Golpo romantic golpo অসম্ভব রকম ভালোবাসি তোমায়

অসম্ভব রকম ভালোবাসি তোমায় পর্ব ৩০


অসম্ভবরকমভালোবাসি_তোমায়

লেখিকাসুমিচৌধুরী

পর্ব ৩০

শুভ্রা বেশ কিছুক্ষণ গম্ভীর মুখে ভাবতে লাগল কোন গানটা গাইলে জুতসই হবে। হঠাৎ ওর মাথায় এই বছরের একটা অদ্ভুত ভাইরাল গান গেঁথে গেল, যেটা ও কদিন ধরে লুপে শুনে এক কলি মুখস্থ করে ফেলেছে। শুভ্রা নিজের গলাটা একটু ঝেড়ে পরিষ্কার করে নিল, তারপর চোখ বন্ধ করে একদম কোনো মাজারের পিরের মতো ভক্তিতে গদগদ হয়ে গলার সুর টা টেনে টেনে গেয়ে উঠল।

~বেলতলী সলেমান ল্যাংটা~
~দোহায় ল্যাংটা দোহায় ল্যাংটা~
~কাটা কেল্লা কাটা কেল্লা~
~কেলায় করে আল্লাহ আল্লাহ~

~কলি শাহ আর কান্দু শাহ~
~ভক্তে করে তোমার আশা~
~রাহআলি শাহ সোবাহান শাহ~
~তুমি ভক্তের মুসকিল কোশা~

~গুলিস্তানের গোলাপ শাহ বাবা~

পরের লাইনটা মুখ দিয়ে বের হওয়ার আগেই হঠাৎ নিস্তব্ধ ছাদ কাঁপিয়ে কে যেন চিল্লিয়ে বলে উঠল।

“হেইইইইইই বাবা!

শুভ্রা ঝট করে চোখ খুলে দেখল, ছাদের অবস্থা রীতিমতো লেজেগোবরে! শুভ্র বাদে বাকি সবাই হাসতে হাসতে ছাদের মেঝের ওপর শুয়ে পড়েছে। ইমন তো হাসির চোটে গড়াগড়ি খেতে খেতে একদম ছাদের রেলিংয়ের কাছে চলে গেছে। ওই ‘হেই বাবা’ চিৎকারটা ইমনই দিয়েছিল। সে এখন নিজের প্যান্টের চেইন খামচে ধরে কুঁকড়ে আছে অবস্থা দেখে মনে হচ্ছে যে কোনো মুহূর্তে ‘মেশিন’ স্টার্ট হয়ে অঘটন ঘটে যেতে পারে!ইমন অনেক কষ্টে টলমল পায়ে উঠে দাঁড়িয়ে বড় বড় শ্বাস নিতে নিতে শুভ্রার দিকে তাকিয়ে করুণ স্বরে বলল।

“আপু, দোহাই লাগে খেলা একটু থামাও! আমি আগে একটু নিচে থেকে আসি, নাহলে মেশিন যে কোনো টাইমে স্টার্ট হয়ে ইজ্জত পাংচার করে দিবে!”

এই বলেই ইমন এক প্রকার দৌড়ে সিঁড়ি দিয়ে নিচে নেমে গেল। ওর এই দশা দেখে বাকিদের হাসির তোড় আরও বেড়ে গেল। ঈশান তো হাসতে হাসতে প্রায় আধমরা হয়ে গেছে। রিদি দুই হাত পেছনে ঠেস দিয়ে বসে হাসতে হাসতে চোখে পানি এনে ফেলেছে। শুধু শুভ্র একদম চুপচাপ নিজের জায়গায় বসে আছে, ও আদৌ হেসেছে কি না কেউ হলফ করে বলতে পারবে না।কিছুক্ষণ পর যখন হাসির রোল একটু থিতু হলো, তখন তুর্য শুভ্রার দিকে তাকিয়ে হাঁপাতে হাঁপাতে বলল।

“বোন রে! মানুষ বলে ঠেকে নাকি শেখে, আর আমি আজ জন্মের শিক্ষা পাইলাম। জীবনেও আর তোমার কাছে হাসির গান শুনতে চাইব না। আরেকবার শুনলে ইমনের মতো আমাদেরও অবস্থা হবে, শেষে ছাদ ধুইতে ধুইতে রাত পার হয়ে যাবে!”

