অর্ধাঙ্গিনী ( দ্বিতীয় পরিচ্ছদ)
নুসাইবা_ইভানা
পর্ব -৩৯
নয়না রেগে বলল, “বাবা আসার আগে প্লিজ চলে যান।”
“তোমার বাবা অনেক ভালো মানুষ। নিশ্চয়ই মেয়ের জামাই এসেছে দেখলে ভীষণ খুশি হবেন।”
“মেয়ের জামাই না, কচু।” বলেই নয়না নিজের রুমে চলে গেল।
সায়না জিয়ানের কাছে এসে বলল, “দুলাভাই, আমি আপনাকে হেল্প করতে পারি, করব?”
“এই, তুমি সেই পিচ্চিটা না? বাপরে! এত বড় হয়ে গেছো, পুরো দাদি আম্মা!”
“এবার বলেন, আমার হেল্প নেবেন? ছোট একটা শর্ত আছে।”
“বলে ফেলো, দাদি আম্মা।”
“আপনি শ্বশুরবাড়িতে এমন খালি হাতে চলে এসেছেন?”
“মোটেই না। আমার শ্বশুর আব্বা বিরাট বড়লোক। তিনি বললেন, ‘বাবা, তুমি বাসায় যাও।’ আমি বললাম, ‘এভাবে কীভাবে যাব?’ বড়লোক শ্বশুর বললেন, ‘তুমি যাও, হাতি-ঘোড়া যা লাগে আমি দেখছি।’”
“দুলাভাই, আপনি আমার হেল্প করলে আমি আপনার হেল্প করব। বলেন, রাজি?”
“নাহ্, একদম রাজি না। শ্বশুর-শাশুড়িকে নিয়ে বিজি, এই ফুরসত আমাকে নিজের বউকে কাবুতে আনতে হবে।”
জিয়ান নয়নার রুমের দিকে গেল। দরজার সামনে গিয়ে থামল। মনে পড়ল কিছুক্ষণ আগের কথা…
আসসালামু আলাইকুম।
জিয়ান মাহবুব তালুকদারের অফিসে গিয়ে সালাম দিয়ে তার কেবিনে ঢুকে পড়ল।
মাহবুব তালুকদার জিয়ানকে দেখে বেশ অবাক হলেন, সাথে রাগও। সালামের জবাব না দিয়ে বললেন, “এখানে কী?”
জিয়ান চেয়ার টেনে বসে বলল, “বাবা, আপনিও যদি আমাকে আমার কথাটা বলার সুযোগ না দেন, তাহলে আমি কার কাছে যাব? মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামিও নিজের কথা বলার সুযোগ পায়।”
“কী বলতে চাও?”
“বাবা, আমি মানি সব দোষ আমার। কিন্তু আমি তো জানতাম না আমার স্ত্রী প্রেগন্যান্ট। আমি ওই মুহূর্তে অসহায় হয়ে পড়েছিলাম। মায়ের ইমোশনাল ব্ল্যাকমেইল, ভাইয়ের মৃত্যু—সবকিছু মিলিয়ে আমাকে একটা দোটানার মধ্যে ফেলে দিয়েছিল। আমি বাইরে চলে গিয়েছিলাম। কিন্তু সেখান থেকেও অন্তরের কাছ থেকে মাঝেমধ্যে নয়নার খোঁজখবর নিতাম। আমার আরও আগে আসা উচিত ছিল, কিন্তু সেখানেও ভুল করে দেরি করে ফেলেছি। আমি আমার ভুল শোধরানোর একটা শেষ সুযোগ চাই। এরপর কথা দিচ্ছি, জীবনে কোনোদিন আপনার মেয়েকে তিল পরিমাণও কষ্টের সম্মুখীন হতে দেব না।”
জিয়ান উঠে এসে মাহবুব তালুকদারের হাত দুটো জড়িয়ে ধরে বলল, “বাবা, আমাকে নিজের সন্তান মনে করে একটা সুযোগ দিন।”
মাহবুব তালুকদার জিয়ানের মাথায় হাত রেখে বললেন, “কথা দাও, জীবনে কোনোদিন আমার মেয়ের চোখে পানি আসতে দেবে না? কোনোদিন তাকে বিন্দু পরিমাণ কষ্ট দেবে না?”
