অবাধ্য_হৃৎস্পন্দন (৪৭)
সোফিয়া_সাফা
সকালবেলা ফ্রেশ হয়ে ওয়াশরুম থেকে বেরিয়েই ফুল থমকে গেল। দেখল, দরজার সামনে দাঁড়িয়ে আছে আবেশ।
“তু…মি?” ফুলের কণ্ঠস্বর কাঁপল।
আবেশ দরজার ফ্রেমে হাত আটকে স্থির হলো। তার চোখে উপচে পড়ছে এক বিচিত্র দহন, যা ফুলকে অস্বস্তিতে ফেলছে। আবেশ শান্ত গলায় বলল, “ভেতরে আসতে বলবি না? তুই বড় হয়ে গেছিস তো তাই অনুমতি নিচ্ছি।”
আবেশের মানসিক অবস্থা স্থিতিশীল নয় ভাবনাটা মাথায় আসতেই ফুল ভেতরে ভেতরে কুঁকড়ে গেল। মন সায় দিল না আবেশকে ভেতরে ঢোকার অনুমতি দিতে। দ্বিধায় থাকা ফুলের অস্বস্তি টের পেয়ে আবেশ নিজেই প্রশ্ন ছুড়ে দিল, “আমি কি চলে যাবো?”
ফুল চলে যেতে বলতে পারল না। জোর করে ঠোঁটে এক চিলতে হাসি ফুটিয়ে বলল, “এমা চলে যাবে কেন? ভেতরে এসো।”
আবেশ ভেতরে এসে দেখল উর্বী এখনো ঘুমে তলিয়ে আছে। ফুলের জড়তা কাটাতে সে নিজেই সহজ হওয়ার চেষ্টা করল, “ওনাকে কোথায় পেলি?”
আলোচনা সাধারণ দিকে মোড় নেওয়ায় ফুল হাঁফ ছেড়ে বাঁচল। বলতে শুরু করল, “অনেক লম্বা কাহিনী আবেশ ভাই। তোমাকে রিদম স্যারের কথা বলেছিলাম না? ওনার যমজ ভাই আছে, যার নাম রিহান। সেই রিহান খুব খারাপ লোক জানো তো। রিদম স্যার আর উর্বী আপু জাস্ট ফ্রেন্ড হিসেবে কয়েকদিন পরপর দেখা করতো, রিহান ভেবে নিয়েছিল উর্বী আপু ওনার গার্লফ্রেন্ড হয়। সেই জন্যই তুলে নিয়ে গিয়েছিল উর্বী আপুকে। ভাই ভাইয়ের শত্রু হলে যা করে আরকি।”
আবেশ ফুলের কথা আদৌ শুনল কী না কে জানে। সে কেবল ফুলকে কথা বলার সুযোগ দিয়ে পরিবেশটা স্বাভাবিক করতে চাইছিল। হঠাৎ সে প্রসঙ্গ পাল্টে বলে উঠল, “শোন ফুল, আমি তখনকার আচরণের জন্য দুঃখিত। সারারাত ভেবে দেখলাম এতে কারোর কোনো দোষ নেই। খোদা আমার জন্য তোকে বানায় নি। যদি বানাতো তাহলে কোনো না কোনো ভাবে তুই আমার হয়েই যেতি। অন্তত ভালোবেসে ফেলতি আমায়। তা যখন হলো না মিছেমিছি অভিমান করে কী লাভ। কম চেষ্টা তো আর করিসনি আমাকে ভালোবাসার, আমিও কম চেষ্টা করিনি তোর ভালোবাসা পাওয়ার।”
ফুলের ঠোঁটের কোণে হাসি ফুটে উঠল। ইশ! এই হাসি ফিরিয়ে আনার জন্য আবেশ মনের বিরুদ্ধে গিয়ে হাজারও মিথ্যা কথা অবলীলায় বলে দিতে পারে।
ফুল নরম স্বরে প্রশ্ন করল, “তুমি আমাকে ভুলে যাবে তো আবেশ ভাই? আমার জন্য আর কষ্ট পাবেনা তো?”
আবেশের বুকের ভেতর দহন শুরু হলো। কতটা কষ্ট সে অনুভব করছে তা কেবল তার অন্তরাত্মা জানে। কিন্তু তার বুনোফুলের জন্য সে সব কষ্ট সয়ে নিয়ে নিজের মনের মৃত্যুর পরোয়ানায় সই করতেও রাজি।
“আমি ভুলে যাবো তোকে। একদমই মনে পড়বে না বুঝলি। তোকে ভুলে যাওয়া এ আর এমন কী কঠিন কাজ। শুধু তো একটু ভালোই বেসেছিলাম। পৃথিবীতে এমন কতো ভালোবাসা অকালেই ঝরে যায়। কতো ভালোবাসা পূর্ণতার মুখ দেখতে পায় না। হাতে গোনা কটা ভালোবাসাই প্রাপ্তির সুখ বয়ে আনে বল। আমার এই একতরফা ভালোবাসার গল্পটা নাহয় এখানেই শেষ হলো। এই শেষ হয়ে যাওয়ার মধ্যে দিয়ে যদি তুই তোর ভালোবাসা পেয়ে যাস সেটাই বা মন্দ কিসে?”
