অবাধ্য_হৃৎস্পন্দন (৪২)
সোফিয়া_সাফা
গভীর অন্ধকারের মধ্যে যখন ফুলের জ্ঞান ফিরল, তখন চারপাশ একদম নিস্তব্ধ। জানালার স্থূল পর্দাগুলো ভেদ করে বাইরের একবিন্দু আলো ভেতরে প্রবেশ করতে পারছে না। ফুলের শরীরটা নিদারুণভাবে আড়ষ্ট হয়ে আছে; বিশেষ করে বাম পাশটা যেন কোনো পাথরের নিচে চাপা পড়ে আছে।
মাথাটা এখনো যন্ত্রণায় ছিঁড়ে যাচ্ছে, তবে স্যালাইনের প্রভাবে শরীরের জ্বালাপোড়াটা কিছুটা কমেছে। সে আলগোছে বাম দিকে ফেরার চেষ্টা করতেই শক্তপোক্ত কিছুর সাথে ধাক্কা খেল। মুহূর্তের জন্য বুকটা ধক করে উঠল তার, আতঙ্কে চিৎকার করে উঠতে চাইল সে। কিন্তু পরক্ষণেই নাকে এল সেই পরিচিত তীব্র পুরুষদীপ্ত ঘ্রাণ; যা কোনো সুগন্ধির নয়, বরং উদ্যানের নিজস্ব সত্তার ঘ্রাণ। দানবটা হয়তো গোসলের পরপরই নিজের সিগনেচার পারফিউম ব্যবহার করার ফুরসত পায়নি।
ফুলের মস্তিষ্ক নিমেষেই সম্মোহনের মায়াজালে আবদ্ধ হলো। সে অনুধাবন করল, পাশে শায়িত এই ব্যক্তি অন্য কেউ নয় বরং স্বয়ং উদ্যান। অদ্ভুত এক ঘোরগ্রস্ততায় সে নিজের ডান হাতটি উদ্যানের প্রশস্ত বক্ষপঞ্জরের ওপর স্থাপন করল। আঙুলের ডগায় শার্টের মসৃণ কাপড় অনুভব হতেই অবচেতন মনেই সে শার্টের কয়েকটা বোতাম খুলে ফেলল, অতঃপর সেখানে কর্ণপাত করল।
উদ্যানের হৃৎপিণ্ডের স্পন্দন একদম ধীর ও ছন্দোবদ্ধ; তাতে কোনো চপলতা নেই, নেই কোনো ব্যাকুলতা। কেন যেন এই প্রশান্তি ফুলের ভালো লাগল না। তার মনে পড়ে গেল সেই রাতের কথা, যখন সে বাইকের গদিতে বসে উদ্যানের বুকের সাথে লেপ্টে ছিল। তখন সে একধরণের উচ্ছৃঙ্খল আর অস্থির শব্দ শুনতে পেয়েছিল, সে এখন ঠিক সেই ধরনের শব্দটাই শুনতে চায়।
ঘোরের অতল গহ্বরে বিচরণ করতে করতে ফুল যেন অবুঝ ও উন্মুখ হয়ে উঠল। মুখাবয়ব ঘুরিয়ে সে উদ্যানের নগ্ন বুকে নিজের নাক ঘষতে লাগল। তার নিশ্বাসের উত্তাপে ঘুমন্ত দানবের শরীরটা একবার শিহরিত হলো ঠিকই, কিন্তু তন্দ্রাচ্ছন্নতা কাটল না।
ফুলের ভেতরে তখন এক আদিম উন্মাদনা দানা বেঁধেছে। সে আবছা আলোয় সম্মোহনী দৃষ্টিতে সেই চওড়া বুকের দিকে তাকিয়ে রইল এবং হুট করেই নিজের ওষ্ঠাধর সেখানে সজোরে গেঁথে দিল।
মুহূর্তের মাঝে উদ্যানের শরীরে যেন হাজার ভোল্টের বিদ্যুৎ তাড়িত হলো। এক ঝটকায় চোখ মেলে খাটের ওপর সচকিত হয়ে বসল সে। দম যেন তাল হারাল, শ্বাস প্রশ্বাসের গতি বেড়ে গেল।
“অ্যালেক্স টার্ন অন দ্য লাইট।” উদ্যানের আদেশে তৎক্ষনাৎ লাইট জ্বলে উঠল।
দীর্ঘক্ষণ অন্ধকারে থাকার পর তীব্র আলোকচ্ছটা ফুলের চোখে শূলের মতো বিঁধল। সে বালিশে মুখ লুকিয়ে আলোর হাত থেকে পরিত্রাণ পেতে চাইল। উদ্যান একপলক তাকে দেখে নিয়ে পানির গ্লাসটি হাতে তুলে নিল। তৃষ্ণা মিটিয়ে শার্টের বোতামগুলো পুনরায় সংবদ্ধ করতে করতে নিরাসক্ত কণ্ঠে বলল, “আমি এই ধরনের মজা একদম উপভোগ করিনা। এমন করবে না কখনো।”
ফুল মুখ ঘুরিয়ে পিটপিট চোখে তাকাল। “এটাকে মজা বললেন কেন? কখনো করবো না মানে কী? ব্যাথা পেয়েছেন আপনি? পাননি তো! তাহলে? আপনি ভালোবাসেন আমাকে, আমিও ভালোবাসি। আমি করবো এমন, এদিকে আসুন।”
উদ্যান সরু চোখে তাকাল, বুঝতে পারল মেয়েটার মাথা ঠিক নেই। উদ্যান খাটের বাইরে পা রাখল।
“খাবার নিয়ে এলে, খেয়ে নিও। টেবিলের ওপর মেডিসিন রাখা আছে। অনিলাকে পাঠিয়ে দিচ্ছি।”
“কোথায় যাচ্ছেন আপনি? থাকুন না এখানে?”
