অসম্ভবরকমভালোবাসি_তোমায়
লেখিকাসুমিচৌধুরী (৩৪)
কারও তীক্ষ্ণ চিৎকারে শুভ্রের যেন ঘোর কাটল। ও এক ঝটকায় রিদিকে ছেড়ে দিয়ে অনেকটা দূরে গিয়ে দাঁড়াল। ওর বুকটা কামারের হাপরের মতো ওঠানামা করছে। রিদিও দেয়ালে পিঠ ঠেকিয়ে ধপ করে মেঝেতে বসে পড়ল। ওর ঠোঁট ফেটে র-ক্ত চুইয়ে পড়ছে আর দুচোখ বেয়ে অবিরল ধারায় জল নামছে। শুভ্র ছাদের দরজার দিকে তাকাতেই দেখল সাহেরা চৌধুরী পাথরের মূর্তির মতো দাঁড়িয়ে আছেন। উনার ফর্সা মুখটা রাগে আগুনের মতো লাল হয়ে গেছে।
সাহেরা চৌধুরীকে দেখেই রিদি ভয়ে নীল হয়ে গেল। ও কাঁপতে কাঁপতে নিজের মুখ দুই হাতে ঢেকে ফেলল। সাহেরা চৌধুরী বড় বড় পা ফেলে এগিয়ে এলেন। শুভ্র কিছু বুঝে ওঠার আগেই বাতাসের বেগে উনার হাতটা উঠল আর ‘ঠাস’ করে একটা প্রচণ্ড চড় পড়ল শুভ্রের গালে। চড়ের শব্দে ছাদের স্তব্ধতা যেন খানখান হয়ে গেল। সাহেরা চৌধুরী ঘৃণাভরা দৃষ্টিতে তাকিয়ে চি-ৎ-কা-র করে বললেন।
“ছিহ্! তুই আমার ছেলে এটা বিশ্বাস করতেই আমার কষ্ট হচ্ছে। একবারও লজ্জা করল না তোর এমন নোংরামি করতে?”
শুভ্র নিজের জ্বলে যাওয়া গালটা এক হাত দিয়ে চেপে ধরে ধরা গলায় বলল।
“আম্মু তুমি শান্ত হও। আমি… আমি তোমাকে সব বলছি।”
সাহেরা চৌধুরী এবার যেন আরও বেশি জ্বলে উঠলেন। উনার সারা শরীর থরথর করে কাঁপছে। উনি গর্জে উঠে বললেন।
“কী শুনব আমি? সব তো নিজের চোখেই দেখলাম। কতটা পাপ করলে নিজের পেটের ছেলের এমন জঘন্য কাজ দেখতে হয়? তুই এমন জানোয়ার হতে পারিস এটা ভাবতেও আমার ঘৃণা লাগছে।”
শুভ্র মাথা নিচু করে অপরাধীর মতো দাঁড়িয়ে রইল। ও বিড়বিড় করে বলতে চাইল।
“আম্মু তুমি যা দেখেছ তা মিথ্যা নয়। কিন্তু… কিন্তু রিদি আমার… আমার…”
সাহেরা চৌধুরী ওর কথা শেষ করতে না দিয়েই এবার তীক্ষ্ণ গলায় চি-ৎ-কা-র করে উঠলেন।
“কী? রিদি কী তোর? বল! থামলি কেন?”
শুভ্র এবার এক পলক রিদির দিকে তাকাল। রিদি তখনো মাথা নিচু করে মেঝেতে পাথরের মতো বসে আছে, ওর চোখের জল সমানে ঝরছে। শুভ্র বুক ভরে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে সাহেরা চৌধুরীর চোখের দিকে সরাসরি তাকিয়ে গম্ভীর গলায় বলল।
“আম্মু, রিদি আমার বিবাহিত স্ত্রী।”
কথাটা শোনার সাথে সাথে সাহেরা চৌধুরীর মাথায় যেন আস্ত একটা পাহাড় ভেঙে পড়ল। তাঁর পায়ের তলার মাটি সরে যাওয়ার দশা। তিনি বড় বড় চোখ করে অবিশ্বাস্য গলায় চি-ৎ-কা-র করে উঠলেন।
“কীহহহহ!”
