Golpo romantic golpo অবাধ্য হৃৎস্পন্দন

অবাধ্য হৃৎস্পন্দন পর্ব ৪০


অবাধ্য_হৃৎস্পন্দন (৪০)

সোফিয়া_সাফা

​উদ্যান চোখ জোড়া বুজে ডুবে আছে ফুলের ঠোঁটের গভীরতায়। কখনো নিচের ঠোঁট, তো কখনো উপরের—অবিরাম এক রাজত্ব কায়েম করে চলেছে সে। তার তপ্ত নিশ্বাসে ফুলের তখন দিশেহারা হওয়ার জোগাড়। হঠাৎ উদ্যান তার ঠোঁট ছেড়ে দিয়ে ঘাড়ের ভাঁজে মুখ ডুবিয়ে দিল। পাগলের মতো চুম্বনের নেশায় মত্ত হয়ে কানের কাছে গিয়ে ফিসফিসিয়ে বলল, “ইউ স্মেল লাইক আ প্রিমরোজ… বাট টেস্ট লাইক স্ট্রবেরিজ অ্যান্ড হানি।”

ফুলের বোধশূন্য শরীরটা যেন মুহূর্তেই প্রাণ ফিরে পেল। ছোটার জন্য ছটফটিয়ে উঠল মেয়েটা। উদ্যান বুঝতে পারল, এই মুহূর্তেই হয়তো মেয়েটা কোনো কঠোর বাক্যবাণে তাকে বিদ্ধ করবে; যার ফলে নিজের সুপ্ত বাসনাগুলোকে অবদমিত করে সে থেমে যেতে বাধ্য হবে। কিন্তু উদ্যান আজ পিছিয়ে যাওয়ার মতো মানসিক অবস্থায় ছিল না। তাই সে ফুলকে মুখ খোলার অবকাশ টুকুও দিল না। ফের ঠোঁটে ঠোঁট দাবিয়ে দিল।
ফুল কিছুক্ষণ ছটফট করে অবশেষে শান্ত হয়ে এল। নোনা জল তার চিবুক বেয়ে ঝরে পড়ছে অবিরত। উদ্যানের দুহাত তখনও নিজস্ব ছন্দে ব্যস্ত। এক হাতে কোমরের হাড় শক্ত করে চেপে ধরে অন্য হাতে ফুলের পিঠে সেঁটে থাকা ব্লাউজের বোতামগুলো একে একে অবমুক্ত করছে সে।

কিয়ৎক্ষণের ব্যবধানে ব্লাউজ নামিয়ে কাঁধ উন্মুক্ত করে ফেলল উদ্যান। তারপর মুখ নামিয়ে সেখানে নাক ঘষতে শুরু করল। দীর্ঘক্ষণ পর ছাড়া পেয়ে ফুলের নাভিশ্বাস উঠল। অক্সিজেনের তীব্র সংকটে লাল হয়ে আসা ঠোঁটজোড়া আপনাআপনি ফাঁক হয়ে গেল। উদ্যানের ছোঁয়া তখন আরও অবিন্যস্ত, আরও বেপরোয়া। দিকভ্রান্ত ফুল ঘাড় বাকিয়ে পেছনে তাকাতেই নজরে এল, গোটা তিনেক মোমবাতির পাশে টেকিলার বড়বড় দুটো কাঁচের বোতল রাখা আছে, এগুলো আর ফুলের কাছে অপরিচিত নয় বরং প্রতিদিন সে এই বোতলগুলো দেখে। যেন সোলার এস্টেটের প্রত্যেকের মৌলিক পানীয় এটা। তার এলোমেলো মস্তিষ্ক চাপ সামলাতে ব্যর্থ হয়ে কঠিন এক সিদ্ধান্তে উপনীত হলো।
উদ্যান তখন মোহাচ্ছন্ন। ফুলের ঘাড়ের ভাঁজে মুখ গুঁজে সে উন্মত্তের মতো ঘ্রাণ নিচ্ছিল, আর তার অস্থির হাতদুটো ফুলের শাড়ি টেনে টেনে খুলছিল। অকস্মাৎ কিছু ভাঙার শব্দে তার মতিভ্রম হলো। তড়িৎবেগে চোখ মেলে তাকাতেই দেখল, ফুলের চোখে জলের ধারা। সেই দৃষ্টি অনুসরণ করে পাশ ফিরতেই দেখল পেল, মেয়েটা টেবিলের সঙ্গে বাড়ি মেরে একটা বোতল ভেঙে ফেলেছে। উদ্যানের চোখে বিস্ময় জমে উঠল। হাতদুটো নিজের কাজ থামিয়ে স্থবির হয়ে পড়ল।

“এটা কী করলে?”

ফুল ভাঙা কাঁচের বোতলটা উদ্যানের দিকে তাক করতেই উদ্যান দুপা পিছিয়ে গেল। হাতের উল্টো পিঠে ঠোঁট মুছতে মুছতে ফুল ডান পাশে সরে দাঁড়াল। ঝাঝালো কণ্ঠে বলল, “আপনি আজ সব সীমা অতিক্রম করে ফেলেছেন। আমার অনুমতি ছাড়া আপনি… এতো কিছুর পরেও কী করে পারলেন আমার ওপর অধিকার ফলাতে? যেই পুরুষ সবার সামনে আমাকে স্ত্রী পরিচয় দিতেও নারাজ ছিল সেই পুরুষের কি আদৌ অধিকার আছে আমার ওপর?”

