Golpo romantic golpo অসম্ভব রকম ভালোবাসি তোমায়

অসম্ভব রকম ভালোবাসি তোমায় পর্ব ২৩


অসম্ভবরকমভালোবাসি_তোমায়

লেখিকাসুমিচৌধুরী

পর্ব ২৩

🚫 অনুমতি ব্যতীত কপি করা নিষিদ্ধ 🚫

ড্রয়িংরুমে যেন একটা জীবন্ত আগ্নেয়গিরি ফেটে পড়ল। বরের মুখ থেকে ‘কবুল’ বেরোনোর আগেই অন্য কারো বজ্রকণ্ঠের সেই তিনবার ঘোষণা পুরো পরিবেশটাকে বরফ করে দিয়েছে। নির্ভান রাগে হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে পেছনে ঘুরে একরাশ বিশ্রী গালি দিতে গিয়েও মাঝপথে থেমে গেল। তার চোখের মণি স্থির হয়ে গেছে, ঠোঁট দুটো কাঁপছে অবিশ্বাসে।

সামনে আর কেউ নয়। স্বয়ং সাইফান শুভ্র চৌধুরী দাঁড়িয়ে আছে। সারা শরীরে নির্মম নির্যাতনের ক্ষত। শার্টের হাতা ছেঁড়া। কপালে শুকিয়ে যাওয়া রক্তের দাগ। কিন্তু চোখের মণি দুটো যেন জ্বলন্ত অঙ্গার। সেই দৃষ্টিতে এখন আর অসহায়ত্ব নেই। আছে এক হিংস্র আভিজাত্য। শুভ্রকে এভাবে মুক্ত অবস্থায় নিজের সামনে দেখে নির্ভানের রক্ত মাথায় চড়ে গেল। সে জানোয়ারের মতো চিৎকার করে এগিয়ে এসে শুভ্রর চোয়াল লক্ষ্য করে সজোরে একটা ঘুষি বসিয়ে দিল। শুভ্র টাল সামলাতে না পেরে কিছুটা ছিটকে গেল। ঠোঁটের কোণ ফেটে নোনা রক্ত গড়িয়ে পড়ল চিবুক বেয়ে। নির্ভান বাঘের মতো গর্জে উঠে চিল্লিয়ে বলল।

“তোর সাহস কী করে হয় রে শুয়োরের বাচ্চা? আমার অধিকারের জায়গায় কবুল বলার? তোকে তো আজ আমি জ্যান্ত কবর দেব কুত্তার বাচ্চা!”

বলেই নির্ভান আবার ঝাঁপিয়ে পড়তে চাইল শুভ্রর ওপর। কিন্তু এবার দৃশ্যপট বদলে গেল। শুভ্র নিজের শরীরের শেষবিন্দু শক্তি সঞ্চয় করে নির্ভানের ধেয়ে আসা হাতটা মাঝপথেই মট করে মুচড়ে ধরল। ব্যথায় নির্ভান কঁকিয়ে ওঠার আগেই শুভ্র তাকে হেঁচকা টানে নিজের একদম কাছে নিয়ে এল। দাঁত কিড়মিড় করে। আগুনের মতো তপ্ত নিশ্বাস নির্ভানের মুখে ফেলে শুভ্র হিসহিসিয়ে বলল।

“ইউ ফাকিং পিস অফ শিট। এতক্ষণ তোকে সুযোগ দিয়েছি বলে ভাবিস না যে আমি তোর হাতের খেলনা। তোর ওই গুষ্টি মারা রাগ আর দু পয়সার শক্তি আমি আমার আন্ডারওয়্যারের নিচে রাখি। বুঝলি খানকির পোলা? বাপের পয়সায় আর গুন্ডা পুষে লাফাচ্ছিস। তোর ওই ইগো আমি আজ তোর পুদে ঢুকিয়ে দেব। তুই ভাবলি কী করে যে শুভ্র চৌধুরীর জিনিসের দিকে হাত বাড়িয়ে তুই আস্ত থাকবি? বেজন্মার বাচ্চা?”

শুভ্রর এমন রুদ্রমূর্তি আর মুখের ওই নোংরা গালি শুনে নির্ভানের মতো খুনিও এক মুহূর্তের জন্য থমকে গেল। শুভ্রর হাতের মুঠি যেন লোহার সাঁড়াশি। যা নির্ভানের হাড় গুঁড়িয়ে দেওয়ার উপক্রম করছে। নিজের এতদিনের বিশ্বস্ত গার্ডদের এমন পাথরের মতো দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে সে হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে হুঙ্কার দিয়ে উঠল।

“কী দেখছিস তোরা? দাঁড়িয়ে তামাশা দেখছিস? ধর এই কুত্তার বাচ্চাকে। এখনই ছিঁড়ে টুকরো টুকরো করে ফেল একে।”

নির্ভানের কথা শেষ হওয়ার আগেই শুভ্র সজোরে এক ধাক্কা মারল তার বুকে। নির্ভান টাল সামলাতে না পেরে মেঝেতে আছড়ে পড়ল। ব্যথায় ককিয়ে উঠে সে আবারও পাগলের মতো চিৎকার করতে লাগল।

“ওই জানোয়ারের বাচ্চারা। তোদের চোখ অন্ধ হয়ে গেছে? দেখছিস না ও আমাকে মারছে? ধর এই শালাকে।”

কিন্তু পরের মুহূর্তেই ড্রয়িংরুমের দৃশ্যটা পাল্টে গেল এক বীভৎস নিস্তব্ধতায়। নির্ভানের নির্দেশে গার্ডরা নড়েচড়ল ঠিকই। কিন্তু তাদের বন্দুকের নল শুভ্রর দিকে না ঘুরে ঘুরে গেল খোদ নির্ভানের দিকে। চারদিক থেকে কালো কুচকুচে বন্দুকের নল এখন নির্ভানের কপালে আর বুকে তাক করা। নিজের কেনা কুত্তাদের নিজের দিকেই এভাবে ফণা তুলে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে নির্ভানের কলিজা শুকিয়ে গেল। সে অবিশ্বাসে তোতলামি করে চিৎকার করে উঠল।

“কী কী করছিস তোরা? মাথা খারাপ হয়ে গেছে? আমি তোদের বস। আমাকে গুলি তাক করেছিস? বিশ্বাসঘাতক শুয়োরের বাচ্চারা। তোদের আমি জ্যান্ত কবর দেব।”

