অসম্ভবরকমভালোবাসি_তোমায়
লেখিকাসুমিচৌধুরী
পর্ব ১৯
🚫অনুমতি ব্যতীত কপি করে নিষিদ্ধ🚫
শহরের ব্যস্ত রাস্তার আড়ালে হাজারো তথ্যের আদান-প্রদান চলে সোশ্যাল মিডিয়া থেকে শুরু করে কম্পিউটারের গোপন বার্তা পর্যন্ত। কিন্তু এই যান্ত্রিক শহরের বুকেই লুকিয়ে থাকে এমন কিছু রহস্য, যার হদিস কেবল সেই রহস্যের স্রষ্টাই জানে। শহরের ঠিক মাঝখানে অবস্থিত এক বিশাল ও ভয়ংকর ঘন জঙ্গল, যা সাধারণ মানুষের কাছে আতঙ্কের অপর নাম। কেউ কল্পনাও করতে পারে না যে, এই অভেদ্য অরণ্যের গভীরেও মানুষের অস্তিত্ব থাকতে পারে।
সবচেয়ে বিস্ময়কর বিষয় হলো, সেই জঙ্গলের মাটির নিচে অবস্থিত এক বিশাল বাড়ি। শুনতে অবিশ্বাস্য মনে হলেও, বাস্তবেও এমন গোপন আস্তানা থাকা সম্ভব, যা অনেকের কাছেই অজানা।
এই মাটির নিচের বাড়িটিই হলো নির্ভানের গোপন ডেরা। অনেক বছর আগে এটি তৈরি করা হয়েছিল। যখন নির্ভান বাংলাদেশে থাকত, তখন সে এখানে মানুষ এনে নৃশংসভাবে খুন করত। সেই অগণিত খুনের দায়ে তাকে একসময় দেশ ছাড়তে বাধ্য হতে হয়েছিল, কিন্তু তার এই আস্তানার হদিস কেউ কখনো পায়নি। নির্ভান নিজেও কখনো ভাবেনি যে, তাকে আবারও কোনো একদিন এই বাড়িতে ফিরে আসতে হবে।
বাড়ির একটি রুমের বেডে নিথর হয়ে শুয়ে আছে রিদি। তার পেটে আর মাথায় এখন সাদা ব্যান্ডেজ। নির্ভানের নির্দেশে আর প্রাণের ভয়ে শহরের সবচেয়ে দক্ষ ডাক্তার এখানে এসে রিদির চিকিৎসা করেছেন। সৃষ্টিকর্তার অশেষ রহমতে রিদি এখন বিপদমুক্ত ও সুস্থ। এখন কেবল সময়ের অপেক্ষা কখন তার জ্ঞান ফিরবে আর সে চোখ মেলে তাকাবে।
ভোরের আলো ফোটার ঠিক কয়েক মিনিট আগে রিদির দু চোখের পাতা ধীরে ধীরে কেঁপে উঠল। চোখ খুলেই সে চারপাশটা দেখার চেষ্টা করল, কিন্তু নিস্তব্ধতা তাকে গ্রাস করে ফেলল। চারদিকটা এতটাই নিঝুম যে ওর মনে হচ্ছে ও কোনো কবরে শুয়ে আছে। রুমটার গঠন আর আসবাবপত্র দেখে মনে হচ্ছে সে কত বছর আগের কোনো এক পরিত্যক্ত পুরোনো বাড়িতে এসে পড়েছে।
হঠাৎ করেই ওর মাথার ভেতরটা প্রচণ্ড যন্ত্রণায় টনটন করে উঠল, আর সেই সাথে পেটের ক্ষতটাও যেন জ্বলে উঠল। নিজের শরীরের দিকে তাকিয়ে কালকের সেই বীভৎস ঘটনার কথা ওর মনে পড়ে গেল। মুহূর্তে রিদি অস্থির হয়ে উঠল; বুকের ভেতরটা ভয়ে দুরুদুরু কাঁপছে। ও তো কারো কোনো ক্ষতি করেনি, তবে কেন ওকে এভাবে মারার চেষ্টা করা হলো?