উদ্যান নেশাতুর চোখে তাকাল। ধীরস্থির গলায় বলল, “তখন তুমি আমার শত্রু ছিলে। আমি তোমার গুরুত্ব বুঝতে পারিনি। যদি বুঝতাম, তোমাকে অসম্মান করতাম না। যথাযথ সম্মানের সহিত সবার সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিতাম। কিন্তু তুমি সেটা নিয়ে রাগ করছো কেন? আমার জানামতে তুমিও তখন আমার স্ত্রী হিসেবে পরিচিত হতে রাজি ছিলে না।”

কথা বলতে বলতেই উদ্যান ফুলের হাত থেকে কাঁচের টুকরোটা কেড়ে নেওয়ার চেষ্টা করল। কিন্তু ফুল ক্ষিপ্রগতিতে সেটা নিজের গলার কাছে ধরে আর্তনাদ করে উঠল, “একদম সামনে এগোবেন না। আমি এখনো নিজেকে আপনার হাতে সঁপে দেই নি। একবারও বলিনি আমার মনে আপনার প্রতি বিন্দুমাত্র কোনো ফিলিংস আছে। যদি বাড়াবাড়ি করেন আমি নিজেকে শেষ করে ফেলব।”

ফুলের হাত অনিয়ন্ত্রিত তালে কাঁপছে। উদ্যান জানে, ফুল তাকে স্রেফ ভয় দেখাচ্ছে না। মেয়েটা নিজেকে আঘাত করতেও দ্বিধাবোধ করবে না। তাই সে নিরাপদ দূরত্বে সরে গিয়ে বলল, “আই ওন্ট কিস ইউ উইথ আউট ইওর ফা’কিং পারমিশন। জাস্ট ডোন্ট হার্ট ইওরসেল্ফ।”

ফুল উদ্যানের কথা কানে না নিয়ে ওয়াশরুমের দিকে দৌড়ে গেল। ভেতর থেকে দরজা আটকে দিয়ে কল ছেড়ে চোখে মুখে পানির ঝাপটা দিতে লাগল। আর উদ্যান খাটের ওপর বসে অহর্নিশ চোখে তাকিয়ে রইল বন্ধ দরজার দিকে। তার আঙুল আপন মনেই নিজের ঠোঁট ছুঁয়ে যাচ্ছিল। বাইরের পরিবেশ তখনও শান্ত হয়নি। মুষলধারে বৃষ্টি পড়ছে।
ফুলের মাথায় উন্মাদনা চেপে বসল। সে পরণের শাড়িটা খুলে ফেলে ভেজা থ্রি পিছ টাই গায়ে জড়াল। তারপর মুখ চেপে ধরে ভেঙে পড়ল এক নিস্তব্ধ কান্নায়। যেই কান্নার কোনো আওয়াজ নেই, আছে শুধু বুক ফাটা আর্তনাদ।
​কিছুক্ষণ পর দরজা খুলে ফুল বেরিয়ে এসে দেখল উদ্যান মাথা নিচু করে বসে আছে। সুযোগ বুঝে সে দরজার দিকে এগোতেই উদ্যান চোখ তুলে তাকাল। ফুল পুনরায় ভাঙা কাঁচের বোতলটা গলার কাছে ধরে জেদি গলায় বলল, “আমি বাড়িতে ফিরে যাচ্ছি। আমার পিছু পিছু আসার চেষ্টা করবেন না।”

উদ্যানের চাহনি নিগুঢ় হয়ে উঠল। সে গম্ভীর স্বরে বলল, “তুমি পথ হারিয়ে ফেলবে। একা একা যেওনা। আমি যখন বলেছি তোমাকে কিস করবো না তখন নিশ্চিন্তে থাকো। বৃষ্টি থামুক তারপর এস্টেটে ফিরে যাব।”

ফুলের ভীষণ অভিমান হলো। লোকটা কি সরি বলতে পারতো না? এতোটা রুক্ষ গলায় কেন বলল থেকে যেতে? না, ফুল শুনবে না এই দানবটার কথা। উদ্যান যেমন তার বাধানিষেধ আমলে নেয়নি তেমনি ফুলও আজ খুব অভিমানী হবে। সিঁড়িতে পা রাখতেই উদ্যান রক্তচোখে তাকে সাবধান করল, “তোমাকে আমি যেতে বারণ করেছি। শুনতে পাওনি? ভালো ভাবে বলছি; ভালো লাগছে না? তুমি কি মনে করো ওই কাঁচের টুকরোকে তেহজিব ভয় পায়?”

ফুলও উদ্যানের ভঙ্গিতে তেজি গলায় বলল, “ভয় না পেলে এগিয়ে আসুক দেখি।”

উদ্যান তৎক্ষনাৎ উঠে দাঁড়াল। একদম ফুলের মুখোমুখি আসতেই ফুল দুহাতে ভাঙা বোতলটা ধরল। উদ্যান দরজার ফ্রেমে হাত রেখে হিসহিসিয়ে বলল, “এগিয়ে এসেছি, এবার দেখো। দেখতে অসুবিধা হলে বলো, আরও কাছে আসছি; নো প্রবলেম!”

ভয় আর জেদে ফুল এক পা পিছিয়ে যেতে চাইল, কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত তার পা সিঁড়ি থেকে পিছলে গেল। সে আতঙ্কিত চোখে হাত বাড়িয়ে উদ্যানকে আঁকড়ে ধরতে চাইল। আর উদ্যানও তার বাড়িয়ে দেওয়া হাত ধরতে গেল কিন্তু ঘটনা এত দ্রুত ঘটে গেল যে সে ফুলকে আঁকড়ে ধরতে পারল না। ফুলের হাতের কাছাকাছি গিয়েও ছুঁতে না পারার আফসোস উদ্যানের মস্তিষ্কে সঙ্গে সঙ্গে ঝড় তুলল। পুরো ৯ টা সিঁড়ি গড়িয়ে ফুলের দেহটা গাছের গোড়ায় থাকা কাদাজলে আছড়ে পড়ল। কাঁচের টুকরো টা কোথায় গিয়ে পড়ল তার আর খবর রইল না।
উদ্যান হতবাক হয়ে নিজের হাতের পানে চেয়ে আছে। নিচের কাদাজলে পড়ে থাকা ফুল যন্ত্রণায় চোখমুখ কুঁচকে উঠে বসার চেষ্টা করল। কোমরে অসামান্য চোট পেয়েছে সে। অতি কষ্টে কোমর চেপে ধরে উঠে বসল, ব্যাথাতুর দৃষ্টে তাকাল উদ্যানের স্থবির হয়ে থাকা অবয়বের দিকে। তার মনে হচ্ছে উদ্যান ইচ্ছা করলেই তাকে বাচিয়ে নিতে পারত কিন্তু আকাশচুম্বী অহংকার আর দাম্ভিকতার জেরে উদ্যান তাকে বাচানোর চেষ্টা করেনি।

