অসম্ভবরকমভালোবাসি_তোমায়
লেখিকাসুমিচৌধুরী
পর্ব ২৯
[শুরুতেই বলি গল্প রাজ্য পেইজে যারা গল্প পড়ছেন ওইটা কিন্তু ফেক পেইজ, ওইটা আমি না, আবার জিসা নামে পেইজে গল্প পড়ছেন ওইটা তো একটা চুন্নি কিন্তু বলেই লাব নেই আপনারা সেই ফেক পেইজেই গল্প পড়বেন শত বারণ করা সত্যেও]
রুমে এসে রিদি ধীর পায়ে আয়নার সামনে গিয়ে দাঁড়াল। নিজের প্রতিবিম্বের দিকে তাকাতেই দেখল ঠোঁটের কোণটা ফেটে গিয়ে লাল নোনা রক্ত জমে আছে, আর ফর্সা গালে শুভ্রর হাতের পাঁচ আঙুলের স্পষ্ট দাগ বসে গেছে। ব্যথায় গালটা দপদপ করছে, কিন্তু অদ্ভুতভাবে রিদি এবার আর কান্নায় ভেঙে পড়ল না। বরং তার ঠোঁটের কোণে এক চিলতে বিজয়ের হাসি ফুটে উঠল। আয়নার দিকে তাকিয়েই সে আপনমনে খিলখিল করে হেসে উঠে আনন্দিত গলায় বলল।
“মিস্টার সাইফান শুভ্র চৌধুরী আমাকে নিয়ে জেলাস! ভাবা যায়? হিংসেতে একদম জ্বলে পুড়ে খাক হয়ে যাচ্ছে লোকটা!”
রিদি নিজের আঙুল দিয়ে গালের সেই দাগটা আলতো করে ছুঁয়ে দেখল। ব্যথার চেয়েও শুভ্রর ওই অধিকারবোধের তীব্রতা তাকে বেশি নাড়া দিচ্ছে। সে আবারও আয়নার দিকে তাকিয়ে জেদি আর চ্যালেঞ্জিং সুরে ফিসফিস করে বলল।
“সো, মিস্টার সাইফান শুভ্র চৌধুরী! এখন তো আমি আপনাকে আরও জ্বালিয়ে মারব। যতক্ষণ না ওই পাথরটা গলে জল হচ্ছে আর আপনি নিজের মুখে ‘ভালোবাসি’ বলছেন, ততক্ষণ আমার শান্তি নেই। ভালোবাসি শোনার জন্য যা যা করতে হয়, আমি তার সবটাই করব। জাস্ট ওয়েট অ্যান্ড সি!”
রিদির চোখেমুখে এখন আর কোনো ভয়ের চিহ্ন নেই, বরং শুভ্রর মন জয় করার এক দুরন্ত নেশা ভর করেছে তার ওপর। সে জানে শুভ্রর ওই রাগটাই আসলে ওর দুর্বলতা।
দোতলা এক বাড়ির বিশাল বড়ই গাছের তলায় উঁকিঝুঁকি মারছে শুভ্রা আর ঈশান। ওদের মতলব একদম পরিষ্কার যেই দেখবে আশেপাশে কেউ নেই, অমনি গাছে একটা জোরসে ঝাঁকি দেবে। ঈশান এমনিতে চোর-পুলিশ খেলায় নেই, কিন্তু শুভ্রার মান ভাঙাতে আজ তাকে এই চুরির অভিযানে নামতে হয়েছে। অনেক বছর পর ঈশান বড়ই চুরি করতে এসেছে, তাই বুকের ভেতরটা যেন ড্রাম পেটাচ্ছে। কিন্তু কপাল খারাপ, বারবার কেউ না কেউ সামনে চলে আসছে, আর অমনি দুজনে দৌড়ে গিয়ে গ্রিলের ওপাশে লুকিয়ে পড়ছে। ঈশানের বুকটা ভয়ে একদম মেয়েমানুষের মতো ধুকপুক ধুকপুক করছে। শুভ্রা শক্ত করে ঈশানের কাঁধ ধরে ভারসাম্য বজায় রাখার চেষ্টা করছে। ঈশান ভয়ে হাঁপাতে হাঁপাতে মিনতি করার সুরে বলল।
“শুভ্রা, শোনো না! তোমাকে আমি বাজার থেকে অনেকগুলো বড়ই কিনে খাওয়াব, কথা দিচ্ছি। আমার না খুব ভয় লাগছে, ধরা পড়লে ইজ্জত আর থাকবে না।”
শুভ্রা সাথে সাথে চোখ পাকিয়ে ওর দিকে তাকিয়ে বেশ দাপুটে গলায় বলল।
“কিনে খাওয়ার চেয়ে চুরি করে খাওয়ার মজাই আলাদা, বুঝলেন? আমি মেয়ে হয়ে একটুও ভয় পাচ্ছি না, আর আপনি ছেলে হয়ে কাঁপছেন? ছিহ্! আপনার পুরুষত্ব কি এতই ভীতু?”