জিয়ান মৃদু হেসে বলল, “কান্নার ব্যাপারে গ্যারান্টি দিতে পারছি না। কারণ ও তো কিছু হলেই কেঁদে দেয়। তবে কথা দিচ্ছি, কোনোদিন কোনো দুঃখ-কষ্ট নয়নাকে স্পর্শ করতে পারবে না।”
মাহবুব তালুকদার হেসে বললেন, “মনে থাক যেন। আমার পর আমি আমার মেয়ের দায়িত্ব তোমাকে দিলাম। আমার মেয়েকে ভালো রাখার দায়িত্ব এখন তোমার উপর নির্ভর করে।”
জিয়ান মাহবুব তালুকদারকে জড়িয়ে ধরে বলল, “ধন্যবাদ, বাবা। আমি সারাজীবন এই করুণার কথা মনে রাখব।”
মাহবুব তালুকদার জিয়ানের পিঠে হাত রেখে বললেন, “তুমি ভাগ্যবান, তাই সুযোগ পেয়েছ। কিছু মানুষ দ্বিতীয়বার সুযোগ পায় না। সুযোগ নষ্ট করো না, কাজে লাগাও। আর হ্যাঁ, বাসায় এক ঘণ্টা পর যেয়ো। তোমার শাশুড়িকে নিয়ে আমি হাসপাতালে যাব। আমি যত সহজে গলে গেছি, তোমার শাশুড়ি তত সহজে গলবে না।”
জিয়ান মাহবুব তালুকদারকে কৃতজ্ঞতা জানিয়ে অফিস থেকে বের হল। মনটা ফুরফুরে লাগছে। যেন ঝড়ঝাপটার পর শীতল বাতাস বয়ে যাচ্ছে হৃদয় জুড়ে।
🌿
জিয়ান কল্পনা থেকে বের হয়ে নয়নার দরজায় টোকা দিল। দরজা খোলা! জিয়ান নয়নার রুমে ঢুকল। নয়না বেডের উপর বসে আছে, হাতে মোবাইল। মোবাইলে মৃদু স্বরে গান বাজছে।
জিয়ান নয়নার পাশ ঘেঁষে বসল। কোন কথা না বলে, নয়নার দিকে পলকহীন দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল।
নয়না নিজের দৃষ্টি নত করে বলল, “আপনি কি মনে করেন আমি আপনাকে এখনো ভালোবাসি?”
“আমি জানি তুমি আমাকে ভালোবাসো। শুধু অভিমানের দেয়াল ভেদ করে এগিয়ে এসে স্বীকার করতে পারছ না। তোমার আর আমার ভালোবাসার মাঝে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে অভিমান, অভিযোগ।”
নয়না জিয়ানের দৃষ্টিতে নিজের দৃষ্টি স্থির করে বলল, “আমি আপনাকে ভালোবাসি—এই কথাটা আকাশের মতো সত্য, সমুদ্রের মতো গভীর। কিন্তু আমি আপনাকে কোনোদিন আর নিজের করে রাখতে পারব না। হয়তো আমি আপনাকে আর নিজের করে রাখতে চাইও না। আপনি নামক মানুষটা জুড়ে কেমন দমবন্ধ করা যন্ত্রণাদায়ক অনুভূতি বিরাজ করে।”
“এবার তো ক্ষমা করে দাও। আমিও তোমার বিরহের অনলে পুড়ছি। আর কত পোড়াবে?”
“ক্ষমা! আপনি কি আমার সন্তানকে ফিরিয়ে দিতে পারবেন? যদি আমার সন্তানকে আমার কোলে ফিরিয়ে দিতে পারেন, আমি আপনাকে সাদরে গ্রহণ করে নেব। ভুলে যাব আপনার করা প্রতিটি অন্যায়, ভুলে যাব তিক্ত অতীত।”
জিয়ান চুপ হয়ে গেল। এখানেই আটকে যায় সে। যে দুনিয়ায় নেই, তাকে কি ফিরিয়ে আনা যায়?
“নয়না তাচ্ছিল্যের হাসি দিয়ে, ধরে আসা কণ্ঠে বলল, “অতিরিক্ত টেনশন আর মানসিক চাপের কারণে গর্ভধারণের তিন মাসেই আমার সন্তান এই পৃথিবী ছেড়ে চলে গেছে। আমি নিজেকে কোনোভাবে মানিয়ে নিতে পারি না যে সে কখনো ছিলই না। আমার অবচেতন মন বারবার কল্পনা করতে চায়—সে দেখতে কেমন হতো? তার ছোট ছোট হাত, তার নিষ্পাপ মুখশ্রী কেমন হতো? অথচ আমি কল্পনা করতেও ব্যর্থ, কারণ তার আকৃতি ধারণ করার আগেই সে আমাকে ছেড়ে চলে গেছে। আপনি আপনার পরিবারের কথা ভাবলেন, অথচ আমার কথাটা একবারও ভাবলেন না? আমি কি আপনার পরিবারের বাইরের কেউ ছিলাম? আমি কি আপনার আপন কেউ হতে পারিনি কখনো? তার মানে কি স্বামী-স্ত্রীর মধ্যকার সম্পর্ক এতটাই ঠুনকো? কই ছিলেন তিনটা বছর আপনি? তখন মনে হয়নি আপনার সুনয়না কেমন আছে? কোন অবস্থায় আছে? তিন বছরে কত কিছু হতে পারতো—আমি তো মরেও যেতে পারতাম।”
“প্লিজ, এসব বলবে না। দয়া করে পেছনের তিক্ত অতীতটাকে মাটিচাপা দাও। জানি সহজ না, কিন্তু অতীত টেনে বর্তমান কেন নষ্ট করবে, বাটার মাশরুম?”
