অবাধ্য_হৃৎস্পন্দন (৪৪)
সোফিয়া_সাফা
সকাল সকাল ফ্রেশ হয়ে আয়নার সামনে দাঁড়াল ফুল। ব্যান্ডেজ প্যাঁচানো মাথার দিকে তাকিয়ে ছোট্ট শ্বাস ফেলল সে। হঠাৎ পেটের মধ্যে গুড়গুড় করে উঠল তার। ক্ষুধা লেগেছে; যেদিন সে সুস্থ থাকে সেদিন কিচেনে গিয়ে ব্রেকফাস্ট খায়। আজও তার ব্যতিক্রম হবে না। চুলগুলো আঁচড়িয়ে নিচু করে খোঁপা করে নেয় সে। তারপর পা বাড়ায় দরজার দিকে।
লুহান আজ কোনো এক কারণে তাড়াতাড়ি উঠে গেছে। আর সকালে ঘুম ভাঙলে ব্রেকফাস্ট না করে থাকা যায় না। সে ব্রেকফাস্ট করার উদ্দেশ্যে ডাইনিং হল পেরোনোর সময় রিদমকে বসে থাকতে দেখতে পায়। রিদম কাউচে বসে আছে, কোলের ওপর ল্যাপটপ রাখা। হয়তো কাজ করছে। লুহান দুপা পিছিয়ে রিদমকে বলল, “ওই কিরে! তুই সাতসকালে এখানে কী করছিস?”
রিদম মাথা না তুলেই জবাব দিল, “আগামীকাল পার্টি আছে, ক্লায়েন্টদেরকে ইনভাইট করছি।”
লুহানের ভ্রু কুঁচকে গেল। পরনের সুইটপ্যান্টের পকেটে হাত গুঁজে ধীর পায়ে রিদমের পাশে এসে দাঁড়াল। “সেটা বুঝতে পারলাম কিন্তু এখানে কী করছিস? রুমে বসে কাজ করা যাচ্ছিল না?”
রিদম ভাবলেশহীন ভঙ্গিতে স্ক্রিনে চোখ নিবদ্ধ রাখল। “যাচ্ছিল না, রুমে উর্বী আছে। আমি ওর সামনা-সামনি যেতে চাইছি না।”
লুহানের কেন যেন হাসি পেল। হাসি আটকে বলল, “সোহমের থেকে জানতে পারলাম, উর্বী তোর ফ্রেন্ড। আসলেই কি তাই?”
“হ্যাঁ।”
লুহান কিয়ৎক্ষণ রিদমের মুখের দিকে তাকিয়ে রইল। রিদমের চেহারার অবস্থার কোনো উন্নতি হয়নি। লুহান বিড়বিড়িয়ে বলল, “কাজের চাপে দাড়ি আর চুল কাটারও সময় পাসনি? তোকে এই লুকে ইন্ডিয়ান কম নাইজেরিয়ান বেশি লাগছে।”
এ কথার পৃষ্ঠে রিদম কিছু বলার প্রয়োজন বোধ করল না। লুহান এবার পকেট থেকে হাত বের করে রিদমের কাঁধে রাখল। চাপা গলায় বলল, “তুই কেন নিজেকে ব্লেইম করছিস বুঝতে পারছি না, এতো গিল্টি ফিল করার কী আছে? রিহান উর্বীকে তোর ফ্রেন্ড ভেবেই তুলে নিয়ে গিয়েছিল। ভেবেছিল ওকে জিম্মি করে তোর থেকে সব তথ্য বের করতে পারবে। তুই তাও কিছু বলিসনি, এখানে তোর ভুল নেই। সামান্য ফ্রেন্ডের জন্য কেইবা নিজের পায়ে কুড়াল মারে?”
রিদম আলগোছে লুহানের হাত সরিয়ে দিল। নিষ্প্রাণ কণ্ঠে বলল, “রিহান যেই বিষয়ে জানতে চেয়েছিল সেই বিষয়ে আমিও কিছুই জানি না, আমি বারবার বলেছিলাম ওকে। একসময় ও আমার কথা মেনে নিয়ে বলেছিল উর্বীকে ছেড়ে দেবে। ও মিথ্যা বলেছিল।”
“তোর কথা শুনে মনে হচ্ছে, তুই লোকটার বিষয়ে জানলে রিহানকে বলে দিতি।”
“হয়তো বলে দিতাম। তেহ একদম ঠিক করেছে লোকটাকে আড়ালে রেখে।”
লুহান চমকে তাকাল। “তুই কী বলছিস, নিজে বুঝতে পারছিস?”
