অবাধ্য_হৃৎস্পন্দন (৩৯)
সোফিয়া_সাফা
ফুল গভীর শ্বাস টেনে টেবিলের ওপর কনুই রাখল। উদ্যানও একইভাবে হাত রাখল, তারপর নির্লিপ্ত ভঙ্গিতে ফুলের হাত চেপে ধরল। ফুলের শরীর মৃদু ছন্দে কেঁপে উঠল।
সে মেরুদণ্ড সোজা করে বসল, ঢোক গিলে বলল, “আপনি আমার হাত টেবিলে ঠেকানোর চেষ্টা করতে পারবেন, কিন্তু অসহনীয় চাপ প্রয়োগ করতে পারবেন না। আগেই বলে রাখলাম।”
ফুলের আশঙ্কাটা বুঝে উদ্যান আশ্বস্ত করে বলল, “ডোন্ট ওয়ারি। তোমার হাত ভেঙে ফেলার কোনো ইনটেনশন নেই আমার। যতটা সম্ভব জেন্টালই থাকব। তুমি শুধু প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার প্রস্তুতি নাও।”
কথায় কথায় ফুল বাম হাত দিয়ে উদ্যানের হাত ঠেলে দিতে চাইল। কিন্তু উদ্যান তাকে সেই সময়টুকুও দিল না। চোখের পলকেই ফুলের হাত হুমড়ি খেয়ে টেবিলে ঠেকে গেল। সঙ্গে সঙ্গে ফুল চোখ বন্ধ করে নিলো।
উদ্যান তার হাত ছেড়ে দিয়ে হাঁটুতে হাত রাখল, টেবিলের ওপর সামান্য ঝুঁকে পড়ল। ফুল তখনো নিজের হেরে যাওয়াটা মেনে নিতে পারছিল না।
ঠিক তখনই উদ্যানের তুখোড় কণ্ঠ কানে এলো, “আর ইউ রেডি, পেটাল?”
ফুল তড়াক করে চোখ মেলল। ভ্রু যুগল তীরের ফলার ন্যায় ধারালো করে উদ্যান ভরাট কণ্ঠে বলল, “আমার প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার জন্য রেডি কিনা জিজ্ঞেস করলাম।”
ফুল বুঝতে পারল আজ সরাসরি এড়িয়ে যাওয়ার পথ নেই; কৌশলে উদ্যানের মোকাবিলা করতে হবে। সে ঠোঁটের কোণে সামান্য বাঁক এনে বলল, “আগে জেনে নিই, প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে চুপ থাকার শাস্তি কীভাবে দিতে চাইছেন? লাঠি দিয়ে ঠাসঠাস আঘাত করবেন নাকি বিষাক্ত কথা দ্বারা দংশন করে নিজেকে সন্তুষ্ট করবেন?”
উদ্যানের মুখে লেগে থাকা প্রশান্তিটুকু নিমিষেই মিলিয়ে গেল। তার বদলে ফুটে উঠল এক দুর্বোধ্য অভিব্যক্তি। চিবিয়ে চিবিয়ে বলল, “আমি জানি তুমি আমার প্রশ্নের উত্তর দেবেনা। উত্তর না পেয়ে আমার মেজাজ করলার চেয়েও তেতো হয়ে যাবে। তাই চুপ থাকার শাস্তি স্বরুপ তুমি একগ্লাস করলার জুস খেয়ে নিলেই হবে। হাতাহাতি কিংবা তর্কাতর্কি করার তিল পরিমানেরও ইচ্ছা নেই আমার। তার উপর তোমার গায়ে হাত তুলবো ভাবলে কী করে?”
ফুল দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, “বাদ দিন। যা প্রশ্ন করার, করে ফেলুন।”
উদ্যানের চোখের মণি স্থির হয়ে গেল ফুলের ওপর। আগ্রহী কণ্ঠে শুধাল, “তুমি ডায়েরির কিছু পৃষ্ঠা ছিঁড়ে ফেলেছিলে কেন?”
ফুল চাইলেই মিথ্যা কিছু বানিয়ে বলে দিতে পারতো কিন্তু না সেও কর্মফলে বিশ্বাস করে। সে মনে করে এই খেলায় বসা মানে সত্য বলার প্রতিশ্রুতি দেওয়া। সেখানে মিথ্যা বললে তার পরিণাম ভোগ করতেই হবে। সে আর কথা বাড়াল না।
হাত বাড়িয়ে গ্লাসে করলার জুস ঢালল। তারপর বাম হাতে নাক চেপে ধরে পুরোটা ঢকঢক করে গিলে ফেলল।
গ্লাস নামাতেই তেতো স্বাদটা জিভের গোড়া থেকে এক ঝটকায় পুরো মুখে ছড়িয়ে পড়ল। এক মুহূর্তের জন্য তার নেত্রপল্লব শক্ত হয়ে বন্ধ হয়ে গেল। ভ্রু দুটো অজান্তেই কপালের দিকে সেঁটে এল। মুখ না বাঁকানোর আপ্রাণ চেষ্টা করল সে।
তবু চোয়ালের পেশিগুলো টানটান হয়ে উঠল। চোখ খুলতেই দেখা গেল, সেখানে ক্ষণিকের জন্য জল জমেছে।
সোহমসহ বাকিরা যেন জুসের তিক্ততা না খেয়েও অনুমান করতে পারল। অনিলা হাহুতাশ করে বলল, “ধ্যাৎ, করলার জুস আনার আইডিয়া টা একদম ফালতু ছিল।”
উদ্যান হালকা হাসল, “এই সামান্য প্রশ্নের উত্তর দিতে পারলে না, পেটাল?”
