অর্ধাঙ্গিনী ( দ্বিতীয় পরিচ্ছদ)
নুসাইবা_ইভানা
পর্ব -৩০
নয়না গুনগুন করে গাইছে…
“নাম ধরে সে ডাকে না যে তবু কেন মরি লাজে
মন যেন আজ একা একা বসে না কোনো কাজে
সে যে চুপিসারে আমায় কেন দেখেও দেখে না
আমার প্রাণ যে মানে না কিছুই ভালো লাগে না
কে বাঁশি বাজায় রে মন কেন নাচায় রে
আমার প্রাণ যে মানে না কিছুই ভালো লাগে না…”
অনিকেত নয়নার গানটা ভিডিও রেকর্ড করল।
“ভাইয়া, তুমি ভিডিও করছ কেন!”
“আমার বোনের এত সুন্দর কণ্ঠ সবাইকে জানাতে হবে না?”
“একদম না! ডিলিট করো, নয়তো ভাবির কাছে বিচার দেব কিন্তু।”
“কে ভাবি? আমি তো কোনো ভাবিকে চিনি না।”
“আচ্ছা এই কথা! এক্ষুনি ভাবিকে কল করছি দাঁড়াও।”
“এই না, বসে আছি, দাঁড়াতে পারব না। তোর লজ্জা করে না বড় ভাইকে ব্ল্যাকমেল করতে?”
“নাহ্, করে না।”
“পোস্ট ডান। আজকে তোর কাছে অনেক ফ্রেন্ড রিকোয়েস্ট আসবে। তোকে দেখে আজ সবাই পাগল হয়ে যাবে।”
“ডিলিট করো। এসব ঠিক না।”
“ঠিক বলেছিস, একদম ঠিক না। চুপচাপ গান গাইতে থাক, আমি শুনি।”
“এহ্! শখ কত! আর গাইব না।”
ড্রাইভার তার গন্তব্যে এগিয়ে যাচ্ছে। গাড়ির ব্যাকসিটে ভাইবোন গল্প করছে।
অনিকেত বলল, “আম্মু কেমন আছে?”
“আমি বলব কেন! এত জানার ইচ্ছে হলে নিজে গিয়ে খোঁজ নাও।”
“আমি কোনোদিন ওই বাসায় ফিরব না। আমার জন্য সেটা লজ্জাজনক। আমার সন্তান যখন জানতে পারবে তার পিতার পরিবার তাকে কতটা তুচ্ছতাচ্ছিল্য করেছে, তখন তাদের মনে খারাপ প্রভাব পড়বে। এর চেয়ে বাকিটা জীবন এভাবেই কাটিয়ে দেব।”
“তুমি জানো আম্মু অনেক চেয়েছিল তোমাকে রাখতে, কিন্তু বাবা আর দাদাভাই রাজি হননি। আচ্ছা ভাইয়া, তুমি প্রথম কীভাবে জানলে বাবা-মায়ের পরিচয়?”
“তোর সাথে দেখা হলে আমি অন্য রকম একটা টান অনুভব করতাম। এর আগে কখনো কারো জন্য এমন টান অনুভব হয়নি। তোর কষ্ট দেখলে কেমন নিজের ভেতরটা হাহাকার করে উঠত। কারো কাছে সেসব প্রকাশ করাও সম্ভব ছিল না, কারণ সবাই আমার অনুভূতিকে কলুষিত করত। যেদিন কোর্টের বাইরে রাত ন’টা পর্যন্ত তুই দাঁড়িয়ে ছিলি, শেষে যখন হাঁটু মুড়ে কান্না করছিলি—ইচ্ছে করছিল জিয়ানের শরীর থেকে মাথা আলাদা করে দিই। এরপর বাসায় এসে এসব নিয়ে ভাবতে লাগলাম। তারপর একের পর এক সূত্র ধরে এগিয়ে যেতে লাগলাম।” “মাহবুব তালুকদার লোকটা পেছন থেকে সব সময় আমাকে সাপোর্ট করেছেন। একটা অনাথ আশ্রম থেকে ভালো কলেজে পড়া, কোচিং করে ভালো মেডিকেলে চান্স পাওয়া—পড়াশোনার খরচ একটা আঙ্কেল দিতেন। আমি তার ওপর নজর রাখা শুরু করলাম। তার ব্যাংক লেনদেন খতিয়ে দেখতে গিয়ে ‘মাহবুব তালুকদার’ নামটা হাইলাইটে আসে। এরপর আর বেশি সময় লাগেনি সবটা বুঝতে।”