ফুল আবেগে মাথা নাড়ল, “ভালোবাসা তোমায় আরও একবার ভালোবাসুক আবেশ ভাই। তোমার জীবনে আরও একবার ভালোবাসার গল্প শুরু হোক। ভিন্ন কোনো মোড়ে ভিন্ন কোনো সময়ে। যে তোমায় ভালোবাসবে তুমি তার হয়ো।”
আবেশ হালকা হাসল। সেই হাসির পেছনে যে কতবড় তাচ্ছিল্য ছিল তা কি ফুল টের পেল? পেল না! আবেশ টের পেতেই দিল না। সে শুধু বলল, “ভালোবাসা তোকে ভালো রাখুক ফুল। খুব সুখে থাক তুই, আমাদের একেবারেই ভুলে যাসনা; মাঝেমধ্যে চলে আসিস।”
ফুলের মনের খেয়াল হলো সে হয়তো আর কখনোই ফিরবে না এবাড়িতে। এমন মনে হওয়ার কারণও স্পষ্ট। মেহেককে সে কথা দিয়েছি আর কখনো মুখোমুখি হবে না আবেশের। ফুল সেই কথা মনে করে উত্তর দিল না, হাসলো শুধু।
আবেশ হাতে ধরে রাখা ফোনটা ফুলের দিকে এগিয়ে দিয়ে বলল, “তোর ফোন, এবার হয়তো ফোন নিয়ে গেলে তোর হাজব্যান্ড আপত্তি করবে না রাইট? করার কথাও নয়।”
ফোনটা হাতে নিতে নিতে ফুল বলল, “মা ফিরে এলে কল দিতে বোলো, ঠিক আছে?”
আবেশ মাথা নাড়ল। নিরবতা অসহনীয় হয়ে উঠতেই আবেশ কণ্ঠ খাদে নামিয়ে বলল, “তোর সামনে একটা জিনিস কনফেস করার ছিল ফুল। আমি জানিনা সেটা শোনার পর আমার প্রতি তোর আস্থা অটুট থাকবে কিনা।”
ফুল থমকে গেলেও আবেশকে সাহস জুগিয়ে দিয়ে বলল, “আরে বলেই ফেলো, আমার সামনে কোনো কিছু কনফেস করা আর আয়নায় ফুটে ওঠা নিজের প্রতিচ্ছবির কাছে কনফেস করা সমান।”
“তা জানি ফুল, কিন্তু তোর বিষয়ে তোর সামনেই কনফেস করাটা একটু কঠিন।”
“এমন কোন বিষয়?”
আবেশ নড়েচড়ে দাঁড়িয়ে লম্বা শ্বাস নিল তারপর ফুলের চোখে চোখ রেখে গড়গড়িয়ে বলে ফেলল, “কক্সবাজারে আমাদের শেষ দেখা হওয়ার রাতে মেহেন্দি দেওয়ার সময় তোর চোখ লেগে যাওয়ার পর আমি অনেকটা কাছাকাছি চলে গিয়েছিলাম তোর।”
ফুলের কান দুটো ঝা ঝা করে উঠল। বিস্ময় ফুটে উঠল চোখে মুখে। আবেশ ভয় পেয়ে গেল তার প্রতিক্রিয়া দেখে। সঙ্গে সঙ্গেই বলল, “বিশ্বাস কর, আমি সজ্ঞানে ছিলাম না তখন। আমার কোনো খারাপ উদ্দেশ্য ছিলো না। শেষ মুহূর্তে হলেও নিজেকে সামলে নিতাম আমি। তুই আমাকে ক্ষমা করে দে।”
ফুল স্তব্ধ হয়ে গেল পুরোপুরি। আবেশের কথাগুলো বিশ্লেষণ করতে চেয়েও বারেবার ব্যর্থ হচ্ছে সে।
“সরি ফুল, ক্ষমা করে দে প্লিজ। তুই ক্ষমা না করলে আমার নিজের প্রতিই ঘৃণা জন্মাতে শুরু করবে।”
ফুল দৃষ্টি সরিয়ে অন্যদিকে তাকাল। নিভু কণ্ঠে বলল, “এটা বলার কি খুব প্রয়োজন ছিল?”
চরম হতাশায় আবেশ নিজের চুল টানতে লাগল। “ছিল ফুল, নইলে ক্ষমা চাইতাম কীভাবে?”
ফুলকে নিশ্চুপ দেখে আবেশ দরজার দিকে ঘুরে দাঁড়াল, “ক্ষমা চাওয়ার দরকার ছিল, চেয়ে নিয়েছি। তুই ক্ষমা করবি কিনা সেটা তোর ব্যাপার। আমি তবে তোর নিরবতাকেই ধরে নিলাম, তুই ক্ষমা করতে পারবি না।”
আবেশ সামনে পা বাড়ানোর আগেই ফুল মৃতপ্রায় কণ্ঠে বলল উঠল, “আমি ক্ষমা করে দিয়েছি। সেই ঘটনা ভুলে যাও।”
আবেশ স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল। পরক্ষণেই দ্রুত পদক্ষেপে রুম ত্যাগ করল সে। তার চলে যাওয়ার মধ্য দিয়ে রুমের পরিবেশ হালকা হয়ে এলো। ক্ষণকাল আগে আবেশের বলা কথাটা মন জমিনে পুতে ফেলল ফুল। উল্টো ঘুরে খাটের দিকে চলে গেল। বালিশের নিচে শেষবারের মতো উদ্যানের ছবিগুলো খুঁজল সে। কিন্তু খুঁজে পেল না। এই কদিনে পুরো রুম চষে ফেলেও ছবিগুলো হদিস পায়নি সে। ফুল দীর্ঘশ্বাস ফেলে খাটের হেডবোর্ডের সাথে হেলান দিয়ে বসে স্বগতোক্তি করল, “উনি মেলো ম্যামকে বিয়ে করবেন শুনে ওনাকে নিয়ে লেখা ডায়েরির পাতাগুলো ছিঁড়ে পুড়িয়ে ফেললেও ছবিগুলো পুড়তে পারিনি আমি। ভেবেছিলাম যেখান থেকে এনেছিলাম সেখানেই রেখে আসবো। ছবিগুলো খুব সম্ভবত বালিশের নিচেই রেখেছিলাম। তবে কোথায় গেল?”