ফুলের পুরো শরীরে কাদা। মুখেও কাদাপানি ঢুকে গেছে। ঘেন্নায় থুতু ফেলে কোনোমতে টাল সামলে উঠে দাঁড়াল সে। উদ্যান তখনও আফসোসের ঘোরেই আটকে আছে। তাকে ভাবলেশহীন দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে ফুল যারপরনাই রেগেমেগে বোম হয়ে গেল।
“ওখানে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে তামাশা দেখছেন? আমাকে ধরলেন না কেন হ্যাঁ? ফিল্মে কখনো দেখেন নি নায়িকা পড়ে যেতে নিলে নায়ক তাকে বাচায়? ওহ হো আমি তো ভুলেই গিয়েছিলাম আপনি কেন আমাকে বাচাবেন আপনি তো নায়ক নন। আপনি হলেন গিয়ে ভিলেন। আমার গল্পের সবচেয়ে বড় ভিলেন আপনি। আর আমি হলাম গিয়ে নির্লজ্জ নায়িকা। যার না আছে লাজ আর না আছে হায়া। নইলে ভিলেনের মাঝে নায়কের গুণাবলির তালাশ করি।”

ফুলের ভিত্তিহীন কথায় উদ্যানের মাঝে ভাবাবেগ ঘটল। সে পকেটে হাত গুঁজে নির্লিপ্ত সুরে বলল, “আমি নায়ক হওয়ার চেষ্টা করেছিলাম বিশ্বাস করো কিন্তু আমার হাত শেষ মুহূর্তে বেঈমানী করেছে। কান্নাকাটি না করে দ্রুত উঠে এসো। তোমাকে এই অবস্থায় ভূতের চেয়েও ভয়ঙ্কর লাগছে। শাওয়ার নিয়ে পরিষ্কার কাপড় পরে নাও।”

রাগে ফুলের শরীর থরথর করে কাঁপছে। সে রাগ সংবরণ করতে না পেরে চেঁচিয়ে উঠল, “আই জাস্ট হেইট ইওর গুডড্যাম অ্যাটিটিউড।”

ফুল উল্টো ঘুরে উদ্দেশ্যহীন ভাবে হাঁটা ধরল। ফুল জানেনা সে কোথায় রওনা করেছে কিন্তু এটা জানে উদ্যানের চেহারা দেখলে তার গা পিত্তি জ্বলে যাচ্ছে। নিজের উপরেই রাগ উঠছে, সে কেন পারছেনা তাকে কিস করার অপরাধে উদ্যানকে কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়ে গলা টিপে দিতে? কেন তার বেহায়া মন প্রতিবাদী হয়ে উঠছেনা? কেন সব ধরনের অঘটন ঘটিয়েও দানবটা পার পেয়ে যায়?

ফুলের ছায়া মিলিয়ে যাওয়া মাত্রই ঝোপঝাড় থেকে রেইনকোট পরা লুহান আর লুইস বেরিয়ে আসে। তারা দুজন ফুলের পিছু নিতে গেলে উদ্যান বাঁধা দিয়ে বলে,
“যাস না ওর পেছনে। ওর দম্ভ ভাঙা অত্যাবশকীয় হয়ে উঠেছে।”

উদ্যানের কণ্ঠস্বর শুনে লুহান অনুমান করল উদ্যান ক্রোধের অনলে দাউদাউ করে জ্বলছে। লুহান ধীর গলায় বলল, “দেখ, রাগের মাথায় এমন কিছু করিস না যার জন্য পরে তোকেই আফসোস করতে হয়।

উদ্যানের নাসারন্ধ্র ফুলে উঠল। অন্ধকারের মাঝেও শক্ত চিবুক পরিলক্ষিত হলো। লুহান সঙ্গে সঙ্গে মাথা নত করল। উদ্যান দাঁতে দাঁত পিষে কিড়মিড়িয়ে বলল, “আফসোস আমাকে নয়, ওকে করতে হবে। ও আমাকে আজ যে পরিস্থিতিতে ফেলেছে তার জন্য একটু শাস্তি ওরও প্রাপ্য।”

উদ্যান পকেট থেকে কনসোল বের করে এক নজর দেখে নিয়ে ভেতরে চলে গেল। লুহান দীর্ঘশ্বাস ফেলে সেভাবেই দাঁড়িয়ে রইল। যদিও সে মনে মনে প্রার্থনা করছিল ফুল যেন শাস্তির এই কয়েক মিনিট নিরাপদে থাকে।

ফুল কান্নাভরা চোখে এদিক ওদিক তাকাচ্ছে কিন্তু নিশ্ছিদ্র অন্ধকারে কোনো বস্তুই তার নজরে পড়ছে না। সে ক্ষণে ক্ষণে পেঁছন ফিরে তাকাচ্ছে। আর অসহায়ের মতো ঠোঁট চেপে কান্না নিয়ন্ত্রণের বৃথা চেষ্টা করছে। উদ্যানকে ঘিরে তার অভিমানের পারদ যেন তরতর করে বেড়েই চলেছে।
“সে আমার পিছু নেয়নি। আমি হারিয়ে গেলেও তার কিছু যাবে আসবে না। অথচ সে নির্দ্বিধায় ভালোবাসার কথা স্বীকার করে। এ তার কেমন ভালোবাসা? যেই ভালোবাসায় মায়া, টান, উন্মাদনা নেই সেই ভালোবাসা আসলে কোন ধরণের অনুভূতি?”

