি দেখতেও অপারগ। মরিয়ম বেগম দু-পা ভেঙে বসলেন কান্নারত হৃদির সামনে। লিভিংরুমের সোফার এককোণে জুবুথুবু মেরে বসে আছে। দু-হাতে ছবির ফ্রেম। ছবিতে হৃদি রোযার কোলে পুতুল জড়িয়ে বসে আছে।

মরিয়ম বেগম ধরলেন ছোটো , কোমল হাত দুটো। মুক্তোর মতো চোখের জল গাল বেয়ে গড়িয়ে পড়ছে তখনো। সমানে ফুপিয়ে উঠছে একটু পরপর। মরিয়ম বেগম মাথা ছুঁয়ে শান্ত করতে বলেন –

‘মিস রোযা আসবেন শীঘ্রই! হয়তোবা ব্যস্ত! এইজন্যই আসতে পারছেন্ না। সে তো সবচেয়ে বেশি আমাদের প্রিন্সেসকে ভালোবাসে। কীভাবে না আসবেন?’

হৃদি গুঙিয়ে উঠল কান্নার মধ্যে, ‘স্নো-হোয়াইট আর আমাকে চায় না।’

মরিয়ম বেগম অসহায় হোন, ‘কে বলল এমন? এও সম্ভব?’

পুতুলের মতো ছলছল চোখ দুটো তাকাতেই মরিয়ম বেগম গলে জল হয়ে যান। মালিকের মেয়ে হওয়াতে পারেন না বাচ্চাটাকে বুকের ভেতর জড়িয়ে ধরতে। সংকোচ লাগে বড়ো। শুধুই মাথায় ক্রমান্বয়ে হাত বুলিয়ে বলতে থাকেন –

‘খুব চায়। আজ না এলেও আগামীকাল সক্কাল সক্কাল চলে আসবেন।’

হৃদির চোখ ভিজে উঠেছে ফের। ঝর্নার মতো ঝরে। ও বিড়বিড় করে বিড়ালছানার মতো –

‘আমি চাই, স্নো-হোয়াইট সবসময় আমার সাথে থাকুক। যেভাবে আমার ক্লাসমেইটদের মা থাকে।’

মরিয়ম বেগম আঁতকে ওঠেন। শ্বাস আটকে আসে। উপস্থিত বাকি কাজের লোকেরাও আশ্চর্যের সপ্তমে যে! হৃদির কথার মানে তারা কীভাবে না বুঝবেন? তখনো কাঁদছিলো। তখুনি তীব্র শব্দ হয় গাড়ি প্রবেশের। তিতান-থোর ঘেউঘেউ করছে। গার্ডসদের একাগ্র সালামের আওয়াজ ভেসে আসছে। হৃদি দ্রুতো নামল সোফা থেকে। পরনে হাঁটু লেন্থ ফ্রোক। ও ছোটো ছোটো কদমে দৌড়ানোতে তা কেমন উড়ছে চুলের পাশাপাশি!


চলবে ~~~
® নাবিলা ইষ্ক।

Share On:

TAGS: ,



CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
Related Posts
 

0 Responses

Leave a Reply