#অর্ধাঙ্গিনী ( দ্বিতীয় পরিচ্ছদ)
#নুসাইবা_ইভানা
#পর্ব -১৭
জাহিন চেয়ারে হেলান দিয়ে বসে আছে। তার সামনে চেয়ারে বাঁধা অবস্থায় বসে আছে তুষি।
জাহিনের সামনে প্লেটে গরুর কলিজা ভুনা আর পরোটা রাখা।
তুষির চোখ বাঁধা। জাহিন তুষির চোখ খুলে দিয়ে আবার চেয়ারে বসল। পায়ের উপর পা তুলে বোতল থেকে পানি ঢেলে হাত ধুয়ে নিল।
তুষি জাহিনকে দেখেই ভয়ে কুঁকড়ে যায়। কাঁপা গলায় বলে, “কোথায় নিয়ে এসেছেন আমাকে? এটা কোন জায়গা?”
জাহিন পরোটা ছিঁড়ে তাতে কলিজা নিয়ে মুখে দিল। মুখের খাবার শেষ করে বলল, “এটা কবরস্থান। তবে এই কবরস্থানে শুধু জীবিতরাই থাকে।”
তুষি চারপাশে তাকাল, কিছুই দেখতে পাচ্ছে না। তাদের এই জায়গাটুকুতে শুধু ক্ষীণ আলো, বাকিটা ঘন অন্ধকারে ঢাকা। ভয়ে তার গলা শুকিয়ে যাচ্ছে। আকুতি ভরা কণ্ঠে বলল, “প্লিজ, আমাকে ছেড়ে দিন।”
জাহিন চেয়ার টেনে তুষির মুখোমুখি বসল। টেবিলের ওপর তুষির হাত রেখে ছু*রির ধার দিয়ে আঙুলের ফাঁকে ফাঁকে আঘাত করতে লাগল। “এই হাত দিয়েই তুই আমাকে টেক্সট করতিস, তাই না? আচ্ছা, সত্যি কি তুই আমার সঙ্গে ফান করেছিস, নাকি ওটা নয়না ছিল?”
তুষি কাঁপা কাঁপা গলায় বলল, “আমার ভুল হয়ে গেছে। আমি বুঝতে পারিনি আপনি এতটা সিরিয়াস। আমাকে ক্ষমা করে দিন।”
জাহিন টেবিলের ওপর ছু*রি গেঁথে দিয়ে বলল, “‘ছেড়ে দেওয়া’ শব্দটা জাহিনের ডিকশনারিতে নেই। তোর জন্য আমার পরিবারের কাছে আমার আসল চেহারা বের হয়ে গেছে। তোর জন্য এতদিনের ইমেজ মুহূর্তে পদদলিত হয়ে গেল। তোকে আমি কী করে ক্ষমা করব?”
জাহিন তুষির গলায় ছুরি ধরে বলল, “তোকে মেরে ফেলব।” তারপরই আবার বলল, “নাহ, এত সহজ মৃত্যু তোর প্রাপ্য নয়। তোর জন্য আরো কঠিন মৃত্যু ভাবতে হবে। ধর, তুই মরার জন্য আকুতি করবি, কিন্তু মৃত্যু আসবে না। জাহিন চৌধুরীকে ধোঁকা দেওয়ার এটাই শাস্তি।”
“আমাকে ক্ষমা করুন…”
“ক্ষমা আবার কী! আচ্ছা, তুই কি দেখিসনি আমি তোর স্কুলের সামনে ঘণ্টার পর ঘণ্টা দাঁড়িয়ে থাকতাম? এত এফোর্ট, এত ভালোবাসা—এসবের মূল্য শুধু একটা ‘সরি’?”
মুহূর্তের মধ্যে তুষির ডান হাতের বুড়ো আঙুল কে*টে ফেলল।
তুষি হৃদয়বিদারক চিৎকার করে উঠল। র*ক্তে টেবিল ভিজে যাচ্ছে।
জাহিন কা*টা আঙুলটা হাতে নিয়ে তুষির সামনে ধরে বলল, “এই আঙুল দিয়েই টাইপ করতিস, তাই না? কত কত গিফট পাঠিয়েছি তোকে। এসবের বিনিময়ে একটা আঙুল কি যথেষ্ট? তোর জন্য পরিবারের চোখে আমি এখন খু*নি। এমনিতেই বাবা ছোটবেলা থেকে আমাকে পছন্দ করত না। এখন তো আমাকে ঘৃণাই করবে। তোকে কী শাস্তি দেব বল!”