ঠিক সেই সময় একটা বিকট ‘ক্যাঁচ’ শব্দে রুমের ভারী দরজাটা খুলে গেল। রিদি ভয়ে কুঁকড়ে গিয়ে দরজার দিকে তাকাতেই থমকে গেল। নির্ভান ধীরপায়ে ভেতরে ঢুকল। রিদির জ্ঞান ফিরেছে দেখে নির্ভানের ঠোঁটের কোণে এক চিলতে তৃপ্তির হাসি ফুটে উঠল। সে খুব স্বাভাবিক ভঙ্গিতে রিদির পাশের একটা চেয়ার টেনে বসল এবং এক দৃষ্টিতে ওর দিকে তাকিয়ে নরম গলায় বলল।
“গুড মর্নিং মায়াবী! ঘুম কেমন হলো? শরীর কি এখন খুব বেশি খারাপ লাগছে?”
রিদি বিস্ময় আর আতঙ্ক মেশানো চোখে নির্ভানের দিকে তাকিয়ে রইল। কে এই লোকটা? আর সে তাকে ‘মায়াবী’ বলে এত আপন করে সম্বোধন করছেই বা কেন? রিদির অবাক চাউনি দেখে নির্ভান আবারও শান্ত গলায় বলল।
“চিনতে পারছ না আমাকে? অবশ্য চেনার কথাও না। পরিচয় পরে হবে, আগে তোমার কিছু খাওয়া প্রয়োজন। মুখটা একদম শুকিয়ে কাঠ হয়ে আছে তোমার।”
রিদি আর চুপ করে থাকতে পারল না। সে নির্ভানের চোখের দিকে সোজাসুজি তাকিয়ে কাঁপা গলায় প্রশ্ন করল।
“কে আপনি? আর আমিই বা এখানে কোথায়?”
নির্ভান এক পলক রিদির দিকে তাকিয়ে বাঁকা হাসল। সেই হাসিতে যেন এক রহস্যময় তৃপ্তি খেলা করছে। সে নিচু গলায় বলল।
“ছিলে আমার শত্রু, হয়ে গেলে মিত্র। মায়াবী, তুমি কি জানো তুমি আমার কত প্রিয়।”
নির্ভানের এমন অদ্ভুত আর অধিকার খাটিয়ে কথা বলা রিদির একদমই পছন্দ হচ্ছে না। ওর বুকের ভেতরটা অজানা আশঙ্কায় কেঁপে উঠল। সে সাহস সঞ্চয় করে বলল।
“দে-দেখুন, আপনি যেই হোন আমার তা জানার প্রয়োজন নেই। আমাকে দয়া করে বাড়ি যেতে দিন, আমি এখনই বাড়ি যাব।”
বলেই রিদি যন্ত্রণাকাতর শরীর নিয়ে বেড থেকে ওঠার চেষ্টা করল। কিন্তু নির্ভান তৎক্ষণাৎ ঝুঁকে পড়ে রিদির দুই কাঁধ শক্ত করে ধরে ওকে থামিয়ে দিল। ওর চোখে তখন এক অদ্ভুত জেদ। সে গম্ভীর গলায় বলল।
“সাবধান! বাড়ি তুমি যাবে ঠিকই, কিন্তু তার আগে তোমাকে পুরোপুরি সুস্থ হতে হবে। এই অবস্থায় এক পা-ও নড়বে না।”
ঠিক সেই মুহূর্তে রুমে একজন নার্স প্রবেশ করল। তার হাতে সতেজ কিছু ফুল আর কিছু পথ্য জাতীয় খাবার। নির্ভান নার্সের দিকে তীক্ষ্ণ নজর দিয়ে হুকুমের সুরে বলল।
“পা থেকে মাথা পর্যন্ত ওর খেয়াল রাখবে। যদি সামান্যতম অবহেলার কারণে ওর কোনো কষ্ট হয়, তবে জেনে রেখো তোমাকে জ্যান্ত টেনে নিয়ে ময়লার ডাস্টবিনে ফেলে দিয়ে আসব। আমি একটু পরেই এসে ওকে দেখে যাব।”
বলেই নির্ভান পরম মমতায় রিদির গায়ের ওপর সাদা ব্ল্যাঙ্কেটটা টেনে দিল। ওর কপালে আলতো করে হাত রেখে ফিসফিস করে বলল।
“বাই মায়াবী। রেস্ট করো, পরে দেখা হবে।”
নির্ভান রুম থেকে বেরিয়ে ধীরপায়ে করিডোর ধরে অন্য একটি রুমে ঢুকল। সেখানে ঢুকতেই দেখল তার আদরের বোন নেহা অস্থির হয়ে এদিক-সেদিক পায়চারি করছে। নেহার চোখে-মুখে আতঙ্কের ছাপ স্পষ্ট। নির্ভান বোনের অবস্থা দেখে শান্ত গলায় বলল।
“কী হয়েছে? এমন করছিস কেন? কোনো ব্যাপারে কি খুব বেশি আপসেট তুই?”