শুভ্রার মুখে ‘ভীতু’ শব্দটা শুনে ঈশানের আঁতে ঘা লাগল। সে নিজের ভাবমূর্তি রক্ষা করতে একটু তেজ দেখিয়ে বলল।
“এই মেয়ে! তুমি জানো আমি কতটা সাহসী? আমাকে ভীতু বলছ কোন সাহসে?”
শুভ্রা ঠোঁট উলটে তাচ্ছিল্য করে টিপ্পনী কেটে বলল।
“সাহস তো দেখতেই পাচ্ছি! নিজেই তো বলছেন ভয় পাচ্ছেন। তো ভয় পাওয়া মানেই তো ভীতু হওয়া, তাই না?”
ঈশান এবার নিজেকে সামলে নিয়ে একটু দার্শনিক ভাব ধরে নিচু স্বরে বলল।
“আরে, আমি অমন ভয়ের কথা বলিনি। চুরি করতে গেলে কার না একটু আধটু ভয় লাগে বলো তো? ব্রিটিশ চোর যারা, তাদেরও মনে হয় ভয় লাগে। আর সেখানে তো আমি সাধারণ একটা ঈশান মাত্র!”
শুভ্রা এবার বিরক্ত হয়ে ঈশানকে থামিয়ে দিয়ে কড়া গলায় নির্দেশ দিল।
“হয়েছে, অনেক জ্ঞান দিয়েছেন, বুঝেছি। এখন ওসব প্যাঁচাল বাদ দিয়ে নিজের টার্গেটে নজর রাখুন। মানুষ গেলেই কিন্তু ঝাঁকি দিতে হবে!”
ঈশান বেচারা আর কিছু না বলে কাঁচুমাচু মুখে গাছের ডালের দিকে তাকিয়ে রইল। শুভ্রার এই চুরির নেশা তাকে আজ কোথায় নিয়ে ঠেকায়, সেটাই দেখার বিষয়।
ঈশান আশেপাশে ভালো করে নজর বুলিয়ে নিল। যখন দেখল ত্রিসীমানায় কোনো মানুষ নেই, তখন সে গুটিগুটি পায়ে বড়ই গাছটার একদম নিচে গিয়ে দাঁড়াল। গাছটা খুব একটা মোটা নয়, মাঝারি গড়নের একটু জোরসে ঝাঁকি দিলেই টপাটপ বড়ই পড়ার উজ্জ্বল সম্ভাবনা আছে। ঈশান মনে মনে সাহস সঞ্চয় করে সবটুকু শক্তি দিয়ে গাছে এক বিশাল ঝাঁকুনি দিল।
সাথে সাথে বৃষ্টির মতো টুপটাপ করে বড়ই পড়তে লাগল মাটিতে। শুভ্রা তো খুশিতে আত্মহারা! সে তড়িঘড়ি করে মাটি থেকে বড়ই কুড়িয়ে নিজের ওড়নার আঁচলে ভরতে লাগল। তার চোখেমুখে তখন রাজ্যের আনন্দ। কিন্তু সেই আনন্দ বেশিক্ষণ স্থায়ী হলো না। হঠাৎ ঈশান দূর থেকে দেখল, লুঙ্গি পরা এক লোক হাতে একটা লাঠি নিয়ে ওদের দিকেই তড়তড় করে এগিয়ে আসছে এবং সম্ভবত ওদের দেখে ফেলেছে।
ঈশানের আত্মারাম খাঁচা হওয়ার দশা! সে এক মুহূর্ত দেরি না করে জান হাতে নিয়ে চিৎকার করে উঠল।
“আইলো রে! মালিক আইলো! পালাও শুভ্রা!”
