Golpo romantic golpo অবাধ্য হৃৎস্পন্দন

অবাধ্য হৃৎস্পন্দন পর্ব ৪৯


অবাধ্য_হৃৎস্পন্দন (৪৯)

সোফিয়া_সাফা

পানিশমেন্ট রুমের থমথমে আবহাওয়ায় পিনপতন নিস্তব্ধতা। একের পর এক নাদিয়ার বিরুদ্ধে অকাট্য সব প্রমাণ উদ্যানের সামনে পেশ করছে লুহান। প্রমাণের ভারে নাদিয়ার অপরাধ যেমন স্পষ্ট হলো, তেমনি নির্দোষ সাব্যস্ত হলো রুমা। বাঁধনমুক্ত হয়েই রুমা ফুপিয়ে ওঠে। মেঝেতে হাঁটু গেড়ে বসে থাকা নাদিয়ার উদ্দেশ্যে শ্রান্ত কণ্ঠে শুধায়, “কেন করলি এমন নাদু? ভালো ছিলাম তো আমরা। ছিলাম না বল? তাহলে?”

নাদিয়া নিশ্চল, একবার চোখ তুলেও তাকাল না। নত মস্তকে শীতল কণ্ঠে বলল, “আমি শুরু থেকেই রিহান স্যারের লোক ছিলাম। সবসময় নিজেকে নিয়ে ব্যস্ত না থাকলে তুই খুব সহজেই ধরে ফেলতে পারতি আমায়।”

লুহান তাড়া দিয়ে বলল, “রুমা, আমাকে দেওয়া কথাটা মনে আছে নিশ্চয়ই?”

রুমা চোখ মুছে সায় জানাল। লুহান বলল, “চলো তাহলে?”

“যাওয়ার আগে একবার সবার সাথে দেখা করতে চাই। বিশেষ করে মিস্ট্রেসার সাথে।”

ফুলের নাম উঠতেই উদ্যানের চোখেমুখে তিক্ততা ফুটে উঠল। ভেতরে ভেতরে সে চরম ক্ষিপ্ত। এর আগে কোনো ব্যাপারে সে এতোটা কনফিউজড হয়নি যতটা এই ফুলকে নিয়ে হচ্ছে। উদ্যান গম্ভীর গলায় প্রশ্ন করল, “আমি যাকে লুকিয়ে রেখেছি তার ব্যাপারে তুই আর কী কী জানিস নাদিয়া?”

নাদিয়া শিউরে উঠল, “ক…কিছুই জানিনা মাস্টার। রিহান স্যার আমাকে বলেছিলেন সেই লোকটার ব্যাপারে খোঁজ নিতে কিন্তু আমি কোনো তথ্যই সংগ্রহ করতে পারিনি।”

চোখ বুজে গভীর শ্বাস নিল উদ্যান। হাতে থাকা রিভলবারটি নাদিয়ার মুখ বরাবর তাক করে শীতল কণ্ঠে বলল, “তেহজিব বিশ্বাসঘাতকদের ঘৃণা করে। আর তেহজিব যাকে ঘৃণা করে তার মৃ’ত্যু সে নিজের হাতে নিশ্চিত করে।”

নাদিয়া মুখ তুলে কিছু বলতে যাবে তার আগেই উদ্যান সব কয়টা গুলি একনাগাড়ে ছুড়ে নাদিয়ার মুখ ঝাঁঝরা করে দিল। গুলির বিকট শব্দে রুমা চমকে পেছনে তাকাল। নাদিয়ার নিথর দেহটি র’ক্তে ভেসে যেতে দেখে সে আর নিজেকে সামলাতে পারল না। লুহান প্রচণ্ড বিরক্ত হয়ে তাকে একহাতে সামলে নিয়ে পানিশমেন্ট রুম থেকে বেরিয়ে গেল।

ফুল উদ্যানের রুমেই ঘুমিয়ে গিয়েছিল। অনিলার ডাকে তার তন্দ্রা ভাঙল। আধোবোজা চোখে সে প্রশ্ন করল, “কী হয়েছে অনিলা আপু? ডাকছো কেন?”

অনিলা ফুলের চুলে হাত বুলিয়ে দিয়ে বলল, “রুমা চলে যাচ্ছে, যাওয়ার আগে তোমার সাথে দেখা করে যেতে চাইছে।”

কথাটা শুনেই ধড়ফড় করে উঠে বসল ফুল। অগোছালো চুলগুলো দ্রুত হাতখোঁপা করতে করতে জিজ্ঞেস করল, “লুহান স্যার কি তাকে নির্দোষ প্রমাণ করতে পেরেছেন?”

