Golpo অন্তরালে আগুন অবাধ্য হৃৎস্পন্দন

অবাধ্য হৃৎস্পন্দন পর্ব ৩১


অবাধ্য_হৃৎস্পন্দন (৩১)

সোফিয়া_সাফা

রাত ১১ টা (হসপিটাল)

এটেনডেন্ট রুমে শুয়ে আছে মেহেক আর ওর মা মমতা বেগম। একটানা হসপিটালে থেকে অসুস্থ হয়ে গিয়েছিলেন মাহবুবা সুলতানা। মমতা বেগম আবেশকে দেখতে এসেছেন, মাহিও এসেছিল, মাহবুবা সুলতানা আর রেহানা বেগমের সাথে খানজাদা নিবাসে ফিরে গিয়েছে। গত ২-৩ দিন যাবত জিরিয়ে জিরিয়ে বৃষ্টি হচ্ছে। বাইরে ঝুম বৃষ্টি, ঠান্ডা ঠান্ডা আবহাওয়ায় মমতা বেগম ঘুমিয়ে গেলেও মেহেকের চোখে ঘুম নেই। সে ফোন টিপছে, হঠাৎ মৃদু ব্যাকুল কণ্ঠে গানের সুর ভেসে আসে। এয়ারফোন খুলে কান খাড়া করে গানের সুর অনুসরণ করে মেহেক। বেড থেকে নেমে কেবিনের সামনে দাঁড়াতেই গানের কথাগুলো স্পষ্ট হয়ে যায়।

নিজেকেই, মনে হয় বলে দি, এ সবই ভুল ও…
ঝরে যাক, পড়ে যাক; আদরে ফোটানো ফুল।
চিন্তাতে তোর, কাটছে প্রহর। শান্তি নেই, এ যন্ত্রনার।
মন মাঝি রে, বল না কোথায়…
মন মাঝি রে, আয় ফিরে আয়
আয় ফিরে আয়, আয় ফিরে আয়
আয় ফিরে আয়…..

আবেশ থেমে যাওয়ার সাথে সাথেই রুম জুড়ে অসহ্যকর নিস্তব্ধতা নেমে এলো। ডিম লাইটের আবছায়ায় দেখা যাচ্ছে বেডের হেডবোর্ডের সাথে হেলান দিয়ে বসে আছে আবেশ। অবচেতন পায়ে রুমে ঢোকে মেহেক, ঠিক বেডের সামনে গিয়ে রিনরিনে গলায় ডাকে,
“আবেশ ভাই…

আধো আলোয় নারীমূর্তি দেখে আবেশের মনে ভ্রম জাগে। বরাবরই মেহেকের ‘আবেশ ভাই’ সম্মোধনে বিড়ম্বনায় পড়ে গেছে সে। আর আজ তো সে বাতাসেও খুঁজে ফিরছে ফুলকে। কোনো আগাম বার্তা না দিয়েই আবেশ আঁকড়ে ধরে মেহেকের কোমড়। মাথা রাখে পেটের ওপর। হড়বড়িয়ে যায় মেহেক, মেরুদণ্ড বেয়ে শীতল স্রোত বয়ে যায়।
“আবেশ ভাই ক… কি করছো?”

আবেশের অস্থির মস্তিষ্ক মেহেকের কণ্ঠের মাঝেই যেন ফুলের কণ্ঠ খুঁজে পেয়েছে।
“তুই এসেছিস ফুল? আমি জানতাম তুই আমাকে দেখতে আসবি। না এসে পারবিই না।”

মেহেক হয়তো বলতে চাইলো সে ফুল নয়, ফুল এসেছিল গতকাল; আজ আসেনি, আবেশের বিভ্রম হচ্ছে। কিন্তু মাহবুবা সুলতানা বারবার ফুলের নাম উচ্চারণ করতে নিষেধ করে গেছেন। পেটের উপর ভেজা কিছু অনুভব করতেই ঘাবড়ে যায় মেহেক,
“কাঁদছো আবেশ ভাই?”

নাক টানে আবেশ, “কাঁদছি? কই নাতো, তোকে খুঁজতে খুঁজতে ক্লান্ত হয়ে ঘেমে গেছি বোধহয়।”

আবেশের কথায় মেহেকের গলা শুকিয়ে এলো। এতো করুণ কেন শোনাচ্ছে আবেশের কণ্ঠ?
“খুঁজে পাবেনা জেনেও কেন খুঁজছো?”
“জানিনা, তোকে খুঁজতেও ভালো লাগে। তোকে না খুঁজলে নিজেকেই হয়তো হারিয়ে ফেলবো।”

মেহেক হয়তো জানেও না সে নিজেও কাঁদছে।
“তোমার কান্না পেলে কেঁদে নাও আবেশ ভাই। রাতের অন্ধকার তোমার চোখের জল লুকিয়ে রাখবে।”
“আমি কাঁদতে চাইনা ফুল, একবার কান্না শুরু করলে থামতে পারবো না যে। আমার জীবনের সবকিছুই মিথ্যা নামক কুয়াশায় ঘেরা। আমি যেই কুয়াশাতে স্বস্তি পাই। সেই কুয়াশা সরিয়ে ফেললে শূন্যতায় বিলীন হয়ে যাবো।”

চুপ হয়ে গেল আবেশ, কিছুক্ষণ পর বলল, “ডেভিলটা আসলেই আমার ভাই নয়… আল্লাহ আমার প্রার্থনা এমন নিষ্ঠুর পদ্ধতিতে কবুল করলেন? সৎ ভাই হলেও মেনে নিতাম কিন্তু এভাবে আগাছা রূপে নিজেকে আবিষ্কার করলাম?”

থমকে গেল মেহেক, এই সম্পর্কে কোনোকিছুই জানতো না সে। কোনোপ্রকার ধারণা বা পূর্বাভাসও পায়নি। এতো বড় ধাক্কা খেয়েও ঠায় দাঁড়িয়ে আছে মেহেক।
“মম এতো বড় সত্যি লুকিয়ে রেখেছিল আমার থেকে… কেন? এর উত্তর চাইনা আমার, কিচ্ছু চাইনা। এতো এতো অপূর্ণতার মাঝে শুধু তোকে চাই আমার।”

হঠাৎ আবেশের মনে হতে লাগল, এই নারীমূর্তি ফুল নয়। মুখ তুলে মেহেকের দিকে তাকায় আবেশ, ঝাপসা চোখে মেহেককে চিনে উঠতে পারেনা।
“কে?”

