অসম্ভবরকমভালোবাসি_তোমায়
লেখিকাসুমিচৌধুরী
পর্ব ২০
🚫অনুমতি ব্যতীত কপি করা নিষিদ্ধ🚫
কেটে গেছে দীর্ঘ ২০ দিন। এই বিশ দিনে রিদি অনেকটাই সুস্থ হয়ে উঠেছে, এখন সে নিজের পায়ে হাঁটাহাঁটি করতে পারে। কিন্তু সুস্থ হওয়ার সাথে সাথে রিদির পাগলামি যেন কয়েক গুণ বেড়ে গেছে। প্রতিটা মুহূর্ত সে চিৎকার করে বাড়ি যাওয়ার জন্য ছটফট করে, কিন্তু নির্ভান অত্যন্ত কঠোরভাবে তার সব পাগলামি নিয়ন্ত্রণ করছে। দিনের অধিকাংশ সময় তাকে একটা অন্ধকার ঘরে বন্দি করে রাখা হয়,যেখানে বাইরের আলো-বাতাস ঢোকারও উপায় নেই।
তবে এই ২০ দিনে সব থেকে অবাক করার বিষয় হলো শুভ্রের নীরবতা। যে শুভ্র প্রথম দুদিন পুরো পৃথিবী তন্ন তন্ন করে রিদিকে খুঁজেছে, সে হঠাৎ করে যেন অদৃশ্য হয়ে গেল। নির্ভান তার গোপন সোর্সের মাধ্যমে খোঁজ নিয়ে জানতে পেরেছে, শুভ্র এখন রিদির শোক ভুলে নিজের ব্যবসা-বাণিজ্য নিয়ে প্রচণ্ড ব্যস্ত সময় কাটাচ্ছে। নির্ভানের অবাক হওয়ার সীমা নেই যে ছেলেটা রিদির জন্য পুরো শহর জ্বালিয়ে দেওয়ার হুমকি দিয়েছিল, সে এত তাড়াতাড়ি হাল ছেড়ে দিল?
পরক্ষণেই নির্ভানের ঠোঁটের কোণে একটা বাঁকা হাসি ফুটে উঠল। সে মনে মনে ভাবল, “শুভ্র চৌধুরী কি তবে ভয় পেয়ে পিছিয়ে গেল? নাকি মায়াবীর মায়া এত তাড়াতাড়ি কাটিয়ে ফেলল?”
রাত তখন ১০:০০ টা। নির্ভান তার ফোনের স্ক্রিনে একটা অচেনা নাম্বারে ডায়াল করে গম্ভীর গলায় বলল।
“এখন আসল খেলার সময় হয়েছে। আজ যেভাবেই হোক, শুভ্রকে আমার পায়ের কাছে চাই। কোনো ভুল যেন না হয়।”
ওপাশ থেকে অত্যন্ত আত্মবিশ্বাসী এক যান্ত্রিক কণ্ঠ ভেসে আসল।
“ওকে বস, কাজ হয়ে যাবে।”
কলটা কেটে দিতেই নির্ভানের অন্ধকার ঘরে তার শয়তানি হাসিটা প্রতিধ্বনিত হতে লাগল। সে জানালার কাঁচের ওপারে অন্ধকারের দিকে তাকিয়ে বিড়বিড় করে বলল।
“সাইফান শুভ্র চৌধুরী আমার এই নরকপুরীতে তোমাকে অগ্রিম স্বাগতম। দেখা যাক, তোমার ব্যবসার নেশা বড় নাকি তোমার ভালোবাসা।”
শুভ্র অফিস থেকে একাই গাড়ি চালিয়ে ফিরছিল। ইকবাল এহসান, রাবেয়া এহসান আর ইমনকে সে তাদের বাড়িতেই থাকতে বলেছে। তাদের চোখেমুখে যে হারানো আতঙ্ক ছিল, শুভ্র তা নিজের এক কথাতেই শান্ত করে দিয়েছে রিদিকে সে সুস্থ ও অক্ষত অবস্থায় ফিরিয়ে আনবে। এটা শুধু কথা নয়, এটা সাইফান শুভ্র চৌধুরীর দেওয়া জবান। তবে শুভ্রের শান্ত মাথার ভেতরে আসলে কী ধরনের ধ্বংসাত্মক পরিকল্পনা চলছে, তা দুনিয়ার অন্য কোনো প্রাণের পক্ষে বোঝা অসম্ভব।
শহরের কোলাহল পেরিয়ে মাঝরাস্তার এক জনমানবহীন নিঝুম অন্ধকারে আসতেই হঠাৎ একটা কর্কশ শব্দ হলো। ‘ফুস’ করে চাকা ফেটে শুভ্রের গাড়িটা একদিকে হেলে পড়ল। শুভ্র একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বিরক্ত মুখে গাড়ি থেকে নামল। চাকাটা পরীক্ষা করতে গিয়ে যখন দেখল সেটা পুরোপুরি পাংচার হয়ে গেছে, তখন সে রাগে একটা লাথি মেরে গালি দিয়ে উঠল।
“ধুর ছাই!”