উদ্যান ফিরে চাইল ফুলের দিকে। “দুপুর হয়ে গেছে, ফ্রেশ হয়ে লাঞ্চ করবো। যদিও অসম্পূর্ণ কাজ সম্পূর্ণ না করে যাওয়ার প্ল্যান ছিল না। কিন্তু তুমি হুঁশে নেই, শরীরের কন্ডিশন দেখে মনে হচ্ছে না সামলাতে পারবে।”
দরজার সন্নিকটে পৌঁছে উদ্যান আদেশ করল, “অ্যালেক্স ওপেন দ্য ডোর।”
অপার এক যান্ত্রিকতায় দরজা খুলে যেতেই উদ্যান রুম ত্যাগ করল।
ওয়াশরুম থেকে বেরোতেই অনিলার দৃষ্টি নিবদ্ধ হলো টেবিলের ওপর রাখা ছোট্ট পেজারটির দিকে; যন্ত্রটি সূক্ষ্ম শব্দে স্পন্দিত হয়ে জ্বলজ্বল করছে। ভ্রু কুঁচকে সে এগিয়ে গিয়ে সেটি হাতে তুলে নিল। সবুজ সংকেত দেখে বিস্ময় জাগল মনে; উদ্যান তাকে ডাকছে! সাধারণত প্রয়োজন হলে উদ্যান অনিকেই তলব করে, তাকে প্রায় কখনোই ডাকে না। তবে আজ কী এমন হলো যে দানবটা তাকে স্মরণ করছে?
সবুজ আলোয় টাচ করতেই উদ্যানের কণ্ঠস্বর ভেসে এল, “পেটালের জন্য খাবার নিয়ে এসো। মেইডকে বলতে পারতাম কিন্তু ইউ নো স্পাই এস্টেটেই আছে এখনো।”
ফুল নিষ্প্রাণ চোখে হাতের দিতে চেয়ে আছে। হাতের উল্টো পাশে ড্রেসিং টেপ লাগানো।
তখনি অনিলা দরজার আড়াল থেকে উঁকি দিয়ে মৃদুস্বরে বলল, “ভেতরে আসব ফুল?”
ফুল দরজার দিকে তাকিয়ে ইশারায় অনুমতি দিল। অনিলা খাবার ভর্তি ট্রে নিয়ে ফুলের পাশে এসে বসল। তাকে ধরে ধরে উঠে বসাল।
“খাবার নিয়ে এসেছি খেয়ে নাও। শরীর একদম ভেঙে গেছে তোমার।”
অনিলার সহায়তায় ফুল খাবার শেষ করে মেডিসিন খেয়ে নিল।
“উর্বী ম্যামকে কি নিয়ে এসেছে অনিলা আপু?” ফুলের প্রশ্নে অনিলা মাথা নাড়ল।
“হ্যাঁ, খুব ভোরে তাকে উদ্ধার করে নিয়ে আসা হয়েছে।”
ফুল স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল। “কোথায় সে এখন? কেমন আছে?”
অনিলা একটু সময় নিয়ে উত্তর দিল, “মেয়েটার অবস্থা একদমই ভালো না। জ্ঞান ফেরেনি এখনো। যদি আরও কয়েক ঘন্টা সেই জায়গায় বন্দি থাকত, ম’রেই যেতো হয়তো।”
ফুল শুকনো ঢোক গিলল। সেই বিভীষিকাময় জায়গার দৃশ্য পুনরায় তার মানসপটে ভেসে উঠল। “হ্যাঁ তাকে খাবার দেওয়া হতো না। ম’রে যেতো সেটা নিশ্চিত। ভাগ্য ভালো যে রিহানের লোকেরা ওনাকে জীবিত ফেলে রেখে গেছে।”
অনিলার হঠাৎই অস্থির লাগতে শুরু করল। সে বিড়বিড় করে বলল, “শুধু নিঃশ্বাস চলছে মেয়েটার, এটাকে বেঁচে থাকা বলেনা। তার চেয়ে মে’রে ফেললেই ভালো হতো।”
ফুলের শরীর শিউরে উঠল। জিভ দিয়ে ঠোঁট ভিজিয়ে বলল, “কী… বলতে চাইছো?”
“মেয়েটার ওপর ওরা অমানবিক নির্যাতন চালিয়েছে। রে/প করেছে অগণিত বার। শুধু একজন নয়, একাধিক লোক শতাধিক বার রে/প করেছে।”
ফুল আঁতকে উঠল। দুহাতে কান চেপে ধরে ভয়ে কুঁকড়ে গেল। “নাহ! বলো না এগুলো, ভয় করে আমার।”
অনিলা কিছু বলতে যাবে তার আগেই ফুল জড়িয়ে ধরল তাকে। হু হু করে বুকফাটা আর্তনাদে ভেঙে পড়ল, “কেন করল? একটা মেয়ের সাথে ওরা কেন করল এমন? তার কী অপরাধ ছিল? এতবড় একটা ধাক্কা সে কীভাবে কাটিয়ে উঠবে? কী বলে স্বান্তনা দেবো আমরা তাকে?”
