Golpo romantic golpo অর্ধাঙ্গিনী গল্পের লিংক সিজন ২

অর্ধাঙ্গিনী সিজন ২ পর্ব ৩৫


অর্ধাঙ্গিনী ( দ্বিতীয় পরিচ্ছদ)

নুসাইবা_ইভানা

পর্ব -৩৫

থলামুয়ানা জিয়ানের মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে বললেন, “জীবনে ভুল আছে বলেই মানুষ সঠিক কাজটা করতে পারে। ভুল না থাকলে কোনটা সঠিক আর কোনটা ভুল কী করে বুঝতাম আমরা?”

“আমি তো শুধু ভুল করিনি, অপরাধ করেছি।”

“অবশ্যই তুমি অপরাধ করেছো। কেন চলে গেলে ওভাবে? ভালোবাসার মানুষের কাছে ছোট হতে কিসের দ্বিধা? তুমি মানা করেছ, নয়না শোনেনি। তুমি চলে আসতে বলেছিলে না। মান-অভিমান কিছুদিন চলত, তারপর ভালোবাসা সব মান-অভিমান দূর করে দিত। পায়ে পড়ে ক্ষমা চাইতে যেভাবেই হোক মানিয়ে নিতে। সামনের মানুষ তোমাকে ভালোবাসে আর ভালোবাসা তো শক্তি। সে কখনো তোমাকে ফিরিয়ে দিতে পারত না।”

“এখন আমি কী করব, চাচাজান?”

“এখন তুমি নতুন করে শুরু করো।”

“আমার পক্ষে নতুন করে শুরু করা সম্ভব না। আমি খোঁজ রেখেছিলাম, কিন্তু সে তো আমাকে বলেনি আমার সন্তানের কথা।”

“দূর থেকে খোঁজ রাখা যায়। কিন্তু অন্যের ওপর ভরসা করে বসে থাকা যায় না। তোমার নিজের উপস্থিতির দরকার ছিল। এখন পথ তোমার নিজের তৈরি করতে হবে।”

জিয়ান উঠে বসল। আকাশে অর্ধচন্দ্র। জিয়ান দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলল, “আমি আবার সুনয়নার প্লেন ড্রাইভার হতে চাই।”

থলামুয়ানা কিঞ্চিৎ হাসলেন। এরপর মৃদু স্বরে বললেন, “তাহলে সে পথ তৈরি করো। এমনভাবে লক্ষ্যের দিকে এগিয়ে যাও যাতে গন্তব্য ভুল না হয়।”

জিয়ান শোয়া থেকে উঠে শার্ট পরল।

থলামুয়ানা জিয়ানের হাত ধরে বললেন, “খেয়ে যাও। শরীরে শক্তি না থাকলে লড়াই করবে কী করে!”

দুজনে একসাথে খেতে বসেছে। জিয়ান বলল, “এখানে থাকতে আপনার কোনো অসুবিধা হয় না তো?”

“নাহ, বরং সুবিধা হচ্ছে। সুনয়না যখন জানবে খুশি হবে।”

“ওর সাথে আপনার কথা হয়নি?”

“নাহ, এক বছর ধরে যোগাযোগ করতে পারিনি।”

জিয়ান আর কিছু না বলে খাবারে মনোযোগ দিল।

🌿 নয়না, সায়না, অনিকেত সবাই ছাদে বসে আছে।

অনিকেত বলল, “জিয়ান আমাকে কল করেছিল। আজকের রাতটা আমাদের বাসায় থাকতে চাইছে।”

নয়না বলল, “তাহলে আমি চলে যাব বাসায়। আমাকে দিয়ে এসো, ভাইয়া।”

সায়না বলল, “বোকা মেয়ে, তুমি এত ভীতু কেন! শোনো, সবচেয়ে বড় শাস্তি হলো ইগনোর। জিয়ান তোমার সামনে উপস্থিত, কিন্তু তুমি এমন ভাব করবে যেন জিয়ান বলতে কেউ তোমার চোখের সামনে নেই। তুমি যদি এরকম পালিয়ে বেড়াও, তাতে প্রমাণ হবে এখনো তোমার মনে তার জন্য দুর্বলতা আছে।”

নয়না চুপ করে থেকে বলল, “ভাইয়া, তোমার কি মাথায় কোনো বুদ্ধি-শুদ্ধি নেই! এরকম মানুষকে কেন বন্ধু বানাতে হয়!”

অনিকেত হেসে বলল, “স্বামী হিসেবে খারাপ হলেও বন্ধু হিসেবে কিন্তু জিয়ানের তুলনা হয় না।”

“নিজের বোনের শত্রুর সাথে বন্ধুত্ব রক্ষা করবে এখন!”

“কী জানি, আমার মন তো অন্য কিছু বলে।”

“কী বলে?”

“বললে আমার পিঠে উত্তম-মধ্যম পড়বে।”

“জানোই যখন-তখন এমন উল্টোপাল্টা চিন্তা রাখো কেন মাথায়?”