শুভ্র দ্রুত এগিয়ে গিয়ে ওর মায়ের দুই কাঁধ শক্ত করে ধরে শান্ত করার চেষ্টা করে বলল।
“আম্মু, তুমি আগে শান্ত হও। আমি তোমাকে সব বুঝিয়ে বলব। প্লিজ আম্মু, একটু রিল্যাক্স হও, শান্ত হও।”
সাহেরা চৌধুরী যেন নিজের কানকেও বিশ্বাস করতে পারছেন না। তিনি শুভ্রর হাত সরিয়ে দিয়ে চিৎকার করে বললেন।
“কী বললি তুই? রিদি তোর বিবাহিত স্ত্রী? আমার সাথে কি তুই ইয়ারকি করছিস শুভ্র?”
শুভ্র চোয়াল শক্ত করে দরাজ গলায় বলল।
“না আম্মু, আমি একদম মজা করছি না। তোমার কি মনে হয় তোমার ছেলে এমন সিরিয়াস বিষয়ে মজা করার মতো ছেলে? রিদি সত্যি আমার বিয়ে করা স্ত্রী।”
কথাটা শোনার সাথে সাথেই সাহেরা চৌধুরীর চোখের সামনে সবকিছু অন্ধকার হয়ে এল। তিনি সহ্য করতে না পেরে সোজা জ্ঞান হারালেন। শুভ্র চট করে উনাকে ধরে ফেলল নাহলে উনি সিমেন্টের মেঝেতে আছাড় খেতেন। মুহূর্তেই শুভ্রর ভেতরের শান্ত ভাবটা উবে গিয়ে সেখানে চণ্ডাল রাগ ভর করল। ও রক্তচক্ষু নিয়ে রিদির দিকে তাকিয়ে দাঁতে দাঁত চেপে গর্জে উঠল।
“সব তোর জন্য হয়েছে! খুব তেজ না তোর? এই বা’লের তেজ কমানোর সব কৌশল এই সাইফান শুভ্র চৌধুরীর খুব ভালো করে জানা আছে। দেখে নিব তোকে আমি।”
ডাক্তার এসে সাহেরা চৌধুরীকে ভালো করে পরীক্ষা করলেন। স্টেথোস্কোপটা সরিয়ে নিয়ে গম্ভীর মুখে জানালেন যে, অতিরিক্ত মানসিক চাপের ফলেই তিনি জ্ঞান হারিয়ে ফেলেছেন। বাড়ির সবাই তখন উৎকণ্ঠা নিয়ে সাহেরা চৌধুরীর শয্যাপাশে ভিড় করে দাঁড়িয়ে আছে। শুধু শুভ্র সেখানে নেই।
শুভ্র তখন বাড়ির পেছনের পুকুরপাড়ে অস্থির পায়ে পায়চারি করছে। মায়ের সামনে গিয়ে দাঁড়াতেও আজ ওর নিজের কাছে নিজেকে খুব ছোট মনে হচ্ছে। রাগের চোটে শুভ্র পুকুরপাড়ের একটা পুরোনো গাছের ছাল খামচে ধরল। ওর কপালের রগগুলো রাগে দপদপ করে ফুলে উঠেছে। রিদির ওপর ওর রাগটা এখন চরমে। কোনোভাবেই ও নিজেকে শান্ত করতে পারছে না। বারবার ওর হাতের মুঠি শক্ত হয়ে আসছে, আবার শিথিল হচ্ছে। শুভ্র দাঁতে দাঁত চেপে বিড়বিড় করে নিজেকে নিজে শাসন করল।
“না, না! আমাকে কন্ট্রোল থাকতে হবে। কন্ট্রোলের বাইরে চলে গেলে সবকিছুই হাতের বাইরে চলে যাবে। কন্ট্রোল সাইফান শুভ্র চৌধুরী। আউট অফ কন্ট্রোল হওয়া চলবে না।”
বেশ কিছুক্ষণ পর শুভ্রা হন্তদন্ত হয়ে পুকুরপাড়ে ছুটে এসে বলল।
“ভাইয়া, তুমি এখানে? আম্মুর জ্ঞান ফিরেছে। তাড়াতাড়ি আসো।”