শুভ্র মেঝের রক্তমাখা থুতু একপাশে ফেলে খুব তাচ্ছিল্যের সাথে নিজের কান দুটো আঙুল দিয়ে চেপে ধরল। যেন নির্ভানের চিল্লানি তার কানে বিষ ঢালছে। সে শান্ত পায়ে নির্ভানের সামনে গিয়ে নিচু হয়ে বসল। তারপর দাঁত বের করে এক পৈশাচিক হাসি দিয়ে বলল।

“আহহহ। একটু আস্তে চিল্লা না রে ফাক ফেস। গলাটা নিচে নামিয়ে কথা বল। তোর এই পোষা কুত্তারা আমার অনেক আগেই পোষা বিড়াল হয়ে গেছে। তুই ভাবলি কী করে যে তোর মতো একটা থার্ড ক্লাস ইডিয়টকে পাহারা দেওয়ার জন্য আমি আমার লোক পাঠাব না? এতদিন তুই যে জালে আমাকে আটকে রেখেছিলি। আসলে সেই জালের সুতোটা শুরু থেকেই আমার হাতে ছিল। তুই নিজের পাতা ফাঁদেই নিজে ধরা খেয়েছিস। শালা লুজার।”

শুভ্রর কথাগুলো নির্ভানের মাথায় ঢুকছিল না। সে মূর্তির মতো থমকে গিয়ে অবিশ্বাসের দৃষ্টিতে শুভ্রর দিকে তাকিয়ে রইল। তার সেই দাপট। সেই অহংকার যেন এক নিমিষেই কর্পূরের মতো উবে গেছে। শুভ্র নির্ভানের এই অবস্থা দেখে বাঁকা হাসল। তারপর পৈশাচিক শান্ত গলায় বলল।

“কী রে বাল। কিছু বুঝতে পারছিস না? জাস্ট চিল। আমি তোকে সব গুছিয়ে বোঝাচ্ছি।”

শুভ্র চোখের একটা ইশারা দিতেই একজন গার্ড ঝড়ের গতিতে বাইরে চলে গেল। কয়েক সেকেন্ডের এক হাড়কাঁপানো নিস্তব্ধতা। ঠিক তখনই ড্রয়িংরুমের দরজা ভেঙে যেন এক বিশাল বাহিনী ভেতরে ঢুকল। বুটের শব্দে মেঝে কেঁপে উঠল। ২০ জন সশস্ত্র পুলিশ অফিসার। ১২ জন এলিট ফোর্সের গার্ড আর তাদের সামনে বুক চিতিয়ে ঢুকল ঈশান। ঈশান ঘরে ঢুকেই শুভ্রর রক্তাক্ত আর ক্ষতবিক্ষত শরীরের দিকে তাকিয়ে আঁতকে উঠল। সে রুদ্ধশ্বাসে বলল।

“বস। আপনি ঠিক আছেন? আপনার শরীর তো পুরো শেষ করে দিয়েছে কুত্তার বাচ্চারা।”

শুভ্র শান্তভাবে শুধু একবার চোখ বুজে বোঝাল সে ঠিক আছে। এদিকে নির্ভানের চোখের মণি তখন চড়কগাছ। এতগুলো পুলিশ। তাও খোদ শুভ্রর সামনে জিভ বের করা কুকুরের মতো আজ্ঞাবহ হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। এই শুভ্র আসলে কে? যদি তার এতই ক্ষমতা। তবে কেন সে এতক্ষণ মার খেল? কেন সে নির্ভানের পায়ের নিচে পড়েছিল?

নির্ভানের এই হাজারো প্রশ্ন আর ধোঁয়াশার মাঝেই ঈশান একটা মোটা ফাইল বের করল। ঠিক সেই মুহূর্তে শহরের সবচেয়ে বড় ম্যাজিস্ট্রেট অফিসার এসে শুভ্রর ঠিক পাশে হাত বেঁধে দাঁড়ালেন। ঈশান ফাইলটা নির্ভানের কুৎসিত মুখের সামনে মেলে ধরে চড়া গলায় তার আসল পরিচয় উগড়ে দিতে লাগল।

“আরহাম খান নির্ভান। ছোটবেলা থেকেই যার রক্তে খুনাখুনি আর মারামারি। ক্ষমতার লোভে সে হয়ে উঠেছিল এই শহরের এক অঘোষিত মাফিয়া। গুনে গুনে ৪২ টা খুন আছে এই জানোয়ারের নামে। সেই খুনের বিচার থেকে বাঁচতে লন্ডনে পালিয়ে গিয়েও শান্তি হয়নি ওর। সেখানেও সে ১৯ জন মানুষকে নৃশংসভাবে মেরেছে। আর আজ তোর সেই সব পাপের অকাট্য প্রমাণ এই ফাইলে জ্বলজ্বল করছে। কুত্তার বাচ্চা।”

কথাগুলো শোনামাত্র নির্ভানের কলিজা শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেল। কপাল বেয়ে দরদর করে ঘাম ঝরতে লাগল। যে অন্ধকার অতীত সে মাটির নিচে পুঁতে এসেছিল। শুভ্র সেটা খুঁড়ে বের করল কীভাবে? ঠিক সেই মুহূর্তে নেহা রুমে ঢুকল। নিজের প্রতাপশালী ভাইকে এভাবে পুলিশ আর বন্দুকের নলের মুখে হাঁটু গেড়ে বসে থাকতে দেখে তার পায়ের নিচ থেকে মাটি সরে গেল। সে অবিশ্বাসে নিজের মুখে হাত দিয়ে পাথর হয়ে দাঁড়িয়ে রইল।

ঈশান এক অদ্ভুত শান্ত ভঙ্গিতে এগিয়ে এল। মেঝের ওপর হাঁটু গেড়ে বসল নির্ভানের ঠিক সামনে। নির্ভানের চোখে তখনো অবিশ্বাসের ঘোর। ঈশান ওর কানের একদম কাছে মুখ নিয়ে শীতল গলায় ফিসফিস করে বলল।

“তুই নিজেও জানিস না রে শয়তানের বাচ্চা। এতদিন কাকে খাঁচায় আটকে রেখে তুই হাত তোলার সাহস দেখিয়েছিস। সত্যিটা শুনবি? শুনলে তোর কলিজা ওখানেই ফেটে বের হয়ে আসবে।”

নির্ভান ফ্যালফ্যাল করে ঈশানের দিকে তাকিয়ে রইল। তার মাথায় কিছুতেই খেলছে না এই সাধারণ এক ব্যবসায়ী শুভ্রর কাছে এত ক্ষমতা এল কোত্থেকে? সে কীভাবে নির্ভানের লন্ডনের অন্ধকার অতীতের হাড়ির খবর বের করল? নির্ভানের এই হাজারো প্রশ্নের ঝড়ের মাঝেই ঈশান আবার ফিসফিসিয়ে বলল।

“কিংশুক নামটা কি কখনো শুনেছিলি?”