ফুল হাতের পিঠে ঠোঁট মুছল। মাথা কিঞ্চিৎ তুলে উদ্যানের দিকে তাকাল। “আপনিই বা কেন এই সামান্য প্রশ্নের উত্তর জানতে চাইলেন?”
উদ্যান মাথা নেড়ে বলল, “তুমি উত্তর দেবে না জানতাম তাই সামান্য প্রশ্নই করেছি।”
উদ্যান আবার টেবিলের ওপর হাত রাখল। এই দফায় সে ফুলকে একটু সময় দিল।
ফুলও পুরোদমে চেষ্টা করল তাকে হারানোর, কাঁধ শক্ত করল, কবজি স্থির রাখল, শরীরের সমস্ত জোর ঢেলে দিল। তবু পারল না। উদ্যান এবার প্রশ্ন ছুড়ল, “সেদিন আকসারাকে দেখে রিএক্ট করেছিলে কেন?”
ফুলের শরীর কেঁপে উঠল। সে প্রশ্নটা এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টায় নাকের নিচে আঙুল ঘষল। তারপর নিরুত্তর থেকে আরেকগ্লাস করলার জুস খেয়ে নিল। খেলা আবার শুরু হলো।
এবার ফুল মরিয়া হয়ে উঠল। জেতার উদ্দেশ্যে সে অন্য হাত দিয়ে উদ্যানের হাতে সুড়সুড়ি দিল, চিমটি কাটল। কিন্তু তাতেও কোনো লাভ হলো না। উদ্যান নির্বিকারভাবে তাকে পরাজিত করল। বিদ্রুপাত্মক কণ্ঠে বলল, “নাইস ট্রায়, পেটাল।”
পরপর হেরে গিয়ে ফুলের কান্না পাচ্ছে। নিজেকে অনড় দেখানোর চেষ্টায় সে কান্না গিলে ফেলছে, যার ফলে কণ্ঠরোধ হয়ে আসছে। মুখ ঘুরিয়ে সে চোখ মুছে নিল।
সোহমের খারাপ লাগল, “তোর অনির কাছ থেকে কিছু শেখা উচিত তেহ।”
উদ্যান এমন ভান করল যেন সে সোহমের কথা শুনতেই পায়নি। সোহমের কথায় অনি ফোড়ন কেটে বলল, “হ্যাঁ, আমি বউকে খুশি করার জন্য ইচ্ছা করেই হেরে গিয়েছিলাম।”
অনিলা মুখ বাকিয়ে কথাটা উড়িয়ে দিল। তাদের হস্তক্ষেপে ফুলের ঠোঁট ভেঙে গোঙানির শব্দ নির্গত হলো। সে মুখ চেপে ধরে দুহাতে চোখ মুছে নিল। অনি সরাসরি না বললেও, আকারে ইঙ্গিতে যে তাকে ইচ্ছা করে হেরে যেতে বলেছে তা বুঝতে পেরেছে উদ্যান। কিন্তু সে এমন কিছু করবে না অন্যদিকে তাকিয়ে থাকায় ফুলের অভিব্যক্ত নজরে এলো না ঠিকই কিন্তু মেয়েটার মন খারাপ কোনো একভাবে পাথর মানবটা টের পেল।
সে পায়ের উপর পা তুলে আয়েসি ভঙ্গিতে বসল। ধারালো কণ্ঠে বলল, “প্রকৃত জয়ের আনন্দ কখনোই বিপরীত পক্ষের ইচ্ছাকৃত হেরে যাওয়ার মাধ্যমে পাওয়া যায় না। বরং বিপরীত পক্ষের কাছ থেকে জয় ছিনিয়ে আনলেই আসল জয় অর্জিত হয়।” এক মুহূর্ত থেমে যোগ করল, “আমিও চাই না তোমাকে এই উৎকট স্বাদের জুস খাওয়াতে। তাই নেক্সট প্রশ্নের উত্তর দিয়ে ফেলো।”
ফুল চোখ তুলে উদ্যানের পানে দৃষ্টি নিক্ষেপ করল। উদ্যান প্রশ্ন করল, “তোমাকে ‘ভালোবাসি’ শব্দটা উচ্চারণ করতে বললে তুমি পালিয়ে যাও কেন?”
ফুল কোনো উত্তর দিল না, কম্পিত হাতে আবারও জুস গিলে ফেলল। এইপর্যায়ে উদ্যানের মুখাবয়ব কঠিন হয়ে এলো। কণ্ঠে আর উষ্ণতা রইল না, “এত ছোট প্রশ্নের উত্তর দিতেও তোমার এত অনীহা কেন? কিসের এত ভয় তোমার? কী লুকাচ্ছো আমার কাছ থেকে? নাকি এই তেতো স্বাদের প্রতি অ্যাডিক্টেড হয়ে পড়েছো?”
