Golpo romantic golpo অর্ধাঙ্গিনী গল্পের লিংক সিজন ২

অর্ধাঙ্গিনী সিজন ২ পর্ব ৩৭


অর্ধাঙ্গিনী ( দ্বিতীয় পরিচ্ছদ)

নুসাইবা_ইভানা

পর্ব -৩৭

পনেরো ফ্লোর বিশিষ্ট একটা বিল্ডিংয়ের আন্ডারগ্রাউন্ডে চেয়ারের উপর বসে টেবিলের উপর পা রেখে একেবারে পর এক নিকোটিনের ধোঁয়া উড়াচ্ছে। তার সামনেই চেয়ারে বেঁধে রাখা হয়েছে এক যুবককে। যার চোখ একটা নেই, হাত একটা নেই, একটা পায়ের অর্ধেক কাটা। লোকটা আর্তনাদ করে বলল, “কেন আমাকে বাঁচিয়ে রেখেছিস?”

অন্তর সিগারেটে শেষ টান দিয়ে উপরের দিকে ধোঁয়া ছেড়ে বলল, “মরে গেলেই তো মুক্তি। এত সহজ মৃত্যু তো কাম্য না তোর জন্য। তুই প্রতিদিন মরণ ভিক্ষা চাইবি, প্রতি মুহূর্ত মরার জন্য ছটফট করবি, কিন্তু মরণ তো এত সহজে তোর কাছে আসবে না।”

“আমাকে কেন বাঁচালি? কেন এমন যন্ত্রণা দিচ্ছিস?”

টেবিলের উপর থেকে পা নামিয়ে একটু সামনের দিকে ঝুঁকে বলল, “ট্রেনের নিচে সুইসাইড করলে মৃত্যু নিশ্চিত, কিন্তু তোর মতো জানোয়ার এত সহজে মরে যাবে! এই যে তুই সামনের আয়নায় নিজেকে প্রতিনিয়ত দেখছিস আর ভেতরে ভেতরে শেষ হচ্ছিস—এই যন্ত্রণা তোর প্রাপ্য। এই যে ‘দ্য মোস্ট হ্যান্ডসাম’ থেকে ‘দ্য মোস্ট যন্ত্রণায় কাতর’ হয়ে চিৎকার করিস—এটা তোরই কর্মফল।”

লোকটা অনেক কষ্টে অন্তরের একটা পা জড়িয়ে ধরে বলল, “প্লিজ আমাকে মেরে ফেল। আমি অপরাধী, আমার বেঁচে থাকার কোনো অধিকার নেই।”

অন্তর পা টেনে সরিয়ে নিয়ে বলল, “এই জায়গাটা চিনতে পারছিস? মান্নাতের বাবাকে এখানে আটকে রেখে টর্চার করে মেরেছিস, তাই না? আর ওর মা? তোর মায়ের বয়সী একটা মহিলাকে তোর সামনে বসে মানুষ নামের কীটগুলো খুবলে খেয়েছে আর তুই ছিলি নীরব দর্শক! এত কিসের লোভ ছিল তোর? টাকা, পয়সা, ধন-দৌলত—তোর তো কোনো কিছুর অভাব ছিল না। তাহলে কেন নিজেকে হিংস্র পশু বানালি?”

ওপাশের লোকটা নীরব। যে চোখটা ভালো আছে, সেটাতেও ঠিকমতো দেখতে পায় না। সেই চোখের কোণ বেয়ে গড়িয়ে পড়ছে অশ্রু।

অন্তর কিছু হাড় এনে বলল, “ওই এসিডের পুলে কতজনকে ঝলসে মেরেছিস। এই হাড়গুলোর সাথে এবার থেকে তোর বসবাস।”

“আমাকে মেরে ফেল, নয়তো বাঁধন খুলে দে। আমি নিজেই ওই এসিডে ঝাঁপ দিব।”

“তুই তো মরবি, তবে ধীরে ধীরে, ধুঁকে ধুঁকে, বিভৎসভাবে তোর মৃত্যু হবে। তোর নিজের রূহ কেঁপে উঠবে তোর মৃত্যুর কথা ভেবে।”

🌿

সকালের আলো ফুটে ওঠার আগেই সায়না ঘুম থেকে উঠে শাওয়ার নিল। ফজরের আজান দিতেই নামাজ আদায় করে অনিকেতকে ডেকে তুলল। সায়না কিচেনের দিকে যাচ্ছে চা বানাতে। হঠাৎ দেখে সোফার উপর কুঁচকে শুয়ে আছে জিয়ান। সায়না আবার রুমে গেল, একটা চাদর এনে জড়িয়ে দিল জিয়ানের গায়ে। তারপর উঁকি দিল নয়নার রুমের দিকে। রুমের দরজা ভেতর থেকে লক। সায়না চা বানিয়ে রুমে চলে এল। ততক্ষণে অনিকেতের নামাজ পড়া শেষ। সায়না অনিকেতের দিকে একটা চায়ের কাপ বাড়িয়ে দিয়ে বলল, “আপনার জঘন্য চা।”

“আমার জঘন্য চা তোমার হাতের স্পর্শে অমৃত হয়ে উঠে, বৌ।”

“বয়স হচ্ছে কিন্তু ফ্লার্টবাজি কমছে না?”