নামটা শোনা মাত্রই নির্ভানের সারা শরীর যেন বরফ হয়ে গেল। চোখের মণি দুটো কোটর থেকে বেরিয়ে আসার উপক্রম। বুকের ভেতরটা সত্যি দপ করে উঠল তার। কিংশুক আন্ডারওয়ার্ল্ডের সেই রহস্যময় সম্রাট। যার নাম শুনলে বাঘা বাঘা মাফিয়াদের হাঁটু কাঁপে। নির্ভানের মতো ছিঁচকে গুন্ডারা বহুবার চেয়েছে তার ছায়ার দেখা পেতে। তার সাথে হাত মেলাতে। কিন্তু কিংশুক তো সেই ধোঁয়া। যাকে ধরা যায় না। ছোঁয়া যায় না। তবে কি তবে কি সামনে দাঁড়িয়ে থাকা এই রক্তাক্ত শুভ্রই সেই ত্রাস?

নির্ভানের মাথা ঝিমঝিম করতে লাগল। পায়ের নিচ থেকে যেন পুরো পৃথিবীটাই সরে যাচ্ছে। নির্ভানের এই কুঁকড়ে যাওয়া অবস্থা দেখে ঈশান এক বীভৎস হাসি দিয়ে বলল।

“তুই যে এই ইঁদুরের গর্তে লুকিয়ে আছিস। সেটা বস সেদিনই জেনে গিয়েছিল যেদিন তুই রিদির ওই রক্তমাখা শাড়িটা পার্সেল করে পাঠিয়েছিলে। জানিস তো। বস সবসময় জানোয়ার হয় না। কিন্তু ও যখন একবার স্বরূপে ফেরে। তখন যমরাজও পথ ছেড়ে দেয়। তোর কপাল ভালো যে তুই বসের একমাত্র দুর্বলতায় হাত দিয়েছিলে। নাহলে মৃত্যু ছাড়া তোর কপালে আর কোনো শাস্তি জুটত না।”

ঈশান একটু থেমে নির্ভানের কপালে নিজের আঙুল দিয়ে টোকা দিয়ে আবার বলল।

“আসলে বস জানত। ও যদি সরাসরি কিংশুক হয়ে তোর সামনে আসত। তবে তুই রিদিকে নিয়ে কোনো বড় চাল চালতি। তুই তো সাপের মতো বিষাক্ত। বসের দুর্বলতা নিয়ে ওকে হারানোর নোংরা খেলা খেলতি। তাই বস ইচ্ছে করেই তোর খাঁচায় ধরা দিয়েছে। যাতে তুই ওকে দুর্বল ভেবে নিশ্চিন্ত থাকিস। যাই হোক। অনেক জ্ঞান দিয়ে ফেললাম। এখন শান্তিতে জেলে যা। আর সারাজীবন পচে পচে নিজের পাপের প্রায়শ্চিত্ত কর।”

নির্ভান এখন এক জ্যান্ত লাশ। যে রিদিকে পাওয়ার জন্য সে এত আয়োজন করেছিল। সেই রিদির ভালোবাসার মানুষটাই যে তার যম হয়ে দাঁড়াবে। সেটা সে দুঃস্বপ্নেও ভাবেনি।

ম্যাজিস্ট্রেট অফিসার অত্যন্ত বিনয়ের সাথে শুভ্রর সামনে এসে দাঁড়ালেন। শুভ্রর রক্তাক্ত শরীরের দিকে তাকিয়ে একরাশ শ্রদ্ধা নিয়ে তিনি বললেন।

“মিস্টার সাইফান শুভ্র চৌধুরী। আপনাকে কী বলে ধন্যবাদ দেব আমি ভাষা পাচ্ছি না। আসলে এই খুনের মামলাগুলো বহুবার টেবিলে উঠেছে। কিন্তু প্রতিবারই টাকার জোরে সব ধামাচাপা পড়ে গিয়েছে। আমরা হাজার চেষ্টা করেও এই জাল ছিঁড়তে পারিনি। অথচ আপনি একজন ব্যবসায়ী হয়ে যে অসাধ্য সাধন করলেন। তাতে এখন মনে হচ্ছে ম্যাজিস্ট্রেট আমি না। আসলে চেয়ারটা আপনারই পাওয়া উচিত ছিল।”

শুভ্র কোনো উত্তর দিল না। তার পাথরের মতো নিথর চোখের দৃষ্টি তখন অন্য কোথাও। পুলিশ যখন নির্ভানকে হাতকড়া পরিয়ে টেনে তোলার চেষ্টা করছে। ঠিক তখনই নেহা চিৎকার করে উঠল। সে শুভ্রর দিকে আঙুল উঁচিয়ে হিসহিসিয়ে বলল।

“শুভ্র। তুমি ভুলে যাচ্ছো যে ভাইয়া এখন রিদির হাজবেন্ড। তুমি ওকে জেলে পাঠালে রিদির কী অবস্থা হবে ভেবে দেখেছ? ও কি আর সমাজে মুখ দেখাতে পারবে? একটা মেয়ের জীবন এভাবে নষ্ট করার অধিকার তোমাকে কে দিয়েছে?”