নির্ভানের শান্ত কিন্তু পাথরের মতো শক্ত চেহারাটা দেখে নেহা ভেতরে ভেতরে কুঁকড়ে গেল। সে মরিয়া হয়ে নির্ভানের দিকে এক পা এগিয়ে এসে ভাঙা গলায় বলল।
“ভাইয়া, তুমি আসলে করতে কী চাইছো বলতো? তুমিই রিদিকে মারতে চাইলে, আবার তাকে বাঁচানোর জন্য তোমার এই রহস্যময় পাতালপুরীতে এনে চিকিৎসা করাচ্ছো! তাহলে আমাদের প্ল্যানের ফায়দাটা কী হলো? আমি শুভ্রকে পাবো কীভাবে? ভাইয়া আমি…সত্যি শুভ্রকে ভালোবাসি ভাইয়া, আই রিয়েলি লাভ হিম!”
কথাগুলো বলতে বলতে নেহা যেন নিজের সব শক্তি হারিয়ে ফেলল,। নির্ভান ওর এই অবস্থা দেখে একটুও বিচলিত হলো না। সে খুব ধীরপায়ে এগিয়ে এসে নেহার মাথায় হাত রাখল। ওর ঠোঁটে একটা বিষাক্ত কিন্তু আশ্বস্ত করার মতো হাসি। সে নিচু স্বরে বলল।
“তোর ভাই যেহেতু তোকে কথা দিয়েছে শুভ্র তোর হবে, তবে শুভ্র তোরই হবে। ডোন্ট ওয়ারি বোন।”
নেহার অবাক চোখে নির্ভানের দিকে তাকিয়ে বলল।
“কিন্তু ভাইয়া, কীভাবে? তুমি তো রিদিকে বাঁচিয়ে ফেললে! রিদি বেঁচে থাকতে আমি কোনোভাবেই শুভ্রকে পাবো না।”
নির্ভান এবার নেহার চোখের দিকে সরাসরি তাকাল। ওর গলার স্বর হঠাৎ করেই একদম নির্লিপ্ত আর বরফশীতল হয়ে গেল। সে সোজাসুজি বলল।
“রিদিকে আমি বিয়ে করব।”
কথাটা নেহার কানে যেন বজ্রপাতের মতো লাগল। সে চমকে গিয়ে নিজের ভ্রু কুঁচকে চিৎকার করে উঠল।
“হোয়াট!”
নির্ভান ছোট করে উত্তর দিল, যেন খুব সাধারণ কোনো কথা বলছে।
“হুম”
“তুমি রিদিকে বিয়ে করবে মানে? তুমি কি পাগল হয়ে যাচ্ছো ভাইয়া?”
নেহার বিস্ময়ের সীমা নেই, সে নিজের কানে যেন বিশ্বাস করতে পারছে না।নির্ভানের চোয়াল শক্ত হয়ে উঠল। সে গম্ভীর আর দৃঢ় গলায় বলল।
“পাগল কি না জানি না, তবে রিদিকে আমি বিয়ে করব। আগে ও একটু সুস্থ হোক।”
নেহা রাগে আর অপমানে ফেটে পড়তে চাইল, আরও কিছু বলতে চাইল, কিন্তু ঠিক সেই মুহূর্তে দরজায় শব্দ হলো। একজন গার্ড হাতে একটা কালো পার্সেলের মতো প্যাকেট নিয়ে রুমে ঢুকল। নির্ভানের সামনে আসতেই সে মাথা নিচু করে কাঁচুমাচু হয়ে প্যাকেটটা বাড়িয়ে ধরল।
“বস, কাজ রেডি। এখন কি এটা পৌঁছে দেব?”
