Golpo romantic golpo অর্ধাঙ্গিনী গল্পের লিংক সিজন ২

অর্ধাঙ্গিনী সিজন ২ পর্ব ২৮


অর্ধাঙ্গিনী ( দ্বিতীয় পরিচ্ছদ)

নুসাইবা_ইভানা

পর্ব -২৮

হোটেলের জানালার বাইরে সব সাদা তুষারের চাদরে ঢাকা শহর।
দেখলে মনে হবে, কেউ এক খণ্ড সাদা মেঘ এনে ঢেকে দিয়েছে পুরো শহর। ঘুম ভাঙতেই জিয়ান দ্রুত ড্রেস চেঞ্জ করে বেরিয়ে পড়ল ট্রেনিং ক্লাসের জন্য। সারাক্ষণ নিজেকে কাজে ডুবিয়ে রাখার তাড়া। ব্যস্ততা স্মৃতি ভোলার সবচেয়ে সহজ উপায়। জিয়ান সেটাকেই কাজে লাগাচ্ছে।

জিয়ান ইউনিভার্সিটির ফ্লাইট সিমুলেটর সেন্টারে ট্রেনিংয়ে এল। সবকিছু রুটিনমাফিক। জীবনটা যেন রোবোটিক ভাবে চলছে। প্রশিক্ষক প্রশংসা করলেন জিয়ানের ফোকাসের। কেউ জানে না, এই ফোকাস তৈরি হওয়ার পেছনের গল্প কতটা বেদনার।

বিরতিতে কফি হাতে জানালার পাশে দাঁড়িয়ে বাইরের দৃশ্য দেখছে জিয়ান। বরফ কাটার মেশিন দিয়ে রাস্তা, ঘর-বাড়ির বরফ কেটে পরিষ্কার করা হচ্ছে। জিয়ান কফির মগে চুমুক দিচ্ছে আর সামনের দৃশ্য উপভোগ করছে। ঠিক তখনই একজন রাশিয়ান মেয়ে পাইলট বলল, “পাইলট জিয়ান রেজা চৌধুরী, আপনি আজ ফ্রি?”

জিয়ান মিষ্টি হেসে বলল, “নাহ, আজ রেস্ট নেব। কাল আমার ফ্লাইট আছে।”

মেয়েটি কথা না বাড়িয়ে চলে গেল।

জিয়ানের সবচেয়ে ভালো লাগে—এই শহরে কেউ তাকে চেনে না। এই অচেনা হওয়াটাই যেন তার জন্য সবচেয়ে বড় স্বস্তি।

হঠাৎ ফোনে একটা নোটিফিকেশন।
জিয়ান অবাক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে টেক্সটের দিকে।

🌿

সকালে ঘুম থেকে উঠে নয়না ক্লাসে গেল। সারাটা দিন যেমন-তেমন ভাবে কেটে গেলেও বিকেল থেকে নয়নার মন বিষণ্ণতায় ছেয়ে গেল।

সন্ধ্যাবেলা এক কাপ চা হাতে নয়না ছাদে উঠে গেল। শহরের আলো জ্বলছে, আকাশ পরিষ্কার। বৃষ্টি নেই আজ। অদ্ভুতভাবে বৃষ্টি নেই—এটা ভেবে তার মনটা আরও ভারী লাগছে। মনে হচ্ছে, এখন ঝুম বৃষ্টি হলে মনটা হালকা হতো। নয়না ঝকঝকে আকাশের দিকে তাকিয়ে বলে, “কিছু মানুষ বৃষ্টির মতো। থাকলে ভালোবাসায় ভেজায়, না থাকলে ভালোবাসার অভাবে শুকিয়ে মরুভূমি বানিয়ে দেয়।”

নয়নার ভাবনার মাঝেই তার ফোনের নোটিফিকেশন বেজে উঠল।

হঠাৎ মেসেজ এল অনিকেতের।
“কাল অফিসের কাজে আমাকে এয়ারপোর্ট যেতে হবে। যাবি নাকি আমার সাথে?”

নয়না প্রথমে ‘না’ লিখল। তারপর মুছে দিল, এরপর লিখল ‘দেখি’। নিজেও জানে না কী দেখবে। তবু সরাসরি না বলতে পারল না।

অনিকেত লিখল, “দেখা-দেখির কী আছে! আমরা কি তোর বরকে দেখতে যাচ্ছি! তুই আমার সাথে যাচ্ছিস—ডিসিশন ফাইনাল। কোনো ‘না’ শুনব না, বলে দিলাম।”

নয়না ‘আচ্ছা’ লিখে ডাটা অফ করে মোবাইল সাইলেন্ট করে পাশে রেখে দিল। মাঝে মাঝে মোবাইলটাকে বিরক্ত লাগে।

