Golpo romantic golpo অসম্ভব রকম ভালোবাসি তোকে

অসম্ভব রকম ভালোবাসি তোমায় পর্ব ৪


অসম্ভব রকম ভালোবাসি তোমায়

লেখিকাসুমিচৌধুরী

পর্ব ৪(❌কপি করা নিষিদ্ধ❌)

রিদি নিচ থেকে রুমে এসে বিছানায় বসে পড়ল। তার দুই হাত তখনো সেই নীল শাড়িটাকে মরিয়া হয়ে আঁকড়ে ধরে আছে। যে শুভ্র ছোটবেলা থেকে তাকে শুধু কড়া শাসন আর তপ্ত ধমক ছাড়া কিছুই দেয়নি। আজ সেই মানুষটাই একদম হুট করে তার আজন্ম লালিত এক চিলতে শখ পূরণ করে দিল। শাড়িটার রেশমি জমিন রিদির আঙুলের ছোঁয়ায় এক অদ্ভুত শীতলতা দিচ্ছে। কিন্তু রিদির ভেতরটা আগ্নেয়গিরির লাভার মতো দাউদাউ করে জ্বলছে। শাড়িটা পেয়ে রিদির মনে এক বিন্দু আনন্দের হিল্লোল বয়ে গেল না। কারণ এই উপহার তো কোনো সাধারণ মানুষের কাছ থেকে আসেনি। এ এসেছে তার সেই ‘শুভ্র ভাইয়ার’ কাছ থেকে। যাকে সে নিজের অস্তিত্বের প্রতিটি পরতে পরতে ভালোবেসেছে। অথচ সেই মানুষটাই এখন অন্য কারো হতে যাচ্ছে। তার বিয়ের সানাই বাজার প্রহর গুনছে পুরো বাড়ি। যদি এই মুহূর্তটা আজকের না হয়ে কয়েক মাস আগে হতো। তবে হয়তো রিদি খুশিতে আত্মহারা হয়ে পুরো রুম নাচিয়ে ফেলত। কিন্তু আজ এই উপহার যেন তার ক্ষতবিক্ষত হৃদয়ে লবণের ছিটা দেওয়ার মতো মনে হচ্ছে।

রিদি শাড়িটা নিজের বুকের সাথে শক্ত করে জড়িয়ে ধরল। তার দুচোখ বেয়ে নোনা জলের ধারা নেমে এসে শাড়ির নীল জমিনটাকে ভিজিয়ে দিচ্ছে। কান্নার বেগ সামলাতে না পেরে সে বিছানায় লুটিয়ে পড়ল। তার কণ্ঠস্বর অবরুদ্ধ। বুক চিরে আসা একেকটা দীর্ঘশ্বাস যেন রুমের বাতাসকে ভারী করে তুলছে। সে কাঁদতে কাঁদতে বিড়বিড় করে বলল।

“জানেন শুভ্র ভাই? আপনি এই শাড়িটা দিয়ে আমাকে এক ফোঁটাও খুশি করতে পারেননি। বরং আপনি আমাকে আরও ভয়ংকর এক যন্ত্রণার গহ্বরে ফেলে দিলেন। কেন বারবার আমাকে এভাবে টেনে ধরেন? কেন আমাকে শান্তিতে মরতেও দেন না?”

রিদির মনে হচ্ছে এই শাড়িটা কোনো বস্ত্র নয়। বরং এক টুকরো জীবন্ত বিষাদ। রিদি খুব সাবধানে শাড়িটা বিছানার একপাশে রাখল। তার হাতদুটো এখনো থরথর করে কাঁপছে। সে ধীরপায়ে আলমারির কাছে গিয়ে নিজের ব্যাগ থেকে পুরনো। কিছুটা বিবর্ণ হয়ে আসা একটা ডায়েরি আর কলম বের করে আনল। এই ডায়েরিটা তো কেবল কাগজ আর কালির সমষ্টি নয়। এটা রিদির ‘জীবন খাতা’। কবে প্রথম সেই কিশোরী মনে শুভ্র নামক ঝড়ের প্রবেশ ঘটেছিল। কবে শুভ্র প্রথম তাকে কড়া গলায় ধমক দিয়ে শাসিয়েছিল। আর কবে অতি সংগোপনে শুভ্র তার দিকে আড়চোখে তাকিয়েছিল। তার প্রতিটি মুহূর্তের সাক্ষী এই ডায়েরি। আগে মন খারাপ হলে রিদি এই ডায়েরির পাতাগুলো উল্টে শুভ্রের সাথে কাটানো পুরনো স্মৃতিগুলো পড়ত আর আপনমনেই খিলখিল করে হেসে উঠত।