“এতই যখন ভালোবাসা, তাহলে কেন ফিরে আসেন নি? তিন বছর যখন কাটাতে পেরেছেন, বাকি জীবনও ঠিক কাটাতে পারবেন। কারো শূন্যতায় জীবন আটকে থাকে না। জীবন জীবনের গতিতে ঠিক কেটে যায়।”
জিয়ান নয়নাকে জড়িয়ে ধরল। “শেষবার, প্লিজ আর একটা সুযোগ দাও। আমি কথা দিচ্ছি, আমি তোমাকে সুন্দর একটা জীবন উপহার দেব। সেখানে আমাদের সন্তান থাকবে। হয়তো যে চলে গেছে সে না, তবে তোমার-আমার অস্তিত্ব নিয়ে নতুন কেউ।”
নয়না কোনো কথার উত্তর দিল না। সেভাবেই দাঁড়িয়ে রইল পাথরের মূর্তির মতো। নয়না বিশ্বাস করতে চায় জিয়ানের ভালোবাসা সত্যি ছিল। কিন্তু কোথায় এসে যেন জিয়ানের ভালোবাসাটা কিন্তু-তে আটকে যায়। তিনটা বছর, ১৫৬ সপ্তাহ, ১,০৯৫ দিন, ২৬,২৮০ ঘণ্টা, ৯৪,৬০৮,০০০ সেকেন্ড—যে মানুষটা আমাকে ছেড়ে থাকতে পারল, সেই মানুষটা আসলেই কি আমাকে ভালোবাসে!
জিয়ান মৃদু স্বরে ডাকল, “বাটার মাশরুম, আমাকে ফিরিয়ে দিও না। বড় আশা নিয়ে এসেছি, আমাকে শূন্য হাতে ফিরিয়ে দিও না, পাখি।”
🌿
মিতা বেগম অবাক হয়ে তাকিয়ে রইলেন নাজিম চৌধুরীর দিকে।
দৌড়ে এসে সামনে দাঁড়িয়ে বললেন, “আমি জানতাম তুমি আমাকে ছেড়ে কোথাও যেতে পারবে না।”
“তাহলে তুমি কীভাবে নিজের সন্তানকে তার স্ত্রীকে ছাড়তে বললে?”
“আমি ভুল করেছি। আমি আমার ভুল শুধরাব। আমি নিজে গিয়ে তালুকদার বাড়ি থেকে আমার ঘরের বউমাকে ফিরিয়ে আনব।”
“এতদিন পর মনে হলো তুমি ভুল করেছ?”
“আমি জানি আমি ভুল। কিন্তু আমার জাহিন… ওর লাশটা চোখের সামনে ভেসে উঠে। কী বিভৎসভাবে ওর মুখটা থেঁতলে গিয়েছিল। আমি আমার ছেলের মৃত্যুশোকে ঠিক-ভুলের পার্থক্য ভুলে বসেছিলাম।”
“ওর পরিণতির দায় তো ওর নিজের। জাহিন কি আমার সন্তান ছিল না? আমার কি ওর জন্য হৃদয় পোড়ে না? আমি যেভাবেই হোক ওর সাজা কমিয়ে আনতাম। বড় বড় উকিলদের সাথে কথা বলে রেখেছিলাম। শত হোক, আমার সন্তান তো! কিন্তু ও নিজেই জেল থেকে পালিয়ে গেল। ট্রেন এক্সিডেন্টে জীবন গেল। এখানে দোষটা কার?”
মেহনুর তার ছেলেটাকে বুকের সাথে চেপে ধরে কাঁদছে। মনে মনে বলছে, “কেন এমন করলে তুমি, জাহিন? আমার ছেলেটাকে কেন বাবা ছাড়া করলে? আমি তোমাকে কোনোদিন ক্ষমা করব না। কোনোদিন না।”
চলবে
Share On:
TAGS: অর্ধাঙ্গিনী সিজন ২, নুসাইবা ইভানা
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
অর্ধাঙ্গিনী সিজন ২ পর্ব ৩৩
-
অর্ধাঙ্গিনী সিজন ২পর্ব ১১
-
অর্ধাঙ্গিনী সিজন ২ পর্ব ৩৭
-
অর্ধাঙ্গিনী সিজন ২পর্ব ৫
-
অর্ধাঙ্গিনী সিজন ২ পর্ব ১৯
-
অর্ধাঙ্গিনী সিজন ২পর্ব ৬
-
অর্ধাঙ্গিনী সিজন ২ পর্ব ৩২
-
অর্ধাঙ্গিনী সিজন ২ পর্ব ২৮
-
অর্ধাঙ্গিনী সিজন ২পর্ব ১০
-
অর্ধাঙ্গিনী সিজন ২পর্ব ৮