অ্যারেঞ্জম্যারেজ২ — ৫ পর্ব
অবন্তিকা_তৃপ্তি
শোয়েব-তিতলির আকদের তারিখ ঠিক হয়েছে, আগস্টের ১২ তারিখে ওদের আকদ্দ হবে, বিয়েটা তার থেকে এক বা দেড় বছর পর হবে। তবে শোয়েবের পরিবার চাইলে বিয়ের ডেট আগানো যেতেই পারে— আপাতত এটুকু সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। শোয়েব মাথাটা নিচু করে তখনও বসে আছে, সায়মা জিজ্ঞেস করলেন এইবার——-‘শোয়েব, তোর সমস্যা আছে কোনো? আজকের কথাবার্তাতে আপত্তি থাকলে বল!’
তিতলি শোয়েবের দিকে তাকালো তখন। ওর কেমন একটা অদ্ভুত অনুভূতি হচ্ছে। বিয়েটা হচ্ছে— এসবে তিতলি এখন অব্দি নিজের কোনো ফিলিংস বা ভয় বা কিছুই অনুভব করতে পারছে না। ওর কানে স্রেফ ভাসছে— তিতলি শোয়েবকে বিয়ে করছে।
শোয়েব মাথাটা তুলল, তিতলির দিকে একবার তাকাল, পরমুহূর্তে চোখটা সরিয়ে নিয়ে বলল———‘তিতলির সমস্যা না থাকলে আমারও নেই।’
তিতলি তাকিয়ে আছে। পায়রা তিতলির দিকে তাকালেন; তিতলি শোয়েবের দিকে তাকিয়েই ছিলো তখন। পায়রা মেয়েকে দেখে বিরক্ত হলেন। ছেলেটা কত লাজুক; একবার তাকিয়ে আর তাকাচ্ছে না মাথা তুলে— লাজুক, শান্ত , ভদ্র ছেলের ময় বসে আছে সবার সামনে। আর মেয়েটাকে দেখ?তাকিয়েই যাচ্ছে। লজ্জা নেই এক ফোঁটা। পায়রা মেয়েকে ডাকলেন শান্ত স্বরে———‘তিতলি?’
তিতলি মায়ের এমন স্বর চিনে, ও বুঝে ফেলে মা কি বোঝাতে চেয়েছে। তাই সতর্ক হয়ে আগেভাগেই চোখ সরিয়ে নিলো, সোজা হয়ে বসে মাথাটা নামিয়ে রাখলো। আসাদ জিজ্ঞেস করলেন———-‘তিতলির সমস্যা আছে? এই তারিখে?’
তিতলি মাথাটা দুপাশে নাড়াল; ধিমে স্বরে বলল——-‘নাহ।’
আসাদ স্বস্তির শ্বাস ফেললেন। সায়মা বলল——-‘বিয়ে তাহলে হচ্ছে আলহামদুলিল্লাহ। আমি ভাবছি আকদটা ঘরোয়া ভাবেই হোক। বিয়েতে নাহয় নিমন্ত্রণ বেশি মানুষকে করে করা হবে। কি বলেন আঙ্কেল?’
আসাদও সেটাতেই সায় দিলেন। সায়মা এবার শোয়েবের দিকে তাকালেন———-‘আংটিটা নাহয় পরিয়ে দে শোয়েব।’
শোয়েব মাথা নাড়ল দুপাশে: পকেট থেকে একটা বক্স বের করলে, পায়রা মেয়েকে নিয়ে শোয়েবের সামনের সোফায় এনে বসালেন। সায়মা ফোন ধরে রাখে ছবি তুলবে বলে।
শোয়েব তিতলির দিকে তাকায় একবার, তিতলি আর এখন তাকাচ্ছে না শোয়েবের দিকে। শোয়েব দেখে তিতলির হাত ঘামছে বেশি, অতিরিক্ত। শোয়েব এ যাত্রায় ফিসফাস করে মাথাটা নামিয়ে বলল——-‘আমার দিকে তাকাও, তিতলি।’
তিতলি শোয়েবের কথাটা শুনে মায়ের দিকে তাকায় সবার আগে। পায়রা স্বাভাবিকভাবেই বললেন———‘হাতটা আগাও, তিতলি।’
তিতলি মায়ের দিকে আশকারা বা সম্মতি পেয়েই হোক শোয়েবের দিকে তাকাল। শোয়েবও তাকিয়েছিলো তখন। দুজনের চোখে চোখ মিলে। শোয়েব হাত পাতে, তিতলির দিকে। তিতলি দেখে ওই হাতটা।
যে হাতটা তিতলিকে ধরে রাখে সারাটাজীবন। যে হাতটা হবে তিতলির ভরসা: আবেগ; ছেলেমানুষির সামলানোর হাত। তিতলি হাত দিবে এই লোকটাকে: সঙ্গে দিবে ওর এক জীবনের সমস্ত স্বস্তি!