কিন্তু আজ এই ডায়েরির পাতায় কোনো আনন্দের স্মারক লেখা হবে না। আজ কলমের প্রতিটি আঁচড়ে ফুটে উঠবে এক গভীর বিষাদের উপাখ্যান। রিদি পড়ার টেবিলের চেয়ারটা টেনে বসল। ঘরভর্তি নিস্তব্ধতা। শুধু বাইরে ঝিঁঝিঁ পোকার একটানা ডাক শোনা যাচ্ছে। কলমটা হাতে নিয়ে সে যখন ডায়েরির প্রথম পৃষ্ঠাটা উল্টাল। তার চোখের সামনে ঝাপসা হয়ে ভেসে উঠল বড় বড় অক্ষরে লেখা সেই বাক্যটি।

~আমার প্রেমপ্রীতি পুরুষ। শুভ্র ভাই~

লেখাটার ওপর হাত বোলাতেই রিদির চোখ থেকে এক ফোঁটা জল টুপ করে সাদা কাগজের ওপর আছড়ে পড়ল। কালিটা একটু লেপটে গেল। ঠিক যেমন রিদির সাজানো স্বপ্নগুলো এখন লেপটে একাকার হয়ে গেছে। সে কাঁপা কাঁপা হাতে আজকের তারিখটা লিখল। তার মনে হচ্ছে কলমটা যেন আজ অনেক ভারী হয়ে গেছে। কলমটা ছোঁয়াতেই তার হাতদুটো প্রবলভাবে কেঁপে উঠছে। আজ কালির রঙটা যেন তার চোখের পানির সাথে মিশে আরও গাঢ় হয়ে যাচ্ছে। সে তার মনের সবটুকু আর্তি ঢেলে দিয়ে লিখতে শুরু করল।