নেহার এই করুণ আর বিষাক্ত যুক্তি শুনে ঈশান হো হো করে হেসে উঠল। হাসতে হাসতে নেহার একদম সামনে গিয়ে সে দাঁত বের করে বলল।

“ছিঃ ছিঃ ম্যাম। থুক্কু নেহা ম্যাম। আপনি তো দেখছি বড়সড় দুটো ভুল করে ফেলেছেন। এক আপনি হয়তো উত্তেজনার চোটে কাবিননামায় কী লেখা ছিল সেটা পড়ার সময় পাননি। আর দুই বিয়ে পড়ানোর ওই মোক্ষম সময়ে আপনি নিজেই তো ঘরে ছিলেন না। কোনো এক আননোন নাম্বারের ফোনে ব্যস্ত হয়ে বারান্দায় চলে গিয়েছিলেন। মনে পড়ছে কি? অবশ্য ফোনটা কিন্তু আমরাই দিয়েছিলাম।”

ঈশানের কথায় নেহার কপালে ভাঁজ পড়ল। সে অবিশ্বাসে ঈশানের দিকে তাকিয়ে রইল। ঈশান মজা পাওয়ার ভঙ্গিতে কাজী সাহেবের দিকে ফিরে বলল।

“কী গো মামু। নেহা ম্যামকে একটু ভালোবাসার ওই কিচ্ছাটা শোনান তো? সত্যিটা জানলে ওনার হার্ট অ্যাটাক হতে পারে।”

কাজী সাহেব কাঁপাকাঁপা হাতে কাবিননামার খাতাটা নেহার চোখের সামনে ধরলেন। গম্ভীর গলায় তিনি পাঠ করলেন।

“বিয়েটা নির্ভানের সাথে নয়। ৫ কোটি ২৫ লক্ষ ১ টাকা দেনমোহর ধার্য করিয়া তাসনিন রিদিকা স্বামী হিসেবে সোহান চৌধুরীর সুপুত্র সাইফান শুভ্র চৌধুরীকে কবুল করিয়াছে। ধর্মীয় এবং রাষ্ট্রীয় আইন মোতাবেক তাসনিন রিদিকা এখন সাইফান শুভ্র চৌধুরীর বিবাহিত স্ত্রী।”

নেহার পায়ের নিচ থেকে মাটি সরে গেল। সে ছোঁ মেরে কাজীর হাত থেকে খাতাটা কেড়ে নিয়ে চোখ বড় বড় করে দেখল। হ্যাঁ। ঠিক তাই লেখা। বর হিসেবে সাইফান শুভ্র চৌধুরীর নামই সেখানে জ্বলজ্বল করছে। নিজের অজান্তেই সে তার ভাইকে নয়। বরং তার সবচেয়ে প্রিয় মানুষ শুভ্রর সাথেই রিদির বিয়ে দিয়ে দিয়েছে। পুরো ঘর যখন এই অবিশ্বাস্য সত্যে স্তব্ধ হয়ে আছে। ঠিক তখনই শুভ্র তার ভাঙা গলায় কিন্তু দৃঢ় স্বরে কাজী সাহেবের উদ্দেশ্যে বলল।

“নতুন করে বিয়ের সব কাজ রেডি করেন। আমি আসছি।”

বিছানার এক কোণে হাঁটু ভাজ করে জড়সড় হয়ে বসে আছে রিদি। অতিরিক্ত কান্নার ফলে চোখের জল যেন শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেছে। চোখের চারপাশটা লাল হয়ে ফুলে আছে। তার সমস্ত সত্তা জুড়ে এখন কেবল শূন্যতা। আজ থেকে সে অন্য কারো স্ত্রী। এখন থেকে শুভ্র নামটা তার জন্য নিষিদ্ধ এক অধ্যায়। চাইলেও আর তাকে নিয়ে স্বপ্ন বোনা যাবে না। বলা যাবে না ভালোবাসি। এখন থেকে নির্ভান নামক ওই জানোয়ারটার সাথে তাকে সংসার করতে হবে। ভাবতেই রিদির গা গুলিয়ে উঠছে। বিষাদ আর ঘৃণা তাকে কুরে কুরে খাচ্ছে।

রিদির এই যন্ত্রণার মাঝেই হঠাৎ ক্যাঁচক্যাঁচ শব্দে দরজাটা খুলে গেল। রিদি চমকে দরজার দিকে তাকাল। দেখল সেখানে শুভ্র দাঁড়িয়ে আছে। শরীরে মারের দাগ থাকলেও চোখ মুখ এখন একদম শান্ত। শুভ্রকে দেখামাত্র রিদির ভেতরটা দুমড়ে মুচড়ে উঠল। কিন্তু পরক্ষণেই মনে পড়ল সে এখন অন্য কারো বিবাহিত স্ত্রী। সে দ্রুত উল্টো দিকে মুখ ঘুরিয়ে জানালার দিকে তাকাল। কান্নাভেজা। অভিমানে ভরা গলায় সে চিৎকার করে বলে উঠল।

“চলে যান এখান থেকে। আপনার মুখটাও আমি দেখতে চাই না। এখন আপনি আমার কাছে কেবলই একজন পরপুরুষ। দয়া করে চলে যান। আর কখনো আমার সামনে আসবেন না। আপনাকে এখন আমার সহ্য হচ্ছে না। কেন এসেছেন? একটা জ্যান্ত লাশ দেখতে? দেখে যান। হয়তো এই জ্যান্ত লাশ খুব তাড়াতাড়িই সত্যিকারের লাশে পরিণত হবে। খোদার দোহাই লাগে। আপনি চলে যান।”

কথাগুলো তীরের মতো ছুড়ে দিলেও রিদির বুক ফেটে যাচ্ছিল। মানুষটাকে চোখের সামনে দেখেও ছোঁয়া যাবে না। এটা সহ্য করার ক্ষমতা তার নেই। শুভ্র কোনো কথা না বলে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। সে ধীর পায়ে এগিয়ে এসে একদম রিদির গা ঘেঁষে বিছানায় বসে পড়ল। রিদি রাগে ফুঁসে উঠে বলল।

“কী হলো? কানে কথা ঢোকে না? আপনাকে বের হতে বলছি না? বের হোন এখনই।”

রিদির এই তীব্র অভিমান আর রাগ দেখে শুভ্রর ঠোঁটের কোণে একটা রহস্যময় হাসি ফুটে উঠল। সে মনে মনে রিদির এই অধিকারবোধ আর রাগ বেশ উপভোগ করছে। শুভ্র নিজের ঠোঁট কামড়ে হাসি চেপে রেখে কাঁধ দিয়ে রিদিকে আলতো করে একটা ধাক্কা দিল। তারপর রিদির একদম চোখের দিকে তাকিয়ে গুনগুন করে গেয়ে উঠল।

~পাগল পাগল মন আমার~
~তোমায় ভালোবাসে~
~কিছুই সে বোঝে নাতো~
~চাই যে তোমায় পাশে~
~চাই যে তোমায় পাশে~