দুপুরের শেষভাগে উদ্যানের ঘুম ভাঙল। সে ফ্রেশ হয়ে একেবারে লাঞ্চ করে ফুলকে বলল, “রেডি হয়ে নাও গিয়ে।”
ফুল মিষ্টি হেসে মাথা নাড়ল। সে আর উর্বী দ্রুত তৈরি হয়ে নিচে নেমে এল। উদ্যান দরজার সামনে দাঁড়িয়ে ঘড়ির দিকে তাকিয়ে ছিল। তাদের দেখে শীতল কণ্ঠে বলল, “তো এবার ফিরে যাওয়া যাক?”
ফুল পা টিপে টিপে উদ্যানের সামনে এসে দাঁড়াল। তার দ্বিধাগ্রস্ত ভঙ্গি দেখে উদ্যান আগেভাগেই অনুমান করে নিল; ফুল হয়তো আবার কোনো বায়না ধরে বসবে। উদ্যান দু আঙুলে কপাল ঘষে রাশভারি কণ্ঠে বলল, “দেখো পেটাল, তোমার সব আবদার এস্টেটে গিয়ে শুনবো। প্লিজ এখানে আর থাকতে চেও না।”
“আমি থাকতে চাইবো না। মা হয়তো খুব জরুরি কাজে গেছেন। কবে ফিরবে আন্দাজে বলা কঠিন।”
“হ্যাঁ আমারও সেটাই মনে হয়।”
ফুল একটু ইতস্তত করে বলল, “চলুন আমরা আপনার মায়ের সাথে দেখা করে আসি।”
উদ্যান চমকিত নয়নে তাকাল, “কী বললে?”
“বললাম, শাশুড়ি মায়ের সাথে দেখা করে আসি চলুন। আমার মায়ের সাথে দেখা না-ই বা করতে পারলাম। সে-ও তো আমার আরও একটা মা।”
উদ্যান মুহূর্তেই যেন স্থবির হয়ে গেল। তার ভেতরে এক তীব্র ক্ষোভ মাথাচাড়া দিয়ে উঠল, কিন্তু চোয়াল শক্ত করে সে সেই অদৃশ্য ক্ষোভটাকে অনবদমিত করল। শান্ত হওয়ার চেষ্টা করে বলল, “খুব ভালো আইডিয়া। চলো তাহলে।”
ফুল খুশি হয়ে উর্বীকে নিয়ে উদ্যানকে অনুসরণ করতে লাগল। তারা বাড়ির পেছনের পারিবারিক কবরস্থানে এসে থামল। বেড়ার অন্যপাশে দাঁড়িয়ে ফুল উৎসুক হয়ে প্রশ্ন করল, “মামি কোথায় আছেন?”
উদ্যান ইশারায় মাটির একটা উঁচু স্তম্ভের দিকে ইশারা করে বলল, “ঐ যে সবার থেকে আলাদা কবরটাই তার।”
ফুলের মনটা বিষন্ন হয়ে এল। সে এর আগেও মায়ের সাথে অনেকবার এসেছে এখানে, তখন অপরিচিত তিনটা কবর কার কার সেটা জিজ্ঞেসও করেছিল সে কিন্তু তার মা বলেছেন তিনিও জানেন না।
ফুল চোখের ইশারায় অন্য দুটো কবর দেখিয়ে বলল, “ওখানে নানাভাই আর তার পাশেই নানুমণি আছেন, তাইনা? আচ্ছা নানাভাইয়ের আরেকপাশের ওখানে কে আছেন? দেখে মনে হচ্ছে মামিও একা নন ওখানে, তার পাশেও কেউ আছে।”
উদ্যান প্রশ্নটা কৌশলে এড়িয়ে গিয়ে ছোট করে বলল, “দেখাদেখি হয়েছে? চলো এবার।”
ধীরলয়ে মাথা নাড়ল ফুল। “আপনিও জানেন না তাইনা?”
উদ্যান জবাব দিল না। ফুল আবারও বলল, “একদিন হয়তো জানতে পারব, যেমন আজ জানতে পারলাম তেমনি আরও দুজনের রহস্যও জানতে পারব। আমি নিশ্চিত তারাও বাইরের কেউ নয় বরং আমাদের আত্মীয়ই হবে। কী বলেন আপনি?”
উদ্যান আনমনেই হেঁটে চলেছে। ফুল একা একাই বকবক করছে। এতক্ষণ মন খারাপ থাকলেও উদ্যানের মায়ের সাথে দেখা করে হয়তো ভালো লাগছে তার।
“আচ্ছা, আপনার মায়ের কথাটা আড়াল করে রাখাটা কি খুব প্রয়োজনীয় ছিল? মা আর মামি কেন লুকিয়ে রাখলেন কথাটা? স্টোর রুমেও তার কোনো অস্তিত্ব খুঁজে পাইনি আমি, একটা ছবি পর্যন্ত পাইনি। মনে হচ্ছে খুব নিখুঁত ভাবে তার অস্তিত্ব মুছে ফেলা হয়েছিল।”
উদ্যানের হাত আপনা আপনি মুষ্টিবদ্ধ হয়ে এলো। ফুল নিজের কৌতুহল চেপে রাখতে পারল না।
“শুনুন না, মামার ব্যাপারে কিছু জানেন আপনি? তিনি নিরুদ্দেশ হয়ে কোথায় গেলেন, বা কী হয়েছিল তার সাথে?”
