অর্ধাঙ্গিনী ( দ্বিতীয় পরিচ্ছদ)
নুসাইবা_ইভানা
পর্ব -৪২
রাত প্রায় সাড়ে বারোটার পর বাসায় এসে পৌঁছাল জাহানারা বেগম। বাসার দরজা খুলতেই জাহানারা বেগমের চোখ পড়ল ড্রয়িংরুমে বসে থাকা জিয়ানের দিকে। মুহূর্তেই তার চোখে আগুন জ্বলে উঠল। রাগে ধপধপ করছে তার মাথা। ইচ্ছে করছে জিয়ানকে ঠাস ঠাস করে কয়েকটা চড় দিতে। নিজেকে কিছুটা সংযত করে কঠোর কণ্ঠে বলল, “তুমি!”
জিয়ান উঠে দাঁড়াল। মাথা নিচু করে বলল, “আসসালামু আলাইকুম, আন্টি।”
“ওয়ালাইকুম আসসালাম শোনার যোগ্যতা তুমি হারিয়েছ অনেক আগেই। কে তোমাকে আমার বাসায় ঢুকতে দিয়েছে? এত বড় স্পর্ধা কার শুনি?”
জিয়ান চুপ করে রইল। কী উত্তর দেবে ভাবতে লাগল মনে মনে।
নয়না রান্নাঘর থেকে বের হয়ে এল। “আমি আসতে বলেছি।”
“তুমি ডেকেছ?” জাহানারা বেগম অবিশ্বাসের চোখে তাকালেন সুনয়নার দিকে। “যে ছেলে তোমার জীবন শেষ করে দিয়েছে, তাকে আবার ঘরে ডেকে এনেছ?”
নয়না শান্ত গলায় বলল, “আম্মু, আমার ওর সাথে কিছু কথা ছিল। চাইলেই তো সব শেষ করে দেওয়া যায় না, আম্মু।”
“আমার কাছে সব শেষ! এখানে চাওয়া-না-চাওয়ার প্রশ্ন কোথা থেকে আসল তিন বছর পর?”
মাহবুব তালুকদার ধীর কণ্ঠে বললেন, “জাহানারা, একটু শান্ত হও।”
“না! আজ আমি শান্ত হব না। আজ কথা শেষ না করে আমি থামব না। তোমরা কি ভেবেছ আমার মেয়ের জীবন নিয়ে এই ছেলেটাকে আমি খেলতে দেব?”
জিয়ান এক পা এগিয়ে এল। নরম কণ্ঠে বলল, “আন্টি, আমাকে একবার কথা বলার সুযোগ দিন।”
“তোমার কথা আমি বহুবার শুনেছি। ফল কী হয়েছে জানো?”
জিয়ান চুপ।
জাহানারা বেগম এবার কাঁপা গলায় বললেন, “আমার মেয়েকে আমি কাঁদতে দেখেছি রাতের পর রাত। একটা মানুষ কতটা ভাঙলে এভাবে মরার মতো বাঁচতে শেখে জানো তুমি?”
নয়না ধীরে বলল, “আম্মু, প্লিজ… চুপ করো।”
“না, নয়না! আজ তুমি চুপ থাকবে।” জাহানারা বেগম আবার জিয়ানের দিকে তাকালেন। কঠোর কণ্ঠে বললেন, “তুমি যদি সত্যিই অনুতপ্ত হও, তাহলে আমার মেয়ের জীবন থেকে চিরতরে চলে যাও। এটাই তোমার সবচেয়ে বড় প্রায়শ্চিত্ত।”
মুহূর্তেই ঘরে পিনপতন নীরবতা নেমে এল।
জিয়ান কিছুক্ষণ চুপ থেকে ধীর কণ্ঠে বলল, “যদি চলে যাওয়া সুনয়নার ভালো থাকার একমাত্র পথ হয়, তাহলে আমি চলে যাব।”
নয়নার বুকটা কেঁপে উঠল। অবাক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল জিয়ানের দিকে। কেন বারবার সব ঠিক হতে হতে আবার ভেঙে যায়?
জিয়ানের চোখে পানি চিকচিক করছে। কিন্তু সে হাসল। “তুমি ভালো থাকো, এটাই আমি চাই। তাতে যদি আমাকে সরে যেতে হয়, আমি তাই করব। ভুল যেহেতু করেছি, শাস্তি তো পেতেই হবে। ভালো থেকো, বাটার মাশরুম।”
জিয়ান নিজের কথা শেষ করে ধীরে ধীরে দরজার দিকে হাঁটতে লাগল।
নয়না স্থির দাঁড়িয়ে। পা যেন নড়ছে না। চোখ থেকে টুপটুপ করে নোনাজল গড়িয়ে পড়তে লাগল।
মনের ভেতর যুদ্ধ—একদিকে ভালোবাসা, অন্যদিকে ভয়।
দরজার কাছে গিয়ে জিয়ান একবার পেছনে তাকাল।
নয়না এখনও দাঁড়িয়ে। চোখে অশ্রু, দৃষ্টিতে প্রিয় মানুষকে আটকে রাখার আকুতি।
এক সেকেন্ড, দুই সেকেন্ড… হঠাৎ নয়না দৌড়ে গিয়ে জিয়ানের হাত ধরে বলল, “এবার ছেড়ে গেলে এজন্মে আর আমাদের মিলন হবে না, মিস্টার প্লেন ড্রাইভার।”
জিয়ান থেমে গেল।
নয়না জিয়ানের হাত শক্ত করে ধরে রাখল।
জাহানারা বেগম অবাক হয়ে তাকিয়ে আছেন।
নয়না বলল, “এইবার যদি ভাঙি, আমি আর উঠতে পারব না। বুঝতে পারছ?”
