অসম্ভবরকমভালোবাসি_তোমায়
লেখিকাসুমিচৌধুরী
পর্ব ১৮
🚫অনুমতি ব্যতীত কপি করা নিষিদ্ধ🚫
ড্রয়িংরুমে নেহা আর নির্ভান তখন খুশির আমেজে মত্ত। নেহা একটু আগেই পৌঁছেছে রিদির ধরা পড়া আর তার আসন্ন মৃত্যুর খবরটা যেন ওদের কাছে কোনো উৎসবের বারতা। হঠাৎ সেই নিস্তব্ধতা চিরে রিদির গগনবিদারী চিৎকার কানে আসতেই দুজনে দৌড়ে সেই ঘুপচি ঘরটায় এসে হাজির হলো।রিদি তখন দুই হাতে মাথা চেপে ধরে মাটির ওপর কুঁকড়ে বসে পড়েছে। ওর সেই ঘন লম্বা চুলগুলো মুখের ওপর অবাধ্য হয়ে ছড়িয়ে পড়েছে, যার কারণে মুখটা চেনা যাচ্ছে না। কেবল চুলের সেই কালো অরণ্য বেয়ে তাজা লাল রক্ত গড়িয়ে মেঝেতে পড়ছে। রিদির চোখের সামনেটা ক্রমশ ঝাপসা হয়ে আসছে, চারদিকের শব্দগুলো যেন অনেক দূর থেকে ভেসে আসছে। নির্ভানকে দেখেই মাটিতে পড়ে থাকা গার্ডটা যন্ত্রণায় কাতরাতে কাতরাতে বলল।
“বস, মেয়েটা আমায় লাথি মেরেছে! তাই ও মাথায় আঘাত করেছে।”
কথাটা শুনে নেহা মুহূর্তেই হিংস্র হয়ে উঠল। চোখের মণি দুটো বড় বড় করে সে চেঁচিয়ে বলল।
“কী! এই সাধারণ একটা মেয়ের এত বড় সাহস? ওকে আমি নিজের হাতে শেষ করব!”
নেহা নিচু হয়ে মেঝেতে পড়ে থাকা রক্তমাখা ছুরিটা তুলতে গেলে নির্ভান ঝট করে তার হাতটা ধরে ফেলল। নির্ভানের চোখে তখন এক অদ্ভুত নেশা। সে শীতল গলায় বলল।
“উহু, থাম! আমি অনেকদিন ধরে নিজ হাতে শিকার করি না। আর কখনো কোনো মেয়ে মানুষকে তো মারিনি। আজ এই মেয়েটাকে দিয়েই শুরু করি। দেখি না, মেয়ে মানুষ খুন করতে কেমন লাগে!”
নেহার ঠোঁটে পৈশাচিক তৃপ্তির হাসি ফুটে উঠল। নির্ভান ধীরস্থিরভাবে ছুরিটা হাতে নিল। তারপর পরম আয়েশে হাঁটু গেড়ে রিদির ঠিক সামনে বসল। রিদি তখনো যন্ত্রণায় মাথা নিচু করে গোঙাচ্ছে, অবিন্যস্ত চুলে ওর সারা মুখ ঢাকা। নির্ভান রিদির চুলের ওপর হাত না রেখেও তার কানের কাছে মুখ নিয়ে ফিসফিস করে বলল।
“চু চু… মিস তাসনিন রিদিকা! খুব কষ্ট হচ্ছে, তাই না? তবে কী আর করার, মরতে তো আপনাকে হবেই। জানেন, আমি সচরাচর মেয়ে মানুষ মারি না। মায়াবীকে ছাড়া কোনো মেয়ের প্রতি আমার কোনোকালেই ইন্টারেস্ট ছিল না। কিন্তু আপনাকে মারলে আমার কলিজায় একটু শান্তি আসবে।”
বলেই নির্ভান এক মুহূর্ত সময় নষ্ট না করে হাতের ধারালো ছুরিটা সজোরে রিদির পেটে আমূল বসিয়ে দিল! রিদি যন্ত্রণার এক চরম চিৎকার দিয়ে মাথাটা পেছন দিকে এলিয়ে দিল। আর ঠিক তখনই চাবুকের মতো ওর চুলগুলো মুখ থেকে সরে গেল।
রিদির ফ্যাকাশে হয়ে যাওয়া মুখটা দেখা মাত্রই মুহূর্তের মধ্যে নির্ভানের সমস্ত পৃথিবী যেন থমকে গেল! তার মুখের পৈশাচিক হাসিটা এক লহমায় উধাও হয়ে গেল। বুকের ভেতরটা কেঁপে উঠল, হাত-পা বরফের মতো শীতল হয়ে এল নির্ভানের। রিদি তার পেটেবিঁধা ছুরির ওপর হাত রেখে যন্ত্রণায় নিথর হয়ে মেঝের ওপর লুটিয়ে পড়ল। ওর মায়াবী চোখ জোড়া আস্তে আস্তে বন্ধ হয়ে এল।মুহূর্তে নির্ভান গলা ফাটানো চিৎকার করে উঠল।
“মায়াবীইইইইইইইইই!”