বলেই ঈশান এক দৌড়ে সামনের গলি দিয়ে অদৃশ্য হওয়ার চেষ্টা করল। শুভ্রাও হাতে থাকা বড়ইগুলো সামলে নিয়ে ওড়নাটা শক্ত করে ধরে ঈশানের পেছন পেছন ঊর্ধ্বশ্বাসে দৌড়াতে লাগল। দৌড়াতে দৌড়াতে তার ওড়না থেকে দু-একটা বড়ই মাটিতে পড়ে যাচ্ছে, কিন্তু সেদিকে তাকানোর সময় এখন নেই। পেছনের লোকটা তখনো চিৎকার করছে, আর এই দুই চোর তখন বাতাসের বেগে নিজেদের ইজ্জত বাঁচাতে ছুটছে।
ঈশান আর শুভ্রা একছুটে সোজা চৌধুরী বাড়ির গেটের সামনে এসে থামল। ঈশান ক্লান্তিতে একদম শেষ, সে দুই হাঁটুতে হাত দিয়ে ঝুঁকে পড়ে সজোরে হাঁপাতে লাগল। ওর কপালে ঘাম জমেছে। অন্যদিকে শুভ্রাও হাঁপাচ্ছে, কিন্তু তার উৎসাহের কমতি নেই। সে ওড়নার আঁচল থেকে একটা টসটসে বড়ই বের করে আয়েশ করে কামড় দিয়ে তৃপ্তির স্বরে বলল।
“আহা! কতদিন পর মনে হচ্ছে এমন দারুণ টক-মিষ্টি বড়ই খাচ্ছি। জাস্ট হেভেনলি!”
ঈশান কোনোমতে সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে বড় বড় শ্বাস নিতে নিতে বিরক্ত আর আতঙ্কিত গলায় বলল।
“মজা তো লাগবেই! যা এক দৌড়ানি খেলাম আজ। ধরা পড়লে দুজনকেই দড়ি দিয়ে বেঁধে রাখত ওই বাড়ির লোকগুলো। উফ বাবা, একটুর জন্য বেঁচে গেছি! আমি আর নেই এসব চুরির মধ্যে, কান ধরলাম!”
শুভ্রা আর ঈশান বাড়ির ভেতরে ঢুকতেই দেখল উঠোনের একটা চাঙের ওপর পাখি, রিদি আর মিহি গোল হয়ে বসে আড্ডা দিচ্ছে। শুভ্রা বিজয়ীর বেশে এগিয়ে গিয়ে ওড়নার আঁচল থেকে মুঠো ভরে বড়ই বের করে সবার সামনে মেলে ধরে তাড়াহুড়ো করে বলল।
“এই নে নে, খা তাড়াতাড়ি! জাস্ট লুক অ্যাট দিস!”
বের করতে যতটুকু দেরি হলো, ওগুলো শেষ হতে তার চেয়েও কম সময় লাগল। সবাই কাড়াকাড়ি করে বড়ই নিয়ে মুখে পুরে দিল। পাখি একটা বড়ই চিবোতে চিবোতে অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল।
“আমাদের গাছের বড়ই তো সব শেষ হয়ে গেছে। তুই এতগুলো বড়ই কোথায় পেলি রে শুভ্রা?”