ফুলের ভেজা চোখ থেকে ঝরঝরিয়ে দুফোঁটা পানি ভূপাতিত হলো। সেই পানি কষ্টের কিংবা অভিযোগের ছিল না, ছিল কেবল তিক্ততার প্রতিক্রিয়া মাত্র। উদ্যান নিজেকে সংযত করে আবারও খেলার জন্য হাত বাড়াল।
সোহম সুযোগ পেয়ে বলল, “অনেক হয়েছে তেহ, থাম এবার। এতো করলার জুস খেলে ওর পেটব্যাথা করবে। বমিও হতে পারে।”
উদ্যান ভারী কণ্ঠে বলল, “প্রশ্নের উত্তর না পেয়ে আজ আমি থামব না। ও নিজের ভালো চাইলে নেক্সট প্রশ্নের উত্তর দিক। নইলে সবকিছু ছাপিয়ে আমাকে হারিয়ে দিতে বল।”
ফুল নাক টেনে টেবিলে কনুই রাখল। উদ্যানের হাতের মুখোমুখি নিজের হাতটা তার কাছে নিতান্তই বাচ্চা মনে হচ্ছে। উদ্যান নিজ তাগিদে ফুলের আঙুলের ফাঁকে আঙুল গলিয়ে হাতের সঙ্গে হাত মিশিয়ে নিয়ে হাতের মাঝে লেগে থাকা নমনীয়তা আর শীতলতা আস্বাদন করতে লাগল। এবার আর তাড়াহুড়ো করল না সে। ফুল কোনো প্রশ্নেরই উত্তর দেবেনা এই ব্যাপারে সে শতভাগ নিশ্চিত। তার চেয়ে ভালো, সে তার আত্মাকেই তুষ্ট করুক।
এই স্থিরতাটুকু কাজে লাগাল ফুল। কাঁধ সামান্য নামিয়ে আনল, পিঠ সোজা রাখল, শরীরের ভার কনুইয়ের ওপর কেন্দ্রীভূত করল। উদ্যান ভ্রুক্ষেপহীন হয়ে বসে রইল। ফুল কিয়ৎক্ষণ উদ্যানের দিকে দৃষ্টি নিবদ্ধ রেখে নিচের ঠোঁটে দাঁত চেপে ধরল।
উদ্যানের সম্পূর্ণ মনোযোগ হাতের ওপর আটকে আছে। ফুল মনে মনে ফন্দি এঁটে ফেলল, কিন্তু সেই পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে উদ্যানের মনোযোগ সরাতে হবে। ভাবনার মাঝেই তার মুখ ফসকে বেরিয়ে এল, “উদ্যান…”
মুহূর্তেই উদ্যান তার চোখে চোখ রাখল। সেই দৃষ্টির ভার সইতে না পেরে ফুল হড়বড়িয়ে গেল। বুঝতে পারল ‘উদ্যান’ ডাকটা কোনো একভাবে দানবটার চিন্তাধারা অবিন্যস্ত করে ফেলেছে। এ যেন মেঘ না চাইতেই বৃষ্টি।
ফুল নিজের আকর্ষণীয় অধরের রেখা কিঞ্চিৎ প্রসারিত করে চোখ টিপে দিল। ওই সামান্য ইঙ্গিতেই উদ্যানের চাহনিতে দ্বিগুণ প্রখরতা জ্বলে উঠল। চোখের গভীরে জমে থাকা সংযম চুপিসারে ভাঙতে শুরু করল। ফুল এবার নিজের শেষ চাল চালল। ওষ্ঠদ্বয় একত্র করে আলতো চুমু ছুড়ে দিল উদ্যানের মুখ বরাবর।
ঠিক সেই ক্ষণেই উদ্যানের ভেতরের সমস্ত নিয়ন্ত্রণ যেন ছিন্নভিন্ন হয়ে গেল। বুকের গভীরে জমে থাকা অস্থিরতা দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়ল শরীর জুড়ে। শ্বাস ভারী হয়ে এলো, অজান্তেই মুঠো শক্ত হয়ে উঠল। দৃষ্টিটা আর নিছক তাকিয়ে থাকার মধ্যে সীমাবদ্ধ রইল না; সেখানে জমে উঠল দমবন্ধ করা ক্ষুধা, অসহিষ্ণু টান আর নিজেকে সামলানোর ব্যর্থ চেষ্টা।
ফুল বুঝতে পারল সে আগুনে ঘি ঢেলে দিয়েছে। এখন সেই আগুন তাকে ঘিরে ফেলার আগেই পিছু হটতে হবে।
উদ্যানকে দিশেহারা করে দিয়ে ফুল দুহাতে তাকে প্রতিহত করার চেষ্টায় দাঁড়িয়ে গেল। সর্বশক্তি প্রয়োগ করে উদ্যানের অসার হয়ে আসা হাতটা টেবিলে ঠেকানোর পূর্বেই দানবটা প্রতিরোধ গড়ে তুলল।
হিসহিসিয়ে আওড়াল, “ছলনা করতে ভালোই জানো দেখছি। ইউ টিজিং গার্ল, খেলা শেষ হোক তারপর দেখাচ্ছি মজা।”
ফুল বুঝতে পারল এটাই তার শেষ সুযোগ। জিততে তাকে হবেই। চোখ বন্ধ করে সে তড়িৎ গতিতে উদ্যানের আঙুলের গাঁটে ঠোঁট ছুইয়ে দিল সে। হাতে ব্যান্ডেজ প্যাঁচানো থাকলেও আঙুলগুলো উন্মুক্তই ছিল। ফুলের ঠোঁটের নরম স্পর্শে উদ্যানের হাত তৎক্ষনাৎ বোধশক্তি হারাল।
জেতার নেশায় ফুল বাকিদের উপস্থিতির কথাও ভুলে গিয়েছিল। উদ্যানের আর শেষ রক্ষা হলো না। অন্তিম মুহূর্তে জয় ছিনিয়ে নিল ফুলই। উদ্যানের সঙ্গে সঙ্গে আশপাশের সবাই বিস্ময়ে তটস্থ হয়ে গেল।
লুহান চোখ কচলে বিড়বিড় করল, “তেহ সত্যি সত্যিই হেরে গেছে? আমরা কি এইমাত্র ওর হেরে যাওয়ার সাক্ষী হলাম?”