আচমকা শুভ্রর মুখে এমন রোমান্টিক গান শুনে রিদি বিস্ময়ে আর বিরক্তিতে শুভ্রর দিকে তাকাল। শুভ্রও তখন অপলক দৃষ্টিতে দেখছিল তার মনোমোহিনীকে। চোখের গাঢ় কাজল। কপালে ছোট্ট টিপ। আর লাল টকটকে বেনারসি। সব মিলিয়ে রিদিকে সত্যি এক মোহময়ী কনের মতো লাগছে। মনে হচ্ছে সে যেন এই বাসর ঘরে শুভ্রর জন্যই প্রতীক্ষায় ছিল।

শুভ্রর এমন সম্মোহনী দৃষ্টি দেখে রিদি দ্রুত চোখ নামিয়ে নিল। সে বাঁ হাত দিয়ে শাড়ির আঁচলটা শক্ত করে মুচড়ে ধরে ধরা গলায় বলল।

“চলে যান বলছি। আমার স্বামী দেখলে কিন্তু খুব রাগ করবে। প্লিজ। যান।”

স্বামী শব্দটা শোনামাত্র শুভ্রর চোখ মুখ মুহূর্তেই শক্ত হয়ে গেল। বুকের ভেতর একটা তীব্র জেলাসি বা ঈর্ষা মোচড় দিয়ে উঠল। সে ঝট করে রিদির চিবুকটা আলতো কিন্তু দৃঢ়ভাবে চেপে ধরে নিজের দিকে ঘোরাল। রিদির চোখের গভীরে চোখ রেখে খুব গম্ভীর আর ভারী গলায় বলল।

“স্বামীর জন্য দেখি খুব দরদ উথলে পড়ছে। তা জনাবা। কোন স্বামীর কথা বলছেন শুনি?”

রিদি রাগে আর অভিমানে ফুঁসে উঠে শুভ্রর হাতটা সজোরে ঝটকা দিয়ে সরিয়ে দিল। নিজের ভেতরের সবটুকু জ্বালা উগরে দিয়ে বলল।

“কোন স্বামী আবার? যার সাথে কিছুক্ষণ আগে আমার এই হাতের সই আর কাজী সাহেবের কলম সাক্ষী রেখে বিয়ে হয়েছে। তার কথা বলছি।”

শুভ্র এবার একটু বাঁকা হাসল। রিদির চোখের মণির দিকে তাকিয়ে নির্বিকার গলায় প্রশ্ন করল।

“তা আপনার কোন মহান স্বামীর সাথে বিয়ে হয়েছে। শুনি?”

রিদি এবার বিরক্তিতে ফেটে পড়ল। জেদের বশে বলে উঠল।

“কার সাথে আবার? একটা জানোয়ার। না মানে। নির্ভানের সাথে বিয়ে হয়েছে আমার। নির্ভান এখন আমার স্বা…।”

বাকি শব্দটা উচ্চারণ করার আগেই শুভ্রর হাতের আঙুলগুলো সাপের মতো এসে রিদির ঠোঁট দুটো গোল করে চেপে ধরল। রিদি থমকে গেল। শুভ্রর চোখের মণি এখন নেশাক্ত আর ভয়ংকর। সে রিদির একদম কানের কাছে মুখ নিয়ে ঠান্ডা গলায় হিসহিসিয়ে বলল।

“বাকি শব্দগুলো ওখানেই আটকে থাক। আর বের করার দরকার নেই। আর নেক্সট টাইম যাতে এই ঠোঁট দিয়ে অন্য কোনো ছেলের নাম না শুনি। নাহলে এই সুন্দর ঠোঁট দুটো কেটে সেলাই করতে আমার কিন্তু বেশিক্ষণ লাগবে না। বুঝলি?”

শুভ্রর এই হঠাৎ পাগলামি আর অদ্ভুত আচরণে রিদি একদম ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেল। লোকটা কি সত্যিই পাগল হয়ে গেল? তার বিয়ে অন্য কারো সাথে হয়ে গেল। অথচ সে এখন উল্টো শাসন করছে। রিদি যখন নিজের ভাবনার জালে আটকে আছে। তখন শুভ্র হঠাৎ খুব যত্ন করে রিদির মাথার লাল টকটকে ঘোমটাটা টেনে ঠিক করে দিল। তারপর শান্ত গলায় বলল।

“চলেন। এখন যাওয়া যাক।”

রিদি ভ্রু কুঁচকে অবিশ্বাসের সুরে বলল।

“কোথায় যাবো?”

শুভ্র এবার রিদির মুখের ওপর একদম ঝুঁকে এল। তার তপ্ত নিশ্বাস রিদির নাকে মুখে আছড়ে পড়ছে। সেই নিশ্বাসের ঝাপটায় রিদির শরীরটা যেন অবশ হয়ে এল। শুভ্র এক পলক রিদির কাঁপতে থাকা ঠোঁটের দিকে তাকিয়ে গম্ভীর গলায় বলল।

“আমি কিন্তু বেশি কথা বলা একদম পছন্দ করি না। তাই আমার সামনে এসব ফালতু প্রশ্ন একদম কম করবি।”

কথাটা শেষ করেই শুভ্র এক মুহূর্ত সময় দিল না। রিদি কিছু বুঝে ওঠার আগেই শুভ্র তাকে এক হ্যাঁচকায় পাজাকোলে তুলে নিল। রিদি আতঙ্কে আর লজ্জায় শুভ্রর গলার ওপর হাত দিয়ে শক্ত করে চেপে ধরল। শুভ্র রিদিকে পাজাকোলে তুলে নিয়ে সটান ড্রয়িংরুমের মাঝখানে কাজী সাহেবের সামনে বসিয়ে দিল। পুরো ঘর নিস্তব্ধ। নেহা একপাশে পাথরের মূর্তির মতো দাঁড়িয়ে আছে। তার চোখের সামনেই তার ভালোবাসার মানুষটা অন্য একজনকে নিজের করে নিচ্ছে। এই দৃশ্য দেখার চেয়ে মৃত্যুও যেন তার কাছে শ্রেয় ছিল। দূরে পুলিশের কর্ডনের মাঝে হাতকড়া পরা অবস্থায় দাঁড়িয়ে আছে নির্ভান। তার লোলুপ দৃষ্টি এখনো তার মায়াবীর দিকে আটকে আছে। রিদিকে আজ লাল বেনারসিতে অপার্থিব সুন্দর লাগছে। অথচ এই সাজটা হওয়ার কথা ছিল নির্ভানের জন্য। ভাগ্যের কী নির্মম পরিহাস। আজ সে শুধুই দর্শক।