নির্ভানের চোখের মণি দুটো হঠাৎ চিকচিক করে উঠল। সে রহস্যময়ভাবে একটু হাসল, প্যাকেটের ওপর আলতো করে হাত রাখল। তারপর খুব নিচু স্বরে বলল।
“উহু, এক মিনিট।”
বলেই নির্ভান নেহার দিকে তাকিয়ে সরাসরি হুকুমের সুরে বলল।
“নেহা, এক টুকরো কাগজে সুন্দর করে লেখ তো সারপ্রাইজ সাইফান শুভ্র চৌধুরী।”
নেহা অবাক হয়ে কিছু একটা বলতে চাইল, কিন্তু তাকে মুখ খোলার সুযোগই দিল না নির্ভান। ঠোঁটে আঙুল চেপে ইশারা করে থামিয়ে দিল।
“হুশ! আগে লেখ, তারপর নিজেই দেখতে পাবি কী হতে যাচ্ছে।”
নেহা আর কথা না বাড়িয়ে ধুলোবালি জমা পুরোনো টেবিলটা থেকে এক টুকরো সাদা কাগজ বের করে নিল। কলম দিয়ে খুব যত্ন করে গুছিয়ে লিখল ‘সারপ্রাইজ সাইফান শুভ্র চৌধুরী’।
সেই কাগজের টুকরোটা হাতে নিয়ে নির্ভান এবার ধীরে ধীরে পার্সেলটা খুলল। ভেতরে তাকাতেই নেহার চোখ দুটো যেন কপালে উঠল। অবিশ্বাসে সে থমকে গেল। এটা তো রিদির পরনের সেই নীল শাড়িটা! আর এই শাড়িটা তো হুবহু সেই রকমই যেটা শুভ্রর কাছ থেকে সেও একবার নিয়েছিল। একই রকম শাড়ি দেখে নেহার ভ্রু কুঁচকে গেল। আগে সেভাবে খেয়াল করেনি, কিন্তু এখন চোখের সামনে রক্তমাখা শাড়িটা দেখে সে যেন কথা বলার ভাষাই হারিয়ে ফেলেছে।নির্ভান সেই রক্তাক্ত শাড়িটার ওপর নেহার লেখা চিরকুটটা রাখল। তারপর একটা শয়তানি হাসি দিয়ে অদ্ভুত এক তৃপ্তি নিয়ে বিড়বিড় করে বলল।
“সারপ্রাইজ সাইফান শুভ্র চৌধুরী!”
শহরের আনাচে-কানাচে থেকে শুরু করে বাংলাদেশের প্রতিটি প্রান্তে হন্যে হয়ে রিদিকে খুঁজে বেড়াচ্ছে শুভ্র। কিন্তু কোথাও তার কোনো চিহ্ন নেই। রিদির অস্তিত্ব যেন বিলীন হয়ে গেছে। শুভ্র জানবে কী করে যে তার ‘মনোমোহিনী’ এখন এই মাটির নিচে বন্দি।
রিদিকে হারিয়ে শুভ্র এখন প্রায় উন্মাদ। পরিপাটি সেই শুভ্রের বদলে এখন তার চুলগুলো এলোমেলো, দুচোখ রক্তজবার মতো লাল হয়ে আছে। চেহারায় একটা শুকনো ভাব গত রাত থেকে একটা দানা খাবারও পেটে পড়েনি তার। ফোনে অনবরত কল দিয়ে যাচ্ছেন ইকবাল এহসান আর সোহান চৌধুরী। বাবা আর ফুফাল যেন ছেলের চিন্তায় পাগল হয়ে গেছেন। কিন্তু তারা কি জানে, তাদের চেয়েও কয়েকগুণ বেশি পাগল হয়ে আছে শুভ্র নিজে? ভেতর থেকে সে যে কতটা ভেঙে চুরমার হয়ে যাচ্ছে, তা কেবল সেই জানে।শুভ্রের বিশাল কন্ট্রোল রুমে সারি সারি দুশোটি কম্পিউটারের সামনে বসে আছে দুশো জন দক্ষ মানুষ। তাদের সবার লক্ষ্য একটাই যেকোনো সূত্র বা লোকেশন খুঁজে বের করা। দেশের প্রতিটি তথ্য তারা যাচাই করছে। তাদের পাশেই শুভ্র অস্থিরভাবে পায়চারি করছিল। হঠাৎ তীব্র শারীরিক দুর্বলতায় মাথাটা চক্কর দিয়ে উঠল শুভ্রের।