“~প্রিয় প্রেমপ্রীতি পুরুষ শুভ্র ভাই? আজ লিখছি আপনাকে নিয়ে। কিন্তু এ তো আমার নতুন কিছু না। আপনাকে নিয়ে লেখা এটা আমার পেশা নয়? নেশা। হ্যাঁ? আপনি আমার নেশা। কিন্তু এই নেশাটা যে আজ আমার বুকে যন্ত্রণায় পরিণত হলো। আজ যেই ডায়েরি আর যেই কলম দিয়ে লিখছি? সেই জিনিসগুলো আগে আনন্দের মুহূর্তে লিখত। এই কালির দাগগুলো সুখের গল্প ফুটিয়ে তুলত। কিন্তু এই কালি আজ আনন্দের না? আজ সে এক বুক চিরে আসা রক্তক্ষরণের কথা লিখবে। আপনি জানেন শুভ্র ভাই? আপনার ওই পাথরের মতো চুপ থাকাটা বড্ড ভালোবাসি আমি। মনে হয় আপনার ওই মৌনতার মাঝেই আমার পুরো পৃথিবী লুকিয়ে আছে। আপনার ওই গভীর চোখের দিকে তাকালে আমি রিদি আমার বেঁচে থাকার সবটুকু সুখ খুঁজে পাই। আপনার ওই গম্ভীর মুখে তাকালে আমার অস্থির বুকে প্রশান্তি পাই। কিন্তু সেই শান্তিগুলো যে আজ বালুচরের মতো আমার হাত থেকে হারিয়ে যাচ্ছে। আপনার দিকে তাকালে এখন আমি শান্তি না? তীব্র যন্ত্রণা পাই। আর মাত্র দুইটা দিন? তারপর আপনি হয়ে যাবেন অন্য কারো। আপনার নামের সাথে? আপনার জীবনের প্রতিটি নিঃশ্বাসের সাথে জড়িয়ে যাবে অন্য এক নারীর অস্তিত্ব। পৃথিবীর মানুষ বদলে যাবে? সময় আপন গতিতে চলে যাবে? কিন্তু এই রিদির কী হবে। সে কি আপনাকে ভুলতে পারবে? না? পারবে না। কারণ ভালোবাসার মতো ভালোবাসলে চাইলেই মন থেকে মুছে ফেলা যায় না। আর আমার ভালোবাসা তো শরীরের নয়? একদম আত্মার গভীর থেকে। তাহলে আমি কীভাবে ভুলব আপনাকে। জানেন শুভ্র ভাই? আজ আমার বড্ড কষ্ট হচ্ছে। বুকের ভেতরটা কেমন যেন দুমড়ে-মুচড়ে যাচ্ছে। ইচ্ছে করছে সব লোকলজ্জা ভুলে আপনাকে জড়িয়ে ধরে চিৎকার করে বলি আই লাভ ইউ শুভ্র ভাই। আমি আপনাকে অনেক ভালোবাসি। আপনার শাসনের চড়টা আমি হাসিমুখে সইতে পারি? কিন্তু অন্য কারো হয়ে যাওয়ার এই আঘাতটা আমি সইতে পারছি না। আমি আজ বড় অসহায়? আমি হেরে যাচ্ছি নিজের ভালোবাসার কাছে। শুভ্র ভাই? আমি আপনাকে নিয়ে আর লিখতে পারছি না? আমার হাত কাঁপছে। মনে হচ্ছে এই বুঝি আমার নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে আসবে। আচ্ছা শুভ্র ভাই? আমি যদি সব ছেড়ে আপনাকে বলি চলেননা আপনি আর আমি মিলে দূরে কোথাও চলে যাই। যেখানে লোকচক্ষুর অন্তরালে আমাদের ছোট্ট একটা ঘর হবে। সেখানে আমাদের ছোট্ট একটা স্বপ্নের সংসার হবে। আপনি কি আমাকে নিয়ে সত্যি চলে যাবেন। আমাকে নিয়ে কি বাঁধবেন সুখের ঘর। আমি কি একটা বার আমার মনের সবটুকু আকুতি আপনার সামনে বলে দেখব? কিন্তু আমার যে অতটুকু সাহস নেই। আমি আজ হেরে যাচ্ছি আমার নিজের ভলোবাসার কাছে। বুক ফেটে মুখ ফুটিয়ে বলতে পারছি না আমার এই যন্ত্রণার কথাটা। শুভ্র ভাই আমি আর লিখতে পারলাম না আপনাকে নিয়ে আজ বেশি কিছু। কলমের কালি হয়তো আপনাকে নিয়ে লেখায় ফুরালো না। তার আগেই ফুরিয়ে এলো আমার শক্তি। তবুও মনের অন্তর থেকে বলবো চিরজীবন সুখী হোন আপনি। আমি না হয় আমার ভালোবাসার যন্ত্রণায় পুড়ে ছায়া হয়ে পড়ে রইলাম এক কোনায়।”

রিদি ডায়েরির ওই ভেজা পাতায় একদম শেষ প্রান্তে কাঁপা কাঁপা অক্ষরে লিখল।

      ~ইতি আপনার নামের নীল বিষে নীল হওয়া এক মেয়ে। রিদি~

লেখাটা শেষ করে রিদি কলমটা টেবিলের ওপর ছেড়ে দিল। তার বুকের ভেতরটা কেমন যেন খালি হয়ে আসছে। ডায়েরিটা বন্ধ করার শক্তিটুকুও নেই। সে অঝোরে কাঁদতে কাঁদতে ওই খোলা ডায়েরির ওপরই মাথা রাখল। চোখের জলে কাগজের কালি আরও কিছুটা লেপটে গেল। রাতের নিস্তব্ধতায় শুধু তার ফুঁপিয়ে কাঁদার শব্দটাই শোনা যাচ্ছিল। সে জানে না এই লেখাগুলো কোনোদিন আলোর মুখ দেখবে কি না। নাকি এই বিষাদের সাক্ষী হয়ে শুধু এই ডায়েরিটাই থেকে যাবে।