ঠিক সেই মুহূর্তে অন্ধকার ফুঁড়ে কেউ একজন তড়িৎগতিতে এসে পেছন থেকে শুভ্রের নাকে-মুখে ক্লোরোফর্ম ভেজানো রুমাল চেপে ধরল। শুভ্র কিছু বুঝে ওঠার আগেই একদল লোক এসে তাকে কালো মুখোশ পরিয়ে পাজাকোলা করে একটা কালো কাঁচের গাড়িতে তুলে নিল।
কিন্তু অদ্ভুত ব্যাপার হলো, এই পুরো সময়টাতে শুভ্র টু শব্দটিও করল না। কোনো হাত-পা ছোড়াছুড়ি বা বাঁচার জন্য আর্তচিৎকার নেই। সে যেন একদম মূর্তির মতো পাথুরে শান্ত হয়ে রইল। কিডন্যাপার গার্ডরা নিজেদের মধ্যে দৃষ্টি বিনিময় করল, তারা বেশ অবাক। অন্য সময় যাদের তারা তুলে আনে, তারা ভয়ে চিৎকার করে কিংবা বাঁচার চেষ্টা করে। কিন্তু এই লোকটা একদম হিমশীতল।
শুভ্রের এই অস্বাভাবিক নীরবতা গার্ডদের কলিজায় এক অজানা ত্রাস ধরিয়ে দিল। তারা বিভিন্ন গল্পে পড়েছে, বাঘ যখন তার শিকারকে আক্রমণ করার জন্য ওত পাতে, তখন সে ঠিক এভাবেই নিঃসাড় আর শান্ত থাকে। শুভ্র কি তবে তাদের শিকার, নাকি শুভ্রই তাদের কোনো মরণফাঁদে নিয়ে যাচ্ছে? পরক্ষণেই তারা নিজেদের ঝেড়ে ফেলল বসের হুকুম পালন করাটাই তাদের কাজ, এর বেশি ভাবার দরকার নেই।
পায়ের ওপর পা তুলে আয়েশ করে একটা বড় কামরায় বসে আছে নির্ভান। তার আঙুলের ফাঁকে জ্বলন্ত সিগারেট থেকে ধোঁয়া কুণ্ডলী পাকিয়ে উপরে উঠছে। পুরো ঘরে এক ধরনের অশুভ নিস্তব্ধতা। ঠিক তখনই ভারী দরজা ঠেলে ভেতরে ঢুকল একজন গার্ড। সে মাথা নিচু করে জানাল।
“বস, কাজ হয়ে গেছে। ওকে হাত-পা বেঁধে একদম কব্জায় এনে ওই পাশের ঘরে বসিয়ে রেখেছি।”
নির্ভান কোনো কথা বলল না, শুধু হাতের ইশারায় গার্ডকে বেরিয়ে যেতে বলল। গার্ডরা চলে যেতেই নির্ভানের গলা থেকে এক পৈশাচিক হাসির শব্দ বের হয়ে এল। সে যেন নিজের জয়ে নিজেই উন্মত্ত হয়ে গেছে। হাসতে হাসতেই সে বিড়বিড় করল, “অবশেষে তুমি আমার জালে ধরা দিলে শুভ্র চৌধুরী!”
খানিকক্ষণ পর নির্ভান ধীরপায়ে সেই অন্ধকার ঘরটির দিকে এগিয়ে গেল যেখানে শুভ্রকে রাখা হয়েছে। ঘরে মৃদু একটা নীলচে আলো জ্বলছে, যার ঝাপসা আভায় চেয়ারে হাত-পা বাঁধা অবস্থায় শুভ্রকে দেখা যাচ্ছে। শুভ্রের মুখটা তখনো কালো মুখোশে ঢাকা, মাথাটা সামান্য নিচু হয়ে আছে।
নির্ভান খুব মন্থর গতিতে হাঁটতে হাঁটতে সোজা শুভ্রের সামনের একটা চেয়ারে বসল। আজই প্রথম নির্ভান আর সাইফান শুভ্র চৌধুরী একে অপরের মুখোমুখি। নির্ভানের ঠোঁটে এক বিজয়ী শয়তানের হাসি, সে তার সিগারেটের শেষ টানটা দিয়ে ধোঁয়াটুকু শুভ্রের মুখোশ লক্ষ্য করে সজোরে ছাড়ল। অন্ধকার এই ঘরে নিশ্বাস নেওয়ার শব্দের চেয়েও এখন নির্ভানের তীব্র হাসির শব্দটাই বেশি স্পষ্ট হয়ে উঠছে।নির্ভান ধোঁয়া ছেড়ে শুভ্রের কালো মুখোশ পরা নিথর মুখের দিকে তাকিয়ে উপহাসের সুরে বলল।
“স্বাগতম মিস্টার সাইফান চৌধুরী।”
শুভ্রর গলা থেকে কোনো কম্পন বের হলো না। খুব শান্ত আর নিরেট গলায় সে উত্তর দিল।
“ধন্যবাদ।”
মুহুর্তে নির্ভানের ঠোঁট থেকে বিজয়ের হাসিটা নিভে গেল। তার কপালে চিন্তার ভাঁজ পড়ল। একটা মানুষ অপহৃত হয়ে, হাত-পা বাঁধা অবস্থায় এত স্বাভাবিকভাবে কথা বলছে কীভাবে? নির্ভান চেয়ারে আরও একটু ঝুঁকে বসে ক্রুর গলায় বলল।
“চিনিস আমাকে?”
শুভ্রর ঠোঁটের কোণে হয়তো এক চিলতে অদৃশ্য হাসি ফুটল। সে নির্লিপ্ত গলায় বলল।
“হয়তো।”
নির্ভানের মেজাজ এবার বিগড়ে যেতে শুরু করল। সে দাঁত কিড়মিড় করে বলল।
“তুই এত স্বাভাবিকভাবে কীভাবে কথা বলছিস রে? পরিস্থিতি কি বুঝতে পারছিস না?”