ধরা পড়ে যাবার ভয়ে উল্টো ঘুরে দাঁড়ায় মেহেক। তাকে চিনতে পারলে আবেশ দক্ষযজ্ঞ শুরু করে দেবে। আবেশ আরও কিছু বলার পূর্বেই কেবিন থেকে বেরিয়ে যায় মেহেক। যাওয়ার সময় দরজা লাগিয়ে দিয়ে যায়। মেহেকের পিছু পিছু দরজা পর্যন্ত আসে আবেশও। শরীর দূর্বল থাকায় মেহেককে আটকাতে পারেনি সে, মূলত হাটার শক্তিটুকুও নেই পায়ে, হাপাতে হাপাতে দরজার সাথে ঠেস দিয়ে বসে পড়ে আবেশ,
“যাস না ফুল। তোর জন্য গোপনে গান গাওয়া শিখেছি আমি। বহু বছর ধরে, আমার স্বপ্ন আমি গান গাইবো; তুই নাচবি। সেই দিন কি আসবে না ফুল? তুই বুনোফুল থেকে আমার ফুলবউ হবি না?”

(সোলার এস্টেট)

ঘড়ির টিকটিক শব্দ ব্যাতীত পুরো রুম নিস্তব্ধপুরী। বৃষ্টি বিলাস শেষে সুইং বেডে গা এলিয়ে দিয়েছিল ফুল। ভাবনা চিন্তা করতে করতে সেখানেই ঘুমিয়ে গিয়েছে। রুম জুড়ে ডিম লাইটের গোলাপি আভার স্নিগ্ধতা বিরাজমান। দুপুরে, গোসল সেরে হলুদ রঙের শাড়ি পড়েছিল ফুল, আর খোলা হয়নি। ঘুমের ঘোরে বাম গালে ঠান্ডা কিছুর ছোয়া পেয়ে চোখমুখ কুচকে গুঙিয়ে ওঠে সে।

“ডাজ ইট হার্ট পেটাল?” উদ্যানের হাস্কিটোনে বলা কথাটা ফুলের কর্ণগুহরে তীব্র আলোড়ন তুলল। পিটপিট চোখে তাকিয়ে দেখল এক ছায়ামানব তার মুখ বরাবর ঝুঁকে গালে হাত বুলিয়ে দিচ্ছে। তৎক্ষনাৎ ঘুম দূরে ঠেলে উঠে বসে ফুল। শাড়ি ঠিকঠাক করে পিছিয়ে যায় অনেকটা।

উদ্যান তর্জনী আঙুলে কপাল চুলকে তীক্ষ্ণ গলায় বলল, “অ্যালেক্স, টার্ন অন দা লাইট।”

পরপরই পুরো রুমে শুভ্র আলোর ছটা ছড়িয়ে পড়ল। বেশ অবাক হয়ে গেল ফুল। সে তো ভেবেছিল ‘অ্যালেক্স’ শুধুমাত্র এসির নাম। কিন্তু এখন তো মনে হচ্ছে ‘অ্যালেক্স’ আদতে কোনো অদৃশ্য সত্তার নাম। সর্বাঙ্গ শিরশিরিয়ে উঠল তার। গালে হাত দিয়ে চিটচিটে আঠালো কিছু অনুভব করল,

“আরে কি করছো? মেডিসিন লাগিয়ে দিয়েছি।”

সঙ্গে সঙ্গেই শাড়ির আঁচল দিয়ে গাল মুছে ফেলে ফুল। ঘটনা চক্রের ঘূর্ণিতে ফুলের বাহু চেপে ধরে নিজের দিকে টেনে নেয় উদ্যান। জোর করে পুনরায় গালে মেডিসিন লাগিয়ে দেয়।
“যতবার মুছবে,” উদ্যান নিচু স্বরে বলল,
“আমি ততবার লাগাবো। তাই বেশি খাটিও না, আমি ক্লান্ত।”

উদ্যানের থেকে নিজেকে ছাড়িয়ে কড়া গলায় ফুল বলে,
“আপনি রুমে ঢুকলেন কিভাবে।”

বেডে হাটু গেড়ে বসে ফুলকে সূক্ষ্ম চোখে পরীক্ষণ করতে করতে উদ্যান বলল, “কিভাবে মানে?”

“দরজা লক করা ছিলো। আপনি ঢুকেছেন কিভাবে?”

উদ্যান ভ্রু নাচিয়ে বলল, “এই বাড়িতে এমন কোনো লক তৈরী করা হয়নি যা আমাকে আটকাতে পারবে।”

“কেনো এসেছেন আপনি, কি চাই?”
“যদি বলি তোমাকে…” অত্যন্ত সরল গলায় জাহির করলো উদ্যান, যেন ফুলকে চাওয়া তেমন অস্বাভাবিক কিছু নয়। ওর সুরে তাল মিলিয়ে ফুল বলে,

“আমাকে পাবেন না, যেতে পারেন।”

উদ্যান এক ইঞ্চি, দু-ইঞ্চি করে অগ্রসর হতে লাগল,
ফুল পিছু হটতে হটতে প্রায় বিছানা থেকে পড়ে যাচ্ছিল। কিন্তু সে পড়ে যাওয়ার আগেই উদ্যান তার কব্জি ধরে টেনে নিল। উদ্যানের স্পর্শে যেন পুড়ে গেল ফুলের হাত। ঝাঝালো কণ্ঠে বলল,
“ছোবেন না আমাকে।”

উদ্যান ঠান্ডা গলায় বলল,
“পড়ে যেতে নিয়েছিলে।”
“গেলে যেতাম। আপনার কি আসে যায়? আর আপনি এগোচ্ছিলেন কেন?”

এক সেকেন্ড থেমে উদ্যান বলল,
“সরি বলতে।”

নাটকীয় ভঙ্গিতে হেসে ওঠে ফুল, “আপনি সরি বলতে এসেছেন তাও আবার আমার কাছে?”

ফুলের হাসির ধরণ দেখে বিমোহিত হয় উদ্যান। “তোমার গায়ে হাত তুলেছিলাম তাই সরি বলতে এসেছি; হাসার কি আছে?”

“আপনি গায়ে হাত তুলেছিলেন তা মনে আছে… কেন তুলেছিলেন, সেটাও মনে আছে নিশ্চয়ই?”