কথাটা বলেই শুভ্রা আবার ভেতরের দিকে দৌড় দিল। শুভ্র নিজের ঠোঁট গোল করে কয়েকবার বড় বড় শ্বাস নিল। নিজেকে যতটা সম্ভব স্বাভাবিক করার চেষ্টা করে ও ধীর পায়ে বাড়ির ভেতর প্রবেশ করল। হাঁটতে হাঁটতে ও সোজা সাহেরা চৌধুরীর ঘরে গিয়ে ঢুকল। রিদি তখনো ঘরের এক কোণে অপরাধীর মতো মাথা নিচু করে মূর্তির মতো দাঁড়িয়ে আছে। শুভ্রকে ঘরে ঢুকতে দেখেই সাহেরা চৌধুরী ক্লান্ত চোখে সবার দিকে তাকালেন। তারপর ধরা গলায় বললেন।
“তোমরা সবাই এখন এই রুম থেকে যাও। আমি শুভ্রের সাথে একা কথা বলতে চাই।”
সাহেরা চৌধুরীর হুকুমে ঘরের সবাই একে একে বেরিয়ে গেল। রিদি ঘর থেকে বের হওয়ার ঠিক আগ মুহূর্তে একবার শুভ্রের দিকে তাকাল। শুভ্রও তখন একদৃষ্টে ওর দিকেই তাকিয়ে ছিল। দুজনের চোখাচোখি হতেই রিদি তড়িঘড়ি করে মাথা নিচু করে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল। শুভ্র সাথে সাথে একদম ছোট বাচ্চার মতো অপরাধী মুখে করুণ সুরে ডাক দিল।
“আম্মুউউ।”
ছেলের ডাক শুনেই সাহেরা চৌধুরী ঝট করে মুখ ঘুরিয়ে নিলেন। শুভ্র পরিষ্কার বুঝতে পারল তার আম্মু ভীষণ অভিমান করেছে। ও ধীর পায়ে এগিয়ে এসে সাহেরা চৌধুরীর বিছানার পাশে বসল। মায়ের একটা হাত নিজের হাতের মুঠোয় নিয়ে মিনতির স্বরে বলল।
“আম্মুউ, শোনো না। তুমি তো কিছু না শুনেই শুধু শুধু আমার ওপর রাগ করছো।”
সাহেরা চৌধুরী এবার মুখ ফিরিয়ে ধরা গলায় বললেন।
“কী শুনব শুনি? যে ছেলে নিজের মাকে না জানিয়ে একা একা বিয়ে করে ফেলতে পারে, সে আর যাই হোক আমার ছেলে হতে পারে না। যা তুই এখান থেকে। তুই আমার শুভ্র না। আমার শুভ্র তো আমাকে অনেক ভালোবাসে।”
শুভ্র এবার আলতো করে সাহেরা চৌধুরীর দুই গাল ধরে নিজের দিকে ঘুরিয়ে আনল। তারপর খুব নরম স্বরে বলল।
“আম্মু, আগে আমার কথাটা একটু মন দিয়ে শোনো। তারপর তুমি যা বলবে আমি তাই করব। প্রমিস।”
সাহেরা চৌধুরী এবার স্থির দৃষ্টিতে শুভ্রের দিকে তাকালেন। শুভ্র বুক চিরে আসা একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে একে একে সব সত্যি সাহেরা চৌধুরীর সামনে মেলে ধরল। পুরো ঘটনা শুনে সাহেরা চৌধুরীর চোখ তো বিস্ময়ে ছানাবড়া হয়ে গেল। তিনি অস্ফুট স্বরে বলে উঠলেন।
“বলিস কী! তার মানে রিদিকে নির্ভান বিয়ে করতে চেয়েছিল?”
শুভ্র মাথা নিচু করে ধরা গলায় স্বীকার করল।
“হ্যাঁ আম্মু। সেদিন পরিস্থিতি এমন ছিল যে আমি ওকে..।”
শুভ্র কথা শেষ করার আগেই সাহেরা চৌধুরী হাত নেড়ে বাধা দিয়ে বলে উঠলেন।
“তাই আমি ওকে হুট করে বিয়ে করে নিলাম। তাই তো? কিন্তু তুই কি একবারও ভেবে দেখেছিস তোর বাবা জানলে কী হবে? উনি আত্মীয়ের মধ্যে আত্মীয়তা করা একদমই পছন্দ করেন না। এই বিষয়টা জানাজানি হলে বাড়ির অবস্থা কী হবে সেটা কি এক মুহূর্তের জন্যও তোর মাথায় এসেছে?”