শুভ্রর গলায় বিন্দুমাত্র বিকার নেই। সে যেন নিজের ড্রয়িংরুমে বসে আড্ডা দিচ্ছে, এমন ভাবে বলল।
“কথা তো মানুষ এইভাবেই বলে। আর কীভাবে বলে আমার জানা নেই।”
নির্ভান এবার অবাকের চরম পর্যায়ে চলে গেল। শুভ্রর এই ইস্পাতকঠিন মানসিকতা তার হিসাব ওলটপালট করে দিচ্ছে। সে চিৎকার করে বলে উঠল।
“তোকে জানোয়ারের মতো তুলে নিয়ে আসলাম, হাত-পা বেঁধে রাখলাম, তোর কি জানের ভয় করছে না? আমি চাইলে তোকে এখনই মেরে ফেলতে পারি!”
শুভ্র এক মুহূর্ত থামল। তারপর খুব গম্ভীর আর দার্শনিক স্টাইলে বলল।
“জীবন যেহেতু আছে, সেহেতু মরতে তো হবেই। এতে জানের ভয় করার কী আছে?।”
নির্ভানের ধৈর্যের বাঁধ এবার পুরোপুরি ভেঙে গেল। এই রুদ্ধশ্বাস পরিস্থিতিতে একটা মানুষ কীভাবে এতটা নির্লিপ্ত আর স্বাভাবিক হয়ে বসে থাকতে পারে, তা এই শুভ্রকে চোখের সামনে না দেখলে সে কোনোদিন বিশ্বাস করত না। অপমানে আর রাগে নির্ভানের রক্ত মাথায় চড়ে বসল। সে মুহূর্তের মধ্যে পাশবিক চিৎকার করে তার গার্ডদের উদ্দেশ্য করে বলল।
“কী দেখছিস তোরা? ওর মুখোশ খোল! দেখি ওর মুখটা, কার এত বড় সাহস আর কার কলিজায় এত বিষ যে আমার সামনে বসে বড় বড় কথা বলছে!”
একজন গার্ড কিছুটা ভয়ে ভয়ে এগিয়ে এল। কাঁপা কাঁপা হাতে সে শুভ্রের কালো মুখোশটা ধীরে ধীরে খুলে ফেলল। আর মুখোশটা সরার সাথে সাথেই যেন ঘরের আবহাওয়া মুহূর্তেই বদলে গেল। সামনে দাঁড়িয়ে থাকা চারজন গার্ড আর যে মুখোশটা খুলল তারা প্রত্যেকে শুভ্রকে দেখামাত্রই বিদ্যুৎস্পৃষ্টের মতো ছিটকে পেছনে সরে গেল। তাদের চোখেমুখে এখন চরম আতঙ্কের ছাপ। সবাই ভয়ে থরথর করে কাঁপতে কাঁপতে অস্ফুট স্বরে বলে উঠল।
“কি-কিংশুং
নির্ভান কিছুই বুঝতে পারল না। তার নিজের পোষা গার্ডরা শুভ্রকে দেখে এইভাবে মরার মতো কাঁপছে কেন? শুভ্র কোনো কথা না বলে একদম বরফশীতল চোখে একবার গার্ডদের দিকে তাকাল। সেই চাহনিতে কী ছিল কে জানে, কিন্তু মুহূর্তের মধ্যে গার্ডরা বড় বড় ঢোক গিলে একদম পাথর হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। নির্ভান রাগে ফেটে পড়ে গার্ডদের দিকে তাকিয়ে চেঁচিয়ে বলল।
“এইভাবে কাঁপলি কেন তোরা? মনে হলো কোনো ভূত দেখেছিস? কী দেখেছিস ওর চেহারায়?”
একজন গার্ড আমতা আমতা করে কোনোমতে কাঁপা গলায় বলল।
“ব-বস, এম-এমনি…”
নির্ভানের খটকা দূর হলো না। সে এবার সন্দেহের দৃষ্টিতে সরাসরি শুভ্রের চোখের দিকে তাকাল। শুভ্র একদম নির্লিপ্ত, যেন কিছুই হয়নি। নির্ভান দাঁতে দাঁত চেপে শুভ্রকে প্রশ্ন করল।
“আব্বে শা’লা কে তুই?।”
শুভ্র এবার নির্ভানের চোখের দিকে গভীর আর স্থিরভাবে তাকাল। তার ঠোঁটের কোণে ফুটে উঠল এক তাচ্ছিল্যের হাসি। সে খুব নিচু কিন্তু পৈশাচিক গম্ভীর গলায় বলল।
“তোর আব্বা লাগি, আব্বা ডাক!”
নির্ভানের মাথার রগ যেন রাগে ছিঁড়ে যাবে। এই চরম মুহূর্তেও শুভ্রর মুখে এমন তাচ্ছিল্য সে মানতে পারছে না। সে এক মুহূর্ত দেরি না করে পাশের গার্ডের হাত থেকে রিভলবারটা ছোঁ মেরে নিয়ে সরাসরি শুভ্রর কপালে ঠেকাল। আগ্নেয়াস্ত্রের ঠান্ডা নলটা শুভ্রর চামড়া ছুঁয়ে আছে, কিন্তু তার চোখের পলক পর্যন্ত পড়ল না। নির্ভান দাঁত কিড়মিড় করে বলল।
“তুই কে বা তোর পরিচয় কী, তা জানার কোনো দরকার নেই আমার। আমার লক্ষ্য শুধু একটাই আমার বোনের মনের আশা পূরণ করা। শোন শুভ্র, যদি জ্যান্ত বাঁচতে চাস,তবে আমার বোনকে বিয়ে করবি। তুই নেহার ভালোবাসার মানুষ বলেই তোর এত বড় বড় কথা আমি সহ্য করছি, নাহলে তোকে এতক্ষণে আমি।”
নির্ভান বাক্যটা শেষ করার সুযোগ পেল না। শুভ্র একদম নিচু কিন্তু পাথরের মতো ভারী গলায় মাঝপথেই বলে উঠল।
“তুই আমার বা*ল করবি।”
কথাটা শুনে নির্ভানের সারা শরীরে যেন আগুন ধরে গেল। সে রাগে চিৎকার করে উঠল।
“শুভ্র! আমাকে রাগিয়ে দিস না, বলছি ভালো হবে না! আমার বোনকে তোকে বিয়ে করতেই হবে। তুই জানিস নেহা তোকে কতটা ভালোবাসে? তোর জন্য ও মরে যেতে পারে!”