উদ্যান গম্ভীর হয়ে গেল।
“দেখো, পেটাল… আমি সারার বিষয়ে কোনো আলোচনা করতে চাই না।”
“কেন? কি লুকাচ্ছেন আমার থেকে? কে হয় সারা আপনার?”

থমকে গেল উদ্যান। বুকে হাত ভাঁজ করে প্রশ্নবিদ্ধ চোখে তাকাল সমুখে বসে থাকা অর্ধাঙ্গিনীর দিকে,
“সারা আমার কে হয় সেটা জানার খুব আগ্রহ দেখছি। আমি কি জানতে পারি কারণ টা কি?”

অপ্রস্তুত হয়ে পড়ে ফুল, দৃষ্টি সরিয়ে নরম গলায় বলে, “আমি ভাবতেও পারিনি আপনার নারী দোষ আছে।”

“কথা ঘুরিয়ে ফেললে… ঠিক আছে, আমার নারী দোষ নেই সেটা ভেবেছো কেন? হসপিটালে বসে তো গলা ফাটিয়ে বলেছিলে আমি নাকি লম্পট, বোধবুদ্ধি হীন দানব।”

চুপ হয়ে গেল ফুল। তীরের ফলার ন্যায় ভ্রু বাকিয়ে তাকিয়ে আছে উদ্যান। ফুলের গতিবিধি ক্যালকুলেট করে বলল,
“তুমি ভাবতেও পারোনি কারণ, যেখানে তুমি আমার ওয়াইফ হওয়া সত্ত্বেও আমি তোমার সাথে তেমন কিছু করিনি সেখানে নারী দোষ থাকাটা কল্পনাতীত ছিল। অ্যাম আই রাইট?”

ফুলের ওষ্ঠদ্বয় নিজ শক্তিতে কিঞ্চিৎ ফাঁক হয়ে গেল। যারপরনাই অবাক হয়েছে সে, উদ্যান কিভাবে তার মনোভাব সম্পর্কে আন্দাজ করে ফেলল ভেবে পাচ্ছে না। উদ্যান এবার ফুলের দিকে মুখ এগিয়ে নিল,
“ফর ইওর ইনফরমেশন, আমার চরিত্র তেমন হলে; তুমি এখনও ভার্জিন থাকতে না, পেটাল।”

উদ্যানের ফিসফিসানিতে গরম হয়ে গেল ফুলের চিবুক। ফর্সা মুখশ্রীতে রক্তিম আভা ফুটে উঠল। লজ্জায় একস্থানে বসে থাকা মুশকিল হয়ে পড়েছে। বেড থেকে নেমে যেতে চাইলে ওর হাত ধরে ফেলে উদ্যান,
“পালিয়ে যেতে হবেনা। অ্যাকসেপ্ট মাই অ্যাপলোজি, আমি নিজ উদ্যোগে রুম থেকে বেরিয়ে যাবো।”

উদ্যানের হাত ছাড়ানোর চেষ্টা করতে লাগল ফুল, “আমি এক শর্তে ক্ষমা করবো আপনাকে।”

ফুলের হাত ছেড়ে দেয় উদ্যান, ফুল আবারও নিজ স্থানে স্থির হয়ে বসে, “কি শর্ত, শুনি।”

“পরিস্কার করে বলুন সারার সাথে কি সম্পর্ক আপনার। পাল্টা কোনো প্রশ্ন করবেন না। আমার শুধু উত্তর চাই।”

একভাবে কিছুক্ষণ ফুলের দিকে তাকিয়ে থাকে উদ্যান অতঃপর বলে, “ফ্রেন্ড হয়, নাথিং এলস।”

রাগ সংবরণ করার চেষ্টায় চোখ বন্ধ করে নেয় ফুল। চড়া গলায় বলে, “মিথ্যা… মিথ্যা… মিথ্যা। আপনি মিথ্যা বলছেন। ইউ ব্লাডি লায়ার।”
ফুলের কণ্ঠ কাঁপল, কিন্তু থামল না, “ও আপনার জাস্ট ফ্রেন্ড হলে আপনি বদ্ধ রুমে ওর সাথে আলাদা সময় কাটাতেন না। তাও আবার আপনার জন্মদিনের দিন। যেখানে আপনার অন্য বন্ধুদের মাঝে আপনাকে সামান্য উইশ করতে যাওয়ার গাটস্ নেই সেখানে ওই মেয়েটা এতো সাহস কোথায় পেলো? নির্ঘাত সে স্পেশাল কেউ।”

একরাশ অনীহা ধরা দিল উদ্যানের চোখেমুখে, “তুমি আমার অ্যাপলোজি অ্যাকসেপ্ট করবে না?”

“আমার প্রশ্নের যথাযথ উত্তর না দেওয়া পর্যন্ত করবো না। যেতে পারেন আপনি।” দরজার দিকে আঙুল তাক করে কথাখানা বলল ফুল।

কিন্তু উদ্যানের মাঝে বিশেষ ভাবাবেগ পরিলক্ষিত হলো না। উল্টো ফুলের তীক্ষ্ণ কথার প্রত্যুত্তরে নিজের শার্টের বোতামে হাত রাখল। ধীরেসুস্থে একটা দুটো করে বোতাম খুলতে দেখে ফুলের মুখ হা হয়ে গেল। কোটর থেকে চোখ বেরিয়ে আসার উপক্রম।

“ক… কি করছেন?” এটুকুতেই যেন ফুলের হৃৎস্পন্দনের গতি বেড়ে গেছে। হাত দিয়ে চোখে ঢেকে ফেলতে নিলে প্রতিরোধ করে উদ্যান। ফুলের হাত চেপে ধরে বিরক্ত ভরা চোখে তাকায়। ততক্ষণে শার্টের সবগুলো বোতাম খুলে ফেলেছে সে। লজ্জায় ফুলের মরিমরি অবস্থা, উফফ! এই ধরনের অনুভুতির জন্য নিজেকে ঘৃণা করে সে, ধিক্কার জানায়।
“আপনি এসব করে আমার ঘৃণার পরিমাণ বাড়িয়ে দিচ্ছেন। নিজেকে সংযত করুন নইলে আমৃত্যু ক্ষমা করবো না আপনাকে।” ঠোঁট নেড়ে বহু কষ্টে কথাগুলো উচ্চারণ করেছে ফুল। তার কথায় বিশেষ পাত্তা দেয়নি উদ্যান, উল্টো ঘুরে বসে একটানে শার্ট খুলে ফেলে। উদ্যানের পিঠ বরাবর চোখ যেতেই লজ্জার পরিবর্তে আৎকে ওঠে ফুল।
“আহহহ….” ফুলের শীৎকারে ‘চ’ সূচক শব্দ করে উদ্যান।