শুভ্রা নিজের জয়ী হওয়ার ভঙ্গিতে কাঁধ ঝাকিয়ে ঠোঁট উল্টে বলল।

“আমি কী করব? আপনারা হাসির গান শুনতে চেয়েছেন, আমি শুনিয়েছি। ব্যস, আমার কাজ আমি পারফেক্টলি করেছি!”

কিছুক্ষণের মধ্যেই ইমন ‘মিশন’ সামলে নিয়ে হাঁপাতে হাঁপাতে ছাদে ফিরে এল। পরিস্থিতি কিছুটা স্বাভাবিক হতেই এবার বোতল ঘুরানোর দায়িত্ব নিল শুভ্রা। বোতলটা বনবন করে ঘুরে সরাসরি গিয়ে থামল ঈশানের দিকে মুখ করে। শুভ্রা তো খুশিতে এক লাফে দাঁড়িয়ে চিৎকার করে উঠল।

“পেয়েছি! এবার আমি ভাইয়াকে প্রশ্ন বা কাজ দেব। ভাইয়া, আপনি কী নেবেন? ট্রুথ নাকি ডেয়ার?”

ঈশান একটু সময় নিয়ে চিন্তা করল। ডেয়ার নিলে এই পাগলি মেয়ে তাকে দিয়ে কী যে করাবে তার ঠিক নেই, তবুও সাহস করে ডেয়ার বেছে নিল।শুভ্রা সাথে সাথে সুযোগ বুঝে ফন্দি এঁটে বলল।

“ঠিক আছে! তাহলে আপনাকে একটা গান গাইতে হবে। তবে যে সে গান নয়, এমন একটা গান গাইবেন যেটা আপনার জীবনের সাথে একদম হুবহু মিলে যায়!”

ঈশান এবার মহাচিন্তায় পড়ে গেল। কোন গানের সাথে নিজের জীবন মেলাবে ভেবেই পাচ্ছে না। হঠাৎ একটা গানের সুর ওর মাথায় খেলে গেল। সে একটা লম্বা শ্বাস ফেলে শর্ত দিয়ে বলল।

“ওকে, গাইব। তবে একা নয়, আমার সাথে রিফাত, তুর্য আর রাসেলকেও গাইতে হবে। কারণ এই গান একা গাইতে একদম ভালো লাগে না, গ্রুপে জমবে বেশি!”

শুভ্র এসব ফালতু কাজে সময় নষ্ট করতে না চেয়ে উঠে চলে যেতে চাইল, কিন্তু ইমন আর রিফাত মিলে এক প্রকার জোর করেই ওকে আবার বসিয়ে দিল। এরপর সব ছেলেরা ঈশানের দিকে তাকাল, ঈশান কোন গানটা শুরু করবে সেই অপেক্ষায়। ঈশান চোখ বন্ধ করে গলা খাঁকারি দিয়ে পুরো দমে গেয়ে উঠল।

~ব্যাচেলর আমি ব্যাচেলর~
~বিন্দাস লাইফে কোনো পেইন নেই আমার~

আচমকা এই গান শুনে উপস্থিত সব ছেলেরা (শুভ্র বাদে) যেন নিজেদের জীবনের প্রতিচ্ছবি খুঁজে পেল। রিফাত, তুর্য আর রাসেল সাথে সাথে ঈশানের তালে তাল মিলিয়ে সমস্বরে গেয়ে উঠল।

~ব্যাচেলর আমি ব্যাচেলর~
~বিন্দাস লাইফে কোনো পেইন নেই আমার~

এবার যেন ছাদ ফাটার উপক্রম হলো। রিদিরা হাসিমুখে ছেলেদের এই পাগলামি দেখতে লাগল। ছেলেরা আরও উচ্চস্বরে, হাততালি দিয়ে গানের পরের অন্তরগুলো গাইতে শুরু করল।

~ব্যাচেলর হয়ে যখন বাড়ি ভাড়া নিতে যাই~
~বাড়িওয়ালা বলে ব্যাচেলরের জায়গা নাই~
~আঙ্কেল, আমি আপনার মেয়ের জামাই হতে আসি নাই~
~থাকার মতো ছোটখাটো একটা জায়গা চাই~