শুভ্র কাজী সাহেবের দিকে একপলক তাকিয়ে হুকুমের সুরে বলল।

“সকলের সামনে পুনরায় আবার বিয়ের কাজ শুরু করুন।”

রিদি যেন আকাশ থেকে পড়ল। সে অবিশ্বাসে চারদিকে তাকাচ্ছে। নির্ভানকে পুলিশ ধরে রেখেছে। নেহা মরা মানুষের মতো চুপচাপ দাঁড়িয়ে আছে। আর তার পাশে বসে আছে স্বয়ং শুভ্র। এসব কখন হলো? এই পুলিশ বা আসলো কোত্থেকে? রিদি যখন নিজের ভাবনার জালে হাবুডুবু খাচ্ছে। ঠিক তখনই শুভ্র তার নরম হাতটা নিজের শক্ত মুঠোয় পুরে নিল। রিদির একদম কানের কাছে মুখ নিয়ে ফিসফিসিয়ে বলল।

“তামাশা দেখার অনেক সময় পাবি। আপাতত এদিকে মন দে।”

শুভ্রর তপ্ত নিশ্বাসে রিদির সারা শরীরে একটা শিহরণ বয়ে গেল। সে বাধ্য মেয়ের মতো সামনের দিকে তাকাল। কাজী সাহেব এবার গলা ঝেড়ে শুভ্রকে জিজ্ঞেস করলেন।

“বাবা। কাবিননামার টাকা কি আগেরটাই রাখব? না কি কোনো পরিবর্তন হবে?”

শুভ্র একবার আড়চোখে রিদির দিকে তাকাল। রিদির সেই ঘাবড়ে যাওয়া মুখটা দেখে তার ঠোঁটের কোণে একটা বিজয়ী হাসি ফুটে উঠল। সে কাজী সাহেবের দিকে তাকিয়ে দরাজ গলায় বলল।

“যেহেতু কাবিননামা ছাড়া বিয়ে হয় না। তাই সেখানে যত টাকাই লিখুন না কেন। আমার ধন সম্পত্তি কোনোদিন খালি হবে না। তবে যেহেতু নিয়ম মেনে টাকা লিখতেই হয়। তাহলে ১০ কোটি টাকা লিখে দেন। আর তার পাশে এটাও লিখে দিবেন যে এই সাইফান শুভ্র চৌধুরীকে চিরতরে কন্যা তাসনিন রিদিকার নামে লিখে দেওয়া হলো। এখন থেকে এই মানুষটার একমাত্র মালকিন শুধু তাসনিন রিদিকা।”

শুভ্রর এমন পাগলাটে আর রাজকীয় ঘোষণা শুনে কাজী সাহেবের হাত থেকে কলমটা প্রায় পড়ে যাওয়ার উপক্রম হলো। রিদি অবিশ্বাসে বড় বড় চোখে শুভ্রর দিকে তাকিয়ে রইল। রিদি নিজের কানকে বিশ্বাস করতে পারছে না। সে কি সত্যিই জেগে আছে। নাকি অসহ্য যন্ত্রণায় মস্তিস্ক বিকৃত হয়ে কোনো রঙিন স্বপ্ন দেখছে? একটু পর কি এই স্বপ্নটা কাঁচের মতো ভেঙে চুরমার হয়ে যাবে? উত্তেজনায় আর ভয়ে রিদি নিজের হাতে জোরে একটা চিমটি কাটল। উফ বেশ ব্যথা পেল সে। কিন্তু কই। চারপাশের এই দৃশ্য তো বদলালো না। স্বপ্ন তো ভাঙল না। রিদির এই ঘোরলাগা ভাবনার মাঝেই কাজী সাহেব বিসমিল্লাহ বলে বিয়ের আনুষ্ঠানিকতা শুরু করলেন। দেনমোহর আর সাক্ষীদের নাম ধাম পড়ে তিনি গম্ভীর গলায় রিদিকে উদ্দেশ্য করে বললেন।

“মা তাসনিন রিদিকা। আপনি কি এই বিবাহে রাজি আছেন? বলুন কবুল।”

রিদি বিস্ময়ে হাঁ হয়ে গেছে। তার ঠোঁট দুটো থরথর করে কাঁপছে। কিন্তু শব্দ বেরোচ্ছে না। তাকে পাথরের মতো বসে থাকতে দেখে শুভ্র বিরক্তি নিয়ে তাকাল। দরাজ গলায় শাসন করার ভঙ্গিতে বলল।

“কানে শুনতে পাসনি? কবুল বল।”

শুভ্রর সেই পরিচিত কর্তৃত্বপূর্ণ কণ্ঠস্বরে রিদির ধ্যান ভাঙল। কাজী সাহেব আবারও নরম গলায় বললেন।

“মা। দেরি করো না। বলো কবুল।”

রিদির কিংকর্তব্যবিমূঢ় অবস্থা দেখে ঈশান একটু এগিয়ে এসে মুচকি হেসে বলল।

“রিদি। প্রিয় মানুষকে এভাবে হাতের নাগালে পেলে সেই সুযোগ ছাড়তে নেই। জলদি জলদি কবুলটা বলে দাও। আর শোনো। এটা কোনো স্বপ্ন না। একদম ধ্রুব বাস্তব। তোমার আর বসেরই বিয়ে হচ্ছে।”

“এ্যাঁ।”

রিদি যেন এখনো বিশ্বাস করতে পারছে না শুভ্র তাকে বিয়ে করছে। রিদিকে এভাবে হাঁ করে তাকিয়ে থাকতে দেখে শুভ্র এবার চূড়ান্ত বিরক্ত হওয়ার ভান করল। সোফা থেকে ওঠার উপক্রম করে বলল।

“ঠিক আছে। বলতে হবে না। তোর এই বালের বিয়ে আমি করতামই না।”

বলেই শুভ্র যেই না উঠে দাঁড়াতে নিল। অমনি রিদি আতঙ্কে আর তাড়াহুড়োয় এক নিশ্বাসে চিৎকার করে বলে উঠল।

“কবুল। কবুল। কবুল।”

রিদির এই মরিয়া ভাব দেখে শুভ্র বাঁকা হাসল। সে আবার রিদির পাশে আয়েশ করে বসে আলতো গলায় বলল।

“আরেহ। একটু দম তো নে।”