সকাল সকাল চৌধুরী বাড়িটা একদম উৎসবের সাজে সেজে উঠেছে। বাড়ির চারপাশ বর্ণিল আলোকসজ্জা আর ডেকোরেশনে ভরে উঠেছে। মেয়েরা দল বেঁধে আড্ডার মাঝে একে অপরের হাতে মেহেদি দিচ্ছে। রিদি চুপচাপ সবার সাথে বসে আছে। যত সময় যাচ্ছে ততই তার বুকটা ফেটে আসছে। সে ভাবছে আর মাত্র একদিন পর তার এই প্রিয় মানুষটা অন্য কারো হয়ে যাবে।

হঠাৎ চৌধুরী বাড়িতে প্রবেশ করল দুইজন যুবক। শুভ্রের বন্ধু রিফাত আর তুর্য। দুজনেই এসে বাড়ির বড়দের সাথে কুশল বিনিময় করে সোজা শুভ্রের রুমে আসল। শুভ্র তখন নিজের মতো বিছানায় বসে ল্যাপটপে খুব মনোযোগ দিয়ে কিছু একটা করছিল। রিফাত সোজা শুভ্রের পাশে বসে তার কাঁধে একটা থাপ্পড় দিয়ে বলল।

“কিরে নতুন জামাই। এই সাত সকালে কিসের মিটিং করছিস?”

শুভ্র ল্যাপটপ থেকে চোখ না সরিয়েই গম্ভীর গলায় বলল।

“স্টপ টকিং রাবিশ।কখন এসেছিস সেইটা বল।”

তুর্য ঘরের সোফায় আরাম করে বসে বলল।

“এই তো মাত্র আসলাম। নিচে যা অবস্থা শুরু হয়েছে তা দেখে তো মনে হচ্ছে পুরো এলাকা মাথায় ওঠবে। কিন্তু হবু বর রুমে বসে ল্যাপটপ টিপছে এই দৃশ্য তো আগে কখনো দেখিনি।”

শুভ্র এবার ল্যাপটপ বন্ধ করে অত্যন্ত শান্ত গলায় তুর্যের উদ্দেশ্যে বলল।

“কেন বর কি ল্যাপটপ টিপতে পারে না?”

তুর্য কপালে ভাঁজ ফেলে বলল।

“পারে কিন্তু বিয়ের আমেজ ছেড়ে এই সাত সকালে ল্যাপটপ নিয়ে বসে থাকাটা কোন ধরনের রসিকতা।”

শুভ্র বিছানা থেকে উঠে ধীর পায়ে ওয়াশরুমের দিকে যেতে যেতে নির্লিপ্ত গলায় বলল।

“আই হ্যাভ নো আইডিয়া। বাই দ্য ওয়ে তোরা বোস আই উইল বি ব্যাক ইন আ মিনিট।”

সাহেরা চৌধুরী নাস্তার ট্রে সাজিয়ে নিয়ে আসলেন সব মেয়েদের মাঝে। কিন্তু সবার হাতে মেহেদি দেখে সাহেরা চৌধুরী কিছুটা বিপাকে পড়ে বললেন।

“একি তোরা তো সবাই মেহেদি দিয়ে ফেলেছিস এখন এই নাস্তার ট্রে কার হাতে দিয়ে উপরে পাঠাই বল তো।”

শুভ্রা হাতের মেহেদি শুকাতে শুকাতে বলল।

“আম্মু রিদিকে দাও ও এখনো মেহেদি পরেনি।”

সাহেরা চৌধুরী রিদির হাতের দিকে তাকিয়ে দেখলেন সত্যি রিদি এখনো মেহেদি পরেনি। তিনি কিছুটা অবাক হয়ে ভ্রু কুঁচকে বললেন।

“কিরে রিদি তুই মেহেদি পরিসনি কেন? সবাই তো হাসাহাসি করে পরছে।”

রিদি ম্লান হেসে নিচু গলায় বলল।

“এমনিই পরিনি মামি পরে কোনো এক সময় পরে নেব।”

“আচ্ছা ঠিক আছে তাহলে তুই এই নাস্তার ট্রে টা নিয়ে শুভ্রের রুমে দিয়ে আয়।”

বলেই সাহেরা চৌধুরী উত্তরের অপেক্ষা না করে রিদির হাতে ট্রে টা ধরিয়ে দিয়ে চলে গেলেন। রিদি নিজের ভেতরের সবটুকু সাহস সঞ্চয় করে উঠে দাঁড়াল। সে খুব ধীর পায়ে সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠে শুভ্রের রুমের সামনে এসে দাঁড়াল। বুকের ভেতরটা তার ধড়ফড় করছে। সে দরজায় মৃদু করাঘাত করে নিচু স্বরে বলল।

“ভাইয়া আসব?”