জয়ের উচ্ছ্বাসে ফুল উদ্যানের হাত ছেড়ে দিয়ে লাফিয়ে উঠল। হাততালি দিয়ে চেঁচিয়ে উঠল, “হে হে! আমি জিতে গেছি। অহংকারী দানবটাকে হারিয়ে দিয়েছি!”
খুশির চোটে সে লাফাতে লাফাতে চারদিকে ঘুরতে লাগল। সোহম হেসে বলল, “ব্যাঙের মতো লাফিয়ে শক্তি অপচয় করোনা ওয়েস্টফুল। তার চেয়ে এই সুযোগে তেহকে একটা ঝাক্কাস প্রশ্ন করে ফেলো।”
ফুল দমে গিয়ে উদর চেপে ধরল। ঘনঘন শ্বাস ফেলতে ফেলতে ঘুরে এসে দাঁড়াল উদ্যানের সামনে। উদ্যান তখন নিজের মধ্যেই ছিল না যেন। হাত মেলে ধরে ড্যাবড্যাব করে চেয়ে ছিল। এই হার মেনে নেওয়ার মতো নয়। মেলো উদ্যানের পক্ষ নিয়ে বলল, “ফুল চিটিং করে জিতেছে। তাই তেহ ওর প্রশ্নের উত্তর দেবেনা।”
ফুলের কপাল কুঁচকে এল। তিরিক্ষি স্বরে বলল, “শুনুন ম্যাম, এভরিথিং ইজ ফেয়ার ইন লাভ অ্যান্ড ওয়ার। আমি চিটিং করিনি, শক্তির বিপরীতে বুদ্ধি খাটিয়েছি।”
মেলো কথা বাড়াতে চাইলে লুহান চুপ করিয়ে দেয়। “ফুল জিতেছে। কীভাবে জিতেছে সেটা ফ্যাক্ট নয়।”
ফুল এবার স্বাভাবিক গলায় শুধাল, “আপনি আমার প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার জন্য প্রস্তুত তো মাস্টার?”
উদ্যান হাতের ওপর দৃষ্টি স্থির রেখেই বলল, “এটাই কি তোমার প্রশ্ন, মিস্ট্রেসা?”
মুখ টানটান করে ফুল বলল, “একদমই না, এটা সেই প্রশ্ন নয়। আমি শুধু নিশ্চিত হতে চেয়েছি।”
উদ্যান প্রায় ফিসফিসিয়ে বলল, “তেহজিব কখনো অপ্রস্তুত থাকেনা, মিস্ট্রেসা। শুধুমাত্র তোমার সংস্পর্শে এলেই একটু বেখেয়ালি হয়ে যায়। জলদি প্রশ্ন করে ফেলো। তোমার সঙ্গে আমার হিসেবনিকেশ আছে।”
ফুল অজান্তেই নিজের হাত দুটো কচলাতে লাগল। আঙুলের ডগায় ওরনা আটকে ঠোঁট মুছতে মুছতে বলল, “আমার মনে অনেক প্রশ্ন। কোনটা রেখে কোনটা করবো বুঝতে পারছিনা। আর আপনি যে আমার প্রশ্নের উত্তর দেবেন তারও কোনো নিশ্চয়তা নেই। আচ্ছা, আপনি কি বিশ্বাস করেন এই প্রশ্নের উত্তরে মিথ্যা বললে আপনার সাথে খুব খারাপ কিছু হবে?”
উদ্যানের ধৈর্য ফুরোতে শুরু করল। বিরক্ত গলায় বলল, “যেকোনো একটা প্রশ্ন করো। একাধিক প্রশ্নের উত্তর দিতে বাধ্য নই আমি। উত্তর দেওয়া না দেওয়া আমার ব্যাপার। দিতে মন চাইলে দেবো, নইলে করলার জুস খেয়ে নেবো। তেতো জিনিস খাওয়ার অভ্যাস আছে আমার।”
ফুলের চোখ বড় হয়ে গেল। সে এতো কষ্ট করে প্রশ্ন করার সুযোগ পেয়েছে আর দানবটা অবলীলায় উত্তর দেবেনা বলে দিচ্ছে? সে এবার শক্ত গলায় বলল, “আমি এমন প্রশ্ন করব, যার উত্তরে আপনি চুপ থাকলেও আপনার মনোভাব পরিষ্কার হয়ে যাবে। আর যদি মিথ্যা বলেন, সেই মিথ্যাই একদিন আপনার জীবনের সবচেয়ে বড় সত্যিতে পরিণত হবে।”
উদ্যান ঠোঁট বাকিয়ে বলল, “তুমি আমাকে অভিশাপ দিচ্ছো, পেটাল?”