অনিকেত নয়নার ফোনটা হাতে নিয়ে বলল, “বাহ্, বোন তো আমার সেলিব্রিটি হয়ে গেছে। তা সেলিব্রিটি সুনয়না, ব্লগ কবে আপলোড করবেন? এক গানে দশ মিলিয়ন ভিউ!”

নয়না অনিকেতের হাত থেকে টান দিয়ে মোবাইলটা নিয়ে বলল, “এসব হয়েছে তোমার জন্য। মেসেজ রিকোয়েস্টে ভরে গেছে ইনবক্স। ছেলেগুলোর কি কোনো কাজ-কাম নেই! মেয়ে দেখলেই হুমড়ি খেয়ে পড়ে।”

“সিঙ্গেল ছেলেদের একটাই কাজ—সুন্দরী মেয়ে দেখলে সুযোগ নেওয়ার চেষ্টা করা। এক কাজ কর—”

নয়না অনিকেতের দিকে তাকিয়ে বলল, “কী?”

অনিকেত ফটাফট দুটো পিক তুলে বলল, “এখন এই পিক দুটো আপলোড করব তোকে ট্যাগ করে।”

“ভাইয়া, এসব একদম ঠিক না।”

এর মধ্যেই কলিং বেলের আওয়াজ কানে এল।

নয়না বলল, “রাত বারোটা বাজে, শয়তান দরজায় এসে হাজির।”

অনিকেত আলতো করে সায়নার হাত চেপে ধরল। সায়না চোখ গরম করে অনিকেতের দিকে তাকাল।

ওদিকে কলিং বেল বেজেই চলেছে।

নয়না বলল, “বাজুক, শয়তানকে ঘরে ঢোকানোর দরকার নেই।”

অনিকেত বলল, “তুই যদি দরজাটা খুলে দিস তাহলে এই পিক আপলোড করব না। বউয়ের সাথে আরাম করে বসেছি, উঠতে ইচ্ছে করছে না। তুই না ভালো ননদ প্রমাণ কর।”

নয়না কপাল কুঁচকে অনিকেতের দিকে তাকিয়ে বলল, “ঘরের শত্রু বিবিসন। মনে রেখো, আম্মুর কাছে বিচার দেব।”

“যাহ্ নাহ্, আমার একটু ইম্পর্ট্যান্ট কথা আছে বউয়ের সাথে।”

নয়না লম্বা লম্বা পা ফেলে চলে এল।

সায়না অনিকেতের গলা চেপে ধরে বলল, “এসব কী ছিল?”

“গলা ছাড়ো, মরে যাব তো!”

“তাহলে বলো, এসব কী ছিল?”

“আম্মুর সাথে কথা হয়েছিল। আম্মু বলল, ওদের কিছুটা সময় দিতে। কারণ নয়না তো আজ পর্যন্ত মুভ অন করতে পারেনি। সব সময় মনমরা হয়ে থাকে। সব সময় মিথ্যে ভালো থাকার অভিনয় করে। রাতের পর রাত মেডিসিন নিয়ে ঘুমাতে হয়। এভাবে কতদিন চলবে? হয়তো ওদের মধ্যে সব ঠিক হবে, নয়তো সব একেবারে শেষ হবে। এভাবে তো বাঁচা যায় না। আমি, তুমি, আম্মু, মাহবুব তালুকদার—সবাই সারাক্ষণ নয়নাকে হাসিখুশি রাখার চেষ্টা করি। কিন্তু কতটা পারি? রাত মানেই ওর জন্য যন্ত্রণা। আমার বোনটা এই যন্ত্রণা থেকে মুক্তি পাক। এর জন্য আমাকে যা কিছু করতে হয় করব।”

সায়না অনিকেতের ঠোঁটে নিজের ঠোঁট ছুঁইয়ে বলল, “তোমার মতো ভাই পাওয়াটা ভাগ্যের না, সৌভাগ্যের।”

অনিকেত দু’হাতে সায়নাকে আঁকড়ে ধরল। হারিয়ে গেল সায়নার ঠোঁটের সুধাপানে।

নয়না দরজা খুলতেই জিয়ান হড়বড় করে প্রবেশ করল।
সেই চিরচেনা ঘ্রাণটা নাকে এসে লাগল নয়নার—Dior Sauvage Parfum। এই ঘ্রাণটা নয়নার চিরচেনা।

জিয়ান নয়নার দিকে তাকিয়ে বলল, “আলিয়া ভাট বলতে বলতে দেখছি নিজেকে তুমি সত্যি আলিয়া ভাট বানিয়ে ফেলেছ! বাহ্, কী বডি, কী ফিগার! আমি তো ঘায়েল।”

নয়না দ্রিম করে দরজা বন্ধ করে বলল, “অসভ্য। বাইরের দেশে থাকতে থাকতে লুচ্চা হয়ে গেছে।”
নয়না বড় বড় পা ফেলে আবার বারান্দায় এল। বারান্দার কাছাকাছি আসতেই দ্রুত ঘুরে দাঁড়াল।