শুভ্রা বেশ গর্বের সাথে বুক ফুলিয়ে মুচকি হেসে বলল।
“চুরি করেছি!”
চুরির কথা শুনে রিদি চোখ বড় বড় করে ফেলল। সে রীতিমতো হকচকিয়ে গিয়ে বলল।
“চুরি? বলিস কী!”
শুভ্রা এবার ঈশানের দিকে আঙুল তুলে কৃতিত্ব দিয়ে হাসতে হাসতে বলল।
“হুম রে! সব সম্ভব হয়েছে ঈশানের জন্য। ও গাছে জুতমতো ঝাঁকি দিয়েছে আর আমি চটপট টকিয়ে নিয়েছি। আরও অনেক আনতে পারতাম, কিন্তু ওই বাড়ির মালিক দেখে ফেলেছিল।”
মিহি ঘটনাটা কল্পনা করে হোহো করে হাসতে হাসতে মজা করে শুধাল।
“তা মালিক দেখে ফেলার পর তোরা কি দৌড়ানি খাস নাই?”
শুভ্রা ওড়নাটা ঝাড়তে ঝাড়তে ফুরফুরে মেজাজে উত্তর দিল।
“দৌড়ানি আবার খাব না? ভাগ্যিস বড়ই গাছটা বাড়ির কাছেই ছিল, তাই এক দৌড়ে বাড়িতে চলে আসতে দেরি হলো না। নাহলে আজ আমাদের কপালে শনি ছিল!”
মিহি ঈশানের অসহায় মুখটার দিকে তাকিয়ে খিলখিল করে হেসে উঠে মজা করে বলল।
“তা ঈশান ভাইয়া, আপনি তো দেখি চুরিতে একদম মেয়েদের মতো ওস্তাদ! তো কী বলেন, আরও একবার যাওয়া যায় নাকি আপনাকে নিয়ে?”
ঈশান নিজের কান ধরে একদম কাঁচুমাচু হয়ে আঁতকে উঠে বলল।
“বাপ রে! কান ধরছি বোন, এই চুরির কারবারে আমি আর নাই। যা দৌড়ানি খাইছি, আজও রাতে স্বপ্নে দেখব!”
বলেই ঈশান আর এক মুহূর্ত না দাঁড়িয়ে বাড়ির ভেতরে সটকে পড়ল। রিদি, পাখি, শুভ্রা আর মিহি ওর যাওয়ার ভঙ্গি দেখে হাসতে হাসতে প্রায় গড়িয়ে পড়ল। ঈশানের এই ভিতু স্বভাবটা ওদের আড্ডার নতুন খোরাক হয়ে দাঁড়াল।
ধীরে ধীরে চারপাশ ঝাপসা হয়ে সন্ধ্যা নেমে এলো। গ্রামের সন্ধ্যাটা শহরে চেয়ে একদম আলাদা, এক অদ্ভুত নিস্তব্ধতা আর হিমেল হাওয়া। মিহি, পাখি, রিদি, শুভ্রার সাথে ইমনও ছাদে এল। সবাই মিলে ছাদের মাঝখানে গোল হয়ে বসে আড্ডা দিতে লাগল। রাতের আঁধারে খোলা আকাশের নিচে কাজিনরা যখন এক হয়, সেই আড্ডার মজাই অন্যরকম।
বেশ কিছুক্ষণ পর ফোনে কথা বলতে বলতে ছাদে এল শুভ্র। ওর পেছনে পেছনে তুর্য, রিফাত আর ঈশানও এল। শুভ্র একবার রিদিদের দিকে আড়চোখে তাকাল, কিন্তু কিছু না বলে একদম ছাদের কিনারায় গিয়ে গভীর মনোযোগে ফোনে কথা বলতে থাকল। এদিকে তুর্য, ঈশান আর রিফাত হাসিমুখে পাখিদের আড্ডার দিকে এগিয়ে এল। রিফাত সবার উদ্দেশ্যে বেশ অমায়িক গলায় বলল।
“হাই! তোমাদের সবার বুঝি এই টাইমে ছাদে আড্ডা দেওয়া হচ্ছে?”