হঠাৎ আকাশ চিরে কয়েকটা বিকট বজ্রপাত হলো। সেই কানফাটানো শব্দে ফুলের সবটুকু সাহস নিমেষেই ধূলিসাৎ হয়ে গেল। সে আর কান্না চেপে রাখতে পারল না, পাগলের মতো হু হু করে কেঁদে উঠল। সে পথ গুলিয়ে ফেলেছে। ফিরে যাওয়ার পথটাও এখন আর তার জানা নেই। সে মাথা চেপে ধরে ছুট লাগাল, আর নয়, অনেক হয়েছে সে এবার ফিরে যেতে চায়। ফিরে গিয়ে উদ্যানের বুক বরাবর কয়েকটা ঘুষি মেরে জানতে চাইবে, “এমন নির্দয় আচরণ আপনি কীভাবে কর‍তে পারলেন। একটুও কি মায়া লাগেনি আমার জন্য? আমাকে হারিয়ে ফেলার ভয়ে তটস্থ হয়ে কেন যাননি? কেন আমি আঘাত পাওয়ার পরেও আপনার হৃদয় গুমরে উঠল না? কেন জিজ্ঞেস করলেন না আমি কোথায় ব্যাথা পেয়েছি। কেন আমার মুখে লেগে থাকা কাদামাটি মুছে দিলেন না?”

অন্ধকারে দিকভ্রান্তের মতো কতক্ষণ ছোটাছুটি করেও ফিরে যাওয়ার পথ খুঁজে পেল না ফুল। অবশেষে হার মেনে চিল্লিয়ে উঠল মেয়েটা, “উদ্যান… কোথায় আপনি? আমাকে কি আপনার প্রয়োজন নেই? ফিরিয়ে নিয়ে যান না আমাকে। আমি ভ… ভয় পাচ্ছি খুব। আপনি জানেন আমি ভূতেদের ভয় পাই। জানেন না বলুন? আমি পথ হারিয়ে ফেলেছি।”

হন্যে হয়ে পথ খুঁজতে গিয়ে হঠাৎ পা পিছলে তার জুতোজোড়া ছিঁড়ে গেল। এক পা এগোতেই তীক্ষ্ণ সূচালো কিছু একটা বিঁধে গেল তার কোমল পায়ের তলায়।
“আহহহ।” ব্যাথায় ককিয়ে উঠল ফুল। পা চেপে ধরে ধপ করে বসে পড়ল ভেজা মাটির ওপর। তখনই ভারী বুট জুতোর পদচারণার শব্দ সমানতালে তার কর্ণগুহরে ভেসে এল। সে উৎসুক হয়ে বলল, “আমি জানতাম আপনি আমাকে ঠিকই খুঁজে বের করবেন। শুধু মনে হচ্ছিল আপনি হয়তো জেদ করে খুঁজতেই আসবেন না।”

কিন্তু আগন্তুক ছায়াগুলো যত অগ্রসর হচ্ছিল, ফুলের চোখের মণি বিস্ময়ে তত বড় হয়ে যাচ্ছিল। এদের কাউকেই তার পরিচিত বলে মনে হচ্ছেনা। গোটা দশেক টগবগে যুবককে চোখের সামনে দেখে ফুলের লোম খাঁড়া হয়ে উঠল। আতঙ্কে গলার স্বর বুজে এল তার, তবুও কাঁপা কাঁপা গলায় প্রশ্ন ছুড়ল, “কা… কারা আপনারা?”

বিপরীতে কোনো উত্তর দিল না লোকগুলো। সামনে দাঁড়িয়ে থাকা বিশালদেহী লোকটা হাত দিয়ে ইশারা করতেই পেছন থেকে দুজন দীর্ঘকায় মহিলার আবির্ভাব ঘটল। তাদের একজনের হাতে থাকা টর্চের আলো সপাটে ফুলের মুখে পড়ল। তীব্র আলোর ঝলকানিতে ফুল চোখ খিচে বন্ধ করে নিল। তারা কোনো কথা না বলে ফুলকে টেনে দাঁড় করাল।

“একী, কারা আপনারা। আমার কাছে কী চাই? ছেড়ে দিন আমাকে। ভালো হবেনা কিন্তু, ছেড়ে দিন।” ফুল ছোটার জন্য প্রাণপণ চেষ্টা করল। কিন্তু লাভ হলোনা, মহিলা দুজন কল্পনার চেয়েও অধিক শক্তিশালী। সেই বিশালদেহী লোকটা হঠাৎ গম্ভীর গলায় আদেশ করল, “ওর গায়ে যত ধরনের মেটালের জিনিস আছে সব খুলে ফেলে দে।”

মহিলা দুজন মাথা নেড়ে প্রথমে ফুলের হাতের চুড়ি গুলো খুলতে লাগল। তারা হয়তো কখনো চুড়ি পরেনি নইলে এমন খাবলে খুবলে চুড়ি খুলতো না। ফুলের মনে হচ্ছে তার কোমল হাত দুটো কেউ জাঁতাকলে পিষে দিচ্ছে। ব্যাথায় মেয়েটার প্রাণ ওষ্ঠাগত। তবুও অনুনয় করেই চলেছে অনবরত।

“ছেড়ে দিন, আমি এগুলো নিজে থেকেই খুলে দিচ্ছি। এগুলো সোনার কিংবা রুপোর নয়, সস্তা মেটালের তৈরি। আমার পায়ের নূপুর রুপোর আর কানের গুলো সোনার। আমি স্বেচ্ছায় সব দিয়ে দেব। দয়া করে ব্যাথা দিবেন না।”

মহিলা দুজন শুনলো না। এক এক করে সেগুলো খুলে ফেলে দিতে লাগল। ফুলের বিস্ময়ের মাত্রা কয়েকগুণ বেড়ে গেল। তাদের মনোভাব ঠিক ঠাহর করতে পারল না। এরা যদি ডাকাতই হয়ে থাকে তাহলে জিনিস গুলো ফেলে দিচ্ছে কেন? মুহূর্তেই ফুলের অন্তরাত্মা কেঁপে উঠল। আচ্ছা তাদের কোনো খারাপ মতলব নেই তো?

তার ভাবনার মাঝেই একজন মহিলা ফুলের পেন্ডেন্টের দিকে হাত বাড়াল। ফুল এবার কান্নায় ভেঙে পড়ল, “এটা কোন ধাতুর তৈরি আমি জানি না, কিন্তু প্লিজ এটা নেবেন না! এটা আমার কাছে খুব দামী!”

