অর্ধাঙ্গিনী (দ্বিতীয় পরিচ্ছদ)
নুসাইবা_ইভানা
পর্ব -৪১
রাত আরও গভীর হয়েছে। দূরের রাস্তায় জ্বলতে থাকা ল্যামপোস্টের মৃদু আলো বারান্দায় এসে পরছে৷ খানিক পরপর শীতল বাতাসে নয়নার সামনের খোলা চুলগুলো উড়ছে৷
নয়না কিছুক্ষণ নীরবে দাঁড়িয়ে রইল আকাশের পানে দৃষ্টি দিয়ে৷ তারপর ধীরে ধীরে জিয়ানের দিকে ফিরে তাকাল।
জিয়ান তখনো তার দিকে তাকিয়ে আছে এক দৃষ্টিতে।সেই দৃষ্টিতে রয়েছে না বলা কথা, অপ্রকাশিত ভালোবাসা।
“নয়না শান্ত স্বরে বলল,আমি যেই দূর্বলতাকে ভয় পাই, তুমি আমার সেই দূর্বলতা। যে দুর্বলতা আমাকে এক সেকেন্ড নিঃস্ব করে দিতে পারে৷ আমি তোমার ভালোবাসাকে ভয় পাই ভীষণ ভয় পাই। আমাকে সর্বহারা করার জন্য তোমার ভালোবাসা’ই যথেষ্ট।
তাই আমি তোমাকে ভয় পাই,
তোমার ভালোবাসাকে ভয় পাই।
কারণ এই ভালোবাসাই,আমাকে সবচেয়ে সুখী মানুষ বানাতে পারে,আবার এই ভালোবাসাই
এক সেকেন্ডে আমাকে নিঃস্ব করে দিয়ে পৃথিবীর সবচেয়ে দুঃখী মানুষ করে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট।
তুমি জানো জিয়ান, মানুষ জীবনে সবচেয়ে বেশি ভয় পায় কোথায়?
জিয়ান ভ্রু কুঁচকে তাকাল।
“কোথায়?
“যেখানে সে একবার ভেঙে গেছে। আমি তোমার কাছে ভেঙে গিয়েছিলাম কাঁচের মত টুকরো টুকরো হয়ে গিয়েছিলো আমার জীবন৷ ওই টুকরো টুকরো কাঁচ জোড়া তালি দিয়ে এইটুকু ভালো থাকা শিখেছি। ঠিক তখন তুমি আমার এসে হাজির! আমার কি ভয় হবেনা?
জিয়ান মাথা নিচু করে ফেলল। একরাশ অনুতপ্ততা তাকে এসে ঘীরে ধরলো। ভঙ্গ কন্ঠে বলল, আমি জানি, তোমার সুন্দর জীবনে আমি এক অঘোষিত সুনামি৷ তবুও নির্লজ্জের মত একটা শেষ সুযোগ কি আমি পেতে পারি না? এইটুকু দয়া করবে আমার প্রতি?
“নয়না জিয়ানের কথা শুনে মৃদু হাসলো। সেই হাসির মধ্য প্রকাশ পেলে তাচ্ছিল্য।
“সুযোগ? তোমাকে কতবার সুযোগ দেবো? আর কতবার আমার হৃদয়টাকে খণ্ডবিখণ্ড কররার পর তোমার মনে হবে আর সুযোগ চাই না?
জিয়ান ধীরে ধীরে নয়নার কাছে এগিয়ে এলো, এইবার শেষ সুযোগ দাও।আমি আমাদের গল্পটা আবার নতুন করে লিখতে চাই।যেখানে ভালোবাসা, বিশ্বাস, ভরসা ছাড়া আর কিছু থাকবে না৷
“নয়না কিছু বলল না। শুধু তাকিয়ে রইল জিয়ানের দিকে। এই মানুষটাকে সে যতই দূরে সরাতে চায়, ততই যেন হৃদয় তাকে কাছে টেনে নেয়। তার মন, মস্তিষ্ক বারবার তাকে সংকেত দেয় মানুষটাকে ভালোবাসতে৷ এ কেমন মোহমায়া!
জিয়ান আবারও তাকে আলতো করে জড়িয়ে ধরল,নয়নার কাঁধে মাথা গুঁজে দিয়ে বলল,চলো কোথাও চলে যাই কিছুদিনের জন্য।
নয়না বলল,এই শহরটা আমাদের অনেক স্মৃতি দিয়েছে। এই শহরের বাতাস,চাঁদ, সুর্য আর ওই কংক্রিটের রাস্তা জুড়ে তোমার আমার ভাঙ্গা গড়ার স্মৃতি জড়ানো৷ এই শহর ছেড়ে কোথায় যাবো বলো?
