অর্ধাঙ্গিনীর ( দ্বিতীয় পরিচ্ছদ)
নুসাইবা_ইভানা
পর্ব -৩৪
নয়নার পরনে সাদা রঙের একটা থ্রি-পিস। সাথে সাদা হিজাব। জিয়ান দরজার ছিদ্র দিয়ে তাকিয়ে নয়নাকে দেখে বলে, “মাম্মা, তোমার মামি চলে এসেছে।”
জিয়ান এক হাতে নিজের চুল ঠিক করে দরজা খুলে বলে, “ওয়েলকাম, বিবিজান। এমন বউ ভাগ্যবানদের কপালেই জোটে। বাহ্! কী পরিমাণ স্বামীভক্ত হলে স্বামীকে অনুসরণ করে তার পিছু পিছু চলে আসে! একটা জিনিস দেখে খুব ভালো লাগছে—তোমার মনে এখনো আমার জন্য ভালোবাসা আছে। বিন্দু পরিমাণও কমেনি।”
“ছাগল, গরু, হাঁস, মুরগি, কুকুর, বিড়াল—যা খুশি পালেন। কিন্তু ভুল ধারণা পালন করবেন না, মিস্টার চৌধুরী। আমার ভাইয়ার বাসায় আপনার মতো মানুষ কী করে?”
“উপস্! মিসেস চৌধুরী, আমি তো শুধু আপনাকেই পালতে চাই।”
“ছেলেমেয়ে লালন-পালন করার বয়সে সুন্দরী মেয়েদের পালন করতে চাচ্ছেন? ছিঃ ছিঃ!”
“কী করবো, মিস। সামনে এমন চোখধাঁধানো সুন্দরী থাকলে আর কিছু মাথায় থাকে না। বাই দ্য ওয়ে, এখন আমার ইচ্ছে করছে আপনার মতো সুন্দরীর সাথে দুই-চারটা বাচ্চাও পালতে।”
মাহি ফুপ্পি বলে নয়নার কোলে ঝাঁপিয়ে পড়লো।
নয়না মাহির গালে চুমু দিয়ে বলে, “তুমি অপরিচিত মানুষের কোলে কেন উঠেছো, ফুপ্পি?”
“এটা তো আমার মামা!”
নয়না দরজার সামনে থেকে ডাকলো, “ভাবি…”
সায়না নয়নাকে দেখে বলে, “তুমি! এখানে দাঁড়িয়ে কেন? ভেতরে আসো।”
“ভাবি, আপনার এই সুন্দরী মেয়েটাকে আমার খুব পছন্দ হয়েছে।”
“ভাইয়া, এসব তোমাকে একদম মানাচ্ছে না। এই বয়সে এসে ফ্লার্ট করছো!”
“ভাবি, সিঙ্গেল মানুষ তো সব সময় ফ্লার্ট করতে পারে। সিঙ্গেল মানুষের মন সব সময় ছোটই থাকে। একটা হিল্লে করে দাও, ভাবি।”
“ছিঃ ছিঃ! ভাইয়া, তুমি কি আমার সেই জিয়ান ভাই? মনে হচ্ছে রোডসাইড রোমিওর সাথে কথা বলছি।”
“কী করবো? বয়স ত্রিশ ছাড়িয়েছে, এখনো সিঙ্গেল। দেখি, রোডসাইড রোমিও হয়ে একটা সুন্দরী পটাতে পারি কি না।”
নয়না নিজের ব্যাগ থেকে বের করে মাহির হাতে চকলেট দিয়ে বলে, “ভাবি, আমি আজ আর বাসায় ঢুকবো না। আসি।”
“এই নয়ন, তুমি আসো। এসব ফুটপাতের রোমিওর জন্য নিজের ভাইয়ের বাসায় আসবে না!”
জিয়ান দরজায় হেলান দিয়ে নয়নাকে এক চোখ টিপে বলে, “মনে হচ্ছে তোর ননদ তোর ভাইয়ের ভয়ে পালাচ্ছে। এতো সুদর্শন পুরুষ আগে কখনো দেখেনি হয়তো। যদি প্রেমে পড়ে যায়, তাই পালাচ্ছে।”
নয়না সোজা বাসার মধ্যে ঢুকে নিজের রুমে চলে গেলো। এই বাসায় তার নিজের রুম আছে।
জিয়ান সায়নার পিছু পিছু কিচেনে এসে বলে, “তোর এত ধৈর্য? তোর হাজব্যান্ড তার বন্ধুর বউকে এত প্রায়োরিটি দিচ্ছে, তোর হিংসে হয় না? উল্টো তুই তাকে প্রশ্রয় দিচ্ছিস?”