অনিলা মাথা নেড়ে সম্মতি জানাল। ফুল খাট থেকে নামতে নামতে জিজ্ঞেস করল, “উর্বী আপু কোথায়?”
“ও ঘুমাচ্ছে, তাই আর ডাকিনি।”

ড্রইংরুমে এসে ফুল দেখল রুমা ব্যাগপত্র নিয়ে প্রস্তুত। ফুলকে দেখে রুমা ম্লান হেসে বলল, “মাঝরাতে ডাকার জন্য দুঃখিত মিস্ট্রেসা। আসলে আমি চলে যাচ্ছি, তাই ভাবলাম শেষবারের মতো দেখা করে যাই।”
“কিন্তু তুমি কোথায় যাচ্ছো রুমা আপু?”
“একেবারে চলে যাচ্ছি মিস্ট্রেসা। দূরে কোথাও।”
“কোথায় যাবে তুমি? সেদিন না বললে মাস্টারের আশ্রয় ছেড়ে মুক্ত বাতাসে শ্বাস নিতে পারবে না, আমি তো ধরেই নিয়েছিলাম তোমার কোথাও যাওয়ার ইচ্ছা নেই।”

রুমা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, “ইচ্ছা না থাকলেও যেতে হয় মিস্ট্রেসা। আমাকেও হচ্ছে, এখন যদি মুক্ত বাতাসে দম বন্ধ হয়ে যায় তবুও কিছু করার নেই।”

ফুল আচমকাই রুমাকে জড়িয়ে ধরল। উপস্থিত সবাই মুহূর্তের জন্য থমকে গেল। কারণ সবার চোখেই রুমা একজন মেইড আর ফুল মাস্টারের ওয়াইফ হয়ে মেইডকে আলিঙ্গন করছে। দৃশ্যটা অকল্পনীয় বটে! ফুলের দৃষ্টিকোণ থেকে কিন্তু বিষয়টা গুরুতর নয়। এস্টেটে আসার পর রুমা আর নাদিয়ার সাথেই সর্বপ্রথম সখ্যতা গড়ে উঠেছিল তার, একসাথে খেয়েছে, একই রুমে থেকেছে।
কিছুক্ষণ পর নিজেকে সামলে নিয়ে ফুল তাকে ছেড়ে দিল। ধরা গলায় বলল, “খুব মিস করবো তোমায় রুমা আপু। মুক্ত বাতাসের সাথে অভ্যস্ত হয়ে যেও প্লিজ। আচ্ছা নাদিয়া আপু কোথায়? তাকে কেন দেখছি না?”

রুমার মুখটা ফ্যাকাশে হয়ে গেল। লুহান কথা কেড়ে নিয়ে বলল, “নাদিয়াকেও এস্টেটের বাইরে পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছে।”

ফুল অবাক হয়ে বলল, “কেন? সেও কি আর আসবে না?”

লুহান কাঁধ ঝাকাল, “না ওদের দুজনকেই কাজ থেকে ছাঁটাই করা হয়েছে।”

ফুল বিড়বিড়িয়ে বলল, “নাদিয়া আপু একবার বলেও গেল না?”

বিদায়ের আনুষ্ঠানিকতা শেষে লুহান রুমাকে নিয়ে গাড়িতে গিয়ে বসল। পুরোটা পথ তাদের মাঝে কোনো কথা হলো না; শহরে পৌঁছে লুহান রুমাকে নিয়ে একটি অভিজাত ফ্ল্যাটে উঠল। পঞ্চম তলার একটি দরজার সামনে দাঁড়িয়ে পকেট থেকে চাবি বের করে রুমার দিকে বাড়িয়ে দিল সে।
“এই ফ্লোরটা আমি তোমার নামে কিনে নিয়েছি। সেই সাথে তুমি চাইলে ইচ্ছামতো অ্যামাউন্টের টাকাও দাবি করতে পারো।”

রুমা চাবিটা হাতে নিয়ে কিছুটা ইতস্তত করে বলল, “থাকার জায়গাটুকু দিয়েছেন এটাই অনেক লুহান স্যার। দয়া করে টাকা অফার করবেন না।”
“তুমি সিওর?”

রুমা মাথা নেড়ে ধীরস্থির কণ্ঠে বলল, “আমি জানিনা কীভাবে আপনার শুকরিয়া আদায় করবো। আপনি না থাকলে হয়তো নিরপরাধ হয়েও অপরাধীর অপবাদ নিয়ে ম’রতে হতো।”

লুহান মৃদু হেসে বলল, “তোমাকে সাহায্য করতেই হতো রুমা। আমি জানতাম রিহানের সাথে তোমার কোনো সম্পর্ক নেই। এমনকি ও তোমাকে চেনে কি না, তাতেও আমার সন্দেহ আছে। যদিও তেহুও এটা জানতো, তবুও মাঝেমধ্যে ও কোনো কিছু ভাবার মতো অবস্থাতেই থাকেনা। তখন ওর যা মনে চায় তাই করে ফেলে।”

রুমা দরজায় হেলান দিয়ে দাঁড়াল। লুহান কপালে দু আঙুল ঘষে ক্লান্ত স্বরে বলল, “ঠিক আছে, আসি তাহলে?”
“অবশ্যই। আমি আপনার ওপর থেকে সব অভিযোগ তুলে নিলাম লুহান স্যার। ভালো থাকবেন আপনি, খুব ভালো থাকবেন আশা করি।”

আজ বহু বছর পর লুহান এক অদ্ভুত স্বস্তি অনুভব করল। মনে হচ্ছে তার পিঠের ওপর তুলে রাখা সমস্ত দোষের ভার অবশেষে নামিয়ে রাখতে সক্ষম হয়েছে সে। ফুরফুরে মেজাজে সে নিচে নেমে এসে গাড়িতে চড়ে বসলো। স্টিয়ারিং-এ হাত রেখে ভাবল আজ সে আর এস্টেটে ফিরবে না বরং ক্লাবে গিয়ে কয়েক পেগ ড্রিংক করে আসবে।