বিশালদেহী লোকটা এবার বিরক্ত হলো। ফুলের চেঁচামেচি তার কাছে মোটেও উপভোগ্য লাগছে না। সে হাতের ইশারায় কিছু একটা চাইল, আর অন্য একজন তক্ষুনি তার হাতে একটা ছোট বোতল ধরিয়ে দিল। লোকটা ভারী কদমে ফুলের সামনে গিয়ে থামল। ফুলকে ভাবার সময়টুকু না দিয়েই মুখের ওপর সেটা স্প্রে করে দিল। মুহূর্তেই ফুলের চারপাশটা দুলতে শুরু করল। চোখের পাতা ভারি হয়ে এল, কিছু মুহূর্তের ব্যবধানেই তার শরীর নিস্তেজ হয়ে একদিকে ঢলে পড়ল।

প্রায় আধঘণ্টা কেটে গেছে। বাইরের বৃষ্টির শব্দ ছাপিয়ে এক অদ্ভুত নিস্তব্ধতা ট্রি হাউসটাকে ঘিরে ধরেছে। লুহান দ্বিধাগ্রস্ত পায়ে ভেতরে উঁকি দিল। দেখল, উদ্যান বিছানায় আধশোয়া হয়ে একমনে টেকিলা গিলছে; চোখেমুখে এক অদ্ভুত কাঠিন্য। লুহান কড়া নাড়তেই উদ্যান বিরক্তি সূচক শব্দ উচ্চারণ করে ভেতরে ঢোকার অনুমতি দিল। “শাস্তি অনেক দিয়েছিস, এবার খুঁজে আনতে যাই?”

উদ্যান মাথা নেড়ে যেতে বলল। লুহান যেই দরজার দিকে পা বাড়াল, অমনি পেছন থেকে উদ্যানের গম্ভীর কণ্ঠস্বর ভেসে এল, “দাঁড়া, আমিও যাব।”

উদ্যান উঠে দাঁড়িয়ে রেইনকোট পরে নিল। তারপর লুইস, লুহান আর দলের আরও কয়েকজনকে সাথে নিয়ে সে অরণ্যের অন্ধকারে নেমে পড়ল। তার হাতে থাকা কনসোলের লোকেশন ট্র্যাক করতে করতে তারা সেই নির্দিষ্ট জায়গাটিতে এসে পৌঁছাল, যেখান থেকে ফুলকে তুলে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। লুহান টর্চ জ্বালিয়ে নিচের দিকে তাকাতেই আঁতকে উঠল। কাদার ওপর ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়ে আছে ফুলের চুড়ি, এয়ারিং আর নূপুরজোড়া। কিন্তু ফুলের কোনো চিহ্নও নেই।

উদ্যান তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে চারপাশটা পর্যবেক্ষণ করল। কয়েক পা এগিয়ে যেতেই একটা বড় কচুপাতার ওপর তার নজর স্থির হলো। সেখানে পড়ে আছে তার দেওয়া সেই পেন্ডেন্টটা। উদ্যান সন্তর্পণে সেটা হাতে নিয়ে পকেটে ঢুকিয়ে রাখল। লুহান তার পাশে এসে দাঁড়িয়ে চাপা গলায় বলল, “নে এবার তুই খুশি হয়েছিস? মেয়েটাকে ওরা তুলে নিয়ে গেছে।”

লুহানের কথা শেষ হওয়ার আগেই উদ্যান প্রবল ক্ষিপ্রতায় তার রেইনকোটের কলার চেপে ধরল। তার চোখ দিয়ে যেন আগুন ঝরছে। বিক্ষুব্ধ গলায় সে গর্জে উঠল, “আমি রেগেমেগে নাহয় ওর পিছু নিতে নিষেধ করেছিলাম তাই বলে তুই সত্যি সত্যিই কাউকে পাঠাবি না ওর পেছনে?”

লুহান হড়বড়িয়ে গেল। এর আগে কখনো তারা উদ্যানের কথার বরখেলাপ করেছে? যে আজ করবে? উদ্যান এটা আশাই বা করল কীভাবে? সে বিস্মিত হয়ে পাল্টা প্রশ্ন করল, “বউ হারানোর শোকে উন্মাদ হয়ে গেছিস? তোর আদেশ অমান্য করে ওর পিছু নিলে তুই আমাকে আস্ত রাখতিস?”

উদ্যান লুহানকে আরও কাছে টেনে এনে অগ্নিঝরা কণ্ঠে হিসহিসিয়ে উঠল, “ওর কিছু হয়ে গেলেও তোকেই আগে মারব, তারপর বাকি সবাইকে। ছাড়ব না কাউকে।”


​কতক্ষণ অচৈতন্য ছিল ফুল, তার কোনো ধারণা নেই। যখন ধীরে ধীরে চোখের পাতা মেলল, দেখল সে এক ঘুটঘুটে অন্ধকার ঘরের মেঝেতে পড়ে আছে। ছাদ থেকে ঝুলে থাকা একটা পুরনো হলদে রঙের বাল্ব টিমটিম করে জ্বলছে, যা ঘরের নিস্তব্ধতাকে আরও গা ছমছমে করে তুলেছে।

​ফুল উঠে বসার চেষ্টা করল। তার হাত-পা বাঁধা নেই ঠিকই, কিন্তু সারা শরীরে বিন্দুমাত্র শক্তি অবশিষ্ট নেই। গায়ের কাদামাখা পোশাকগুলো শুকিয়ে শক্ত হয়ে গেছে। তার সেই রেশমের মতো মসৃণ চুলগুলো এখন কাদায় চিটচিটে আর জট পাকানো। আগুনের মতো তপ্ত নিশ্বাস বের হচ্ছে তার নাসারন্ধ্র দিয়ে; ফুল বুঝতে পারল প্রবল জ্বরে তার শরীর পুড়ে যাচ্ছে। চারপাশটা ঝাপসা হয়ে আসছে, চোখ দুটো যেন যন্ত্রণায় আপনাআপনি বুজে যেতে চাইছে।

​ঠিক সেই মুহূর্তে এক করুণ আর্তনাদ তার কানে এসে বিধল। কেউ একজন খুব কাছ থেকেই গোঙাচ্ছে। যন্ত্রণাকাতর সেই শব্দে ফুলের তন্দ্রাচ্ছন্ন শ্রবণেন্দ্রিয় মুহূর্তেই সজাগ হয়ে উঠল। সে অমানুষিক প্রচেষ্টায় ঘাড় বাঁকিয়ে পেছনের দিকে তাকাল।