ফুলের একের পর এক প্রশ্নে উদ্যানের ধৈর্যচ্যুতি ঘটল। দাঁতে দাঁত চেপে পাশ ফিরে বলল, “তিনি কোথায় আছেন আমি কীভাবে জানবো পেটাল? আমাকে তো তার অ্যাক্সিডেন্টের পরপরই মেক্সিকো পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছিল তাইনা? উল্টো সে কোথায় আছে এটা আমার তোমাদেরকে জিজ্ঞেস করা উচিত। কী করেছো তোমরা তার সাথে তা তো তোমরাই ভালো বলতে পারবে।”
ফুল মিনমিনিয়ে বলল, “আমি তো কোনো ব্যাপারেই কিছু জানিনা। শুধু জানি তার একটা ভয়াবহ অ্যাক্সিডেন্ট হয়েছিল। সেই অ্যাক্সিডেন্টে তিনি দুটো পা-ই হারিয়ে ফেলেছিলেন।”
উদ্যানের সহ্যশক্তির বাঁধ ভেঙে গেল। সে অতর্কিতে ফুলের বাহু চেপে ধরে কিড়মিড়িয়ে বলল, “লিসেন পেটাল, মিস্টার তাশরিফ খানজাদা বা তার ওয়াইফ মিসেস বর্ণপ্রিয়া খানজাদাকে নিয়ে তোমার মুখ থেকে আমি একটা বাক্যও শুনতে চাইনা। নিজের ভালো চাইলে কথাটা মাথায় গেঁথে নাও।”
উদ্যানের অগ্নিঝরা বাক্যবাণে ফুল আহত হলো। তার বাদামী রঙা কৃষ্ণগহ্বর ন্যায় চক্ষুদ্বয় থেকে যেন আগুনের স্ফুলিঙ্গ ঝরে পড়ছে।
উদ্যানের খসখসে হাতের বজ্রমুষ্টিতে ফুলের কোমল বাহুটা পিষ্ট হয়ে যাচ্ছে। ব্যথায় ফুলের ডাগর চোখে জল জমতেই উদ্যানের হুঁশ ফিরল। সে এক ঝটকায় ফুলের হাতটা ছেড়ে দিল।
“ফুল?” আবেশের পরিচিত কণ্ঠস্বর কানে আসতেই উদ্যান এক মুহূর্তের জন্য চোখ বন্ধ করে তপ্ত শ্বাস ফেলল। ফুল তড়িঘড়ি করে গাল বেয়ে নামা অশ্রুটুকু মুছে নিল। আবেশ ধীরপায়ে তাদের দিকে এগিয়ে এসে বলল, “তুই এখানে, আমি ভাবলাম, আমাকে না বলেই হয়তো চলে গেছিস।”
“না, আবেশ ভাই। নানা-নানুর সাথে দেখা করতে এসেছিলাম।” ফুল খুব সংক্ষেপে উত্তর দিল। অতঃপর উর্বীকে নিয়ে দ্রুতপায়ে প্রথমে উদ্যানকে, তারপর আবেশকে পাশ কাটিয়ে গাড়ির দিকে চলে গেল।
উদ্যানও হাঁটা ধরতেই নেবে তখনই আবেশ পাশ থেকে বলল, “ফুলকে কষ্ট দেওয়ার কথা ভুলেও ভাববেন না মিস্টার তেহজিব খানজাদা।”
কালো রঙের শার্টের হাতা গোটাতে গোটাতে উদ্যান আবেশের দিকে সরু চোখে তাকাল। তার মাথায় বরাবরের মতোই হেডব্যান্ড, কবজিতে ব্ল্যাক বেল্টের ঘড়ি। “আমার ভাবনা চিন্তা নিয়ে তোমাকে ভাবতে কে বলেছে? নিজের চরকায় তেল দাও বুঝলে।”
আবেশ ক্লান্ত ভঙ্গিতে হাসল, “ফুলকে আমি কখনো নিজের থেকে আলাদা মনে করিনি। ওকে নিয়ে ভাবাটাই আমার জন্য নিজের চরকায় তেল দেওয়া।”
“তো ভাবতে থাকো ওকে নিয়ে। আমাকে বিরক্ত করছো কেন?”
উদ্যানের একেবারে সমুখে এসে দাঁড়াল আবেশ। বুকে হাত গুটিয়ে শান্ত গলায় বলল, “বিরক্ত আপনি আমাকে করেছেন, আমার অতি যত্নে ফোটানো ফুলকে চুরি করে নিয়ে গেছেন। আমি সারাজীবন সাধনা করেও যা পাইনি আপনি তা অবলীলায় পেয়ে গেছেন। তাই বলে মূল্যহীন মনে করবেন না। ফুলের ভালোবাসা পেয়ে নিজেকে ধন্য মনে করুন মিস্টার খানজাদা।”
উদ্যান তাচ্ছিল্যের হাসলো। অতি বিদ্রুপের স্বরে বলল, “আমার পাশে শোয়ার সুযোগ পেয়ে ওর নিজেকে ধন্য মনে করা উচিত মিস্টার আবেশ… ওহ ওয়েট ইউ আর নট খানজাদা এনিমোর। নিজের সারনেম জানো তো?”