শুভ্র এবার নির্ভানের চোখের দিকে সোজাসুজি তাকাল। ওর দৃষ্টিতে কোনো মায়া নেই, কোনো ভয় নেই; আছে শুধু একরাশ ঘৃণা আর অবজ্ঞা। সে খুব শান্তভাবে বলল।
“কিন্তু আমি তো বাসি না। যাকে আমি ভালোবাসিই না, তাকে কেন বিয়ে করতে যাব? তোর বোন ভালোবাসে বলে কি আমাকেও বাসতে হবে নাকি?”
শুভ্রর এমন যুক্তিপূর্ণ কিন্তু রূঢ় জবাবে নির্ভান কয়েক সেকেন্ডের জন্য থমকে গেল। সে বুঝতে পারছে, এই লোকটাকে ভয় দেখিয়ে বা অস্ত্র উঁচিয়ে টলানো সম্ভব নয়। রুমের ভেতরে তখন এক অসহ্য উত্তেজনা একদিকে নির্ভানের উন্মত্ত রাগ, আর অন্যদিকে শুভ্রর হিমশীতল জেদ।নির্ভানের চোখের মণি দুটো রাগে চিকচিক করে উঠল। সে রিভলবারটা শুভ্রর কপাল থেকে সরিয়ে নিয়ে শেষবারের মতো শান্ত কিন্তু চরম হুশিয়ারি দিয়ে বলল।
“তাহলে তুই নেহাকে বিয়ে করবি না? এটাই তোর শেষ কথা?”
শুভ্রর গলায় কোনো দ্বিধা নেই, কোনো জড়তা নেই। সে নির্ভানের চোখের দিকে তাকিয়ে এক শব্দে উত্তর দিল।
“হুম।”
নির্ভান এবার বিকট এক হাসি দিল, যে হাসিতে কেবল শয়তানিই মাখানো। সে চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়ে বলল।
“ঠিক আছে, তাহলে জেনে রাখ আমার বোনকে বিয়ে না করলে তুই তিলে তিলে শেষ হবি। তোর এই অহংকার আমি গুঁড়িয়ে দেব।”
বলেই নির্ভান তার পেছনে দাঁড়িয়ে থাকা গার্ডদের দিকে ফিরে পাথরের মতো শক্ত গলায় আদেশ দিল।
“শোন! একে সেকেন্ডে সেকেন্ডে লাঠি দিয়ে আঘাত করবি। যতক্ষণ না নেহাকে বিয়ে করতে রাজি হচ্ছে, ততক্ষণ একটা সেকেন্ডের জন্যও থামবি না। ওর শরীরটা আজ থেঁতলে দে!”
নির্ভানের এই ভয়ংকর হুকুম শুনে গার্ডরা সবাই যেন জমে গেল। তারা একে অপরের দিকে তাকাচ্ছে কিন্তু কেউ এগিয়ে যাওয়ার সাহস পাচ্ছে না। একজন গার্ড অনেক কষ্টে নিজের ঢোক গিলে কাঁপা কাঁপা গলায় বলল।
“ব-বস, মারতেই হবে? এভাবে অন্ধকারে বেঁধে রাখলেই তো হয়… মানে…।”
নির্ভান বাজ পড়ার মতো শব্দে ধমক দিয়ে উঠল। সে রাগী দৃষ্টিতে গার্ডটার দিকে তাকাল। তার চাহনিতে স্পষ্ট মৃত্যু পরোয়ানা। গার্ডটা ভয়ে চমকে উঠল, তার কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম জমছে। ঠিক সেই মুহূর্তে গার্ডরা ভীতু চোখে শুভ্রর দিকে তাকাল।
শুভ্রও সেই সময় গার্ডটার দিকে এক অদ্ভুত আর রহস্যময় দৃষ্টিতে তাকাল। সেই চোখের ইশারায় কী গোপন সংকেত ছিল, তা কেবল তারাই জানে। মুহূর্তের মধ্যে পরিস্থিতি বদলে গেল। নিজেদের ভয় লুকানোর জন্যই হোক বা বসের হুকুম মানতেই হোক গার্ডরা ভারী লাঠিগুলো উঁচিয়ে ধরল। তারপর সজোরে একের পর এক আঘাত করতে শুরু করল শুভ্রর শরীরে।লাঠির প্রতিটি আঘাতে ঘরটা প্রতিধ্বনিত হচ্ছে, কিন্তু অদ্ভুত বিষয় শুভ্রর মুখ দিয়ে একটা আর্তনাদও বের হচ্ছে না। সে যেন ব্যথার ঊর্ধ্বে চলে গেছে। নির্ভানের ঠোঁটে তখন এক পৈশাচিক তৃপ্তির হাসি।
সকাল সকাল নির্ভান আর নেহা হাসতে হাসতে ড্রয়িংরুমে বসে কফি খাচ্ছে। দুই ভাই-বোনের মুখে এক পৈশাচিক শয়তানি হাসি, যেন তারা কোনো রাজ্য জয় করে ফেলেছে। ঠিক এমন সময় একজন গার্ড এসে মাথা নিচু করে নির্ভানকে জানাল।
“বস, গুনে গুনে ৩০০ টা আঘাত করেছি। কিন্তু ওর মুখ দিয়ে একটা ‘হ্যাঁ’ শব্দ বের করতে পারিনি। সারা শরীর লাঠির আঘাতে ক্ষতবিক্ষত হয়ে গেছে, নীল হয়ে ফুলে আছে সব জায়গা তবুও ও জেদ ছাড়ছে না।”
কথাটা শোনামাত্রই নেহা কফির মগটা ধপ করে টেবিলের ওপর রেখে উঠে দাঁড়াল। তার চোখেমুখে এবার এক অদ্ভুত উত্তেজনা। সে দৃঢ় গলায় বলল।
“আমি কথা বলবো শুভ্রের সাথে। দেখবো কত ওর জেদ আর কত বড় ওর কলিজা!”