​পরমুহূর্তেই ভয়ে তার কলিজা শুকিয়ে এল। কয়েক হাত দূরেই অন্ধকারের ভেতর একটা মেয়েকে শক্ত করে চেয়ারের সাথে বেঁধে রাখা হয়েছে। মেয়েটির অবস্থা বড়ই করুণ; উষ্কখুষ্ক চুলগুলো মুখের ওপর ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকায় তার চেহারা স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে না। কিন্তু তার অদ্ভুত গোঙানি আর শরীরের কম্পন দেখে তাকে পাগল বলেই মনে হচ্ছে। হলদেটে আলোয় সেই দৃশ্য দেখে ফুলের শিরদাঁড়া বেয়ে এক শীতল স্রোত বয়ে গেল। এই জনমানবহীন অন্ধকারে কে এই মেয়েটি? আর কেনই বা তাকে এভাবে আটকে রাখা হয়েছে?

মেয়েটির করুণ দশা দেখে ফুল আতঙ্কে শিউরে উঠল। অসুস্থ শরীর নিয়ে টলতে টলতে সে দেয়াল হাতড়ে ঘরের দরজা খুঁজতে লাগল। একসময় দরজার নাগাল পেলেও দেখল তা বাইরে থেকে শক্তভাবে তালাবদ্ধ। ফুল দরজায় করাঘাত করে প্রাণপণ চিৎকার করল। কিন্তু সেই নিস্তব্ধ প্রকোষ্ঠ থেকে তার কণ্ঠস্বর বাইরে পৌঁছাল না। কেউ এল না তাকে সাহায্য করতে।

​হতাশ হয়ে সে দরজার সাথে হেলান দিয়ে মেঝেতে ধপ করে বসে পড়ল। ভয়ে আর জ্বরের ঘোরে তার শরীর কাঁপছে। তন্মধ্যেই সেই বন্দি মেয়েটা ভাঙা গলায় অস্ফুট স্বরে বিলাপ করে উঠল, “পানি… একটু পানি দাও…”

​ফুলের বুকের ভেতরটা ভয়ে দুরুদুরু করে কাঁপছিল। সে ভয়ে আড়ষ্ট হয়ে দরজার কোণে কুঁকড়ে রইল। এভাবেই কেটে গেল প্রায় ঘণ্টাখানেক। তপ্ত জ্বরের ঘোরে ফুলের চোখ লেগে এসেছিল, কিন্তু আবারও সেই তৃষ্ণার্ত আর্তনাদ ভেসে এল, “পানি… পানি… দাওনা একটু।”

ফুলের ঘুম ছুটে গেল। ​এবার ভয়ের চেয়ে মায়া আর মানবিকতা প্রবল হয়ে উঠল তার মনে। সে অস্পষ্ট হলদে আলোয় চারদিকে তাকিয়ে ঘরের এক কোণে একটা মাটির কলস দেখতে পেল। টলটলে পায়ে এগিয়ে গিয়ে কাঁপা হাতে কলসটা কাত করতেই দেখল তলানিতে সামান্য পানি অবশিষ্ট আছে। সেইটুকু পানি পাত্রে ঢেলে সে অতি সাবধানে মেয়েটির সামনে গিয়ে দাঁড়াল। তার প্রতিটি পদক্ষেপে ফুটে উঠছিল গভীর জড়তা আর শঙ্কা।

​মেয়েটি তখনো মাথা নিচু করে গোঙাচ্ছিল। ফুল অতি সন্তর্পণে হাত বাড়িয়ে মেয়েটির মুখের ওপর লেপ্টে থাকা সেই জট পাকানো চুলগুলো সরালো পানি খাওয়ানোর জন্য। কিন্তু চুলগুলো সরাতেই হলদেটে আলোয় যে মুখটি ভেসে উঠল, তা দেখে ফুলের পায়ের নিচ থেকে মাটি যেন সরে গেল। বিস্ময় আর আতঙ্কে তার শরীরের রক্ত হিম হয়ে এল। তার হাতের পাত্রটি কাঁপতে কাঁপতে মেঝেতে পড়ে গেল।

“ম্যাম, আপনি এখানে?” ফুলের চিৎকারে উর্বী ধীরে ধীরে মুখ তুলে চাইল, কিন্তু তার ঝাপসা দৃষ্টিতে ফুলকে চিনে ওঠার মতো শক্তি ছিল না। উর্বীর এমন বিধ্বস্ত আর করুণ দশা দেখে ফুলের অস্থিমজ্জা শিরশিরিয়ে উঠল।
ফুল তাকে কী করে ভুলে যাবে? এই মেয়েটিই যে একদিন তাকে সাহায্য করেছিল। জঙ্গল থেকে উদ্ধার করে আবেশের হাতে তুলে দিয়েছিল। এক দেখায় কাউকে মনে না রাখাটা স্বাভাবিক হলেও এই কারণেই ফুলের মনে আছে তাকে।

“পানি… একটু পানি।” তৃষ্ণায় উর্বীর কণ্ঠস্বর চিরে যাচ্ছে। ফুল হতবিহ্বল হয়ে মেঝেতে পড়ে থাকা খালি পাত্রটির দিকে তাকাল। উর্বীর জীর্ণ মুখটা দেখে ফুল হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে আবার কলসের কাছে ছুটে গেল। কলসটা উপুড় করে অবশিষ্ট কয়েক ফোঁটা পানি পাত্রে জমিয়ে সে উর্বীর সামনে ফিরে এল। উর্বী পানিটুকু পান করে যেন প্রাণ ফিরে পেল। ফুল তার চুলগুলো সরিয়ে দেওয়ার উদ্দেশ্যে পেছনে ঠেলে দিতেই উর্বীর ঘাড়ে, গলায় ও গালে থাকা নখের আচড় আর কামড়ের বিদঘুটে দাগ ফুলের চোখ ঝলসে দিল।

“কে তুমি?” উর্বী প্রায় ফিসফিসিয়ে শুধাল।

ফুলের কণ্ঠরোধ হয়ে এল। তবুও কষ্ট করে উচ্চারণ করল, “আমি ফুল, সেদিন জঙ্গল থেকে যাকে বাচিয়েছিলেন। মনে নেই?”