এদিকে কলেজে নানা রকম অনুষ্ঠান হচ্ছে কিন্তু শুভ্রের কিছুতেই ভালো লাগছে না। চারপাশের এত আলো, গান, হইহুল্লোড় সবকিছুই ওর কাছে বিষ লাগছে। মনের ভেতরটা ছটফট করছে এক অজানা আশঙ্কায়। বারবার মনের আয়নায় রিদির সেই মুখটা ভেসে উঠছে। শুভ্র বারবার নিজেকে প্রশ্ন করছে, রিদিকে মারা কি ঠিক ছিল? কেন যে অকারণে মারতে গেল তার মনোমোহিনীকে! এই অপরাধবোধ ওকে কুঁড়ে কুঁড়ে খাচ্ছে।
ধীরে ধীরে অনুষ্ঠান শেষ হতে হতে সন্ধ্যা হয়ে এলো। শুভ্র আর এক মুহূর্ত সেখানে থাকতে পারল না। সে গটগট করে কলেজ থেকে বের হলো, পিছন পিছন ঈশান আর শুভ্রাও আসছিল। শুভ্র গম্ভীর গলায় ঈশানকে উদ্দেশ্য করে বলল।
“ঈশান তুমি শুভ্রাকে বাড়িতে পৌঁছে দিয়ে আসো, আমি এখন বাড়িতে যাচ্ছি না।”
ঈশান বসের মুখের দিকে তাকিয়ে আর দ্বিরুক্তি করল না। শুধু বলল।
“ওকে বস।”
শুভ্র সাথে সাথে তার গাড়িতে উঠে পড়ল। কোথায় যাবে সে নিজেও জানে না, তবে তার দম বন্ধ হয়ে আসছে। সে পাগলের মতো গাড়ি চালিয়ে ফাঁকা রাস্তা দিয়ে ছুটে যেতে লাগল।
রাত হয়ে এসেছে। শুভ্র চুপচাপ রাস্তা দিয়ে একা গাড়ি চালাচ্ছে। চারপাশটা নিঝুম। হঠাৎ তার ফোনটা বেজে উঠল। শুভ্র স্ক্রিনে তাকিয়ে দেখে ইকবাল এহসানের ফোন। সে গাড়ি চালাতে চালাতেই ফোনটা রিসিভ করে কানে ধরল। ওপাশ থেকে ইকবাল এহসানের কণ্ঠস্বর ভেসে এল অত্যন্ত অস্থির আর আতঙ্কিত।
“শুভ্র বাবা, রিদিদের কলেজের কি অনুষ্ঠান শেষ হয়নি?”
শুভ্র তৎক্ষণাৎ গাড়িতে কষে ব্রেক মারল। টায়ারের তীক্ষ্ণ শব্দে রাস্তাটা কেঁপে উঠল। সে বলল।
“ফুপা, অনুষ্ঠান তো অনেক আগেই শেষ হয়ে গেছে। কেন ফুপা, কি হয়েছে?”