অনিলার নেত্রপল্লবও অশ্রুসিক্ত হয়ে উঠল। কান্না সংবরণ করে সে বলল, “হ্যাঁ সেই জন্যই তো বললাম, তার চেয়ে মে’রে ফেললেও ভালো হতো বোধহয়। মেয়েটাকে এতো কষ্ট ভোগ করতে হতো না।”
“সে এখন কোথায় আছে? আমাকে নিয়ে চলো, আমি দেখতে চাই তাকে। এই বাড়িতে তার কেউ নেই, এই মুহূর্তে তার পাশে আপনজন থাকা দরকার। নইলে সে ভেঙে পড়বে।”
“তুমি কীভাবে যাবে? হাঁটতে পারবে বলেও তো মনে হচ্ছে না।”
ফুল মুখ তুলে চোখ মুছে নিল। অনিলার কবজি ধরে গলায় ঠেকিয়ে বলল, “আমি পারবো, জ্বর ছেড়ে দিয়েছে, দেখো।”
অনিলা স্নেহভরা চোখে তাকাল। “জ্বর পুরোপুরি কমেনি ফুল। মাত্রই মেডিসিন খেয়েছো। মেডিসিন কোনো ম্যাজিক নয় যে সঙ্গে সঙ্গে কমে যাবে।”
“আমি অসুস্থ বোধ করছি না। হাঁটতে পারবো, তুমি আমাকে নিয়ে চলো সেখানে।”
“মেয়েটা রিদমের রুমে আছে। তুমি কি যাবে সেখানে?”
ফুল বিস্মিত চোখে তাকাল। “তাকে রিদম স্যারের রুমে কেন রাখা হয়েছে?”
অনিলা বিরস মুখে বলল, “জানিনা, আমি ঠিক বুঝে উঠতে পারছি না। মেয়েটাকে ও-ই কোলে করে এস্টেটে এনেছে। তারপর নিজের রুমে নিয়ে গেছে। মেয়েটার জামাকাপড় অনেক নোংরা ছিল ফুল। তুমি ভাবতেও পারবে না, মেয়েটার অবস্থা কতোটা বিভৎস ছিল।”
ফুলের নিঃশ্বাস আটকে এল। রিনরিনে কণ্ঠে বলল, “আমি সেই কুঠুরিতে তাকে দেখেছিলাম অনিলা আপু। আবছা আলোয় যেটুকু দেখেছিলাম সেটুকু দেখেই রূহ কেঁপে উঠেছিল।”
ফুল আস্তে-ধীরে নেমে দাঁড়াল। অনিলাকে নিয়ে রিদমের দরজার অভিমুখে আসতেই থমকে দাঁড়াল। দেখতে পেল, রিদম রক্তচোখে উর্বীর দিকে চেয়ে আছে। বিপরীতে উর্বী জানুদ্বয়ের মাঝে মুখ গুজে খাটের এককোনায় বসে আছে। হাতদুটো দিয়ে নিজেকে এমন করে আঁকড়ে ধরে আছে যেন সবার থেকে নিজেকে আড়াল করতে চাইছে। অনিলার কথানুযায়ী উর্বীর পরনে নোংরা পোশাক নেই, তার বদলে সফট কাপড়ের লং ফ্রক। হাতাগুলোও লং। হয়তো জামাটা দিয়ে তার শরীরের ক্ষতগুলো সুনিপুণ ভাবে ঢাকার চেষ্টা করা হয়েছে।
ফুল কারো অনুমতির আশায় না থেকে রুমে ঢুকে পড়ল। উর্বীর ঠিক সামনে গিয়ে দাঁড়িয়ে অতি সন্তর্পণে তার কাঁধে হাত রাখল। কিন্তু সামান্য স্পর্শেই উর্বী ছিটকে সরে গেল। দুহাতে মুখ ঢেকে প্রলাপ বকতে শুরু করল সে, “কাছে এসো না, ব্যাথা হচ্ছে, আমার খুব ব্যাথা হচ্ছে।”
ফুল বিছানায় হাঁটু গেড়ে বসল। উর্বীর হাত ধরে বলল, “ম্যাম আমার দিকে তাকান, আমি আপনাকে একটুও ব্যাথা দেবো না। আপনাকে আমরা উদ্ধার করে নিয়ে এসেছি। কেউ আপনাকে আর আঘাত করতে পারবে না। আমার দিকে চেয়ে দেখুন, আমি ফুল!”
উর্বী ভীতসন্ত্রস্ত চোখে মাথা তুলল। অশ্রুসজল নয়নে সে ফুলের দিকে তাকাল। ফুলের ফ্যাকাশে মুখাবয়ব দেখে সে একটু একটু চিনতে পারল। “তু…তুমি? আমাকে বের করে নিয়ে যাবে?”
ফুল কান্না আটকে কিঞ্চিৎ হাসার চেষ্টা করল। অভয় দিয়ে বলল, “আমরা আপনাকে মুক্ত করে এনেছি ম্যাম। চারপাশে তাকিয়ে দেখুন, সেই নিকষ কালো অন্ধকার এখন আর নেই। এখানে কত আলো!”
উর্বী সত্যি সত্যিই চারদিকে দৃষ্টি ফেরাল। একপর্যায়ে তার নজর গিয়ে স্থির হলো রিদমের চোখের ওপর। রিদমকে দেখামাত্রই উর্বীর অভিব্যক্তিতে আমূল পরিবর্তন এল। সে সজোরে চিৎকার করে উঠল, “ও! ও আমাকে কষ্ট দেবে! ও আমাকে ছাড়বে না! ও একটা পিশাচ, আমাকে খাবার দেয়না। পানি চাইলে মাথায় ঢেলে দেয়। আমাকে প্রস্রাব খেতে বলে। অনেক গুলো মানুষ নিয়ে আসে সাথে, তারা আমাকে অনেক কষ্ট দেয়, খুব ব্যাথা দেয়। আমি বারবার বলি আমাকে মে’রে ফেলতে কিন্তু তাও মে’রে ফেলেনা। আমাকে ও বাঁচতে দেবেনা আর ম’রতেও দেবেনা।”
বলতে বলতেই উর্বী ত্রাসের বশে ফুলকে জাপটে ধরল। “আমাকে নিয়ে যাও এখান থেকে! দোহাই তোমার, আমাকে নিয়ে যাও!”