২ সপ্তাহ পর…

খানাজাদা নিবাসে ফিরে এসে রেহানা বেগম যখন মাহবুবা সুলতানার মুখে শুনলেন ফুল তার সাথে দেখা করতে চেয়েছিল তখন তিনি হাপিত্যেশ করলেন। ফুলকে উদ্যান এবাড়িতে নিয়ে আসবে জানলে তিনি কখনোই সেই সময় বাড়ির বাইরে থাকতেন না। মেয়েটাকে যে তারও খুব দেখতে ইচ্ছে করে।

প্রতিদিনের অভ্যাসমতো মাহবুবা সুলতানা, রেহানা বেগম, মেহেক আর আবেশ ডিনার টেবিলে বসল। চারপাশ নিস্তব্ধ, শুধু চামচের ঠুনঠান শব্দ হচ্ছে।

“তুই কি আজও বাইরে যাবি আবেশ?” মায়ের প্রশ্নে আবেশ নিঃশব্দে মাথা নাড়াল।

মাহবুবা সুলতানা বাড়তি কোনো প্রশ্ন করলেন না। খাওয়া দাওয়া শেষে মেহেক নিজের রুমে যাওয়ার সময় দরজা খোলা পেয়ে আবেশের রুমে উঁকি দিল। তখনই তার চোখে পড়ল, সে আবেশের জন্মদিনে যেই গিফট টা দিয়েছিল সেই গিফট টা এখনো সেভাবেই পড়ে আছে। আবেশ ছুঁয়েও দেখেনি। প্রতিদিনই সে ভাবে আজ হয়তো আবেশ গিফট টা খুলে দেখবে কিন্তু প্রতিবারই সে নিরাশ হয়।

তার ভাবনার মধ্যেই আবেশ ওয়াশরুম থেকে বেরিয়ে এল। তোয়ালে দিয়ে মুখ মুছতে মুছতে এগোলো খাটের দিকে। মেহেক আজ ভীষণ আশাহত হয়ে বিষন্ন কণ্ঠে জানতে চাইল, “আবেশ ভাই, তুমি এখনো কেন গিফট টা খুলে দেখলে না?”

আবেশ একরাশ অনীহা নিয়ে মেহেকের দিকে তাকাল। বরফশীতল কণ্ঠে বলল, “তোকে আমার সামনে আসতে বারণ করেছি না, মেহেক।”

মেহেক বেশ অপমানিত বোধ করল। জেদ চেপে বসল তার মনে। সে সরে না গিয়ে সরাসরি আবেশের মুখোমুখি দাঁড়াল। “কেন বারণ করেছ? আমি কী করেছি? বলেছি না আমি বাধ্য করিনি তোমার ফুলকে কথা দিতে।”

আবেশের চোখদুটো রাগে জ্বলে উঠল। দাঁতে দাঁত চেপে সে বলল, “আমার ফুল? তুই কি আমার কাঁটা ঘায়ে নুন ছিটাতে এসেছিস? নাকি আমার অসহায়ত্ব নিয়ে তামাশা করতে এসেছিস। দেখ এমনিতেই অনেক বাড়াবাড়ি করে ফেলেছিস। এবার অন্তত থেমে যা!”

মেহেকের চোখের কোণ ভিজে উঠল। রুদ্ধ কণ্ঠে সে বলল, “কী বাড়াবাড়ি করেছি আমি? গিফট টা খুলে দেখলে যদি তোমার ইগো হার্ট হয় তাহলে রেখে যেতে বলেছিলে কেন?”

আবেশ গলা চড়িয়ে বলল, “রেখে যেতে না বললে তুই আমার পিছু পিছু ঘুরে বিরক্ত করতিস সেই জন্যই বলেছিলাম। এখন যা তোর গিফট নিয়ে বের হ।”

মেহেকের চোখের কার্ণিশ বেয়ে কয়েক ফোঁটা জল ভূপাতিত হলো। আবেশ গিফট টা এনে এক প্রকার জোর করেই তার হাতে ধরিয়ে দিয়ে বলল, “যা এখন।”

মেহেক গিফট মুচড়ে ধরল। চাপা গলায় বলল, “ফুলের ওপর জমে থাকা রাগ তুমি আমার ওপরে ঝাড়ছো কেন? ফুলের দেওয়া গিফট টা তো ঠিকই নিয়েছিলে আমার টা নিতে কী সমস্যা তোমার?”

আবেশ নিজের ওপর নিয়ন্ত্রণ হারাল। চিৎকার করে বলে উঠল, “আমি কারো ওপর জমানো রাগ তোর ওপর ঝাড়ছি না মেহেক, তুই-ই আমাকে বাধ্য করছিস! কেন তুই ‘ফুল’ সেজে প্রতি রাতে আমার কাছে আসতিস? কেন?”

​আচমকা এমন প্রশ্নের তোপে পড়ে মেহেক হতবিহ্বল হয়ে গেল। আবেশের চোখ দুটো টকটকে লাল, সেখানে খেলা করছে তীব্র যন্ত্রণা আর আক্রোশ। সে আবার গর্জে উঠল, “আমি সব বুঝে গেছি মেহেক। ফুলের অবর্তমানে তুই ওর জায়গা নিতে চেয়েছিস। তুই ওর মতো করে আমাকে ‘আবেশ ভাই’ বলে ডেকে জ্বালাতন করিস, সবসময় ওর মতো হওয়ার চেষ্টা করিস। তোর চুলগুলোও প্রায় ওর মতোই, তোর কথা বলার ধরন, চালচলনে আমি কেন ফুলের প্রতিচ্ছবি দেখি? কেন আমার অবচেতন মস্তিষ্ক বারবার ফুলের সাথে তোকে গুলিয়ে ফেলে? কেন!”