রিদম নিরুত্তর রইল। লুহান একটু সময় নিয়ে বলল, “উর্বীকে এখানে রাখা ঠিক হবে না। আমি তেহুর সাথে বের হবো। তুই ওর বাড়ির ঠিকানা বল, আসার সময় রেখে আসব।”
রিদম কি-বোর্ডের ওপর আঙুল চালাতে চালাতে বলল, “প্রয়োজন নেই।”
“দেখ, ওর বাবা-মা নিশ্চয়ই ওকে খুঁজছে। মেয়েটা তো তোর ফ্রেন্ড হয়, তোর উচিত হবে তেহকে বুঝিয়ে শুনিয়ে ওকে বাড়িতে পৌঁছে দেওয়া।”
“প্রথমত ওর বাবা-মা ওকে খুঁজছে না। দ্বিতীয়ত ওকে সেখানে রেখে আসলে ও কয়েকদিনের মধ্যেই মরে যাবে। ওর নিজের বাবা-মাই মে’রে ফেলবে ওকে।”
“তারা এমন কেন করবে? উল্টো আমার মনে হচ্ছে বাবা-মায়ের সাথে থাকলে ও দ্রুত সুস্থ হয়ে উঠবে।”
“ভুল ভাবছিস তুই। ওর পেরেন্টস আর দশটা পেরেন্টস এর মতো নয়। বিশেষ করে ওর মা। খুব ধার্মিক, ডিভোর্সি হওয়ার কারণে আগে থেকেই দেখতে পারে না ওকে। সহজ ভাষায় বললে, ওর মা মেলোর মায়ের মতো। যারা প্রকৃত মায়ের ডেফিনিশন ফলো করে না।”
মেলোর কথা উঠতেই লুহানের মুখ ফ্যাকাশে হয়ে গেল। “দেখ যা ভালো মনে করিস তাই কর। শুধু গিল্টি ফিল করে নিজেকে শাস্তি দিস না। আমি অন্তত তোর গিল্টি ফিল করার কারণ খুঁজে পাচ্ছি না। রেপ শব্দটা আমাদের কাছে নতুন নয়। তোর কাছে তো একদমই না।”
রিদমের আঙুল থেমে গেল। শান্ত চোখে তাকাল লুহানের দিকে। কিছুটা তেজমিশ্রিত কণ্ঠে বলল, “হ্যাঁ, বারবার তোকে আর সোহমকে মনে করিয়ে দিতে হবে না যে আমি একজন ফা’কার।”
“তুই ক্ষেপে যাচ্ছিস কেন? আগে তো খুব প্রাউড ফিল করতি, এখন কী হলো?”
রিদম ল্যাপটপটা হাতে তুলে নিয়ে লুহানকে সতর্ক করে দিয়ে বলল, “যা এখান থেকে নইলে…”
লুহান হাসতে লাগল, “নইলে ওটা ছুড়ে মারবি আমার ওপর? দাঁড়া আমি রেডি হয়ে নিই; তারপর মার।”
রিদমের থমথমে মুখটা দেখে লুহান মশকরা থামিয়ে দিল। “আচ্ছা, তুই নিজের কাজ কর। আমি যাচ্ছি।”
লুহান উল্টো ঘুরে চলে আসতে নিলে দরজার সামনে দাঁড়িয়ে থাকা ফুলের দিকে চোখ যায়। লুহানের কাছে ধরা খেয়ে ফুল হড়বড়িয়ে গিয়ে দরজার ফ্রেম ছেড়ে দিয়ে সোজা হয়ে দাঁড়াল। সবসময় সে-ই কেন এমন কিছু শুনে ফেলে যা তার শোনার কথা থাকে না? সবসময় সে-ই কেন?
“তুমি এখানে?” লুহানের প্রশ্নে ফুল ডাইনিং হলে প্রবেশ করল।
“হ্যাঁ, আমার এখানে থাকাটা স্বাভাবিক হলেও আপনাদের আশা করিনি।”
লুহান সন্দিহান চোখে তাকাল। ফুল ম্লান হেসে বলল, “আপনাদের ঘুম তো দুপুরের আগে ভাঙে না, তাই বললাম।”
রিদম একনজর ফুলকে দেখে নিয়ে পুনরায় কাজে মনোযোগী হলো। ফুল ডাইনিং হল পেরিয়ে কিচেনে ঢুকল। লুহান চলে গেল ফুলের পিছু পিছু।
কয়েকজন মেইড আর শেফ মিলে দুপুরের রান্নার প্রস্তুতি নিচ্ছে। ফুল আর লুহানকে দেখে তাদের মধ্যে থেকে একজন মেইড জিজ্ঞেস করল, “মিস্ট্রেসা আর লুহান স্যার, কী খাবেন আপনারা বলুন, আমি বানিয়ে দিচ্ছি।”
ফুল একবার চারদিকে তাকাল। কিন্তু নাদিয়া বা রুমাকে খুঁজে পেল না। লুহান বলল, “আমার জন্য স্ক্র্যাম্বলড এগ আর অ্যাভোকাডো টোস্ট।”
“আর মিস্ট্রেসা?”
ফুল সংক্ষেপে বলল, “ওটস।”
মেইড তাদের বলে দেওয়া খাবার তৈরি করতে ব্যস্ত হয়ে পড়ল। ফুলকে এদিক-ওদিক তাকাতে দেখে লুহান প্রশ্ন করল, “কিছু খুঁজছ?”
“হ্যাঁ, রুমা বা নাদিয়া আপুকে দেখছি না কোথাও।”
লুহান প্রসঙ্গ পাল্টে ফেলল তৎক্ষণাৎ। “তেহ বলল তোমাকে নিয়ে নাকি যাবে এক জায়গায়। কদিনের জন্য যাবে তোমরা?”
“জানি না, হয়তো ২-৩ দিনের জন্য। কেন?”
লুহান একটু দ্বিধাগ্রস্ত কণ্ঠে বলল, “তুমি কি কোনোভাবে এক সপ্তাহের জন্য তেহকে আটকে রাখতে পারবে না?”
ফুল বড় বড় চোখে তাকাল, “মানে কেন?”