ফুলের কণ্ঠ কেঁপে উঠল, “হ্যাঁ দিচ্ছি, কারণ এই প্রশ্নের সঙ্গে আমার জীবন মরণ জড়িয়ে আছে।”
উদ্যান নিশ্চুপ হয়ে গেল।
এই কারণেই সে ফুলকে জিততে দেয়নি। নইলে ভালোবাসা প্রমাণের খাতিরে বউকে জিতিয়ে দিতে তার কোনো আপত্তি ছিল না। উদ্যান নিজ ভাবনায় গা ভিজিয়ে ছিল তখনই ফুল ঘাড় ঘুরিয়ে সোহমকে প্রশ্ন করল, “সোহম স্যার, আপনাদের তেহ কি কর্মফলে বিশ্বাস করে?”
সোহম বিপাকে পড়ে গেল। কারণ উদ্যান তীক্ষ্ণ চোখে তাকিয়ে আছে। সোহম বেশ কিছুক্ষণ সময় নিয়ে বলল, “হ্যাঁ। খুব বিশ্বাস করে। সেই জন্যই তো গিভ অ্যান্ড টেক স্ট্রাটেজি মেনে চলে।”
উদ্যানের নাসারন্ধ্র ফুলে উঠল। চোয়ালের পেশিতে টানটান ভাব দেখা দিল। লুহান স্বগতোক্তি করল, “এই সোহম গিভ অ্যান্ড টেক স্ট্রাটেজির ব্যাপারে ফুলকে কেন বলল?”
ফুল কয়েক কদম এগিয়ে উদ্যানের সামনে দাঁড়াল। “আপনি আর যাই হোক মিথ্যা বলবেন না। সত্য বলতে না পারলে চুপ থাকবেন।”
উদ্যান জিভ দিয়ে গাল ঠেলে হ্যাঁ সূচক মাথা নাড়ল।
ফুল গভীর শ্বাস নিল। তারপর প্রশ্ন করল, “আপনি আমাকে সত্যিই ভালোবাসেন?”
প্রশ্নটা ছুড়ে দিয়ে ফুল গভীর মনোযোগে উদ্যানের দেহভঙ্গি পর্যবেক্ষণ করতে লাগল। কিন্তু সন্দিহান কিছুই তার চোখে ধরা পড়ল না। উদ্যান যখন টেবিলের ওপর হাত রাখল, ফুলের বুকটা দমকে উঠল। সে ধরে নিয়েছিল, এবার হয়তো উদ্যান করলার জুস খেয়ে নেবে। আর যদি সেটাই হয়, তবে ফুল বুঝে নেবে, উদ্যান তাকে ভালোবাসে না। হয়তো কোনো অজানা কারণে মিথ্যা বলছে।
কিন্তু ঠিক তখনই উদ্যান অন্য হাতে ফুলের হাত ধরে টান দিল। ভাবার সুযোগ না দিয়ে হাতটা নিজের মুখের কাছে এনে স্পষ্ট শব্দে চুমু খেল।
কণ্ঠে এক অচেনা নমনীয়তা ফুটিয়ে বলল, “হ্যাঁ। আমি তোমাকে সত্যিই ভালোবাসি, পেটাল।”
এক মুহূর্তের জন্য ফুল বাকরুদ্ধ হয়ে গেল। তার মস্তিষ্কে কেউ যেন সজোরে আঘাত করেছে। এতদিন ধরে যে মস্তিষ্ক তাকে বারবার বলেছে, উদ্যান তাকে ভালোবাসে না। আজ সেই মস্তিষ্কই সব হিসেব গুলিয়ে ফেলেছে।
সে মাথা চেপে ধরল, টলমল নয়নে তাকাল উদ্যানের পানে। ঠোঁট অনিয়ন্ত্রিত তালে কেঁপে উঠল। উদ্যানের ঠোঁটের কোণে ধরা দিল এক দুর্বোধ্য হাসির রেখা। আর কোনো দিকে তাকানোর সাহস পেল না ফুল। একছুটে সে রিসোর্টের দিকে চলে গেল। উদ্যান চেয়ারে গা এলিয়ে দিয়ে সংক্ষিপ্ত স্বরে বলল, “অনিলা, ওর পিছু পিছু যাও।”
অনিলা মাথা কিঞ্চিৎ দুলিয়ে ফুলের পিছু নিল। পরিবেশ তুলনামূলক স্বাভাবিক হতেই উদ্যানের রাশভারী কণ্ঠ ভেসে এলো, “সল…”
সোহম হতবুদ্ধি হয়ে চোখ ফেরাল। উদ্যান ধীর পায়ে কাছে এসে বলল, “তুই এত সহজে মিথ্যা কীভাবে বলে দিলি?”
লুহান যোগ করল, “তেহ শুধু স্যারের সম্মানে স্ট্রাটেজিটা মেইনটেইন করে চলে। তুইও সেটা খুব ভালো করেই জানিস তবুও মিথ্যা বললি কেন?”