আবেশের শক্ত চোয়াল দৃশ্যমান হলো। একই সাথে তাল মিলিয়ে লাল হয়ে এল কানদুটো। বলল, “জন্মসূত্রে পাওয়া সারনেম নিয়ে এতো মাতামাতির কী আছে? সারনেম খুঁজলে আমিও পেয়ে যাবো। বাট আই ডোন্ট নিড ওয়ান।”
“হোয়াট এভার।” উদ্যান উদাসীনভাবে কাঁধ ঝাঁকাল।
“ভালোবাসেন না আপনি ফুলকে। কেন তবে শুধু শুধু কেড়ে নিচ্ছেন? রেখে যান না আমার কাছে, আমি ওকে নিয়ে অনেক দূরে চলে যাবো। আপনার সব ঋণ আস্তে আস্তে শোধ করেও দেবো।”
উদ্যানের চোখ কুঁচকে এল। সে পিলপিল করে আবেশের কাছে গিয়ে নিচু স্বরে বলল, “ভালোবাসি আমি ওকে, তাই আমৃত্যু ও আমার সাথেই থাকবে। ওর দেহে প্রাণ থাকা পর্যন্ত আমি ওকে ছাড়বো না।”
আবেশের বুকের ভেতর গুমরে উঠল। অত্যন্ত ভাঙা গলায় বলল, “ভালোবেসে থাকলে কখনোই নোংরা কথা বলতে পারতেন না ওকে নিয়ে।”
উদ্যান আলসেমি করে ঘাড় চুলকাল, “ডার্টি ওয়ার্ড কখন বললাম? তোমাকে শুধু বোঝাতে চাইলাম তেহজিবের পাশে শোয়ার সুযোগ পাওয়া আর আকাশকুসুম স্বপ্ন সত্যি হওয়া একই কথা।”
আবেশের কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম জমলো। হাঁসফাঁস করে উঠল ছেলেটা। শরীর থেকে যেন ধোঁয়া বের হচ্ছে।
“আমি ফুলকে আটকাতে পারবো না। কারণ সেই ক্ষমতা নেই আমার। ওকে সম্মোহন করে ফেলেছেন আপনি। কী করতে চাইছেন আমি জানিনা। কিন্তু…”
আবেশ ঝট করে মাথা নিচু করে নিল। সমস্ত দম্ভ বিসর্জন দিয়ে দু হাত জোড় করে সবটুকু আবেগ মিশিয়ে বলল, “ওকে কাঁদাবেন না প্লিজ। মেয়েটা খুব আহ্লাদী, সামান্য অবহেলা টুকুও সহ্য করতে পারবে না। ও খুব ভীতু, কঠিন পরিস্থিতির মোকাবিলা করার সাহস নেই ওর মাঝে। ওকে ভালোবেসে কাছে টেনে আনা খুব সহজ, বড্ড ভালোবাসার কাঙাল মেয়েটা। ওর থেকে ক্ষমা পাওয়াও সহজ। ওকে খুন করে ফেলে ক্ষমা চাইলেও হয়তো ক্ষমা করে দেবে। তাই এমন মেয়েকে খুব যত্নে রাখতে হয় বুঝলেন। এদের কষ্ট স্বয়ং সৃষ্টিকর্তাও সহ্য করতে পারেন না। এদের কাঁদালে কিংবা কষ্ট দিলে তার পরিনতি ভয়াবহ হয়।”
উদ্যান কানে আঙুল ঢুকিয়ে অলস ভঙ্গিতে বলল, “তোমার জ্ঞান দেওয়া হয়ে গেছে? ক্যান আই টেক মাই লিভ নাও?”
আবেশ স্তব্ধ হয়ে রইল। জড়ো করা হাত দিয়ে নিজের মুখটা একবার মুছে নিয়ে সে নীরবে সরে দাঁড়াল।
↓
“তুমি কিন্তু প্রতিজ্ঞা টার কথা ভুলে যেওনা ফুল।” মেহেকের কথায় ফুল হাসল।
“ভুলবো না, মেহেক।”
ফুল এক এক করে সবার থেকে বিদায় নিয়ে গাড়িতে উঠে বসলো। পুরোটা সময় আবেশের মনোযোগ ফুলের দিকেই ছিল।
গাড়িটা দৃষ্টি সীমার বাইরে চলে যাওয়ার পরপরই আবেশ ঘুরে দাঁড়িয়ে মেহেককে সরাসরি প্রশ্ন করল, “তুই ফুলকে কোন প্রতিজ্ঞার ব্যাপারে মনে করিয়ে দিচ্ছিলি তখন?”
অকস্মাৎ প্রশ্নে মেহেক ভড়কে গেল, “কখন?”