” চলো না প্লিজ দূরে কোথাও যাই৷ এরপর নতুন করে এই শহরে আমাদের ভালোবাসার টুকরো টুকরো স্মৃতি জমা হবে৷
“নয়না কিছুক্ষণ চুপ রইলো৷ এরপর ধীর স্বরে বলল,দেখা যাক।
জিয়ানের ঠোঁটে হালকা হাসি ফুটল।যেনো বিশ্ব জয় করে ফেলেছে৷
” নয়না বারান্দা থেকে রুমের দিকে পা বাড়ালো৷
“জিয়ান নয়নার হাতদুটো নিজের হাতের মুঠোয় নিয়ে বলে,আমি তোমার দূর্বলতা না সবচেয়ে বড় শক্তি হতে চাই। আমার ভালোবাসা তোমার জন্য ভয় না বরং সমস্ত ভয় জয় করার ক্ষমতা হবে। এরপর আমাদের সুখের গল্প হবে৷
” নয়না হাত ছাড়িয়ে একটু দূরে দাঁড়িয়ে বলে,খাবার খাবেন? অনেক রাত হয়েছে ঘুমাতে হবে তো৷
“তুমি খাবে না?
” আমি খাবো বলেই তো আপনাকে জিজ্ঞেস করলাম। “ওহহহ ভেরী স্মার্ট বউ আমার। খাবার রেডি করো আমি হাত মুখ ধুয়ে আসি৷
🌿
জাহানারা বেগম বললেন, কি সমস্যা তোমার? এই রাতের বেলা আমরা রেস্টুরেন্টে কেনো এসেছি? এখন কি আমাদের এসব করার বয়স আছে?
” রাগ করছো কেন? কতদিন হলো তোমার সাথে একটু ভালো সময় কাটাই না৷ মানুষ বাঁচেই বা কতদিন। বেঁচে থাকতে সব ভালো জিনিস করে রাখতে হয়।
“তোমার মত মানুষের মুখে এসব মানায় না৷ নিজের সন্তানকে বছরের পর বছর এতিমখানায় ফেলে রেখে এখন ভালো কাজের বর্ণনা শোনাচ্ছো!
” দয়া করে আর পেছনের কথা টেনে এনো না৷ যা হওয়ার হয়ে গেছে। আমি আমার কর্মের জন্য অনুতপ্ত আর কি করলে তোমরা আমাকে ক্ষমা করবে বলো?এখন শুধু মৃত্যু বাকি আছে যদি আমার মৃত্যুতে তোমরা খুশি হও তবে তাও করতে রাজি৷
“তবুও নিজের সন্তানকে সমাজে সন্তান বলে স্বকৃীত দিতে রাজি না?
” বলো, কিভাবে কি করবো। আমি তাতেও রাজি৷
“জাহানারা বেগম কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বললেন,সে-সব আমার চেয়ে তুমি ভালো বোঝো৷ এখন চলো আমি বাসায় যাবো।
” আর একটা কথা। বাসায় কিন্তু জিয়ান আছে প্লিজ রিয়েক্ট করবে না।
“ওই ছেলের সাহস কি করে হয় আমার বাসায় ঢোকার! আমার মেয়ের জীবন জাহান্নাম করে দিয়ে আবার আমার বাসায়! এক্ষুনি বাসায় চলো৷ তুমি না গেলে আমি একাই যাবো৷ বলেই হাঁটা শুরু করলেন জাহানারা বেগম৷ মাহবুব তালুকদার বউয়ের পিছু পিছু হাঁটতে লাগলেন।
🌿
ঢাকার এক ব্যস্ত শপিংমলে দাঁড়িয়ে আছে মেহনুর।
চারপাশে মানুষে ভরা। হাসি, গল্প, কেনাকাটা সবকিছুতেই যেন জীবনের রঙ লেগে আছে। সবাই কত আনন্দিত সবাই কত ভালো আছে। কিন্তু এই ভিড়ের মাঝেও মেহনুর নিজেকে ভীষণ একা। পৃথিবীতে তারাজ কেবল দুঃখ বরাদ্দ সুখ যেনো সোনার হরিণ তার জন্য। জারিফ তার হাত ধরে টান দিল। আদুরে কন্ঠে বলল,মাম্মা… পাপা।
মেহনুর জারিফেে দিকে তাকিয়ে বলে, কই?জারিফ সামনে দাঁড়িয়ে থাকা এক অপরিচিত লোকের দিকে আঙুল দেখাচ্ছে। আর বলছে পাপা৷
মেহনুর তাড়াতাড়ি তাকে কোলে তুলে নিল।
“না বাবা ওটা তোমার পাপা না।
জারিফ মুখ গোমড়া করে বলল,পাপা।
মেহনুর জারিফের কপালে চুমু দিয়ে বলে,তোমার পাপা খুব দূরে। একদিন ঠিক তোমার কাছে চলে আসবে৷ ওটা তোমার পাপা না পাখি। কথাটা বলতে বলতে তার নিজের গলাও কেঁপে উঠল।
কখনও কখনও সে নিজেকেই প্রশ্ন করে..
সত্যিই কি জারিফের বাবা কোনোদিন ফিরে আসবে?
