Golpo romantic golpo অবাধ্য হৃৎস্পন্দন

অবাধ্য হৃৎস্পন্দন পর্ব ৫৬


অবাধ্য_হৃৎস্পন্দন (৫৬)

সোফিয়া_সাফা

টাই লুজ করতে করতে উদ্যান নিজের রুমের দিকে ভারী কদমে অগ্রসর হচ্ছিল। দরজার সমুখে আসতেই তার পা থমকে গেল। হাতল ঘুরিয়ে রুমে ঢুকতেই যাবে ঠিক তখনই তার মস্তিষ্ক ফাঁকা হয়ে গেল কিছুক্ষণের জন্য। দুপা পিছিয়ে গিয়ে সে ফুলের দরজার দিকে দৃষ্টি নিক্ষেপ করল। খেয়াল করল দরজাটা যাওয়ার সময় সে যেভাবে দেখে গিয়েছিল এখনো ঠিক সেভাবেই ভিড়িয়ে রাখা আছে। মানে দরজাটা যেটুকু খোলা ছিল এখনো সেটুকুই আছে।
ফুল সাধারণ দরজা খোলা রেখে ঘুমায় না। কিন্তু এতো রাত অবধি তার সজাগ থাকার কথাও নয়। কী করছে তবে মেয়েটা? উদ্যান বেশিকিছু না ভেবে দরজা ঠেলে ভেতরে উঁকি মারল। কিন্তু ফুলের দেখা মিলল না। সে ভাবল ব্যাপারটা ইগ্নোর করে নিজের রুমে চলে যাবে। হয়তো ফুল ড্যান্স রুমে কিংবা সুয়িং বেডের রুমে আছে। ওয়াশরুমেও থাকতে পারে।

উদ্যান উল্টো ঘুরে চলে যেতে চেয়েও পারল না। কেমন যেন শূন্য শূন্য লাগছে রুমটা। সে প্রায় অনেকদিন পর ফুলকে ডাকতে বাধ্য হলো, “পেটাল! পেটাল, কোথায় তুমি?”

কোনো সাড়াশব্দ মিলল না। তবুও উদ্যান ভাবল মেয়েটা হয়তো সুয়িং বেডেই ঘুমিয়ে গেছে। তার পাজোড়া আজ অবাধ্য হলো, স্বতঃস্ফূর্ত ভাবে হেঁটে চলে গেল সুয়িং বেডের রুমে। পুরো রুমে চোখ বুলিয়েও ফুলের দেখা মিলল না। শুধু রুম জুড়ে ভেসে বেড়াচ্ছে মেয়েলি অস্তিত্বের ঘ্রাণ আর পিওনি ফুলের মিশ্র সুবাস।

সে একে একে ড্যান্স রুমে, ব্যালকনিতে ও ওয়াশরুমে গিয়েও দেখল কিন্তু খুঁজে পেল না কোথাও। মুহূর্তেই উদ্যানের শরীরটা অসার হয়ে এল। তারপরেও তার ভাবনায় এল না যে মেয়েটা শুধু এই রুমে নয় বরং পুরো সোলার এস্টেটের কোথাও নেই। ভাবনায় না আসাটাই তো স্বাভাবিক, এখান থেকে পালিয়ে যাওয়া কি অসম্ভব নয়?
উদ্যান ত্রস্ত পায়ে পুরো এস্টেট চষে ফেলল। তবুও যখন ফুলের হদিস মিলল না তখনই সে রুমে ফিরে এসে সিকিউরিটি কন্ট্রোল রুমে ঢুকল। সিসিটিভি ফুটেজ চেক করে দেখল ফুল তাদের বেরোনোর আগে একবার তার রুমের সামনে এসেছিল। সবশেষে মেইন গেইটে থাকা সিসিটিভি চেক করতেই তার চোখে আগুন জ্বলে উঠল।

সে দৌড়ে গিয়ে ফোনটা হাতে তুলে নিয়ে ফুলের লোকেশন চেক করল। পেন্ডেন্টের লোকেশন দেখে চোখ কপালে উঠে গেল তার। উদ্যান ভাবতেও পারছে না ফুল পালিয়ে গেছে এস্টেট থেকে। সে আবারও সিকিউরিটি কন্ট্রোল রুমে ফিরে এসে গেটের বাইরের সিসিটিভি ফুটেজ চেক করে দেখে স্তব্ধ হয়ে গেল। সেখানে দেখা যাচ্ছে ফুল পার্কিং এরিয়ার দিকে যাচ্ছে। পার্কিং এরিয়ার ফুটেজ চেক করে চোয়াল শক্ত হয়ে এল তার।

