#অর্ধাঙ্গিনী ( দ্বিতীয় পরিচ্ছদ)
#নুসাইবা_ইভান
#পর্ব -১৮
নয়না রুমে এসে ড্রেস চেঞ্জ করে টুকটুকে একটা লাল শাড়ি পরল। সঙ্গে হালকা কিছু অর্নামেন্টস। চুলগুলো আঁচড়ে বেণী করে নিল। ক্রিম কালারের একটা হিজাব পরে নিল। শেষবারের মতো নিজেকে আয়নায় দেখছিল।
মেহনুর এসে বলল, “তুমি অনেক সুন্দর। এতটাই সুন্দর যে, তোমার জন্য ছেলেরা সহজেই পাগল হয়ে যায়। আমি জানি, এতে তোমার কোনো দোষ নেই। তোমার ফেস কাটিং, গায়ের রং—সব মিলিয়ে তুমি অপরূপা। সুন্দর মানুষের জন্য এটাই প্লাস পয়েন্ট। তারা অপরূপ সুন্দরী হওয়া ছাড়া আর কোনো যোগ্যতা না থাকলেও সব জায়গায় ফার্স্ট প্রায়োরিটি পায়। তবে তুমি কি জানো, মানুষের রূপের প্রেমটা যাস্ট মোহ? রূপ দেখে মানুষ উপভোগ করে, কিন্তু জীবনে সত্যিকারের ভালোবাসা পায় না।”
নয়না সামনের দিকে ঘুরে বলল, “আপনার সমস্যাটা কী, সেটা বলুন তো? আমার না হয় রূপ আছে। আমার গুণ না থাকুক, মানুষ অন্তত আমার রূপের প্রেমে পড়ে। কিন্তু আপনার তো তাও নেই। তাই আপনার জীবনে সেটুকুও নেই। না আছে রূপ, না আছে গুণ। শুধু আছে পাড়ার আন্টিদের মতো পায়ে পড়ে ঝগড়া করার যোগ্যতা। যার কারণে মানুষ যতটুকু পাত্তা দিত, আপনাদের মতো মানুষকেও তা দেয় না। সেই ক্ষোভ অন্যের ওপর ঝাড়বেন!”
“সুনয়না, তুমি কেন আবার ফিরে এসেছ? তোমার ফিরে আসার সবচেয়ে বাজে প্রভাব পড়বে আমার জীবনে। এই সবে আমি জীবনটাকে একটু গোছাতে শুরু করেছিলাম। কিন্তু তুমি নামক ঝড় এসে আবার সব শেষ করে দিলে।”
“আপনার হাজব্যান্ডের জন্য আমি মৃত্যুর কাছাকাছি চলে গিয়েছিলাম। আমার হাজব্যান্ড অযথা শাস্তি পাচ্ছিল। আর আপনি আমাকে দোষারোপ করছেন! বোধবুদ্ধি আছে, নাকি সস্তায় বেচে দিয়েছেন? গায়ের চামড়া যত চকচকে, আপনার মনটা যদি তার কিঞ্চিৎও হতো!”
মেহনুর হঠাৎ নয়নার হাত ধরে নিজের পেটের ওপর রেখে বলল, “আমার হাজব্যান্ডকে অন্তত এই নিষ্পাপ জানটার জন্য মুক্তি দাও, নয়না। আমার সন্তানটাকে বাবা-হারা করো না। আমি জীবনে বাবার আদর পাইনি, আমার সন্তানটা যেন সেই কষ্ট অনুভব না করে। আমি পৃথিবীর সবচেয়ে খারাপ মানুষ হতে পারি, কিন্তু বিশ্বাস করো, আমি পৃথিবীর সবচেয়ে ভালো মা হতে চাই। আমার সন্তানের জন্য দয়া করো।”
নয়না দু’হাত ভাঁজ করে বলল, “আপনার হাজব্যান্ডকে আমি ক্ষমা করে দিয়েছি। যদিও ওনার মতো মানুষ ক্ষমার অযোগ্য, তবুও ক্ষমা করেছি। এবার চেষ্টা করুন নিজের স্বামীকে আঁচলে বেঁধে রাখতে। আমি কেস তুলে নিয়েছি। এবার তাকে শুধরে নেওয়ার দায়িত্ব আপনার।”
“তুমি এ বাসায় থাকলে তা কখনো সম্ভব হবে না, নয়না। চোখের সামনে তোমাকে দেখলে কী করে মন থেকে তোমাকে বের করবে? নাকি তুমি জেলাস যে, তোমার আগে আমার সন্তান আসছে বলে?”