আবেশ মাথা চেপে ধরে পিছিয়ে গেল কয়েকপা। মেহেক স্তম্ভিত হয়ে গেল তার কথা শুনে। আসলেই কি সে মনের অজান্তেই ফুলকে অনুকরণ করার চেষ্টা করে? তার নিজের অস্তিত্ব কি তবে বিলীন হয়ে গেছে?

“আ…বেশ ভাই…” মেহেকের কণ্ঠস্বর বুজে এল।

আবেশ হাত উঁচিয়ে তাকে থামিয়ে দিল। দ্রুত শ্বাস নিতে নিতে বলল, “ডাকবি না আমায় ওভাবে! তুই যতবার ওভাবে ডাকিস, আমি ততবারই ভুল করে তোকে ‘ফুল’ ভেবে বসি। এই ভুলটা আমি আর করতে চাই না।”

মেহেক জড়োসড়ো হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। আবেশ হঠাৎ উন্মত্তের মতো মেহেকের কবজি চেপে ধরল, একপ্রকার টেনেহিঁচড়েই তাকে ড্রয়িংরুমে নিয়ে এল। সদর দরজার দিকে ইশারা করে রূঢ় স্বরে বলল, “তুই চলে যা এখান থেকে। তোকে আমি জাস্ট সহ্য করতে পারছি না।”

আবেশের চিৎকার শুনে মাহবুবা সুলতানা আর রেহানা বেগম ততক্ষণে ড্রয়িংরুমে চলে এসেছেন। মাহবুবা সুলতানা আঁতকে উঠে বললেন, “আবেশ! তুই ওর সাথে এভাবে কথা বলছিস কেন? কী করেছে ও?”

আবেশ উন্মাদের মতো মায়ের দিকে তাকাল, “ওকে তোমরা ফুল সাজিয়ে আমার রুমে কেন পাঠাতে মম?”

মাহবুবা সুলতানা ছেলেকে শান্ত করার চেষ্টায় মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে এলেন কিন্তু আবেশ তার হাত ঝাড়া মেরে সরিয়ে দিল। মাহবুবা সুলতানা বললেন, “আমরা ওকে ফুল সাজিয়ে পাঠিয়েছি ব্যাপারটা এমন নয়, তুই-ই ওকে ফুল ভেবে নিয়েছিলি আবেশ। আমরা শুধুমাত্র তোকে সুস্থ করার চেষ্টায় ওর সাহায্য নিয়েছিলাম।”

“তোমরা ভুল করেছো। ওকে আমার কাছে পাঠানো ঠিক হয়নি। এখন আমি ওকে সহ্যই করতে পারছি না। আমি ফুলের অপেক্ষায় থাকতে চাই, ও ফিরবে না জেনেও অপেক্ষায় থাকবো আমি সারাজীবন। কিন্তু ওকে যতবার দেখি ঠিক ততবারই মনে হয় আমি ফুলকে হারিয়ে ফেলেছি, আর কখনো ফিরে পাবো না। যেটা আমি মনে করতে চাইনা। তাই ওকে বলে দাও আমার আশেপাশেও না যেতে। পারলে বাড়ি থেকেই চলে যেতে বলো।”

মাহবুবা সুলতানা ছেলের আচরণে ভারী কষ্ট পেলেন। “ও আমার বোনের মেয়ে আবেশ। এমন ব্যবহার করতে পারিস না। ওর মা ওকে হোস্টেলে রাখতেই চেয়েছিল, আমিই বলেছি আমার কাছে থাকতে।”

“ঠিক আছে, তাহলে প্রথম অপশন টাই বেছে নিয়ে আমার সামনে আসতে নিষেধ করো।” এইটুকু বলেই আবেশ ধুপধাপ পা ফেলে বাড়ি থেকে বেরিয়ে গেল।

মেহেক নিঃশব্দে কাঁদছিল। মাহবুবা সুলতানা তাকে জড়িয়ে ধরে সান্ত্বনা দেওয়ার চেষ্টা করলেন, “তুই মন খারাপ করিস না। জানিসই তো ওর ওপর দিয়ে কী ঝড় বয়ে যাচ্ছে। আমি ওর হয়ে ক্ষমা চাচ্ছি।”

মেহেক চোখের জল মুছে নিজেকে ছাড়িয়ে নিল। অভিমানী স্বরে বলল, “আমি চলে যাবো খালামণি। আমি চাইনা আমার জন্য তোমার ছেলের সমস্যা হোক।”
“এভাবে বলিস না, আবেশ রাগের মাথায় বলেছে। রাগ কমলেই সব ঠিক হয়ে যাবে।”
“কিচ্ছু ঠিক হবে না খালামণি, শুনলে না তোমার ছেলে কী বলে গেল। সে নাকি সারাজীবন ফুলের অপেক্ষায় থাকবে। তোমার ছেলে ফুলকে কোনোদিনও ভুলতে পারবে না।”