নির্ভান একটা তৃপ্তির হাসি দিয়ে গার্ডকে ইশারা করল।
“ওকে নিয়ে যা।”
গার্ডের পিছু পিছু নেহা সেই অন্ধকার স্যাঁতসেঁতে রুমটাতে এসে ঢুকল। ঘরের ভেতরটা গুমোট আর ভারী হয়ে আছে। শুভ্র তখনো সেই চেয়ারে মাথাটা পেছন দিকে হেলিয়ে দিয়ে নিঃসাড় হয়ে বসে আছে। তার সিল্কি চুলগুলো এখন ঘাম আর রক্তে লেপটে এলোমেলো হয়ে কপালে এসে পড়েছে। ঠোঁটের কোণ দিয়ে শুকনো রক্তের রেখা, আর ছেঁড়া শার্টের ফাঁক দিয়ে স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে লাঠির শত শত আঘাতের চিহ্ন।
শুভ্রকে এই অবস্থায় দেখে নেহার কলিজার ভেতরটা এক মুহূর্তের জন্য মোচড় দিয়ে উঠল। যতই স্বার্থপর হোক, দিনশেষে সে শুভ্রকে পাগলের মতো ভালোবাসে। আর নিজের ভালোবাসার মানুষকে এভাবে রক্তাক্ত অবস্থায় দেখার ক্ষমতা কোনো নারীর থাকে না। তবুও নিজেকে সামলে নিয়ে নেহা পাথরের মতো মুখ করে শুভ্রের সামনে এসে দাঁড়াল। শুভ্র খুব ধীরভাবে চোখের পাতা মেলল। ঝাপসা কিন্তু তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে সে নেহার দিকে তাকাল।নেহা কম্পিত কণ্ঠে সরাসরি প্রশ্ন করল।
“আমাকে বিয়ে করতে তোমার আসলে সমস্যাটা কোথায় শুভ্র?”
শুভ্র কোনো ক্লান্তি ছাড়াই খুব নিরেট গলায় উত্তর দিল।
“আমার কাছে এর কোনো ব্যাখ্যা নেই। শুধু একটাই উত্তর আছে আমি তোমাকে বিয়ে করবো না।”
নেহার চোয়াল শক্ত হয়ে এল। সে তিক্ত স্বরে আবার বলল।
“কেন? আমি কি দেখতে খারাপ? নাকি আমি একসময় ধর্ষিতা হয়েছিলাম বলে আমার ওপর তোমার এত ঘৃণা?”
শুভ্র একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। তার কণ্ঠস্বরে কোনো ঘৃণা ছিল না, ছিল এক অদ্ভুত গাম্ভীর্য। সে বলল।
“নারীকে আমি সবসময় সম্মান করি নেহা। তুমি ধর্ষিতা হয়েছিলে, সেটা তোমার ভাগ্যের পরিহাস। এতে তোমার কোনো হাত নেই, তাই সেটা নিয়ে তোমাকে ছোট করার রুচি আমার নেই। আমি তোমাকে ওভাবে দেখি না।”
নেহা এবার প্রায় ভেঙে পড়ল। সে শুভ্রের হাঁটুর কাছে বসে পড়ে আর্তনাদ করে বলল।
“তাহলে আমাকে বিয়ে করতে কেন চাচ্ছো না? শুভ্র, আমি তোমাকে সত্যিই ভালোবাসি! আমার সবটুকু দিয়ে ভালোবাসি। বিশ্বাস করো, তুমি শুধু একবার আমাকে নিজের করে নাও… আমি প্রমিস করছি, তোমার সব কথা আমি অক্ষরে অক্ষরে শুনবো। তোমার সব আদেশ আমি মাথা পেতে নেবো। শুধু আমাকে ফিরিয়ে দিও না শুভ্র!”
শুভ্র নেহার চোখের দিকে তাকিয়ে এক বুক যন্ত্রণা চেপে খুব শান্তভাবে বলল।
“ভালোবাসার অর্থ তো তুমি বোঝো নেহা। তাহলে আমার হৃদয়ে যদি আগে থেকেই অন্য কেউ রাজত্ব করে, তাকে সেখানে রেখে আমার এই মন কীভাবে তোমাকে গ্রহণ করবে? আমি চাইলেও তো তোমাকে এই হৃদয়ে জায়গা দিতে পারবো না।”
শুভ্রর মুখ থেকে এই কথাগুলো বেরোনো মাত্রই নেহার চেহারার মায়া উবে গেল। তার চোখ-মুখ পাথরের মতো শক্ত হয়ে এল। সে ঝটকা দিয়ে উঠে দাঁড়িয়ে তীক্ষ্ণ গলায় বলল।
“তুমি নিশ্চিত ওই রিদির কথা বলছো, তাই না?”