সোহম আর লুহান ফ্রেশ হয়ে ডিনার করার উদ্দেশ্যে নিচে নেমেছিল সবেমাত্র তখনই উদ্যানকে হন্তদন্ত হয়ে বেরিয়ে যেতে দেখে তারাও তার পিছু নিল।

“কোথায় যাচ্ছিস আবার?” লুহানের প্রশ্নের জবাবে উদ্যান কিড়মিড়িয়ে বলল, “পেটাল, এস্টেটে নেই, পালিয়ে গেছে।”

“হোয়াট দ্য ফা*ক!” দুজনেই চিল্লিয়ে উঠল।

উদ্যান পার্কিং-এ এসে গাড়ির ডিকি চেক করল কিন্তু সেটাও ফাঁকা ছিল। সে খুব একটা অবাক হলো না। মেয়েটা এখানে নেই সে জানতো তবুও কেন খুলে দেখেছে সেটা জানেনা।

উদ্যান গাড়িতে না উঠে বাইকে চেপে বসল। সোহম আর লুহানও নিজেদের বাইক স্টার্ট দিয়ে ক্লাবের উদ্দেশ্যে রওনা হলো।

রাত দুটো সাতচল্লিশ মিনিট। কিছুক্ষণের মধ্যেই মেয়েদেরকে শো করা হবে। প্লাটফর্মের সামনে অপেক্ষমাণ আছে দূর দূরান্ত থেকে আসা এলিট শ্রেণীর লোকজন। যারা মূলত বাঙালি মেয়েদের প্রতি ইন্টারেস্টেড।
ঘড়ির কাটায় তিনটা বাজতেই মূল আয়োজন শুরু হলো। জ্বলে উঠল বিভিন্ন রঙের লাইট। গান শুরু হলো সাউন্ড বক্সে। মঞ্চের লাল মখমলের পর্দা সরে যেতেই আলো এসে পড়ল একদল মেয়ের ওপর। কিন্তু সবার মাঝখানে যাকে ধরে এনে দাঁড় করানো হলো, তাকে দেখেই পুরো গ্যালারি এক মুহূর্তের জন্য নিস্তব্ধ হয়ে গেল।

​সে ফুল। তবে এ যেন এক অচেনা রূপে। তার পরনে কালো রঙের অফ-শোল্ডার ওয়েস্টার্ন ড্রেস, যা তার শুভ্র কাঁধদুটোকে নির্মমভাবে উন্মুক্ত করে রেখেছে। হাঁটু পর্যন্ত নামা মসৃণ কাপড়টা তার শরীরের প্রতিটি ভাঁজকে স্পষ্ট করে তুলছে। তার দীর্ঘ কালো চুলগুলো অবিন্যস্তভাবে পিঠের ওপর ছড়ানো, মাথায় একটা পার্লের হেডব্যান্ড। চোখদুটো আধখোলা, টলমলে ভঙ্গি আর ঘোরলাগা দৃষ্টিই বলে দিচ্ছে চারপাশের কিছুই ঠিকমতো বুঝে উঠতে পারছে না সে। চোখের কোণে চিকচিক করছে অশ্রুকণা। নাকের ডগা আর গালদুটো লালচে।

​গানের তালে যখন অন্যান্য মেয়েরা সবার মনোরঞ্জন করতে ব্যস্ত হয়ে পড়ল, ফুল তখন নিজেকে সামলে নিতেই হিমশিম খাচ্ছিল। ইতোমধ্যেই বেশ কয়েকজনের লোলুপ দৃষ্টি আটকে গেছে তার ওপর। অস্বস্তি আর আতঙ্কে মেয়েটার তপ্ত নিশ্বাস যেন আগুনের হলকার মতো ঝরছে। বেশ কয়েকজন লোক উঠে গিয়ে হোস্টকে একান্তে কিছু বলে এল।
​গ্যালারির একপাশে পায়ের ওপর পা তুলে বসে ছিল চার্লস। ফুলের দিকে তাকিয়ে সে ক্রুর হাসল। তার কৃত্রিম দাঁতগুলো অন্ধকারের মাঝেও ঝকঝক করছে। উদ্যান তার সব দাঁত ভেঙে ফেলার পর দীর্ঘ চিকিৎসা শেষে সে এই ডেন্টাল ইমপ্লান্ট করিয়েছে; তাই দাঁতগুলো এখন অস্বাভাবিক সাদা আর নিখুঁত। বাঙালি মেয়েদের প্রতি তার এক ধরণের বিকৃত ঝোঁক আছে, আর সেই টানেই সে আজ এখানে এসেছে। কিন্তু এভাবে অযাচিতভাবে ফুলের দেখা পেয়ে যাবে, কল্পনাও করেনি।
​সে মনে মনে আওড়াল, “হোয়াট আ প্লেজান্ট সারপ্রাইজ… দ্য রেকলেস গার্ল ওয়াকড রাইট ইনটু মাই পাথ।”