“বিশ্রী দেখাচ্ছে জানি, তুমি চাইলে মেডিসিন লাগিয়ে দিতে পারো।”

ইতোমধ্যেই ফুলের চোখ অশ্রুতে ভরে গেছে। ঠোঁট চেপে ক্ষণে ক্ষণে কেঁপে উঠছে। উদ্যানের পিঠের অবস্থা বিভৎস, কোথাও চওড়া, বেগুনি-নীল ফুলে ওঠা চোট, কিছু জায়গায় হলদে হয়ে আসা ক্ষতের ছোপ, মনে হচ্ছে একের পর এক আঘাত একই স্থানে পড়েছে।
সেই অংশটা এখনও ফুলে আছে, রক্ত জমে গাঢ় কালচে-বেগুনি রঙ নিয়েছে। ক্ষতগুলোর চারপাশের ছাল উঠে খসে গেছে, যেন দগদগে জ্বালা লুকিয়ে আছে চামড়ার নিচে। ফুল নিজের চোখে দেখার পরেও বিশ্বাস করতে পারে না যে মানুষটা এমন পিঠ নিয়েও নির্বিকার আছে। চোখ সরিয়ে নেয় ফুল। আর তাকিয়ে থাকা সম্ভব হচ্ছেনা। ফুলের স্থবিরতায় ছোট্ট শ্বাস ফেলে উদ্যান, ঘাড় ঘুরিয়ে পেছনে তাকাতেই মুখ আড়াল করে নেয় ফুল। আর যাই হোক নিজের দূর্বলতা দেখাতে এখনও নারাজ সে,
“ঠিক আছে, তুমি লাগিয়ে না দিলে চলে যাচ্ছি আমি।”

উদ্যান বেডের বাইরে পা রাখতেই, ফুল ধরা গলায় বলে ওঠে,
“বসুন এখানে, লাগিয়ে দিচ্ছি।”

ঠোঁটের কোণে রহস্যময় হাসি ফুটে ওঠে উদ্যানের। সেই হাসি অবশ্য ফুলের চোখে পড়েনি। সুইং বেডের পাশে রাখা মেডিক্যাল বক্সটা ফুলের সামনে রাখে উদ্যান। উদ্দেশ্যেহীন ভাবেই ফুলের নজর পড়ে উদ্যানের প্রশস্ত বুকে, পুরোপুরি ভাবে খেয়াল করার আগেই ঘুরে বসে উদ্যান। কাঁপা কাঁপা হাতে বক্সটা খুলতে নিলে উদ্যান বলে ওঠে,
“তোমাকে মেডিসিন লাগানোর অনুমতি দেওয়ার পেছনে কারণ একটাই, সেটা হলো, অ্যাপলোজি অ্যাকসেপ্ট করা। তুমি মুখ ফুটে ক্ষমা করে দিয়েছো বললে তবেই আমি তোমার হাতে মেডিসিন লাগাবো।”

উদ্যানের অযাচিত আবদারে ফুলের ভ্রু কুচকে গেল। তবুও হার মেনে নিয়ে ছোট্ট করে বলল, “ক্ষমা করে দিয়েছি।”

স্বস্তির শ্বাস ফেলল উদ্যান। হাতে মেডিসিন নিয়ে ক্ষতস্থানে লাগিয়ে দিতে শুরু করে ফুল, কৌতুহলী কণ্ঠে শুধায়,
“গতরাতে সারাকে দিয়ে মলম লাগান নি?”
“নাহ! ইচ্ছা করে নি।”

ঘায়ে মলম লাগাতে গিয়ে নিজেই শিউরে উঠছে ফুল। এই পর্যায়ে এসে নিজেকেও মনস্টার বলে মনে হচ্ছে। উদ্যানকে মূর্তির মতো বসে থাকতে দেখে সেদিন শরীরের সব শক্তি খাটিয়ে প্রহার করেছিল।

“তোমার কি শীত করছে? এভাবে কাঁপছো যে?” উদ্যানের প্রশ্নে চোখ মুছে নেয় ফুল। শুকনো ঢোক গিলে নিজেকে ধাতস্থ করে বলে,
“বলুন না সারা কে হয় আপনার।”
“এই বিষয়ে উত্তর পেতে তুমি যতটা না মরিয়া তার চেয়েও অধিক মরিয়া আমি; তোমার আগ্রহের পেছনের কারণ উদঘাটনে।”

ফুলের মন ভারী হয়ে এলো, কণ্ঠ খাদে নামিয়ে বলল,
“আপনার ফ্রেন্ড হয়ে থাকলে আমাকে বের করে দিলেন কেন?”

আচমকা পেছনে ঘুরে ফুলের হাত চেপে ধরে উদ্যান। শান্ত কণ্ঠে বলে,
“তোমার সব প্রশ্নের উত্তর দেবো। শুধু একবার বলো তুমি আমাকে ভালোবাসো।”

হাপাতে লাগল ফুল। হাত সরিয়ে বলল, “ভালোবাসি না।”

সামনে ফিরে তাকায় উদ্যান, উদাসীন গলায় বলে, “তাহলে আর কিছু জানতে চেয়ো না। জানার প্রয়োজন নেই তোমার।”

“মিথ্যা শোনার জন্য এতো ব্যাকুল কেন?”
“শুনে দেখতাম, তোমার মুখে মিথ্যা কেমন শোনায়।”
“মিথ্যা বলতে ভয় হয় আমার, আপনি সেই মিথ্যা শুনে সন্তুষ্ট হয়ে যদি সত্যি হিসেবে ধরে নেন।”

শব্দ করে হেসে ওঠে উদ্যান। সেই হাসি দেখার প্রচেষ্টায় ডানপাশে হাল্কা ঝুকে যায় ফুল। কিন্তু তার আগেই মিলিয়ে যায় উদ্যানের হাসি,
“মিথ্যা আঁকড়ে কেউ বাচতে পারে কি পেটাল? আমি নাহয় তোমার মিথ্যা ভালোবাসা আঁকড়ে মরে গেলাম। তোমার কি খুব বেশি অসুবিধা হয়ে যাবে?”