শুভ্র দ্রুত তার মায়ের হাত দুটো নিজের শক্ত মুঠোয় পুরে নিল। চোখেমুখে প্রবল আকুতি নিয়ে বলল।
“আম্মু! আমার ওপর একটু ভরসা রাখো। আমি সব ঠিক করে দেব। জাস্ট আমাকে অল্প কিছু সময় দাও।”
সাহেরা চৌধুরী কপালে চিন্তার ভাঁজ ফেলে গুমরা মুখে বললেন।
“তবুও তোর বাবা জানলে তোর ফুপির সাথেও চরম রাগারাগি করবে। তুই তো তোর বাবার জেদ চিনিস। উনি একবার বিগড়ে গেলে আর কাউকে পরোয়া করেন না।”
শুভ্র এবার পরম মমতায় তার মায়ের হাতের তালুতে একটা উষ্ণ চুমু খেল। তারপর আত্মবিশ্বাসের সাথে মৃদু হেসে বলল।
“কিচ্ছু হবে না। সব ঠিক হবে। আর তোমার ছেলে বেঁচে থাকতে কোনো অন্যায় হতে দেবে না। তুমি শুধু তোমার শুভ্রের ওপর একটু বিশ্বাস রাখো।”
সাহেরা চৌধুরী ছেলের মুখের দিকে অপলক কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইলেন। উনার দীর্ঘশ্বাসের সাথে যেন একটা চাপা কষ্ট বেরিয়ে এল। তারপর একদম নিচু আর ভেজা গলায় প্রশ্ন করলেন।
“ভালোবাসিস রিদিকে?”
শুভ্র সাথে সাথে নখ কামড়াতে কামড়াতে বিরক্তির সুরে বলল।
“না, ওর মতো মেয়েকে ভালোবাসা যায় না। ভালোবাসি না আমি।”
সাহেরা চৌধুরী ছেলের কথা শুনে এক মুহূর্ত দেরি করলেন না। তিনি ঝট করে শুভ্রের কানটা শক্ত করে মুচড়িয়ে ধরে হেসেই ফেললেন।
“হ্যাঁ, ভালোবাসা যায় না বলেই তো সাত-পাঁচ না ভেবে হুট করে বিয়ে করে নিলি! আমি কি তোর মা হয়ে কিচ্ছু বুঝি না রে, কি ভাবিস তুই নিজেকে?”
শুভ্র ব্যথায় উঁ উঁ করে উঠল, তারপর সাথে সাথে দাঁড়িয়ে সাহেরা চৌধুরীর কাঁধ জড়িয়ে ধরে আহ্লাদী গলায় বলল।
“উমম! এর জন্যই তো তুমি আমার পৃথিবীর বেস্ট আম্মু। কিছু বলতে হয় না, তার আগেই ছেলের মনের সব ভাষা বুঝে যাও।”
সাহেরা চৌধুরী ছেলের আদর দেখে মৃদু হেসে বললেন।
“হয়েছে থাক, এত তেল মারতে হবে না। আগে এটা বল, তুই যে ওকে ভালোবাসিস সেটা কি ও জানে?”
শুভ্র একটু থমকে গিয়ে নিচু স্বরে বলল।
“না আম্মু, এখনো বলি নাই।”
সাহেরা চৌধুরী আকাশ থেকে পড়লেন। তিনি অবাক হয়ে বললেন।
“বলিস কী! এখনো বলিস নাই? কিন্তু কেন?”
শুভ্র আবার বিছানায় মায়ের পাশে বসে গুমরা মুখে বলল।
“কারণ ও বড্ড বেশি লাফালাফি করে, যেটা আমার একদমই সহ্য হয় না। তার ওপর যদি এখন ওকে আমার ভালোবাসার কথা বলি, ও তো মাথায় চড়ে আরও বেশি লাফালাফি শুরু করবে।”
সাহেরা চৌধুরী ছেলের মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে শান্ত গলায় বোঝাতে লাগলেন।
“পাগল ছেলে! খুশিতে মানুষ তো একটু পাগল হবেই, তাই বলে কি মনের কথা এভাবে চেপে রাখা যায়? শোন, ভালোবাসা বেশি প্রকাশ করাও ভালো না, আবার একদম প্রকাশ না করে থাকাও ভালো না। একতরফা ভালোবাসা না প্রকাশেই সুন্দর লাগে, কিন্তু যখন দুজন দুজনকে ভালোবাসে, তখন সেই ভালোবাসা গোপন রাখলে শুধু ভুল বোঝাবুঝি আর সমস্যার সৃষ্টি হয়। আর আমার যতটুকু ধারণা, রিদিও তোকে ভালোবাসে। তাই দুজন যখন দুজনকে পছন্দ করিস, তখন মনের কথাটা জানিয়ে দেওয়াই ঠিক। ভাবিস না আমি শুধু তোর মা আমি একদিকে যেমন তোর মা, অন্যদিকে তোর সবথেকে বড় বন্ধু। তাই বন্ধু হয়েই বলছি, রিদিকে তোর মনের কথাটা আজই জানিয়ে দে।”
সাহেরা চৌধুরীর কথা শুনে শুভ্রর মুখে এক চিলতে হাসি ফুটে উঠল। ও সাথে সাথে বিছানা থেকে উঠে দাঁড়িয়ে আবারও ঝাপটে ধরে মায়ের কাঁধ জড়িয়ে ধরল। গভীর মমতায় সাহেরা চৌধুরীর গালে একটা শব্দ করে চুমু দিয়ে উচ্ছ্বসিত গলায় বলল।
“আম্মুউউ! তুমি এত ভালো কেন বলো তো? তুমি আসলেই পৃথিবীর সব থেকে সেরা আম্মুউ। আমি জানতাম আমার আম্মু সবসময় আমার পাশেই থাকবে। আই লাভ ইউ সো মাচ আম্মু!”