উর্বী মনে করার চেষ্টা করল কিন্তু মনে করতে পারল না। ফুল জিভ দিয়ে শুষ্ক ওষ্ঠদ্বয় ভিজিয়ে প্রশ্ন করল, “আপনাকে এখানে কে এনেছে ম্যাম?”

নিমিষেই উর্বীর অভিব্যক্তি পাল্টে গেল। রক্তচোখে তাকাল ফুলের দিকে। পরমুহূর্তেই বুকফাটা আর্তনাদে ভেঙে পড়ল সে। “ওরা… আমাকে এখানে আটকে রেখেছে। অনেক খারাপ করেছে আমার সাথে। ওরা মে’রে ফেলবে আমাকে।”

​উর্বী আরও অনেক কিছু বলে বিলাপ করতে লাগল, যার মাথামুণ্ডু কিছুই ফুলের বোধগম্য হলো না। সে উপায়ন্তর না পেয়ে উর্বীর গালে হাত রাখল। নমনীয় কণ্ঠে বলল, “কেউ আপনার সাথে খারাপ করতে পারবে না। আপনি শান্ত হোন, আমাকে সবটা খুলে বলুন।”

কিন্তু উর্বী আরও বেশি উত্তেজিত হয়ে পড়ল। অতীতের কোনো পৈশাচিক স্মৃতি হয়তো তার মানসপটে ভেসে উঠছিল, সে পাগলের মতো মাথা ঝাঁকাতে লাগল।
“তুমি আমাকে বাচাও, আমি এখানে থাকতে চাইনা। আমার দম বন্ধ হয়ে যায়, ওরা খুব কষ্ট দেয়।”

ফুলের ভীষণ মায়া লাগল উর্বীর জন্য। সে উর্বীকে এক নিবিড় আলিঙ্গনে জড়িয়ে ধরল। “আমি এসে গেছি, আপনাকে রেখে কোথাও যাব না। সেদিন আপনি আমাকে সাহায্য করেছিলেন আজ আমি আপনাকে করবো।”

ফুল উর্বীর হাতপা খুলে দিতে চাইল কিন্তু বেড়ি তালাবদ্ধ থাকায় সে খুলতে পারল না। নিরুপায় হয়ে আবারও সেই দরজা কাছে চলে গেল। যেভাবেই হোক তাকে এখান থেকে বেরোনোর পথ খুঁজে বের করতেই হবে। সে নিজের সর্বশক্তি দিয়ে দরজায় আঘাত করতে লাগল। তখনই হঠাৎ দরজাটা খুলে গেল। দরজার সামনে দাঁড়িয়ে থাকা সেই মহিলা দুজনকে দেখে কয়েকপা পিছিয়ে গেল ফুল কিন্তু পালাতে পারল না। তার আগেই একজন তার হাত ধরে ফেলল। তারপর টেনেটুনে নিয়ে যেতে লাগল, “কোথায় নিয়ে যাচ্ছেন আমাকে? ছেড়ে দিন।”

ফুল চারদিকে তাকিয়ে জায়গাটা স্মরণ করে রাখল। তারা দুজন ফুলকে নিয়ে সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠে এল। সেই স্যাঁতসেঁতে ভূতুড়ে পরিবেশ পেরিয়ে ফুল হঠাৎ তীব্র আলোর দেখা পেল। তাকে এক বিশাল রাজকীয় লিভিং রুমে এনে ছেড়ে দেওয়া হলো। আচমকা ছেড়ে দেওয়ায় ফুল হুমড়ি খেয়ে পড়ল মেঝেতে। চোখ তুলে দেখল কতগুলো যুবক সোফায় বসে হাসিঠাট্টা করছে।
এক ভয়াবহ পরিস্থিতির মাঝখানে নিজেকে আবিষ্কার করে ফুলের হৃৎপিণ্ড যেন থমকে গেল।

​সেই বিশালদেহী লোকটা, যাকে ফুল রাতের অন্ধকারে দেখেছিল, সে এবার গম্ভীর গলায় বলে উঠল, “মেয়েটা আসলেই মাথা নষ্ট করা সুন্দরী। হানের বউ হওয়ার জন্য একদম পার্ফেক্ট।”

উপস্থিত সবার লোলুপ দৃষ্টি গিয়ে পড়ল মেঝেতে লুটিয়ে থাকা ফুলের ওপর। ঘৃণায় ফুল মাথা নিচু করে নিল। ঠিক তখনই রিহান ধীরপায়ে ফুলের দিকে অগ্রসর হলো। তার সামনে ঝুঁকে পড়ে, হাতে থাকা কাঁচের বোতলের অগ্রভাগ দিয়ে ফুলের চিবুকটা উঁচিয়ে ধরল সে। তারপর মৃদু স্বরে গুনগুন করে গেয়ে উঠল,
“কতদিন ভেবেছি শুধু দেখবো যে তোমায়
ক্লান্তহীন তুমি ছিলে আমার কল্পনায়…
সেই ছবি উঠলো ভেসে চোখেরই পাতায়।”

রিহানের চেহারা স্পষ্ট হতেই ফুল রীতিমতো বাকরুদ্ধ হয়ে গেল। তাকে স্তম্ভিত হতে দেখে রিহান একগাল হেসে বলল, “আমার রাজ্যে তোমাকে স্বাগতম, ফ্লোরিতা।”

​ফুলের শরীর আতঙ্কে শিউরে উঠল। সে অস্ফুট স্বরে উচ্চারণ করল, “রিদম… স্যার আপনি?”