“পাইলট জিয়ান রেজা চৌধুরী, আপনি হয়তো এই দেশে নতুন, তাই জানেন না। আমার হাজব্যান্ড অনিকেত মাহমুদ আর সুনয়না তালুকদার রক্তের ভাই-বোন। জিনগতভাবেই তারা ভাই-বোন। সো এমন পবিত্র সম্পর্ক নিয়ে আমি জেলাস কেন হবো?”
জিয়ান অবাক হয়ে বলে, “মানে! এসব কী করে হলো!”
“আপনি তো পালিয়ে গিয়েছিলেন। এরপর কত কিছু হয়ে গেছে, সেসবের খোঁজ আপনি রেখেছেন! একটা মেয়েকে বিয়ে করে, তাকে নিজের ভালোবাসায় ডুবিয়ে তারপর তাকে ছেড়ে চলে গিয়ে তিন বছর পর এসে রোডসাইড রোমিও হবেন আর সে আপনার কাছে চলে আসবে? একটা মানুষ ভেঙে গেলে সে নিজেকে অনেক কষ্টে গড়ে তোলে। যে সুনয়নাকে আপনি ছেড়ে গিয়েছিলেন আর ফিরে এসে যে সুনয়নাকে দেখছেন, তাদের মধ্যে আকাশ-জমিনের পার্থক্য। সেই ষোড়শী মেয়েটা এখন পূর্ণ নারী হয়ে উঠেছে। যে মেয়ে নিজের চোখে নিজের সন্তানকে শেষ হতে দেখেছে। যে মেয়ে নিজেকে ভেঙেচুরে গড়েছে। তার জীবনে আপনার অস্তিত্ব সামান্য ধুলোকণার মতো—যাকে সহজেই মাড়িয়ে সামনে এগিয়ে যাওয়া যায়।”
জিয়ান কিছুক্ষণ চুপ করে রইলো। তারপর কাতর কণ্ঠে বলল, “আমি জানি আমি ভুল করেছি। আমার ভুলের ক্ষমা নেই। কিন্তু আমি কী করতাম? আমি নিজের প্রতিও তো অন্যায় করেছি। আমি কি কম কষ্ট পেয়েছি? আমার প্রতিটি দিন, প্রতিটি রাত নিজের সাথে যুদ্ধ করে টিকে ছিলাম। নিজেকে এত এত ব্যস্ত রাখতাম, কখন রাত হতো, কখন দিন কাটতো—সেটাও অনেক সময় জানতাম না। আমি কী করতাম? একদিকে মা, একদিকে বউ। আমি কাকে ছাড়বো, কাকে ধরবো?”
“দুটোকে ব্যালেন্স করে চলতে হয়। পালিয়ে গিয়ে কী পেয়েছো? যাদের ছেড়ে গেছো, তাদের অবস্থা ভেবেছো? একবারও নয়নার কথা চিন্তা করোনি?”
জিয়ান সায়নার হাত থেকে ছুরি নিয়ে বলে, “নিজের সন্তানকে শেষ হতে দেখেছে মানে?”
“মানেটা খুব সহজ। যখন তুমি নিজের স্ত্রীকে ছেড়ে গিয়েছিলে, তখন নয়না প্রেগন্যান্ট ছিল। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত চার মাসের সময় নয়নার মিসক্যারেজ হয়ে যায়। মেয়েটা সম্পূর্ণ ভেঙে পড়ে। তোমাকে হারিয়ে ভেবেছিল, হয়তো নিজের সন্তানকে আঁকড়ে ধরে বেঁচে থাকবে। ভাইয়া, একবার ভাবো—ওই সময়টা মেয়েটার জন্য কতটা কঠিন ছিল। ভালোবাসার মানুষ হারানোর ব্যথা নিরাময়ের আগেই সন্তান হারানোর ব্যথা।”
জিয়ান কিচেন থেকে বের হয়ে বাসা থেকে চলে গেল।
সায়না মালটা কেটে জুসারে জুস বের করে গ্লাসে ঢেলে নয়নার জন্য নিয়ে গেল।
নয়না হিজাব খুলে বেডে শুয়ে আছে। মাহি তার পাশে বসে খেলছে।
সায়না নয়নার দিকে জুসের গ্লাস বাড়িয়ে দিয়ে বলে, “নাও, ঠান্ডা ঠান্ডা জুস খেয়ে মন-মেজাজ ঠান্ডা করো।”
নয়না জুসের গ্লাস হাতে নিয়ে বলে, “আপদ বিদায় হয়েছে?”