ইকবাল এহসান ওপাশ থেকে কান্নায় ভেঙে পড়া গলায় বললেন।
“কি বলো তুমি! তাহলে আমার রিদি মা কই? ও তো এখনো বাড়ি আসেনি! আর বাবা ওর ফোনটাও বন্ধ পাচ্ছি।”
ইকবাল এহসানের কথাটা শোনা মাত্রই শুভ্রের মাথায় যেন আস্ত আকাশ ভেঙে পড়ল। এক মুহূর্তের জন্য ওর হৃৎপিণ্ডটা থমকে গিয়ে পরক্ষণেই পাগলের মতো ধকধক করতে লাগল। সে চরম অস্থিরতায় স্টিয়ারিং হুইলটা খামচে ধরে কাঁপা গলায় বলল।
“কী বলছেন ফুপা আপনি! রি-রিদিকে তো আমি দুপুরের দিকেই বাড়ির জন্য পাঠিয়ে দিয়েছি। ও তো অনেক আগেই পৌঁছানোর কথা!”
ইকবাল এহসান ওপাশ থেকে ডুকরে কেঁদে উঠলেন। তাঁর হাহাকার মাখানো কণ্ঠস্বর শুভ্রের কানে সজোরে বিঁধল।
“না বাবা, ও বাড়িতে আসেনি! আমি কতবার ফোনে কল করছি, কিন্তু ফোন বারবার বন্ধ বলছে। আমার মা জননীটা কোথায় গেল রে বাবা!”
শুভ্রের মস্তিস্ক যেন কাজ করা বন্ধ করে দিয়েছে। চারদিকের নিঝুম রাতটা হঠাৎ ওর চারপাশ থেকে শ্বাসরোধ করতে চাইল। সে কোনোমতে নিজেকে সামলে নিয়ে চোয়াল শক্ত করে বলল।
“ফুপা, আপনি শান্ত হোন। আমি দেখছি। আমি… আমি রিদিকে নিয়ে তবেই বাড়ি ফিরছি। আপনি একদম টেনশন করবেন না ফুপা, আমি থাকতে রিদির কিচ্ছু হতে দেব না। এটা আমার কথা!”
বলেই শুভ্র ফোনটা কেটে দিয়ে পাগলের মতো শুভ্রাকে কল দিল। ওপাশ থেকে শুভ্রা কলটা রিসিভ করে কিছু বলার আগেই শুভ্র গর্জন করে উঠল।
“শুভ্রা! তাড়াতাড়ি আমাকে মিথিলা, ভাবনা, রিয়া ওদের সবার বাসার ঠিকানা সেন্ড কর! কুইক!”
ওপাশ থেকে শুভ্রা হকচকিয়ে গিয়ে ঘাবড়ে যাওয়া গলায় বলল।
“কী হয়েছে ভাইয়া? তোমার গলা এমন শোনাচ্ছে কেন? তুমি ঠিক আছ তো?”
শুভ্র এবার হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে চিৎকার করে উঠল। ওর গলার রগগুলো রাগে ফুলে উঠেছে।
“আমি তোকে যেটা করতে বলছি সেটা কর! আই সেইড ডু হোয়াট আই টোল্ড ইউ রাইট নাউ! ডোন্ট ওয়েস্ট মাই ড্যাম টাইম, জাস্ট সেন্ড দ্য অ্যাড্রেসেস!”
শুভ্রার আর কথা বাড়ানোর সাহস হলো না। সে কাঁপাকাঁপা হাতে দ্রুত সব ঠিকানা মেসেজ করে দিল। শুভ্র পাগলের মতো গাড়ি ছুটিয়ে একজনের পর একজনের বাসায় গেল। টায়ারের ঘর্ষণে রাস্তা কেঁপে উঠছে, কিন্তু ফলাফল শূন্য! কারো বাড়িতেই রিদি নেই। শুভ্রের মনে হচ্ছে ওর কলিজাটা কেউ জ্যান্ত টেনে বের করে নিচ্ছে।
সে রিদির নাম্বারে একটার পর একটা কল দিয়েই যাচ্ছে, কিন্তু সেই নিষ্ঠুর যান্ত্রিক কণ্ঠস্বর বারবার বলছে সংযোগ দেওয়া সম্ভব নয়’। রাগে, ক্ষোভে আর এক অজানা আতঙ্কে শুভ্র হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে ফেলল। সে সজোরে নিজের দামি ফোনটা রাস্তার দিকে ছুড়ে মেরে গলা ফাটানো এক চিৎকার দিয়ে উঠল।
“আহহহহহহহহহ! রিদির বাচ্চা, কই তুই? আজ তোকে পেয়ে নিই, একদম জান শেষ করে দেব তোর! এইভাবে আমার কলিজা নিয়ে কেন খেলছিস তুই?”
