Golpo romantic golpo অর্ধাঙ্গিনী গল্পের লিংক সিজন ২

অর্ধাঙ্গিনী সিজন ২ পর্ব ৪৪


অর্ধাঙ্গিনী ( দ্বিতীয় পরিচ্ছদ)

নুসাইবা_ইভানা

পর্ব -৪৪

অর্ধভেজা হয়ে সমুদ্রের পাশে দাঁড়িয়ে আছে দু’জনে। জিয়ানের হাতের মধ্যে বন্দি নয়নার হাত। চারপাশে নিকষ কালো অন্ধকার, তার মধ্যে উঁকি দিচ্ছে চাঁদের আলো। রাতের নিস্তব্ধতা ভেদ করে ঢেউয়ের গর্জনে চারপাশ মুখরিত হচ্ছে।

“জিয়ান নয়নাকে বলল, ‘আর কতক্ষণ এভাবে দাঁড়িয়ে থাকবে, বাটার মাশরুম?’”

নয়না মৃদু স্বরে বলল, “এখন আমরা কোথায় যাবো?”

জিয়ান কানের কাছে মুখ এনে নিম্ন স্বরে বলল, “সেখানে, যেখানে একবার বাসর হতে হতে সম্পূর্ণ হয়নি। আজ সেই অসম্পূর্ণ বাসর পূর্ণ করবো।”

নয়না কিছুটা সরে দাঁড়াতে চাইলো, কিন্তু জিয়ানের হাতের জন্য আর এগোতে পারলো না।

এমন সময় একটা মেয়ে জিয়ানের হাতে একটা বড় চাদর দিয়ে বলল, “স্যার, আপনার জন্য এটা হোটেল ম্যানেজমেন্ট পাঠিয়েছে।” সাথে একটা বাইকের চাবিও দিলো।

জিয়ান চাদর আর বাইকের চাবি হাত বাড়িয়ে নিজের হাতে নিয়ে মেয়েটাকে ধন্যবাদ দিলো। মেয়েটা চলে যেতেই জিয়ান নয়নার শরীরে চাদর জড়িয়ে দিয়ে বলল, “জান, তোমার জন্য সারারাত এভাবে দাঁড়িয়ে থেকে সমুদ্রের ঢেউ উপভোগ করবো।”

নয়না পিছন ফিরে জিয়ানের দিকে তাকিয়ে বলল, “আমার ড্রেস চেঞ্জ করতে হবে।”

জিয়ান ঠোঁট কামড়ে নিজের হাসি কন্ট্রোল করে বলল, “শুধু ড্রেস চেঞ্জ, নাকি ড্রেস চেঞ্জ করাটা বাহানা? মনে মনে কী চলছে, সুন্দরী বৌ আমার?”

নয়না শালটা ভালোভাবে নিজের গায়ে জড়িয়ে বলল, “যাবো না রুমে, সারারাত এভাবেই দাঁড়িয়ে থাকবো। অসুখ হলে হোক। অসভ্য লোক, সব সময় ডার্টি চিন্তা-ভাবনা।”

“সুন্দরী বৌ, তাও আবার অর্ধভেজা, স্নিগ্ধ রূপবতী বউ সামনে থাকলে পুরুষ মানুষের নিয়ত তো সভ্যতা হারাবেই। সভ্যতা না হারালে তার পুরুষত্ব নিয়ে নিশ্চিত সন্দেহ আছে।”

“ছিহহহ! মুখে কিছু আটকায় না। ঠোঁট কাটা লোক। এখনও আগের মতো আছেন, একটুও শুধরাননি?”

“আমার মতো ভদ্র ছেলে একটাও পাবে? তোমার সাথে অসভ্যতা, অভদ্রতা না করলে আগামী প্রজন্ম এগোবে কী করে!”

নয়নার কান গরম হয়ে গেছে জিয়ানের ঠোঁট কাটা কথাবার্তা শুনে। দ্রুত পায়ে সামনে এগিয়ে যেতে লাগলো।

জিয়ান নয়নার হাত ধরে বলল, “আসো বউ, বাইকে পাশাপাশি জড়াজড়ি করে বসি। এভাবে দূরে দূরে থাকলে আরও আগুন বাড়বে।”

এতক্ষণ ঠান্ডা লাগছিলো, কিন্তু জিয়ানের বেফাঁস কথা শুনে রীতিমতো নয়নার গরম লাগছে।

নয়না হঠাৎ বলল, “জানো, আমি এখনও তোমাকে ভয় পাই।”

জিয়ান মৃদু স্বরে বলল, “আমি জানি।”

নয়না “কিন্তু” বলে থামলো।

জিয়ান তাকাল নয়নার দিকে, “কিন্তু কী?”