জাহিন উঠে হাঁটতে লাগল। যেতে যেতে বলল, “আপাতত এই কবরস্থানে থাক। ফিল কর, মরার পর কবর কেমন লাগে।”
জাহিন সামনে এগোতেই আলোটা নিভে গেল। তুষি চিৎকার করে কাঁদতে লাগল। তার কান্নার শব্দ দেওয়ালে ধাক্কা খেয়ে আবার তার কানেই ফিরে আসছে।
জাহিন কা*টা আঙুলটা একটা কুকুরকে ছুঁড়ে দিল। কুকুরটা মুহূর্তে আঙুলটা খেয়ে ফেলল। তারপর জাহিন বাইকে চড়ে মন্ত্রীর ফার্মহাউসে চলে এল। এসেই দেখল, মন্ত্রীর ছেলে আর তার বন্ধুরা মেয়েদের নিয়ে পার্টিতে মেতে উঠেছে। জাহিন একটা সিগারেট ধরিয়ে সোফায় বসল, ধোঁয়া ছেড়ে চিৎকার করে বলল, “আমার আইনে আমিই জজ, আমিই উকিল। যে সাজা নির্ধারিত হয়েছে, তাই হবে শেষ ফয়সালা। জাহিন চৌধুরীর আইনে সাজা মওকুফের কোনো অপশন নেই। এই শালা, আজ তোকে দুনিয়া থেকে বিদায় করে দেব। যতক্ষণ বেঁচে আছিস, মজা করে নে। এরপর তোর দেহ থাকবে, কিন্তু প্রাণ থাকবে না।”

নয়না চোখ খুলেই নিজেকে জিয়ানের বাহুতে আবিষ্কার করল। তার ঠোঁটের কোণে মুচকি হাসি ফুটে উঠল। নয়না জিয়ানের গলার কাছে ঠোঁট ছুঁয়ে বলল, “তোমাকে ভুল বুঝেছি, এটা আমার অন্যায়। তোমার আদালতে আমার সাজা হওয়া উচিত।”
জিয়ান নয়নার কোমর ধরে নিজের সঙ্গে আরেকটু মিশিয়ে নিয়ে বলল, “আমার মনের জেলে তুমি যাবজ্জীবন কারাদণ্ডপ্রাপ্ত আসামি। এ জন্মে আর মুক্তি নেই তোমার।”
“তুমি উঠে পড়েছ?”
“হুম, যখন আমার বাটার-মাশরুম আমার এখানটাতে বাটারি কিস করল, তখন আর ঘুম থাকে?”
নয়না হেসে উঠে বলল, “তাড়াতাড়ি উঠে ফ্রেশ হোন। নাস্তা করে আমাদের বাসায় যেতে হবে। বাবা নিশ্চয়ই ভীষণ রেগে আছেন।”
মিতা বেগম ফজরের নামাজ পড়ে আর বিছানায় পিঠ ঠেকাননি। অপেক্ষায় আছেন, কখন জিয়ানকে এক নজর দেখবেন। কয়েকটা দিন ছেলেটাকে মন ভরে দেখেননি।
জিয়ান আর নয়না ফ্রেশ হয়ে সোজা মিতা বেগমের রুমে গেল। তাঁকে না পেয়ে দুজনে নিচে নেমে এল।
মিতা বেগম কিচেনে নাস্তা বানাচ্ছেন—পরোটা আর সুজির হালুয়া, জিয়ানের ফেভারিট। সঙ্গে খেজুর-গুড়ের পায়েসও করেছেন।
জিয়ান পেছন থেকে মিতা বেগমকে জড়িয়ে ধরে বলল, “আম্মু, কেমন আছ তুমি?”
এতদিন পর ছেলের মুখে ‘আম্মু’ ডাক শুনে মিতা বেগমের চোখের বাঁধ ভেঙে পড়ল। তিনি ঘুরে জিয়ানের মুখে হাত বুলিয়ে দিয়ে বললেন, “তোকে বাড়িতে দেখে আমি ভালো আছি। তোর মুখটা শুকিয়ে গেছে রে।” তারপর নয়নার দিকে তাকিয়ে কপাল কুঁচকে বললেন, “আমার রাজপুত্রের মতো ছেলেটাকে এমন বিদ্ধস্ত দেখাচ্ছে!”
জিয়ান আম্মুর চোখের জল মুছে দিয়ে বলল, “আম্মু, আমি তোমাদের কাছে ফিরে এসেছি। এখন আবার তোমার রাজপুত্র আগের মতো হয়ে যাবে।”
তখনো মিতা বেগম নয়নাকে খেয়াল করেননি। নয়না সামনে এসে বলল, “আমাকে আদর করবেন না, আম্মু?”