লুহান নিরুপায় হয়ে বলল, “রুমার জন্য, তেহ আমাকে তিনদিন সময় দিয়েছে। কিন্তু তিনদিন খুব কম সময়, কীভাবে কী করব বুঝতে পারছি না।”
ফুল বোকা বোকা চোখে চেয়ে রইল। লুহানের কথা বোধগম্য হয়নি তার। “রুমা আপুর জন্য, সময় লাগবে?”
লুহান উপর-নিচ মাথা ঝাঁকাল। ফুল বলল, “একটু ক্লিয়ার করে বলবেন?”
লুহান দীর্ঘশ্বাস ফেলল। “তেহুর মনে হচ্ছে রুমাই রিহানের সিক্রেট স্পাই। রুমার মাধ্যমেই রিহান তোমাকে আর রিদমকে কিডন্যাপ করে নিয়ে যেতে পেরেছে।”
“কী! রুমা আপু এমন বিশ্বাসঘাতকতা করেছে?”
“করেছে কী করেনি সেটা উদঘাটন করতেই তো সময় লাগবে। যদি তুমি একটু সাহায্য করতে।”
“তিনদিন সময় দিয়েছে কেন? তিনদিন পর কী করবে সে রুমা আপুর সাথে?”
“কী আর করবে, পানিশমেন্ট দেবে।”
ফুল আর কোনো প্রশ্ন করার আগেই মেইড তার ব্রেকফাস্ট রেডি করে দিল। ফুল সেটা নিয়ে ডাইনিং টেবিলে এসে একটা চেয়ার টেনে বসল। রিদম এখনো সেখানেই ছিল। ফুল বিনাবাক্যে ব্রেকফাস্ট সেরে উঠে দাঁড়াল।
↓
বুকের ওপর ভর দিয়ে বেঘোরে ঘুমোচ্ছে উদ্যান। পাতলা কমফোর্টারটা কোমর অবধি টেনে রাখা। তার হানি স্কিন টোনের উদোম পিঠ দৃশ্যমান। পিঠের ওপরের নির্দয় ক্ষতগুলো যেন চকচক করছে। হঠাৎ ডোরবেল বেজে ওঠায় উদ্যানের তন্দ্রাচ্ছন্নতা টুটে যায়। বালিশ থেকে মুখ তুলে আধোচোখে তাকায় দরজার দিকে। ঘুমকাতর কণ্ঠে শুধায়, “অ্যালেক্স, হু ইজ ইট?”
“ইট ইজ দ্য ইন্ডিভিজুয়াল ইউ অ্যাড্রেস অ্যাজ পেটাল।”
উদ্যান পুনরায় বালিশে মুখ গুঁজে বলে, “লেট হার ইন।”
ভারী দরজাটা খুলে যেতেই বিছানার এক পাশে শুয়ে থাকা তান মাথা তুলে সেদিকে তাকায়। ফুল ভেতরে উঁকি দিতেই তানের সাথে চোখাচোখি হয়ে যায় তার। সে ঢোক গিলে বাড়িয়ে দেওয়া পা ফিরিয়ে নেয়। তান এখনো তার দিকেই তাকিয়ে আছে। ফুল একবার উল্টো ঘুরে চলে যেতে নেয়, পরমুহূর্তেই সাহস জুগিয়ে সে রুমের ভেতরে পা রাখে। কাঁপা স্বরে ডাকে, “মাস্টার, আপনার সাথে কথা ছিল।”
সঙ্গে সঙ্গেই তান খাট থেকে একপ্রকার লাফিয়ে নামে। ফুল আতঙ্কিত হয়ে দুহাতে মুখ ঢেকে আকাশ-পাতাল কাঁপিয়ে চিল্লিয়ে ওঠে।
“আহ্!” তার চিৎকারে উদ্যান ঝাঁকুনি খেয়ে উঠে বসে। তান সেসবে পাত্তা না দিয়ে ফুলের পায়ের কাছে বসে জিভ বের করে লেজ নাড়ছে।
উদ্যান শান্ত গলায় তাকে ডাক দেয়, “তান, কাম হেয়ার।”
তান এক দৌড়ে উদ্যানের কাছে চলে যায়। ফুলের ভয় এখনো কাটেনি। সে চোখ খিঁচিয়ে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে কাঁপছে। নড়াচড়ার ক্ষমতাটুকুও যেন হারিয়ে ফেলেছে সে। উদ্যান তানের মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে দিতে নিচু স্বরে বলল, “লেটস প্লে হাইড অ্যান্ড সিক, ওকে? ইউ শুড গো অ্যান্ড হাইড সামহোয়্যার।”
তান কান নাড়ল, তারপর ছুটে চলে গেল ফিটনেস স্টুডিওর দিকে।
“তান চলে গেছে, তুমি চোখ খুলতে পারো এবার।” উদ্যান গায়ে শার্ট জড়াতে জড়াতে কথাখানা বলল।
ফুল পিটপিট চোখে পুরো রুমে চোখ বুলিয়ে লম্বা শ্বাস নিল। ধিমে পায়ে এগিয়ে গেল উদ্যানের দিকে।
“তুমি আমার রুমে এসেছ, বিশ্বাস হচ্ছে না।”
“বিশ্বাস না হওয়ার কিছুই নেই। আপনি বলেছিলেন সকালে খানজাদা নিবাসে নিয়ে যাবেন। ঘড়ির কাঁটায় দশটা বাজতে চলল, এখনো আপনার ঘুমই ভাঙেনি।”
“বারোটা বাজার আগ পর্যন্ত সকালই থাকবে পেটাল। ডোন্ট ওয়ারি। বারোটা বাজার আগেই রওনা হব।”
ফুল দীর্ঘশ্বাস ফেলল। “যা বলতে এসেছিলাম, শুনুন, আমি উর্বী ম্যামকে সঙ্গে নিয়ে যেতে চাই।”
উদ্যান অনুভূতিশূন্য চোখে তাকাল। “নো।”
“আপনি কি আমার কোনো কথা শুনবেন না?”