“মনে হচ্ছে চলে গেছে।”
নয়না এক চুমুকে জুস পান করে বলে, “কেন এসেছে এত বছর পর? আমার জন্য ছেলে দেখো, বিয়ে করব।”
“সত্যি?”
“১০০% সত্যি। আমি ডিভোর্স ফাইল করব। এই সম্পর্ক থেকে অনেক আগেই মুক্ত হয়েছি, এখন শুধু ফর্মালিটি পূরণ করব।”
“আচ্ছা, জাহিনের কী খবর বলো তো? তোমার কি মনে হয় ওই লাশটা জাহিনের ছিল?”
“আমি নিজেও জানি না। পুলিশ হেফাজত থেকে কোন ফাঁসির সাজাপ্রাপ্ত আসামি কী করে পালিয়ে যেতে পারে! আর ওই লাশ—ওটা কি আসলেই জাহিনের ছিল? পালিয়ে যদি যায়, তাহলে ওরকম বিভৎসভাবে কী করে মরলো? এসব ভাবলে আর কিছু ভালো লাগে না। মনে হয় সামনে আরও বড় কোনো বিপদ আছে। আমার আর এমন জীবন চাই না।”
“নাহ, ছিল না জাহিনের লাশ। তোমার ভাই নিজ দায়িত্বে ডিএনএ টেস্ট করেছিল। ওটা অন্য কারো লাশ ছিল, কিন্তু ওই লাশের শরীরে জাহিনের রক্ত ছিল কী করে? আর ডাক্তার কেন বলল ওটা জাহিন?”
“মাঝেমধ্যে মনে হয় জাহিন আবার ফিরে আসবে—নতুন কোনো তুফান হয়ে।”
সায়না নয়নার কাঁধে হাত রেখে বলে, “তুমি কি জাহিন আর জিয়ানকে চিনবে?”
“হয়তো দেখেই বুঝব না। কিন্তু আমার কাছাকাছি আসলে আমি চিনতে পারব।”
“এটা কি আসল?”
“হুম, এটা জিয়ান। এতে কোনো সন্দেহ নেই।”
“আমি এতদিন তোমাকে এসব বলিনি, কারণ আমি চাইনি তুমি টেনশন করো।”
“আমার জীবনটাই টেনশন হয়ে গেছে। আমি যতবার ভাবি জিয়ানকে ক্ষমা করে দেব, ততবার মনে পড়ে কীভাবে সে আমাকে ছেড়ে চলে গিয়েছিল। যাওয়ার পর একবারও আমার কথা তার মনে পড়েনি? কখনো খোঁজও নেয়নি। জানতেও চায়নি আমি কেমন আছি। এখন এসে ভালোবাসা দেখাচ্ছে! পুরুষ মানুষের ভালোবাসা কচু পাতায় জমে থাকা পানির মতো—দেখতে সচ্ছ, কিন্তু অস্থায়ী।”
জিয়ান সোজা চৌধুরী ম্যানশনে চলে এল। কারো সাথে কোনো রকম কথা না বলে সোজা নিজের রুমে গিয়ে দরজা বন্ধ করে দিল। ওয়াশরুমে ঢুকে শাওয়ারের নিচে বসে পড়ল। ইচ্ছে করছে চিৎকার করে কাঁদতে, অথচ পুরুষ মানুষ কখনো এভাবে কাঁদতে পারে না।
আচ্ছা, মানুষ কি ভুল শুধরে নতুন করে জীবন শুরু করতে পারে?
চলবে
Share On:
TAGS: অর্ধাঙ্গিনী সিজন ২, নুসাইবা ইভানা
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
অর্ধাঙ্গিনী গল্পের সকল পর্বের লিংক সিজন ২
-
অর্ধাঙ্গিনী সিজন ২পর্ব ১৭
-
অর্ধাঙ্গিনী সিজন ২ পর্ব ২২+২৩
-
অর্ধাঙ্গিনী সিজন ২পর্ব ১৮
-
অর্ধাঙ্গিনী সিজন ২পর্ব ১২
-
অর্ধাঙ্গিনী সিজন ২ পর্ব ৩৩
-
অর্ধাঙ্গিনী সিজন ২পর্ব ৩
-
অর্ধাঙ্গিনী সিজন ২ পর্ব ৩২
-
অর্ধাঙ্গিনী সিজন ২পর্ব ৮
-
অর্ধাঙ্গিনী সিজন ২ পর্ব ২৪