অর্ধাঙ্গিনী ( দ্বিতীয় পরিচ্ছদ)
নুসাইবা_ইভানা
পর্ব -৩২
জিয়ান চোখ বন্ধ করতেই হুট করে মনে পড়লো, সে বাংলাদেশে। এই কথা তো কেউ জানে না। তাহলে ওপাশের মানুষটা কি সুনয়না ছিল?
জিয়ান মোবাইল হাতে নিয়ে দ্রুত টাইপ করে, “আমার তোমার সাথে কিছু কথা আছে। কল করছি, রিসিভ করো দ্রুত।”
রিপ্লাইয়ের অপেক্ষায় পুরো রুম জুড়ে পায়চারি করতে লাগলো। একেক সেকেন্ড যেন একেক ঘণ্টা মনে হচ্ছে জিয়ানের কাছে! গুনে গুনে চারশ পঁচিশ সেকেন্ড পর রিপ্লাই এলো।
“আচ্ছা, এই সুনয়নাকে কি তুমি কখনো ভুলতে পারবে না! যাকে তাকে সুনয়না বানিয়ে দিচ্ছো!”
“আমি জানি তুমি সুনয়না। যদি সত্যি তুমি সুনয়না না হয়ে থাকো তাহলে কল করো।”
“আমি মেহনুর।”
“মিথ্যে বলছো।”
নয়না সুচনাকে ডেকে এনে সবটা বুঝিয়ে দিয়ে কল করলো।
রিসিভ হতেই জিয়ান বলে,
“স্যরি তোমার সঙ্গে থাকতে না পারার জন্য, স্যরি তোমাকে রেখে চলে যাওয়ার জন্য। স্যরি আমার করা প্রতিটি অন্যায়ের জন্য!”
“ডার্লিং, আপনি কি স্যরির গাছ লাগিয়েছেন!”
“কে তুমি?”
“বলুন ‘কে তুমি নন্দিনী? আগে তো দেখিনি।’ বাই দ্য ওয়ে, পাইলট রেজা চৌধুরী, আমি আপনার হবু ওয়াইফ। আপনার আম্মু এই নম্বরটা অনেক আগে দিয়েছিল। কাল রাতে হুট করে টেক্সট সেন্ট হলো।”
“কে আপনি?”
“আমি আপনার হিরোইন। আপনি আমার একমাত্র হিরো।”
জিয়ান রেগে বলে,
“আপনি হয়তো জানেন না, আমি বিবাহিত। আর হ্যাঁ, ভদ্রতা শিখুন।”
বলেই কল কেটে দিলো।
কল কাটতেই দুজনে জোরে জোরে হাসতে লাগলো। হাসতে হাসতে দু’বোন গড়াগড়ি খাচ্ছে।
নয়না হাসতে হাসতে টাইপ করলো:
“তুই আমার হিরো, বাকি সব জিরো। আমার মতো ভালো মেয়ে হারালে কাঁদতে হবে আড়ালে।”
জিয়ানের এত রাগ হচ্ছে, ইচ্ছে করছে ফোনের ভেতর থেকে মেয়েটাকে টেনে এনে দুই-চারটা চড়-থাপ্পড় দিতে পারলে শান্তি লাগতো। সাথে সাথে ব্লক করে দিলো।
সূচনা বলল, “জিজু কিন্তু লয়াল আছে আপি।”
“তুই এসবের কী বুঝিস? নাক টিপলে এখনো দুধ পড়বে, সে এসেছে জ্ঞান দিতে।”
“আমি বড় হয়ে গেছি বুঝলা। বারো বছর, তেরো মাস, ছয় দিন আমার বয়স।”
নয়না কান টেনে বলে, “ওরে পাকা বুড়ি!”
দুজনে একসাথে এসে খাবার খেয়ে শুয়ে পড়লো।
নয়না আজ রাতে কিছুতেই ঘুমাতে পারবে না। পুরোনো প্রেম যেন নতুন করে জেগে উঠেছে তার হৃদয়ে। তার মানে জিয়ানের মনে এখনো তার বসবাস। তাকে কেউ সরাতে পারেনি জিয়ানের মন থেকে। এত ভালোবাসার পরেও কেন আমার হাত ধরে রাখার সাহস হলো না আপনার! ভালোবাসা বলতে কিছু নেই, ঘৃণা করি আমি আপনাকে।
🌿
রাতটা কোনোমতে পার হলো। ভোরের আলো ফোটার আগেই জিয়ান কালো শার্ট, কালো প্যান্ট, মুখে একটা কালো মাস্ক পরে দাঁড়িয়ে রইলো তালুকদার ম্যানশনের কাছাকাছি।
এত ভোরে কেউ নেই, মনে হচ্ছে সে চুরি করতে এসেছে। নিজেকে প্রফেশনাল চোর মনে হচ্ছে তার। এমন সময় তার ফোনটা বেজে উঠলো। জিয়ান অবাক হয়ে বলে, “এত ভোরে কে কল করলো!”