হঠাৎ শুভ্রের চোখ দুটো রাগে আর রক্তচক্ষু হয়ে উঠল। সে কোনো উপায় না দেখে নিজের হাতের স্মার্ট ওয়াচটা টিপে কাউকে একটা ফোন দিল। ওপাশ থেকে কলটা রিসিভ হতেই শুভ্র দরাজ গলায় হুকুম দিতে লাগল।
“দশ মিনিটের মধ্যে এই পুরো পৃথিবীর সব জায়গায় আমার ঘেরাও চাই! রেল স্টেশন, বাস স্টেশন, এয়ারপোর্ট সব! ইভেন হসপিটালের প্রতিটি কোনা যেন আমার মানুষের নজরদারিতে থাকে। আজকে যত ফ্লাইট যাওয়ার কথা আছে, সব ক্যান্সেল করা হবে! যত টাকা লাগে আমি দেব, তবুও আমার সব জায়গায় ঘেরাও চাই।”
ওপাশ থেকে অত্যন্ত অনুগত এক কণ্ঠস্বর ভেসে এল।
“ওকে বস।”
শুভ্র ফোনটা কেটেই ঈশানকে কল দিল। ঈশান আগে থেকেই শুভ্রার সাথে ছিল, তাই সে কয়েক মিনিটের মধ্যেই ঝড়ের বেগে শুভ্রের সামনে এসে হাজির হলো। শুভ্রকে এমন বিধ্বংসী রূপে দেখে ঈশান ঘাবড়ে গিয়ে বলল।
“বস, আপনি ঠিক আছেন তো? কী হয়েছে?”
শুভ্র কোনো উত্তর দিল না। পাথরের মতো শক্ত মুখে সে পকেট থেকে আরেকটা ফোন বের করে রিদির একটা হাসিখুশি ছবি ঈশানের ফোনে সেন্ড করে দিল। তারপর বরফশীতল গলায় বলল।
“এই ছবিটা এখনই দেশের সব নিউজ চ্যানেলে দাও। পুরো পৃথিবী যেন এই মুহূর্তে ওকে দেখতে পায়! সাথে দুটো বিশেষ ক্যাপশন থাকবে। প্রথমটা হচ্ছে যে এই মেয়েটাকে যে খুঁজে পাবে বা সন্ধান দেবে, তাকে নগদ লক্ষ টাকার পুরস্কার দেওয়া হবে। আর দ্বিতীয়টা…”
শুভ্র থামল, ওর চোখ দিয়ে যেন আগুন ঝরছে। সে দাঁতে দাঁত চেপে বলল।
“দ্বিতীয়টা থাকবে যদি এই মেয়েকে কেউ তুলে নিয়ে থাকে, তবে সে যদি নিজের জানের মায়া করে, তাহলে যেন চুপচাপ ওকে আমার হাতে তুলে দিয়ে যায়। নাহলে সাইফান শুভ্র চৌধুরী।তার জানটাকে কুবিয়ে কুবিয়ে রাস্তার কুত্তাদের খাওয়াবে! মনে থাকে যেন, এক চুল এদিক-ওদিক না হয়।”
শুভ্রের রাগ দেখে ঈশানের বুকের ভেতরটা কেঁপে উঠল। কিন্তু তার চেয়েও বেশি বড় ধাক্কা খেল যখন সে ফোনের স্ক্রিনে রিদির ছবিটা দেখল। ঈশান অবিশ্বাসের সুরে তোতলামি করে বলল।
“ব- বস, এইটা তো রিদির পিক! কী হয়েছে রিদির? ও কোথায়?”
শুভ্র গাড়িতে পিঠ ঠেকিয়ে দাঁড়িয়ে আছে, ওর চোয়াল শক্ত হয়ে ফুলে উঠেছে। সে রুদ্ধশ্বাসে বলল।
“পাওয়া যাচ্ছে না ওকে! দুপুরে নিজে দাঁড়িয়ে থেকে ওকে বাড়িতে পাঠিয়ে দিয়েছি, কিন্তু ফুপা ফোন করে জানালো ও বাড়ি ফেরেনি। ফোনটাও বারবার বন্ধ বলছে। ওর সব বান্ধবীদের বাড়ি চষে ফেলেছি, কোথাও নেই ও… কোথাও নেই!”