ইমপ্লান্ট করা নতুন দাঁতগুলোতে একবার জিভ বুলিয়ে নিয়ে উঠে দাঁড়ায় চার্লস, চলে যায় হোস্টের কাছে।

কয়েক মিনিটের ব্যবধানে বাকি মেয়েদের সরিয়ে রেখে ফুলকে চাহিদা সাপেক্ষে নিলামে ওঠানো হয়। কারণ বেশিরভাগ লোকই তাকে কিনে নিতে চাচ্ছে।

নিলামের মঞ্চের মধ্যমণি হিসেবে ফুলের ওপর লাইট ফোকাস করতেই ফুল চোখমুখ কুচকে ফেলল। আলোটা যেন তার চোখে বিঁধছে। হোস্ট মাইক্রোফোনটা হাতে তুলে নিল। ঠোঁটের কোণে পেশাদার হাসি টেনে চারপাশে তাকাল সে।
তারপর উচ্চস্বরে বলল, “জেন্টলমেন! টুনাইটস স্পেশাল অ্যাট্র্যাকশন। দ্য বিডিং ফর দিস এক্সকুইজিট বেঙ্গলি বিউটি স্টার্টস অ্যাট ফাইভ হান্ড্রেড থাউজ্যান্ড ডলার্স!”

​সাথে সাথেই চারপাশ থেকে বিড শুরু হয়ে গেল।
“সিক্স হান্ড্রেড থাউজ্যান্ড!”
“এইট হান্ড্রেড থাউজ্যান্ড!”
“ওয়ান মিলিয়ন!”
“ওয়ান পয়েন্ট টু মিলিয়ন!”

গ্যালারির ভেতর উত্তাপ ছড়িয়ে পড়ল। লোলুপ চোখগুলো একসাথে নিবদ্ধ হয়ে আছে ফুলের ওপর।
তখনই পায়ের ওপর পা তুলে বসে থাকা চার্লস সিগারটা ঝেড়ে শান্ত গলায় বলল, “ফাইভ মিলিয়ন!”

​পুরো গ্যালারিতে মুহূর্তের জন্য স্তব্ধতা নেমে এল। এক লাফে দাম বাড়ানোয় কয়েকজন অবাক চোখে চার্লসের দিকে তাকাল। তখনই অন্য এক ধনাঢ্য ব্যবসায়ী চিৎকার করল, “সেভেন মিলিয়ন!”

চার্লসের ভুরু কুঁচকে গেল। সে হেলান দিয়ে বসল, তারপর নির্লিপ্ত স্বরে বলল, “টেন মিলিয়ন।”

হোস্ট উত্তেজনায় হাতুড়িটা টেবিলের ওপর ঠুকতে ঠুকতে বলল, “টেন মিলিয়ন ওয়ান্স… টেন মিলিয়ন টোয়াইস…”

ঠিক সেই মুহূর্তে ক্লাবের বিশাল দরজাটা সশব্দে খুলে গেল। সবাই চমকে ঘুরে তাকাল। দরজার ফ্রেমে দাঁড়িয়ে আছে উদ্যান। সে ধীরে ধীরে ভেতরে এগিয়ে এসে বলল, “টুয়েন্টি ফাইভ মিলিয়ন।”

তার উপস্থিতিতে গ্যালারিতে পিনপতন নীরবতা নেমে এল। সে একদৃষ্টে তাকিয়ে আছে ফুলের দিকে। তার প্রশ্নবিদ্ধ চোখজোড়া নজরে আসতেই ফুল ম্লান হাসল। ওষ্ঠাধর কেঁপে উঠল তার। সে অস্ফুট স্বরে কেবল একটা শব্দই উচ্চারণ করতে পারল, ​“উ…দ্যান।”

উদ্যান দীর্ঘ পদক্ষেপে ভিড় ঠেলে সরাসরি পৌঁছে গেল মঞ্চের ওপর, কয়েকজন বাউন্সার সহজাত প্রবৃত্তিতে বাধা দিতে আসতেই লুহান তপ্ত চোখে তাদের দিকে তাকাল; তার চোখের ইশারায় বাউন্সারেরা থমকে যেতে বাধ্য হলো। এদিকে সোহম মঞ্চে উঠে দাপটের সাথে হোস্টের হাত থেকে হাতুড়িটা ছিনিয়ে নিল। কোনো ভূমিকা ছাড়াই সে সশব্দে টেবিলে হাতুড়ি ঠুকল, “টুয়েন্টি ফাইভ মিলিয়ন ওয়ান্স!”