সোহম মাথা নিচু করে বলল, “হোপফুল অনেক আশা নিয়ে তোকে প্রশ্ন করতে চাচ্ছিল। যদি শুনতো তুই এসব মানিস না তাহলে ও তোর কথা বিশ্বাস করতো না। তাই আমি শাক দিয়ে মাছ ঢাকার চেষ্টা করেছি। ‘গিভ অ্যান্ড টেক’ স্ট্রাটেজির কথা টেনে এনেছি, যাতে ও তোর স্বীকারোক্তিটা বিশ্বাস করে নেয়।”
উদ্যান আপাতত সোহমকে কিছু বলতে পারল না। কেন জানিনা তার রাগ ধপ করে নিভে গেছে। তখন ঠিক কোন কারণে রাগ উঠেছিল সে জানেনা। কিন্তু বর্তমানে তার চেতনাজুড়ে শুধুমাত্র ফুলের চুমু খাওয়ার দৃশ্যটা ছুটে বেড়াচ্ছে।
আরো দুদিন রিসোর্টে কাটিয়ে তারা ফিরে এলো পেটাল এস্টেটে। আগামীকাল পুরো একসপ্তাহের ট্যুর কমপ্লিট করে তারা রওনা হবে সোলার এস্টেটের পথে। গত দুদিন ফুলকে স্পেস দিলেও উদ্যানের পক্ষে নিজের ইচ্ছা গুলোকে দমিয়ে রাখা আর সম্ভব হচ্ছেনা। মূলত ফুলই প্রলোভন দেখিয়ে তার নিভৃত আকাঙ্ক্ষাগুলোকে উসকে দিয়েছে। এখন তাকেই এর মোকাবিলা করতে হবে।
রাতে ডিনার শেষে উদ্যান ফুলের রুমে গিয়ে বলল, “কাল আমরা সোলার এস্টেটে ফিরে যাবো। তাই আজ আমি তোমার জন্য স্পেশাল কিছু অ্যারেঞ্জ করেছি। যাবে আমার সঙ্গে?”
অজ্ঞাত কারণে ফুলের মন অস্থির হয়ে পড়ল। তবুও উদ্যানের মুখের উপর না বলে দিতে পারল না। উঠে দাঁড়িয়ে জিজ্ঞেস করল, “এই মাঝরাতে কোথায় নিয়ে যাবেন আমাকে?”
উদ্যান হেয়ালি করে বলল, “তোমাকে ভূতেদের ডেরায় রেখে আসতে যাবো।”
ফুল ঠোঁট ফুলিয়ে বলল, “আপনি খুব অদ্ভুত। ভালোবাসেন, অথচ কথা বলেন লাগামছাড়া। একটু ভালোভাবে বলতে পারেন না?”
উদ্যান কয়েকপা এগিয়ে এসে বুকে হাত গুটিয়ে বলল, “তোমাকে নিয়ে ডেটে যাচ্ছি প্রিয়তমা। দয়া করে চলো আমার সঙ্গে, নইলে আমি প্রচণ্ড কষ্ট পাবো।”
ফুল মুখ ঘুরিয়ে নিল। “হুহ, যে কাঁদতে জানেনা তার আবার কিসের কষ্ট? আচ্ছা আপনি কি জন্মের সময়েও কাঁদেন নি?”
উদ্যান ঘাড় ধরে নিমজ্জিত কণ্ঠে বলল, “তা আমি কী করে বলবো?”
উদ্যানের হাসি হাসি মুখখানা দেখে ফুলের না চাইতেও ভালো লাগল। চোখ উল্টে বলল, “আপনাকে হাসতে কে শিখিয়েছে তাও জানেন না?”
উদ্যান আচমকা ফুলের দু’বাহু চেপে ধরে আয়নার সামনে নিয়ে গেল। আয়নায় ভেসে ওঠা ফুলের প্রতিচ্ছবির দিকে ইশারা করে বলল, “তুমি শিখিয়েছো।”
ফুল চমকে তাকাল। পেছন ঘুরে শুধাল, “আমি কীভাবে?”
উদ্যানের চোখেমুখে অদ্ভুত ধরনের উজ্জ্বলতা ফুটে উঠল। প্রগাঢ় কণ্ঠে ব্যাখ্যা করল, “ডাক্তার অনেক ফানি জোক্সস শুনিয়েও হাসাতে পারেনি। হঠাৎ বাইকে ওঠার পর তোমার স্পর্শের কথা মনে পড়ে গেল। তারপর আমি তোমাকে গাছের সাথে বেধে রেখে ফ্ল্যাটের লিফটে উঠে অজ্ঞান হয়ে গিয়েছিলাম। সেই ঘটনা যতবার মনে পড়ে ততবারই হাসি পায়। পরপর দুবার তোমার সংস্পর্শে আসার পর চেতনা হারিয়ে ফেলেছিলাম আমি।”
ফুল হতচকিত নয়নে তাকিয়ে রইল। “আপনি জ্ঞান হারিয়ে ফেলেছিলেন কেন?”
উদ্যান মুখ ফিরিয়ে উত্তর দিল, “তখন অসুস্থ ছিলাম, সেইজন্য…”
“কী অসুখ হয়েছিল আপনার?”