বাক্যশূন্য হয়ে পড়ে ফুল। প্রসঙ্গ পাল্টে বলে, “অন্তত একে অপরের জাতশত্রু হওয়ার পেছনের রহস্য টুকু খোলাসা করুন।”

“বললাম তো আগে ভালোবাসি বলো তারপর যা জানতে চাইবে তাই বলবো।”
“আমি মিথ্যা বলতে পারবো না।”

সময় নিলো উদ্যান, তারপর আচমকা ভারী গলায় আদেশ করল, “অ্যালেক্স, ডিম দা লাইটস টু টুয়েন্টি পারসেন্ট।”

লাইটের আলো ধিমে হয়ে যেতেই উদ্যান একটানে ফুলকে নিজের সামনে এনে বসায়। ফুল পারছেনা এখান থেকে পালিয়ে যেতে, ওর মুখটা হাতের আঁজলায় নিয়ে নেয় উদ্যান,
“তাহলে সত্যি টাই বলো শুনি। বছর খানেক আগে ‘Petal’ নামক আইডি থেকে আমার ইনস্টাগ্রামে তুমি মেসেজ দিয়ে উল্টো পাল্টা কথা বলতে কেন?”

গায়ে কাঁটা দিলো ফুলের, উদ্যানের হাত সরিয়ে দিয়ে মিনমিনিয়ে বলল, “আমি মোটেও উল্টো পাল্টা কিছুই বলিনি।”
“ওহ আচ্ছা…”

পকেট থেকে ফোন বের করে ইনস্টাগ্রাম খুলল উদ্যান।
কিছুক্ষণ স্ক্রল করে স্ক্রিনে চোখ রেখে পড়তে শুরু করল,
“‘আজকে একটা ইন্টারভিউয়ে আপনার দেখা পেলাম। আপনার নাম তেহজিব খানজাদা? হাই আমি Petal, জানি নামটা অদ্ভুত কিন্তু আপাতত এই নাম ছাড়া অন্য কোনো নিকনেম মাথায় আসছে না। আজ সারাটাদিন ড্রইং বইয়ের ভাঁজে রাখা শুকনো পেটাল গুলো ভাবনা চিন্তা ব্লক করে রেখেছে। আচ্ছা, কোনো নির্দিষ্ট ফুলের পাপড়ি কি আপনার পছন্দ? মনে করে দেখুন দেখি।’ পরেরদিন লিখেছো, ‘ইন্টারভিউয়ে দেখেছি আপনাকে কিন্তু সামনাসামনি দেখার ইচ্ছা আকাশছোঁয়া। আপনার হেয়ার স্টাইল পছন্দ হয়নি আমার। সামনে পেলে প্রথমে হেয়ার স্টাইল ঠিক করাবো।’ লাইক সিরিয়াসলি পেটাল!”

ফুল এদিক-ওদিক তাকিয়ে পালানোর পথ খুঁজছিল, কিন্তু উদ্যান ওর একহাত ধরে রেখেছে,
“এরপর একসপ্তাহ মেসেজ দাওনি, পরের সপ্তাহে লিখেছো, ‘মাথায় সমস্যা ওয়ালা লোকগুলো কি আপনার মতোই রসকষহীন আর অহংকারী হয়?’ আবার একসপ্তাহ চুপ থেকে বলেছো, ‘আজ আপনার পোস্ট দেখলাম আপনি ঘুরতে গিয়েছেন? একা একা ঘুরতে কেমন লাগে? রিসোর্টের পাশাপাশি নিজের থোবড়ার দু চারটা ছবি পোস্ট করে দিলে উপকৃত হতাম।’ এরপর প্রায় একমাস পর লিখেছো, ‘আপনি কি জানেন, কেন কিছু মানুষ মেসেজ সিন করে না?”

ফোনটা রেখে ফুলের আরেক হাতও ধরে ফেলে উদ্যান। চোখ খিচে বন্ধ করে রেখেছে ফুল, লজ্জায় গলা শুকিয়ে গেছে। উদ্যান নরম অথচ ধারালো স্বরে বলল,
“মেসেজগুলো আনসেন্ড করলে হয়তো বাঁচতে।
কিন্তু তুমি তো আইডিটাই ডিলিট করে দিলে। তাই সবকিছুই রয়ে গেছে আমার ইনবক্সে। এবার বলো, এসব উল্টো পাল্টা কথা বলে ফ্লার্ট করার কারণ কি ছিলো?”

লজ্জায় ফুলের ইচ্ছা করছে মাটির সাথে মিশে যেতে কিন্তু সেসবের মাঝে হঠাৎ একটা প্রশ্ন মাথাচাড়া দিয়ে উঠল,
“আপনি তো আমার মেসেজ সিন করেননি কখনও। তাহলে জানলেন কীভাবে যে এগুলো আমি পাঠিয়েছিলাম? আমার… ডায়েরি ধরেছেন আপনি?”

উদ্যান কাঁধ ঝাঁকিয়ে বলে,
“ডায়েরি? ওহ হ্যাঁ, সেই গোলাপি রঙা বোকা বোকা দেখতে ডায়েরি টার কথা বলছো? ডায়েরির অনেক গুলো পৃষ্ঠা ছেঁড়া ছিল, আমি শুধু ভাবছি কেন ছিঁড়েছিলে?”

উদ্যানের শেষের কথাটুকু পুরোপুরিভাবে উপেক্ষা করে ফুল। দাঁত খিচে বলে,
“একে তো আপনি অনুমতি ব্যাতিত আমার ডায়েরি ধরেছেন তার উপর আমার পছন্দের রঙকে অপমান করছেন?”
“অপমান কোথায় করলাম? তুমি যেমন; তোমার চয়েজ গুলোও তেমন হবে। সেটাই স্বাভাবিক।”
“এবার তো আপনি গোটা আমি টাকেই অপমান করলেন।”

ফুল জানেনা কেন, কিন্তু মনের কোনে অভিমান ভর করল, মুখ ঘুরিয়ে অন্যদিকে তাকালে, উদ্যান একদম হঠাৎ করে ফুলের কানের কাছে গিয়ে হিসহিসিয়ে বলে,
“শাড়িতে তোমাকে সুন্দর লাগছে, আই জাস্ট ওয়ান্ডার ডার্ক গ্রিন রঙের শাড়িতে তোমাকে কেমন দেখাবে।”

উদ্যানের ভারী কণ্ঠস্বর উপেক্ষা করে ফুল শুধায়,
“আপনার গ্রিন রঙ পছন্দ?”
“পছন্দ কিনা জানিনা, জাস্ট কম্ফোর্ট ফিল করি।”