ওপরের দিকে তাকিয়ে কান্না থামানোর চেষ্টা করল মেহেক। তারপর একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে হনহনিয়ে নিজের রুমে চলে গেলো। আলমারি খুলে গিফট বক্সটা একপ্রকার ছুড়ে ফেলল ভেতরে, সেখানে আগে থেকেই আরও একটা গোলাপি রঙা র‍্যাপিং পেপারে মোড়ানো গিফট বক্স ছিল। লাল গিফট বক্সটা সেটার সাথে গিয়ে ধাক্কা খেল; ফলস্বরূপ দুটোই ছিটকে এসে মেঝেতে আছড়ে পড়ল। মেহেক কাঁদতে কাঁদতেই ফ্লোরে বসে পড়ল সেগুলো তোলার উদ্দেশ্যে। তার লম্বা চুলগুলোও অবিন্যস্ত হয়ে লুটিয়ে পড়ল মেঝেতে। মেহেক গিফট বক্স দুটো হাতে নিয়ে বেশ অনেকক্ষণ বসে রইল নির্লিপ্ত ভঙ্গিতে।

ঘড়ির কাঁটায় তখন বারোটা ছুঁইছুঁই। হঠাৎ করেই আকাশ ঘন কালো মেঘের চাদরে ঢাকা পড়েছে। ক্ষণে ক্ষণে মেঘের গুরুগম্ভীর গর্জন আর বিদ্যুতের চমক জানান দিচ্ছে প্রকৃতিতে এক প্রলয়ংকরী বর্ষণ আসন্ন। মেহেক ধীর পায়ে আলমারিতে গিফট দুটো রেখে ক্লান্ত শরীরটা টেনে নিয়ে গেল ওয়াশরুমে। বেসিনের কল ছেড়ে দিয়ে মুখে পানির ঝাপটা দিতে লাগল সে। তোয়ালে দিয়ে মুখ মুছে আয়নার দিকে তাকাতেই তার দৃষ্টি স্থির হয়ে গেল। দীর্ঘক্ষণ কান্না করার কারণে চোখমুখ ফুলে গেছে তার; বিশেষ করে চোখদুটো।

মেহেক আনমনেই গালে হাত রেখে বিড়বিড় করল। “কোন দিক থেকে আমাকে ফুলের মতো দেখায়? ফুলের কি আমার মতো জোড়া ভ্রু আছে? নেই তো, আমারও তো ওর মতো নিচের ঠোঁটে তিল নেই। ওর মতো টানা টানা চোখও নেই আমার। আমার গায়ের রঙ ফর্সা হতে পারে কিন্তু কই কাঁদলে তো আমার গাল আর নাক লাল হয়ে যায়না। উল্টো রঙ হারিয়ে বিবর্ণ হয়ে যায়। তবে আমাকে কেন সে ফুল ভেবে ভুল করবে?”

মেহেকের দৃষ্টি পড়ল চুলের ওপর। সামনে আসা একগোছা চুল হাতে নিয়ে বলল, “এই চুলগুলো কত যত্ন করে বড় করেছি তা কেবল আমিই জানি। ওর মতো অযত্নেই বড় হয়ে যায়নি। হ্যাঁ, ওর চুল দেখেই আমার চুল বড় করার সাধ জেগেছিল। এটাকেই কি অনুকরণ করা বলে? হ্যাঁ আমি লক্ষ্য করেছিলাম ফুল যখন তাকে ‘আবেশ ভাই’ বলে ডাকতো তখন তার মুখ উজ্জ্বল হয়ে উঠতো, তাই আমিও হয়তো অজান্তেই ফুলের মতো করে তাকে ডাকার চেষ্টা করেছি। এটাকেও কি অনুকরণ করা বলে?”

মেহেক কিছুক্ষণ স্তব্ধ হয়ে থেকে পরক্ষণেই শক্ত গলায় বলল, “আমি আর ফুলের মতো করে ডাকবো না তাকে। আর এই চুলগুলো…”

মেহেক যেন এক ভয়ানক ঘোরের মধ্যে তলিয়ে গেল। ওয়াশরুম থেকে বেরিয়ে উদ্ভ্রান্তের মতো কিছু একটা খুঁজতে লাগল সে। কাঙ্ক্ষিত বস্তুটি হাতে পেতেই আবার ফিরে এল ওয়াশরুমের আয়নার সামনে। হাঁটু সমান লম্বা চুলগুলোকে দুভাগে ভাগ করে নিল। একপাশের চুলের মুঠি শক্ত করে ধরে অন্য হাতের কেঁচি দিয়ে ‘খচ’ করে কেটে ফেলল সে। একই ভঙ্গিতে আরেকপাশের চুলগুলোও কাটল। হাঁটু সমান লম্বা চুলগুলো কাঁধ সমান হয়ে গেছে, এই দৃশ্য আয়নায় ফুটে উঠতেই চোখ বন্ধ করে নিল মেহেক; কেটে গেল তার ঘোর। বন্ধ চোখের পাতা বেয়ে নোনা জল গড়িয়ে পড়তে লাগল বিরামহীন।

কেঁটে ফেলা চুলগুলো আঁকড়ে ধরে মেঝেতে বসে হাউমাউ করে কেঁদে উঠল সে। এটা সে কী করে ফেলল? কিসের আশায় করল? শুধুমাত্র আবেশকে শান্তি দিতে সে নিজের এতো সাধনার চুল কেঁটে ফেলল?
“আমাকে ভূতে ধরেছে? কেন করলাম এমন? খুব কষ্ট হচ্ছে।”

তখনই মাহবুবা সুলতানা ধরফরিয়ে মেহেকের রুমে প্রবেশ করলেন। “মেহেক, কোথায় তুই?”

