অ্যারেঞ্জম্যারেজ২ — ৩ পর্ব
অবন্তিকা_তৃপ্তি
সূর্যের তীব্র প্রদাহ এড়িয়ে শোয়েব-তিতলি একটা রেস্টুরেন্টের সামনে এসে দাঁড়ালো। শোয়েব গাড়ি পার্ক করে এসে তিতলির পাশটায় দাঁড়ালো। রেস্টুরেন্টের কাঁচের আয়নায় দুজনের একটা প্রতিবিম্ব দেখা যাচ্ছে, শোয়েব সেদিকে চেয়ে একবার মাথা ঘুরিয়ে তিতলির দিকে তাকালো। তিতলিও তাকিয়েছে সবেই, দুজনের চোখে চোখ মিলে গেলে, তিতলি লজ্জায়-অস্বস্তিতে চোখ ঘুরিয়ে নিল। শোয়েব পাল্টা হাসল; অস্বস্তি যে ওরও হচ্ছে না তেমনটা না। জীবনের প্রথম কোনো মেয়ের সাথে শোয়েব ডেটে এসেছে,লজ্জা লাগছে ওর নিজেরও।
শোয়েব দরজা খুলে দিয়ে তিতলিকে ইশারা করে——-‘ঢুকো।’
তিতলি ঢুকলো: ওর পিছু পিছু শোয়েবও ভেতরে ঢুকলো। শোয়েব একটা টেবিল ধরে এগিয়ে চেয়ার টানল তিতলির জন্যে। তিতলির কিছুটা অবাক হয়েছে। ও চেয়ারে বসতে বসতে একবার শোয়েবের দিকে তাকাল।
শোয়েব ওর সামনের চেয়ারে বসলো। তিতলির অবাক চোখ দেখে শোয়েব ভ্রু উচালো———-‘কি? এমন করে তাকাচ্ছো কেন?’
তিতলি আগেপিছে না ভেবে সরল মনে বলে উঠলো———-‘এসব জেসচার আই মিন . . এই চেয়ার টেনে দিলেন আমাকে বসার জন্যে এসব ড্রামাতে দেখেছিলাম আমি। আপনি ড্রামা দেখে এসব করছেন?’
শোয়েব ভ্রু কুচকে জবাব দিল—-‘ড্রামা? আমি ড্রামা দেখিনা। আর এগুলোকে ম্যানার্স বলে।’
তিতলি আর কথা বললো না। শোয়েব মেনু এগিয়ে দিল ওর দিকে———-‘অর্ডার কি দিবে দেখে নাও।’
তিতলি দেখে দেখে একটা রাইস বোল, আর কুল ড্রিংকস অর্ডার দিল। শোয়েব পাস্তা আর কুল ড্রিংকস দিল। তিতলি খাচ্ছে, মাথা তুলে একবারও শোয়েবের দিকে তেমন একটা তাকাচ্ছে না। শোয়েব খেতে খেতে জিজ্ঞেস করল———-‘খাবার ভালো লেগেছে? এটা আমার ফেভরেট রেস্টুরেন্ট।’
তিতলি জবাব দিল——-‘হু ভালো লাগছে।’
আর কথা নেই। শোয়েব এবার তিতলির দিকে চেয়ে বিরক্ত হয়ে বলল————-‘গাড়িতে আমি কথা বলিনি দেখে কথা শোনালে আমাকে। এখন নিজেই চুপ করে আছো।’
তিতলি থতমত হয়ে শোয়েবের দিকে চেয়ে বিড়বিড়াল ——‘কি কথা বলবো?’
শোয়েব জিজ্ঞেস করে————-‘আই ওয়ান্ট টু আস্ক সামথিং। বিয়েটা ভাঙার চেষ্টা করছো কেন বারবার?আমি দেখতে খারাপ? তোমার সাথে রুড আচরণ করছি? বা অসভ্যতা করেছি? এমন কিছু? ভাঙার এক্সাক্ট রিজন কি?’