সাহেরা চৌধুরী ছেলের কপালে হাত বুলিয়ে দিয়ে স্নেহমাখা গলায় বললেন।
“আই লাভ ইউ টু মাই সান। এখন বল, আমি যা যা বললাম তা তুই করবি তো?”
শুভ্র একটু লাজুক হেসে সাহেরা চৌধুরীর চোখের দিকে তাকিয়ে দৃঢ় কণ্ঠে বলল।
“তুমি বলেছো আর আমি করব না, তা কি হয়? আমি খুব তাড়াতাড়িই ওকে আমার মনের কথা জানাব। আমাকে জাস্ট একটু সময় দাও, কথা দিচ্ছি সবটা জানিয়ে দেব।”
সাহেরা চৌধুরী ছেলের চিবুক ছুঁয়ে অবিশ্বাসের সুরে খানিকটা টিটকারি দিয়ে বললেন।
“সত্যি তো? নাকি পরে আবার মত বদলে ফেলবি?”
শুভ্র সাথে সাথে নিজের কান ধরে বাচ্চার মতো মাথা নেড়ে বলল।
“একদম সত্যি! সত্যি সত্যি তিন সত্যি!”
সাহেরা চৌধুরীর সাথে কথা বলে শুভ্র যখন রুম থেকে বের হলো, ওর ঠোঁটে তখন এক চিলতে মিষ্টি হাসি লেগে আছে। এই হাসিটা সচরাচর ওর মুখে দেখা যায় না, আর যখন দেখা যায় যেকোনো মেয়ের হৃদস্পন্দন থামিয়ে দেওয়ার জন্য এই এক চিলতে হাসিই যথেষ্ট। শুভ্রের মতো গম্ভীর আর রাগী খোলসের নিচে যে এক অদ্ভুত রোমান্টিক প্রেমিক লুকিয়ে আছে, সেটা ঈশান ছাড়া আর কেউ জানে না। শুভ্র পকেটে দুই হাত গুঁজে দিয়ে আনমনে শিস বাজাতে বাজাতে করিডোর দিয়ে হাঁটতে লাগল। ওর গলার পুরুষালী সুরে গুনগুন করে গান মেতে উঠল।
~সারারাত ভর চোখের ভেতর~
~স্বপ্নে তোমার আনাগোনা~
~নেমে আসে ভোর থাকে তবু ঘোর~
~হাওয়ায় হাওয়ায় জানাশোনা~
এদিকে উঠোনে তখন এক এলাহি কাণ্ড। রিদি, শুভ্রা, মিহি, পাখি, তূর্য, রিফাত আর ঈশান মিলে গোল হয়ে দাঁড়িয়ে পেয়ারা খাচ্ছিল আর আড্ডা দিচ্ছিল। হঠাৎ বারান্দা থেকে ভেসে আসা সেই ভরাট কণ্ঠের গান শুনে সবাই চমকে বারান্দার করিডোরের দিকে তাকাল। দেখল, শুভ্র আপন মনে গান গাইতে গাইতে ছাদের সিঁড়ির দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। মুহূর্তেই সবার চোখ কপালে উঠে গেল! পাখি মুখের পেয়ারাটা চিবানো বন্ধ করে হাঁ করে শুভ্রের দিকে তাকিয়ে থেকে বলল।
“এ বাবা! শুভ্র ভাই গান গাইতাছে? আমি কি এইটা স্বপ্নে দেখতাছি?”