মিহি চুলে হাত বুলিয়ে সহজ গলায় জানাল।
“হ্যাঁ ভাইয়া। আসলে আমরা কাজিনরা যখনই এক হই, এভাবে আড্ডা দেওয়া আমাদের কাছে একদম নতুন কিছু না।”
রিফাত এবার একটু সুযোগ বুঝে পরামর্শ দেওয়ার ঢঙে বলল।
“তা আমি কি তোমাদের এই আড্ডায় জয়েন করতে পারি?”
পাখি এক গাল হেসে অভয় দিয়ে বলল।
“আড্ডা দিতে আবার পারমিশন লাগে নাকি? দাঁড়িয়ে আছেন কেন, বসেন! যা আড্ডা দিবেন শুরু করেন।”
মাঝখান থেকে ইমন হঠাৎ উত্তেজনায় লাফিয়ে উঠে সবার মনোযোগ আকর্ষণ করে বলল।
“ধুর! শুধু আড্ডা দিলে কি আর ভালো লাগে? যেহেতু আমরা এখন অনেকে আছি, তাহলে চলো সবাই মিলে ট্রুথ অর ডেয়ার (Truth or Dare) খেলি!”
ইমনের প্রস্তাব শুনে সবার চোখেমুখে উত্তেজনার ঝিলিক দেখা দিল।মিহি ইমনের প্রস্তাবে বেশ সায় দিয়ে উৎসাহী গলায় বলল।
“কথাটা তুই মন্দ বলিস নাই রে ইমন! দাঁড়া, তোরা বস আমি নিচে গিয়ে চট করে একটা খালি বোতল নিয়ে আসছি।”
এই বলে মিহি এক দৌড়ে নিচে গিয়ে একটা কাঁচের বোতল নিয়ে এল। সবাই গোল হয়ে ছাদের মাঝখানে বসে পড়ল। রিফাত সুযোগ বুঝে একদম মিহির পাশেই জায়গা করে বসল। তুর্য বসল পাখির পাশে, আর ঈশান যখন দেখল আড্ডার বহর বাড়ছে সে কেটে পড়তে চাইল, কিন্তু শুভ্রা জোর করে টেনেটুনে ওকে নিজের পাশেই বসিয়ে দিল।
ঠিক সেই মুহূর্তে সিঁড়ি দিয়ে ছাদে উঠে এল রাসেল। সবাইকে এভাবে গোল হয়ে বসে থাকতে দেখে সে একটু অবাক হয়ে কৌতূহলী গলায় বলল।
“আরে, এখানে কী হচ্ছে? আড্ডা নাকি খেলাধুলার আসর বসিয়েছিস তোরা?”
রিদি রাসেলের দিকে তাকিয়ে ঠোঁটের কোণে একটা রহস্যময় হাসি ঝুলিয়ে স্বাভাবিক গলায় বলল।
“জ্বি ভাইয়া, আমরা ট্রুথ অর ডেয়ার খেলছি। আপনি চাইলে আমাদের সাথে জয়েন করতে পারেন।”
রাসেল যেন মেঘ না চাইতেই জল পেয়ে গেল! সে এক মুহূর্ত দেরি না করে সোজা রিদির একদম গা ঘেঁষে বসে পড়ল। রিদির ভেতরে তখন প্রচণ্ড বিরক্তি কাজ করছে, রাসেলের শরীরের উৎকট পারফিউমের গন্ধে ওর দম আটকে আসছে। কিন্তু শুভ্রকে জ্বালানোর জন্য এই হাসিটা ওকে রাখতেই হবে।
শুভ্র ফোনের কথা শেষ করে সবার দিকে ফিরতেই ওর চোয়াল শক্ত হয়ে এল। সবাই গোল হয়ে বসে আছে সেটা বড় কথা নয়, ওর নজর গিয়ে আটকেছে রিদির ঠিক পাশটিতে বসে থাকা রাসেলের ওপর। রিদির এত কাছাকাছি রাসেলকে দেখে শুভ্রর মাথায় যেন রক্ত চড়ে বসল। মেয়েটা কি পেয়ে বসেছে ওকে? ওকে না রাগিয়ে দিলে কি ওর পেটের ভাত হজম হয় না? শুভ্র বড় বড় নিঃশ্বাস ফেলে নিজেকে শান্ত করার ব্যর্থ চেষ্টা করল। তারপর সবার উদ্দেশ্যে বেশ ধমকের সুরে বলে উঠল।
“কী হচ্ছে এখানে? তোরা সবাই এভাবে রাস্তার পাগলের মতো গোল হয়ে বসে আছিস কেন? কোনো কাজ নেই তোদের?”
