অর্ধাঙ্গিনী ( দ্বিতীয় পরিচ্ছদ)
নুসাইবা_ইভানা
পর্ব -৪০
নয়না বারান্দায় চলে এলো। একবার ইচ্ছে করছিল জিয়ানকে জড়িয়ে ধরে হাউমাউ করে কাঁদতে। ভালোবাসা মানুষকে দুর্বল করে দেয়। বারবার আমরা সেখানেই ফিরে যাই যেখান থেকে আমরা সবচেয়ে বেশি আঘাত পেয়েছি। কেন আমি তোমাকে এত ভালোবাসলাম কেন? আমি তোমাকে মেনে নিলে নিজের সঙ্গে অন্যায় করা হবে। আবার তোমাকে ছাড়া বেঁচে থাকাও দুষ্কর। তুমি আমাকে কেমন মায়াজালে বন্দি করলে? আমি তোমাকে ছাড়া বাঁচতে চাই, অথচ তোমাকে ভালোবাসা ছাড়তে পারলাম না। অবচেতন মন যেন বারবার তোমার ভালোবাসা চায়।
জিয়ান নয়নাকে পেছন থেকে জড়িয়ে ধরে বলে, “তুমি একটু সময় নাও। চলো আমরা দু’জন দূরে কোথাও যাই। যেখানে তুমি আর আমি ছাড়া আর কেউ থাকবে না।”
নয়না সেভাবেই জিয়ানের বক্ষপিঞ্জরে লেপ্টে রইল বেশ কিছুক্ষণ।
জিয়ান নয়নার চুলের ওপর আলতো চুমু দিয়ে বলে, “আচ্ছা, অনিকেতের সাথে তোমার সম্পর্ক এত ক্লোজ হলো কী করে? ভুল ভেবো না। মানে, তোমাদের দেখে মনে হচ্ছিল তোমরা সত্যি রক্তের ভাই-বোন।”
নয়না মাথা তুলে তাকাল। দু’জনেই বসে আছে বারান্দায়।
জিয়ান আলতো হাতে নয়নার চোখের পানি মুছে দিল।
নয়না মৃদু স্বরে বলল, “অনিকেত ভাইয়া সত্যিই আমার ভাই। আমার মায়ের পেটের আপন ভাই। রক্তের সম্পর্ক আমাদের।”
জিয়ান অবাক হয়ে বলে, “সত্যি?”
“হুম, সত্যি।”
নয়না জিয়ানের হাঁটুর ওপর মাথা রেখে বলল, “আমাদের ঝামেলা যখন চলছিল, তখন অনিকেত ভাইয়া আমাদের বাসায় এসেছিল। আমি ভীষণ অসুস্থ হয়ে পড়েছিলাম। লাস্ট বার যখন আমাদের বাসায় আসে, তখন বাবা তাকে অন্য রুমে ডেকে নিয়ে যায়। বাবা অনিকেত ভাইয়াকে বলে, ‘কী চাই তোমার? আমার মেয়ের খেয়াল রাখার জন্য আমি যথেষ্ট। তোমাকে দরকার নেই আমাদের।’”
“মিস্টার মাহবুব তালুকদার, আপনি সুনয়নার বাবা, আমি সুনয়নার ভাই। আপনার যেমন নিজের মেয়ের প্রতি ভালোবাসা আছে, আমারও আমার বোনের প্রতি ভালোবাসা আছে। আপনার গায়ে যে মিথ্যে অহংকারের চাদর জড়ানো, আমি মুখ খুললে তা খুলে ফেলতে সময় লাগবে না। আপনি আমাকে আমার মতো থাকতে দিন। আপনার মতো মানুষের পরিচয় আমার লাগবে না।”
“না লাগলে এখানে কী? আর কোনোদিন যেন এই বাসার আশেপাশে বা এই বাড়ির মানুষের আশেপাশে না দেখি।”
“আপনি কি ভেবেছেন আপনার এই ঠুনকো ধমকে আমি ভয় পাব? আমি ততদিন এই বাসায় আসব যতদিন আমার বোন সুস্থ না হচ্ছে।”
“কিসের বোন? তোমাকে আমি নিজের সন্তান মানি না।”
“আপনাকেও আমি মানি না। বরং ঘৃণা করি যখন মনে হয় আপনার মতো মেরুদণ্ডহীন একজন মানুষ আমার বাবা।”
“মুখ সামলে কথা বলো। তুমি ভুলে যাচ্ছ তুমি কার সামনে দাঁড়িয়ে কথা বলছ।”