“কোন কথাটা শুনিনি তোমার? বাড়িতে নিয়ে যাওয়াটা কি যথেষ্ট নয়?”
“যথেষ্ট, কিন্তু উর্বী ম্যামকে নিয়ে গেলে আমার ভালো লাগবে। তাকে রেখে গেলে চিন্তায় থাকব। রিদম স্যারকে সুবিধাজনক লাগে না আমার। উপরন্তু উর্বী ম্যাম বাইরের পরিবেশে গেলে দ্রুত স্বাভাবিক হতে পারবে।”
উদ্যান নিশ্চুপ রইল। ফুল খাটের ওপর উঠে গিয়ে উদ্যানের পাশে বসল। হঠাৎ হাত জোড় করে বার দুয়েক নেত্রপল্লব ঝাপটে উদ্যানের চোখে চোখ রেখে বলল, “প্লিজ মাস্টার, প্লিজ। নিয়ে যাই না তাকে?”
উদ্যান কিছুক্ষণ ফুলের দিকে স্থির চোখে তাকিয়ে থেকে আচমকা তার ঘাড় চেপে ধরে নিজের মুখ বরাবর নিয়ে আসে। চোখের পলকেই দখলে নিয়ে নেয় ফুলের আবেদনময়ী ঠোঁটজোড়া। হতবিহ্বল হয়ে যায় ফুল। বিস্ময়ে চোখ বড় বড় হয়ে যায় তার। চুমু ভেঙে বিছানা ছেড়ে উঠে দাঁড়ায় উদ্যান। চুলে স্লাইড করতে করতে নিষ্প্রভ কণ্ঠে বলে, “পারমিশন গ্রান্টেড। রেডি হয়ে নাও গিয়ে।”
ফুলের মাথা ঝিমঝিম করে ওঠে। নিরাসক্ত পায়ে দ্রুতগতিতে উদ্যানের রুম ত্যাগ করে সে।
↓
উদ্যান ফ্রেশ হয়ে একেবারে রেডি হয়ে নিচে এলো। দেখল লুহান লিভিং রুমে বসে আছে। সে ভ্রু উঁচিয়ে জানতে চাইল, “তুই এত সকালে এখানে কী করছিস, তাও আবার একদম রেডি হয়ে? কোথাও যাবি নাকি?”
উদ্যানের কথায় লুহান হতবুদ্ধি হয়ে তাকায়। “কোথায় যাব মানে? তোদের সাথে যাব না আমি?”
সোফায় আসন গেড়ে বসে পড়ল উদ্যান। “না, তোকে যেতে হবে না। আমি নিজেই ড্রাইভ করে যেতে পারব।”
“কিন্তু তুই না রাতে বললি, তুই ফুলকে নিয়ে বাইরে যাবি আমি যেন রেডি হয়ে থাকি?”
উদ্যান বিরক্ত হলো। “তোকে আমি আমাদের সাথে যাওয়ার জন্য রেডি হতে বলিনি। বরং দুদিন পরের পার্টির জন্য রেডি হতে বলেছি। আমার অবর্তমানে ক্লায়েন্টের সাথে তুই কথা বলবি।”
“রিদম থাকতে আমাকে কথা বলতে হবে কেন?”
উদ্যানের শান্ত চোখের সাথে চোখাচোখি হতেই লুহান মিছেমিছি হাসার চেষ্টা করল। “ওহ ভুলে গিয়েছিলাম, তোদের দুজনের মধ্যে তো স্নায়ুযুদ্ধ চলছে। ঠিক আছে, তুই নিশ্চিন্তমনে ঘুরে আয়। আমি ক্লায়েন্টের সাথে কথা বলে নেব।”
তাদের কথার মাঝেই ফুল উর্বীকে নিয়ে নিচে নেমে আসে। ফুলের পরনে ফ্লোরাল লং ফ্রক। ওড়না দিয়ে চুল ঢেকে রাখা। উর্বীকেও সে নিজের মতো করে রেডি করে এনেছে।
“আমরা কোথায় যাব ফুলমতি?” উর্বীর জিজ্ঞাসার উত্তরে ফুল মিষ্টি হেসে বলল, “আমরা ঘুরতে যাব ম্যাম।”
উর্বী একটু রাগ দেখিয়ে বলল, “তুমি আবারও ম্যাম বলে ডাকছ আমায়? বলেছি না অনিলাকে যেমন আপু বলে ডাকো আমাকেও তেমন আপু বলে ডাকবে?”
ফুল জিভ কেটে বলল, “সরি উর্বী আপু।”
উর্বীর মাথায় হঠাৎ একটা ভাবনা হানা দিতেই সে চিন্তিত কণ্ঠে বলল, “আচ্ছা, বাইরে গেলে ওনারা যদি আবারও আমাদের কিডন্যাপ করে নিয়ে যায়?”