~ব্যাচেলর আমি ব্যাচেলর~
~বিন্দাস লাইফে কোনো পেইন নেই আমার~

ছেলেদের গান শেষ হওয়ার পর মেয়েরা সবাই জোড়ে হাততালি দিয়ে উঠল। শুভ্রা ঈশানের দিকে তাকিয়ে একটু হেসেই বলল।

“কিন্তু ভাইয়া, আপনি তো চাকরি করেন, আপনি তো আর সেই ব্যাচেলর নেই।”

ঈশান হাত ঝাড়া দিয়ে হেসে বলল।

“দুর মিয়া, অত হিসাব মিলাতে এসো না তো। তবে এই গানটা এখন পুরোপুরি না মিললেও, বস আসার আগে একদম এই গানের মতোই ছিল আমার জীবনটা।”

আর কেউ কথা বাড়াল না। এবার বোতল ঘোরানোর দায়িত্ব নিল ইমন। বোতলটা বনবন করে ঘুরে একদম সরাসরি শুভ্রের সামনে গিয়ে থামল। শুভ্র পালানোর পথ না দেখে সোজাসুজি ‘ট্রুথ’ বেছে নিল। ঈশান সবাইকে থামিয়ে দিয়ে শুভ্রের চোখের দিকে স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে বেশ গম্ভীর গলায় প্রশ্ন করল।

“বস, আপনাকে যদি বলা হয় ভালোবাসা মানে এক প্রকার অপরাধ, তবে এই কথার ওপর ভিত্তি করে আপনি কী ব্যাখ্যা দেবেন?”

মুহূর্তের মধ্যে ছাদের ওপর এক পিনপতন নীরবতা নেমে এল। আড্ডার সব হাসি-ঠাট্টা যেন এক নিমিষেই উধাও। সবাই চরম কৌতুহল নিয়ে শুভ্রের দিকে তাকিয়ে আছে জানতে চাইছে এই কঠোর মনের মানুষটার ভেতরে ভালোবাসার সংজ্ঞাটা আসলে কেমন। রিদিও আড়চোখে বারবার তাকাচ্ছে শুভ্রের উত্তরের অপেক্ষায়।শুভ্র কিছুক্ষণ চুপ করে থাকল। সে ধীরস্থিরভাবে চোখ বন্ধ করল। তারপর একটা তপ্ত দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে ঈশানের দিকে তাকিয়ে শান্ত কিন্তু দৃঢ় গলায় বলল।

“ভালোবাসা যে অপরাধ, তার সঠিক কোনো ব্যাখ্যা হয়তো আমি দিতে পারব না। কারণ ভালোবাসা তো আর এক প্রকারের হয় না। ভালোবাসা অনেক রকমের হয়। কারও কাছে ভালোবাসা মানে সুন্দর অনুভূতি, আবার কারও কাছে ভালোবাসা তীব্র ঘৃণা, কারও কাছে ভালোবাসা এক নিছক অপরাধ, কারও কাছে এটা স্রেফ একটা খেলা, আবার কারও কাছে ভালোবাসা মানে অনেক বড় পাপ। তবে আমার ক্ষেত্রে ব্যাপারটা একটু আলাদা।”

শুভ্র কয়েক মুহূর্তের জন্য থামল। ওর দৃষ্টি তখন অজান্তেই রিদির বিষণ্ণ চেহারার ওপর গিয়ে স্থির হলো। রিদির সেই ফোলা গাল আর ফাটা ঠোঁটের দিকে তাকিয়ে শুভ্রর বুকটা যেন একবার কেঁপে উঠল। সে আবার বলতে শুরু করল।

“তাকে ভালোবাসা যদি হয় অপরাধ, তবে আমি সেই ভুলের নেবো বারে বারে স্বাদ।”

শুভ্রের এই কাব্যিক আর সাহসী উত্তর শুনে সবাই যেন এক মুহূর্তের জন্য পাথরের মূর্তি হয়ে গেল। রিদি স্তব্ধ হয়ে শুভ্রের চোখের দিকে তাকিয়ে রইল। এই উত্তরটা কি শুধু খেলার খাতিরে, নাকি এটা কোনো এক গোপন স্বীকারোক্তি? ছাদের ওই ম্লান আলোয় শুভ্রকে আজ এক রহস্যময় প্রেমিকের মতো মনে হচ্ছে।
ঈশান জোরে একটা হাততালি দিয়ে উঠল। তুর্য শুভ্রের পিঠে একটা হালকা চাপড় মেরে হাসতে হাসতে বলল।

“কিরে শালা! প্রেম করছিস লুকিয়ে লুকিয়ে, তাই না? নাহলে তোর মুখ দিয়ে এমন রোমান্টিক ডায়ালগ বের হওয়ার তো কথা না!”