ফুল কিছুটা অপ্রস্তুত হয়ে পড়লেও দ্রুত নিজেকে সামলে নিল। উর্বীর হাত ধরে বলল, “ঠিক আছে, আপনি আমার সাথেই চলুন। এখানে থাকার কোনো প্রয়োজন নেই; ওনারা আপনাকে চেনেনও না। উদ্ধার করে এনেছেন, এটাই অনেক।”
উর্বীকে নিয়ে ফুল নেমে দাঁড়াল। উর্বী তখনো ফুলের বাহু আষ্টেপৃষ্ঠে চেপে ধরে আছে। একে তো ফুলের নিজের শরীর অসুস্থতায় জীর্ণ, তার ওপর উর্বীর হাতের প্রবল চাপে সে আড়ষ্ট হয়ে পড়ছে। সে বিস্ময়ে ভাবল, এত নির্যাতনের পরেও মেয়েটার শরীরে এত শক্তি অবশিষ্ট আছে কীভাবে? পরক্ষণেই স্মরণে এল, উর্বী একজন পুলিশ কর্মকর্তা; তার দেহে এই কাঠিন্য থাকাটা মোটেও অস্বাভাবিক নয়।
প্রস্থানের পূর্বে ফুল রিদমের দিকে চেয়ে ধীরস্বরে বলল, “উর্বী ম্যামকে উদ্ধার করে নিয়ে আসার জন্য আপনাকে ধন্যবাদ, রিদম স্যার।”
রিদম কোনো উত্তর দিল না। ফুল কিছুক্ষণ ইতস্তত করে পুনরায় বলল, “মাস্টারের সাথে কথা বলে সব ঠিক করে নিয়েন। যদিও আমি জানি সব দোষ আদতে তারই ছিল, কিন্তু জানেনই তো দানবটা ভীষন একরোখা। শুধু শুধু রাগ করে থেকে লাভ হবে না।”
রিদম তখনও নিশ্চুপ, কিন্তু পাশ থেকে সোহম বলে উঠল, “তেহ বলে দিয়েছে ও যেন তেহুর মুখোমুখি না হয়। এমনিতেও যা মুখে এসেছে তাই বলে দিয়েছে তার ওপর কথার অবাধ্য হলে তেহ ওকে মে’রে মাটি চাপা দিয়ে দিবে।”
ফুল কিছুটা শঙ্কিত হলো। তবুও নিজেকে সামলে নিয়ে বলল, “উনি রাগের মাথায় বলে দিয়েছেন। আপনি চাইলে আমি আপনার হয়ে ওনার সাথে কথা বলবো। সর্বোপরি উর্বী ম্যামকে বাঁচাতে গিয়েই তো ঝামেলাটা হলো।”
সোহম মৃদু হেসে বলল, “তাহলে তো খুব ভালো হবে। তুমি একটু বুঝিয়ে বোলো ওকে। রিহানের অত্যাচার সহ্য করতে করতে রিদমের মস্তিষ্কের কলকব্জা একটু বিগড়ে গেছে আরকি!”
শেষের কথাটুকু ফিসফাস করে বলল সোহম। ফুল একটা ছোট্ট শ্বাস ফেলে উর্বীকে নিয়ে বেরিয়ে এল।
ফুলের সুইং বেডের ওপর ঘুমিয়ে আছে উর্বী। তাকে খাবার আর ঔষধ খাইয়ে ঘুম পাড়িয়েছে ফুল আর অনিলা। উর্বী ঘুমের ঘোরেও ফুলের হাত চেপে ধরে আছে। যেন তাকে ছেড়ে দিলেই সে আবারও সেই অন্ধকার কুঠুরিতে ফিরে যাবে।
এখন বিকেলের শেষভাগ, ফুলের শরীরটা একটু সুস্থ সুস্থ লাগছে। জ্বরটাও ছেড়েছে। ফুল ভেবেছিল উদ্যান লাঞ্চ করেই হয়তো তার কাছে ফিরে আসবে। কিন্তু তার ভাবনাটা ভুল প্রমাণিত হয়েছে, উদ্যান আসেনি তার কাছে।
“উনি একবারও আসলো না। কী করছেন উনি?” আনমনেই কথা খানা বলে ফেলল ফুল।
অনিলা মুচকি হেসে বলল, “খুব মিস করছো বুঝি তাকে?”
ফুল লজ্জিত হয়ে দৃষ্টি অবনত করল। অনিলা পুনরায় বলল, “কাউকে ভালোবাসে ফেললে এমন হওয়াটাই স্বাভাবিক। সর্বক্ষণ তার কথাই মনে পড়ে, তার কাছাকাছি থাকার আকাঙ্ক্ষা জাগে।”
ফুল লাজুক হেসে পাল্টা প্রশ্ন করল, “তুমি দেখছি অনি স্যারকে খুব ভালোবাসো, শুধু প্রকাশ করো না তাইনা?”