“কী বলো এসব! আমার মতো ইয়াং, সুদর্শন পুরুষকে তোমার বয়স্ক লাগছে! কাল থেকেই জিম জয়েন করব।”

“আপনাদের তিনজনের মধ্যে সবচেয়ে হ্যান্ডসাম রেজা ভাই, তারপর আপনি। নাহিদ ভাইয়াও আপনার যেমন হ্যান্ডসাম, কিন্তু ভাইয়ার ভুরি সব খেয়ে দিয়েছে।”

অনিকেত কপাল কুঁচকে বলল, “বেহায়া মহিলা! নিজের বরের সামনে ভাইয়ের প্রশংসা করে! খাবই না আমি চা। এক্ষুনি জিমে যাব। বডি সলিড বানাব, তারপর দেখব কারো চোখে সুদর্শন লাগে কি না।”

সায়না খিলখিল করে হেসে উঠল। তারপর অনিকেতের আধভেজা চুল এলোমেলো করে দিয়ে বলল, “আপনি কেমন বাচ্চাদের মতো রিয়েক্ট করছেন, ডাক্তার বাবু। পৃথিবীর সব পুরুষের সৌন্দর্য একদিকে, তোমার সৌন্দর্য আরেকদিকে। তুমি আমার ব্যক্তিগত একান্ত প্রিয় পুরুষ। তোমার সাথে কারো তুলনা হয় না! তোমার কাছেই আমার শান্তি, তোমার হৃদয়ে সমাপ্তি হয় আমার সব ক্লান্তির।”

🌿

জিয়ান আড়মোড়া ভেঙে ঘুম থেকে উঠে বসল। গায়ের চাদর দেখে মৃদু হাসল। সে ভেবেছিল এটা নয়নার কাজ।

সায়না কোমরে এক হাত দিয়ে দাঁড়িয়ে আরেক হাতে খুন্তি। জিয়ানকে উদ্দেশ্য করে বলল, “তোমরা ছেলেরা এত কনফিডেন্স কই পাও বলো তো! যে বৌকে তিন বছর আগে ফেলে রেখে গেছ, সেই বৌ তোমার কথা চিন্তা করে গায়ে চাদর জড়িয়ে দেবে—এমন ধারণা কীভাবে করতে পারো, ভাই?”

“এটা নয়না রাখেনি?”

“উঁহু, আমি রেখেছি। আর হ্যাঁ, এখন বেলা বারোটা বাজে। দয়া করে নাস্তা করে বিদায় হও।”

“বারোটা বাজে! আমার বউ কই? বউ কি চলে গেছে আমাকে রেখে?”

“তোমার বউ ভার্সিটিতে গেছে। মনে হয় না আজ আর এ বাড়িতে ফিরবে।”

জিয়ান দ্রুত ওয়াশরুমে ঢুকে পড়ল। ঝটপট রেডি হয়ে মাহির গালে চুমু দিয়ে বলল, “আসি, ম্মাম্মা। শোনো, বড় হয়ে তোমার ফুপির মতো হবে, ভুলেও তোমার আম্মুর মতো হবে না।”

“না খেয়ে কোথায় যাচ্ছ?”

“ভার্সিটিতে।”

“সেখানে তোমার কোনো কাজ নেই। চুপচাপ নাস্তা খেয়ে বাসায় যাও। মামা আজ বিকেলের ফ্লাইটে দেশ ছেড়ে চলে যাবে মামির সাথে রাগ করে।”

“ওসব এখন দেখার টাইম নেই। এখন আগে বউ সামলাব, তারপর বাকি সব।”

“ওরে আমার বউ-পাগলা রে!”

জিয়ান আর কোনো উত্তর দিল না, দ্রুত বের হয়ে গেল বাসা থেকে। তার গন্তব্য এখন নয়নার ভার্সিটি।

🌿

হৃদয় নয়নাকে দেখে বলল, “কাল রাতে তোর কী হয়েছিল বল তো?”

“সর গাঁধা! তোকে একটা কাজ বললাম, ঠিকমতো তো করতে পারলি না। এখন জিজ্ঞেস করছিস কী হয়েছে?”

“এক মিনিট দাঁড়া, তুই কি সিরিয়াস?”

“সিরিয়াস হলে?”