তিতলির হঠাৎ কেমন যেন বুকটা কেপে উঠল। ও আস্তে করে শোয়েবের দিকে বাম হাতটা বাড়িয়ে দিয়ে শোয়েবের চোখের দিকে তাকায়। শোয়েব দেখে তিতলির চোখ টলমল করছে: যেন অশ্রু গড়াবে। শোয়েব মৃদু হেসে তিতলির হাতটা বড়ই ভরসা নিয়ে ধরল একহাতে। হাতের উপর হাত রেখে আস্তে করে রিং ফিঙ্গারে আংটি পরিয়ে দিল। পুরোটাক্ষণ তিতলি তাকিয়েছিলো শোয়েবের ঠিক নেশাল: হুডেড চোখ-দুটোর দিকে।
শোয়েব আংটি পড়ানো শেষ করে তিতলির হাতটা আস্তে করে ওর কোলের উপর রেখে ছেড়ে দিল। তিতলি দেখে ওইটুকুও— শোয়েব এখানেও ম্যানার্স দেখিয়েছে। ওর হাতটা ঝপ করে ছেড়ে দেয়নি শুন্যে। তিতলি এবারেও আরেকবার আকৃষ্ট হলো এই মানুষটার প্রতি।
শোয়েব আংটি পড়ানোর পুরোটা ভিডিও করল সায়মা। ভিডিও অফ করে পায়রা-আসাদের দিকে তাকালো। পায়রা মেয়ের পাশটায় গিয়ে বসে মেয়েকে একহাতে ধরে রাখলেন। তিতলি মায়ের সাথে একদম মিশে গিয়ে শোয়েবের দিকে তাকায়। অথচ পায়রা বুঝেন— তিতলির সম্পূর্ণ গা কাপছে। পায়রা আরো শক্ত করে ধরেন মেয়েটাকে। এত আবেগি; এত নাজুক এই মেয়েটা।
সায়মারা চলে যাবে। শেষবারের মতো পায়রা ওদের মিষ্টিমুখ করালেন। সায়মা দশ হাজার টাকা সালামী দিল তিতলির হাতে। তিতলি সেটা মুঠোতে চেপে ধরে বসে রইল বাকিটাক্ষণ।
ওরা চলে যাবে এখন। পায়রা তিতলির দিকে তাকালেন——-‘শোয়েবকে এগিয়ে দিয়ে আসো তিতলি।’
পায়রা কথাটা বলে সায়মার সাথে কিছুক্ষণ দাড়িয়ে গল্প করতে থাকেন। শোয়েব গাড়ি পার্ক থেকে বের করবে বলে বেরিয়ে আসে ঘর থেকে। তিতলি ধীর পায়ে শোয়েবের সাথে এগিয়ে যায়। গাড়ির সামনে এসে শোয়েব থামে। তিতলিও থামে তখন। শোয়েব গাড়ির সাথে হেলান দিয়ে তিতলির দিকে তাকাল; পরমুহূর্তে বলল—————‘আমার দিকে তাকাতেও মায়ের পারমিশন লাগে?’
তিতলি বোকার মতো শোয়েবের দিকে তাকাল——-‘মা. .মানে!’