একবার চারপাশে তাকাল সে। চার্লস বিড করতে চেয়েও করল না। কারণ উদ্যানকে সে ভয় পায়। অনেক বেশিই ভয় পায়। এখন মুখ খুললে উদ্যান তার মুখ চিরে ফেলতেও দুবার ভাববে না।
সোহম আবার হাতুড়ি ঠুকল, “টুয়েন্টি ফাইভ মিলিয়ন টোয়াইস।”

ঠোঁটের কোণে এক চিলতে বাঁকা হাসি ফুটিয়ে সোহম শেষবারের মতো হাতুড়িটা সজোরে আঘাত করল।
“সোল্ড!”

ফুলের ওপর দৃষ্টি নিবদ্ধ রেখেই উদ্যান পকেট থেকে নিজের ব্ল্যাক কার্ডটা বের করে হোস্টের দিকে এগিয়ে দিল।

“টেইক দ্য মানি!” উদ্যানের রাশভারি কণ্ঠের বিপরীতে ভয়ে কাঁপতে লাগল হোস্ট। সে জানে উদ্যান আসলে কে! তার সাথে সম্পর্ক খারাপ করার কথা দুঃস্বপ্নেও ভাবতে পারে না সে। অথচ উদ্যানের কণ্ঠে হিংস্রতা স্পষ্ট। সে কী এমন পাপ করেছে যার জন্য উদ্যান তার ওপরে ক্ষুব্ধ হয়ে আছে?

“হারি আপ। আই ডোন্ট হ্যাভ অল নাইট।” উদ্যানের হুশিয়ারিতে হোস্ট কাঁপা কাঁপা গলায় উত্তর দিল,
“ন-নো, মাস্টার… ইটস নট নেসেসারি। উই আর অনার্ড দ্যাট ইউ লাইকড হার। কনসিডার দিস এ গিফট ফ্রম আস।”

উদ্যানের চোখের মনিতে এক পলকের জন্য খুনের নেশা খেলে গেল। সে স্থির দৃষ্টিতে হোস্টের চোখের দিকে তাকিয়ে দরাজ গলায় বলল, “গিফট? বাট আই ডোন্ট টেইক গিফটস ফ্রম ট্র্যাশ। সোয়াইপ দ্য কার্ড অ্যান্ড ক্লিয়ার দ্য ট্রানজেকশন। নাউ!”

ভয়ে হোস্টের কপালে ঘাম জমে গেল। সে দ্রুত কার্ড রিডার মেশিনে কার্ডটা প্রবেশ করাল। কয়েক সেকেন্ডের যান্ত্রিক শব্দের পর ‘Transaction Successful’ লেখাটি ভেসে উঠতেই উদ্যান এক ঝটকায় কার্ডটি ফিরিয়ে নিল।

“থ্যাংকস ফর সেলিং মি মাই ওন প্রপার্টি। আইল মেক শিউর টু রিমেম্বার দিস ফেভার।” তার কথাটা শুনে হোস্ট প্রায় দৌড়েই আড়ালে চলে গেল।

উদ্যান ঘাড় বাকিয়ে ফুলকে ধরে রাখা মেয়ে দুটোর দিকে রক্তচোখে তাকাল। তার চোখের ইশারা বুঝে তারা ত্রস্ত পায়ে পিছিয়ে গেল। ফুল তখনও নেশার ঘোরে টলছে। তার চোখের কোণে জমে থাকা এক ফোঁটা অশ্রু উদ্যানের উপস্থিতিতে যেন প্রশান্তি খুঁজে পেয়ে গাল বেয়ে গড়িয়ে পড়ল।

উদ্যান আনমনেই পরনের ব্লেজারটা খুলে ফুলকে পরিয়ে দিল। অজানা কারণে চুলগুলো দুহাতে এলোমেলো করে দিয়ে তার সব সাজগোছ লেপ্টে দিল। ফুলের মুখটা নিজের বক্ষপিঠে চেপে ধরে ঘাড় বাকিয়ে সবার দিকে তাকাল সে। অতঃপর ঠান্ডা শীতল কণ্ঠে বলল, “ফরগেট হার ফেস। ইরেজ ইট ফ্রম ইউর মেমোরি। বিকজ ইফ দিস ফেস অ্যাপিয়ার্স ইন এনিওনস ড্রিম আফটার টুডে, রিমেম্বার ইট উইল বি দ্য লাস্ট ড্রিম অফ ইউর লাইফ।”