সেদিনের পর যেন দেখাদেখির কিছু বাকি নেই। অশান্ত মনটা ডুবে গেল অতীতের কালো স্মৃতিতে।

জাহিনের কেস কোর্টে উঠেছে। সর্বোচ্চ শাস্তি ফাঁসি হওয়ার সম্ভাবনা বেশি। নয়না রেডি হচ্ছিল কোর্টে সাক্ষী দিতে যাওয়ার জন্য।

জিয়ান নয়নার কোমর জড়িয়ে ধরে নিজের কাছে টেনে আনল। নয়না কিছু বুঝে ওঠার আগেই নয়নার ঠোঁটে ঠোঁট ডুবিয়ে দিল। মিনিট দুয়েক পর নয়নার ঠোঁট ছেড়ে দিয়ে বলল, “বাটার মাশরুম, আমি ক্লান্ত হয়ে গেছি। আমাকে একটু শান্তি দিবে?”

নয়না জিয়ানের গলা জড়িয়ে ধরে বলে, “মিস্টার প্লেন ড্রাইভার, আমি আপনাকে শান্তির সমুদ্রে ভাসিয়ে রাখব।” নয়না নিজের পা উঁচু করে জিয়ানের গালে চুমু দিয়ে বলে, “আজকের পর শুধু আমাদের ভালোবাসাময় দিন কাটবে। আদরে-সোহাগে ভরিয়ে রাখব একে অপরকে।”

জিয়ান নয়নার পায়ের সামনে বসে পড়ল। নয়না অবাক হয়ে বলে, “কী করছেন এটা! উঠুন।”

“প্লিজ, তুমি জাহিনের বিরুদ্ধে কোনো সাক্ষ্য দিও না। আমি জানি এটা অন্যায় আবদার, কিন্তু বিশ্বাস করো, এটা ছাড়া আর কোনো উপায় নেই।”

নয়না কল্পনাও করেনি জিয়ান এমন কিছু বলবে। এত কিছু হয়ে যাওয়ার পরেও জাহিনকে বাঁচাতে চাইবে।

নয়না কয়েক কদম পিছিয়ে গেল।

জিয়ান নয়নার দিকে নত দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে।

“আমি আমার ফ্রেন্ডের হত্যাকারীকে ছেড়ে দেব? আমার পক্ষে এটা সম্ভব না। আপনার ভাই তুষিকে এমনি-এমনি মারেনি। যন্ত্রণা দিয়ে ধুঁকে ধুঁকে মেরেছে। যদি তুষি আপনার বোন হতো, তাহলে আপনি কী করতেন, মিস্টার জিয়ান রেজা চৌধুরী?”

মিতা বেগম দরজার সামনে থেকে বলে, “সংসার করতে হলে অনেক কিছু সহ্য করতে হয়। তুমি নিজের ছোট দেবরকে ভাইয়ের মতো মনে করে সামান্য ক্ষমা করতে পারবে না! দেখো নয়না, আমরা সবাই জানি জাহিন যা করেছে তা ক্ষমার অযোগ্য, কিন্তু জাহিনের ফাঁসি হলে কি তোমার বান্ধবী ফিরে আসবে? কেন তুমি আমার কোল খালি করবে? দয়া করে তুমি নিজের মুখটা বন্ধ রাখো। ভুলে যাও কী হয়েছিল। নতুন করে আমরা সবাই একসাথে সুন্দর একটা জীবন শুরু করব।”

নয়না মিতা বেগমের কথার কোনো জবাব দিল না। জিয়ানের দিকে তাকিয়ে বলে, “চোখ তুলে আমার চোখে চোখ রাখো।”

জিয়ান নয়নার দিকে তাকাতেই নয়না বলল, “আমাদের সম্পর্ক কি এই সাক্ষ্য দেওয়া না দেওয়ার ওপর নির্ভর করছে?”

জিয়ান দৃষ্টি নত করে ফেলল।

নয়না রাগে গর্জে উঠে বলে, “কাপুরুষের মতো দৃষ্টি সরিয়ে নিচ্ছ কেন! চোখে চোখ রেখে হ্যাঁ বা না উত্তর দাও।”

জিয়ান তবু চুপ করে রইল।

নয়না জিয়ানের আরও কাছে এসে জিয়ানকে জড়িয়ে ধরে বলে, “আমি একজন বীরপুরুষকে বিয়ে করেছিলাম। আর আজ একজন কাপুরুষকে ছেড়ে যাচ্ছি।” বলেই হিজাবের শেষ পিনটা আঁটকে রুম থেকে বের হওয়ার জন্য পা বাড়াল।

জিয়ান নয়নার হাত ধরে বলে, “প্লিজ যেও না। আমি তোমাকে ভীষণ ভালোবাসি। তুমি চলে গেলে আমি শূন্য হয়ে যাব। আমাকে শূন্য করে দিয়ে চলে যেও না।”