উদ্যান ঘুরিয়ে প্যাঁচিয়ে বলল, “ডাক্তার জানে, আমি জানিনা। বাদ দাও, এখন আমি সুস্থ আছি। তোমার যত ইচ্ছা কিস করতে পারো।”
ফুল লজ্জা পেয়ে গেল। ইশ, জ্বর আর ব্যথার ঘোরে করা সেদিনের বেহায়াপনার কথা মনে পড়তেই মাটি ফাঁক করে ঢুকে যেতে মন চাইছে। সে অস্বস্তিতে উদ্যানের চওড়া বুক ঠেলে অন্যদিকে সরে গেল।
“আপনি আমাকে ডেটে নিয়ে যাবেন?”
“হ্যাঁ, চলো।”
উদ্যান ফুলের হাত ধরে নিয়ে যেতে লাগল। ফুল অপ্রস্তুত হয়ে পড়ল, “একটু রেডি হয়ে নিই?”
উদ্যান থেমে গিয়ে বলল, “এমনিতেই সুন্দর লাগছে। তাকানোর সাহস পাচ্ছি না, আস্তে আস্তে তুমি যেন বেশি বেশিই সুন্দর হয়ে যাচ্ছো। এভাবেই চলতে থাকলে আমি যখন তখন কন্ট্রোল হারিয়ে ফেলতে পারি।”
লজ্জায় নেতিয়ে পড়ল ফুল। গাল গরম হয়ে গেল মুহূর্তেই। “কথাবার্তায় লাগাম টানুন, আমি এখনো আপনাকে তেমন কিছু করার অনুমতি দেইনি। তাই এতোদূর এসে ভুল পথে চলে যাবেন না। জোরাজুরি করলে কিন্তু আমি মেনে নিতে পারবো না। আর মেনে নিতে না পেরে কী করবো আপনি খুব ভালো করেই জানেন।”
উদ্যানের হাতের গ্রিপ আরও শক্ত হয়ে গেল। নিরাবেগ গলায় বলল, “তুমি নিজের ক্ষতি করবে কেন? আমি তেমন কিছু করে ফেললে তুমি আমাকে শাস্তি দিও। তবুও নিজের ক্ষতি কোরো না।”
ফুল হাত ছাড়ানোর চেষ্টা করতে করতে বলল, “আপনার ভাবভঙ্গি সুবিধার লাগছে না। আমরা অন্য কোনোদিন ডেটে যাই?”
উদ্যানের চোখে আগুন জ্বলে উঠল। সে বিক্ষুব্ধ গলায় বলে দিল, “আমি আজই ডেটে যাবো। তুমি গেলে যাবে, না গেলে অন্য কাউকে নিয়ে যাবো। তেহজিবের জন্য মেয়ের অভাব পড়বে না। এক্ষুনি তুড়ি বাজালে ডজন খানেক মেয়েলোক হাজির হয়ে যাবে।”
ফুল দাঁত চেপে তাকিয়ে রইল। উদ্যান একনজর তার প্রতিক্রিয়া দেখে নিয়ে পকেট থেকে কনসোল বের করল। “তুমি মনে হয় বিশ্বাস করছো না। দাঁড়াও এখুনি দেখিয়ে দিচ্ছি।”
ফুল ঝাপিয়ে পড়ে কনসোল টা কেড়ে নিল। সেটা আছাড় মারার উদ্দেশ্যে ওঠাতেই উদ্যান হকচকিয়ে গেল, “ওটা ভেঙো না।”
উদ্যান কোনোভাবে ফুলের হাত থেকে কনসোল টাকে বাচিয়ে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল। ফুলের হাত ছেড়ে দিয়ে বলল, “ঠিক আছে, আমি একাই ডেটে চলে যাচ্ছি। তুমি থাকো।”
ফুল অকস্মাৎ উদ্যানের বাহু আঁকড়ে ধরল। হিংস্র গলায় বলল, “আমি আপনাকে বিশ্বাস করতে পারছিনা, একা না গিয়ে যদি অন্য কাউকে নিয়ে যান তখন? আমিও যাবো আপনার সাথে।”
উদ্যান মুচকি হেসে ফুলের হাত মুঠোয় নিয়ে হাঁটা ধরল।
খাড়া পাহাড়ের চূড়ায় উঠতে গিয়ে ফুলের দম ফুরিয়ে এলো। হাঁটু ধরে ঝুকে গিয়ে তৃষ্ণার্থ পাখির ন্যায় ঘনঘন শ্বাস টানতে লাগল। হাপিয়ে গেছে উদ্যানও। তবুও ফুলের পিঠে হাত বুলিয়ে দিতে দিতে পানির বোতল এগিয়ে দিল। ফুল পানি পেয়ে খুশি হয়ে গেল। ত্রস্ত হাতে বোতল খুলে গলা ভিজিয়ে নিল। তারপর ওরনার ভাঁজে মুখ মুছে ক্লান্ত গলায় বলল, “ধন্যবাদ।”
প্রত্যুত্তরে উদ্যান ঘাসের উপর হাঁটু ভাঁজ করে বসে পড়ল। পাহাড়ের চূড়ায় রাত নেমেছে পুরোপুরি। আকাশটা অদ্ভুতভাবে কাছাকাছি মনে হচ্ছে। চারপাশে পাইন আর পাহাড়ি ঝোপের ফাঁক দিয়ে বাতাস বয়ে যাচ্ছে। কিন্তু তাদের মাথার উপর খোলা আকাশ। উদ্যান কিছুক্ষণ নিচের অন্ধকার উপত্যকার দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর ফুলের হাত ধরে আলতো টান দিয়ে তাকে নিজের পাশে বসিয়ে দিল। আকাশের বুকে ঝুলে থাকা চাঁদটা দেখিয়ে প্রশ্ন করল, “চাঁদটাকে কাছাকাছি মনে হচ্ছেনা?”