এক মুহূর্ত দেরি না করে উদ্যান প্রবল ক্ষিপ্রতায় ফুলকে নিজের কাঁধের ওপর তুলে নিয়ে ঝড়ের গতিতে ক্লাব থেকে বেরিয়ে গেল। যাওয়ার আগে চার্লসের দিকে এক মরণঘাতী দৃষ্টি ছুড়ে দিতে সে ভুলল না। চার্লস অবশ্য তার দিকে তাকায় নি। সে মাথা নিচু করে বসে ছিল। যেন তাকে সে খেয়ালই করেনি।

ফুলকে নিয়ে বাইকে বসতে গিয়ে বিপাকে পড়ল উদ্যান। মানস্পটে ভেসে উঠল সেই দিনকার কথা। উদ্যান ফুলকে পেছনে না বসিয়ে সামনে বসাল। নেশার ঘোরে মেয়েটা উদ্যানের বুকের সাথে লেপ্টে যেতে চাইল। তার অবাধ্য হাত দুটো সামলাতে উদ্যান দ্রুত রুমাল দিয়ে ফুলের হাতদুটো নিজের কোমরের সাথে বেঁধে ফেলল।
​কিন্তু তাতেও রেহাই মিলল না। ফুল শার্টের ওপর দিয়েই উদ্যানের বুকে বারবার নাক ঘষতে লাগল, অস্ফুট স্বরে কিছু বলতে চাইল। উদ্যান চরম বিরক্তিতে তার মুখ চেপে ধরে গর্জে উঠল, “ফাজলামো বন্ধ করো! নয়তো এক থাপ্পড়ে বেহুঁশ করে ফেলব!”

ফুল বাচ্চাদের মতো ঠোঁট ফুলিয়ে বলল, “আপনি শুধু আমার… আমি যা খুশি তাই করবো।”

উদ্যান থমকাল। অতঃপর নিজেকে সামলে নিয়ে বলল, “এস্টেটে ফিরে যা খুশি কোরো বাট রাস্তায় নয় ওকে?”

ফুল মাথা নাড়লেও তার অবাধ্যতা থামল না। দম আটকে আসা অবস্থায় উদ্যান এক হাতে ফুলের ঘাড় চেপে ধরে তাকে একটু দূরে সরাল এবং অন্য হাতে তার চুলগুলো দিয়ে মুখটা প্রায় ঢেকে দিল। খেয়াল রাখল যেন শ্বাস-প্রশ্বাসে সমস্যা না হয়।

অতঃপর তারা রওনা হলো এস্টেটের পথে। মাঝ রাস্তায় ফুলের শরীর ঢিলে হয়ে আসতেই উদ্যান ভড়কে গেল। দাঁতে দাঁত পিষে সে বাইক থামিয়ে চেক করে দেখল মেয়েটা ঘুমিয়ে গেছে। সে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে আবারও বাইক স্টার্ট দিল।
এস্টেটে ফিরে ফুলের রুমে ফুলকে শুইয়ে রেখে উদ্যান নিজের রুমে ঢুকে শাওয়ার নিয়ে নিল।

ডাইনিং হলে একসাথে ডিনার করতে বসেছে উদ্যান, সোহম আর লুহান। তখনই মেলো ঘুম ঘুম চোখে উঠে এসে তাদের সামনে দাঁড়াল। সোহম বলল, “তুই তো শান্তিতে ঘুমোচ্ছিস, আমরা যে কতো কিছু করে এলাম জানিস?”

মেলো একটা চেয়ার টেনে বসে একহাতে মাথা চেপে ধরল। খিটখিটে মেজাজে বলল, “মিস্টার ভিক্টর রোমানো, বডিশপ ক্লাবের ওনার কল দিয়েছে। সে তেহুর সাথে কথা বলতে চায়।”

উদ্যান যেন শুনলোই না। নির্বিঘ্নে খাবারে মনোযোগ দিল। ভেজা চুল থেকে পানি পড়তে পড়তে তার শার্টের ঘাড়ের অংশ ভিজে জবজবে হয়ে গেছে। মেলো একবার তার দিকে তাকিয়ে তপ্ত শ্বাস ফেলল, “আমি বলেছি বিকালে কল দিতে কিন্তু সে নাকি এখনই কথা বলবে।”

লুহান কাঠখোট্টা কণ্ঠে বলল, “সরি বলে লাভ হবেনা। তেহুর ওয়াইফকে নিলামে তোলার খেসারত তাকে দিতেই হবে।”