“ভালো তো একটু আমিও বাসি তাকে। কিন্তু তার মাধ্যমেই ভালোবাসতে শিখেছি এমনটা নয়।”
ফুল থমকাল। “মানে? তুমি তার আগেও কাউকে ভালোবেসেছো?”
অনিলা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। “হ্যাঁ, ভালোবেসেছিলাম। যখন আমার ভালোবাসা তার সামনে প্রকাশ করেছিলাম সে মুখে বলেনি যে সে আমাকে ভালোবাসে না; এটাও বলেনি যে তার গার্লফ্রেন্ড আছে।”
“তুমি তো এই ব্যাপারে কখনো কিছু বললে না অনিলা আপু।”
“বলিনি কারণ আমি নিজেই সেই ঘটনা ভুলে যেতে চেয়েছি, কিন্তু আজ উর্বীকে এই অবস্থায় দেখে ঘটনাটা মনে পড়ে গেল।”
“তারপর কী হয়েছিল?”
“বলছি, তবে এটা হয়তো বুঝতে পারলে আমি কেন তোমার আবেশ ভাইকে বলে দিতে বলেছিলাম যে তুমি তাকে ভালোবাসো না?”
আবেশের প্রসঙ্গ আসতেই ফুলের মুখ ফ্যাকাশে হয়ে গেল। সে ক্ষীণ স্বরে বলল, “আমি খুব শীঘ্রই যাবো তার কাছে।”
“হ্যাঁ খুব তাড়াতাড়ি যেও ফুল। তুমি হয়তো তার কষ্ট অনুভব করতে পারছো না কিন্তু আমি পারছি। একই পথের পথিক কিনা! যদিও আমার গল্পে সবচেয়ে বড় ভুল আমারই ছিল।”
ফুল জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তাকাতেই অনিলা মাথা নিচু করে নিল। “তোমাকে অনির ব্যাপারে সবকিছু বললেও নিজের ব্যাপারে আমি কিছুই বলিনি ফুল। মনে হয়েছিল সব জানতে পারলে তুমি আমাকে ফ্রেন্ড বানাবে না। আর সত্যি বলতে আমার একজন ফ্রেন্ডের খুব প্রয়োজন ছিল।”
অনিলা একটু থামল। ফুল নিশ্চুপ রইল। অনিলা আবারও বলতে শুরু করল, “আমি নিজের দোষ কখনো দেখিই নি। সবসময় অনির দোষ খুঁজেছি। এখনো খুঁজি, তুমি একদিন জিজ্ঞেস করেছিলে না? আমি কখনো অনির অনুভূতি, পরিস্থিতি, প্রতিকূলতা বোঝার চেষ্টা করেছি কিনা? তার উত্তর হলো না, আমি করিনি কখনো।”
ফুল তপ্ত শ্বাস ত্যাগ করল। “আমি দুঃখিত অনিলা আপু। সেদিন ওসব বলা উচিত হয়নি আমার। কী বলেছি নিজেও জানিনা। তোমার এখানে দোষ নেই, ওনার চরিত্রের বিবরণ শুনে তোমাকে দোষ দেওয়ার কোনো অবকাশ থাকেনা। তুমি অনি স্যারের চেয়ে ভালো কাউকে ডিজার্ভ করতে।”
অনিলার চোখ জলে ভরে উঠল। তাকে কাঁদতে দেখে ফুল হতবিহ্বল হয়ে গেল। “কাঁদছো কেন?”
“আমিও সেটাই মনে করতাম যে অনির চেয়ে ভালো কাউকে ডিজার্ভ করি আমি। কিন্তু এখন তোমার সাথে মেশার পর বুঝতে পেরেছি যে আমিও পার্ফেক্ট নই।”
“এতে কান্না করার কী আছে? পৃথিবীতে কেউ পার্ফেক্ট হয়না, অনিলা আপু। তুমি কাউকে ভালোবাসতেই পারো এতে কোনো দোষ নেই। লোকটা হয়তো তোমাকে ধোঁকা দিয়েছিল তাইনা?”
অনিলার কান্নার বেগ আরও তীব্র হলো। সে রুদ্ধকণ্ঠে বলল, “শুধু ধোঁকা দেয়নি, আরও কিছু করেছিল।”
ফুলের চোখে কাঠিন্য ভাব ফুটে উঠল। সে দৃঢ় স্বরে প্রশ্ন করল, “কী করেছিল?”
অনিলা চোখ মুছে লম্বা শ্বাস নিল। তারপর বলতে শুরু করল, “ও আমার ক্লাসমেট ছিল। ওর জন্মদিনে ইনভাইটেশন পেয়ে আমিও গিয়েছিলাম। সেই রাতে ও বলেছিল সবাই চলে যাওয়ার পর ও একান্তে আমার প্রোপোজালের এন্সার দেবে। আমিও সরল মনে উত্তর পাওয়ার আশায় থেকে গিয়েছিলাম।”
অনিলার কণ্ঠরোধ হয়ে এল। ফুল বাকীটুকু অনুমান করে নিল। ধরা গলায় শুধাল, “ছেলেটা খারাপ কিছু করেছিল তোমার সাথে?”
অনিলা ওপর-নিচে মাথা নাড়ল। “হ্যাঁ, আমার হাত পা বেঁধে ন্যা’কে’ড ভিডিও ধারণ করেছিল। বিশ্বাস করো আমি জানতাম না ও এতোটা খারাপ। শুধু আমি না কলেজের সবাই জানতো ও খুব ভালো ছেলে।”
ফুলের মাথা ঝিমঝিম করে উঠল। এগুলো কী হচ্ছে তার সাথে? আর কতো জঘন্য ঘটনার সম্মুখীন হতে হবে তাকে? এ সে কোথায় এসে পড়ল? সে নিরাবেগ কণ্ঠে জানতে চাইল, “অনি স্যার জানে এই ব্যাপারে?”