নয়না জিয়ানের দিকে এগিয়ে এলো, এরপর ফিসফিস করে বলল, “এই ভয়, ডর—সবকিছুর ঊর্ধ্বে আমি তোমাকে ভালোবাসি। তোমার প্রতি আমার ভালোবাসা কখনো এক বিন্দুও কমেনি, ভবিষ্যতেও কমবে না। বারবার, শতবার আমি হেরে যাই, দুর্বল হয়ে যাই শুধু ভালোবাসি বলেই।”

জিয়ানের চোখ ভিজে উঠল। সে আলতো করে নয়নাকে নিজের কাছে টেনে নিল। নয়নার মাথা নিজের বুকে রাখল।

ঢেউয়ের শব্দ, চাঁদের আলো আর দূর থেকে ভেসে আসা গানের শব্দ—সেই সুন্দর সন্ধিক্ষণে দু’টা ভাঙা হৃদয় আবার একটু একটু করে জোড়া লাগতে শুরু করল। সব ভুলে মিশে গেলো একে-অপরের মাঝে। এভাবে কয়েক মুহূর্ত কেটে গেলো।

জিয়ান বাইকে বসে নয়নাকে বাইকে বসার আহ্বান জানাচ্ছে।

নয়না এগিয়ে এসে জিয়ানের কাঁধে ভর দিয়ে বাইকে বসলো। জিয়ানের পিঠের সাথে নিজেকে মিশিয়ে নিয়ে শক্ত করে ধরে বসলো।

জিয়ান লুকিং গ্লাসে নয়নার লজ্জা-রাঙা মুখটা দেখে তৃপ্তির হাসি ফুটে উঠলো তার মুখে। বাইক চলছে, ঠান্ডা বাতাসে শীতল হচ্ছে দু’জন। অথবা দুটি দেহ এক হওয়ার তাড়না বাড়ছে ক্রমশ।

বাইক পার্ক করে জিয়ান রুমের চাবি নিয়ে নয়নাকে কোলে তুলে নিয়ে গেলো রুমে।

রুমে ঢুকতেই নয়নার চোখ ছানাবড়া! পুরো রুম লাল, হলুদ গোলাপ আর সাদা রজনীগন্ধায় সাজানো। বেডের মাঝখানে গোলাপের পাপড়ি দিয়ে ইংরেজি দুটো অক্ষর লেখা—মাঝখানে লাভ দেওয়া (N❤️J)। তার ঠিক সামনে তোয়ালে দিয়ে একজোড়া কবুতর প্রতীক বানানো।

নয়নার হৃদযন্ত্র যেন বেসামালভাবে বিট করতে লাগলো।

জিয়ান নয়নাকে কোল থেকে নামিয়ে একটানে নয়নার গায়ের চাদর সরিয়ে নিলো।

নয়না নিজের কামিজ আঁকড়ে ধরে জোরে জোরে শ্বাস নিচ্ছে।

জিয়ান নয়নার একদম কাছে এসে নয়নার গা ঘেঁষে দাঁড়ালো। নয়নার শরীরে তখনো ভেজা ওড়না জড়ানো। জিয়ান নয়নার ওড়না ধীরে ধীরে নয়নার শরীর থেকে ছাড়িয়ে ফ্লোরে রাখলো। নয়নার ঘাড়ে নিজের আঙুল স্লাইড করতে করতে নয়নার ভেজা চুলগুলো একপাশে সরিয়ে দিলো। নয়না কিঞ্চিৎ কেঁপে উঠলো। জিয়ান আলতো করে নয়নার কাঁধে চুমু খেতে লাগলো। নয়না স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে পারছে না। তার শরীর যেন আসার হয়ে আসছে। হুট করে জিয়ানের দিকে ঘুরে জিয়ানকে জড়িয়ে ধরলো।

জিয়ান নয়নাকে কোলে তুলে এগিয়ে গেলো বেডের দিকে। নয়নাকে বেডে শুইয়ে দিয়ে নয়নার বন্ধ করে রাখা চোখে ফুঁ দিয়ে মৃদু স্বরে বলল, “আজকের রাত তোমার-আমার। আজকের পর থেকে তোমার জীবনের প্রতিটি রাত শেষ হবে আমার স্পর্শে, প্রতিটি দিনের শুরু হবে আমার স্পর্শে।” বলেই নয়নার গলায় মুখ ডুবিয়ে দিলো। রাতের গভীরতার সাথে দুটি দেহ-মন গভীরভাবে মিশে যাচ্ছে একে অপরের মাঝে।

•••
সকালে মিঠা রোদ জানালার সাদা পর্দার ফাঁকফোকর ভেদ করে নয়নার চোখে-মুখে পড়তেই পিটপিট করে চোখ খুলল নয়না। চোখ খুলতেই জিয়ানের ঘুমন্ত নিষ্পাপ মুখটা চোখে পড়লো। জিয়ানের দিকে তাকিয়ে মৃদু হাসছে নয়না। ইশশ! সব সময় এমন একটা দিনের অপেক্ষা ছিলো নয়নার। যেখানে একে অপরের মুখ দেখে দিনের শুরু হবে। নয়না খুব সাবধানে জিয়ানের মুখের কাছে নিজের মুখ এনে জিয়ানের কপালে চুমু খেলো। সাবধানে জিয়ানের বাহুবন্ধন থেকে মুক্ত হওয়ার চেষ্টা করছে, যাতে জিয়ানের ঘুম না ভাঙে।

হুট করে জিয়ান উঠে নয়নার উন্মুক্ত পেটের উপর মাথা রেখে নয়নার কোমর জড়িয়ে ধরে বলল, “একদম নড়বে না জান। এখানে যে কদিন থাকবো, রাত আর দিন আমাদের জন্য সমান। মানে বুঝেছো? নাকি বোঝাবো, বাটার মাশরুম?”