সোহম বলল, “হুম, আমাদের পৌঁছাতে যদি আর একটু দেরি হতো, বিউটিফুলকে চার্লস কিনে নিয়ে চলে যেতো।”

কথার মাঝেই আবারও মেলোর ফোন বেজে উঠল। মেলো কেটে দিতে চাইলে উদ্যান হাত বাড়িয়ে ফোনটা নিয়ে নেয়। কয়েক সেকেন্ড ওপাশের লোকটার কথা শোনার পর উদ্যান মুখের খাবার টুকু গিলে বলে, “ইট্‌স ফাইন। জাস্ট শাট দ্য বার ডাউন অ্যান্ড নেভার শো ইউর ফেস টু মি।”

উদ্যান কল কেটে দিতেই লুহান সরু চোখে তাকাল, “এতো সহজে ছেড়ে দিবি?”

“তো, আর কী করবো? মেয়েটাকে ওরা তুলে নিয়ে তো যায়নি। নিজের পায়ে হেঁটে গেছে।”

সোহম মাথা নাড়ল, “তবুও কাজটা ঠিক হয়নি।”

উদ্যান এক মুহূর্তের জন্য থম মেরে রইল। পরমুহূর্তেই প্লেটের মধ্যেই হাত ধুয়ে উঠে পড়ল। হনহনিয়ে চলে গেল ফুলের রুমে।

ফুল তখন ওয়াশরুমে ছিল। উদ্যান ধপ করে বিছানায় বসে পড়ল। কানে ভেসে এল বমি করার শব্দ। প্রায় আধাঘন্টা পার হয়ে গেলেও ফুল বের হলো না। পানির শব্দ থেকে বোঝা যাচ্ছে মেয়েটা শাওয়ার নিচ্ছে। ঠিক পঞ্চাশ মিনিট পর ফুল বেরিয়ে এল। খাটের ওপর উদ্যানকে বসে থাকতে দেখে তার শরীর জমে গেল। কাপড় না নিয়ে যাওয়ার কারণে তাকে বাথরোব পরেই বের হতে হয়েছে। সে ধীরপায়ে ওয়ার্ডোবের দিকে যেতে নেবে তখনই উদ্যান শান্ত চোখে তার দিকে তাকায়। কেঁপে ওঠে ফুলের তনুমন।

দৌড়ে চলে যেতে চায় ওয়াশরুমে কিন্তু তার আগেই উদ্যান প্যাঁচিয়ে ধরে তার কোমর। অন্য হাতে চেপে ধরে ফুলের গলা। “কেন গিয়েছিলে সেখানে?”

ফুল ছটফটিয়ে ওঠে। মুক্তি পেতে চায় তার হাতের জোরালো বন্ধন থেকে কিন্তু পারেনা। তৎক্ষনাৎ মনে পড়ে যায় ক্লাবের ঘটনা গুলো। ফিসফিস করে শুধায়,
“আপনি কেন গিয়েছিলেন?”

উদ্যান ক্ষেপে যায়, “তুমি নিশ্চয়ই দেখেছো আমি কেন গিয়েছিলাম?”

ফুলের রক্তিম ঠোঁটজোড়া কেঁপে ওঠে। লাল হয়ে যায় সম্পূর্ণ মুখশ্রী। ছোটার চেষ্টা থামিয়ে দিয়ে তাচ্ছিল্যের সুরে বলে, “আপনিও দেখেছেন আমি কেন গিয়েছিলাম।”

উদ্যান মারাত্মক রেগে যায়। দিশাহারা হয়ে ফুলকে আছড়ে মারে ফ্লোরে। “তুমি বিক্রি হতে গিয়েছিলে? লাইক সিরিয়াসলি! আমার অনুমতি ছাড়া এস্টেটের বাইরে পা রাখার সাহস পেলে কোথায়?”

ঘটনার আকস্মিকতায় ফুল ব্যাথা পেল কোমরে। তবুও নিজেকে সামলে নিয়ে সেভাবেই বলল, “গিয়েছি একদম বেশ করেছি! যেই লোক মেয়েলোক কিনতে নিষিদ্ধ জায়গায় যায়। তার বউয়েরও বিক্রি হয়ে যাওয়াই উচিত।”

উদ্যান রক্তচোখে তাকাল ফুলের দিকে। এগিয়ে গিয়ে তার থুতনিটা সজোরে চেপে ধরল, “তোমার বিক্রি হয়ে যাওয়ারও কোনো যোগ্যতা নেই। যে তোমাকে কিনে নেবে তার পুরো টাকাটাই গচ্ছা যাবে। কী করবে তোমাকে দিয়ে? কোন কাজে আসবে তুমি তার?”