ভেতর থেকে রিফাত বেশ অমায়িক স্বরে বলল।

“আসো শুভ্র রুমে নেই।”

রিদি খুব সন্তর্পণে নিজের অস্তিত্বকে যেন ছোট করে মাথা নিচু করে রুমে প্রবেশ করল। রিদিকে দেখামাত্রই রিফাতের দৃষ্টি যেন স্থির হয়ে আটকে গেল রিদির ওপর। রিদির সেই মায়াবী চেহারার বিষণ্ণতা রিফাতকে মুহূর্তেই মুগ্ধ করল। রিদি ধীরপায়ে এগিয়ে এসে বিছানার ওপর নাস্তার ট্রে টা সন্তর্পণে রাখল। তার হাত দুটি হালকা কাঁপছে। নিচু স্বরে সে বলল।

“মামি আপনাদের জন্য নাস্তা পাঠিয়েছেন।”

বলেই রিদি কোনোমতে নিজেকে সেখান থেকে সরিয়ে নিতে চাইল। কিন্তু সে পা বাড়াতেই রিফাত কিছুটা আগ্রহ নিয়ে বলে উঠল।

“এই মেয়ে দাঁড়াও। তুমি কি শুভ্রের কাজিন লাগো?”

রিদি দরজার দিকে এক পা বাড়িয়েও থমকে দাঁড়াল। ঠিক সেই মুহূর্তে ওয়াশরুমের দরজা খুলে শুভ্র বেরিয়ে এল। তার পরনে একটা কুচকুচে কালো শার্ট। চুলগুলো হাল্কা ভেজা। কিছুটা কপালে এসে লেপ্টে আছে। রিফাতকে রিদির দিকে তাকিয়ে থাকতে দেখে আর রিফাতের কথা শুনে শুভ্র বেশ বিরক্ত হলো। সে হাতের তোয়ালেটা একপাশে ছুড়ে ফেলে অত্যন্ত কর্কশ আর ঠান্ডা গলায় রিফাত কে বলল।

“হোয়াই আর ইউ সো ইন্টারেস্টেড। দ্যাটস নান অফ ইয়োর বিজনেস রিফাত।ওর পরিচয় জেনে তোর কি কাজ?”

রিফাত একটা বাঁকা হাসি দিয়ে শুভ্রের দিকে তাকিয়ে টিপ্পনী কাটল।

“পরিচয় জানতে হলে কি কোনো কারণ লাগে নাকি? আমি তো ভাবছি তোর এই সুন্দরী কাজিনটাকে পটানো যায় কি না।”

তুর্যও রিদির ফ্যাকাশে হয়ে যাওয়া মুখটার দিকে একপলক তাকিয়ে ফাজলামি করে বলল।

“তুমি কে গো সুন্দরী? আমার এই বন্ধুর অচল মনটা তো দেখছি তুমিই কেড়ে নিলে। কোথায় তোমার বাড়ি বলে দাও না সুন্দরী? কালই ঘটক নিয়ে হাজির হব তোমার বাড়ি।”

রিদি দরজার চৌকাঠের কাছে একদম কাঠের পুতুলের মতো স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। তার মনে হচ্ছে পায়ের নিচের মাটিটা দুলছে। শুভ্র এবার আর নিজেকে সামলাতে পারল না। তার ফর্সা মুখটা রাগে একদম রক্তবর্ণ হয়ে গেল। সে সিংহগর্জনে ফেটে পড়ল।

“দ্যাট ইজ এনাফ রিফাত অ্যান্ড তুর্য। অনেক হয়েছে। এইটা তোদের ফাজলামি করার জায়গা না।”

শুভ্রের ওই রণমূর্তি দেখে রিফাত আর তুর্য দুজনেই একদম কুঁকড়ে গেল। তাদের মুখে আর কোনো রা কাড়ল না। রিদি ভয়ে একদম কেঁপে উঠল। শুভ্র এবার রিদির দিকে তপ্ত চোখে তাকিয়ে অত্যন্ত কর্কশ গলায় চিৎকার করে বলল।