ফুল সোজা হয়ে বসল।
“ঠিক আছে। আমি আপনার ‘কল্পনা’ অনুযায়ী গ্রিন শাড়ি পরব, যদি আমার একটা প্রশ্নের উত্তর দেন।”

পেছনের দিকে কিছুটা হেলে গেল উদ্যান। কাঁধ টানটান করে বলল,
“আগে যেসব প্রশ্ন করেছো সেসব বাদে যদি কোনো প্রশ্ন থাকে করো। আমি উত্তর দেওয়ার চেষ্টা করবো। আফটার অল, আই ওয়ান্ট টু সি ইউ ইন গ্রিন শাড়ি’স।”

ফুল ভাবনায় পড়ে গেল। কি জিজ্ঞেস করবে সে? আগে যেসব প্রশ্ন করেছে সেসব প্রশ্নের উত্তর সোজাসুজি দেবে না। ঠোঁটে আঙুল ঠেকিয়ে ভেবে যাচ্ছে ফুল, উদ্যান তো একধ্যানে তাকিয়ে আছে ফুলের ঠোঁটের দিকে, বিড়বিড় করে বলে,
“আই লাইক পেটালস… সফট, ফ্র্যাজাইল। একজ্যাক্টলি দ্য কাইন্ড অফ উইকনেস আই এনজয় ব্রেকিং।” মুহুর্তেই কিছু কথা মনে পড়ে উদ্যানের, বহু আগের কথা। উদ্যান কিছু বলার পূর্বেই ফুল প্রশ্ন ছোড়ে,
“আমি আপনার মায়ের ব্যপারে জানতে চাই। কোথায় আছে মামী এখন? তাকে রেখে মামা আবারও বিয়ে করেছিলেন কেন?”

নিমিষেই উদ্যানের মুখের আদল পরিবর্তন হয়ে যায়। হালকা আলোয় তার অভিব্যক্তি বোঝা গেল না। নির্জীব গলায় বলল,
“গত ২০ বছর ধরে খানজাদা নিবাসের পেছনের অংশে, বাকিদের সাথে একান্তে সময় কাটাচ্ছেন তিনি। স্ত্রীর প্রয়োজনীয়তা বোধ করেই আবারও বিয়ে করেছিলেন জনাব তাশরিফ খানজাদা।”

শুকনো ঢোক গিলল ফুল। খানজাদা নিবাসের পেছনে পারিবারিক কবরস্থান অবস্থিত। যার মানে উদ্যানের মা বিশ বছর পূর্বেই গত হয়েছেন। ফুল ক্ষীণ গলায় বলল,
“সেই জন্যই তার সম্পর্কে কোনো ধারণা নেই আমার আর আবেশ ভাইয়ের। মা আর মামীও কিছুই বলেনি আমাদেরকে। কেন বলেনি সেটাও পরিষ্কার, সেই সাথে এও পরিষ্কার কেন বাইরের মানুষদের সাথে কথাবার্তা বলায় সীমাবদ্ধতা ছিলো আমার আর আবেশ ভাইয়ের। মামী বলেছিল কেউ যদি আমাদেরকে আজেবাজে কিছু বোঝাতে আসে আমরা যেন না শুনি।”

একদৃষ্টে ফুলের দিকে তাকিয়ে আছে উদ্যান। মেয়েটা যদি জানতো ওর না জানার পরিধি আরও সবিস্তর।
“আপনার মা মারা গিয়েছিল কিভাবে?”

কৌশলে ফুলের প্রশ্ন এড়িয়ে গেল উদ্যান। গায়ে শার্ট জড়িয়ে অন্যদিকে তাকাল, “অ্যালেক্স, টার্ন দা লাইট ব্যাক অন।”

বেড থেকে নেমে দাঁড়ায় উদ্যান, শার্টের হাতা গোটাতে গোটাতে বলল, “যাও। কথামতো গ্রিন শাড়ি পরে এসো।”

ফুল ভ্রু কুঁচকায়,
“আপনি উত্তর দিলেন না তো।”
“তার আগে বলো আমার ড্রইং বই তুমি পেয়েছিলে কোথায়?”

এমন প্রশ্ন শোনার জন্য মোটেও প্রস্তুত ছিলো না ফুল।
“স্টোর রুমে… পেয়েছিলাম। এত ছোটো ব্যাপারও মনে আছে আপনার?”

“না থাকার কারণ নেই। কিশোর বয়সে বিভিন্ন ফ্লাওয়ার পেটাল’স সংগ্রহ করার বোকা অভ্যাস ছিলো আমার। ড্রইং বইয়ের পাতার ভাঁজেও পেটাল’স কালেক্ট করা ছিলো আই থিংক। আর সেই পেটাল’স গুলো আমি কবরস্থান থেকে কালেক্ট করেছিলাম।”
“কি ফুলের পাপড়ি ছিলো সেগুলো?”
ফুলের প্রশ্নে ছোটো ছোটো চোখে তাকায় উদ্যান। আমতা-আমতা করে ফুল বলে,
“আসলে অনেক বছর আগে রেখেছিলেন তো আমি ঠিক চিনে উঠতে পারিনি সেগুলো কোন ফুলের পাপড়ি।”

উদ্যান রুম থেকে বেরিয়ে যাওয়ার জন্য পা বাড়ায়। দরজা পর্যন্ত গিয়ে পিছু ফিরে বলে,
“প্রিমরোজ।”
“হ্যাঁ?” অবচেতন মনেই সাড়া দেয় ফুল।
“বলেছি প্রিমরোজের পেটাল’স ছিল। সেদিন আমি দাদাভাইকে নিয়ে সেগুলো কালেক্ট করতে গিয়েছিলাম; তোমার মা লুকিয়ে লুকিয়ে দেখছিলেন। তুমি তার কোলে ছিলে।”
“নানাভাই জীবিত ছিলেন তখন?”
“হু ছিলেন।”

ফুল নিশ্চুপ হয়ে গেল। উদ্যান বিড়বিড় করে বলল,
“তোমার মায়ের ধারণা ছিল, পছন্দের ফুলের নাম রেখে দিলেই ওনার মেয়েকে পছন্দ করবো আমি। কিন্তু সে জানতেন না ওনার মেয়ের নাম রাখার পর পছন্দের ফুলটাকেই অপছন্দ করতে শুরু করেছিলাম আমি।”

“কিছু বললেন?”