ফোন হাতে নিয়ে দেখে মিতা বেগমের নম্বর। এই মানুষটার প্রতি বিন্দু পরিমাণ শ্রদ্ধা নেই জিয়ানের মনে। কীভাবে সে নিজের দুধের ঋণ, গর্ভের ঋণ, বড় করে তোলার ঋণ আরো কত কত ইমোশনাল ব্ল্যাকমেইল করে বাধ্য করেছিল নয়নাকে ছেড়ে যেতে। বাবা-মা বোধহয় সবচেয়ে বেশি ইমোশনাল কার্ড খেলে। সব কিছুতে জিতে গেলেও কিছু মানুষ এই ইমোশনালের কাছে হেরে যায়।
ফোনটা বাজতে বাজতে কেটে গেল। আবার বেজে উঠলো সশব্দে। জিয়ান রিসিভ করে কানের সামনে ধরে বলে, “কিছু বলবেন? আমি খোঁজ নিয়ে দেখেছি আপনারা সবাই ভালো আছেন। মিথ্যে বলে আমাকে দেশে ফিরিয়ে এনেছেন।”
“এভাবে কথা বলছিস কেন বাবা! আমি কি তোর পর? নিজের মায়ের উপর এভাবে অভিমান করে থাকবি? ওই মেয়েটাই তোর জন্য সব!”
“আমি এসব বিষয়ে কোনো কথা বলতে ইচ্ছুক না। পৃথিবীতে সব মানুষ স্বার্থপর। তবে আমার ধারণা ছিল মায়ের ভালোবাসা ছাড়া পৃথিবীতে সব স্বার্থপরতায় ঘেরা। কিন্তু আপনি আমাকে বুঝিয়ে দিয়েছেন, জন্মদাত্রী মা স্বার্থপর হলে সেই সন্তানের জীবন ধ্বংস করে দেয়।”
“এভাবে বলিস না। আমি তোর জন্য সুনয়নার চেয়ে সুন্দরী মেয়ে খুঁজে দেব। বাসায় আয় বাবা। জারিফের জন্য আয়। ছেলেটাকে একটু ছুঁয়ে যা। তোর গায়ে ওর বাবার গন্ধ পাবে। রক্তের টান যে বড় টান।”
“চৌধুরী বাড়ি নামটা এখন আমার কাছে কাঁটার মতো। ওই বাড়ির স্মৃতি আমার হৃদয় এফোঁড়-ওফোঁড় করে দেয়। বারবার মনে হয় আমি কীসের শাস্তি পাচ্ছি? অন্যায় করলো একজন, শাস্তি পাচ্ছি আমি।”
“তোর ভাই তোর বউয়ের জন্য পৃথিবীতে নেই। তোর আপন ভাইয়ের মৃত্যুর জন্য দায়ী তোর বউ। কীভাবে তুই ওই মেয়ের সাথে সারাজীবন কাটাতিস বল আমাকে? ওই চেহারা দেখলেই তোর মনে তোর ভাইয়ের মরা মুখ ভেসে উঠত না!”
“আপনিও জানেন আর বাকি সবাই জানে, জাহিনের মৃত্যুতে নয়নার কোনো হাত নেই। নয়না কী করেছে? সাক্ষী দিয়েছে এই তো। কিন্তু সরকারের গোলামি করে একের পর এক অন্যায় কে করেছে? কত মানুষের জীবন নরক বানিয়ে দিয়েছে—গুম, খু’ন কোনটা না করেছে। শেষমেশ তুষির মতো একটা নিষ্পাপ মেয়েকে কী নির্মমভাবে না হ”ত্যা করেছে। বারবার নয়নার দোষ না খুঁজে জাহিনের দোষটা একবার দেখো। নিজের মনকে একবার প্রশ্ন করো—দোষটা কার। তোমার সন্তান হারিয়েছো, তাতে তোমার এত কষ্ট। যেই লোকগুলো গুম করে, খুন করে, মেঘনা নদীতে পেটে পাথর বেঁধে ডুবিয়ে দিয়েছে—তাদের পরিবারের কথা চিন্তা করো। ও যে পাপ করেছে, ওর মৃ”ত্যু হওয়া উচিত ছিল আরও নি”র্মমভাবে।”
মিতা বেগম ফোনটা কেটে দিলেন। ফজরের নামাজ শেষ করেই জিয়ানকে কল করেছিলেন। জায়নামাজে বসে মাথা নিচু করে কাঁদতে লাগলেন। সব বুঝেও যেন অবুঝ। সব মানে, তবুও বারবার জাহিনের কণ্ঠের আকুতি তার কানে বেজে উঠে, “আমি বাঁচতে চাই আম্মু, আমার জীবনটা ভিক্ষা দাও। আমি আমার সন্তানকে স্পর্শ করতে চাই। আমি এইটুকু জীবন চাই যেন আমার সন্তানকে স্পর্শ করতে পারি। আমি মরতে চাই না। আমাকে বাঁচাও আম্মু, আমাকে বাঁচাও।”