কাজী সাহেব হাহা করে হেসে ফেললেন। তিনি নিয়ম অনুযায়ী রিদিকে দিয়ে আরও দুবার কবুল বলিয়ে নিলেন। রিদি এবার এক মুহূর্ত দেরি না করে গড়গড় করে বলে দিল। এরপর শুভ্রর পালা। কাজী সাহেব শুভ্রর কাছ থেকে সই নিয়ে তাকে কবুল বলতে বললেন। শুভ্র তো তৈরিই ছিল। সেও বিন্দুমাত্র দেরি না করে স্পষ্ট স্বরে নিজের সম্মতি জানিয়ে দিল। সব নিয়ম কানুন আর আইনি প্রক্রিয়া মেনে অবশেষে পূর্ণতা পেল দুটি বিবাগী হৃদয়। কাজী সাহেব মোনাজাতের জন্য হাত তুলে ঘোষণা করলেন।

“আলহামদুলিল্লাহ। আজ থেকে আপনারা দুজন আইনত ও শরীয়ত মোতাবেক স্বামী স্ত্রী।”

পুরো ড্রয়িংরুমে তখন এক পবিত্র স্তব্ধতা। কাজী সাহেব দোয়া ধরলেন। শুভ্র। রিদি। ঈশান। ম্যাজিস্ট্রেট অফিসার। পুলিশ আর গার্ডরা সবাই হাত তুলে আমীন বলছে। কেবল দুজন মানুষ সেই দোয়ায় শরিক হতে পারল না। নির্ভান আর নেহা। তাদের দুজনের চোখেই এখন সীমাহীন শূন্যতা। নেহার চোখে শুভ্রকে চিরতরে হারানোর দহন। আর নির্ভানের চোখে তার মায়াবীকে সারা জীবনের মতো হারিয়ে ফেলার হাহাকার।

কাজী সাহেব দোয়া শেষ করে উঠে দাঁড়ালেন। পুরো ড্রয়িংরুমে তখন এক স্বস্তির নিঃশ্বাস। কিন্তু রিদি? সে তখন খুশিতে হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে ফেলেছে। সবটুকু ভয়। সবটুকু হাহাকার এক নিমিষেই কর্পূরের মতো উবে গেছে। সে বসা থেকে এক ঝটকায় উঠে দাঁড়িয়ে জড়িয়ে ধরল শুভ্রকে। পাশে কত মানুষ। পুলিশ। ম্যাজিস্ট্রেট সব ভুলে গিয়ে সে শুভ্রর বুকে মুখ লুকিয়ে ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠল।

“আমি কল্পনাও করিনি আমার অন্ধকার হয়ে আসা জীবনটাকে আল্লাহ এভাবে আলো করে দেবেন। আমি আমি বিশ্বাসই করতে পারছি না আপনি আমাকে সত্যি বিয়ে করেছেন। আমি আজ কতটা খুশি তা আপনাকে বলে বোঝাতে পারবো না। শুধু এইটুকু জানি। আই লাভ ইউ। ভালোবাসি। খুব ভালোবাসি আপনাকে।”

রিদির এই আকস্মিক ও উন্মুক্ত ভালোবাসার প্রকাশ দেখে পুরো ড্রয়িংরুম এক মুহূর্তের জন্য থমকে গেল। শুভ্র পাথরের মতো দাঁড়িয়ে রইল। রিদির শরীরের উষ্ণতা আর তার মনের এই সরল স্বীকারোক্তি শুভ্রকে যেন অবশ করে দিয়েছে। ঈশান পরিস্থিতি সামাল দিতে মুচকি হেসে জোরে হাততালি দিয়ে উঠল। তার সাথে সাথে সব গার্ডরাও হাততালি দিয়ে এই নতুন দম্পতিকে অভিনন্দন জানাল।

কিন্তু এই দৃশ্য দেখার ক্ষমতা নেহার ছিল না। তার ভেতরটা তখন প্রতিহিংসার আগুনে দাউদাউ করে জ্বলছে। সেও তো ভালোবেসেছিল। তবে কেন তার কপালে শুধু শূন্যতা? আল্লাহ কেন শুভ্রকে অন্য কারো করে দিল? হিংসে আর অপমানে নেহা হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে ফেলল। তার চোখ পড়ল টি টেবিলের ওপর রাখা ফল কাটার ধারালো ছুরিটার দিকে।

বিদ্যুৎবেগে নেহা এগিয়ে গিয়ে ছুরিটা হাতে তুলে নিল। শুভ্র কিছু বুঝে ওঠার আগেই নেহা রিদিকে হেঁচকা টানে শুভ্রর বুক থেকে ছাড়িয়ে আনল। তারপর বাম হাতের কনুই দিয়ে রিদির গলা সজোরে চেপে ধরে ডান হাতের ধারালো ছুরিটা একদম তার কণ্ঠনালিতে ঠেকিয়ে ধরল। নেহার চোখমুখ তখন ডাইনির মতো ভয়ংকর দেখাচ্ছে। সে পাগলের মতো চিৎকার করে শুভ্রর দিকে তাকিয়ে বলতে লাগল।

“অনেক হয়েছে। অনেক দেখেছি তোদের এই প্রেমের খেলা। কেন রে? আমাদের ভালোবাসার কি কোনো মূল্য নেই? আমিও তো তোকে জান দিয়ে ভালোবেসেছিলাম। আমার সব পাগলামি তো তোকে পাওয়ার জন্যই ছিল। কেন তবে আমাকে বিয়ে করলি না? কেন এই পথের মেয়েটাকে নিজের করে নিলি? কেন কেন?”