ফুল ভরসা দিয়ে নিচু গলায় বলল, “পারবে না আপু, কারণ আমাদের সাথে মনস্টারটাও যাবে।”
উর্বী অবুঝ গলায় জোরেই বলে উঠল, “মনস্টার কে?”
উদ্যান অচল দৃষ্টিতে তাকিয়ে ছিল ফুলের দিকে। ফুল আড়চোখে তাকে দেখে নিয়ে উর্বীর কানে কানে বলল, “আস্তে বলো, সোফার ওপর যাকে দেখছ সেই হলো মনস্টার।”
উর্বী তার ভঙ্গিতেই মৃদু স্বরে বলল, “মনস্টারকে কি ভয় পাওয়া উচিত নয়? সে নিজেই যদি আমাদের ক্ষতি করে দেয়, তখন?”
“না আপু, আমি ওনার স্ত্রী, উনি ভালোবাসেন আমায়। ক্ষতি করবেন না বরং রক্ষা করবেন, বুঝলে?”
লুহান ছোট ছোট চোখে তাদের দুজনকে দেখছিল। হঠাৎ বলল, “তুমি উর্বীকে নিয়ে এসেছ কেন?”
ফুল বলল, “উর্বী আপুকে সাথে করে নিয়ে যাব তাই।”
উর্বী মাথা নাড়ল, “হ্যাঁ, আমিও যাব ফুলের সাথে।”
লুহান বেশ ভাব নিয়ে বলল, “তুমি ওকে নিয়ে যেতে পারবে না ফুল।”
ফুলের মুখ কুঁচকে গেল, “কেন?”
তখনই উর্বীর নাম শুনে রিদম ডাইনিং হল থেকে উঁকি মারল। উদ্যান এখানে না থাকলে সে নির্দ্বিধায় চলে আসত। লুহান মুখ খোলার আগেই উদ্যান গম্ভীর গলায় বলল, “ও পেটালের সাথে গেলে তোর কী সমস্যা লুহান?”
চকিত নয়নে তাকাল লুহান। গলা পরিষ্কার করে বলল, “এমা, আমার কোনো সমস্যা নেই। ভাবলাম তুই হয়তো রাজি হবি না, তাই বলে দিয়েছি। তুই রাজি থাকলে আমার কোনো প্রবলেম নেই।”
উদ্যান পায়ের ওপর তুলে রাখা পা নামিয়ে দরজার অভিমুখে রওনা হলো। পিছু পিছু ফুল আর উর্বীও হাঁটা ধরল। উদ্যান চলে যেতেই রিদম আড়াল থেকে বেরিয়ে এসে পিছু ডাকল, “বোকাফুল…”
পাশ ফিরে তাকাল ফুল। রিদমকে দেখেই আঁতকে উঠল উর্বী, আতঙ্কিত হয়ে ফুলের পেছনে গুটিয়ে যেতে লাগল। তার আচরণে রিদমের নিঃশ্বাস আটকে এল। ভাঙা গলায় শুধু বলল, “ওকে দেখে রেখো বোকাফুল। অনেক অনেক ধন্যবাদ তোমাকে ওকে নিয়ে ভাবার জন্য। তুমি তেহকে কীভাবে রাজি করিয়েছ জানি না, তবে এটুকু জানি তুমি খুব ভালো।”
ফুল থমকাল, হাসার চেষ্টা করে বলল, “আপনাকেও ধন্যবাদ, ওনাকে উদ্ধার করে নিয়ে আসার জন্য। আর একটা কথা, আপনার ভাইয়ের কুকর্মের জন্য নিজেকে দোষারোপ করবেন না। চেহারা এক হলেও আপনারা ভিন্ন মানুষ, এটা মনে রাখবেন।”
রিদম তপ্ত শ্বাস ফেলল। “উর্বীর আচরণ আমাকে ভুলে যেতে বাধ্য করছে যে আমি আর রিহান ভিন্ন ব্যক্তি। ওর প্রতিক্রিয়া দেখলে মনে হয় আমিই রিহান, সব দায়ভার আমার নিজের। অন্তত আমি এটা এড়িয়ে যেতে কখনোই পারব না যে উর্বীকে রক্ষা করতে ব্যর্থ হয়েছি আমি। আমার জন্যই আজ ওর এই পরিণতি। না ওর সাথে প্রতিনিয়ত দেখা করতাম, আর না রিহান ওকে আমার গার্লফ্রেন্ড ভেবে তুলে নিয়ে যেত।”
“আপনার ভাইয়ের ভাবনা ভুল ছিল তাই না রিদম স্যার? উর্বী আপু শুধুমাত্র আপনার বন্ধু হয়, ঠিক না?”