“আমি তোকে এক্ষুনি বিয়ে করব।”

“মানে!”

“মানে, প্রেম করে টাইম ওয়েস্ট করা তারপর ছ্যাকা খাওয়া হৃদয়ের ডায়েরিতে নেই। তাই সোজা বিয়ে চল, কাজি অফিসে।”

“এখনো আমার ডিভোর্স হয়নি। আইনত বিয়ে অসম্ভব। আর শরিয়ত মতে বিবাহ অবৈধ।”

“তাহলে কোর্টে চল, তোর ডিভোর্স ফাইল করাই।”

“ক্লাস শেষ করে তারপর যাব।”

হৃদয় প্রথমবারের মতো নয়নার হাত ধরে বলল, “তুই সত্যি আমাকে বিয়ে করবি তো? দেখ, আমি তোর অতীত জানতে চাই না। আমি শুধু চাই আমার সাথে তোর একটা সুন্দর ভবিষ্যৎ। আমি বাবা-মায়ের একমাত্র ছেলে। প্রথমে তারা একটা ডিভোর্সি মেয়েকে মেনে নিতে চাইবে না। কিন্তু আমার সুখের জন্য সব মানবে।”

নয়না স্থির হয়ে দাঁড়াল। তার মাথার উপর উত্তপ্ত সূর্য। এক পলক হৃদয়ের দিকে তাকিয়ে বলল, “তোর হৃদয়টা অনেক বড়। এবার ক্লাসে চল। ভবিষ্যৎ এখন ভাবতে হবে না। দ্রুত চল, স্যার চলে আসবে।”

জিয়ান সেই কখন থেকে গেটের বাইরে দাঁড়িয়ে আছে। অনিকেতের কাভার্ড থেকে হোয়াইট শার্ট আর কালো প্যান্ট পরে এসেছে। চোখে সানগ্লাস।

কয়েকজন মেয়ে বের হওয়ার সময় আড়চোখে জিয়ানের দিকে তাকাচ্ছে। জিয়ান সেদিকে ভ্রূক্ষেপ করছে না। অপেক্ষা করতে করতে অবশেষে অপেক্ষার প্রহর শেষ হল। নয়না গেট দিয়ে বাইর হচ্ছে। নয়না জিয়ানকে দেখে হৃদয়ের হাতের মধ্যে হাত রেখে হাঁটছে।

জিয়ান হুট করে এসেই নয়নাকে কোলে তুলে নিল।

নয়না বলছে, “ছাড়ুন, নয়তো চিৎকার করব।”

জিয়ান লম্বা পা ফেলে হাঁটছে আর বলছে, “দেখি তোমার গলায় কত জোর আছে। শুরু করো।”

“মানুষ জড়ো হলে কিন্তু গণধোলাই খাবেন।”

“ওকে ম্যাডাম, আমি প্রস্তুত।” জিয়ান গাড়ির দরজা খুলে নয়নাকে ভেতরে বসিয়ে বলল, “একদম নড়বে না, তাহলে কিন্তু এখানে হানিমুনে সেরে ফেলব। তুমি তো জানোই আমার কোনো লজ্জা-শরম নেই।”

গাড়ির দরজা বন্ধ করতে যাবে, সেই মুহূর্তে হৃদয় গাড়ির দরজা ধরে বলল, “কে আপনি? কী সমস্যা আপনার? আমার হবু বউকে স্পর্শ করার সাহস কে দিয়েছে! এখন ভার্সিটিতে থেকে পোলাপান ডেকে এনে হাত-পা ভেঙে ব্যাগে ভরে দিব।”

জিয়ান হৃদয়ের দিকে তাকিয়ে বলল, “তুই কে বে? আমার বউ আমার সম্পদ তোর কবে থেকে হল! এখান থেকে সরে দাঁড়া, নয়তো নিজের নাম ভুলে যাবি।”

হৃদয় আর জিয়ান মিলে তর্কাতর্কি শুরু করল। এই ফাঁকে নয়না টুপ করে বের হয়ে রিকশায় উঠে কেটে পড়ল। হৃদয় বিষয়টা খেয়াল করে তর্ক আরও বাড়িয়ে দিল।

নয়নার রিকশা চোখের আড়াল হতেই হৃদয় বলল, “এক্সের চেয়ে নেক্সট অলওয়েজ বেটার। গুড বাই, আঙ্কেল।” হৃদয় কথাটা বলেই এক দৌড় মারল।

জিয়ান বলল, “শা’লা! আমি তোর আঙ্কেল হলে আমার বউ তোর মা লাগে। আর একবার তোকে পাই হাতের সামনে, মা না ডাকিয়ে ছাড়ব না।”

চলবে

Share On:

TAGS: ,



CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
Related Posts
 

0 Responses

Leave a Reply