শুভ্রর এমন রুক্ষ মেজাজ দেখে তুর্য একদম দমে না গিয়ে উল্টো হাতছানি দিয়ে ডেকে বলল।
“আরে রাগছিস কেন? খেলা হবে আজ, জমে ক্ষীর হবে! তুইও আয়, এখানে বোস। সবাই মিলে খেললে দারুণ জমবে।”
শুভ্র যেন আগ্নেয়গিরির মতো জ্বলে উঠল। সে কড়া গলায় নির্দেশ দিল।
“কোনো খেলা-টেলা হবে না! ওঠ সবাই এখান থেকে।”
ইমন এবার একটু সাহস সঞ্চয় করে প্রতিবাদী গলায় বলল।
“ব্রো, এটা কিন্তু কোনো কাজের কথা বললা না তুমি! আমরা সবাই কত আশা নিয়ে খেলতে বসলাম আর তুমি বলছো খেলা হবে না? এমনিতে তোমাকে ভয় পেলেও এই মুহূর্তে তোমার এই অন্যায় কথা আমরা কেউ শুনব না।”
ইমনের সাথে বাকিরাও একমত হয়ে মাথা নাড়াল। শুভ্র বুঝতে পারল এই মুহূর্তে এদের গায়ের জোরে সরানো যাবে না। সে একটা কুটিল বুদ্ধি আঁটল। সে ধীর পায়ে হাঁটতে হাঁটতে ঠিক রিদির পেছনে গিয়ে দাঁড়াল। দুই হাত ট্রাউজারের পকেটে ঢুকিয়ে বেশ ভাব নিয়ে সবার উদ্দেশ্যে বলল।
“ঠিক আছে, তোরা খেল। আমি এখানে দাঁড়িয়েই দেখি।”
রিফাত এবার শুভ্রকে জোরাজুরি করে বলল।
“তুই দাঁড়িয়ে থাকবি কেন? আয় আমাদের সাথে বোস। সারাক্ষণ তো কাজ নিয়ে ব্যস্ত থাকিস, একটু সবার সাথে খেললে তোরও ভালো লাগবে।”
রিফাতের কথা শুনে শুভ্র এক চিলতে বাঁকা হাসল। রিদি তখনো রাসেলের পাশে আয়েশ করে বসে ছিল। শুভ্র সুযোগ বুঝে নিজের পায়ের আঙুল দিয়ে রিদির পেছনের দিকে আলতো করে সুড়সুড়ি দিয়ে দিল। রিদি আচমকা এই স্পর্শে কামড় দেওয়া পোকা ভেবে আতঙ্কে চিৎকার করে দাঁড়িয়ে পড়ল।
“আআআ! পোকা! পোকা! এখানে নির্ঘাত কোনো বিষাক্ত পোকা আছে!”