শুভ্র এক মুহূর্ত তুর্যের দিকে স্থির দৃষ্টিতে তাকাল। তারপর খুব স্বাভাবিক গলায় পালটা প্রশ্ন করল।

“তোকে কে বলল আমি প্রেম করছি? নিজের মনগড়া গল্প বানানো বন্ধ কর।”

তুর্য দমে না গিয়ে নাছোড়বান্দার মতো বলল।

“প্রেম না করলে এত সুন্দর আর গভীর কথা কেন বললি? এর পেছনে নিশ্চয়ই কোনো রহস্য আছে, যেটা তুই লুকাচ্ছিস।”

শুভ্র এবার কিছুটা বিরক্ত হয়ে গম্ভীর গলায় উত্তর দিল।

“কথাটা আমার ভালো লেগেছে, তাই বলেছি। এর বেশি কিছু না। ফালতু প্রশ্ন করে সময় নষ্ট করবি না, আমি আর কোনো উত্তর দিতে পারব না।”

শুভ্রের কড়া মেজাজ দেখে আর কেউ কথা বাড়ানোর সাহস করল না। সবাই আবার খেলায় মন দিল। একে একে সবার পালা শেষ হলো। কেউ কেউ মজার মজার সব গোপন কথা ফাঁস করল, আবার কেউ অদ্ভুত সব কাজ করে হাসির রোল তুলল। কিন্তু সবার শেষে বোতলের মুখটা গিয়ে থামল সরাসরি রিদির দিকে।রিদি কী ভেবে যেন জেদের বশেই ‘ডেয়ার’ নিয়ে ফেলল। সাথে সাথে শুভ্র বিদ্যুৎবেগে বলে উঠল।

“আমি কাজ দেব! এবার রিদি আমার দেওয়া ডেয়ার পূরণ করবে।”

শুভ্রর কথা শুনে রিদির বুকের ভেতরটা যেন কেঁপে উঠল। এই লোকটার ওপর তো কোনো ভরসা নেই, না জানি কী অদ্ভুত কাজ দিয়ে বসে! রিদি মনে মনে ভাবল, কেন যে ট্রুথ নিতে গেল না! সে একবার শুকনো ঢোক গিলে অসহায়ের মতো শুভ্রের দিকে তাকাল।শুভ্র ঠোঁটের কোণে সেই চিরচেনা বাঁকা হাসিটা ফুটিয়ে তুলল। রিদির চোখের মণির দিকে তাকিয়ে সে খুব আয়েশ করে বলল।

“তোর জন্য খুব সহজ একটা কাজ। তুই ওই ছাদের একদম কিনারায় গিয়ে এক পা ওপরে তুলে আর দুই কান ধরে টানা ৩০ মিনিট দাঁড়িয়ে থাকবি। এইটাই তোর জন্য আমার দেওয়া ডেয়ার।”

শুভ্রের এই অমানবিক আর অদ্ভুত কাজের কথা শুনে উপস্থিত সবার চোখ কপালে উঠল। রিদি তো বিশ্বাসই করতে পারছে না যে শুভ্র সবার সামনে এমন একটা শাস্তি দিতে পারে। সে এক লাফে দাঁড়িয়ে তীব্র বিস্ময় আর রাগে চিৎকার করে উঠল।

“কীহহহহহহ! আপনি কি পাগল হয়ে গেছেন? আমি কেন কান ধরে এক পায়ে দাঁড়িয়ে থাকব?”

শুভ্র রিদির আপত্তির তোয়াক্কা না করে একদম পাথরের মতো শক্ত গলায় বলল।

“কেন দাঁড়িয়ে থাকবি সেটা কোনো প্রশ্নই না। যখন ডেয়ার নিয়েছিস, তখন সেটা পালন করা এখন তোর দায়িত্ব। আমার দেওয়া ডেয়ার এটাই, আর তোকে এখন এটাই করতে হবে। কোনো ওজর-আপত্তি চলবে না।”

শুভ্রের এই অদ্ভুত আর কিছুটা নিষ্ঠুর জেদ দেখে রাসেল পাশে বসে নিচু স্বরে বিড়বিড় করে উঠল।

“এটা কেমন ডেয়ার? এটা তো রীতিমতো টর্চার!”