মিহিও ঘোরের মধ্যে থেকে বলল।
“আমিও মনে হয় তোর সাথে একই স্বপ্নে চলে এসেছি রে!”
ঈশান নিজের কানকে বিশ্বাস করতে পারছে না। ও বিড়বিড় করে বলল।
“বস গান গাইছে! এইটাও আমার আজ বিশ্বাস করতে হচ্ছে? এইটা আবার বসের কোন রূপ?”
রিদি তো একদম পাথরের মতো দাঁড়িয়ে। জীবনে এই প্রথম ও শুভ্রকে এতটা খুশিতে ডগমগ হতে দেখছে। কিন্তু এত খুশি হওয়ার কারণ কী? ও তো ভেতরে ওর আম্মুর সাথে কথা বলতে গেল, তাহলে হঠাৎ এমন কী হলো যে ও এভাবে গান ধরল?
কৌতূহল সামলাতে না পেরে সবাই পা টিপে টিপে শুভ্রের পিছু নিল। শুভ্র ততক্ষণে ছাদে উঠে এসেছে। চারদিকে গোধূলির আলো মিলিয়ে গিয়ে ঝাপসা অন্ধকার নামতে শুরু করেছে। শুভ্র ছাদের এক কোণে থাকা একটা গোলাপ গাছের সামনে গিয়ে থামল। একটা টকটকে লাল গোলাপ ছিঁড়ে নাকে নিয়ে লম্বা করে ঘ্রাণ নিল ও। তারপর আকাশের দিকে মুখ তুলে দুই হাত পাখির ডানার মতো মেলে দিয়ে উচ্চস্বরে সুরেলা কন্ঠে গেয়ে উঠল।
~তুমি দেখা দিলে তাই~
~মনে জাগে প্রেম প্রেম কল্পনা~
~আমি তোমার হতে চাই~
~এটা মিথ্যা কোনো গল্প না~
ঠিক সেই মুহূর্তেই কারও কাশির শব্দে শুভ্রের গানের তরী মাঝপথে থমকে গেল। ও ঝট করে ঘাড় ঘুরিয়ে দেখল, ছাদের দরজায় এক পাল উঁকিঝুঁকি দিচ্ছে। চোখের পলকে শুভ্রের সেই রোমান্টিক চেহারা উবে গিয়ে রাগী আর গম্ভীর রূপটা ফিরে এল। শুভ্রের সেই রক্তচক্ষু দেখেই কারোর আর বুঝতে বাকি রইল না যে কপালে দুঃখ আছে। সবাই যে যেদিকে পারল সিঁড়ি দিয়ে দে দৌড়!
রিদিও ওদের সাথে পাল্লা দিয়ে দৌড়াতে লাগল। কিন্তু প্রবাদ আছে না, ‘যেখানে বাঘের ভয় সেখানেই রাত হয়’ রিদির ক্ষেত্রেও ঠিক তাই হলো। ও তাড়াহুড়ো করে দৌড় দিতে গিয়েই নিজের পায়ের সাথে পা লেগে ‘ধপাস’ করে ছাদের ওপর আছাড় খেল। কনুইয়ে প্রচণ্ড চোট পেয়ে ও ব্যথায় কঁকিয়ে উঠে অস্ফুট স্বরে চিৎকার করে উঠল।
“আহহহ!”
“কেয়ারলেস একটা।”
চলবে
Share On:
TAGS: অসম্ভব রকম ভালোবাসি তোমায়, সুমি চৌধুরী
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
নির্লজ্জ ভালোবাসা পর্ব ৭০
-
অসম্ভব রকম ভালোবাসি তোমায় পর্ব ২১
-
নির্লজ্জ ভালোবাসা পর্ব ৮১
-
অসম্ভব রকম ভালোবাসি তোকে পর্ব ২
-
নির্লজ্জ ভালোবাসা পর্ব সারপ্রাইজ
-
অসম্ভব রকম ভালোবাসি তোমায় পর্ব ৯
-
অসম্ভব রকম ভালোবাসি তোমায় পর্ব ১৫
-
নির্লজ্জ ভালোবাসা পর্ব ৮০
-
অসম্ভব রকম ভালোবাসি তোমায় পর্ব ৬
-
নির্লজ্জ ভালোবাসা পর্ব ৫৯