জিয়ান বলল, “সরো।”

নয়না সাথে সাথে জিয়ানের চোখ ধরে বলল, “সামনে দেখা বারণ।”

“এত চোরের মতো মিনমিন করে কথা বলছ কেন! এতক্ষণ তো চটাং চটাং কথা বলেছ। চোখ ছাড়ো দেখি কী হচ্ছে।”

জিয়ান নয়নার হাত সরিয়ে সামনে তাকিয়ে বলল, “লা হাওলা ওয়ালা কুওয়াতা ইল্লা বিল্লাহ। বন্ধু দেখি বুড়ো বয়সে খুল্লাম খুল্লা রোমান্সে মগ্ন।”

জিয়ানের কণ্ঠ শুনে সায়না দ্রুত সরে গেল।

অনিকেত জিয়ানের দিকে তাকিয়ে বলল, “দেখিস যখন চুপচাপ চলে যেতে পারলি না? ডিস্টার্ব করলি কেন, শালা?”

জিয়ান নয়নার হাত ধরে বলল, “ওকে, তোরা কন্টিনিউ কর। দেখি আমারও কোনো ব্যবস্থা হয় নাকি।”

🌿 মিতা বেগম বসে বসে কাঁদছেন। নাজিম চৌধুরী বললেন, “তোমার এসব নাটক দেখতে দেখতে আমি বোর হয়ে গেছি, মিতা। এসব মায়াকান্না দেখলে বিরক্ত লাগে।”

মিতা বেগম কান্নারত অবস্থায় বললেন, “আমার চোখের পানি তোমার কাছে নাটক মনে হয়? তোমার কি মনে হয় আমার মধ্যে মায়া-মমতা কিছু নেই?”

নাজিম সাহেব বললেন, “না, নেই। তুমি একজন স্বার্থপর মহিলা। নিজের স্বার্থের জন্য তুমি তিন তিনটা জীবন নষ্ট করে দিয়েছ। অপরাধী যেই হোক, তার পরিচয় সে অপরাধী। কিন্তু তুমি ছোটবেলা থেকে জাহিনের অন্যায়কে প্রশ্রয় দিয়েছ। ছোট থেকে শাসন করলে আজ জাহিনের পরিণতি এমন হতো না। এত বছর পর ছেলেটা ফিরে এসেছে, তুমি তার কোলে জাহিনের সন্তানকে তুলে দিয়ে বললে—‘এই ছেলেকে নিজের ছেলে মনে করে মেহনুরের সাথে নতুন জীবন শুরু করো!’ ছিঃ ছিঃ, মিতা। আমার ভাবতেও ঘৃণা হচ্ছে তোমার মতো। মানুষের সাথে জীবনের এতগুলো বছর নষ্ট করেছি! ছেলেটাকে কাছে ডেকে তার দুঃখের কথা শুনতে পারতে, তার দুঃখ দূর করার চেষ্টা করতে পারতে। কিন্তু না, তুমি সব সময় সেটাই করবে যেটা তুমি চাও। আমার পক্ষে তোমার সাথে এক ঘরে থাকা সম্ভব না। আমি যত দ্রুত সম্ভব এই দেশ ছেড়ে চলে যাব। এরপর তুমি তোমার মতো থেকো।”

মিতা বেগম বললেন, “সব দোষ শুধু আমার? তোমার দোষ নেই? তুমি ছোটবেলা থেকে জাহিনকে অবহেলা করে এসেছ। এর জন্য জাহিনের প্রতি আমার ভালোবাসা বরাবরই বেশি। আমি জানি জাহিনের ভালোবাসায় আমি অন্ধ হয়ে জিয়ানকে কষ্ট দিয়েছি। কিন্তু কী করতাম? আমি ওই মেয়েকে দেখলেই মনে হতো—এই মেয়েটা আমার কোল খালি করেছে।”

“আর তোমার ছেলে যে মায়েদের কোল খালি করেছে, তাদের হিসাব কে কষবে, মিতা? আমি জাহিনকে অবহেলা করতাম না, শাসন করতাম। কিন্তু আর কেউ না জানুক, তুমি তো জানো অতিরিক্ত শাসন করার কারণটা কী। সাত বছর বয়সেই খুন করেছিল বাড়ির দারোয়ানকে।”

“ওতুকু ছেলে খুনের কী বোঝে?”

“একজন বৃদ্ধ লোককে ইঁদুরের ওষুধ খাওয়ানো কি ছোট অন্যায়?”

“ও একটা অবুঝ শিশু ছিল।”

“প্লিজ, মিতা। আমার চোখের সামনে থেকে সরে যাও। তোমাকে অসহ্য লাগছে।”

চলবে

Share On:

TAGS: ,



CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
Related Posts
 

0 Responses

Leave a Reply