“একদম ভুলছি না। আমি একজন অপদার্থ, মেরুদণ্ডহীন মানুষের সামনে দাঁড়িয়ে কথা বলছি।”
“তুমি কীভাবে আমার পর্যন্ত পৌঁছালে? ভুল করেছি তোমাকে বাঁচিয়ে রেখে।”
“আমি শুধু জানতে চেয়েছিলাম কোন কাপুরুষ আমাকে জন্ম দিয়ে ফেলে রেখে গিয়েছে। কোন নিষ্ঠুর মা তার সন্তানকে একা ছেড়ে গেছে। তারপর শেষবার যখন আপনি ওই এতিমখানার পুরনো স্টাফ দু’জনকে মোটা অংকের টাকা দেওয়ার জন্য গেলেন, সেবার আপনার মতো একজন জঘন্য মানুষের মুখদর্শন হলো। আমার এই জীবনে সবচেয়ে কষ্টের মুহূর্ত ছিল আপনার মতো একজন মানুষ আমার বাবা—এই পরিচয় পাওয়া। আমার সেদিন মনে হচ্ছিল, এমন কিছুর সাক্ষী হওয়ার চেয়ে আমি সারাজীবন জানতাম আমার বাবা-মা মারা গেছে, সেটাই সবচেয়ে ভালো হতো।”
মাহবুব তালুকদার অনিকেতের দিকে এগিয়ে এসে বলে, “তোমার ফালতু কথা শোনার সময় আমার নেই। চলে যাও এক্ষুনি।”
জিয়ান অবাক হয়ে বলে, “সত্যি তোমার বাবা এরকম মানুষ! আমার বিশ্বাস হচ্ছে না।”
“আমারও বিশ্বাস হয়নি। কিন্তু সেদিন আমাদের সবার সামনে বাবার মুখোশ খুলে যায়। কারণ আম্মু অনিকেত ভাইয়ার পিছু পিছু যাচ্ছিল। তাই বাবা আর ভাইয়ার পুরো কথোপকথন আম্মু শুনে ফেলে। আম্মু রান্নাঘর থেকে দা নিয়ে বাবার দিকে তেড়ে যায়। খেয়াল করে দেখবে, বাবার হাতে কাটা দাগ আছে।”
“তুমি এতগুলো বছর আমাকে আমার সন্তানের কাছ থেকে দূরে সরিয়ে রেখেছ। এতগুলো বছর আমার এত কান্না, এত আর্তনাদ দেখেও চুপ করে থেকেছ। আমি মেরে ফেলব তোমাকে। তোমার মতো মানুষের বেঁচে থাকার কোনো অধিকার নেই।”
অনিকেত দ্রুত জাহানারা বেগমের হাত ধরে বলে, “প্লিজ, মাথা ঠান্ডা করুন।”
জাহানারা বেগম অনিকেতকে জড়িয়ে ধরে বলে, “বাবা, কতগুলো বছর আমি তোকে হারানোর যন্ত্রণা বয়ে বেড়াচ্ছি। এই লোকটা আমাকে বলেছে তুই বেঁচে নেই। আমার বাবা, আমার সন্তান—তুই বেঁচে আছিস। তুই আমার নাফি। সেই ছোট্ট নাফি। আমি এই বাসায় আর এক মুহূর্তও থাকব না। আমাকে তোর সাথে নিয়ে চল।”
জিয়ান বলল, “তারপর?”
“তারপর আমি আর আম্মু তিন মাস অনিকেত ভাইয়ার বাসায় ছিলাম। বাবা অনেক ক্ষমা চেয়ে আমাদের ফিরিয়ে এনেছেন। কিন্তু ভাইয়া বাবাকে ক্ষমা করতে পারেনি।”
জিয়ান নয়নার কপালে চুমু দিয়ে বলে, “জীবন নাটকের চেয়েও নাটকীয়। সিনেমার স্ক্রিপ্ট বাস্তব জীবনের গল্পের কাছে কিছুই না।”
নয়না জিয়ানের কাছ থেকে দূরে সরে এল। বসা থেকে উঠে দাঁড়িয়ে বলে, “আমি এই ছোট জীবনে অনেক কিছু সহ্য করে ফেলেছি। আমার মধ্যে আর ধৈর্য নেই এত দুঃখ বা নতুন করে কোনো ঝড় সহ্য করার। মন বলে তোমাকে জড়িয়ে নে। মস্তিষ্ক বলে, আবার দুঃখকে গ্রহণ করতে চাস?”