কথাটা বলতে গিয়েই শুভ্রের বলিষ্ঠ কণ্ঠস্বর এক মুহূর্তের জন্য কেঁপে উঠল। এক চরম অসহায়ত্ব আর দুর্বলতা ওকে গ্রাস করতে চাইল। ঈশান সব শুনে যেন আকাশ থেকে পড়ল। পরিস্থিতি যে কতটা ভয়াবহ তা বুঝতে ওর আর বাকি রইল না। শুভ্রের এই ভেঙে পড়া অবস্থা দেখে ঈশান নিজের ভয় ঝেড়ে ফেলে চোখ-মুখ শক্ত করে বলল।
“বস, আপনি একদম টেনশন করবেন না। আমি এখনই সবকিছু হ্যান্ডেল করছি। আপনি শুধু নিজেকে শক্ত রাখুন।”
বলেই ঈশান আর এক মুহূর্ত দেরি করল না। বাইকের স্টার্ট দিয়ে এক বিকট গর্জন তুলে সে ঝড়ের গতিতে দৃষ্টির আড়ালে চলে গেল।
রাতের সেই নির্জন রাস্তায় দাঁড়িয়ে শুভ্র যেন এক হিংস্র পশুর মতো গর্জে উঠল। তার চিৎকারে চারপাশের নিস্তব্ধতা খানখান হয়ে গেল। সে আকাশের দিকে তাকিয়ে দাঁতে দাঁত চেপে বলল।
“যদি রিদিকে কোনো কুত্তার বা’চ্চা তুলে নিয়ে থাকে, তবে তার রক্ত দিয়ে আমি গোসল করব! রিদির যদি কিছু হয়, তবে খোদার কসম সবাইকে ধ্বংস করে দেব কাওকে ছাড়বো না আমি।”
ইতিমধ্যেই পুরো পৃথিবী যেন ওলটপালট হয়ে গেল। পুলিশ, সেনাবাহিনী থেকে শুরু করে শুভ্র তার সমস্ত শক্তি মাঠে নামিয়ে দিয়েছে। তন্নতন্ন করে খোঁজা হচ্ছে শহরের প্রতিটি ইঞ্চি। হঠাৎ পুলিশের সাইবার ইউনিট থেকে খবর এল রিদির ফোনের শেষ লোকেশন ট্র্যাক করা গেছে। ফোনটা বন্ধ হওয়ার ঠিক আগ মুহূর্তে যেখানে অন ছিল, সেই জায়গাটা চিহ্নিত হতেই শুভ্র উন্মুখ হয়ে সেখানে ছুটল।
পাগলের মতো গাড়ি চালিয়ে শুভ্র সেই নির্জন রাস্তার মোড়ে এসে পৌঁছাল। ধকধক করতে থাকা বুক নিয়ে সে রাস্তার এদিক-সেদিক খুঁজতে লাগল। হঠাৎ রাস্তার একদম কিনারায় ঘাসের ওপর চকচকে একটা জিনিসের দিকে ওর নজর গেল। শুভ্র দৌড়ে গিয়ে ফোনটা তুলে নিল। ফোনের স্ক্রিনটা ফেটে গেছে, কিন্তু ওটা চিনতে এক মুহূর্ত দেরি হলো না ওর এটা রিদিরই ফোন!
রিদির ফোনটা এভাবে রাস্তায় পড়ে থাকতে দেখে শুভ্রের পায়ের নিচ থেকে মাটি সরে গেল। ও নিশ্চিত হয়ে গেল যে ওর মনোমোহিনীকে কেউ জবরদস্তি তুলে নিয়ে গেছে। কিন্তু কে? শুভ্রের জানামতে রিদির তো কারো সাথে কোনো শত্রুতা থাকার কথা নয়! তবে কেন ওকে লক্ষ্য করা হলো? শুভ্রের মাথায় তখন রাগের চেয়েও হাজারটা প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে। কিন্তু পরক্ষণেই সেই বিভ্রান্তি ছাপিয়ে এক ভয়াবহ আক্রোশ ওর রক্তে মিশে গেল। শুভ্র দুহাতে ফোনটা শক্ত করে চেপে ধরে বনের বাঘের মতো গর্জে উঠল।
“যেই হোক সে! যেই হাত দিয়ে আমার মনোমোহিনীকে ধরার দুঃসাহস করেছে, সেই হাত আমি কেটে টুকরো টুকরো করে ফেলব! যেই চোখ দিয়ে আমার মনোমোহিনীকে নোংরাভাবে দেখেছে, সেই চোখ আমি টেনে উপড়ে ফেলব!আই উইল নট স্পেয়ার এনিওয়ান! আই উইল বার্ন দিস হোল ওয়ার্ল্ড টু ফাইন্ড হার!”