“আপনার চিন্তাভাবনা এত নিম্নমানের!” নয়না আর কিছু বলার আগেই জিয়ান বলে উঠল, “মেহনুর, তোমার মতো শিক্ষিত একটা মানুষের কাছ থেকে এমন আচরণ খুবই হতাশাজনক। এক কাজ করো, তুমি আর জাহিন আলাদা হয়ে যাও। আমার ওয়াইফ এখানে, এই বাড়িতেই থাকবে। আসতে পারো আমার রুম থেকে।”
মেহনুর চলে যেতেই জিয়ান নয়নার দিকে তাকিয়ে বলল, “মাশাআল্লাহ, আমার অর্ধাঙ্গিনীকে মোহনীয় লাগছে। কারো নজর না লাগুক আমার বাটার মাশরুমের ওপর।”
নয়না মুচকি হেসে বলল, “মিস্টার প্লেন ড্রাইভার, পাঞ্জাবি আর জিন্স রাখা আছে। দ্রুত চেঞ্জ করুন।”
নয়না সরে আসতে যেতেই জিয়ান তার হাত ধরে বলল, “একটা চুমু খেতে পারি? জাস্ট একটাই চুমু খাব, তারপর ফটাফট ড্রেস চেঞ্জ করে ফেলব, প্রমিস।”
নয়না জিয়ানের সামনে দাঁড়িয়ে দু’হাত ভাঁজ করে বলল, “একটাই কিন্তু।” বলেই চোখ বন্ধ করে নিল। নয়না ভেবেছিল জিয়ান লিপ কিস করবে। কিন্তু না, নয়নাকে অবাক করে দিয়ে জিয়ান তার কপালে আলতো চুমু খেয়ে বলল, “হে আমার চাঁদ, হে আমার জোছনার আলো, তুমি হাসলেই আমার পৃথিবীতে সুখ ছড়িয়ে পড়ে।”
নয়না দূরে সরে বলল, “এবার দ্রুত রেডি হও।”
জিয়ান টি-শার্ট খুলে পাঞ্জাবি পরে নিল। এরপর কোমরে তোয়ালে জড়িয়ে প্যান্ট চেঞ্জ করে নিল।
নয়না হেসে বলল, “তোয়ালে তো ফাঁকা ছিল, ইশশ… আমি তো সব দেখে ফেললাম!”
জিয়ান এক চোখ টিপে বলল, “প্রথমবার দেখলে জান? এর আগে দেখোনি, শিওর?”
“ছিহহ, বেশরম লোক! আমি বেরিয়ে আম্মুকে বলে আসছি, আপনি দ্রুত আসুন।”
“আরেহহ, কিউটিপাই, শুরু তো তুমিই করলে। আর আমি বললেই বেশরম!”

সায়না বলল, “দেখো অনিকেত, তোমার উচিত ওই লোকটার মুখোমুখি হওয়া। কেন তোমার সঙ্গে এত বড় অন্যায় করল? তোমার মতো ছেলেকে পরিচয় দিতে তার এখন লজ্জা করে! যখন অবৈধভাবে নিজেদের দেহের সুখ মিটিয়েছিল, তখন লজ্জা করেনি! বাচ্চা জন্ম দেওয়ার সময় সমাজের কথা মনে পড়েনি, জন্ম দেওয়ার পর মনে পড়েছে! তুমি ছেড়ে দিলেও আমি ছাড়ব না। আগে ডিএনএ টেস্ট করাব। তারপর আদালতে দেখা হবে মাহবুব তালুকদারের সঙ্গে। আমি কাল বা পরশুই নয়নার সঙ্গে দেখা করব। নয়না কি জানে?”
“নাহ, নয়না সম্ভবত এসবের কিছুই জানে না। বাদ দাও সায়না। জোর করে পিতার পরিচয় পাওয়া যাবে, কিন্তু ভালোবাসা, স্নেহ, মায়া, মমতা? এগুলোর অভাবে এতগুলো বছর পার করেছি, বাকি জীবনটাও পার করে দিতে পারব।”
“অনিকেত, এরকম মানুষের ভালোবাসার কোনো প্রয়োজন নেই তোমার। অবশ্যই পরিচয় আর তাদের মতো সভ্যতার আড়ালে লুকিয়ে রাখা মানুষদের পরিচয় সামনে আনার প্রয়োজন আছে।”
অনিকেত সায়নাকে জড়িয়ে ধরে তার পেটে হাত রেখে বলল, “নতুন করে আমার জীবনে আর কাউকে চাই না। তোমাদের নিয়েই বাকি জীবন কাটিয়ে দিতে চাই, সায়না। যে পিতা তার সন্তানের পরিচয় মিটিয়ে দিতে চায় না, আমি সেই পিতার মুখদর্শন করতে চাই না এ জীবনে। তুমি শুধু আমার বোনটাকে নিজের বোনের মতো ভালোবাসা দিও। তুমি জানো, প্রথমবার যখন ওর সঙ্গে দেখা হয়েছিল, কেমন আপন আপন লেগেছিল। তারপর যখন বলল, ‘আমি আপনার ছোট বোন, আমার পরিবার আজ থেকে আপনার পরিবার—এটাই আপনার পরিচয়’, সেদিন মনে হয়েছিল পৃথিবীতে একটা বোন থাকা কত বড় সৌভাগ্যের। কে জানতো, সেদিন আসলেই আমি সেই সৌভাগ্যবান মানুষ!”