রিদি নামটা কানে আসামাত্রই শুভ্রর সারা শরীরে যেন একটা বৈদ্যুতিক শক লাগল। এতো অত্যাচারেও যে চোখ দুটো পাথরের মতো ছিল, সেই চোখগুলো মুহূর্তেই ঝাপসা হয়ে এল। রিদির অভাব তাকে এক নিমেষে প্রচণ্ড দুর্বল করে দিল। নেহা শুভ্রর এই নীরবতা আর চোখের পানি দেখে হিংসায় জ্বলে উঠল। সে শুভ্রর একদম মুখের কাছে মুখ এনে দাঁত কিড়মিড় করে বলল।
“যদি তোমার জীবনে ওই রিদিই না থাকে? যদি তুমি ওকে আর কোনোদিন ফিরে না পাও?”
শুভ্রর বুকের ভেতরটা যেন খাঁ খাঁ করে উঠল। সে নিজের অজান্তেই অস্ফুট স্বরে আর প্রচণ্ড অসহায়ত্ব নিয়ে বলে উঠল।
“পাগল হয়ে যাবো আমি… ধ্বংস হয়ে যাবো আমি!”
শুভ্রর গলায় রিদির প্রতি এমন টান দেখে নেহার ভেতরে থাকা নারী সত্তাটা ঈর্ষায় হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে ফেলল। সে নিশ্চিত হয়ে গেল যে এই পুরুষের হৃদয়ে অন্য কারো জন্য আর তিল পরিমাণ জায়গাও অবশিষ্ট নেই। নেহা রাগে অন্ধ হয়ে হিসহিসিয়ে বলল।
“যেখানে সাইফান শুভ্র চৌধুরী আমার নয়, সেখানে সাইফান শুভ্র চৌধুরীর ধ্বংসই প্রাপ্য!”
নেহা ড্রয়িং রুমে ফিরে এসে পাগলের মতো হাতের কাছে যা পাচ্ছে সবকিছু আছাড় দিয়ে ভাঙচুর করতে লাগল। দামী কাঁচের ফুলদানি থেকে শুরু করে শোপিস সব মাটিতে পড়ে চুরমার হয়ে যাচ্ছে। নির্ভান দ্রুত এগিয়ে এসে নেহাকে আটকানোর চেষ্টা করল এবং শান্ত করতে করতে বলল।
“কুল ডাউন নেহা! কী হয়েছে? কেন এমন করছিস? শান্ত হো।”
নেহা এক ঝটকায় একটা বড় ফুলদানি তুলে দেয়ালে ছুড়ে মেরে চিৎকার করে উঠল।
“সব ধ্বংস করে দেবো আমি! ওই শুভ্র কেন বোঝে না আমার ভালোবাসা? কেন বোঝে না আমি ওর জন্য কতটা পাগল হতে পারি?”
নির্ভান এক গাল হেসে তাচ্ছিল্যের সাথে বলল।
“তুই তো ভালোই বেসেছিস একটা একগুঁয়ে আর ঘাড়ত্যাড়াকে! আজ ওই শুভ্রকে তুই ভালোবাসিস বলেই ও বেঁচে আছে, নাহলে আমার মেজাজ যে পর্যায়ে ছিল, এতক্ষণে ওকে আমি জানে মেরে ফেলতাম।”
নেহা এবার নির্ভানের শার্টের কলার চেপে ধরে চোখে আগুন নিয়ে বলল।
“ওই ঘাড়ত্যাড়াকেই আমার লাগবে! আমি কিছু বুঝি না, ওকে ছাড়া অন্য কোনো পুরুষের প্রতি আমার বিন্দুমাত্র আগ্রহ আসে না। ওকেই আমার ভালো লাগে, ওকেই চাই আমার জীবনে যেভাবেই হোক!”
নির্ভান নেহার মাথায় হাত রেখে আশ্বস্ত করে বলল।
“ডোন্ট ওয়ারি, পেয়ে যাবি। নির্ভান চৌধুরী যা চায়, তা করেই ছাড়ে।”
নেহা নির্ভানের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে অবিশ্বাসের সুরে বলল।
“কীভাবে পাবো আমি ওকে? ও তো সারাক্ষণ রিদির নাম জপে! ও রিদিকে চায়, রিদিকে ভালোবাসে। ওর হৃদয়ে শুধু রিদির জায়গা, আমার না!”
রিদি নামটা শোনামাত্রই কয়েক মুহূর্তের জন্য থমকে গেল নির্ভান। তার নিজের ভেতরের সেই দগদগে পাগলামিটা যেন আবার চাড়া দিয়ে উঠল। রিদি… যাকে সে নিজের নেশার মতো ভালোবাসে, যাকে সে কোনোভাবেই হারাতে পারবে না। নির্ভানের চোখের দৃষ্টি বদলে গেল, ঠোঁটে ফুটে উঠল এক পৈশাচিক বাঁকা হাসি। সে শান্ত কিন্তু শীতল গলায় বলল।
“বুঝেছি, এখন আমার কী করতে হবে।”
নেহা ভ্রু কুঁচকে তার ভাইয়ের দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করল।
“কী করবে এখন তুমি?”