নাকি এই অপেক্ষাই তার জীবনের নিয়তি হয়ে থাকবে? সারাজীবন এই মিথ্যে অপেক্ষায় কেটে যাবে তার সন্তানের জীবন। কিন্তু যেদিন জারিফ সব বুঝতে শিখবে তখন কি উত্তর দেবো? মেহনুর আর ভাবতে পারলো না৷ কেনাকাটা সম্পূর্ণ না করেই বেরিয়ে আসলো শপিংমল থেকে।
🌿
বায়তুল মোকাররম মসজিদের উত্তর গেটে এখনো জারিফ সেভাবেই বসে আছে মানুষের ভিড় ধীরে ধীরে কমে যাচ্ছে।
রাস্তার পাশে স্ট্রেচারের ওপর বসে আছে জাহিন।সামনে ভাঙা থালায় কিছু খুচরা টাকা। টাকা গুলোর দিকে তাকিয়ে দ্বীর্ঘশ্বাস ছাড়ছে জাহিন৷ কত কোটি কোটি টাকার মালিক সে৷ অথচ আজ সে অসহায় এক মুসাফির। যার জীবনে মৃত্যু ছাড়া আর কোন অপেক্ষা নেই৷ হঠাৎ ঠান্ডা বাতাসে জাহিনের শরীর কেঁপে উঠল।
একসময় সে ছিল স্মার্ট, সুদর্শন যুবক। মানুষ তাকিয়ে থাকত তার দিকে।আজও মানুষ তাকিয়ে থাকে।কিন্তু ভয় নিয়ে।কেউ করুণা করে, কেউ ঘৃণায় দৃষ্টি সরিয়ে নেয়৷
জাহিন কষ্ট করে স্ট্রেচারটা একটু এগোনোর চেষ্টা করল।
পারল না।তার বুকের ভেতর হঠাৎ তীব্র যন্ত্রণা শুরু হলো৷ ক্লান্ত হয়ে আকাশের দিকে তাকাল।চোখ থেকে নোনাজল গড়িয়ে পড়ছে। মৃদু স্বরে বলল,আল্লাহ আমাকে মেরে ফেলেন।আমার এই জীবন আমি আর বয়ে বেড়াতে চাই না৷ আল্লাহ আমাকে মুক্তি দিন৷
ঠিক তখনই একটা মানুষ এসে জাহিনের সামনে দাঁড়াল।
জাহিন ধীরে ধীরে মাথা তুলল সামনের মানুষটাে দেখেই তার চোখ বড় হয়ে গেল।অস্ফুট স্বরে বলল, অন্তর।
অন্তরের ঠোঁটে অদ্ভুত হাসি। তাচ্ছিল্য স্বরে বলল কি রে, জীবন কেমন লাগছে এখন?”
জাহিন কাঁপা গলায় বলল,আমাকে মেরে ফেল।
অন্তর কিছুটা ঝুকে জাহিনের দিকে তাকাল।মৃত্যু এত সহজ না, জাহিন। তুই যেভাবে অন্যদের জীবন নষ্ট করেছিস,তোর শাস্তি এতো সহজ মৃত্যু না৷ তুই প্রতি মূহুর্তে ধুঁকে ধুঁকে মরবি৷
“জাহিন চোখ বন্ধ করে ফেলল।
“অন্তর থালার মধ্যে একটা পাঁচশ টাকার নোট ছুড়ে দিল।বেঁচে থাক। তোর এই বেঁচে থাকাটাই আসল শাস্তি। জানিস আজ শপিংমলে কি দেখেছি? একটা বাচ্চা পাপা পাপা বলে ডাকছে একজন অপরচিত মানুষকে৷ আচ্ছা জাহিন তুই কি জানিস ওই বাচ্চাটার বাবা তুই? এই বলে অন্তর চলে গেল।
জাহিন চিৎকার করে অন্তর বলে,ডাকতে লাগলো, কি বলে গেলো অন্তর তাকে? তার সন্তান? এটা কি সত্যি!
মূহুর্তেই দু’লকজন পথচারী জড়ো হলো।
জাহিন একদম চুপ হয়ে গেলো। নিঃশব্দে তার চোখ গড়িয়ে অশ্রু ঝড়তে লাগলো।
দু’একজন যারা জড়ো হয়েছিলো, তারাও চলে গেলো৷ চারপাশে শহর আগের মতোই ব্যস্ত।কেউ থামল না।কেউ দেখল না।
একটা মানুষ নিজের জীবনের জন্য নয়, মৃত্যুর জন্য ভিক্ষা চাচ্ছে।
চলবে৷
Share On:
TAGS: অর্ধাঙ্গিনী সিজন ২, নুসাইবা ইভানা
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
অর্ধাঙ্গিনী সিজন ২ পর্ব ২৯
-
অর্ধাঙ্গিনী সিজন ২পর্ব ১১
-
অর্ধাঙ্গিনী সিজন ২পর্ব ১৫
-
অর্ধাঙ্গিনী সিজন ২পর্ব ১৮
-
অর্ধাঙ্গিনী সিজন ২ পর্ব ৩০
-
অর্ধাঙ্গিনী সিজন ২পর্ব ১৬
-
প্রেমবসন্ত সিজন ২ পর্ব ১৫
-
অর্ধাঙ্গিনী সিজন ২ পর্ব ২৪
-
অর্ধাঙ্গিনী সিজন ২ পর্ব ২৭
-
অর্ধাঙ্গিনী সিজন ২পর্ব ৬