মন্ত্রীপুত্র আরিয়ান বলল, “এই, তুই ওই গোয়েন্দা না? যাকে আমার বাবা টাকা দিয়ে কিনে নিয়েছে?”
জাহিনের হাতে চামড়ার গ্লাভস। সজোরে ঘুষি মারল আরিয়ানের মুখ বরাবর।
আরিয়ান ছিটকে পড়ল ফ্লোরে। জাহিন আরিয়ানের বুকে পা রেখে বলল, “জাহিন চৌধুরী এতটা সস্তা না যে তাকে কেনা যাবে।” হাতে থাকা মদের বোতলটা ঢেলে দিল আরিয়ানের মুখে। ততক্ষণে সবাই চলে গেছে, মুহূর্তে রুম ফাঁকা হয়ে গেল। জাহিন আরিয়ানের দিকে তাকিয়ে বলল, “তোর বাবা আমার সঙ্গে গাদ্দারি করেছে। তার পরিণাম তাকে ভুগতেই হবে। গুডবাই।” বলেই মেইন দরজার কাছাকাছি লুকিয়ে পড়ল।
গেটের সামনে থেকে দারোয়ানরা ছুটে এসে দেখল আরিয়ান ফ্লোরে পড়ে আছে, মুখ থেকে রক্ত ঝরছে। দ্রুত মন্ত্রীকে কল করে জানাল। ইমার্জেন্সি হাসপাতালে নেওয়া হলেও ডাক্তার জানাল, অতিরিক্ত নেশার কারণে আরিয়ান মারা গেছে।
শেষ রাতের দিকে জাহিন বাসায় ফিরে নিজের রুমে না গিয়ে নিচের গেস্ট রুমে এসে ঘুমিয়ে পড়ল। অথচ বাসার কেউ এখনো জানে না যে জাহিন বাসায় উপস্থিত। এক রাতের মধ্যে সে কত জঘন্য অপরাধ করে এসে নিশ্চিন্তে ঘুমাচ্ছে।

জাহানারা বেগম আগের চেয়ে মোটামুটি সুস্থ, কিন্তু মাঝে মাঝে এখনো উল্টোপাল্টা কথা বলেন। এই তো সকাল থেকে নয়নার জন্য রান্নাবান্না করছিলেন। হঠাৎ শিল্পী বেগমকে বললেন, “শিল্পী, তুই কি আমার নাফীকে দেখেছিস? দেখ তো, সকাল থেকে ছেলেটা কিছু খায়নি। কোথায় গেল, খুঁজেই পাচ্ছি না। ওইটুকু ছেলে একা একা কোথায় গেল, বল না?”
শিল্পী বেগম বোকার মতো তাকিয়ে থাকতেই জাহানারা বেগম চলে গেলেন। “নাফি… নাফি…” বলে ডাকতে ডাকতে পুরো বাড়ি ঘুরতে লাগলেন।
নীলাঞ্জনা তার ছেলের কাছে তুষিকে বসিয়ে রেখে রান্না করছে। ইদানীং তাকেও রান্নার কাজে হেল্প করতে হয়। এ বাড়ির কেউ কাজের লোকের হাতের রান্না খায় না। এদিকে জাহানারা বেগমও অসুস্থ।
মাহবুব তালুকদার জাহানারা বেগমের হাত ধরে টেনে নিজের রুমে নিয়ে গেলেন। তারপর তার মুখ চেপে ধরে বললেন, “কেন এসব বলে চেঁচাচ্ছ? তুমি তো জানোই, এতিমখানা থেকে নাফি হারিয়ে গেছে। হয়ত বেঁচে আছে, নয়তো নেই। এই বুড়ো বয়সে কেন সম্মান নষ্ট করতে উঠে-পড়ে লেগেছ?”
জাহানারা বেগম মাহবুব তালুকদারকে জড়িয়ে ধরে বাচ্চাদের মতো হাউমাউ করে কাঁদতে লাগলেন।
#চলবে
Share On:
TAGS: অর্ধাঙ্গিনী সিজন ২, নুসাইবা ইভানা
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
অর্ধাঙ্গিনী সিজন ২পর্ব ১
-
অর্ধাঙ্গিনী সিজন ২পর্ব ১৬
-
অর্ধাঙ্গিনী সিজন ২পর্ব ৬
-
অর্ধাঙ্গিনী সিজন ২পর্ব ১৩
-
অর্ধাঙ্গিনী সিজন ২পর্ব ২
-
অর্ধাঙ্গিনী সিজন ২পর্ব ১২
-
অর্ধাঙ্গিনী সিজন ২পর্ব ১৪
-
অর্ধাঙ্গিনী সিজন ২পর্ব ১১
-
অর্ধাঙ্গিনী সিজন ২পর্ব ৯
-
অর্ধাঙ্গিনী সিজন ২পর্ব ১৫