“তুমি বিশ্বাস করো, আম্মু জানত না তুমি বেঁচে আছো। বাবার সামনে এ নিয়ে তুমুল ঝামেলা হয়। তখন আমিও বিধ্বস্ত। আম্মু কঠিন সিদ্ধান্ত নিল বাবাকে ডিভোর্স দেবে। একটা বাজে পরিস্থিতির মধ্যে আরও একটা বাজে পরিস্থিতি। আমি সহ্য করতে না পেরে সুইসাইড করার চেষ্টা করি। কিন্তু আমি নিজেকে মারতে গিয়ে নিজের সন্তানটাকে মেরে ফেললাম। আমি যখন হসপিটালে, তুমি নিয়মিত আমাকে দেখতে আসতে। বারবার তোমাকে চোখের সামনে দেখতে দেখতে আম্মুর সন্দেহ হয়। এরপর কৌশলে তোমার মাথার চুল সংগ্রহ করে ডিএনএ টেস্ট করায়। তারপর তো বাকিটা আম্মুর কাছে পানির মতো পরিষ্কার হয়ে যায়।”
তিক্ত অতীত মনে করলেই নয়নার বুকটা হাহাকার করে ওঠে তার অনাগত সন্তানের জন্য, যে এই পৃথিবীর আলো দেখতে পায়নি। তার ভুলের জন্য তার অস্তিত্ব পৃথিবীতে আসতে পারেনি। নয়না কান্না করছে।
অনিকেত নয়নার চোখের পানি মুছিয়ে দিয়ে বলে, “কাঁদিস না বোন। তার হায়াত ছিল না, তাই সে এই পৃথিবীতে আসতে পারেনি। নিজেকে দোষ দিস না। নতুন করে জীবনটা শুরু কর, সব ঠিক হয়ে যাবে।”
“ভাইয়া, আমি কী করে জিয়ানকে ভুলে যাব? আমার প্রতিটা নিঃশ্বাস, প্রতিটা দীর্ঘশ্বাস, হাসি-কান্না—সবকিছুতেই ওই মানুষটা জড়িয়ে আছে। আমি শত চেষ্টা করেও তাকে ভুলতে পারছি না।”
“তাহলে ভোলার চেষ্টা করিস না। আমরা স্মৃতি থেকে যা মুছে ফেলতে চাই, তাই স্মৃতিতে প্রখর হতে থাকে। বরং স্মৃতি বহন করেই নতুন স্মৃতি তৈরি কর। এক সময় সুখের স্মৃতির প্রলেপে ওসব তিক্ত অতীত চাপা পড়ে যাবে।”
গাড়ি এসে থামল এয়ারপোর্টের সামনে।
অনিকেত নয়নার দিকে টিস্যু বাড়িয়ে দিয়ে বলল, “তোকে সাক্ষাৎ পেত্নি লাগছে। ভালোভাবে চোখ-মুখ মুছে ফুলের তোড়াটা হাতে নিয়ে নায়িকা স্টাইলে হেঁটে আয় আমার পিছু পিছু।”
জিয়ান এয়ারপোর্টের সব ফরমালিটি পূরণ করে বের হওয়ার জন্য সামনে এগিয়ে আসছিল। হঠাৎ তার পা থেমে যায়। নয়নাকে চিনতে তার এক সেকেন্ডও সময় লাগেনি। জিয়ানের চোখ দুটো নিজের অজান্তেই ভিজে ওঠে। সে মনে মনে ভাবে—’আমি তো তোমাকে বলে আসিনি, তবুও তুমি আমাকে গ্রহণ করতে এসেছো! আমি কি এতদিন নিজেকে তোমার থেকে অকারণেই দূরে সরিয়ে রেখেছি?’ জিয়ান দু’হাত প্রসারিত করে সামনে দাঁড়িয়ে থাকে।
নয়না দৌড়ে আসছে। জিয়ান বড় একটা ধাক্কা খেল যখন দেখল নয়না তার পাশ দিয়ে ফুল নিয়ে দৌড়ে সামনের দিকে চলে যাচ্ছে। সে যেন মুহূর্তেই হার্টে গুলিবিদ্ধ হলো। ঠিক এমন এক অসহ্য যন্ত্রণা অনুভব করল সে।
অনিকেত জিয়ানের সামনে এসে থমকে দাঁড়াল। দুজনের দৃষ্টি নিবদ্ধ হলো একে অপরের ওপর। মুহূর্তেই অনিকেতের চোয়াল শক্ত হয়ে গেল। অনিকেত নিজেকে সংযত করে সামনের দিকে এগিয়ে যাওয়ার জন্য পা বাড়াল।
জিয়ান বিধ্বস্ত কণ্ঠে ডাকল, “অনিকেত!”
অনিকেত বলল, “কে আপনি? আমার নাম ধরে ডাকছেন কেন!”
“আমি জানি তুই আমাকে চিনতে পেরেছিস। ভুলে গেছিস, আমরা বলেছিলাম যা-ই হয়ে যাক আমরা সব সময় একে অপরের পাশে থাকবো?”