রিদম ভড়কে গেল। এমন প্রশ্ন হয়তো আশা করেনি সে। তবুও উর্বীর চোখে সে বন্ধুর চেয়ে বেশি কিছু ছিল না। অবশ্য সে হতেও চায়নি কখনো।
“হ্যাঁ, একটা ভুল বোঝাবুঝির জন্য উর্বীর জীবনটা তছনছ হয়ে গেল। রিহান জানে আমি কেমন, তবুও কেন যে এমন ভুল ধারণা করল বুঝতে পারছি না।”
ফুল দীর্ঘশ্বাস ফেলল। “যা হয়েছে খুব খারাপ হয়েছে। উর্বী আপু কবে স্বাভাবিক হবে জানি না। তবে আমি পুরোপুরি চেষ্টা করব তাকে সুস্থ জীবনে ফিরিয়ে আনতে।”
↓
দুপুর দুটো। দুপুরের শেষভাগে সূর্য তার সবটুকু তাপ উগড়ে দিচ্ছে ধরণীর বুকে। খানজাদা নিবাসের পার্কিং লটে গাড়ি পার্ক করে রেখে ফুল ও উর্বীকে নিয়ে উদ্যান মূল ফটকের সামনে এসে দাঁড়াল। বার দুয়েক কলিং বেল বাজাতেই বাড়ির কাজের লোক দরজা খুলে দিল। উদ্যানকে দেখে কাজের মহিলা বিস্মিত হয়ে দুপা পিছিয়ে গেলেন। ছুটে গিয়ে ডেকে আনলেন মাহবুবা সুলতানাকে। ততক্ষণে তারা তিনজন ড্রইংরুমে এসে দাঁড়াল।
ফুল-উদ্যানকে দেখে মাহবুবা সুলতানার হাঁটার গতিতে স্থিরতা এল। মুহূর্তের ব্যবধানেই চোখ বেয়ে পানি গড়িয়ে পড়তে লাগল তার। “কেন এসেছ তোমরা? আমার ছেলেকে পাগল বানিয়ে দিয়েও শান্তি হয়নি তোমাদের?”
উদ্যান তীক্ষ্ণ চোখে তাকাল তার দিকে। বিক্ষিপ্ত কণ্ঠে বলল, “আমার বাড়িতে আমি কেন এসেছি তার কৈফিয়ত আপনাকে দিতে হবে? এত খারাপ দিনও আসেনি আমার।”
মাহবুবা সুলতানা আজ দমে গেলেন না, সিঁড়ি বেয়ে নিচে নেমে এলেন। কান্না চেপে বললেন, “চলে যাব তোমার বাড়ি থেকে। আমার ছেলেকে সুস্থ করে দাও।”
উদ্যান ঠোঁট প্রসারিত করে বলল, “ওহ হ্যালো, আমি কোনো ডাক্তার বা ম্যাজিশিয়ান নই যে মেডিসিন দিয়ে বা জাদুমন্ত্রের বলে আপনার ছেলেকে সুস্থ করে তুলতে পারব।”
মাহবুবা সুলতানা নিজের সহজাত চরিত্রের ঊর্ধ্বে গিয়ে আজ অসহায় কণ্ঠে বললেন, “কেন মে’রেছ ছেলেটাকে ওমন করে? ওর সাথে তো তোমার কোনো শত্রুতা ছিল না।” ফুলের দিকে তাকালেন উনি, “যার সাথে শত্রুতা ছিল তাকে নিয়ে তো দিব্যি সংসার করছ। ছেলেটাকে কেন শাস্তি দিলে?”
ফুল অশ্রুসিক্ত নয়নে তাকাল। মাহবুবা সুলতানা তেড়ে গেলেন তার দিকে, আচমকা ফুলের হাত মুচড়ে ধরে বললেন, “তুই সত্যিই অভিশপ্ত, কালসাপ একটা, এত এত ভালোবাসা দিলাম তোকে অথচ বিনিময়ে কী দিলি আমাদের? ছেলেটার কী দোষ ছিল? শুধু তো ভালোই বেসেছিল তোকে, প্রতিদান স্বরূপ সব কেড়ে নিলি ওর থেকে। পাগলের কাতারে দাঁড় করিয়ে দিলি? নিজে স্বামী নিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছিস, জমিয়ে সংসার করছিস। মাঝখান থেকে আমার ছেলেটা সব হারিয়ে দেউলিয়া হলো। না গ্র্যাজুয়েশন শেষ করতে পারল আর না তোকে পেল। কীভাবে শান্তিতে ঘুমাস তুই? একটুও অনুশোচনা হয় না? এতগুলো জীবন নষ্ট করে দিয়েও কীভাবে ভালো থাকতে পারিস?”
ফুল কান্নায় ভেঙে পড়ল। নিঃসহায় চোখে তাকাল উদ্যানের দিকে। দেখল উদ্যান শূন্য চোখে একদিকে তাকিয়ে আছে। ফুল বুঝতে পারল কেউ তার হয়ে কথা বলবে না। তাকেই নিজ পক্ষ সমর্থন করতে হবে।
মাহবুবা সুলতানার আক্রমণাত্মক প্রবণতা দেখে উর্বী চোখ-মুখ ঢেকে মেঝেতে বসে কাঁপতে লাগল। মাহবুবা সুলতানার হাত ছাড়ানোর চেষ্টা বাদ দিয়ে ফুল তার চোখে চোখ রাখল, “আমার চেহারা দেখেও কি বুঝতে পারছ না আমি কতটা ভালো আছি? একটুও বুঝতে পারছ না?”