এই শব্দগুলো যেন তার কর্ণকুহরে প্রতিনিয়ত প্রতিধ্বনি করতে থাকে। এই শব্দের যন্ত্রণা তাকে ভেতর থেকে শেষ করে দিচ্ছে। মা হয়ে নিজের ছেলেকে বাঁচাতে না পারার যন্ত্রণা বয়ে বেড়াচ্ছে। এই যন্ত্রণার পরিমাপ করার ক্ষমতা কারো নেই—আল্লাহ ছাড়া।
🌿
অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে থেকে একটা রেস্তোরাঁয় এসে বসলো। তেল ছাড়া পরোটা আর একটা অমলেট অর্ডার করলো। নাস্তা শেষ করে পথের দিকে তাকিয়ে রইলো।
নয়না বের হয়েছে বাসা থেকে। তাই রেস্তোরাঁর সামনে এসে গাড়ি থামিয়ে হালুয়া আর পরোটা নিলো।
জিয়ান বাইক নিয়ে সাবধানে নয়নার পিছু পিছু ভার্সিটি পর্যন্ত এলো।
হৃদয় দাঁড়িয়ে আছে গেটের সামনে।
নয়না গাড়ি থেকে নামতেই এক গুচ্ছ হলুদ গোলাপ নয়নার দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বলে,
“সুপ্রভাত, মায়াবী চোখের অধিকারিনী।”
নয়না ফুলগুলো হাতে নিয়ে বলে,
“তোকে না কতবার বলেছি আমার সাথে ফ্লার্ট করবি না। তাহলে কিন্তু বন্ধুত্বও রাখব না।”
“রেগে যাচ্ছো কেন সুনয়না? তোমার মতো মিষ্টি মেয়েরা রেগে গেলে আরো মিষ্টি লাগে দেখতে।”
“তুই কি আমার হাতে মরতে চাস?”
“তোমার হাতে মরতে পারা তো আমার সৌভাগ্য।”
“হৃদয়ের বাচ্চা, উষ্টা খাবি।”
“আমি তোমায় ফুল দিলাম, বিনিময়ে তুমি আমায় মন দাও সুন্দরী। উষ্টা আবার কী!”
জিয়ান রাগে ফুঁসছে। ইচ্ছে করছে ছেলেটাকে ধরে কিল-চড় মারতে। কিন্তু ভার্সিটিতে কোনো ঝামেলা করা যাবে না। নিজের হাত মুষ্টিবদ্ধ করে নিজেকে শান্ত রাখার চেষ্টা করছে।
হৃদয় বলল, “এই দেখ তো, পাশের কালো শার্ট পরা ছেলেটাকে। মনে হচ্ছে তোর সাথে ফ্লার্ট করছি সেটা সহ্য করতে না পেরে রাগে ফুঁসছে! কিন্তু এই নতুন পাগল আবার কে! ভার্সিটির কেউ বলে তো মনে হচ্ছে না।”
নয়না এক পলক তাকিয়ে চোখ আর চুল দেখেই বুঝে গেল মানুষটা কে। নয়না হৃদয়ের হাত ধরে বলে, “চল, দেরি হচ্ছে ক্লাসের জন্য।”
জিয়ান নিজেকে আর কন্ট্রোল করতে পারল না।
নয়না কয়েক কদম সামনে এগোতেই পেছন থেকে নয়নার হিজাব টেনে ধরে বলে,
“এক পা-ও সামনে এগোবে না।”
চলবে
Share On:
TAGS: অর্ধাঙ্গিনী সিজন ২, নুসাইবা ইভানা
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
অর্ধাঙ্গিনী সিজন ২ পর্ব ২০+২১
-
অর্ধাঙ্গিনী সিজন ২ পর্ব ৩১
-
অর্ধাঙ্গিনী সিজন ২পর্ব ৬
-
অর্ধাঙ্গিনী সিজন ২পর্ব ৮
-
অর্ধাঙ্গিনী সিজন ২ পর্ব ২২+২৩
-
অর্ধাঙ্গিনী গল্পের সকল পর্বের লিংক সিজন ২
-
অর্ধাঙ্গিনী সিজন ২পর্ব ১৬
-
অর্ধাঙ্গিনী সিজন ২পর্ব ৭
-
অর্ধাঙ্গিনী সিজন ২পর্ব ১৪
-
অর্ধাঙ্গিনী সিজন ২পর্ব ১২