অনিলা হ্যাঁ সূচক মাথা নাড়ল। “হ্যাঁ, ছেলেটা পরবর্তীতে সেই ভিডিও দিয়ে ব্ল্যাকমেইল করতো। টাকা চাইতো, বলতো টাকা না দিলে সেই ভিডিও ইন্টারনেটে ছেড়ে দেবে। আমি অনেকবার নিজেকে শেষ করে ফেলতে চেয়েও পারিনি। তার মধ্যেই অনির আগমন ঘটেছিল। ও আমাকে তুলে এনেছিল ঠিকই কিন্তু একেবারে জোর করে আটকে রাখেনি। বলেছিল আমি যা চাইব ও তাই দেবে বিনিময়ে সারাজীবন ওর সাথে থাকতে হবে। আমি শুধু চেয়েছিলাম সেই ভিডিও ডিলিট করাতে। অনি আমার চাওয়া পূরণ করেছিল। সেই সাথে আমার বাবা-মাকে অনেক টাকাপয়সা দিয়েছিল। এখনও দেয়, তারা অনির টাকায় এখনও ভালোভাবে জীবনযাপন করে।”
ফুল আলগোছে অনিলার থেকে হাত সরিয়ে নিল। অনিলা কান্নার মাত্রা বাড়িয়ে দিয়ে বলল, “তুমি কী এসব শুনে আমাকে ঘৃণা করবে ফুল? আর বন্ধু মনে করবে না?”
ফুলের নিঃশ্বাস ভারী হয়ে এল। অনিলাকে জড়িয়ে ধরে বলল, “এখানে তোমার কোনো দোষ নেই। আমি তোমাকে বন্ধু মনে করি অনিলা আপু। সবসময় করবো, আর আজ এই সত্য প্রকাশের মধ্য দিয়ে আমরা বেস্ট ফ্রেন্ড হয়ে গেলাম।”
রাতের বেলা,
টেরেসে বসে বাকিরা উদ্যানের অপেক্ষা করছে। সোহম একটু বিরক্ত গলায় বলল, “এখনো আসছে না কেন? ওর ওয়াইফির কাছে চলে গেল নাকি?”
অনি ঠাট্টা করে বলল, “গেলেও খুব একটা অবাক হবো না। রাত হয়েছে, এই সময় বউকে একটু বেশিই মনে পড়ে।”
লুহান আঁড়চোখে মেলোর দিকে তাকাল। বিড়বিড়িয়ে বলল, “সব পুরুষদের বউয়ের কথা মনে পড়ে বুঝি? আচ্ছা যাদের বউ নেই তাদের কার কথা মনে পড়ে?”
মেলো ফোনের স্ক্রিন থেকে চোখ সরিয়ে শূন্য চোখে তার দিকে তাকাল। সোহম হো হো করে হেসে উঠে বলল, “তাদের মনে পড়ে বন্ধুদের কথা। এই যেমন তোর আর আমার কিন্তু দেরি হয়নি। ঠিক টাইমে চলে এসেছি। রিদমের নিষেধাজ্ঞা না থাকলে রিদমও চলে আসতো। যদিও ওর রেস্ট নেওয়া প্রয়োজন। কী হয়েছে জানিনা, একদম চুপচাপ হয়ে গেছে, কারো সঙ্গে কথাও বলছে না।”
মেলো ফোনটা সরিয়ে রেখে টেবিল থেকে ‘ভেপ’ তুলে ওষ্ঠাধরে স্থাপন করল। লুহানের চাহনি আরও তীক্ষ্ণ হলো; স্বগতোক্তি করল, “আমার চেয়েও ওই জড় বস্তুটার ভাগ্য ঢেড় ভালো।”
মেলো নিঃশ্বাসের সাথে ধোঁয়া টেনে নিয়ে কাউচে গা এলিয়ে দিল। আয়েসি ভঙ্গিতে ধোঁয়া উড়াতে উড়াতে বলল, “তেহ লেট নাইট শাওয়ার নিতে গেছে। বউয়ের কাছে যায়নি। বাইরে থেকে এসে ও সবসময়ই শাওয়ার নেয়।”
লুহান মন খারাপ করে অন্যদিকে চোখ ফেরাল। সোহম উচ্ছ্বসিত কণ্ঠে বলল, “তাহলে বল তোদের মিটিং টা কেমন ছিল? টুরিস্ট এজেন্সি ডিল কনফার্ম করেছে?”
অনি বাহু প্রসারিত করে বলল, “হাহ! কনফার্ম না করে উপায় আছে নাকি? তেহুর সামনে না বলার ক্ষমতা কারো নেই। তার ওপর মেক্সিকোর অর্থনীতির পঞ্চাশ শতাংশই যেখানে ‘টি-কে গ্রুপ’ নিয়ন্ত্রণ করে, সেখানে আমাদের সাথে ডিল না করলে ক্ষতিটা তাদেরই হতো।”
সোহম টেকিলার গ্লাস হাতে নিতে নিতে বলল, “মাঝে মাঝে আমি তেহুর ডুয়েল পার্সোনালিটি দেখে ইনফ্লুয়েঞ্জড হয়ে যাই। ও যেভাবে দুদিক মেইনটেইন করে চলে তা সত্যিই অবিশ্বাস্য।”
অনি আত্মবিশ্বাসের সাথে বলল, “আমরাই বা কম কিসে?”