তিতলি এমন একটা প্রশ্নে পুরোপুরি আড়ষ্ট হয়ে গেল। খাবার থামিয়ে কিছু বলতে যাবে; শোয়েব তার আগেই ভরাট কণ্ঠে বলল———-‘খেতে খেতেও কথা বলা যায়। খাও!’
তিতলি সাথেসাথেই আবার খেতে শুরু করে; শোয়েবের দিকে চেয়ে আবার চোখ লুকিয়ে উত্তর দিল————‘আমি ছোট এখনো, বিয়ের জন্যে। আর আপনি . .!’
‘আর আমি বুড়ো তাইতো?’ —— শোয়েব তিতলির কথা কেড়ে নিয়ে বলল। তিতলির ওর দিকে তাকাতেই দেখে শোয়েব মারাত্মক গম্ভীর মুখে ওর দিকে তাকিয়ে আছে।
অমন তাকানোতে তিতলি ঢোক গিলে একটা; পরপর জবাব দিল————-‘ আমি ছোট. . কলেজে পড়ে বিয়ে করলে বাকি জীবনটা নষ্ট করতে চাইনা।’
‘তো আমি তো পড়াব বলেছিই। আগে নিজের বাসায় পড়তে, এখন আমার আই মিন আমাদের বাসায় পড়াশোনা করবে।’
তিতলি বলল———‘বিয়ের পর পড়াশোনায় অনেক এফেক্ট পড়ে।’
শোয়েব এবার ভ্রু বাকায়———‘কেন বিয়ের পর আমি কি তোমার বই-খাতা খেয়ে ফেলব নাকি? আশ্চর্য তো।’
তিতলি শোয়েবের এমন কথা বলার ধরন শুনে গুটিয়ে গেল একপ্রকার, মিনমিন করে বলল————‘আরেকটা কারণ আছে. . ! আপনি অনেক রুড। কঠিন করে কথা বলেন আমার সাথে, আমার এটা পছন্দ নয়।’
শোয়েব এবার বোকা হয়ে যায়; আশ্চর্য হয়ে বলল———‘আমি রুড? আমিই?’
তিতলি মাথা নাড়াল; অর্থাৎ হ্যাঁ। শোয়েব সাথেসাথেই জবাবটা দিল————‘আমি রুড না অবশ্যই। তুমি ঘাড় ত্যারামি করছো দেখে আমাকে তোমার রুড লাগছে। তাছাড়া আমি যথেষ্ট পোলাইট। বিয়ের পর সেটা আরও ভালো করে বুঝতে পারবে।’
তিতলি অস্বস্তি হলো। ও আরও গুটিয়ে গিয়ে খেতে থাকে। শোয়েব ওর দকে কিছুক্ষণ চেয়ে থেকে হঠাৎ ওকে ডাকল———-‘তিতলি!’
‘হু?’ —- তিতলি মাথা তুলে। শোয়েব ঢোক গিলে একটা। পরপর গম্ভীর মুখে তিতলির দিকে একটা টিস্যু এগিয়ে দিয়ে বলল————‘ঠোঁটের কোণে সস লেগে আছে। মুছে ফেলো।’
তিতলি ভ্রু বাকায়। পরপর টিস্যু নিয়ে ঠোঁটের কোনটুকু মুছে নিয়ে ঠোঁট দেখিয়ে বলল———‘মুছেছে?’
শোয়েব হাসি আটকে কোনরকমে বলল——-‘হ্যাঁ।’
বলা শেষে শোয়েব খেতে খেতে মাথা নিচু করে ঠোঁট টিপে হাসতে থাকে শুধু। তিতলির ওর হাসি দেখে ভ্রু কুঁচকে তাকায়। তারপর জিজ্ঞেস করে———-‘হাসছেন কেন আপনি?’
শোয়েব ওর দিকে তাকাল মাথা তুলে; এখনও ঠোঁটের কোণে অদ্ভুত এক হাসি লেপটে আছে। তিতলির রাগ হলো এবার; জোর দেখিয়ে বলল———-‘হাসছেন কেন বলেন?’