নয়না জিয়ানের দিকে তাকিয়ে বলে, “আমি খুনির বিপক্ষে সাক্ষী দেব। যে মানুষ এত এত খারাপ কাজ করেছে, তাকে আমি ছাড় দেব না। সত্যের সাথে আপোষ করব না আমি। যদি সাহস থাকে, তো তোমার ভাইয়ের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দেওয়ার পর আমাকে কোর্ট থেকে বাসায় নিয়ে আসবে। আমি অপেক্ষায় থাকব তোমার। না আসলে বুঝে নেব, আমাদের আর এ জন্মে একসাথে থাকা হবে না। ভালোবাসা মানে অন্যায়ের সাথে আপোষ হতে পারে না। ভালোবাসা হবে শক্তি। অথচ ভালোবাসার দোহাই দিয়ে আমাকে দুর্বল করতে চাইছ।”

নয়না রুম থেকে বের হওয়ার আগে জিয়ানের দিকে তাকিয়ে বলে, “তোমার অপেক্ষায় থাকব, মিস্টার প্লেন ড্রাইভার। তুমি আসবে তো তোমার অর্ধাঙ্গিনীকে নিজের করে নিতে?”

নয়না সেদিন কোর্টের বাইরে রাত নয়টা পর্যন্ত অপেক্ষা করেছে। জিয়ান আসেনি।

নয়না ছাদে হাঁটু মুড়ে বসে কান্না করতে লাগল। আশপাশের সব ভুলে সে চিৎকার করে কাঁদতে লাগল।

নীলাঞ্জনা দরজার পাশে দাঁড়িয়ে দেখছে। কাছে এসে সান্ত্বনা দিচ্ছে না। কারণ কিছু দুঃখের বোঝা কান্না করে কমাতে হয়। নয়তো দুঃখ জমে জমে হৃদয় ভারী হয়ে যায়। নীলাঞ্জনার চোখের কোনেও তার অজান্তেই অশ্রু এসে জমা হয়েছে। বোনের কষ্ট যেন তার হৃদয়ে পৌঁছে গেছে। ধীরে পায়ে এগিয়ে এল নয়নার কাছে।

নয়নার কাঁধে হাত রেখে বলে, “এবার থাম। আর কাঁদিস না, বোন আমার।”

ওইটুকু সান্ত্বনার বাণী যেন নয়নার ভেতরের কষ্ট আরও বাড়িয়ে দিল। দু’হাতে নীলাঞ্জনাকে আঁকড়ে ধরে কাঁদতে লাগল।

🌿

রাতে জিয়ান বেডে এপাশ-ওপাশ করছে। কিছুতেই তার চোখে ঘুম আসছে না। নিজের ফেক আইডি দিয়ে নয়নার আইডি ঘুরে এল। সাহস করে ফেক আইডি থেকে টেক্সট করল, “আসসালামু আলাইকুম। কেমন আছেন?”

কিছুতেই স্বস্তি পাচ্ছে না। সেদিনের ঘটনা যেন তাদের অনেক দূরে নিয়ে গেছে। চাইলেও হয়তো এ দূরত্ব আর মেটানো যাবে না।

বেড থেকে উঠে এসে ডেস্কে বসে একটা কাগজ বের করল। অনেক দিন পর কলম ধরল। কোনো চিঠি লিখল না, আর না লিখল কোনো অভিযোগ। শুধু একটা লাইন লিখল:

“আমরা দুজনেই ভালো থাকার চেষ্টা করছি।”

লাইনটার নিচে আর কিছু লেখেনি। ভাঁজ করে কাগজটা পকেটে রেখে দিল। কিছু কথা কাগজে থাকাই ভালো। পাঠানোর দরকার হয় না। কিছু কথা কেবল নিজের জন্য।

জিয়ান মনে মনে বলল, “কী হতো যদি তুমি আমাদের ভালোবাসার জন্য একটু সেক্রিফাইস করতে? আমার দ্বারা আর কোনোদিন ভালোবাসা হবে না। বাকিটা জীবন এভাবেই কেটে যাবে তোমার স্মৃতি বহন করে। হৃদয় জুড়ে তুমি, অথচ হাত বাড়ালেই তোমার শূন্যতা। কিছু দূরত্ব থাকে, যেগুলো মানচিত্রে ধরা পড়ে না।
কিছু মানুষ আলাদা শহরে থেকেও একই স্মৃতিতে আটকে থাকে। হয়তো খুব শিগগিরই
একই আকাশের নিচে, একই এয়ারপোর্টের ভিড়ে, দুজনেই আবার মুখোমুখি হবে। কিছু দেখা না হওয়া যেন সবচেয়ে বড় দেখা হয়ে থাকে।”

চলবে

Share On:

TAGS: ,



CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
Related Posts
 

0 Responses

Leave a Reply