সোহম হেসে বলল, “সবই তেহুর প্রভাব।”
তন্মধ্যেই সেখানে উদ্যানের পদধ্বনি শোনা গেল। তাকে ধীরপায়ে এগিয়ে আসতে দেখে সোহমের হাসি সহসা থেমে গেল। উদ্যান এসেই নিজ হাতে গ্লাসে অরেঞ্জ জুস আর বরফ মিশিয়ে টেকিলা প্রস্তুত করল। তাতে একটা তৃপ্তির চুমুক দিয়ে কাউচে জাঁকিয়ে বসল। সবাইকে এক পলক দেখে নিয়ে সোহমের উদ্দেশ্যে বলল, “কেন ডেকেছিস? যা বলার দ্রুত বল, আমার কাজ আছে।”
অনি ঠোঁট নেড়ে বলল, “কাজ নয়, বল বউ আছে! আরে জেলাস হবো না আমরা। বিশেষ করে আমি, আমারও তো বউ আছে, শুধু তোর মতো ভাগ্য নেই।”
উদ্যান একহাত কাউচে রেখে নির্বিকার কণ্ঠে বলল, “আমার মতো ভাগ্য আর কারো না হোক। ইউ নো আমি নিজের ভাগ্য নিয়ে অনেক রক্ষণশীল।”
সবাই স্তব্ধ হয়ে গেল। লুহান চোখ রাঙিয়ে তাকাল অনির দিকে। অনি থতমত খেয়ে গেল। সে আসলে কথাটা এভাবে বলতে চায়নি। সোহম পরিস্থিতি সামাল দিতে দ্রুত প্রসঙ্গ পাল্টে ফেলল, “আমি যে জন্য তোদের ডেকেছি তা হলো, রিদমকে আটকে রাখার পেছনে রিহানের উদ্দেশ্যে সম্পর্কে আমি একটু ধারণা পেয়েছি। যদিও এখন রিদম কারো সঙ্গেই কথা বলছে না। মেয়েটাকে খুঁজতে বান্দরবানে যাওয়ার পথে রিদম এ ব্যাপারে কিছু বলেছিল আমায়। তোরা কাজে গিয়েছিলি তাই বলার সুযোগ পাইনি।”
লুহান ভ্রু উঁচিয়ে বলল, “তুই এমন ভান করছিস যেন রিহানের উদ্দেশ্য সম্পর্কে আমাদের জানা ছিল না। আরে ও আমাদের গোল্ডেন প্রজেক্টটা বাঞ্চাল করার জন্যই রিদমকে আটকে রেখেছিল।”
সোহম মাথা নাড়ল। “না, ওর প্রকৃত উদ্দেশ্য সেটা ছিল না।”
উদ্যান রক্তচোখে সোহমের দিকে তাকাল, “কথা শেষ কর সোহম, আমার ধৈর্যের সীমা ছাড়িয়ে যাচ্ছে।”
সোহম গ্লাসটা টেবিলে রেখে গলা খাঁকারি দিল। “রিহানের মেইন ইনটেনশন ছিল তুই যাকে মেক্সিকোতে চিকিৎসা করানোর জন্য নিয়ে গিয়েছিলি তাকে খুঁজে বের করা।”
পরক্ষণেই উদ্যান হাতের গ্লাসটি সজোরে মেঝেতে আছাড় মারল। বিকট শব্দে কাঁচের গ্লাসটা চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে চারদিকে ছড়িয়ে পড়ল। উপস্থিত কারো মধ্যেই কোনো ভাবান্তর হলো না; উদ্যানের এমন বিধ্বংসী আচরণ দেখে অভ্যস্ত তারা। দানবটা যেন ক্রমশই আগের রূপে ফিরে যাচ্ছে।
অনি প্রশ্ন করল, “তাকে কেন খুঁজছে?”
সোহম উত্তরে বলল, “কেন খুঁজছে সেটা রিদমও জানে না। আমি কীভাবে জানবো।”
লুহান এবার সরাসরি উদ্যানকে লক্ষ্য করে বলল, “উত্তর টা শুধু রিহান আর তেহুই দিতে পারবে। লোকটার সাথে তেহুর সম্পর্ক কী? কেন রিহান সব বাদ দিয়ে তাকে খুঁজছে?”