নির্ভান তার কলারটা ঠিক করে নিয়ে এক অদ্ভুত স্বরে বলল।
“বিয়ে!”
অন্ধকারের ঝাপসা আলোয় জানালার গ্রিল ধরে স্থির হয়ে বসে আছে রিদি। বাইরের ঘুটঘুটে অন্ধকারের দিকে তাকিয়ে থাকা ওর চোখ দুটো থেকে নোনা জল গড়িয়ে পড়ছে। আজ দীর্ঘ ২০টা দিন সে তার মা, বাবা আর ভাইকে দেখে না জানে না তারা কেমন আছে, আদৌ খেয়েদেয়ে বেঁচে আছে কি না। কিন্তু সব থেকে বড় রক্তক্ষরণ হচ্ছে শুভ্রের জন্য। শুভ্রের কি ওর জন্য একটুও মায়া লাগে না।
২০টা দিন ধরে সে নিখোঁজ, অথচ শুভ্র একবারের জন্যও তাকে খুঁজে বের করার চেষ্টা করল না! রিদি ভাবল শুভ্র হয়তো ধরে নিয়েছে সে চিরতরে হারিয়ে গেছে, তাই মিছে খুঁজে লাভ নেই। সে হয়তো এখন তার বিশাল ব্যবসা আর কাজ নিয়ে মত্ত। ভুলে গেছে এক সময় রিদি নামের কেউ তার জীবনে ছিল। রিদি দীর্ঘশ্বাস ফেলে বিড়বিড় করল, “হায়রে মানুষ! পাষাণ মানুষকেই কেন যে এই হৃদয় খুঁজে বেড়ায়! এটাই বোধহয় বাস্তব ভালোবাসার মানুষ যতই পাষাণ হোক, এই অবুঝ হৃদয়টা ওই পাষাণটার জন্যই কাঁদবে।”
রিদি নিজের চোখের পানিটুকু মুছে নিয়ে জানালার ওপারে শূন্যতার দিকে তাকিয়ে ভাঙা গলায় গাইতে শুরু করল।
~আমার যা হারাবার গেছে হারিয়ে~
~জীবনে তাকে আর পাবো না ফিরে~
গানের মাঝে রিদি চোখটা বন্ধ করল,অন্ধকারে কল্পনাতে ভেসে ওঠল শুভ্রের মায়াবী মুখটা, রিদি চোখ বন্ধ রেখেই গেয়ে ওঠল।
~নীড় ভেঙে পাখি গেছে উড়ে~
~আমার হৃদয়ে মরুভূমি করে~
~মরীচিকার মতো আমায় রয়েছে গিরে~
~জানি না আজ সে কার দখলে~
“বাহ! খুব সুন্দর গান গাও তো তুমি!”
হঠাৎ কারো গম্ভীর কণ্ঠস্বরে চমকে উঠল রিদি। গান থামিয়ে ঝট করে তাকিয়ে দেখল দরজার কাছে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে নির্ভান। ওর ঠোঁটে সেই পরিচিত রহস্যময় হাসি। মুহূর্তেই রিদি ঘৃণাভরে চোখ সরিয়ে নিল। এই লোকটাকে দেখলে ওর পিত্তি জ্বলে ওঠে, মনে হয় নরকের কোনো শয়তান ওর সামনে দাঁড়িয়ে আছে। রিদি কোনো উত্তর না দিয়ে আবার জানালার দিকে মুখ ঘুরিয়ে পাথরের মতো বসে রইল।নির্ভান ধীরপায়ে ঘরের ভেতরে ঢুকে রিদির একদম কাছে এসে দাঁড়াল। ও জানে, রিদি ওকে কতটা ঘৃণা করে, কিন্তু সেই ঘৃণাই যেন নির্ভানের নেশা বাড়িয়ে দিচ্ছে।নির্ভান রিদির পাশে বসে একটু আয়েশ করে গলা খাঁকারি দিল। ওর চোখেমুখে এক অদ্ভুত ধূর্ততা। সে রিদির দিকে তাকিয়ে শান্ত গলায় বলল।
“তোমার বন্দিদশা এবার শেষ রিদি। অনেক হয়েছে, আর এভাবে অন্ধকারে থাকতে হবে না। এখন থেকে তুমি বাইরের আলো দেখতে পারবে, মুক্ত বাতাসে নিশ্বাস নিতে পারবে।”
বাড়ি যাওয়ার কথা শুনে রিদির ম্লান হয়ে যাওয়া চোখেমুখে এক মুহূর্তের জন্য আশার আলো ঝলমল করে উঠল। সে অবিশ্বাসের সুরে জিজ্ঞেস করল।
“সত্যি বলছেন? আমাকে আমার মা-বাবার কাছে যেতে দিবেন? আমাকে ছেড়ে দিবেন?”
নির্ভান একটা বাঁকা হাসি দিয়ে বলল।
“হুম, ছেড়ে দেব। তবে একটা ছোট শর্ত আছে।”
রিদি বুক ঢিপঢিপ অবস্থায় বলল।
“কী শর্ত?।”
নির্ভান এবার রিদির চোখের দিকে সরাসরি তাকিয়ে অত্যন্ত স্থির গলায় বলল।
“শর্তটা হলো, আমাকে বিয়ে করতে হবে।”
রিদি যেন আকাশ থেকে পড়ল। মুহূর্তেই ওর মুখটা ফ্যাকাসে হয়ে গেল। সে ঘৃণায় শিউরে উঠে তড়িৎগতিতে বলল।
“অসম্ভব! এইটা আমি মরে গেলেও পারবো না। আপনি কী করে ভাবলেন আমি আপনাকে বিয়ে করবো?”