মিতা বেগম নয়নাকে দেখে কপাল কুঞ্চিত করলেন। নয়নার দিকে তেড়ে এসে বললেন, “এসব কিছু তোমার জন্যই হয়েছে। আবার কেন এসেছ?”
জিয়ান আম্মুর হাত ধরে বলল, “আম্মু, তুমি ভুল ভাবছ। নয়নার কোনো দোষ নেই। নয়না নিজেও ভিকটিম।”
“এই মেয়েটাকে আমি কত স্নেহ করতাম। আর এই মেয়েই আমাদের ধোঁকা দিয়ে পালিয়েছিল।”
“আম্মু, ওসব সত্যি না। ওসব ছিল নয়নাকে খুন করার প্ল্যান।”
জিয়ান সবটা খুলে বলল, তবে জাহিনের নামটা বাদ দিল। মিতা বেগম হার্টের রোগী, এত বড় ধাক্কা সহ্য করতে পারবেন না।
মিতা বেগম নয়নাকে জড়িয়ে ধরে বললেন, “তোকে ভুল বুঝে কত বদদোয়া দিয়েছি, ক্ষমা করে দিস মা।”
নয়নাও আম্মুকে জড়িয়ে ধরল।
মিতা বেগম বললেন, “তোরা গিয়ে বোস, আমি নাস্তা নিয়ে আসছি।”
নয়না বলল, “আপনি কেন! আপনি আর আপনার ছেলে গিয়ে বসুন, আমিই নাস্তা নিয়ে আসছি।”
নাস্তা তৈরি করতে করতে নয়না ভাবল—ছেলের বউ কোনোদিন মেয়ে হয়ে উঠতে পারে না। এত ভালোবাসা, এত কিছু, একটা ঘটনায় মুহূর্তে পর করে দেয়। অথচ শত অন্যায় করলেও ছেলেকে কখনো এভাবে পর করে দিতে পারে না। পৃথিবীতে মা-বাবার মতো সম্পর্ক আর নেই হয়তো।
চোখের কোণে জমে থাকা জল মুছে নয়না খাবারের ট্রে নিয়ে ডাইনিং-এ এল। নয়না সার্ভ করছে। জিয়ান নয়নার দিকে তাকিয়ে রইল।
নয়না একটা পরোটা খেয়ে উঠে চা বানাতে কিচেনে গেল।
এমন সময় মেহনুর নিচে নেমে এসে জিয়ানের কাঁধে হাত রেখে বলল, “তুমি কখন এসেছ? কাল রাতে নাকি জেল থেকে বের হয়েছ? তারপর থেকে কতবার কল দিয়েছি, রিসিভ করোনি কেন?”
নয়না চায়ের কাপ টেবিলে রেখে বলল, “উনি আপনার বড় ভাসুর আপনার জাহিন না।”
মেহনুর অবাক হয়ে নয়নার দিকে তাকাল, “তুমি! কোথা থেকে উদয় হলে?”
নয়নার মুখে আসমান থেকে পড়েছি বলতে ইচ্ছে করছিল, কিন্তু নিজেকে সামলে বলল, “আমার হ্যাসব্যান্ডের কাঁধ থেকে হাতটা সরিয়ে রাখুন।”
মেহনুর হাত সরিয়ে নিয়ে একবার জিয়ানের দিকে, একবার নয়নার দিকে তাকাচ্ছে।
নয়না মিতা বেগমের দিকে চা এগিয়ে দিয়ে বলল, “আম্মু, আপনার চা।” তারপর মেহনুরের দিকে তাকিয়ে মিষ্টি করে বলল, “চা খাবেন? ঢেলে দিই?”
#চলবে
Share On:
TAGS: অর্ধাঙ্গিনী সিজন ২, নুসাইবা ইভানা
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
অর্ধাঙ্গিনী সিজন ২পর্ব ১৫
-
অর্ধাঙ্গিনী সিজন ২পর্ব ১১
-
অর্ধাঙ্গিনী সিজন ২পর্ব ১০
-
অর্ধাঙ্গিনী গল্পের সকল পর্বের লিংক সিজন ২
-
অর্ধাঙ্গিনী সিজন ২পর্ব ৯
-
অর্ধাঙ্গিনী সিজন ২পর্ব ৬
-
অর্ধাঙ্গিনী সিজন ২পর্ব ৫
-
অর্ধাঙ্গিনী সিজন ২পর্ব ১২
-
অর্ধাঙ্গিনী সিজন ২পর্ব ১৮
-
অর্ধাঙ্গিনী সিজন ২পর্ব ৮