মেহেক চুলগুলো বেসিনের ওপর রেখে চোখ মুছে নিলো। মাথায় ওড়না জড়িয়ে বেরিয়ে এলো ওয়াশরুম থেকে। “ক…কী হয়েছে খালামণি?”

মাহবুবা সুলতানা উদ্বিগ্ন কণ্ঠে বললেন, “বাইরে বৃষ্টি হচ্ছে। আবেশ এখনো বাড়িতে ফেরেনি। প্রতিরাতেই অবশ্য বাইরে যাওয়ার অভ্যাস হয়েছে ওর কিন্তু বারোটার আগেই তো ফিরে আসে। আজ তবে কী হলো?”

মেহেক মুখ নিচু করে বলল, “চিন্তা কোরো না হয়তো বৃষ্টির কারণেই আসতে পারছে না।”
“চিন্তা করতাম না কিন্তু আজ ও গিটার টাও সাথে নিয়ে যায়নি। আমি এই কদিনে দেখিনি ওটা রেখে ওকে কোথাও যেতে।”

মেহেককে নিশ্চুপ থাকতে দেখে মাহবুবা সুলতানা বেরিয়ে যেতে যেতে বললেন, “আমি ওকে খুঁজতে বেরোচ্ছি। রেহানা ঘুমিয়ে পড়েছে, তাই বিরক্ত করিনি। আবেশ যদি ফিরে আসে আমাকে কল করিস ঠিক আছে?”

মেহেক নিজেকে ভাবলেশহীন দেখাতে চেয়েও পারলো না। “তুমি একা একা এই রাতের বেলায় কোথায় গিয়ে খুঁজতে তাকে? তার ওপর বৃষ্টি পড়ছে সেই খেয়াল আছে?”
“আছে বলেই তো দু চোখের পাতা এক করতেও পারছি না। ঝোঁকের বশে যদি কোনো অনর্থ করে বশে? মায়ের মন তো মানাতে পারছি না কিছুতেই।”

মেহেক না চাইতেও মাহবুবা সুলতানার পিছু পিছু হাঁটা ধরল। “আমিও যাচ্ছি তোমার সাথে।”

ছাতা মুড়ো দিয়ে দুজনেই বেরিয়ে পড়ল বাড়ি থেকে। বৃষ্টির তোড়ে কয়েক হাত দূরের দৃশ্যও ঝাপসা হয়ে আছে। গেটের বাইরে পা রাখতেই মাহবুবা সুলতানা পিছলে পড়ে যেতে নিলেন। মেহেক ছাতা ছেড়ে দিয়ে তাকে দুহাতে সামলে নিল। “সাবধানে খালামণি।”

মেহেকের মাথার কাপড় সরে যেতেই মাহবুবা সুলতানার শরীর জমে গেল বিস্ময়ে। অস্ফুটস্বরে তিনি আওড়ালেন, “মেহেক তোর… চুল?”

মেহেক কথাটা শুনল না বরং তার দৃষ্টি আটকে গেল কয়েক মিটার দূরে বসে থাকা আবেশের ওপর। ছেলেটা রাস্তার পাশে থাকা একটা গাছের সাথে হেলান দিয়ে বসে আছে। “খালামণি ওই দেখো, তোমার ছেলে।”

মাহবুবা সুলতানা ফিরে তাকালেন সেদিকে। মেহেক তাকে দারোয়ানের বসার জায়গায় বসিয়ে রেখে বলল, “তুমি এখানেই বসো, আমি নিয়ে আসছি তাকে।”

মেহেক ছাতা মাথায় দিয়ে বৃষ্টির ঝাপটা উপেক্ষা করে আবেশের দিকে এগিয়ে গেল। আবছা অন্ধকারে আবেশ একপলক তার দিকে তাকিয়েই আবার চোখ সরিয়ে নিল। মেহেক ওর মাথার ওপর ছাতাটা ধরে সামনে ঝুঁকে দাঁড়াল। এক অচেনা, নিস্পৃহ কণ্ঠে বলল, “এখানে বসে আছেন কেন? বাড়িতে চলুন, খালামণি চিন্তায় চিন্তায় অস্থির হয়ে পড়েছেন। আর কতো দুশ্চিন্তা দেবেন তাকে?”

​আবেশ কোনো উত্তর দিল না; বরং হাঁটুতে মুখ গুঁজে আরও কুঁকড়ে বসল। মেহেক এবার কণ্ঠস্বরে কিছুটা ঝাঁঝ মিশিয়ে বলল, “এই দেখুন, আমি আমার চুল কেটে ছোট করে ফেলেছি। এখন নিশ্চয়ই আপনি আর আমাকে দেখে বিব্রত হবেন না।”

আবেশ হঠাৎই চোখ তুলে তাকাল। মেহেক ম্লান হেসে বলল, “দেখুন এরপরও সমস্যা হলে আমি না-হয় হোস্টেলেই চলে যাবো। আসলে হোস্টেলে থাকার অভ্যাস নেইতো তাই একটু গড়িমসি করছি। তাই বলে আপনাকে বাড়ির বাইরে রেখে আমি বাড়ির ভেতরে থাকবো অতোটাও স্বার্থপর নই। অত্যন্ত আমার চুল কেটে ফেলাটা বিফলে যেতে দিয়েন না।”

আবেশ উঠে দাঁড়াল। মেহেকের দিকে একবার আঁড়চোখে তাকিয়ে বাড়ির ভেতর চলে গেল সে।

সাতদিন পর…

ফুলের বেডরুমে মাথা চেপে ধরে আধশোয়া হয়ে বসে আছে উর্বী। ফুল এসে তার পাশে বসল।
“কী হয়েছে আপু? আবারও কি মাথা ব্যাথা করছে?”