রাসেলের কথাগুলো শুভ্রের কানে স্পষ্ট গেল, কিন্তু সে পাত্তাই দিল না। রিদি এবার রাগে ফেটে পড়ে বলল।

“এমন কোনো ডেয়ার হয় নাকি? ডেয়ার মানে তো কোনো কাজ করা, কিন্তু আপনি যেটা দিচ্ছেন সেটা তো নির্ঘাত সাজা! আমি তো কোনো অপরাধ করিনি যে আমাকে এভাবে শাস্তি ভোগ করতে হবে। আমি পারব না আপনার এই আজেবাজে ডেয়ার পালন করতে!”

শুভ্র এবার একটু আয়েশ করে বসে বাঁকা হেসে বলল।

“আরে বাবা, ডেয়ার মানেই তো চ্যালেঞ্জ। আমার কাছে এটাই ডেয়ার আর তোকে এটাই করতে হবে। আর যদি না পারিস, তবে একটা অপশন আছে। ঈদের দিন যত টাকা সালামি পেয়েছিস, তার সবটুকু আমাদের দিয়ে দিবি। আমরা সবাই মিলে সেই টাকা দিয়ে গ্র্যান্ড পিকনিক করব। এখন তুই ভেবে দেখ কী করবি।”

রিদি এবার মহাবিপদে পড়ে গেল। সে কিছুতেই বুঝতে পারছে না এই লোকটা কেন বারবার ওর জমানো সালামির টাকার ওপর নজর দেয়! রিদি রাগী দৃষ্টিতে শুভ্রের দিকে তাকিয়ে রইল, যেন চোখ দিয়েই ওকে ভস্ম করে দেবে। শুভ্র ঘড়ির দিকে তাকিয়ে আবার তাড়া দিয়ে বলল।

“রাগী চোখে তাকিয়ে কোনো লাভ নেই মিসেস! এখন কোনটা বেছে নিবি কান ধরে দাঁড়িয়ে থাকা নাকি টাকাগুলো হাসিমুখে আমাদের হাতে তুলে দেওয়া? সময় মাত্র ৫ সেকেন্ড। ওয়ান… টু… থ্রি… ফোর… ফাই…।”

শুভ্র ‘ফাইভ’ বলার আগেই রিদি চিৎকার করে বলে উঠল।

“থামুন! দাঁড়াচ্ছি আমি, দাঁড়াচ্ছি!”

শুভ্র তৃপ্তির হাসি হেসে বলল।

“গুড চয়েস! এই তো লক্ষ্মী মেয়ের মতো কথা।”

রিদি রাগে গজগজ করতে করতে ছাদের এক কোণে গিয়ে কান ধরে দাঁড়াল। শুভ্র দূর থেকে ওকে লক্ষ্য করে আঙুল উঁচিয়ে আবার শাসন করার সুরে বলল।

“উঁহু! শুধু কান ধরলে হবে না, এক পা ওপরে তুলতে হবে। জলদি!”

রিদি রাগে দাঁতে দাঁত চেপে এক পা ওপরে তুলে টাল সামলাতে সামলাতে দাঁড়িয়ে রইল। ছাদের বাকি সবাই হাঁ করে রিদির এই দশা দেখছে। রাসেলের মুখ চুন হয়ে গেছে, কিন্তু শুভ্রর মুখে তখন এক পৈশাচিক আনন্দের বাঁকা হাসি। সে যেন রিদিকে শাসন করার এই সুযোগটা খুব তারিয়ে তারিয়ে উপভোগ করছে।

ছাদের ওপর সময় যেন থমকে দাঁড়িয়েছে। একে একে ইমন, তুর্য, রিফাত আর ঈশান আড্ডা শেষ করে নিচে নেমে গেল। রাসেলের ফোনে একটা জরুরি কল আসায় সেও কথা বলতে বলতে সিঁড়ি দিয়ে অদৃশ্য হলো। মিহি আর পাখি যখন যাওয়ার তোড়জোড় করছিল, শুভ্রাও ওদের সাথে নিচে নেমে গেল।