জিয়ান মাথা নাড়ল।
“আমি আর ভাঙতে দেব না। আমার জীবনের সবকিছু দিয়ে হলেও না।”
নয়না চোখ বন্ধ করল এক মুহূর্ত। তারপর ধীর কণ্ঠে বলল, “শেষ সুযোগ।”
জিয়ানের চোখ ভিজে গেল। শত চেষ্টা করেও নিজের চোখের জল লুকাতে পারল না। কোনো কথা না বলে, আশেপাশের সব ভুলে জড়িয়ে ধরল নয়নাকে।
মাহবুব তালুকদার মৃদু স্বরে জাহানারা বেগমের কানের কাছে মুখ নিয়ে বললেন, “ওদের ভালোবেসে ভালো থাকতে দাও, জাহানারা। ভুল তো মানুষই করে। তাই বলে কি ভুল শুধরে নেওয়ার সুযোগ দেওয়া যাবে না?”
জাহানারা বেগম চুপচাপ নিজের রুমে চলে গেলেন। মাহবুব তালুকদার তার পিছু পিছু গেলেন।
🌿
মেহনুর বাসার বারান্দায় দাঁড়িয়ে আছে। জারিফ ঘুমিয়ে পড়েছে তার কোলেই। আকাশে আজ চাঁদ নেই, তবে অগণিত তারা জ্বলজ্বল করছে।
হঠাৎ মেহনুরের ফোনটা বেজে উঠল। অজানা নম্বর। কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে রিসিভ করে বলল, “হ্যালো?”
ওপাশে কিছুক্ষণ নীরবতা। তারপর খুব ধীরে একটা কণ্ঠ থেকে ভেসে এল, “মেহনুর…”
মেহনুরের বুক ধক করে উঠল।
“কে?”
“আমি…”
“আমি কে?”
“জাহিন…”
মুহূর্তেই মেহনুরের হাত কাঁপতে শুরু করল। ফোনটা প্রায় পড়ে যাচ্ছিল।
“তুমি?”
“হ্যাঁ, আমি।”
মুহূর্তেই মেহনুর কেঁদে ফেলল। “তুমি বেঁচে আছ?”
ওপাশে দীর্ঘশ্বাস।
“বেঁচে আছি, কিন্তু মরার মতো।”
মেহনুর কিছু বলল না।
জাহিন বলল, “আচ্ছা, আমাদের কি সত্যি কোনো সন্তান আছে?”
মেহনুর চুপ করে থাকল কিছুক্ষণ। তখনও এক হাতে জারিফকে আগলে রেখেছে নিজের বুকের সাথে। ধীর কণ্ঠে বলল, “জাহিন, তোমার-আমার সন্তান আছে। ভুল সময়ে ভুল করে সে চলে এসেছে আমার অসহায় জীবনের সঙ্গী হতে। তার নাম…”
আর কিছু বলার আগেই ওপাশ থেকে লাইন বিচ্ছিন্ন হয়ে গেল।
মেহনুরের চোখ থেকে অশ্রু গড়িয়ে পড়তে লাগল। অনেকক্ষণ চুপ করে তাকিয়ে রইল আকাশের দিকে। মেহনুরের কোলে ঘুমন্ত জারিফ।
অন্তর ফোনটা কেটে দিয়ে মোবাইল থেকে সিম বের করে সাথে সাথে ভেঙে ফেলল।
জাহিনের চোখ বেয়ে তখন নোনাজল গড়িয়ে পড়ছে। আকুতির স্বরে বলল, “আমাকে একবার শুধু আমার সন্তানের মুখটা দেখার সুযোগ দিবি, অন্তর? আমার মতো মানুষের শেষ ইচ্ছেটা পূরণ করবি?”