“আর তুই। তুই এখানে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে কী দেখছিস? তামাশা দেখছিস? বের হ রুম থেকে। গেট আউট অফ মাই রুম রাইট নাও।”

শুভ্রের কর্কশ কণ্ঠস্বরের ধমকে ভয়ে রিদি একছুটে রুম থেকে বেরিয়ে গেল। রিদি বেরিয়ে যেতেই তুর্য শুভ্রের সেই অগ্নিশর্মা মুখের দিকে তাকিয়ে কিছুটা ভড়কে গেল। তবুও পরিবেশ হালকা করতে টিপ্পনী কেটে বলল।

“রিলাক্স শুভ্র। তুই যেভাবে ধমক দিলি মেয়েটাকে। ও তো ভয়ে একদম কুঁকড়ে গেছে। না মানে। আমাদের ধমক দিয়েছিস আমরা বড় মানুষ। হজম করে নিয়েছি। কিন্তু মেয়েটা তো পিচ্চি। ওইটুকুনি মেয়ে তোর এই সিংহগর্জন কীভাবে সামলাবে? এখন গিয়ে দেখ আন্টির আঁচল ধরে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে তোর নামে নির্ঘাত নালিশ দিচ্ছে এ্যাঁ শুভ্র ভাই আমাকে ধমক দিয়েছে।”

শুভ্র আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে ধীরস্থিরভাবে হাতের ঘড়িটা কবজিতে পরতে পরতে শান্ত অথচ তীক্ষ্ণ গলায় বলল।

“তোদের মতো থার্ড ক্লাস না ও। রিদিকে আমি যতটুকু চিনি ও ভীষণ শান্ত-শিষ্ট একটা মেয়ে। আর ওকে কি আমি আজই প্রথম ধমক দিয়েছি নাকি? মেয়েটা যখন থেকে নাকে নোলক পরা শুরু করেছে তখন থেকেই আমার ধমক খেয়ে বড় হচ্ছে। কোনোদিন কারো কাছে আমার নামে বিচার দেয়নি। আর এখন তো ও অনেকটা বড় হয়েছে এখন বিচার দিতে যাবে কোন দুঃখে? তোদের মতো গবর মার্কা বন্ধু যে কেন শুধু আমার কপালেই জুটল কে জানে।”

তুর্য আর রিফাত পাল্টা কিছু বলার জন্য মুখ খুলতে যাবে। তার আগেই শুভ্র গটগট করে রুম থেকে বেরিয়ে যেতে যেতে শ্লেষ মিশিয়ে বলল।

“আই অ্যাম গোয়িং ডাউন। ইফ ইউ গাইজ ওয়ান্ট টু কাম দ্যান জয়েন মি।আর আসতে না চাইলে রুমে বসে মেডিটেশন কর।”

শুভ্রের এই সপাট উত্তরের পর আর কথা বাড়ানোর সাহস পেল না তুর্য আর রিফাত। তারা দুজনে একে অপরের দিকে তাকিয়ে মুখ বাঁকাল। শুভ্র সিঁড়ি দিয়ে নামতে নামতে নিচের হট্টগোল শুনতে পাচ্ছে। চারদিকে হলুদ আর মেহেদির আমেজ। আত্মীয়-স্বজনে বাড়িটা গমগম করছে।

শুভ্র নিচে নামতেই তার পিছু পিছু রিফাত আর তুর্যও নামল। তারা একদম ছায়ার মতো শুভ্রের পেছনে এসে দাঁড়াল। ড্রয়িংরুমে তখন মেয়েদের মেহেদি আর আড্ডার আসর পুরো জমে উঠেছে। হঠাৎ রিফাত সেই আড্ডার দিকে তাকিয়ে বেশ উচ্চস্বরে মেয়েদের উদ্দেশ্য করে বলল।

“এই যে আফারা খালারা চাচিরা। শুধু কি তোমরা মেহেদি লাগালেই হবে? বরের হাতে মেহেদি কে দেবে? ও বুঝেছি কথায় আছে না যার বিয়ে তার নাম নেই পাড়া-পড়শির ঘুম নেই। তোমাদের দশা হয়েছে ঠিক তেমন।”

রিফাতের এমন কথা শুনে মিহি রেগে একদম বোম হয়ে গেল। সে মেহেদি দেওয়া হাতটা ঝাড়া দিয়ে ঝংকার দিয়ে বলে উঠল।

“অই মিয়া। আপনি কোন চ্যাটাং চ্যাটাং মুরব্বি যে এসব ডিসকাস্টিং কথা বলছেন? আমাদের কোন দিক দিয়ে আপনার চাচি-খালা মনে হলো অ্যাঁ?”