কিছুটা দূরে একটা কম্পিউটারের সামনে দাঁড়িয়ে কাজ তদারকি করছিল ঈশান। হঠাৎ শুভ্রকে হেলে পড়তে দেখে সে দৌড়ে এসে তাকে শক্ত করে ধরে ফেলল। উৎকণ্ঠা নিয়ে বলল।
“বস, আপনি ঠিক আছেন তো? আপনার শরীরটা অনেক দুর্বল লাগছে, বস আপনি দয়া করে কিছু খেয়ে নিন।”
শুভ্র টলমল পায়ে দাঁড়িয়ে ঈশানের দিকে তাকাল। তার গলায় একরাশ হাহাকার। সে ধরা গলায় বলল।
“না ঈশান, আমার গলা দিয়ে কোনো খাবার নামবে না। আমার রিদিকে খুঁজতে হবে। যেকোনো মূল্যে হোক, ওকে বের করে আনতে হবে।”
ঈশান বসের এই অবস্থা দেখে নিজেকে সামলাতে পারছিল না। সে মিনতি করে বলল।
“কিন্তু বস, আপনার শরীর একদম ভেঙে পড়ছে। আপনাকে আগে শক্ত থাকতে হবে, আপনি সুস্থ থাকলে তবেই তো লড়তে পারবেন।”
শুভ্র ক্লান্তিতে ঈশানের কাঁধে হাত দিয়ে নিজের শরীরের ভর ছেড়ে দিল। একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে শূন্য চোখে তাকিয়ে বলল।
“পেটের খিদের জ্বালা থেকে আমার মনের জ্বালাটা অনেক বেশি রে ঈশান। আমি শুভ্র যে আসলে কেমন আছি, তা আমি ছাড়া আর কেউ বুঝতে পারবে না।”
ঈশান কোনো উত্তর দিল না, চুপ হয়ে রইল। শুভ্রের ব্যক্তিগত জীবনের সবটুকু তার জানা নেই। তবে সে এটুকু খুব ভালো করে টের পেত যে বসের মনে একটা নারীর জন্য বিশাল এক জায়গা ছিল আর সেই নারীটি যে রিদি, তা এখন শুভ্রের এই করুণ দশা দেখলেই পরিষ্কার বোঝা যায়।
রাত তখন আনুমানিক ১০:০০ টা। শুভ্র কন্ট্রোল রুমে বাঘের মতো পায়চারি করছে আর তার লোকজনকে সমান তালে তাগাদা দিচ্ছে। কিন্তু ফলাফল সেই শূন্য শহরের আনাচে-কানাচে রিদি নামক মানুষটা বাদে সবাইকেই পাওয়া যাচ্ছে, শুধু রিদিরই কোনো হদিস নেই। শুভ্র নিজের ভেতরে এক চরম অস্থিরতা অনুভব করছে সে বুঝতে পারছে, এবার তাকে তার সেই ভয়ংকর রূপে ফিরতে হবে। নাহলে সে তার মনোমোহিনীকে চিরতরে হারিয়ে ফেলবে।
এমন সময় হঠাৎ সেই রুমের কলিং বেলটা বেজে উঠল। ঈশান দরজার কাছে এসে দরজা খুলতেই নিচে রাখা একটা পার্সেল দেখতে পেল। ঈশান ভ্রু কুঁচকে আশেপাশে তাকাল, কিন্তু করিডোরে কেউ নেই। এত রাতে এই পার্সেল কে দিয়ে গেল? ঈশান পার্সেলটা হাতে নিয়ে সরাসরি শুভ্রের সামনে এসে দাঁড়াল। প্যাকেটটা চোখের সামনে ধরে বলল।
“বস, এই পার্সেলটা দরজায় পেলাম। কিন্তু কাউকে দেখতে পেলাম না। মনে হয় দিয়ে চলে গেছে।”