​রিহান মাথা নেড়ে তাচ্ছিল্যের স্বরে বলল, “নো ইউ আর রঙ ফ্লোরিতা, আমি রিদম নই। আমি রিহান, ইউ ক্যান কল মি হান; অর হোয়াট এভার ইউ ওয়ান্ট।”

ফুলের শরীর কাঁপতে শুরু করল। সে তেজি গলায় বলল, “আমার নাম ফুল, ফুল মিনস ফ্লাওয়ার। উল্টোপাল্টা নামে ডাকবেন না।”

রিহান ভাবুক গলায় বলল, “এটা উল্টোপাল্টা নাম নয়। স্প্যানিশ নাম; যার অর্থ স্মল ফ্লাওয়ার।”
“নামের ব্যাখ্যা জানতে চাইনি। আমাকে যেখান থেকে তুলে এনেছেন সেখানেই রেখে আসুন।”
“আমি তোমাকে রেখে আসার জন্য তুলে আনিনি, ফ্লোরিতা। তোমাকে আমি বিয়ে করবো। তুমি হবে আমার রাজ্যের সম্রাজ্ঞী।”

ফুল দাঁত কিড়মিড়িয়ে বলল, “আপনি আসলেই রিদম স্যার নন, এই ব্যাপারে নিশ্চিত হলাম। যদি হতেন তাহলে জানতেন যে আমি বিবাহিতা। আমি বিয়ে টিয়ে করতে পারব না আপনাকে।”

রিহান আসন করে বসে পড়ল ফ্লোরে। তারপর অত্যন্ত আয়েশি ভঙ্গিতে গালে হাত রেখে বলল, “দেখো ফ্লোরিতা, আমার কোনো নির্দিষ্ট ধর্ম নেই। আমার পাপা ছিলেন বৌদ্ধ আর মা হিন্দু। তোমার বিয়েটা হয়েছে মুসলিম রীতিতে, তাই আমার বাবা-মায়ের ধর্মের দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে তোমার ওই বিয়ের কোনো অস্তিত্বই নেই। তাই ঠিক করেছি, আজ এই মুহূর্তে আমি তোমাকে হিন্দু শাস্ত্র মতে বিয়ে করবো।”

ফুল আর নিজেকে ধরে রাখতে পারল না। যন্ত্রণায় ফেটে পড়ে চিৎকার করে উঠল, “কেন? কেন বিয়ে করতে চাইছেন আপনি আমাকে?”

​রিহান শরীরটা সামান্য এগিয়ে নিয়ে ফুলের দিকে ঝুঁকে গেল। গাঢ় স্বরে বলল, “কারণ তোমাকে না দেখেই আমি তোমার প্রেমে পড়ে গিয়েছিলাম। আর আজ সামনে থেকে দেখার পর তোমাকে সরাসরি বউ বানিয়ে ফেলার ইচ্ছেটা মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে।”

​তীব্র জ্বরে ফুলের চোখমুখ ফুলে আছে, কাদামাখা নোংরা পোশাকে তাকে এই মুহূর্তে অত্যন্ত বিধ্বস্ত দেখাচ্ছে। নিজের এই জীর্ণ দশা দেখে ফুলের মনে হলো, একজন সুস্থ মস্তিষ্কের মানুষ কীভাবে এই অবস্থায় তাকে দেখে বিয়ের প্রস্তাব দিতে পারে? তার সাথে আসলে কী ঘটছে, সে কিছুই বুঝে উঠতে পারছে না।

​অসহায়ত্ব চেপে ফুল আকুতি করল, “ছেড়ে দিন আমাকে, আমি আর নিতে পারছি না এসব। আপনার সাথে আবার আমার কোন জন্মের শত্রুতা আছে? আমি কিচ্ছু বুঝতে পারছিনা।”

রিহান উদাসীন চোখে ফুলের আপাদমস্তক মেপে নিল। তারপর বাঁকা হেসে বলল, “আমি তো তোমাকে এখনো ধরিই নি ফ্লোরিতা, তাহলে ছেড়ে দেওয়ার প্রসঙ্গ আসছে কেন? বিয়ের পর যখন তোমাকে ধরবো তখন নাহয় ছেড়ে দিতে বোলো?”

এরপর রিহান তিনজন মেইডকে ডেকে কর্কশ কণ্ঠে আদেশ দিল, “ওকে যত দ্রুত সম্ভব বিয়ের জন্য তৈরি করে নিয়ে আয়।”
​মেইডরা ফুলের বাহু ধরতে এগোতেই সে তেজস্বী কণ্ঠে গর্জে উঠল, “খবরদার! একদম কাছে আসবেন না কেউ! আমি…”

​কথা শেষ না করেই ফুল উল্টো ঘুরে পালানোর জন্য এক দৌড় লাগাল। কিন্তু পাহারারত সেই যমদূতসম নারী দুজনের হাতে সে মুহূর্তেই আটকা পড়ল। তারা ফুলকে একপ্রকার টেনেহিঁচড়ে পাঁজাকোলা করে ওপরতলার দিকে নিয়ে গেল। রিহান ততক্ষণ পর্যন্ত সেদিকেই তাকিয়ে রইল, যতক্ষণ না ফুলের ছায়াটুকু অন্ধকারের আড়ালে মিলিয়ে গেল।

পাশ থেকে একজন উৎসুক হয়ে প্রশ্ন করল, “তুই আসলে মেয়েটার সাথে ঠিক কী করতে চাইছিস রিহান?”

​রিহান বোতলটার ছিপি খুলতে খুলতে নির্লিপ্ত গলায় বলল, “কেন জানিনা ওকে ভালো লাগছে আমার। হয়তো তেহুর প্রিয় খেলনা বলেই এতো বেশি টানছে আমাকে। ওকে বিয়ে করে আগে ফুলশয্যা সেরে নেই, তারপর ভাববো আর কী কী করা যায়।”

​সে আবারও সোফার দিকে এগোতে এগোতে ক্রাশারের দিকে ইশারা করল। “ক্রাশার, যা তো—দেখে আয় রিদ এখন কী করছে। ওকে আমার বিয়ের খবরটা দিয়ে আয়। শত হলেও ও আমার বড় ভাই, হোক না মাত্র দুই মিনিটের বড়। খাবারের বদলে ওর কাছ থেকে আশীর্বাদ নিয়ে আসিস।”

ক্রাশার মাথা নেড়ে হাঁটা ধরল।

চলবে,,,

শব্দসংখ্যা: ৩৮৫০+

Share On:

TAGS: ,



CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
Related Posts
 

0 Responses

Leave a Reply