Golpo romantic golpo অর্ধাঙ্গিনী গল্পের লিংক সিজন ২

অর্ধাঙ্গিনী সিজন ২ পর্ব ৩৩


অর্ধাঙ্গিনী ( দ্বিতীয় পরিচ্ছদ)

নুসাইবা_ইভানা

পর্ব -৩৩

নয়না কপাল কুঁচকে পেছনের দিকে তাকিয়ে বলে, “কে আপনি? পাবলিকের গণধোলাই খাওয়ার শখ জেগেছে নাকি আপনার? কোনো ভদ্র পুরুষ মেয়েদের হিজাবে টাচ করে না।”

“কে বলল আমি অভদ্র? অভদ্র হয়েছি তোমারই কারণে।”

নয়না হৃদয়ের হাত শক্ত করে ধরল। তারপর বলল, “হিজাব ছাড়ুন। লজ্জা করে না রাস্তাঘাটে মেয়েদের ডিস্টার্ব করতে? আর কে আপনি?”

জিয়ানের চোখে রাগ স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে। বাঁ হাতে মাস্ক সরিয়ে বলে, “এবার চিনতে সমস্যা হবে না নিশ্চয়ই। আপনিই বলুন, ম্যাডাম, কে আমি?”

“ইভটিজার? রাস্তাঘাটে মেয়েদের হিজাব ধরে টানাটানি করছেন, আবার বুক ফুলিয়ে চেহারা দেখাচ্ছেন! নিজেকে হিরো ভাবছেন!”

নয়না হিজাব ছাড়িয়ে নিয়ে বলে, “হ্যালো মিস্টার ইভটিজার, নিজের রাস্তা মাপুন। নয়তো পাবলিকের গণধোলাই মিস হবে না।”

জিয়ান ফট করে হৃদয়ের হাতের মধ্য থেকে নয়নার হাত সরিয়ে নিল। হৃদয়ের দিকে রক্তচক্ষু নিয়ে তাকিয়ে বলে, “ভুলেও এরকম দুঃসাহস করার কথা চিন্তাও করবি না। একদম পুঁতে ফেলব।”

নয়না জিয়ানকে ধাক্কা দিয়ে বলে, “কী বংশগতভাবে গুন্ডা? মাস্তানি করতে ইচ্ছে করলে অন্য কোথাও করুন। এটা কোনো মাস্তানি করার জায়গা না।”

হৃদয় বলল, “এই লোকটা কে চিনিস?”

নয়না শান্ত স্বরে বলল, “এক্স।”

হৃদয় জিয়ানের দিকে তেড়ে গিয়ে বলে, “প্রেজেন্টের সামনে এক্সের কোনো ভ্যালু নেই। সো মিস্টার এক্স ভাইয়া, নিজের পথে চলুন। আমার পথে বাধা দেবেন না।”

জিয়ান নিজের রাগ সংযত করে বলে, “আমি কী করব আর কী করব না, সেটা বলার তুই কে?”

“সরি ব্রো, এক্সের হ্যাঁ/না বলার অধিকার নেই। সো আপনি কোনো অ্যানসার পাবেন না।”

জিয়ান নয়নার হাত ধরে নিজের দিকে টেনে এনে বলে, “এই ভার্সিটির মাঠে তোমার ঠোঁটে চুমু খেয়ে প্রমাণ করতে হবে আমি তোমার কে। সহজ চুমু কিন্তু আমি খাব না। কোমর ধরে নিজের সাথে জড়িয়ে নিয়ে কঠিন চুমু খাব—তাও এই খোলা মাঠে, সকলের সামনে। তারপর চিৎকার করে বলব, আমি তোমার কে।”

নয়না ঝাঁকুনি মেরে নিজের হাত ছাড়িয়ে নিয়ে বলে, “পাগলদের জন্য পাবনা মেন্টাল হসপিটাল। এটা কোনো পাগলামি করার জায়গা না। আর সেই অধিকার আপনি অনেক আগেই হারিয়ে ফেলেছেন। উড়ে এসে জুড়ে বসা যায় না। প্লিজ আমাকে ডিস্টার্ব করবেন না।”

জিয়ান হুট করে নয়নার গালে চুমু দিয়ে মুহূর্তেই সরে গিয়ে বলে, “পাগল বলো না, বাটার মাশরুম। পাগল কিন্তু স্থান-কাল বোঝে না। পাগলামি শুরু করলে সামলাতে হিমশিম খাবে।”
বলেই চোখ টিপল।

নয়না জিয়ানের দিকে রাগী দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলে, “অসভ্য।”
বলেই হৃদয়ের হাত টেনে নিয়ে চলে যাচ্ছে।