ফুলের ফোলা ফোলা গালে রক্তিম আভা ফুটে উঠল। কান্নার তোড়ে রীতিমতো শিউরে উঠছে তার সমগ্র তনুমন। “অবশ্য কবেই বা বুঝতে পেরেছ? বুঝতে পারোনি বললে ভুল হবে। বুঝতে চাওনি, আমাকে নিয়ে ভাবোনি কখনো। আমি কিন্তু তোমাদের কথা ভেবেছি, ভেবেই তো বিয়েটা করেছিলাম। নইলে ওনার মতো হৃৎপিণ্ডহীন মানুষকে বিয়ে করার কোনো শখ ছিল না আমার। হ্যাঁ, মনের কোথাও অনুভূতি ছিল ওনার জন্য কিন্তু ওতটাও ব্যাকুলতা ছিল না যে সব অত্যাচার সয়ে নিতেও প্রস্তুত হয়ে যেতাম। আমার ভুলটা কী ছিল? বলতে পারো আবেশ ভাইয়ের সাথে পালিয়ে যাওয়াটা ভুল ছিল? হ্যাঁ, ভুল মনে হতেই পারে, আমরা প্রত্যেকে নিজেদের দৃষ্টিভঙ্গি থেকে অন্যকে বিচার করতে অভ্যস্ত। একটু সুখে কেইবা না থাকতে চায় বলো? আমিও থাকতে চেয়েছিলাম। ভেবেছিলাম তোমাদের স্বার্থে সব সহ্য করে নেব। কিন্তু পরিস্থিতি প্রচণ্ড অসহ্যকর হয়ে উঠেছিল, ভাবতেও পারিনি উনি আমার সাথে অত খারাপ ব্যবহার করবেন। সবার সামনে আমাকে মেইড হিসেবে পরিচয় করিয়ে দিলেন, কাজিন হিসেবে পরিচয় দিতেও ছিল ওনার ঘোর আপত্তি। এক টেবিলে খেতে বসার পর কুকুরের মতো আচরণ করেছিলেন আমার সাথে। খুব কষ্ট পেয়েছিলাম আমি, অপমানে হোক বা সুখে থাকার নেশায় হোক আমি কল দিয়েছিলাম আবেশ ভাইকে। বলেছিলাম আমাকে নিয়ে যেতে। সেই কল করার জন্যও ভয়ঙ্কর শাস্তি ভোগ করতে হয়েছিল আমাকে। তারপর কী কী হয়েছে আমার সাথে সেই প্রসঙ্গে নাই বা গেলাম। পালিয়ে আমি নিজের ইচ্ছায় যাইনি, ভাগ্য আমাকে নিজ শক্তিতে টেনে এনেছিল বাইরে। আবারও সেদিন সুখে থাকার উন্মাদনা চেপেছিল মাথায়। নিজের ফোন নম্বর ছাড়া আর কারো নম্বর মুখস্থ ছিল না আমার। কলটা রিসিভ করেছিল আবেশ ভাই। বলাবাহুল্য সে ছাড়া আমার শুভাকাঙ্ক্ষী আর কেইবা ছিল? আবেশ ভাইকে বলেছিলাম আমার থাকার ব্যবস্থা করে দিয়ে তোমাদের কাছে ফিরে আসতে কিন্তু না! সে আমাকে একা রেখে আসেনি। এখন বলো দোষটা কার মামি?”
মাহবুবা সুলতানা ফুলের বাহু ছেড়ে দিয়ে আঁচলে মুখ গুঁজে কাঁদতে লাগলেন। ফুল এক হাতে চোখ মুছে উদ্যানের দিকে এগিয়ে গেল, তার দিকে ইশারা করে বলল, “সব দোষ ওনার, উনি যদি প্রথমেই আমাকে মর্যাদা দিতেন আমি পালিয়ে যেতে চাইতাম না। আবেশ ভাইও বুঝতে পারত আমি সুখে আছি, তার আর মন পুড়ত না আমার জন্য। সবচেয়ে বড় দোষটা করেছেন উনি; আবেশ ভাইয়ের গায়ে হাত তুলে।”
ফুলের চোখ চকচক করে উঠল, “আমি কিন্তু সেই অপরাধের জন্য শাস্তিও দিয়েছি ওনাকে।”
ফুল উদ্যানের শার্টে হাত দিতে গেলে উদ্যান তার হাত সরিয়ে দেয়। ফুল আচমকা হেসে ওঠে, “দেখো মামি, উনি কেমন রূঢ় বিহেভ করেন আমার সাথে। আমি খুব কষ্টে আছি মামি। একটুও ভালো নেই বিশ্বাস করো। আচ্ছা আমার এত কষ্ট লাগে কেন, বলতে পারো? জানো তো উনি আমাকে ভালোবাসেন, আচ্ছা ওনার ভালোবাসা পেয়ে আমার কি সুখী হওয়ার কথা ছিল না? তবুও কেন পারছি না সুখী হতে?”
মাহবুবা সুলতানা অবাক চোখে তাকালেন। ভাবলেন আবেশের সাথে সাথে ফুলও পাগল হয়ে গেছে। উদ্যান পাগল বানিয়ে ফেলেছে ফুলকে। তিনি ফুলের হাত ধরে অন্যদিকে টেনে নিলেন, “উদ্যান বলেছে তোকে ভালোবাসে?”
ফুল হাসিমুখে মাথা নাড়ল। “হ্যাঁ, ভালোবাসেন উনি আমাকে।”
উদ্যান পকেটে হাত গুঁজে তাদের দিকে ফিরল। নিরাবেগ কণ্ঠে বলল, “হ্যাঁ, ভালোবাসি ওকে, সো হোয়াট?”
মাহবুবা সুলতানার চোখ বড় বড় হয়ে গেল। “তুমি তো ওকে শত্রু মনে করতে, হঠাৎ এগুলো কেন বলছ?”