দরজার সাথে ঠেস দিয়ে দাঁড়ায় উদ্যান, “বলেছি, তোমার প্রশ্নের উত্তরের বিনিময়ে গ্রিন শাড়ি কি নিজে থেকে পড়ে আসবে নাকি আমি হেল্প করবো?”

ধীর পায়ে এগিয়ে গিয়ে উদ্যানের সামনে দাঁড়ায় ফুল। ঠোঁট সামান্য বাঁকিয়ে বলে,
“একটা প্রশ্নেরও ঠিকঠাক উত্তর দেননি। তাই গ্রিন শাড়ি পড়বো না আমি।”

দীর্ঘশ্বাস ফেলল উদ্যান, কোনো পূর্বাভাস ছাড়াই সে ধীরে হাত বাড়িয়ে ফুলের চুলে গোঁজা ক্লাচারটা খুলে নিল। ঠিক পরের মুহূর্তেই, ফুলের ঘন, মসৃণ চুল পিঠ বেয়ে নেমে এলো। অপ্রস্তুতে ফুলের কাঁধ হালকা কেঁপে উঠল। হতচকিত ফুল চোখ বড় বড় করে তাকিয়ে রইল উদ্যানের দিকে। ওকে খুটিয়ে খুটিয়ে পরখ করছে উদ্যান, পা হতে মাথা পর্যন্ত নজর বুলিয়ে ফুলের চোখে চোখ রেখে বলে,
“না পড়াই ভালো আই থিংক, এই শাড়িতেই মাথা খারাপ হয়ে যাচ্ছে আমার। গ্রিন শাড়ি পড়লে নিজেকে সামলাতে পারবো না। তখন আবার নিজেকে প্রোটেক্ট করতে না পেরে সুই’সাইড অ্যাটেম্পড করবে তুমি।”

তাড়াহুড়ো করে চুলগুলো হাতখোপা করে নেয় ফুল। “যাক আমি ম’রে গেলে আপনার যাবে আসবে তাহলে।”

উদ্যানের দৃষ্টি গাঢ় হয়ে গেল। তার চোখ ধীরে ধীরে ঘুরে বেড়াতে লাগল ফুলের ফর্সা ঘাড় আর গলার কোমল ভাঁজে।
“আফটার অল ভালোবাসি তোমাকে। মৃ’ত্যু কিভাবে কামনা করি?”

আবার সেই ‘ভালোবাসার’ কথাটা। বুক চিরে দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এলো ফুলের,
“ভালোবাসলে প্রমাণ করে দিন, বলুন সারা কে হয় আপনার।”

ঠোঁটের কোণে হাসির রেখা ফুটে ওঠে উদ্যানের। নির্লজ্জের মতো সেদিকে তাকিয়ে আছে ফুল। কিন্তু সেই হাসি পরিনত হবার পূর্বেই মিলিয়ে যায়,
“ভালোবাসা কোনো হাইপোথিসিস নয় যে প্রমাণ করতে হবে। যে সত্যিকার ভালোবাসে, সে প্রমাণ নয়; অনুভব করায়।”

উদ্যানের কথায় অবাক হয়ে যায় ফুল। ব্যাটা তো ভারী ধড়িবাজ।
“এভাবে সবকিছু এড়িয়ে গেলে আপনার ভালোবাসা কিভাবে অনুভব করবো আমি?”
“তুমিও তো এড়াচ্ছো,” শান্ত স্বরে বলল উদ্যান। “স্বীকার করো, সারাকে দেখে তুমি জেলাস হয়েছিলে।”

চমকে গেল ফুল। “জেলাস!” হাত দিয়ে মুখ ঢেকে মিছেমিছি হাসছে ফুল, ঠোঁট প্রসারিত করে উদ্যান বলল,
“হি হি করো না, হাসি পাচ্ছে না তোমার।”

হাসির সত্যতা প্রমাণ করতে উদ্যানের বাহুতে হাত রেখে হাসতে লাগল ফুল। উদ্যান একবার চোখ নামিয়ে হাতের দিকে তাকিয়ে আবারও ফুলের দিকে তাকায়,
“আমার সত্যিই হাসি পাচ্ছে, আপনার জাস্ট ফ্রেন্ডকে দেখে আমি কেন জেলাস হবো?”

“তুমি বিশ্বাস করে নিয়েছো যে সারা আমার ফ্রেন্ড? কেউ একজন বলেছিল একবার মিথ্যা কথা বলে ধরা খেলে সে আর তার কোনো কথাই বিশ্বাস করেনা।”

ফুলের হাসি থেমে গেল, “মানে সারা শুধু ‘ফ্রেন্ড’ নয়?”

“সে ফ্রেন্ডই। তবে তুমি এত সহজে বিশ্বাস করবে ভাবিনি।”
“মাঝেমধ্যে নিজের মেন্টাল হেলথের কথা চিন্তা করে কিছু কিছু বিষয় ব্লাইন্ডলি বিলিভ করতে হয়।”
“আহা, এতো জেলাস তুমি?”
“আমি জেলাস নই।”
“তাহলে আবারও আকসারাকে আসতে বলি?”

ফুলের চোখ বিস্ময়ে বড় হয়ে যায়। তার চাহনি দেখে হাসি পায় উদ্যানের, “ভাবছি আগামী সাত মাস ওর সাথেই থাকবো। ঠিক যেভাবে তুমি আবেশের সাথে ছিলে। তুমি যেহেতু জেলাস নও সেহেতু তোমার কোনো সমস্যা হবে না আশাকরি।”

ফুলের গলা শুকিয়ে আসে। অবিশ্বাসী সুরে বলে,
“মজা করছেন?”