জিয়ান তাকিয়ে তাকিয়ে দেখছে। ইচ্ছে করছে ছেলেটাকে কতক্ষণ ধরে পেটাতে পারলে তার মেজাজ ঠান্ডা হতো। মনে মনে বলে, “পাগল মেয়ে আমাকে বলে আমি এক্স। আমি এক্সই নেক্সট।”

সামনের দিকে গিয়ে আবার বাইক নিয়ে ছুটে চলল। গন্তব্য এখন অনিকেতের বাসা।

হৃদয় বলল, “তোর আবার এক্স জন্ম হলো কবে? এদিকে আমাকে পাত্তা দিস না। কথায় কথায় বলিস আমার সেম এজ রিলেশন পছন্দ না। তলে তলে এক্সও আছে। বাহ্‌ নয়না, বাহ্‌! অভিনয়ের জন্য নয়না সেরা রে!”

নয়না হাতের ব্যাগ দিয়ে হৃদয়ের পিঠে মেরে বলে, “নাটক কম কর। ওটা আমার হ্যাজব্যান্ড। আমার এক্স। নেক্সট কিছু দরকার নেই।”

হৃদয় থমকে দাঁড়িয়ে বলে, “এই, তুই মিথ্যে বলছিস, তাই না? এইটুকু মেয়ের আবার হ্যাজব্যান্ড! তা কোনো মেয়ে নিজের হ্যাজব্যান্ডকে গণধোলাইয়ের ভয় দেখায়? হুট করে এই হ্যাজব্যান্ড কি আকাশ থেকে টপকে পড়ল?”

নয়না বলল, “ঠিকই বলেছিস, শালা আকাশ থেকেই টপকেছে। বুঝতে পারছি না। প্লেন থেকে জমিনে কেন নেমে এলো! শোন, আজ আমি ক্লাস করব না। আমার একটা দরকারি কাজ আছে, আসি।”

“কই যাবি?”

“ডিভোর্স ফাইল করতে।”
বলেই হনহন করে চলে গেল।

হৃদয় বোকার মতো তাকিয়ে রইল। কী হলো! নয়নার এক্স হ্যাজব্যান্ড—এটা কি সত্যি? নাকি আমার কাছ থেকে পিছু ছাড়ানোর জন্য মিথ্যে নাটক? বিয়েই বা হলো কবে! সুন্দরী মেয়েরা কি সিঙ্গেল থাকে না!

🌿

আজ তুষির তৃতীয় মৃত্যুবার্ষিকী। অন্তর তুষীর জন্য একটা এতিমখানায় দোয়ার অনুষ্ঠান রেখেছে। সাদা পাঞ্জাবি, সাদা পাজামা, সাদা টুপি মাথায় অন্তর দাঁড়িয়ে আছে তুষির কবরের পাশে। তুষির কবরের পাশে এসে দাঁড়ালে মনে হয় তুষি তার দিকে তাকিয়ে হাসছে। মুচকি হেসে তার সাথে কথা বলছে। একদৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে কবরের দিকে। যেন চোখ সরালেই তুষীকে হারিয়ে ফেলবে।

আচ্ছা, সেদিন রাতে যদি তুষিকে সাথে করে নিয়ে যেত, তাহলে তো এই পৃথিবীতে তাদের একটা সুখী সংসার হতো।

অন্তর হাঁটু মুড়ে বসে পড়ল কবরের পাশে। কবরের মাটি ছুঁয়ে বলে, “এই শহরে তোমার-আমার ভালোবাসার সংসার হলো না। তুমি বলেছিলে, তুমি চিৎকার করে বলতে চাও তুমি আমার বউ। অথচ আজ সব চিৎকার শুধু আমার হাহাকার। আমি তোমাকে আমার করে রাখতে পারলাম না। আমি তোমাকে আগলে রাখতে পারলাম না। তুমি আমার হয়েও আমার হলে না। কেন এভাবে আমাকে ফাঁকি দিয়ে চলে গেলে?”

নয়না অন্তরের কাঁধে হাত রেখে বলে, “ভাইয়া, এভাবে ভেঙে পড়বেন না। যে চলে যায়, তার জন্য দোয়া করুন। বেঁচে থাকলে আপনাকে এত কষ্ট পেতে দেখলে কত কষ্ট পেত মানুষটা। তার কথা ভেবে অন্তত নিজেকে ভালো রাখুন।”

নয়না অনেকগুলো বেলিফুল রাখল তুষির কবরের পাশে। “তোর তো বেলি ফুল পছন্দ। দেখ, তোর জন্য তোর পছন্দের ফুল নিয়ে এসেছি।”

অন্তর বলল, “সবকিছু এভাবে শেষ না হলেও পারত?”