এখন বিশাল ছাদের ওপর নিস্তব্ধ রূপালি জ্যোৎস্নায় শুধু রিদি আর শুভ্র। রিদির অবস্থা তখন করুণ। এক পায়ে দাঁড়িয়ে থাকতে থাকতে ওর সারা শরীর থরথর করে কাঁপছে, কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম জমেছে। মনে হচ্ছে এখনই বুঝি ও জ্ঞান হারিয়ে লুটিয়ে পড়বে। শুভ্র ধীর পায়ে হেঁটে রিদির একদম সামনে এসে দাঁড়াল। ওর ঠোঁটের কোণে এখনো সেই রহস্যময় আর বাঁকা হাসিটা লেগে আছে।

রিদি কাঁপতে কাঁপতে অস্ফুট স্বরে জিজ্ঞেস করল।

“কে-কেন এমন করছেন? এই অমানুষিক ডেয়ার দেওয়ার মানে কী? আমি আপনার কী ক্ষতি করেছি?”

শুভ্র কথা বলল না। সে আরও এক ধাপ এগিয়ে রিদির খুব কাছে চলে এল। শুভ্রের তপ্ত নিঃশ্বাস তখন রিদির মুখের ওপর আছড়ে পড়ছে। শুভ্র খুব আলতো হাতে রিদির কপালে এসে পড়া এলোমেলো চুলগুলো সরিয়ে কানের পিঠে গুঁজে দিল। তারপর নিচু আর গম্ভীর গলায় বলল।

“বলেছিলাম না? রাসেলের থেকে দূরে থাকতে। ওকে ওভাবে হাসিমুখে আসকারা দিয়ে আমাকে রাগিয়ে দিলে তার ফল কখনো ভালো হবে না। এখন নিজের হাড়ের ওপর দিয়ে টের পাচ্ছেন তো ফলটা কতটুকু ‘ভালো’ হচ্ছে, মিসেস শুভ্র চৌধুরী?”

শুভ্রের হাতের স্পর্শ আর ওই ‘মিসেস শুভ্র চৌধুরী’ ডাকটা শুনে রিদি যেন বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হলো। শারীরিক ক্লান্তিতে ওর শরীরটা টলমল করে উঠল। রিদি ভারসাম্য হারিয়ে পেছনের দিকে পড়ে যেতে নিলেই শুভ্র এক ঝটকায় নিজের শক্ত হাত দিয়ে ওর কোমর জড়িয়ে ধরে ফেলল।রিদি টাল সামলাতে না পেরে সরাসরি শুভ্রের চওড়া বুকের ওপর আছড়ে পড়ল। দুজনের হৃদপিণ্ডের ধুকপুকানি তখন এক হয়ে মিশে যাচ্ছে। শুভ্র ওর কোমর আরও শক্ত করে চেপে ধরে রিদির চোখের গভীরে তাকিয়ে রইল। রিদির চোখে তখন জলটলমল অভিমান, আর শুভ্রের চোখে সীমাহীন অধিকারবোধ।

রিদি কোনো রকম এক দলা শ্বাস টেনে নিজের টাল সামলানোর চেষ্টা করল। শুভ্রর হাতের শক্ত বাঁধন ওর শরীরের হাড়গোড় যেন গুঁড়িয়ে দিতে চাইছে। রিদি নিচু স্বরে কাঁপা গলায় বলল।

“ছাড়েন আমায়, আমি নিচে যাব। অনেক হয়েছে আপনার এই পাগলামি।”

শুভ্র রিদির কথার তোয়াক্কা করল না। উল্টো ওর কোমরের ওপর নিজের হাতের পাক আরও শক্ত করে ওকে নিজের শরীরের সাথে একদম লেপ্টে ধরে কানের কাছে মুখ নিয়ে ফিসফিস করে বলল।

“যদি না ছাড়ি? তাহলে কী করবি তুই? জাস্ট টেল মি।”

রিদি অন্ধকারেই শুভ্রর ওই ধকধকে চোখের দিকে তাকিয়ে রইল। ওর গলার স্বর ধরে আসছে, তবুও সাহস সঞ্চয় করে বলল।

“ছাড়বেন না কেন?