আবেশ ভারিক্কি কণ্ঠে আওড়াল, “কিছুক্ষণ আগেই।”
মেহেক আমতা-আমতা করতে লাগল, “কই নাতো… আমি তো কিছু বলিনি।”
“আমি পরিষ্কার শুনেছি। মিথ্যা বলার চেষ্টা করিস না।”
মেহেক কথা গুলিয়ে ফেলল। আবেশ তাকে আর মাহবুবা সুলতানাকে চমকে দিয়ে খপ করে মেহেকের হাতটা ধরে নিজের মাথার ওপর রাখল। ভরাট কণ্ঠে বলল, “তুই চাইলেই মিথ্যা কথা বলতে পারিস। এমনিতেও বেঁচে থাকার কোনো ইচ্ছাই নেই। বলে ফেল ফুলকে কোন প্রতিশ্রুতির কথা মনে করিয়ে দিয়েছিলি।”
মাহবুবা সুলতানা তাকে থামানোর চেষ্টা করলেন, “কোন ধরনের ছেলেমানুষী করছিস আবেশ? ছেড়ে দে ওর হাত।”
“তুমি চুপ থাকো, মেহেক জলদি বল। আমি তোর কথা সত্যি হিসেবেই মেনে নেবো। তুই যা খুশি বলতে পারিস।”
আবেশের মাথায় হাত রেখে মেহেকের পক্ষে মিথ্যা বলা অসম্ভব। মাহবুবা সুলতানাও বলে যাচ্ছেন, “মিথ্যা বলিস না মেহেক। ও যা জানতে চাইছে সত্যি সত্যিই বলে দে।”
মেহেক শুকনো ঢোক গিলল। নিজের কাঁপতে থাকা শরীরটাকে সামলানোর চেষ্টা করে ধরা গলায় বলেই ফেলল, “ফুল কথা দিয়েছে আর কখনো তোমার মুখোমুখি হবে না। সেই কথাই মনে করিয়ে দিয়েছিলাম।”
আবেশের মাথায় যেন আকাশ ভেঙে পড়ল মুহূর্তেই। মেহেকের হাতটা মুক্ত করে দিয়ে সে পিছিয়ে গেল কয়েক পা। রূঢ় কণ্ঠে সে শুধাল, “তুই ওকে বাধ্য করেছিস?”
মেহেক মাথা নেড়ে আর্তনাদ করে উঠল, “না আবেশ ভাই! আমি বাধ্য করিনি। ও নিজের ইচ্ছায় এই সিদ্ধান্ত নিয়েছে।”
আবেশ উদ্ভ্রান্তের মতো পকেট থেকে ফোন বের করে ফুলের নম্বর ডায়াল করল।
↓
“চোখ বেঁধে নিতেই হবে?” ফুলের প্রশ্নে উদ্যান ভিউ মিররে একবার তীক্ষ্ণ দৃষ্টি নিক্ষেপ করল। বরফ শীতল কণ্ঠে বলল, “হ্যাঁ। আগে ওই মেয়েটার চোখ বাঁধো, তারপর নিজের।”
ফুল নাক কুচকে মৃদু আপত্তি জানাল, “উর্বী আপু ঘুমিয়ে পড়েছে। ওর চোখ বাধার কী প্রয়োজন?”
উদ্যান ধমকের সুরে বলল, “বাধতে বলেছি বাধবে, অযথা প্রশ্ন করে সময় নষ্ট কোরো না।”
দীর্ঘশ্বাস ফেলে উদ্যানের কথামতো উর্বীর চোখ বেধে দিল ফুল।
“এবার নিজের টাও বাধো।”
ফুল ঠোঁট বাকিয়ে নিজের চোখ বাধতে যাবে তখনই পার্সের মধ্যে থাকা তার ফোনটা বেজে উঠল। তড়িঘড়ি করে ফোনটা বের করতে না করতেই উদ্যান সজোরে গাড়ির ব্রেক কষল। টায়ারের ঘর্ষণে এক বিকট শব্দ হলো।
উর্বী ঘুমের ঘোরে প্রবল ধাক্কা অনুভব করে চোখ মেলে তাকানোর চেষ্টা করল কিন্তু চোখ বাধা থাকায় সে কিছুই দেখতে পেল না। হাত দিয়ে চোখের বাধন খুলে দেখল, ফুল হুমড়ি খেয়ে আছড়ে পড়েছে ড্যাশবোর্ডের ওপর। হাত থেকে ফোনটা ছিটকে পড়েছে নিচে। সিটবেল্ট লক থাকায় বড় কোনো বিপদ হয়নি।
“কী হলো?” ফুলের প্রশ্নের বিপরীতে কোনো জবাব এল না। সে নিচু হয়ে ফোনটা কুড়োতে চাইল, কিন্তু তার হাত ফোন অবধি পৌঁছানোর আগেই উদ্যান শক্ত হাতে ফোনটা তুলে নিল।
ফোনের স্ক্রিনে ‘আবেশ ভাই’ নামটা জ্বলজ্বল করছে। সেটা দেখামাত্রই উদ্যানের কপালের রগগুলো ফুলে উঠল। দাঁতে দাঁত চেপে সে জিজ্ঞেস করল, “তুমি ফোন পেলে কোথায় আর আবেশ কেন কল দিচ্ছে?”
কপালের ওপর ছড়িয়ে পড়া চুলগুলো সরিয়ে নিয়ে সোজা হয়ে বসলো ফুল। ধীর গলায় বলল, “ওটা আমারই ফোন, সে কেন কল দিচ্ছে তা তো জানিনা।”
উদ্যান ফোনটা হাতের মুঠোয় নিয়ে আরেক হাতে গাড়ির ইঞ্জিন স্টার্ট দিল। আবেশ লাগাতার কল দিয়েই যাচ্ছে। হঠাৎই উদ্যান জানালার কাঁচ নামিয়ে ফোনটা বাইরে ধরল।
ফুল বিস্মিত হয়ে গেল, “আরে কী করছেন? ফোনটা পড়ে যাবে তো।”
ফুলের কথাটা শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই উদ্যান ফোনটা ছেড়ে দিল। চোখের পলকেই চাকার নিচে পিষ্ট হয়ে ফোনটা গুড়ো গুড়ো হয়ে গেল। ফুল স্তব্ধ হয়ে জানালার বাইরে তাকিয়ে রইল। কম্পিত কণ্ঠে জানতে চাইল, “কেন করলেন এমন?”