রিদি ভয় পেয়ে লাফিয়ে একটু সরে যেতেই শুভ্র সুযোগ বুঝে ধপাস করে ঠিক রিদির খালি হওয়া জায়গাটাতে বসে পড়ল। অর্থাৎ এখন শুভ্র বসেছে রাসেলের ঠিক পাশে, আর রিদি মাঝখান থেকে ছিটকে গেছে। রিদি হাঁ করে শুভ্রর দিকে তাকিয়ে থেকে অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল।
“কী হলো? আপনি আমার জায়গায় এসে বসলেন কেন? উঠুন বলছি, এটা আমার জায়গা ছিল!”
শুভ্র একদম উদাসীন ভাব ধরে নির্বিকার গলায় বলল।
“এইটা তোর জায়গা, এটা কোন দলিলে লেখা আছে শুনি? আমি জায়গা খালি পেয়েছি, তাই বসে পড়েছি।”
শুভ্রর এমন ভাবসাব দেখে রিদি ওর দিকে একদম কটমট করে তাকাল। কিন্তু অবাক কাণ্ড! শুভ্র রেগে যাওয়ার বদলে রিদির চোখের দিকে তাকিয়ে হঠাৎ একটা বাঁকা হাসি দিয়ে চোখ মারল। রিদি যেন বিদ্যুস্পৃষ্ট হলো! সে ঝটপট অন্য দিকে মুখ ফিরিয়ে নিল। লোকটার সাথে কথা বলাই বৃথা, সবসময় এমন অদ্ভুত আচরণ কেন করে কে জানে! শুভ্রা পাশ থেকে রিদির হাত টেনে নিজের পাশে জায়গা করে দিয়ে বলল।
“হয়েছে, থাক। চ্যাঁচামেচি করতে হবে না, এবার এখানে এসে বোস।”
রিদি রাগে দাঁত কিড়মিড় করতে করতে একদম শুভ্রর মুখোমুখি হয়ে বসে পড়ল। আড়চোখে তাকিয়ে দেখল শুভ্র তখনো ওর দিকে তাকিয়ে সেই রহস্যময় বাঁকা হাসিটা হাসছে। রিদি এবার নিশ্চিত হলো।লোকটাই ওকে রাসেলের পাশ থেকে সরানোর জন্যই এই কাণ্ডটা করেছে।
এদিকে রাসেল একদম অচল হয়ে বসে আছে।ওর পরিকল্পনাগুলো প্রতিবারই শুভ্রর কারণে ভেস্তে যাচ্ছে।
অবশেষে খেলা শুরু হলো। ইমন সজোরে বোতলটা ঘুরাতেই সেটা বনবন করে ঘুরে একদম শুভ্রার সামনে গিয়ে স্থির হলো। শুভ্রা কিছুক্ষণ ভেবেচিন্তে সাহস করে ‘ডেয়ার’ বেছে নিল। সেটা দেখে তুর্য এক গাল হেসে শুভ্রাকে চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়ে প্রশ্ন করল।
“শুভ্রা, তুমি একটা গান গাও যে গান শুনে হাসতে হাসতে আমাদের পেটে খিল ধরে যাবে। তবে মনে রেখো, গানটা যেন অবশ্যই হাসানোর মতো হয়। কোনো সিরিয়াস গান চলবে না কিন্তু!”
রানিং…!
Share On:
TAGS: অসম্ভব রকম ভালোবাসি তোমায়, সুমি চৌধুরী
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
নির্লজ্জ ভালোবাসা পর্ব ৭৮
-
নির্লজ্জ ভালোবাসা পর্ব ৬২
-
অসম্ভব রকম ভালোবাসি তোমায় পর্ব ৩২
-
অসম্ভব রকম ভালোবাসি তোমায় পর্ব ৬
-
নির্লজ্জ ভালোবাসা পর্ব ৬৭
-
অসম্ভব রকম ভালোবাসি তোমায় গল্পের লিংক
-
অসম্ভব রকম ভালোবাসি তোমায় পর্ব ৯
-
নির্লজ্জ ভালোবাসা পর্ব ৫৮
-
অসম্ভব রকম ভালোবাসি তোকে পর্ব ১
-
নির্লজ্জ ভালোবাসা পর্ব ৭৩