উর্বীর কপালে সূক্ষ্ম ভাঁজ। সে চোখ না মেলেই শান্ত স্বরে বলল, “আমি এখন পুরোপুরি সুস্থ আছি ফুল। আমাকে এখান থেকে বের হতে সাহায্য করো।”

ফুল অবাক হয়ে প্রশ্ন করল, “তুমি… তুমি সত্যিই সব মনে করতে পারছো?”
“হু, আমি ইন্সপেক্টর উর্বী রায়। এই বাড়িতে একবার সার্চ ওয়ারেন্ট পেয়ে এসেছিলাম। এই কয়েকদিন অবজার্ভ করে বুঝতে পারলাম আমাদের কাছে যেই তথ্য এসেছিল সেটা সত্যি হওয়ার চান্সেস আছে।”

ফুল কৌতূহলী হয়ে ভ্রু কুঁচকাল, “কোন ব্যাপারে বলছো?”

উর্বী এবার চোখ মেলল। চারপাশটা একবার দেখে নিয়ে চাপা গলায় বলল, “তুমি এবাড়িতে যাদেরকে দেখতে পাচ্ছো তারা সবাই ড্রাগ ট্রাফিকিং এর সাথে জড়িত।”
“ড্রাগ ট্রাফিকিং?”
“হ্যাঁ, যেটুকু বুঝলাম তুমি এদের সম্পর্কে অতিরিক্ত কিছুই জানো না।”

ফুল হেসেই ব্যাপারটা উড়িয়ে দিল। “উর্বী আপু, তুমি এগুলো কী বলছো? ওনারা বিজন্যাস পারপাসে একসাথে থাকেন। তেহজিব খানজাদা হলেন মেক্সিকোর সর্ববৃহৎ মাল্টিন্যাশনাল কনগ্লোমারেট টি’কে গ্রুপের সিইও। যার ব্যবসা রিয়েল-এস্টেট, এনার্জি, লজিস্টিক্স এবং হসপিটালিটি সেক্টরে বিস্তৃত। লুহান স্যার হেড অফ সিকিউরিটি, মেলো ম্যাম এক্সিকিউটিভ অ্যাসিস্ট্যান্ট। অনি স্যার ফাইন্যান্স ডিরেক্টর, রিদম স্যার লজিস্টিক্স আর সোহম স্যার অপারেশন্স দেখেন।”

ফুলের বলার ধরন শুনে উর্বী হতচকিত নয়নে তাকাল। “তোমার কথা শুনে মনে হচ্ছে তোমারও ওদের নিয়ে কোনো এককালে সন্দেহ ছিল। সেই সন্দেহ মেটাতে একদম নাড়ি নক্ষত্র খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে পর্যবেক্ষণ করেছো।”

ফুল ছোট্ট করে শ্বাস ফেলল, “হ্যাঁ, ওনাদের একসাথে দেখে সন্দেহ হয়েছিল আমারও। তবে এবার বাড়িতে ফিরে ফোন হাতে পাওয়ার পর ওনাদের নিয়ে ইন্টারনেটে রিসার্চ করে সবকিছু জানতে পেরেছি।”

​উর্বী একটু ভেবে প্রশ্ন করল, “আমি যখন এখানে এসেছিলাম সার্চ অপারেশনে তখন শুধু অনি আর অনিলাই ছিল কেন তোমরা কোথায় ছিলে?”

“তুমি রিদমের কথা স্কিপ করলে কেন? আমাদের সাথে তো রিদমও ছিল।” হঠাৎ অনিলার কণ্ঠ শুনে ফুল ও উর্বী দরজার দিকে তাকাল। অনিলা কখন যে দরজায় এসে দাঁড়িয়েছে, তারা টেরই পায়নি।

ফুল বুঝে উঠতে পারল না উর্বী কবেকার কথা বলছে। “কবে এসেছিলে তুমি উর্বী আপু?”

উর্বী রিদমের প্রসঙ্গ এড়িয়ে গিয়ে ফুলের প্রশ্নের উত্তর দিল, “যেদিন তোমাকে জঙ্গল থেকে উদ্ধার করেছিলাম সেদিন আমি এই বাড়ি সার্চ করেই শহরে ফিরছিলাম। আর অনিলা তুমিই বলো বাকিরা তখন কোথায় ঘাপটি মেরে ছিল?”

অনিলা আলস ভঙ্গিতে ভেতরে ঢুকে বলল, “সবাই তোমার আসার খবর পেয়েই চলে গিয়েছিল উর্বী।”

উর্বী পালটা প্রশ্ন ছুড়ে দিল, “যদি তোমরা অনৈতিক কোনো কাজের সাথে যুক্ত না-ই থাকো, তাহলে আমার আগমনে প্রভাবিত হয়েছিলে কেন?”