নির্ভানের চেহারায় কোনো ভাবান্তর হলো না। সে আগের মতোই নির্বিকার থেকে বলল।
“এত উত্তেজিত হচ্ছো কেন? তুমি পারবে কি পারবে না সেইটা জানতে তো আমি আসিনি। আমি তোমাকে শুধু আমার সিদ্ধান্তটা জানালাম।আমি তোমাকে বিয়ে করবো, আর সেটাই ফাইনাল।”
রিদি এবার রাগে আর অপমানে ফেটে পড়ল। সে চিৎকার করে বলল।
“এখানে মরে গিয়ে পচে যাবো, তবুও আপনার মতো একটা জানোয়ারকে আমি বিয়ে করবো না! কোনোদিন না!”
আসলে আমি দুঃখিত, আগের পর্বে তোমার দেওয়া ওই দারুণ উত্তেজনাকর অংশটুকু আমি মিস করে গিয়েছিলাম। নির্ভান যেভাবে রুমাল বের করে রিদিকে সারপ্রাইজ দিতে নিয়ে গেল, সেখান থেকেই আবার সুন্দর করে লিখে দিচ্ছি:
রিদির ঘৃণাভরা কথা শুনে নির্ভান অট্টহাসিতে ফেটে পড়ল। রিদি রাগে ফুঁসছে, তার যদি সামর্থ্য থাকতো তবে এই নির্ভানকে এখনই শেষ করে ফেলত। নির্ভান হাসি থামিয়ে ক্রুর গলায় বলল।
“জানি তুমি এত সহজে রাজি হবে না। তার জন্যই তোমাকে খুশি করতে একটা স্পেশাল সারপ্রাইজ এনেছি। সারপ্রাইজটা এত সুন্দর যে, ওটা দেখার পর তুমি নিজেই নেচে নেচে আমাকে বিয়ে করতে চাইবে।”
রিদি ভ্রু কুঁচকে সন্দিহান চোখে তাকাল। তার মনে কুডাক ডাকছে। সে কাঁপা গলায় জিজ্ঞেস করল।
“সা-সারপ্রাইজ? কিসের সারপ্রাইজ?”
নির্ভান কোনো উত্তর দিল না। সে ধীরপায়ে উঠে দাঁড়াল এবং পকেট থেকে একটা সাদা রুমাল বের করল। রুমালটা নাকের কাছে নিয়ে একবার গভীর ঘ্রাণ নিল সে। তারপর হঠাৎ করেই বাম হাত দিয়ে রিডিকে হ্যাঁচকা টান দিয়ে দাঁড় করিয়ে দিল। রিদি কিছু বুঝে ওঠার আগেই নির্ভান তার পেছনে গিয়ে চোখের ওপর রুমালটা শক্ত করে বাঁধতে বাঁধতে বলল।
“চলো, তোমাকে নিয়ে যাই সেই কাঙ্ক্ষিত সারপ্রাইজটা দেখাতে। যেখানে তোমার সব প্রশ্নের উত্তর অপেক্ষা করছে।”
নির্ভান রিদির হাত শক্ত করে ধরে একরকম টেনে হিঁচড়ে সেই অন্ধকার সিঁড়ি দিয়ে নিচে নামতে লাগল। রিদি অন্ধকারে কিছুই দেখতে পাচ্ছে না, শুধু তার বুকটা দুরুদুরু কাঁপছে। কিছুক্ষণ হাঁটার পর নির্ভান একটা লোহার দরজা খোলার শব্দ করল। ঘরের ভেতরটা গুমোট আর একটা ভ্যাপসা গন্ধ।নির্ভান রিডিকে ঘরের ঠিক মাঝখানে দাঁড় করাল। তারপর রিদির কানের কাছে মুখ নিয়ে ফিসফিস করে বলল।
“রেডি তো? স্পেশাল সারপ্রাইজটা দেখার জন্য।”
বলেই নির্ভান এক ঝটকায় রিদির চোখের রুমালটা খুলে দিল। ঝাপসা আলোয় রিদি সামনের দিকে তাকিয়েই পাথরের মতো জমে গেল। তার পায়ের তলা থেকে যেন মাটি সরে গেল।
রানিং…!
নিন অনেক বড় পর্ব দিলাম আশা করি সবাই সাপোর্ট করবেন, অনুরোধ 4k রিয়েক্ট যাতে ওঠে, চুরি করে কেউ গল্প পড়বেন না,লেখিকার লেখার ফল আপনাদের রিয়েক্ট তাই টুস করে একটা রিয়েক্ট আর বস্তা বস্তা কমেন্ট ছুড়ে মারবেন…🙂
Share On:
TAGS: অসম্ভব রকম ভালোবাসি তোকে, সুমি চৌধুরী
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
অসম্ভব রকম ভালোবাসি তোমায় গল্পের লিংক
-
নির্লজ্জ ভালোবাসা পর্ব ৬৯
-
নির্লজ্জ ভালোবাসা পর্ব ৫৬
-
নির্লজ্জ ভালোবাসা পর্ব ৬১
-
অসম্ভব রকম ভালোবাসি তোমায় পর্ব ১৬
-
অসম্ভব রকম ভালোবাসি তোমায় পর্ব ১৩
-
নির্লজ্জ ভালোবাসা পর্ব ৮৮
-
অসম্ভব রকম ভালোবাসি তোমায় পর্ব ৬
-
নির্লজ্জ ভালোবাসা পর্ব ৫৮
-
নির্লজ্জ ভালোবাসা পর্ব ৬৭