ফুলের হৃদপিণ্ডে যেন কেউ ছুরি ঢুকিয়ে দিল। সে যন্ত্রণাকাতর চোখে উদ্যানের দিকে তাকিয়ে বলল, “আপনার যদি তাই মনে হয়, তাহলে কেন নিজের টাকা গচ্ছা যেতে দিলেন?”

উদ্যান তাচ্ছিল্য মিশিয়ে চাপা স্বরে বলল, “আমি চাইনি অন্য কারো লোকসান হোক। আফটার অল ইউ আর মাই ফা*কিং ওয়াইফ, নিজের ইউজলেস বউটার অক্ষমতার দায় আমিও তো এড়িয়ে যেতে পারি না।”

ফুলের ইচ্ছে করল মাটির সাথে মিশে যেতে। এই ধরনের কথাবার্তা শোনার জন্য তৈরি ছিল না সে। এমনিতেই ক্লাবের ঘটনা তাকে যন্ত্রনা দিচ্ছিল। “আপনি আমাকে অসম্মান করছেন তেহজিব।”

উদ্যান ঘাড় কাত করে বলল, “বিক্রি হতে চাওয়া মেয়েদের সম্মান কীভাবে দেখায়, জানা নেই আমার।”

ফুল হঠাৎই হাঁটুতে ভর দিয়ে দুহাতে চেপে ধরল উদ্যানের শার্টের কলার। দাঁত খিচে বলল, “আমি বিক্রি হতে যাইনি। কোনো ইচ্ছাও ছিল না। আমি শুধু আপনি কী করতে যাচ্ছেন সেটা দেখতে গিয়েছিলাম।”

উদ্যান আরও একটু ঝুকে গিয়ে বলল, “বেশ তো, দেখে নিয়েছো আশা করি। খুব শীঘ্রই আমি এমন কাউকে নিয়ে আসবো যে আমার প্রয়োজন মেটাতে পারবে।”

ফুলের হাত আলগা হয়ে এল। “আপনি এমন কিছুই করবেন না।”

উদ্যান কাঁধ ঝাকিয়ে বলল, “করবো কী করবো না তাতো দেখতেই পাবে।”

ফুলের হাতের মুঠি আলগা হয়ে এল। তার সারা পৃথিবী যেন ভেঙে তছনছ হয়ে যাচ্ছে। গলার কাছে দলা পাকিয়ে আসা কান্নাগুলো সে গিলে নিতে চাইল, কিন্তু পারল না। চোখের জলে তার দৃষ্টি ঝাপসা হয়ে এল। সে আবারও সর্বশক্তি দিয়ে উদ্যানের শার্টের কলারটা চেপে ধরল। মুখ বরাবর নিজের মুখ নিয়ে গিয়ে রুদ্ধস্বরে বলল, “আপনি ভালোবাসেন না আমাকে স্বীকার করে নিন তবে।”

উদ্যানের দৃষ্টি স্থির হয়ে রইল ফুলের কম্পিত ওষ্ঠাধরে। এক আদিম আকাঙ্ক্ষা তার মস্তিষ্কের রন্ধ্রে রন্ধ্রে বিষ ছড়াতে শুরু করল; ইচ্ছে হলো এখনই সব দূরত্ব ঘুচিয়ে দিতে। কিন্তু পরক্ষণেই নিজেকে সামলে নিয়ে মুখ ফিরিয়ে নিল সে। এক অদ্ভুত শীতলতায় বিড়বিড়িয়ে বলল, “আমি ভালোবাসি তোমাকে।”

​ফুলের কানে কথাটা তপ্ত সিসার মতো ঠেকল। অভিযোগের সুরে বলল, “ভালোবেসে থাকলে অন্য কাউকে আনার কথা বলতে পারতেন না।”
“সেটার সাথে ভালোবাসার কী সম্পর্ক? সে শুধুমাত্র আমার ‘বেড পার্টনার’ হবে। তোমার মতে তো শারীরিক সম্পর্ক স্থাপনকে ভালোবাসা বলেনা তাইনা?”

উদ্যানের কথায় তালগোল পাকিয়ে গেল ফুলের। সে অবুঝের মতো ভাঙা কণ্ঠে প্রশ্ন করল, “ভালোবাসেন আমাকে আর ‘বেড পার্টনার’ বানাবেন অন্য কাউকে?”
“তো? আমার বউ যদি সে`ক্সুয়ালি ডিজেবল হয় তাহলে আমাকে অন্য মেয়ের কাছে যেতে হবেনা? ফিজিক্যাল নিড বলেও তো একটা কথা আছে।”

ফুলের গলা শুকিয়ে এল। অস্ফুটস্বরে উচ্চারণ করল, “আমি… আমি সে`ক্সুয়ালি ডিজেবল?”