শোয়েব দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল———-‘মানে তিতলি. .আমি দেখেছি আন্টির চোখ রাঙ্গানো। তুমি এরপর থেকে আর একবারও আমার দিকে তাকাওনি। পুরোটাসময় যন্ত্রের বসে ছিলে।’
তিতলি লজ্জা পেল কেন যেন। পরপর কথা ঘুরিয়ে বলল——-‘আপনি কিভাবে জানলেন? তারমানে আপনিও আমাকে দেখছিলেন? শুধু ভাব দেখাচ্ছিলেন ভদ্র হবার।’
শোয়েব সাথেসাথেই বলল———-‘হ্যাঁ আমি দেখছিলাম তোমাকে? তো? তো কি হলো? আমার কারোর কাছে পারমিশন লাগে না তোমাকে দেখতে। হবু স্ত্রী আমার তুমি। আমার রাইট আছে তোমার দিকে তাকানোর: তেমনি তোমারও রাইট আমার দিকে তাকিয়ে থাকার: উই বোথ হ্যাভ ইকুয়াল রাইটস।’
তিতলি শুনে; মিনমিন করে বলল———-‘মেয়েরা এভাবে সবার সামনে তাকিয়ে থাকলে নির্লজ্জ বলে সবাই। এইজন্যে মা সাবধান করেছেন শুধু।’
‘নির্লজ্জ? এগুলা ভোগাস কথাবার্তা তিতলি। যাই হোক, আংটিটা ভালো লেগেছে?’ —— শোয়েব কথা ঘুরিয়ে ফেলল: যেহেতু তিতলি দেখা যাচ্ছে অপ্রস্তুত হচ্ছিল।
তিতলি আংটির দিকে তাকাল; যা ওর রিং ফিঙ্গারে জ্বলজ্বল করে শোভা দিচ্ছিল। তিতলি মৃদু স্বরে বলল———‘সুন্দর: কে পছন্দ করেছে?’
শোয়েব গাড়িতে হেলান দিয়ে, জবাব দিল একবাক্যে ——‘আমি। আংটিটা এক দেখাই কিনেছিলাম। তোমার হাতে দারুণ মানাবে ভেবেছিলাম; এন্ড দেখো মানিয়েছেও।’
তিতলি তাকাল শোয়েবের দিকে। শোয়েবকে দেখে কেউ বলবে না এই ছেলের সবার সামনে এত লজ্জা! তিতলির সামনে কতটা স্পষ্ট কথা বলতে থাকে সারাক্ষণ। অথচ বড়দের সামনে যেন মুখ খুলতে পারেনা লজ্জাতে:চালাক লোক!
শোয়েব হঠাৎ ওর পকেট থেকে আরেকটা বক্স বের করে তিতলির দিকে ধরে, তিতলি অবাক হলো এবার——-‘এটা কি? আংটি? কার জন্যে?’
শোয়েব মৃদু হেসে বলল———-‘আমার জন্যে। তুমি পরিয়ে দিবে। আমিও এনগেজড: সবার অবশ্যই এটা জানা উচিত। তাইনা?’
তিতলি হেসে ফেলল শোয়েবের কথা শুনে। পরে আর মানা না করে চুপচাপ আংটি বের করল বক্স থেকে। শোয়েব হাত এগিয়ে দিল; তিতলি শোয়েবের মতো শোয়েবের হাতটা চেপে ধরল না। না ধরেই শুধু রিং ফিঙ্গারে সিলভার কালারের এক রঙ্গা আংটিটা পরিয়ে দিল।
শোয়েব আংটি পড়ানো শেষ করে ওর ফোনটা বের করে তিতলির দিকে বাড়িয়ে দিল———‘দুজনের হাতের একটা ছবি তুলো। স্মৃতি থাকুক। বাচ্চাদের দেখানো যাবে ওদের বাপ-মায়ের সিম্পল এংগেজমেন্ট।’
তিতলি হা হয়ে তাকাল শোয়েবের দিকে——-‘বাচ্চা?’