উদ্যানের সপাটে জবাব দিল, “ফোনের কী প্রয়োজন তোমার?”
ফুলের চোখজোড়া ছলছলিয়ে উঠল, “কথা বলতাম মায়ের সাথে সেই জন্যই এনেছিলাম।”
“প্রয়োজন নেই, আজ এখন থেকে আমি ছাড়া তোমার কেউ নেই। তোমার সব ভাবনা চিন্তা যেন আমি কেন্দ্রিক হয়।”
“ফোনটা থাকলে কি খুব সমস্যা হয়ে যেতো?”
“বাদ দাও পেটাল। আমার ভালোবাসা কি যথেষ্ট নয়? সামান্য ফোনের জন্য মন খারাপ হয়ে যাচ্ছে? আমার ভালোবাসা চাই নাকি ফোন চাই বলো।”
ফুল বুঝতে পারল উদ্যানের সাথে তর্ক করে লাভ নেই। এমনিতেও সে আবেশের কল রিসিভ করতো না। সে কোনো যোগাযোগ রাখবে না আবেশের সাথে।
ফুলের সাথে কথা বলতে না পেরে আবেশের অস্থিরতা আকাশ ছুঁয়েছে৷ প্রথম কয়েকবার কল ঢুকলেও এখন অপর পাশ থেকে ভেসে আসছে: The number you’ve dialled is currently unreachable…
বুকটা খালি হয়ে আসলো তার। ফুলের সাথে দেখা হবেনা ভাবতেই নিঃশ্বাস ফুরিয়ে আসছে। সে টলমলে পায়ে মাহবুবা সুলতানার সামনে এসে দাঁড়াল।
“মম, প্লিজ বলো না ফুলের সাথে ডেভিলটার কিসের শত্রুতা ছিল?”
প্রশ্নটা শুনে মাহবুবা সুলতানা আড়ষ্ট হয়ে গেলেন। মনে পড়ে গেল এই একই প্রশ্ন এবার ফুল এসেও তাকে করেছিল। তিনি ফুলকে সব বলে দিতেও চেয়েছিলেন কিন্তু উদ্যান এসে ফুলকে নিয়ে গিয়েছিল। পরবর্তীতে তাকে সতর্ক করে বলেছিল, ফুলকে অতীতের কোনো ঘটনার কথা না জানাতে। মাহবুবা সুলতানা তাই চেয়েও ফুলকে কিছুই জানাতে পারেন নি। আর না তো এখন আবেশকে জানাতে পারবেন, ছেলেটা সবে মাত্র সুস্থ হতে আরম্ভ করেছে, এইমুহূর্তে পুরোনো ঘটনা উন্মোচন করা ঠিক হবেনা।
তিনিও মনেপ্রাণে চান, আবেশ যেন এবার ফুলকে ভুলেই যায়। তাই তিনি খুব বিস্তারিত ব্যাখ্যায় না গিয়ে সংক্ষেপে বললেন, “উদ্যানের বাবা উদ্যানের চেয়ে ফুলকে বেশি ভালোবাসতেন। সেটাই উদ্যান সহ্য করতে পারতো না। বয়স কম ছিল তো তখন, তাই এই ছোট্ট কারণেই ফুলকে শত্রু মনে করতো ছেলেটা। এখনই দেখনা, ছেলেটা সেই শত্রুতা ভুলে গিয়ে ফুলকে ভালোবেসেও ফেলেছে।”
“তোমার মনে হয় ডেভিলটা আসলেই এঞ্জেল হয়ে গেছে?”
“এঞ্জেল হয়েছে কিনা জানিনা, ফুল উদ্যানকে ভালোবেসে ফেলেছে এটাই সবচেয়ে বড় কথা। ওরা ভালো থাকুক সেটাই চাই। কী বলিস?”
আবেশ মলিন হাসল, “ফুল সত্যিই ভালোবেসে ফেলেছে, কিন্তু আমার কেন মনে হলো ডেভিলটা ভালোবাসার মানেই জানেনা।”
“আরে ও একটু অন্যরকম, দেশের বাইরে বড় হয়েছে তো তাই ওর আচরণে তোর এমন মনে হয়েছে। ওরা পরস্পরকে ভালোবাসে, তুই চিন্তা করিস না। খুব ভালো থাকবে ওরা দুজন একসাথে।”
“সে নাহয় বুঝলাম কিন্তু ফোনটা কেন রিসিভ করলো না?”