এদিকে নির্ভান মুহূর্তের মধ্যে রিদির রক্তাক্ত আর নিথর দেহটা নিজের বুকের মাঝে জড়িয়ে ধরে এক বুক ফাটানো আর্তনাদ করে উঠল। তার চোখের জল তখন রিদির ফ্যাকাশে গাল ভিজিয়ে দিচ্ছে।
“ও নো নো নো! আ*হহহ! এই মায়াবী, ওঠ! কথা বল আমার সাথে! ওহ আল্লাহ, আমি এইটা কী করলাম? যাকে দেখার জন্য দীর্ঘ তিনটি বছর ধরে আমার এই চোখ দুটি তৃষ্ণার্ত হয়ে আছে, যাকে পাওয়ার জন্য আমি দিন-রাত প্রহর গুনে গুনে অপেক্ষা করছি, আজ তাকেই আমি নিজের হাতে শেষ করে দিলাম? ওহ আল্লাহ, এই দিন দেখার আগে আমার মৃত্যু কেন হলো না!”
নির্ভান উন্মাদ হয়ে গেছে। সে কাঁপাকাঁপা হাতে রিদির মুখ থেকে রক্তমাখা চুলগুলো সরাচ্ছে আর অসংলগ্নভাবে বকে যাচ্ছে।
“এই… এই মায়াবী, ওঠ না! আমি জানতাম না এটা তুই। আমি তো তোকে শত্রু মনে করেছিলাম! যদি একবার জানতাম তুই-ই আমার মায়াবী, তবে কি তোকে আঘাত করার দুঃসাহস করতাম? লক্ষ্মীটি, কষ্ট পাস না, চোখ খোল! দেখ, আমি কেমন পাগলামি করছি। দেখ আমার চোখ দুটো কতটা তৃষ্ণার্ত তোকে দেখার জন্য! চোখ খোল না মায়াবী… আর কোনোদিন আঘাত করব না তোকে। একটিবার শুধু চোখ খোল! আমি এমনিতেই তিন বছর ধরে তোর জন্য পাগল হয়ে আছি, এই পাগলটাকে আর পাগল বানাস না! প্লিজ মায়াবী… শুধু একবার চোখ খোল!”
নির্ভানের সেই হাহাকার পুরো ফ্যাক্টরির দেয়ালগুলোতে ধাক্কা খেয়ে ফিরে আসছে। তার সাদা শার্ট এখন রিদির রক্তে মাখামাখি। হঠাৎ ঘরের কোণায় থাকা পুরোনো টেলিভিশনটায় ব্রেকিং নিউজ বেজে উঠল। সাইফান শুভ্র চৌধুরীর সেই ভয়ংকর ঘোষণা আর রিদির ছবি স্ক্রিনে ভেসে উঠল। কিন্তু নির্ভানের সেদিকে কোনো খেয়াল নেই। সে তখনো রিদির নিথর হাতের ওপর মাথা রেখে ডুকরে কাঁদছে আর বলছে।
“আই উইল নট লেট ইউ গো, মায়াবী! প্লিজ ওয়েক আপ মায়াবী, আই অ্যাম নট এনিথিং উইদাউট ইউ!”
নেহা আর দাঁড়িয়ে থাকা গার্ডরা যেন পাথর হয়ে গেছে। নির্ভানের এই আকস্মিক পাগলামি আর হাহাকারের কোনো মাথামুণ্ডু তারা খুঁজে পাচ্ছে না। নেহা বিভ্রান্ত হয়ে কিছু একটা বলতে যাচ্ছিল, কিন্তু তার আগেই নির্ভান হিংস্র পশুর মতো গর্জে উঠল। গার্ডদের দিকে রক্তচক্ষু নিয়ে তাকিয়ে চিৎকার করে বলল।
“ওই খান’কি’র পোলারা! দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে তামাশা দেখছিস কী? তাড়াতাড়ি গাড়ি বের কর! মায়াবীকে হসপিটালে নিতে হবে। দেখছিস না ওর কত কষ্ট হচ্ছে? কত রক্ত বের হচ্ছে ওর শরীর থেকে!”