শোয়েব তিতলির এমন অদ্ভুত এক্সপ্রেশন বুঝে না; বোকার মতো হবলল———‘কি? অবাক হচ্ছো কেন এতো? বি রিয়েল: বাচ্চা তো একদিন হবেই। শুধুশুধু এটা নিয়ে সিনেমার নায়িকাদের মতো লজ্জা পাওয়ার কি আছে?’
তিতলি সাথেসাথে নিজেকে সামলে বলল——-‘না, লজ্জা পাওয়ার আসলেই কিছু নেই। দিন ফোন দিন। ছবি তুলে দিচ্ছি।’
শোয়েব ফোনটা এগিয়ে দিল। তিতলি শোয়েবকে দেখিয়ে দিল কিভাবে হাতটা রাখবে। শোয়েবের সাদা গাড়িকে ব্যাকগ্রাউন্ড করে ওরা একসাথে ছবি তুলল। শোয়েব ছবিগুলো দেখে বলল———-‘হাতটা ধরে ছবি তুললে ভালো হতো।’
তিতলি শুনে মুখ ঘুরিয়ে বলল———‘বিয়ের পর।’
শোয়েবও তাকাল তখন তিতলির দিকে। পরপর হেসে উঠে বলল———-‘হু; বিয়ের পর।’
সায়মা এসেছে ইতিমধ্যেই। তিতলি সরে দাঁড়াল শোয়েবের থেকে। শোয়েবও তাড়াহুড়ো করে গাড়িতে উঠে পড়ল। সায়মা তিতলির সাথে অনেকক্ষণ কথা বলে গাড়িতে উঠে গেল। দুজনের গাড়ি চলে গেলে হঠাৎ তিতলির চোখ গেল সদর দরজার দিকে।
রিহাদ মামা দাড়িয়ে আছে অদূরে। সম্পর্কে তিতলির অনেক দূর সম্পর্কের চাচা, তোহ ইয়াং অনেক। উনি শোয়েবদের গাড়িটার দিকে একবার তাকিয়ে তিতলির দিকে আবার তাকালেন।
পায়রা রিহাদ দেখে এগিয়ে এলেন———‘এখন আসার সময় তোর? ওরা তো চলেই গেল।বললাম আগে আয়।’
রিহাদ পায়রার দিকে চেয়ে গম্বীর স্বরে বলল———‘এই মেয়েটা গাড়িতে ছিলো?’
পায়রা শুনে বললেন———-‘হ্যাঁ, পাত্রের বোন হয়। সায়মা নাম।’
রিহাদ শুনে দাঁতও কিরমির করে উঠে বলল——-‘পাত্রের বোন? তাইনা? ও আমার এক্স ওয়াইফ হয়, যার কথা আমি তোমাকে বলেছিলাম। এত তাড়াতাড়ি ভুলে গেলে আপা? এই মেয়ের ভাইয়ের সাথে বিয়ে. .তিতলি সুখী হবে তো? ভাই-বোন দুটোই তো মারাত্মক জংলি, অসামাজিক। তোমার এটুকু মেয়েটাকে কিভাবে দিচ্ছো এখানে?’
চলবে
ভিলেন নেই এই গল্পে। যা আছে সব দরকার বলেই আছে। জাস্ট ভরসা রাখুন আমার উপর।
Share On:
TAGS: অবন্তিকা তৃপ্তি, অ্যারেঞ্জ ম্যারেজ
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
ডেনিম জ্যাকেট পর্ব ৩৩
-
ডেনিম জ্যাকেট পর্ব ৩
-
ডেনিম জ্যাকেট পর্ব ২৪
-
ডেনিম জ্যাকেট পর্ব ৩৬
-
ডেনিম জ্যাকেট পর্ব ১৮
-
ডেনিম জ্যাকেট পর্ব ৫১
-
ডেনিম জ্যাকেট পর্ব ৩২
-
ডেনিম জ্যাকেট পর্ব ২
-
ডেনিম জ্যাকেট পর্ব ১৫
-
ডেনিম জ্যাকেট পর্ব ১