অন্তর জাহিনের দিকে ঝুঁকে বলে, “আমার তুষী নিশ্চয়ই এর চেয়ে করুণভাবে আকুতি করছিল বাঁচার জন্য। কিন্তু তুই কি বাঁচতে দিয়েছিলি? আমার তুষিকে, আমার ভালোবাসাকে, আমার বিয়ে-করা বউটাকে তুই কী নির্মমভাবে হত্যা করেছিস। তোর কাছে বারবার প্রাণের ভিক্ষা চাইছিল, ঠিক যেভাবে তুই প্রতিনিয়ত মৃত্যুর ভিক্ষা চাস। আমার তুষিকে তুই জীবন ভিক্ষা দিসনি। আমি ও তোর ছেলের মুখ কোনোদিন তোকে দেখতে দেব না। জানিস, তোর ছেলে যাকে তাকে দেখলেই ‘পাপা পাপা’ বলে ডাকতে থাকে।”
জাহিনের ইচ্ছে করছিল কোনোভাবে নিজের জীবনটা যদি এই মুহূর্তে শেষ করে ফেলতে পারত। কেন সে জানল এই পৃথিবীতে তার অস্তিত্ব আছে? বাবা হওয়ার এই অনুভূতির সাক্ষ্য কেন হল সে? সেই অনুতাপ হচ্ছে। এর চেয়ে অজানা থাকলেই বোধহয় ভালো হতো।
অন্তর শিস বাজাতে বাজাতে আন্ডারগ্রাউন্ড থেকে বের হয়ে গেল।
জাহিন সেভাবেই বসে অসহায় দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল।
🌿
রাতের অন্ধকার ভেদ করে ভোরের আলো ধীরে ধীরে শহরটাকে আলোকিত করে তুলছে। জানালার পর্দার ফাঁকফোকর দিয়ে গড়িয়ে হালকা সূর্যের আলো এসে পড়েছে নয়নার চোখে-মুখে। ঘুম ভাঙতেই কিছুক্ষণ স্থির হয়ে শুয়ে রইল সে। হুট করে মনে পড়ল, গতকাল রাতে তো জিয়ান তার পাশে ছিল। তাহলে জিয়ান এখন কোথায়?
নয়না চোখ বন্ধ করে দীর্ঘশ্বাস নিল। হৃদয়যন্ত্রে কেমন অদ্ভুত এক চিনচিন অনুভূতি হচ্ছে।
ঠিক তখনই দরজায় কেউ কড়া নাড়ল। “প্রিয়তমা অর্ধাঙ্গিনী ঘুম ভেঙেছে?”
নয়না দ্রুত উঠে দরজার সামনে এসে দাঁড়াল। সামনে তাকিয়ে দেখে—
জিয়ান দাঁড়িয়ে আছে, হাতে দু’কাপ চা। মুচকি হেসে বলল, “গুড মর্নিং, বাটার মাশরুম। ঘুম কেমন হয়েছে?”
নয়না কিছু না বলে চা নিয়ে বারান্দায় গিয়ে দাঁড়াল। মুহূর্তেই মনটা ভালো হয়ে গেল।
জিয়ানও তার পাশে এসে দাঁড়াল। তারপর নয়নার কানের কাছে মুখ নিয়ে বলল, “আজ একটা সারপ্রাইজ আছে। রেডি তো, মিসেস জিয়ান রেজা চৌধুরী?”
নয়না ভ্রু কুঁচকে তাকাল। “কিসের সারপ্রাইজ?”
জিয়ান মৃদু হেসে বলল, “আগেই যদি বলে দিই তাহলে সারপ্রাইজ কই থাকল? দ্রুত ফ্রেশ হয়ে ব্যাগ প্যাক করো, ময়নার মা। আমরা আর কিছুক্ষণের মধ্যেই বের হচ্ছি।”
“কোথায়?”
“যেখানে তুমি, আমি আর আমাদের ভালোবাসা ছাড়া কেউ নেই, সেখানে। চলো না, হারিয়ে যাই দূর অজানায়। হারাতে কী বাধা আছে, বাটার মাশরুম?”
নয়না কিঞ্চিৎ হেসে বলল, “হারিয়ে যেতে আজ নেই মানা।”
চলবে
তুমিআসবেবলে।
চাঁদ রাতে মেহেদী না পরে তোমাদের জন্য লিখলাম। ঈদ মুবারক।সবার ঈদ ভালো কাটুক। আমার জন্য আর আমার নতুন বইয়ের জন্য দোয়া আর ভালোবাসা দিবে।
সামনে কিন্তু দারুণ একটা রোমান্টিক পর্ব অপেক্ষা করছে।
Share On:
TAGS: অর্ধাঙ্গিনী সিজন ২, নুসাইবা ইভানা
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
অর্ধাঙ্গিনী সিজন ২ পর্ব ১৯
-
অর্ধাঙ্গিনী সিজন ২পর্ব ১৩
-
অর্ধাঙ্গিনী সিজন ২ পর্ব ৪৪
-
অর্ধাঙ্গিনী সিজন ২ পর্ব ২৪
-
অর্ধাঙ্গিনী সিজন ২পর্ব ১৫
-
অর্ধাঙ্গিনী সিজন ২ পর্ব ২৭
-
অর্ধাঙ্গিনী সিজন ২ পর্ব ২৬
-
অর্ধাঙ্গিনী সিজন ২পর্ব ১৮
-
অর্ধাঙ্গিনী গল্পের সকল পর্বের লিংক সিজন ২
-
অর্ধাঙ্গিনী সিজন ২ পর্ব ৩৮