রিফাত মোটেও দমে যাওয়ার পাত্র নয়। সে দাঁত বের করে এক গাল হেসে বলল।

“আরে মেয়ে রাগ করো কেন? না মানে তোমাদের কাউকে তো চিনি না কে কার কী হয় তাও জানি না। রাস্তাঘাটে অপরিচিত কারো সাথে দেখা হলে তো আমরা সম্মান দিয়ে আন্টি চাচি বা খালা বলি। তোমরাও তো আমার কাছে অপরিচিত তাই ওটাই বললাম।”

দুজনের কথা কাটাকাটি শুনে শুভ্র মেজাজ হারিয়ে দুজনেই ধমক দিয়ে বলল।

“স্টপ ইট।একদম চুপ। তোদের যেখানে সেখানে গিয়ে সিন ক্রিয়েট না করলে পেটের ভাত হজম হয় না?”

বলেই শুভ্র বিরক্তিতে মুখ ফিরিয়ে চলে যেতে চাইল। কিন্তু রিফাত তো নাছোড়বান্দা। সে এক ঝটকায় শুভ্রের হাত টেনে ধরে দাঁত বের করে হাসল।

“কই যাস? তোর বিয়ে আর তুই হাতে রঙ ছোঁয়াবি না তা তো হতে দেব না। এই তুর্য ধর তো একে। আজকে ও মেহেদি না দিয়ে কই যায় আমিও দেখি।”

শুভ্র হাত ছাড়ানোর আপ্রাণ চেষ্টা করে কর্কশ গলায় বলল।

“তোদের দিতে ইচ্ছে করছে তোরা দে। বাট আই ওন্ট টাচ দিস গারবেজ আই হ্যাভ নো ইন্টারেস্ট।”

কিন্তু তুর্য আর রিফাত এক প্রকার গায়ের জোরেই শুভ্রকে পাঁজাকোলা করে টেনে নিয়ে মেয়েদের আড্ডার মাঝখানে সোফায় ধপাস করে বসিয়ে দিল। তুর্য বিজয়ী হাসি দিয়ে মেয়েদের দিকে তাকিয়ে ঘোষণা করল।

“এই যে সুন্দরীরা। তোমাদের মধ্যে কে সবথেকে স্পেশাল ডিজাইন পারো? আমাদের এই কাঠখোট্টা বরটার হাতে একটা খাসা নকশা তুলে দাও তো। ওকে চেপে ধরে রাখার দায়িত্ব আমাদের।”

শুভ্র সোফা থেকে ওঠার জন্য ধস্তাধস্তি শুরু করল। তার ফর্সা মুখটা রাগে আর লজ্জায় লাল হয়ে উঠেছে। সে চিৎকার করে বলল।

“হোয়াট দ্য হেল।ছাড় বলছি আমাকে। তোদের এসব গু আমি হাতে লাগাবো না তোরা লাগা।”

রিফাত শুভ্রের কবজিটা লোহার মতো শক্ত করে চেপে ধরে হেসে কুটিকুটি হয়ে বলল।

“ব্যস ব্যস। এই ‘গু’ই আজকে তোর হাতের তালুতে লেপে দেব। একদম চুপচাপ বস দুলহা সাহেব।”

শুভ্র চরম বিরক্তি আর গাম্ভীর্য নিয়ে সোফায় পাথরের মতো বসে রইল। কিন্তু আসল বিপত্তিটা বাঁধল মেহেদি দিতে গিয়ে। বাড়ির সব মেয়েই ইতিমধ্যে হাত রাঙিয়ে ফেলেছে কারো হাতই এখনো পুরোপুরি শুকায়নি যে শুভ্রের হাতে নকশা করে দেবে। সবার এই ইতস্তত ভাবনার মাঝেই শুভ্রার মনে পড়ে গেল রিদির কথা। রিদি এখনো মেহেদি ছোঁয়ায়নি আর ও যে কত নিখুঁত মেহেদি দিতে পারে তা শুভ্রার খুব ভালো জানা।