লুহান ইনডায়রেক্টলি উদ্যানকে প্রশ্নটা করেছে কিন্তু উদ্যান যেই প্রশ্নের উত্তর এতবছরে দেয়নি সেই প্রশ্নের উত্তর আজ দেবে; আশা করাটাও বোকামি। তারা তো সেই রহস্যময় ব্যক্তির কথা একপ্রকার ভুলেই গিয়েছিল।
উদ্যান কোনো এক প্রলয়ঙ্কারী ঘোরের মাঝে বিচরণ করছিল। সে কারো কোনো কথার তোয়াক্কা না করেই গর্জে উঠল, “স্পাইকে সামনে আনার সময় হয়ে গেছে। আগে স্পাইয়ের মৃ’ত্যু নিশ্চিত করতে হবে।”
কথাটা বলেই উদ্যান দ্রুতপদে প্রস্থান করতে শুরু করল। বাকিরা তার এই রূপ দেখে যেন নিঃশ্বাস নিতেও ভুলে গেল। উদ্যানকে শেষবার এতটা উন্মত্ত দেখা গিয়েছিল ফুল পালিয়ে যাওয়ার পর। লুহানের কেন যেন উদ্যানের পদক্ষেপ ঠিক সুবিধাজনক লাগল না। সেও একপ্রকার দৌড়েই তার পিছু নিল। উদ্যান কোনোদিকে ভ্রুক্ষেপ না করে সোজা রুমা আর নাদিয়ার রুমের সামনে এসে থামল। লুহান থমকে দাঁড়াল, কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম জমলো তার। অস্ফুটস্বরে আওড়াল, “তোর কোথাও ভুল হচ্ছে, ও হতে পারে না। কিছুতেই না, ও হতে পারে না।”
উদ্যান তার কথা কানে নিলো না। দরজা খুলে ভেতরে ঢুকে দেখল রুমা শোয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে। নাদিয়া রুমে নেই, কয়েকদিন পর পার্টি থাকায় নাদিয়া অন্য মেইডদের সাথে ড্যান্স প্রাকটিস করতে গেছে। হঠাৎ উদ্যানকে দেখে রুমা তৎক্ষনাৎ উঠে দাঁড়াল।
“কিছু কী লাগবে মাস্টার? আপনি কষ্ট করে আসতে গেলেন কেন? ডেকে নিতেন।”
উদ্যান দুপা এগিয়ে এসে তীক্ষ্ণ কণ্ঠে বলল, “তুই স্পাই তাইনা? তুই-ই রিহানের কাছে তথ্য পাচার করেছিস?”
রুমার দেহলতা আতঙ্কে কেঁপে উঠল। “এসব আপনি কী বলছেন মাস্টার? আমি রিহান স্যারের স্পাই নই। তার সাথে আমার কোনো কানেকশন নেই, বিশ্বাস করুন।”
উদ্যান অট্টহাসিতে ফেটে পড়ল। তার হাসি দেখে রুমার শরীর হিম হয়ে এল। উদ্যান গলা চড়িয়ে আদেশ দিল, “লোবো, টেক দ্যাট স্লা’ট টু দ্য পানিশমেন্ট রুম।”
চোখ বন্ধ করে নিল লুহান। মাথা নেড়ে সে রুমার হাত শক্ত করে চেপে ধরল। লুহানের স্পর্শ পেতেই রুমা কান্নায় ভেঙে পড়ল। “আমাকে নিয়ে যাবেন না লুহান স্যার! আমি কিচ্ছু জানি না, বিশ্বাস করুন আমি নির্দোষ!”
রুমা নিচে বসে পড়তে চাইল। লুহান সেভাবেই তাকে টেনে হিঁচড়ে নিয়ে যেতে লাগল। উদ্যান পেছনে ফিরতেই দেখলো; অনি, সোহম আর মেলো জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে।
অনি সংশয় নিয়ে প্রশ্ন করল, “তুই শিওর রুমাই স্পাই?”
উদ্যান নিজের ঘাড় ম্যাসেজ করতে করতে বলল, “হ্যাঁ, দুদিন আগে পেটালকে নিয়ে ট্রি হাউস ডেটে যাওয়ার পর, পেটাল যখন বেরিয়ে গেল তখনই রুমাকে দেখেছিলাম আমি।”
সোহম হকচকিয়ে গেল। “তুই ওকে ওখানে দেখেছিলি, কিন্তু কীভাবে?”
উদ্যানের দৃশ্যপটে ভেসে উঠল। লুহান ফুলের পিছু নিতে চাইলে উদ্যান তাকে নিষেধ করে দেয়, ঠিক সেই সময়েই আকাশে বিদ্যুৎ চমকায়। উদ্যান সমুখে তাকাতেই রুমাকে গাছের আড়ালে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখতে পায় সে। রুমা অবশ্য বুঝতে পারেনি যে উদ্যান তাকে দেখে ফেলেছে, মেয়েটা বিদ্যুৎ চমকানোর শব্দে কান চেপে ধরে চোখ বন্ধ করে ছিল। উদ্যান তবুও নিশ্চিত হওয়ার জন্য কনসোলে চোখ বোলায়। আর রুমার লোকেশন দেখে সে শিওর হয়ে যায়।
এই ঘটনা শুনে অনি আর মেলো চুপ হয়ে গেলেও সোহম বলে উঠল, “তার মানে তুই বুঝতে পেরেছিলি পিটিফুলের বিপদ হতে পারে। তবুও তুই ওর পিছু নিসনি?”
উদ্যান শান্তচোখে তাকাল। “ওর পিছু নিলে আমরা রিদমকে এখনো খুঁজে পেতাম না।”
কথাটা বলেই উদ্যান পা ফেলে চলে গেল। সোহম আহাম্মকের মতো তাকিয়ে রইল তার যাওয়ার পানে।
চলবে,,,
শব্দসংখ্যা: ৩৪৫০+
Share On:
TAGS: অবাধ্য হৃৎস্পন্দন, সোফিয়া সাফা
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
অবাধ্য হৃৎস্পন্দন পর্ব ২৩
-
অবাধ্য হৃৎস্পন্দন পর্ব ৩২
-
অবাধ্য হৃৎস্পন্দন পর্ব ১০
-
অবাধ্য হৃৎস্পন্দন পর্ব ৪১
-
অবাধ্য হৃৎস্পন্দন পর্ব ১৬
-
অবাধ্য হৃৎস্পন্দন পর্ব ৪৩
-
অবাধ্য হৃৎস্পন্দন পর্ব ৩৬
-
অবাধ্য হৃৎস্পন্দন পর্ব ১৯
-
অবাধ্য হৃৎস্পন্দন পর্ব ১১
-
অবাধ্য হৃৎস্পন্দন পর্ব ৪০