“মনে করতাম, এখন ওয়াইফ মনে করি। এটাই পাস্ট আর প্রেজেন্টের মধ্যকার পার্থক্য।”
বাড়ির ভেতরে প্রবেশ করার পরপরই উদ্যান আর ফুলকে দেখে থমকে দাঁড়ায় মেহেক। কাঁধে ঝোলানো ব্যাগটা পিছলে নিচে পড়ে যেতে নেয়। ব্যাগটা সামলে দ্রুত পায়ে এগিয়ে আসে মেহেক।
উদ্যান ঘাড় কাত করে পুনরায় বলে, “আমার ওয়াইফের কষ্টে থাকার কারণ আমি নই; বরং আপনার ছেলে আবেশ। ওর ধারণা ওর জন্যই আবেশের এই পরিণতি হয়েছে। সেই জন্যই ও সুখী হতে পারছে না।”
মেহেক আপনমনেই হাসল। সাবলীল কণ্ঠে বলল, “বাহ! ফুলের কষ্টে থাকার দায়টাও কী সুন্দর আবেশ ভাইয়ের ওপর চাপিয়ে দিলেন। আপনার তারিফ না করে পারলাম না।”
উদ্যান শীতল দৃষ্টি নিক্ষেপ করল, “যা সত্য তাই বললাম। সত্য কথা আবার সবাই হজম করতে পারে না। অবশ্যই বেশি বেশি তারিফ করবেন, এতে বদহজম হওয়ার সম্ভাবনা কমে যাবে।”
মেহেক জোরপূর্বক হেসে বলল, “নিজের তারিফ শুনতে খুব পছন্দ করেন দেখছি।”
“পছন্দ করি কি না জানি না, তবে লোকে আমার তারিফ করতে পছন্দ করে।”
“হ্যাঁ, গুন্ডা-মাস্তান শয়তান লোক হিসেবে আপনার তারিফ না করে পারছি না। গুন্ডা না হলে ওভাবে আবেশ ভাইকে মা’রতে পারতেন না। হসপিটালে বসে আমি তার ক্ষতগুলো দেখিনি। বাড়িতে আসার পর সেগুলো দেখেই তারিফ করতে শুরু করে দিয়েছি। জায়নামাজে বসেও তারিফ করেছি বিশ্বাস করুন। উপহার স্বরূপ মোনাজাতে চেয়েছি আপনি যেন আবেশ ভাইয়ের চেয়েও হাজার কোটি গুণ বেশি কষ্ট অনুভব করেন। হুহ!”
কথাগুলো একনাগাড়ে বলে দম নিল মেহেক। ফুল আর মাহবুবা সুলতানা বিস্মিত চোখে তাকিয়ে আছে তার দিকে। মেহেক উপলব্ধি করতে পারল সে রাগের বশে অনেক কিছু বলে ফেলেছে। উদ্যানের চোখ লাল বর্ণ ধারণ করল। সে এগিয়ে যেতে লাগল মেহেকের দিকে, ফুল দিশাহারা হয়ে উদ্যানের সামনে এসে দুহাত মেলে ধরে দাঁড়াল। এই সুযোগে মেহেক একছুটে ওপরের তলায় চলে গেল। সে চলে যেতেই উদ্যান ঠোঁটের কোণে হাসি টেনে বলল, “আরে সরে যাও, ভয় দেখাতে যাচ্ছিলাম শুধু। ওসব বদদোয়ায় বিশ্বাস করি না আমি। আর ও যা যা উপাধি দিল; গুন্ডা-মাস্তান আর কী যেন? ওহ হ্যাঁ শয়তান! উপাধিগুলো খারাপও লাগেনি।”
ফুল হাত নামিয়ে নিল। অস্ফুট স্বরে আওড়াল, “হ্যাঁ এগুলো শুনতে তো ভালো লাগবেই আপনার। এগুলো শোনার জন্যই তো নিজেকে সবসময় দানব হিসেবে উপস্থাপন করেন।”
উদ্যান হালকা ঝুঁকে গেল ফুলের দিকে। চোখ বন্ধ করে নিল ফুল। উদ্যান তার মাথার ব্যান্ডেজের ওপর ফুঁ দিয়ে বলল, “কষ্ট করে উপস্থাপন করতে হয় না পেটাল। আপনা-আপনি প্রকাশিত হয়ে যায়। আমি প্রাণীটাই যে এমন। কবে বুঝবে তুমি!”
চলবে,,,
শব্দসংখ্যা: ৩৪০০+
(আজকের পর্বে কাকে মিস করলেন বা আগামী পর্বে কাকে দেখার জন্য এক্সাইটেড? কমেন্টে জানান!)
Share On:
TAGS: অবাধ্য হৃৎস্পন্দন, সোফিয়া সাফা
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
অবাধ্য হৃৎস্পন্দন পর্ব ২৯
-
অবাধ্য হৃৎস্পন্দন পর্ব ৪৫ (এর বর্ধিতাংশ)
-
অবাধ্য হৃৎস্পন্দন পর্ব ৩৪
-
অবাধ্য হৃৎস্পন্দন পর্ব ১০
-
অবাধ্য হৃৎস্পন্দন পর্ব ৩৮
-
অবাধ্য হৃৎস্পন্দন পর্ব ৩৯
-
অবাধ্য হৃৎস্পন্দন পর্ব ৩৭
-
অবাধ্য হৃৎস্পন্দন পর্ব ২৭
-
অবাধ্য হৃৎস্পন্দন পর্ব ৮
-
অবাধ্য হৃৎস্পন্দন পর্ব ১৬