শুভ্র শূন্য চোখে পার্সেলটার দিকে তাকাল। এত রাতে কে পার্সেল দিয়ে গেল? সে তো কিছু অর্ডার করেনি।শুভ্র কোনো কথা না বলে পার্সেলটা নিয়ে কন্ট্রোল রুম থেকে বের হলো। একদম শহরের রাস্তার সামনে এসে দাঁড়াল সে, পিছন পিছন ঈশান। শুভ্র আশেপাশে তীক্ষ্ণ নজরে তাকাল শুধু দু-একটা গাড়ি দেখা যাচ্ছে, কিন্তু সন্দেহজনক কাউকে দেখা যাচ্ছে না। শুভ্র ভাবল হয়তো কেউ ভুল করে তার ঠিকানায় পার্সেল দিয়ে চলে গেছে।বিরক্তিতে শুভ্র যখন রাস্তার পাশে পার্সেলটা ছুঁড়ে ফেলে দিতে চাইল, ঠিক তখনই ঈশান তাকে থামিয়ে দিয়ে বলল।
“বস, একটু খুলে দেখেন না কী আছে। আই মিন, কেউ ভুল করে রেখে গেলে তো অবশ্যই বলে যায়। কিন্তু এই ডেলিভারি বয় তো টু শব্দটাও করল না। আমি শিওর বস, এতে কিছু একটা আছে।”
শুভ্রর হাতটা মাঝপথেই থমকে গেল। ঈশানের কথা শুনে সে পার্সেলটার দিকে আবার তাকাল। একটা অজানা আশঙ্কায় তার বুকের ভেতরটা ধক করে উঠল।শুভ্র কাঁপা কাঁপা হাতে প্যাকেটটা খুলল আর খুলতেই তার চোখ কপালে উঠে গেল। পাশে দাঁড়িয়ে থাকা ঈশানেরও চোখ দুটো বড় বড় হয়ে গেল। ঈশান অবিশ্বাসের দৃষ্টিতে তাকিয়ে কাঁপা কাঁপা গলায় বলল।
“ব-বস, এইটা তো রিদির শাড়ি! কাল তো এই শাড়ি পরেই সে ছিল।”
শুভ্র তড়িঘড়ি করে প্যাকেট থেকে শাড়িটা বের করে আনল। আর ঠিক সেই মুহূর্তেই শাড়ির ভাঁজ থেকে সাদা কাগজের সেই চিরকুটটা নিচে পড়ে গেল। শুভ্র সেদিকে তাকানোরও সময় পেল না, তার পুরো মনোযোগ তখন হাতের ওই কাপড়টার ওপর। সে শাড়িটা মেলে ধরতেই দেখল, পুরো শাড়িটা রক্তে ভিজে জবুথবু হয়ে আছে। কালচে রক্তের দাগগুলো দেখে শুভ্রর বুকের ভেতরটা যেন কেউ ধারালো ছুরি দিয়ে চিরে দিল।সে আর দাঁড়িয়ে থাকতে পারল না। রাস্তার ধুলোবালির মধ্যেই শাড়িটা হাতে নিয়ে হাঁটু গেঁড়ে বসে পড়ল শুভ্র। তার পুরো শরীর থরথর করে কাঁপছে। সে আর্তনাদ ভরা ঝাপসা চোখে ঈশানের দিকে তাকিয়ে কাঁপা কাঁপা গলায় বলল।
“ঈ-ঈশান, এ তো আমার মনোমোহিনীর শাড়ি! ওর শাড়িতে এত রক্ত কেন ? আমার মনোমোহিনীর কী হয়েছে?।”
ঈশান কী বলবে ভেবে পাচ্ছে না, তার নিজের বুকটাও ভয়ের চোটে থরথর করে কাঁপছে। রিদির পরনের শাড়িতে এমন টাটকা রক্ত! কেউ জেনেবুঝেই এই কাজটা করেছে, সরাসরি শুভ্রর কলিজায় কামড় বসিয়েছে।
হঠাৎ শুভ্র আকাশফাটা এক আর্তনাদ করে উঠল। সে হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে শূন্য আকাশের দিকে তাকিয়ে পাগলের মতো চিৎকার করে বলতে লাগল।
“প্লিজ! আমার মনোমোহিনীকে কেউ কষ্ট দিস না! আমি ওর কষ্ট সইতে পারবো না। কার শত্রুতা আমার মনোমোহিনীর সাথে? যা করার আমার সাথে কর, সব শাস্তি আমাকে দে! আল্লাহর দোহাই লাগে, আমার মনোমোহিনীকে একটুও যন্ত্রণায় ফেলিস না! আমার এই বুক, আমার এই আত্মা ছিঁড়ে যাচ্ছে রে আমি ওর কষ্ট সহ্য করতে পারবো না!”