নেহার গলার চিৎকারে পুরো ঘর আবার নরককুণ্ডে পরিণত হলো। রিদি আতঙ্কে জমে গেছে। ছুরির ধারালো ফলাটা তার গলায় বিঁধছে। শুভ্রর চোখের মণি মুহূর্তেই কুঁচকে ছোট হয়ে এল। তার শরীরের প্রতিটি শিরা এখন টানটান।

নেহার দুচোখ দিয়ে তখন শ্রাবণ ধারার মতো জল পড়ছে। তার হাতের ছুরিটা কাঁপছে ঠিকই। কিন্তু চোখের দৃষ্টিতে এক মরণপণ জেদ। শুভ্রর কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম জমতে শুরু করেছে। সে বুঝতে পারছে। নেহা এখন একটা জীবন্ত আগ্নেয়গিরি। যার ভেতর বছরের পর বছর ধরে জমানো অবহেলার লাভা এখন বিস্ফোরণের অপেক্ষায়। শুভ্র নিজের গলার স্বর যতটা সম্ভব শান্ত রাখার চেষ্টা করে বলল।

“নে নেহা। প্লিজ রিদিকে ছেড়ে দাও। ওকে কিছু কোরো না। দেখো। তোমার যা রাগ। যা জেদ সব তো আমার ওপর। তোমার যা করার আমার সাথে করো। কিন্তু রিদিকে দয়া করে মুক্তি দাও।”

নেহা এক পৈশাচিক চিৎকার দিয়ে উঠল। তার কান্নায় পুরো ড্রয়িংরুমের বাতাস ভারী হয়ে গেল।

“কেন রে? খুব লাগছে তোর? তোকে কেন মারব? তোকে মারলে তো তুই শান্তিতে মরে যাবি। মারব এই রিদিকে। কারণ তোর পৃথিবী তো এই মেয়েটা। রিদি শেষ হয়ে যাওয়া মানে তুই জ্যান্ত লাশ হয়ে যাওয়া। আমাকে দিনের পর দিন তিলে তিলে মেরে তুই শান্তিতে থাকবি। তা তুই ভাবলি কী করে?”

শুভ্রর বুকটা কেঁপে উঠল। সে জানে নেহা এখন হিতাহিত জ্ঞানশূন্য। সে কোনোমতে নিজেকে সামলে নিয়ে এক কদম এগিয়ে গিয়ে বলল।

“নেহা। পাগলামি কোরো না। রিদি তোমার কী ক্ষতি করেছে? তোমার যত লড়াই তো আমার সাথে। আমাকে মারো। ও তো নির্দোষ।”

শুভ্রকে এক কদম এগোতে দেখেই নেহা ছুরিটা রিদির গলায় আরও চেপে ধরল। রিদির ফর্সা গলায় হালকা লাল রক্তের রেখা দেখা দিল। নেহা গর্জে উঠে বলল।

“খবরদার। এক পা ও এগোবি না। তুই কাছে আসার চেষ্টা করলেই এই ছুরিটা ওর গলায় চালিয়ে দেব। আর কী বললি? ও কী করেছে? ও আমার সব থেকে বড় শত্রু। আমার সাজানো বাগান ও জ্বালিয়ে দিয়েছে। আমার কাছ থেকে তোকে কেড়ে নিয়েছে ও। কিন্তু শুনে রাখ শুভ্র। আমার জেদটা মিথ্যা হতে পারে। কিন্তু তোকে পাওয়ার এই তৃষ্ণা। এই ভালোবাসা কোনোদিন মিথ্যা ছিল না। তুই যদি আমার না হস। তবে তোকে আমি আর কারো হতে দেব না। ওকে মেরে আমি আজীবন জেলে পচে মরব। তবুও তোকে সুখে থাকতে দেব না।”

কথাটা শেষ করেই নেহা উন্মত্তের মতো ছুরিটা সজোরে রিদির গলায় চালিয়ে দিতে লাগল। শুভ্রর চোখের সামনে সব কিছু যেন ঝাপসা হয়ে আসছে। সে একদৃষ্টিতে রিদির চোখের দিকে তাকাল। সেই চোখে এক বিন্দু মৃত্যুভয় নেই। নেই কোনো আর্তনাদ। রিদি শুধু ছলছল চোখে অপলক তাকিয়ে আছে শুভ্রর দিকে। সেই চাহনি যেন নিঃশব্দে বলছে।

“তোমায় ভালোবার জন্য যদি আজ আমায়
শহিদ হতে হয়,তবে আমি হাসিমুখে রাজি,
বেঁচে নাই বা থাকলাম, মরে গিয়ে তোমার
সৃতি হয়ে বেঁচে থাকাটাই আমার হবে সব থেকে
বড় সার্থকতা।”

রিদির ওই শান্ত। সমর্পিত দৃষ্টি শুভ্রর কলিজাটা মুহূর্তে কুড়ে কুড়ে শেষ করে দিচ্ছে। সে আর তাকাতে পারছে না ওই মায়াবী চোখের দিকে। প্রতিটা পলক যেন এক একটা বিষাক্ত তীরের মতো শুভ্রর বুক ছিদ্র করে দিচ্ছে। অসহ্য এক অন্ধকার চাদর যেন ধীরে ধীরে শুভ্রর পুরো অস্তিত্বকে গিলে ফেলছে। তার মনে হচ্ছে। রিদির এই বিসর্জনের চেয়ে নিজের মৃত্যুও অনেক বেশি সহজ ছিল। মনে হচ্ছে তার হৃৎপিণ্ডটা ওখানেই থেমে গেছে। সে যন্ত্রণায় সজোরে চোখ বন্ধ করে ফেলল।

পরের মুহূর্তেই এক বীভৎস ছ্যাঁত শব্দ। ধারালো ছুরিটা কারো শরীরের নরম মাংস ভেদ করে ভেতরে ঢুকে গেল। গরম। তাজা রক্তের ছিটে এসে সরাসরি শুভ্রর গাল আর কপালে ছিটকে পড়ল। লোনা রক্তের সেই অদ্ভুত গন্ধ শুভ্রর নাকে ঝাপটা মারল। শুভ্রর মনে হলো তার পুরো পৃথিবীটা এক নিমিষেই ধ্বংস হয়ে ধূ ধূ মরুভূমি হয়ে গেল। শরীরের ভেতরের সবটুকু শক্তি যেন এক লহমায় কেউ শুষে নিল। সে আর নিজেকে ধরে রাখতে পারল না। বুকের ভেতরটা অসহ্য যন্ত্রণায় মুচড়ে উঠল। মনে হলো কেউ জীবন্ত হৃদপিণ্ডটা ছিঁড়ে নিল। সে বুকে হাত শক্ত করে চেপে ধরে মেঝেতে আছড়ে পড়ল। আর তার বুক চিরে বের হয়ে এল এক আকাশ ফাটানো আর্তনাদ।

“আহহহহহহহহহহহহ।”

রানিং…!

অনেক বড় পর্ব দিছি 4k রিয়েক্ট যাতে ওঠে আশা রাখছি তোমাদের কাছে…🙂

Share On:

TAGS: ,



CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
Related Posts
 

0 Responses

Leave a Reply