জিয়ান পেছন থেকে নয়নাকে জড়িয়ে ধরল, ঘাড়ের চুল সরিয়ে নয়নার কাঁধে আলতো ঠোঁট ছুঁয়ে বলে, “শেষবার। এরপর আর তোমাকে অভিযোগ করার সুযোগ দেব না, বাটার মাশরুম।”
মেহনুর জারিফের জন্য শপিং করতে এসেছিল। এই সব মানুষের ভিড়ে মেহনুর যেন বড্ড একা। এই পৃথিবীতে তার মতো নিঃস্ব কেউ কি আছে?
জারিফ মেহনুরের হাত ধরে টেনে বলে, “মাম্মা, পাপা। পাপা।”
মেহনুর জারিফকে কোলে তুলে নিল। কপালে চুমু দিয়ে বলে, “ওটা তোমার পাপা না। বাবা। তোমার পাপা খুব শিগগিরই আসবে তোমার কাছে।”
মাঝেমধ্যে রাস্তায় কোনো পুরুষকে দেখলে জারিফ ‘পাপা পাপা’ বলে চিৎকার করে ওঠে। মেহনুর তখন এভাবে মিথ্যে সান্ত্বনা দেয় জারিফকে।
🌿
অন্তর জাহিনকে একটা স্ট্রেচারে বসিয়ে বায়তুল মোকাররম মসজিদের উত্তর গেটের সামনে বসিয়ে দিল। সামনে একটা ভাঙা থালা।
জাহিন একদৃষ্টে অসহায়ভাবে তাকিয়ে আছে। কেউ কেউ সেই থালার মধ্যে দুই টাকা, পাঁচ টাকা ফেলে চলে যাচ্ছে। জাহিন প্রতি মুহূর্তে মৃত্যু কামনা করে, কিন্তু মৃত্যু তার কাছে আসে না। জেল থেকে পালিয়ে যাওয়ার পথে ট্রেনে অ্যাক্সিডেন্ট হয়। সে বেঁচে গেলেও সেই বেঁচে থাকা যেন মৃত্যুর যন্ত্রণার চেয়েও কঠিন হয়ে উঠেছে। এক হাত দিয়ে স্ট্রেচার সামনে নেওয়ার বৃথা চেষ্টা করছে, কিন্তু কোনো লাভ হচ্ছে না। এশার নামাজ শেষে মুসল্লিরা বের হচ্ছে। ভ্রু কুঁচকে একপলক তাকিয়ে অনেকেই দৃষ্টি সরিয়ে নিচ্ছে। চেহারার একপাশ একদম থেঁতলে গেছে। হঠাৎ কেউ তাকালে ভয় পাবে। কেউ কেউ টাকা ছুড়ে দিয়ে দ্রুত প্রস্থান করছে। কেউ কেউ ওই বিভৎস চেহারা দেখে করুণা করছে। জাহিনের একচোখ বেয়ে অশ্রু গড়িয়ে পড়তে লাগল। কী সুন্দর জীবন ছিল তার। অথচ লোভ তাকে আজ একেবারে নিঃস্ব করে দিয়েছে। যে ছিল সুদর্শন যুবক, সে আজ বিভৎস চেহারার এক পুরুষ—যার দিক থেকে মানুষ দৃষ্টি সরিয়ে নেয়। শাঁ শাঁ করে গাড়ি ছুটে চলছে। জাহিনের ইচ্ছে করছে কোনোমতে শরীরটা টেনে নিয়ে গাড়ির নিচে চাপা পড়ে এই পৃথিবী থেকে বিদায় নিতে।
চলবে
বই পড়ুন সুস্থ সমাজ গড়ুন।
Share On:
TAGS: অর্ধাঙ্গিনী সিজন ২, নুসাইবা ইভানা
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
অর্ধাঙ্গিনী সিজন ২পর্ব ১৫
-
অর্ধাঙ্গিনীর সিজন ২ পর্ব ৩৪
-
অর্ধাঙ্গিনী সিজন ২ পর্ব ৩৫
-
অর্ধাঙ্গিনী সিজন ২ পর্ব ২৮
-
অর্ধাঙ্গিনী সিজন ২ পর্ব ২০+২১
-
অর্ধাঙ্গিনী সিজন ২পর্ব ৭
-
অর্ধাঙ্গিনী সিজন ২পর্ব ১৭
-
অর্ধাঙ্গিনী সিজন ২ পর্ব ২৫
-
অর্ধাঙ্গিনী সিজন ২ পর্ব ২৭
-
অর্ধাঙ্গিনী সিজন ২ পর্ব ৩৭