ঈশান শুভ্রকে সামলাতে ওর দুই কাঁধ শক্ত করে ধরে ঝাঁকুনি দিয়ে বলল।
“বস! আপনি শান্ত হোন! রিদির কিছু হয়নি, ও ঠিক আছে। কেউ কেবল আপনাকে মানসিকভাবে পঙ্গু করে দেওয়ার জন্য এই নোংরা খেলা খেলছে।”
কথাটা বলতে বলতেই ঈশানের চোখ পড়ল রাস্তায় পড়ে থাকা সেই চিরকুটটার দিকে। ঈশান সেটা তুলে ধরতেই তার শরীরের রক্ত হিম হয়ে গেল। সেখানে স্পষ্ট করে লেখা সারপ্রাইজ সাইফান শুভ্র চৌধুরী’। ঈশান চিরকুটটা শুভ্রের চোখের সামনে ধরল।
“বস, এই দেখুন!”
শুভ্র তার আর্তনাদ থামিয়ে ছোঁ মেরে চিরকুটটা হাতে নিল। ওই কয়েকটা শব্দ দেখামাত্রই শুভ্রর পুরো শরীর পাথরের মতো শক্ত হয়ে গেল। সে হাতের মুঠোয় কাগজটা এমনভাবে পিষল যেন ওটা তার শত্রুর গলা। এখন সে নিশ্চিত, কেউ অত্যন্ত ঠান্ডা মাথায় তার সাথে এই যুদ্ধ শুরু করেছে। শুভ্রের চোখ দুটো হঠাৎ টকটকে লাল হয়ে উঠল, মনে হলো সেখান থেকে বিষাক্ত আগুনের লাভা ঝরছে। সে দাঁত কিড়মিড় করে নরকের শয়তানের মতো গম্ভীর আর কলিজা কাঁপানো গলায় বলল।
“আমার সাথে লড়তে চাস তো? ঠিক আছে! এখন তুই দেখবি এই সাইফান শুভ্র চৌধুরী আসলে কার নাম। আমার মনোমোহিনী… আমার এই দেহে এক ফোঁটা রক্ত থাকতে ওর কিচ্ছু হতে দেব না আমি! আর যদি ওর গায়ের একটা পশমেও আঘাত লেগে থাকে, তবে শপথ করছি এই শহর আমি জ্যান্ত মানুষের চিতার আগুনে জ্বালিয়ে খাক করে দেব! সব ধ্বংস করে দেব আমি! তুই যে গর্তেই লুকিয়ে থাকিস না কেন, আজরাইল হয়ে তোর শিয়রে আমি ঠিকই পৌঁছাব। জাস্ট ওয়েট কর! তুই কল্পনাও করতে পারবি না সাইফান শুভ্র চৌধুরী যখন জানোয়ার হয়, তখন মৃত্যুও তার সামনে এসে ক্ষমা চায়।”
রানিং…!
Share On:
TAGS: অসম্ভব রকম ভালোবাসি তোকে, সুমি চৌধুরী
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
অসম্ভব রকম ভালোবাসি তোমায় পর্ব ৯
-
নির্লজ্জ ভালোবাসা পর্ব ৮০
-
অসম্ভব রকম ভালোবাসি তোমায় পর্ব ৫
-
নির্লজ্জ ভালোবাসা পর্ব ৮২
-
নির্লজ্জ ভালোবাসা পর্ব ৬৬
-
নির্লজ্জ ভালোবাসা পর্ব ৫৫
-
নির্লজ্জ ভালোবাসা পর্ব ৬৩
-
নির্লজ্জ ভালোবাসা পর্ব ৭৩
-
নির্লজ্জ ভালোবাসা পর্ব ৬৮
-
অসম্ভব রকম ভালোবাসি তোমায় পর্ব ১৬