অনিলা হেসে উর্বীর পাশে বসল। “হায়রে ইন্সপেক্টর ম্যাম, আজ পুরো জেরা করার মুডে আছেন দেখছি। তখন একসাথে এতোজনকে দেখে অযথা সন্দেহের তালিকায় যুক্ত হতে চাইনি। আমরা খুব শান্তিপ্রিয় বুঝলে। আর আমাদের মাস্টার মানে; তেহ খুবই স্ট্রিক্ট কাউকে কোনো সাধারণ প্রশ্নের উত্তর দিতেও তার ইগোতে লাগে। তোমাদের সাথে ওর তর্কাতর্কি হবার ভয়েই সবাই মিলে ওকে চলে যেতে বাধ্য করেছিল।”

উর্বীর মনে জমে ওঠা সন্দেহের পারদ একটু হালকা হলো বোধহয়। তবুও সে শুষ্ক গলায় বলল, “সে যা-ই হোক, আমাকে ফিরে যেতে হবে।”

“তুমি সত্যিই চলে যেতে চাও?” ফুলের প্রশ্নে উর্বী তার হাতের ওপর হাত রাখল।
“হ্যাঁ ফুল, যেতে তো হবেই আমাকে তাইনা? আমার সাথে যা যা হয়েছে সেই সবকিছুর প্রতিশোধ আমি নেবোই নেবো। তোমাদেরকে অনেক অনেক ধন্যবাদ আমাকে স্বাভাবিক হতে সাহায্য করার জন্য। ঘটনাটা আমাকে ভেতর থেকে গুড়িয়ে দিয়েছিল। বিশেষ করে ফুলকে আমি নিজের পাশে না পেলে হয়তো সুস্থ হতেই পারতাম না। ও প্রতি মুহূর্তে আমাকে সাহস জুগিয়েছে।”

“আচ্ছা, সেসব পরে দেখা যাবে। চলো আজ আমরা একসাথে মুভি দেখব।” অনিলার কথায় ফুল একটু আগ্রহ দেখাল।
“সবাই থাকবে থিয়েটারে?”

অনিলা মাথা নেড়ে হ্যাঁ বলল। উর্বীকে নিয়ে থিয়েটারের এক পাশে এসে বসলো ফুল আর অনিলা। ফুল একবার পুরো থিয়েটারে চোখ বুলিয়ে দেখল কিন্তু কাঙ্ক্ষিত মানুষটিকে খুঁজে পেল না। সেদিনের পর দানবটাকে সে খাবার টেবিলে ছাড়া চোখের দেখাও দেখতে পায় না। সব জায়গাতেই মিসিং থাকে দানবটা।

রিদম একটা মুভি অন করে দিয়ে ঘাড় বাকিয়ে অন্য সারিতে বসে থাকা উর্বীর দিকে তাকাল। উর্বী তার উপস্থিতি সম্পূর্ণভাবে উপেক্ষা করে মুভি দেখতে লাগল। মুভিটা ছিল তুই যমজ ভাইকে নিয়ে যারা একে অপরের থেকে বিপরীত। একজন ভালো আর একজন খারাপ। মুভিটা খুব একটা এনজয় করল না ফুল। তার ভীষণ ঘুম পাচ্ছে, বারবার দুচোখ বুজে আসছে।

“তোমার কি খুব ঘুম পাচ্ছে? রুমে যেতে চাও?” উর্বী জানতে চাইল। ফুল মাথা নেড়ে একটা দীর্ঘ হাই তুলল, “হ্যাঁ উর্বী আপু, তুমি দেখতে চাইলে থাকো। আমি চলে যাই?”

ফুল টলতে টলতে উঠে দাঁড়াল। পরপরই উঠে গেল অনিলা আর উর্বীও। রিদম বেশ বিরক্ত হলো, সোহমের দিকে তাকিয়ে বলল, “কিরে ও তো চলে যাচ্ছে। মুভির আইডিয়া মনে হয় কাজে দিল না।”

​অনি রিদমকে আলতো ধাক্কা দিয়ে বলল, “তুইও যা ওর পিছু পিছু। গিয়ে কথা বলার চেষ্টা কর।”

লুহান অনিকে পরামর্শ দিল, “তুই গিয়ে আগে অনিলাকে ওর থেকে আলাদা কর। তবেই না রিদম কথা বলার সুযোগ পাবে।”

​অনি তৎক্ষণাৎ উঠে দাঁড়াল, কিন্তু বিপত্তি বাধল ফুলকে নিয়ে। কীভাবে উর্বীর থেকে দূরে সরাবে তাকে? লুহান মেলোর দিকে তাকিয়ে সোহমের উদ্দেশ্যে বলল, “সোহম তুই গিয়ে ফুলের মনোযোগ অন্যদিকে ঘোরানোর চেষ্টা কর।”

সোহম বেশ উৎসাহ নিয়ে উঠে দাঁড়াল। “ওকে, আমি রাজি, কিন্তু তেহ জানতে পারলে আমার ভাগের পানিশমেন্ট তোরা ভাগাভাগি করে নিবি, ঠিক আছে?”

লুহান আর রিদম সায় জানিয়ে বলল, “ওকে ডান।”

চলবে,,,

শব্দসংখ্যা: ৩৩০০+

Share On:

TAGS: ,



CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
Related Posts
 

0 Responses

Leave a Reply