শুভ্র ঠোঁটের কোণে সেই বাঁকা হাসিটা ফুটিয়ে নির্বিকার গলায় বলল।

“বিকজ ইটস মাই উইশ। আমার ইচ্ছে হয়েছে তোকে এভাবে ধরে রাখতে, তাই ছাড়বো না।”

রিদি এবার ক্ষিপ্ত হয়ে উঠল। সে ঝাজালো গলায় শুধাল।

“আপনার ইচ্ছেতেই কি সব হবে? আমার কি কোনো নিজস্ব ইচ্ছে নেই? না মানে, আপনি কি আমাকে আপনার হাতের পুতুল মনে করেন? আপনি যেভাবে নাচাবেন আমি সেভাবেই নাচব? ডোন্ট থিংক সো।”

শুভ্র এবার রিদির চিবুকটা এক হাত দিয়ে শক্ত করে চেপে ধরে ওর একদম মুখের কাছে মুখ নিয়ে এল। ওদের দুজনের নিঃশ্বাস তখন এক হয়ে মিশে যাচ্ছে। শুভ্র খুব গাঢ় স্বরে রিদির চোখের মণির দিকে তাকিয়ে বলল।

“আমার হাতের পুতুল হতে তোর সমস্যাটা কোথায় ? ভালোবাসার মানুষের হাতে পুতুল হতে কি খুব বেশি আপত্তি আছে তোর? ইউ নো আই লাভ ইউ।”

শুভ্রর মুখ দিয়ে বাক্যটা বের হওয়ার সাথে সাথেই সে যেন সংবিৎ ফিরে পেল। নিজের ওপর নিজেরই রাগ হলো অতিরিক্ত আবেগে এ কী বলে ফেলল সে! শুভ্র মুহূর্তের মধ্যে রিদির কোমর থেকে হাত সরিয়ে দিয়ে কয়েক ইঞ্চি দূরে সরে দাঁড়াল। রিদি কিছু বলার জন্য মুখ খোলার আগেই শুভ্র বেশ কঠোর গলায় পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার চেষ্টা করল।

“কিছু বলি নাই আমি, তুই ভুল শুনেছিস! শুনিস নাই তুই কিছুই, তোর কানে পোকা ঢুকেছে তুই ভুলভাল শুনেছিস। একদম বেশি ভাববি না। জাস্ট কাম ডাউন।”

শুভ্র নিজের অস্থিরতা লুকানোর জন্য পকেটে হাত ঢুকিয়ে রিদির দিক থেকে নজর সরিয়ে নিল। তারপর গলার স্বর স্বাভাবিক করার চেষ্টা করে দ্রুত বলল।

“আর হ্যাঁ, নিচে নেমে আয়। রাতে ছাদে বেশিক্ষণ থাকিস না, ঠান্ডা লেগে যেতে পারে। আর নেক্সট টাইম আমাকে এভাবে রাগিয়ে দিস না, নাহলে আজকের থেকেও দ্বিগুণ খারাপ হবে। বি কেয়ারফুল।”

বলেই শুভ্র আর এক মুহূর্ত দাঁড়াল না, গটগট শব্দে সিঁড়ি দিয়ে নিচে নেমে চলে গেল। রাতের নিস্তব্ধ আঁধারে রিদি একা ছাদের মাঝখানে মূর্তির মতো দাঁড়িয়ে রইল। তার চোখ-মুখ তখন বিস্ময়ের চরম পর্যায়ে। সে নিজের কপালে হাত দিয়ে বিড়বিড় করে বলতে লাগল।

“লোকটা কি সত্যিই আমাকে আই লাভ ইউ বলল? নাকি আমি সত্যি ভুল শুনলাম? সব কথা তো স্পষ্ট শুনলাম, তাহলে ওই শব্দগুলো কি ভুল শোনা সম্ভব? ইটস ইমপসিবল! আমার যতটুকু ধারণা, লোকটা আমাকে আই লাভ ইউ-ই বলেছে।”

রিদি উত্তেজনায় যেন কূলকিনারা খুঁজে পাচ্ছে না। হঠাৎ ভালোবাসার মানুষের মুখে এমন একটা বাক্য শোনা যে কতটা অবিশ্বাস্য হতে পারে, তা রিদি এখন হাড়হাড় টের পাচ্ছে। তার মন বলছে সে ঠিক শুনেছে, কিন্তু শুভ্রর তাৎক্ষণিক অস্বীকার তাকে দ্বিধায় ফেলে দিয়েছে। মনের ভেতরে এক বিশাল যুদ্ধ শুরু হয়ে গেছে সত্যি না কি ভ্রম।

রানিং…!

Share On:

TAGS: ,



CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
Related Posts
 

0 Responses

Leave a Reply