“সরি স্যার, আমি আপনাকে চিনি না। ডোন্ট ডিস্টার্ব।” অনিকেত চলে গেল।
জিয়ান সেভাবেই দাঁড়িয়ে দেখছে—কাছের মানুষ কীভাবে দূরে সরে যায়। সবচেয়ে প্রিয়জন কীভাবে অপরিচিত হয়ে যায়। ভালোবাসা কীভাবে রুদ্ধদ্বার বন্ধ করে দেয়। জিয়ানের অনিচ্ছা সত্ত্বেও তার চোখ থেকে দু’ফোঁটা অশ্রু গড়িয়ে পড়ল। ওই দু’ফোঁটা অশ্রু কি তার হৃদয়ের ক্ষত প্রকাশ করতে পারছে?
নয়না সূচনাকে জড়িয়ে ধরে বলল, “তুই চলে এসেছিস! আমি তোকে অনেক মিস করেছি।”
“আমি তোমাদের একদম মিস করিনি। তোমরা সবাই আমাকে দূরে সরিয়ে দিয়েছ। আমি তোমাদের আর ভালোবাসি না।”
নয়না ফুলের তোড়া সূচনার দিকে বাড়িয়ে দিতেই ঈশান হাত বাড়িয়ে সেটা নিয়ে বলল, “হেই বিউটিফুল লেডি!”
নয়না কপাল কুঁচকে বলল, “ডাক্তার ঈশান মির্জা, আপনি?”
“হুম, আমি। আমি তো ডাক্তারি ডিগ্রির জন্য লন্ডনে গিয়েছিলাম। আমার ফেরার কথা শুনে ডাক্তার অনিকেত মাহমুদ আমাকে বলল এই সুইট পিচ্চিকে সাথে করে নিয়ে আসতে। আপনার চাচার চোখ ফাঁকি দিয়ে চুরি করে নিয়ে এসেছি।”
নয়না হাত বাড়িয়ে বলল, “ধন্যবাদ ডাক্তার মির্জা।”
“ওয়েলকাম প্রিটি লেডি।”
সবাই একসাথে বাইরের দিকে এগিয়ে গেল। জিয়ান পেছন থেকে তাকিয়ে দেখছে। নয়না কি তাকে দেখেনি নাকি চিনতে পারেনি? ডাক্তার ঈশানের সাথে কিসের সম্পর্ক নয়নার?
অনিকেতের গাড়িটা চোখের আড়াল হতেই জিয়ান একটা সিএনজি ভাড়া করে উঠে বসল। জিয়ানের মনে হচ্ছে এক ছুটে এই শহর ছেড়ে পালিয়ে যেতে। এই শহরে বিষাদ ছাড়া তার জন্য আর কিছু নেই। আজকের ঘটনার পর তার মনটা যেন আরও ভেঙে গেল। ক্ষীণ যে আশার প্রদীপটুকু ছিল, তাও যেন মুহূর্তে নিভে গেছে।
মোবাইল বের করে নিজের আইডিতে ঢুকতেই অনিকেতের পোস্টটা সামনে আসল।
“আনঅফিশিয়াল সিঙ্গার প্রিন্সেস সুনয়না তালুকদার। আপনারাও হারিয়ে যাবেন তার কণ্ঠের মোহে।”
জিয়ান বারবার গানটা শুনতে লাগল। শাড়িটার দিকে তাকিয়ে তার দৃষ্টি স্থির হলো। এই শাড়িটা তো সে-ই গিফট করেছিল।
নয়নার দিকে তাকিয়ে সে মনে মনে বলল, “তুমি কি আমাকেই ডাকছো গানের সুরে? নাকি এখন সুর তোলো অন্য কোনো ধ্বনিতে? আমি তোমাকে একবার জড়িয়ে ধরতে চাই। শুধু একবার।”
চলবে
Share On:
TAGS: অর্ধাঙ্গিনী সিজন ২, নুসাইবা ইভানা
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
অর্ধাঙ্গিনী সিজন ২পর্ব ১৮
-
অর্ধাঙ্গিনী সিজন ২ পর্ব ২৪
-
প্রেমবসন্ত সিজন ২ পর্ব ১৫
-
অর্ধাঙ্গিনী সিজন ২ পর্ব ২৭
-
অর্ধাঙ্গিনী সিজন ২পর্ব ১২
-
অর্ধাঙ্গিনী সিজন ২ পর্ব ২০+২১
-
অর্ধাঙ্গিনী সিজন ২পর্ব ৪
-
অর্ধাঙ্গিনী সিজন ২পর্ব ১৩
-
অর্ধাঙ্গিনী সিজন ২পর্ব ১
-
অর্ধাঙ্গিনী সিজন ২পর্ব ২