শোয়েব হাসি আটকে; মাথা নাড়াল দুপাশে——-‘কিছু না খাও।’
তিতলির এবার ভীষণ রাগ হলো। ওকে কি জোকার পেয়েছে এই লোক? এমনি এমনি ওকে দেখে হাসবে আর জিগেস করলে বলবে কিছু না? তিতলি এবার জেদ দেখালো, চিরবিরিয়ে উঠে বলল———-‘আশ্চর্য। আমাকে দেখে হাসবেন আর বলবেনও না কেন হাসছেন?’
শোয়েব হাসি থামিয়ে বলল এবার——-‘লজ্জা পাবে বললে। বিয়ের আগে আমি কাউকে লজ্জা দেইনা। বিয়ের পরে দেব সেসব। আর জানতে চাওয়ার আছে কিছু?’
তিতলি নাক ফুসছে শুধু। লোকটা কি ভয়ঙ্কর অসভ্য চিন্তা করছে ওকে নিয়ে কে জানে। তিতলি সাথেসাথে ওড়না ঠিকঠাক করে বসলো; আবার আড়চোখে লোকটার দিকে তাকাল। শোয়েব তখন নিজের মতো করে খাচ্ছে, এখনো হাসছে ঠোঁট টিপে. .অসভ্যের মতো। তিতলির রাগ হচ্ছে শুধু ওই হাসি দেখে, শুধু লজ্জা পাবে বলে চেপে ধরে কারণটা জিজ্ঞেস করতে পারছে না।
দুজনেরই খাওয়া-দাওয়া শেষ। শোয়েব-তিতলি দুজনেই কাউন্টারের সামনে দাড়িয়ে আছে। শোয়েব কার্ড দিয়ে বিল দিচ্ছে। তিতলি ওর পেছনে চুপটি করে দাড়িয়ে এপাশ-ওপাশ দেখছে শুধু।
শোয়েব বিল মেটাচ্ছে: আর টুকটাক কথা বলে যাচ্ছে ক্যাশিয়ারের সাথে। তিতলি আশপাশ দেখতে দেখতে হঠাৎ চোখ গেল পিআর পাশের একটা মধ্য বয়স্ক লোকের দিকে। বয়স্ক লোকটা তিতলি-শোয়েবকে আঙুল দিয়ে ইশারা করে কিছু বলে যাচ্ছে। তিতলি আবছা শুনতে পেল লোকটা বলছে———-‘নাগর জুটাইসে একটা। এহন যাইব রুম ডেটে কোনো সস্তা হোটেলে: আজকালের পোলাপানের বাপ-মা ইজ্জতটা এরাই খাইয়া দিচ্ছে। বেশরম পয়দা হইছে একেকটা। আস্তাগফিরুল্লাহ।’
তিতলির লোকটার কথা শুনে পুরো গা রি-রি করে উঠল রীতিমতো। কি নোংরা কথা বলেছে এই বাপের সমান লোক। তিতলির মনটা চাইল এক্ষুনি ধরে থাবড়াতে এটাকে।
তিতলি যখন থাবরানোর জন্যে নিজেকে তৈরি করছিল; শোয়েব তখন বিল মিটিয়ে ওর পাশে দাঁড়াল——-‘যাওয়া যাক!’
তিতলি তখনও মারাত্মক কঠিন মুখে ওই বুড়ো লোকটার দিকে চেয়ে আছে। শোয়েব থামল, তিতলির মুখের চাওনি লক্ষ করে মাথা ঘুরিয়ে পেছনে তাকাল। বুড়ো লোকটা তিতলির দিকে অশ্লীল চেহারা নিয়ে ঠিক তখনও তাকিয়ে আছে। শোয়েব আবারও তিতলিকে দেখে; তিতলির মুখ রাগে লাল হয়ে গেছে একদম।
শোয়েব এ যাত্রায় বড্ড নরম কণ্ঠে তিতলিকে ডাকল———‘তিতলি?’