শুভ্রা এক ঝটকায় উঠে দাঁড়িয়ে রিফাত আর তুর্যের উদ্দেশ্যে চটপটে গলায় বলল।

“আপনারা ভাইয়াকে ছাড়বেন না একদম ধরে রাখেন। আমি রিদিকে ধরে নিয়ে আসছি।”

শুভ্রা পুরো বাড়ি তন্নতন্ন করে খুঁজে শেষে ছাদে গিয়ে দেখল রিদি রেলিং ধরে একদম নিশ্চুপ হয়ে আকাশের দিকে তাকিয়ে আছে। শুভ্রা কোনো কথা না শুনে এক প্রকার জোর করেই রিদিকে টেনে নিচে নিয়ে আসতে লাগল। রিদি নিজেকে ছাড়ানোর চেষ্টা করে বিরক্ত হয়ে বলল।

“কী হয়েছে এভাবে টেনে হিঁচড়ে কোথায় নিয়ে যাচ্ছিস আমাকে?”

শুভ্রা কোনো জবাব না দিয়ে সিঁড়ি ভাঙতে ভাঙতে বলল।

“শুভ্র ভাইকে মেহেদি পরিয়ে দিতে। আমাদের সবার হাতে মেহেদি হাত খালি নেই যে ভাইয়াকে পরিয়ে দেব। তুই দিসনি তাই আগে ভাইয়াকে পরিয়ে দিয়ে তারপর তুইও পরে নিস।”

শুভ্র নামটা শোনা মাত্রই রিদির কলিজাটা যেন মোচড় দিয়ে উঠল। বুকের ভেতর সেই হার্টবিট আবার ড্রাম বাজানো শুরু করেছে। যে মানুষটার সামনে গেলেই সে ভয়ে কাঠ হয়ে যায় আজ তার হাতের ওপর হাত রেখে সে মেহেদি পরিয়ে দেবে? ভাবতেই রিদির হাত-পা বরফের মতো ঠাণ্ডা হয়ে আসছে। সে শুভ্রাকে মানা করার জন্য কিছু একটা বলতে চাইল কিন্তু শুভ্রা তখন পুরো অ্যাকশন মুডে। সে এক টানে রিদিকে ভিড়ের মাঝখান দিয়ে নিয়ে গিয়ে সরাসরি শুভ্রের ঠিক সামনের টুলে বসিয়ে দিয়ে হুকুমের সুরে বলল।

“একদম চুপচাপ। কোনো কথা না বলে ভাইয়ার হাতে একটা সুন্দর ডিজাইন করে দে।”

রিদি ভয়ে কাঁপতে কাঁপতে মাথা নিচু করল। সে অনুভব করল শুভ্রের সেই তীক্ষ্ণ আর গভীর চাহনিটা সরাসরি তার ওপর নিবদ্ধ। শুভ্র সোফায় হেলান দিয়ে আয়েশ করে বসলেও তার চোয়াল তখনো শক্ত। রিদি কাঁপাকাঁপা হাতে মেহেদির কোণটা তুলে নিল। সে নিচু হয়ে খুব সাবধানে শুভ্রের সেই শক্ত আর চওড়া হাতের তালুটা নিজের বাম হাতের তালুর ওপর রাখল। শুভ্রের শরীরের সেই চেনা তীব্র পুরুষালি উত্তাপ মুহূর্তেই রিদির শরীরের ভেতর বিদ্যুতের মতো খেলে গেল। শুভ্র এবার রিদির একদম চোখের দিকে তাকিয়ে অত্যন্ত শান্ত অথচ এক অদ্ভুত ভারী গলায় বলল।

“ইউ হেভ টু বি ভেরি কেয়ারফুল। আমার হাতে যেন কোনো হিজিবিজি দাগ না পড়ে। আদারওয়াইজ ইউ নো মি।”

রানিং…!

Share On:

TAGS: ,



CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
Related Posts
 

0 Responses

Leave a Reply