নয়না লজ্জা পেয়ে চুপ করে রইলো। জিয়ান কী বোঝাতে চাইছে সেকথা না বোঝার মতো অবুঝ সে নয়। চুপচাপ সেভাবেই পড়ে রইলো নয়না।

🌿

সায়না মাহিকে ঘুম পাড়িয়ে একটা বাসন্তী রঙের জামদানি শাড়ি পরে হালকা সাজুগুজু করে এক কাপ কফি বানিয়ে বসার ঘরে এসে টিভি ছেড়ে সিরিয়াল দেখছে। রাত বাজে দেড়টা, এখনো বাসায় ফেরেনি অনিকেত। আজ অনিকেতের দুটো ওটি আছে। তাই দেরি হবে। হাসপাতালের জন্য বের হওয়ার সময় বলে গেছে, “আজ আমার জন্য অপেক্ষা করবে না। আজ ফিরতে দেরি হবে। খেয়ে ঘুমিয়ে পড়বে। না খেয়ে বসে থাকবে না কিন্তু, মনে থাকবে তো?”

সায়না মনে মনে বলে, “ডাক্তারের বউ হতে ধৈর্য লাগে। কখনো কখনো মধ্যরাতেও ডাক্তাররা নিজের বউয়ের পাশ থেকে উঠে ছুটে চলে যায় রোগীর কাছে। আবার মাঝে মাঝে মধ্যরাত কিংবা পুরো রাত কাটিয়ে দেয় অপারেশন রুমে।”

এসব ভাবনার মাঝেই কলিং বেল বেজে উঠল, সেই সাথে সায়নার মুখে হাসিও। কফিকাপটা টেবিলে রেখে দ্রুত দরজা খুলে দিলো।

অনিকেত সায়নাকে দেখে বলল, “তুমি কি আমার জন্য অপেক্ষা করছিলে?” অনিকেত ইচ্ছে করে তার বউয়ের সাজগোছ উপেক্ষা করার নাটক করছে, অথচ চোরা মন সায়নার দিকেই নিবদ্ধ।

সায়না মুখ ফুলিয়ে বলল, “নাহহহ, পাশের বাসার ভাবির বরের জন্য।”

“আরেহহহহ! রেগে যাচ্ছো কেন ম্যাডাম? মধ্যরাতের পাশের বাসার ভাবির বরের জন্য এত সুন্দর করে সেজেগুজে অপেক্ষা! বাহহহহ! শোনো, রাগ কোরো না জানটুস। সাথে সাথে দরজা খুললে তাই বললাম।”

সায়না রাগ নিয়ে বলল, “তুমি জানো আজকে কত তারিখ?”

অনিকেত খানিক চুপ থেকে বলল, “নাহহহ, কত তারিখ ঠিক মনে পড়ছে না।”

সায়না আর কিছু বললো না। আবার সোফায় এসে বসলো। কফিকাপ হাতে নিয়ে চুমুক দিলো।

অনিকেত ধীর পায়ে সায়নার সামনে এসে হাঁটু গেড়ে বসে একগুচ্ছ টিউলিপ সায়নার সামনে ধরে বলল, “হ্যাপি ম্যারেজ ডে, আমার প্রিয়তমা অর্ধাঙ্গিনী। তোমাকে পাওয়ার পর চারটা বছর কেটে গেলো ভালোবাসায়। এই সুন্দর দিনটা কি কখনো ভুলতে পারবো? যেদিন এক পরী এসে ভর করেছিলো আমার শূন্য জীবনে। তার ভালোবাসার জাদুতে আজ আমি পরিপূর্ণ। পরী আগমের সেই শুভদিন কী করে ভুলে যাই বলো তো, পরী বউ?”

সায়না অবাক হয়ে গেলো! তার মানে অনিকেত মনে রেখেছে। সাথে সাথে ফুলগুলো হাতে নিয়ে অনিকেতের গলা জড়িয়ে ধরে সারা মুখে চুমু খেতে লাগলো।

“আরেহহ! পাগলি, একটু থামো। আমি ফ্রেশ হয়ে আসি।”

সায়না অনিকেতকে আর কিছু বলতে দিলো না। নিজের ঠোঁট দিয়ে অনিকেতের ঠোঁট দুটো আটকে দিলো।

অনিকেত হার মেনে নিজেও হারিয়ে গেলো সায়নার ভেজা ঠোঁটের ভালোবাসায়।

চলবে

Share On:

TAGS: ,



CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
Related Posts
 

0 Responses

Leave a Reply