উদ্যান তাকে সরিয়ে দিয়ে সোজা হয়ে দাঁড়ল। পকেটে হাত গুজে জানালার দিকে তাকিয়ে নির্লিপ্ত স্বরে বলল, “ইউ আর ডিজেবল, সেই জন্যই আমি চাইনি অন্য কেউ তোমাকে কিনে প্রতারিত হোক।”

লজ্জা আর অপমানে ফুল মাথা নিচু করে নিল। ঠোঁট কামড়ে ধরে সে নিজেকে সামলানোর আপ্রাণ চেষ্টা চালাল। “আপনি নিজের দোষ ঢাকতে আমাকে নিয়ে এভাবে যা খুশি তাই বলে দিলেন, তেহজিব?”
“আমি কোনো দোষ করিনি।”
“বউকে ভালোবেসেও পরনারীদের কাছে যাওয়া দোষের নয়? বউয়ের সামনে দাঁড়িয়ে তাকে নিয়ে এমন জঘন্য মন্তব্য করাও দোষের নয়?”
“আমি কোনো জঘন্য মন্তব্য করিনি। স্রেফ সত্যিটা বলেছি। তুমি আমার প্রয়োজন পূরণ করতে পারলে আমাকে অন্য কারো কাছে যেতে হতো না।”

ফুল আর পারল না কান্না আটকে রাখতে। সে হঠাৎ করে উঠে দাঁড়াল। ভেজা চুলের তোয়ালেটা একপাশে ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে সে কাঁপা কাঁপা যান্ত্রিক হাতে নিজের বাথরোবের বাঁধন আলগা করতে শুরু করল।

“আপনার সব প্রয়োজন মিটিয়ে দেব আমি। দেখুন তবে…!”

উদ্যান দেখল ফুলের হাতদুটো থরথর করে কাঁপছে। তবুও সে স্থির চোখে চেয়ে রইল ফুলের দিকে। উদ্যানের চাউনি দেখে ফুলের কান্নার মাত্রা বেড়ে গেল। বাথরোবটা তার শুভ্র কাঁধ থেকে খসে পড়ার ঠিক আগের মুহূর্তে উদ্যান ক্ষিপ্র গতিতে প্রতিরোধ করল। বিড়বিড়িয়ে বলল, “নট লাইক দ্যাট, তোমাকে খুশি খুশি আমার কাছে আসতে হবে। এভাবে চোখের জলে নাকের জলে হয়ে থাকলে আমি মজা পাবো না। আমাকে এতোদিন সাফার করানোর জন্য তোমাকে অবশ্যই ক্ষমা চাইতে হবে। তবেই হয়তো আমার সিদ্ধান্ত বদলাবে।”

উদ্যান দরজার দিকে হাঁটা ধরল তখনই ফুল বলে উঠল, “আগে শুধুমাত্র বউ ছিলাম আপনার, এখন থেকে কৃতদাসীও বটে। অবশ্যই আপনাকে খুশি করার সর্বোচ্চ চেষ্টা করব। যাতে আমাকে কিনে নিজেকে প্রতারিত মনে না হয়। টাকা গুলো জলে না যায়। অন্য কোনো কৃতদাসীর প্রয়োজনও বোধ না করেন।”

উদ্যান পিছু ফিরল না। দরজার চৌকাঠে গিয়ে জিভ দিয়ে গালের ভেতরের ত্বক স্পর্শ করে সংক্ষেপে বলল, “বেস্ট অফ লাক!”

সে চলে যেতেই ফুল দরজা লাগিয়ে দিয়ে বিছানায় গা এলিয়ে দিল। একটু ঘুমিয়ে নেওয়া প্রয়োজন, সকালে তার ভার্সিটি আছে। আর কিছুক্ষণ পরেই ভোরের আলো ফুটে যাবে। ঘুমানোর নিয়তে ফুল চোখ বুজল ঠিকই কিন্তু ঘুমাতে পারবে বলে মনে হলো না। কেমন যেন চোখ জ্বালা করছে। কিয়ৎক্ষণের মধ্যেই বন্ধ চোখের পাপড়ি বেয়ে নোনাজল গড়িয়ে পড়তে লাগল তার।

চলবে,,,

শব্দসংখ্যা: ২৮০০+

Share On:

TAGS: ,



CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
Related Posts
 

0 Responses

Leave a Reply