“একদম না আমি সিরিয়াস। সকাল আটটায় ওর ফ্লাইট এখনও বাংলাদেশেই আছে।” ফোন বের করে হাতে নিল উদ্যান। “আমি বরং কল করি।”

মাথা চক্কর দিয়ে ওঠে ফুলের। ভয়, রাগ, ঈর্ষা, লজ্জা সবকিছুর মিশেলে ভয়াবহ এক অনুভূতি। হাত বাড়িয়ে ধরে ফেলল উদ্যানের ফোন,
“না! না, কল করবেন না। যেখান থেকে এসেছে; সেখানেই ফিরে যাক।”

ফোন নামিয়ে ফুলের হাত চেপে ধরে উদ্যান। নিজের কাছে টেনে এনে আবারও ফুলের চুল খুলে দেয়,
“জাস্ট, আই লাইক ইওর সেক্সি হেয়ার। আদার ওয়াইস সব চুল কেঁটে দিতাম।”

ফুলের নিঃশ্বাস আটকে আসে।
“আপনি স্বীকার করলেন… আমার চুল আপনি কেটেছেন?”
“হ্যাঁ করলাম।”
“তাহলে কেন কেটেছেন সেটাও স্বীকার করুন। সেই সাথে এও বলুন আমার খোঁজ আরও আগে পাওয়ার পরেও কেন সময় নষ্ট করলেন।”

ফুল আর উদ্যানের মাঝে নামেমাত্র দুরুত্ব। কথা বলতে বলতে ফুল বুঝতেই পারে না কতটা কাছে দাঁড়িয়ে আছে উদ্যান। আচানক, দুহাতে ফুলের গালজোড়া আঁকড়ে ধরে উদ্যান। তার চোখ থেমে যায় ফুলের নিচের ঠোঁটে থাকা ছোট্ট কালো তিলে। ঘোরলাগা কণ্ঠে বলে,
“কিয়েরো উন বেসো।”

ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেল ফুল, মুখ ফসকে গোঙানির রূপে বেরিয়ে এল,
“এ্যাঁ?”

ঘোর কাটে উদ্যানের। দৃষ্টি সরিয়ে নীচু গলায় বলে,
“শাড়ি পড়ে এসো।”
“বেসো’ না কি যেন বললেন, মানে কি?”
“শাড়ি পড়ে এলে বাংলায় বলবো।”
“দরকার নেই, আমার প্রশ্নের উত্তর দিন।”

বিরক্ত হলো উদ্যান। “খালি প্রশ্ন প্রশ্ন আর প্রশ্ন। তোমার চেয়ে আকসারা ভালো, চুপচাপ আমার কথা শোনে। কথা বলতেও জানেনা, বিরক্তও করেনা।”

ফুলকে ছেড়ে দিয়ে হনহনিয়ে রুম থেকে বেরিয়ে যায় উদ্যান। পেছন থেকে ফুল ডেকে ওঠে,
“কোথায় যাচ্ছেন? একটা উত্তর তো ঠিকঠাক ভাবে দিয়ে যান… নাহ ‘যান’ বলা যাবে না। শুনুন না।”

ঘুরে দাঁড়ায় উদ্যান, কাঠখোট্টা গলায় বলে, “শাড়ি পড়ে আমার রুমে এসো, সব কথা শুনবো। আমার থেকে কিছু আদায় করতে হলে আমাকেও কিছু দিতে হয়, দ্যাটস মাই স্ট্রাটেজি।”

উদ্যান চলে গেল, বেকুবের মতো দাঁড়িয়ে আছে ফুল। বিরক্তি সূচক শব্দ উচ্চারণ করে বেডের দিকে এগোতেই ঔষধের উপর চোখ পড়ে,
“দেখেছো, শুধু মলম লাগালেই হবে? ঔষধও তো খেতে হবে।”

ঔষধের পাতা হাতে নিয়ে উদ্যানের রুমের দিকে পা বাড়াতেই উদ্যানের বলা কথা মনে পড়ে যায়,
‘শাড়ি পড়ে আমার রুমে এসো।’

কি করবে ভেবে পাচ্ছে না ফুল। যেনতেন উপায়ে রহস্যের পর্দা সরাতেই হবে। সবচেয়ে সহজ উপায় ছিল ‘ভালোবাসি’ বলে ফেলা। কিন্তু সেটা বলতে পারবে না। ধীরপায়ে ওয়ার্ড্রোবের সামনে গিয়ে থামে ফুল। শুকনো ঢোক গিলে, একখানা ডিপ ফরেস্ট গ্রিন রঙের অর্গানজা শাড়ি আর বেবি পিঙ্ক রঙের ব্লাউজ নিয়ে ওয়াশরুমে চলে যায়।

এদিকে রুমে আসতেই উদ্যানের ফোন বেজে ওঠে। রাত এখন দুটো ছুইছুই। ফোনের স্ক্রিনে সোহম লেখা দেখে সঙ্গে সঙ্গেই রিসিভ করে কানের কাছে নেয় উদ্যান, অপরপাশ থেকে কিছু শুনে মুহুর্তেই চোয়াল শক্ত হয়ে গেল। গম্ভীর গলায় বলল,
“আই’ম কামিং…”

ফোন কেটে দিয়ে কি হোল্ডার থেকে চাবি নিয়ে ধুপধাপ পা ফেলে বেরিয়ে যায় উদ্যান।

শাড়ি পড়ে ড্রেসিং টেবিলের সামনে দাঁড়িয়ে আছে ফুল,
“হুহ আমিও এবার দেখবো, উত্তর না দিয়ে কোথায় যান। একবার সব সত্যি জানি তারপর ভেবে চিন্তে সিদ্ধান্ত নেবো। আগে দেখতে হবে আপনি সত্যিই ভালোবাসেন কিনা।”

একজোড়া গ্রিন রঙের এয়াররিং পড়ে নেয় ফুল, সেই রঙের সাথে মিলিয়ে হাতে জড়িয়ে নেয় একমুঠ কাঁচের চুড়ি। মসৃণ, রেশমি সরু কালো চুলগুলো হাঁটু অবধি ছড়িয়ে আছে। ঠোঁটে লিপ বাম লাগিয়ে ওষ্ঠ যুগল একত্র করে নিজের উদ্দেশ্যে চুমু ছোড়ে ফুল।
“উদ্যান আজকে উন্মাদ হবেই হবে… কিন্তু আমার লক্ষ্য রহস্য উন্মোচন করা। নিজেকে প্রোটেক্ট করাও জরুরি। সেইবার আমি বোকামি করেছিলাম; কাঁচের টুকরোটা চার্লসের পেটে না ঢুকিয়ে।”

নিজের ভাবনায় নিজেই শিউরে ওঠে ফুল। উদ্যানের পেটে কাঁচ ঢোকানোর গাটস্ নেই তার। আবারও হয়তো নিজের পেটেই ঢুকাতে হবে। সেজেগুজে উদ্যানের রুমে এসে আশাহত হয় ফুল। কিং সাইজ খাটের উপর তান ঘুমিয়ে আছে। পুরো রুমের কোথাও উদ্যানের ছায়া পর্যন্ত নেই। অদ্ভুত এক শূন্যতা ঘিরে আছে চারপাশে।
“কোথায় গেল?”

চলবে,,,

Share On:



CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
Related Posts
 


0 Responses

Leave a Reply