তিতলি তাকাল শোয়েবের দিকে; নিচু কণ্ঠে রাগ নিয়ে বলল———-‘আপনি . .ওই দেখুন ওই লোকটা. . কি কথা বলেছে জানেন? নোংরা ইঙ্গিত দিচ্ছিল এতক্ষণ। ওকে তো আমি . .’
তিতলি কথা শেষ না করেই রেগেমেগে এগিয়ে যেতে চাইলে: শোয়েব সাথেসাথেই ওর পার্স ধরে ওকে আটকে দিল———-‘নো তিতলি, দাঁড়াও।’
তিতলি দেখে শোয়েব ওর পার্সটা ধরে আছে; ওর শরীরের কোনো অংশ ধরেনি। কেন ধরল না? বিয়ের অধিকার নেই বলে? তিতলি শোয়েবের দিকে তাকাল; শোয়েব ভীষণ শান্ত কণ্ঠে বলল————‘আমি ব্যাপারটা হ্যান্ডেল করছি। হু? ঠান্ডা থাকো: ওকে?’
তিতলির কিছু বলা লাগল না: শোয়েব এগিয়ে গিয়ে কাউকে কল দিল। মুজুরতেই রেস্টুরেন্টের দুজন স্টাফ বয়স্ক লোকটাকে ঘিরে ফেললো। দেখা গেল— স্টাফরা লোকটার কলার ধরেছে; জবাবদিহিতা চাইছে।
শোয়েব তিতলির দিকে তাকাল———‘এবার যাই?’
তিতলি অবাক হলো———‘কাকে কল করলেন একটু আগে?’
শোয়েব নির্বিকার কণ্ঠে জবাবটা দিল———‘রেস্টুরেন্টের মালিক আমার ফ্রেন্ড। সো. .বুঝতেই পারছ।’
তিতলি আর কিছু বললো না। দেখা গেল বয়স্ক লোকটাকে বড্ড হ্যানস্থা করে রেস্টুরেন্ট থেকে ঘাড় ধাক্কা দিয়ে বের করে দেওয়া হলো। যাবার আগে লোকটা নোংরা, রাগী চোখে শোয়েব-তিতলির দিকে তাকিয়ে রইলো।
শোয়েব তিতলির একপাশে এসে দাড়ালো, ভ্রু কুচকে মারাত্মক গম্ভীর চোখে লোকটার দিকে তাকাতেই, সাথে সাথে ওই বয়স্ক লোকটা বাকা চোখে তিতলির দিকে চেয়ে চুপচাপ পাশ কাটিয়ে চলে গেল। তিতলি অস্বস্তিতে জমে উঠে বললো————-‘লোকটা আমাদের বয়ফ্রেন্ড-গার্লফ্রেন্ড ভেবেছে।’
শোয়েবও উত্তর দিল ভরাট কণ্ঠে——-‘কিন্তু আমরা তা নই, আমরা স্বামী-স্ত্রী হবো।’
চলবে
নেক্সট পর্ব আগামীকাল আসছে; সেহরির আগে-আগেই। সবাই বেশি বেশি রিঅ্যাক্ট-কমেন্ট করবেন। আমি রিপ্লাই দিব সবার কমেন্টের।
Share On:
TAGS: অবন্তিকা তৃপ্তি, অ্যারেঞ্জ ম্যারেজ সিজন ২
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
ডেনিম জ্যাকেট পর্ব ৩১
-
ডেনিম জ্যাকেট পর্ব ২০
-
ডেনিম জ্যাকেট পর্ব ৩০
-
ডেনিম জ্যাকেট পর্ব ৫২
-
ডেনিম জ্যাকেট পর্ব ৪২
-
ডেনিম জ্যাকেট পর্ব ২৬
-
ডেনিম জ্যাকেট পর্ব ৩৩
-
ডেনিম জ্যাকেট পর্ব ৪৩
-
ডেনিম জ্যাকেট পর্ব ১৫
-
ডেনিম জ্যাকেট পর্ব ১২