মাহবুবা সুলতানা ছেলের কাঁধে হাত রাখলেন, “হয়তো ফুলও চায়না তুই ওকে নিয়ে ভাবিস। সেই জন্যই হয়তো রিসিভ করেনি। দেখ আবেশ ফুল চায় তুইও ভালো থাক। তাই তোরও ভালো থাকার চেষ্টা করা উচিত।”
আবেশ আর কিছু বলল না। বুকভরা একরাশ শূন্যতা নিয়ে সে চুপচাপ বাড়ির ভেতর চলে গেল।
↓
বিকেলের রক্তিম আভা মুছে গিয়ে আকাশটা যেন সন্ধ্যার ধূসর রঙা চাদর গায়ে জড়াচ্ছে। এস্টেটের বিশাল ফটকের সামনে শ্বেতপাথরে খোদাই করা ‘SOLAR’ লেখাটির দিকে তাকিয়ে উর্বীর বুকের ভেতরটা হঠাৎ কেঁপে উঠল। মনে হলো সে আগেও এসেছিল এখানে। বলে রাখা ভালো খানাজাদা নিবাসের উদ্দেশ্যে বেরোনোর সময় সে এই লেখাটা খেয়াল করেনি।
সে বিড়বিড় করল, “আমার মনে হচ্ছে, আমি এখানে বিশেষ কোনো কাজে এক সময়ে এসেছিলাম।”
ফুল ভ্রু কুচকে তাকাল। তবে কিছু বলার সুযোগ পেল না। উদ্যান তাড়া দিয়ে বলল, “৩০ সেকেন্ডের মধ্যে দরজা লক হয়ে যাবে, ভেতরে চলো।”
ফুল মাথা নেড়ে উর্বীকে নিয়ে ভেতরে এলো। ড্রইংরুমে বসে তাদের জন্য অপেক্ষা করছিল রিদম বাদে বাকিরা। ফুল আর উর্বীকে দেখেই অনিলা প্রায় নেচে উঠে এগিয়ে এল।
“উফ! কতদিন পর দেখলাম তোমাদের!” বলতে বলতেই সে ফুলকে জাপটে ধরল।
উর্বী কিছুটা অবাক হয়ে ভ্রু উঁচাল, “মাত্র আটটা দিনই তো হয়েছে অনিলা।”
অনিলা ফুলকে ছেড়ে দিয়ে ঠোঁট উল্টে আদুরে গলায় বলল, “আমার কাছে তো মনে হচ্ছিল আট মাস হয়ে গেছে।”
উদ্যান অবশ্য থামেনি। চিরাচরিত গম্ভীর ভঙ্গিতে নিজের রুমে চলে গেছে। রিদম ডাইনিং হলে বসে তার প্রস্থানের অপেক্ষায় ছিল। উদ্যান দৃষ্টির আড়ালে যেতেই সে বাইরে বেরিয়ে এল।
হঠাৎ রিদমের ওপর চোখ পড়তেই শিউরে উঠল উর্বী; আঁকড়ে ধরল ফুলের বাহু। তাকে ভয় পেয়ে যেতে দেখে রিদমের নিঃশ্বাস ভারী হয়ে এল। সে অনেক বড় আশা নিয়ে বসে ছিল যে, উর্বী এবার ফিরে এসে হয়তো স্বাভাবিক আচরণ করবে কিন্তু সেটা হলো না।
উর্বীর ভীতসন্ত্রস্ত হয়ে যাওয়া চেহারা দেখে ফুল অনুমান করতে পারল উর্বী কাকে দেখে সিটিয়ে যাচ্ছে। তাই সে উর্বীকে সামনে আনার প্রয়াস করে বলল, “ভয় পাচ্ছো কেন উর্বী আপু? তুমি যাকে ভেবে ভয় পাচ্ছো উনি সে নয়। ভালো করে দেখো উনি তোমার বন্ধু রিদম স্যার।”
উর্বী অশ্রুসিক্ত নয়নে ফুলের পানে তাকাল। জরানো কণ্ঠে বলল, “হ্যাঁ, উনিই সেই লোক! ওনাকেই আমি নিজের বন্ধু ভেবেছিলাম। উনি সেই সুযোগ কাজে লাগিয়ে আমাকে তুলে নিয়ে গিয়েছিল। উনি ভালো মানুষ নন ফুল, একদম ভালো নন!”
ফুল অপ্রস্তুত হয়ে পড়ল। সে উর্বীর গাল দুটো নিজের হাতের মুঠোয় নিয়ে শান্ত করার চেষ্টা করল, “আরে না আপু, তোমাকে তো রিহান তুলে নিয়ে গিয়েছিল। উনি রিদম স্যার, উনি তোমার সাথে কিছুই করেননি।”
উর্বী কোনো কিছু শুনতেই চাইলো না, বরং ক্রমশই ভারসাম্য হারিয়ে উন্মত্তের মতো করতে লাগল। তাকে এমন বেসামাল হয়ে পড়তে দেখে রিদম দ্রুত পায়ে স্থান ত্যাগ করল। পরপরই ফুল আর অনিলাও উর্বীকে নিয়ে ফুলের রুমের উদ্দেশ্যে হাঁটা ধরল।
চলবে,,,
শব্দসংখ্যা: ৩৪০০+
(গল্পটাকে নিজেদের মতো ঘুরিয়ে প্যাচিয়ে জটিল না করে ফেলার পরামর্শ রইল। যদি নিজেদের মতো ভাবতেন যান তাহলে জট পাকিয়ে ফেলবেন। আমি যখন যেটুকু বলছি সেটুকুই বিশ্বাস করবেন। তাহলে আর গল্পটাকে জটিল মনে হবেনা।)
Share On:
TAGS: অবাধ্য হৃৎস্পন্দন, সোফিয়া সাফা
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
অবাধ্য হৃৎস্পন্দন পর্ব ৩৯
-
অবাধ্য হৃৎস্পন্দন পর্ব ২৪
-
অবাধ্য হৃৎস্পন্দন পর্ব ৪১
-
অবাধ্য হৃৎস্পন্দন পর্ব ১০
-
অবাধ্য হৃৎস্পন্দন পর্ব ২৫(প্রথমাংশ+শেষাংশ)
-
অবাধ্য হৃৎস্পন্দন পর্ব ২০
-
অবাধ্য হৃৎস্পন্দন পর্ব ৪৫
-
অবাধ্য হৃৎস্পন্দন পর্ব ১৪
-
অবাধ্য হৃৎস্পন্দন পর্ব ৩৬
-
অবাধ্য হৃৎস্পন্দন পর্ব ৩৬ (বর্ধিতাংশ)