“ভাইয়া, জীবন, মৃত্যু, জন্ম—এসবের কোনোটাই আমাদের হাতে নেই। আল্লাহ তায়ালা যা ঠিক করে রেখেছেন, তাই হবে। হায়াত শেষ হলে বেঁচে থাকার আর কোনো রাস্তা নেই।”

“আমার হায়াত কেন শেষ হচ্ছে না? আমি আর বাঁচতে চাই না।”

“বেঁচে আছেন বলেই এভাবে বলছেন। বেঁচে থাকাটা নেয়ামত। মরে যাওয়া মানেই শেষ। তাই যতদিন বেঁচে আছেন, ভালোভাবে বাঁচুন। আপনার জন্য আমি মেয়ে দেখব? বিয়ে করবেন?”

অন্তর আর কোনো উত্তর দিল না। হেঁটে চলে গেল।

নয়না কিছুক্ষণ সেভাবেই বসে রইল। শেষবারের মতো তুষির সাথে তার কথা হয়নি। না অভিযোগ, না অভিমান—কোনোটাই প্রকাশ করা হয়নি। অথচ কত কথা বলার ছিল। এজন্মে আর কোনোদিন তুষীর সাথে কথা হবে না। মৃত্যু যেন মানুষকে মুছে দেয়। অথচ স্মৃতিগুলো তাজা হয়ে রক্ত ঝরায়।

নয়না দ্রুত পায়ে অন্তরের পিছু নিল।

অন্তর পিছনে না ফিরে বলল, “আমি এই কান্না লুকিয়ে হাসতে চাই, আমি এই জীবন লুকিয়ে বাঁচতে চাই।”

নয়না চুপ করে রইল। এই কথার গভীরতা অনেক। এর উত্তর দেওয়ার মতো শব্দ সে খুঁজে পেল না।

দুজনে চলে গেল দুজনের গন্তব্যে।

নয়না গাড়িতে উঠে ড্রাইভারকে বলল, “ভাইয়ার বাসায় চলুন।”

“অনিকেত স্যারের বাসায়?”

“হুম।”

নয়না নিজের সেই গানের ভিডিও দেখল। বাপরে! ছোটখাটো সেলিব্রিটি মনে হচ্ছে নিজেকে। এমন কাকের গলায় কী এমন পেল মানুষ!

নয়না নিজের ফোন বের করে অনিকেতকে কল করার জন্য নাম্বার ডায়াল করল। সাথে সাথে ফোনটা বন্ধ হয়ে গেল। নয়না বিরক্তি নিয়ে বলে, “তিন বছর পর এসেছে আমার শান্তি নষ্ট করতে। কত কষ্ট করে নিজের জীবনটা গুছিয়ে নিয়েছিলাম। আসছে আবার এলোমেলো করতে। বদ লোক, এই লোকের জন্যই রাতে ফোনে চার্জ দিতে পারিনি।”

নয়না মোবাইলের স্ক্রিনে নিজের চেহারা দেখে বলে, “নয়না, মোটেও পাত্তা দিবি না। পুরোনোকে ভুলে যা। নতুন করে শুরু করেছিস সবকিছুতে নতুনত্ব আন। তুই পারবি, নয়না। তোকে পারতেই হবে। ইশশ! আজ আসছে চুমু খেতে—এতদিন কাকে চুমু খেয়েছে, তার কাছে যাক।”

গাড়ি এসে থামল অনিকেতের বাসার সামনে। নয়না ড্রাইভারকে বলল, “আপনি বাসায় চলে যান। আম্মুকে বলবেন, আজ আমি বাসায় ফিরব না।”

🌿

জিয়ান কিছুক্ষণ আগেই অনিকেতের বাসায় এসেছে। অনিকেতের মেয়ে মাহিকে কোলে নিয়ে দুষ্টুমি করছে।

সায়না অনেকবার বলেছে, “ভাইয়া, তুমি চলে যাও। আমার স্বামী তোমাকে পছন্দ করে না।”

জিয়ান হেসে বলে, “ওকে, আপি। আমি তো আপনার বাসায় আসিনি। ভাবি, আমি এসেছি আমার বন্ধুর বাসায়। আমার বন্ধু ফিরলে পছন্দ-অপছন্দ আমরা বুঝে নেব। ভাবি, প্লিজ নাস্তার ব্যবস্থা করুন। দেবরদের খাতির-যত্ন করতে হয়, জানেন না?”

“তোমার ফুপিকে কল করে বলছি, তার ভাইয়ের ছেলে আমার সংসারে অশান্তি করছে।”

“ভাবি, আপনার সাথে আমার অন্য কোনো সম্পর্কে নেই। এই মুহূর্তে আমি শুধু আপনার হ্যাজব্যান্ডের বন্ধু।”

এর মধ্যেই কলিং বেল বেজে উঠল।

জিয়ান মাহিকে কোলে নিয়ে বলে, “ভাবি, জুস বানান। আমি দেখি কে এল!”

চলবে

Share On:

TAGS: ,



CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
Related Posts
 

0 Responses

Leave a Reply