ঠিক তখনই একজন গার্ড হন্তদন্ত হয়ে ঘরে ঢুকে কাঁপা কাঁপা গলায় বলল।
“বস, মেয়েটাকে হসপিটালে নিলে আপনি বড় বিপদে পড়বেন! সব নিউজ চ্যানেল থেকে শুরু করে সোশ্যাল মিডিয়া সবখানে এই মেয়েটার ছবি দেখাচ্ছে। পুলিশ, সেনাবাহিনী সব রাস্তায় নেমেছে ওকে খুঁজতে। এয়ারপোর্ট, স্টেশন, বাস স্ট্যান্ড সব সিল করে দেওয়া হয়েছে। এমনকি শহরের প্রতিটা হসপিটালও ঘেরাও করা হয়েছে। আর এই সবকিছু করছে সাইফান শুভ্র চৌধুরী! বস, ও পুরো পাগল হয়ে গেছে এই মেয়েটার জন্য। বস, আমার কথা শোনেন, মেয়েটার লাশ এখানে ফেলে রেখে আমরা এখনই অন্য কোথাও পালিয়ে যাই!”
গার্ডের মুখ থেকে ‘লাশ’ শব্দটা শোনা মাত্রই নির্ভানের হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে গেল। সে ক্ষিপ্র গতিতে পাশে থাকা এক গার্ডের কোমর থেকে রিভলবারটা ছিনিয়ে নিল। কোনো কিছু চিন্তা না করেই সেই গার্ডের বুক লক্ষ্য করে ‘ঠাস ঠাস’ করে দুবার ট্রিগার চেপে দিল!মুহূর্তেই গার্ডটা নিথর হয়ে মেঝেতে লুটিয়ে পড়ল। ঘরের বাতাস বারুদের গন্ধে ভারী হয়ে উঠল। নির্ভান তখনো রিদির রক্তাক্ত দেহটা এক হাতে জড়িয়ে ধরে অন্য হাতে রিভলবার উঁচিয়ে চিৎকার করে উঠল।
“কে কী করবে তাতে আমার কিচ্ছু যায় আসে না! আমি কাউকেই ভয় পাই না। আমার মায়াবীকে বাঁচাতে হলে যা করতে হয় আমি তাই করব। আর ওই সাইফান শুভ্র চৌধুরী? ওকে তো আমি দেখে ছাড়ব! সাধারণ একটা ব্যবসায়ী হয়ে এত পাওয়ার দেখায় কীভাবে, সেটা আমিও একবার দেখতে চাই! আই ডোন্ট কেয়ার অ্যাবাউট এনিওয়ান! মাই মায়াবী মাস্ট লিভ!”
রানিং….!
নোট:
পরবর্তী যে কয়েকটি পর্ব প্রকাশিত হবে, সেগুলো সম্পূর্ণ কাল্পনিক। এগুলোর সাথে বাস্তব কোনো ব্যক্তি, ঘটনা বা স্থানের মিল খুঁজে পাওয়া গেলে তা সম্পূর্ণ অনিচ্ছাকৃত। তাই দয়া করে কেউ এগুলোকে বাস্তবতার সাথে তুলনা করবেন না।
Share On:
TAGS: অসম্ভব রকম ভালোবাসি তোকে, সুমি চৌধুরী
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
অসম্ভব রকম ভালোবাসি তোমায় পর্ব ৯
-
অসম্ভব রকম ভালোবাসি তোকে পর্ব ২
-
অসম্ভব রকম ভালোবাসি তোমায় পর্ব ৮
-
অসম্ভব রকম ভালোবাসি তোমায় পর্ব ৭
-
নির্লজ্জ ভালোবাসা পর্ব ৭৫
-
নির্লজ্জ ভালোবাসা পর্ব ৮০
-
অসম্ভব রকম ভালোবাসি তোকে পর্ব ৩
-
অসম্ভব রকম ভালোবাসি তোমায় পর্ব ৫
-
অসম্ভব রকম ভালোবাসি তোমায় পর্ব ৪
-
নির্লজ্জ ভালোবাসা পর্ব ৮২