ফুল চাঁদের থেকে দৃষ্টি সরিয়ে উদ্যানের দিকে তাকাল। গুনগুনিয়ে বলল, “হ্যাঁ। চাঁদটা আসলেই অনেক কাছে।”
উদ্যান বাহু প্রসারিত করে ঘাসের উপর শুয়ে পড়ল। ফুলের হাত ধরে চোখ দিয়ে ইশারা করল তার পাশে শোয়ার জন্য। ফুল প্রথমে দোনোমোনো করলেও উদ্যানের ডান বাহুতে মাথা রেখে গা এলিয়ে দিল। চারদিকে এক আরামদায়ক নিস্তব্ধতা বিরাজ করছে।
শুধু ক্ষণে ক্ষনে পাতার সড়সড় শব্দ আর বাতাসের হালকা আওয়াজ ভেসে আসছে। অদ্ভুত এক আচ্ছন্নতায় ফুল চোখ বন্ধ করে নিল। তখনই কানে ভেসে এলো পরিচিত এক গানের সুর। ঠিক সুর নিয়, কে যেন শিস বাজাচ্ছে। ফুল স্থান কাল ভুলে গিয়ে সেই শিস বাজানো শুনতে লাগল। তখনই কানে এলো,
“Subhan allah… subhan allah… subhan allah”
চমকে গিয়ে ফুল চোখ মেলতেই দেখল উদ্যান পাশ ফিরে ধীরে ধীরে তার ওপর ঝুকে যাচ্ছে। ফুল প্রতিক্রিয়া দেখানোর পূর্বেই উদ্যান বাম হাত মাটিতে ঠেকিয়ে ফুলকে আবদ্ধ করে নিল। ঠোঁট বরাবর মুখ নিতেই ফুল চোখ খিচে মুখ ফিরিয়ে নেয়। উদ্যান ফুলের উন্মুক্ত হয়ে যাওয়া মোমরঙা ঘাড়ের ভাঁজে ফু দিয়ে গেয়ে ওঠে,
“Chand sifarish jo karta hamari
deta woh tumko bata. Sharmo haya ke
parde gira ke, karni hai humko khata.
Jidd hai abb toh hai khud ko mitanaa
hona hai tujhme fanaa..”
উদ্যান আবারও শিস বাজিয়ে উঠল। ফুলের কান গরম হয়ে গেল সঙ্গে সঙ্গে। সে দুহাত উঠিয়ে উদ্যানের মুখ ঢেকে ফেলল। অসহায় গলায় বলল, “আমি প্রস্তুত নই।”
শুধুমাত্র সেই জানে কথাটা বলতে গিয়ে তার লোমকূপ কীভাবে খাড়া হয়ে গিয়েছিল। ফুলের বাধা পেয়ে উদ্যান আগের মতো ধপ করে শুয়ে পড়ল। ছাড়া পেয়ে উঠে বসল ফুল। কপালের ঘাম মুছে জোরে জোরে শ্বাস নিতে লাগল।
তখনই আকাশ বাতাস কাঁপিয়ে ঝোড়ো হাওয়া বইতে শুরু করল।
আকস্মিক প্রকৃতির এমন বিরূপ আচরণে ফুলের বুকের ভেতর শূন্যতা ছেয়ে গেল। কেঁপে উঠল সর্বাঙ্গ। উদ্যানের দিকে তাকিয়ে দেখল, লোকটা কপালে হাত ঠেকিয়ে চোখ বন্ধ করে নির্বিঘ্নে শুয়ে আছে।
ফুল বিচলিত কণ্ঠে বলল, “বৃষ্টি নামবে এখনই, উঠুন। বাড়িতে ফিরে চলুন।”
উদ্যানের মাঝে ভাবাবেগ ঘটল না। একই ভঙ্গিতে শুয়ে রইল। ঝুমঝুমিয়ে বৃষ্টির ফোঁটা পড়তে শুরু করল। ফুল হকচকিয়ে গিয়ে উদ্যানের বাহু ধরে ঝাঁকুনি দিল। কিন্তু লোকটা একচুলও নড়ল না। ফুল দিশাবিশা হারিয়ে—সমস্ত সংকোচ, ভয়, জড়তা দূরে সরিয়ে তার গালে হাত রাখল। ফুলের হাতের শীতল স্পর্শে উদ্যান চোখ মেলল ঠিকই কিন্তু কোনো কথা বলল না।
ততক্ষণে আকাশ ভেঙে বৃষ্টির ফোঁটা অনবরত জমিনে পড়ছে। উদ্যান বিরক্তিতে চ-বর্গীয় শব্দ উচ্চারণ করে উঠে দাঁড়াল। ফুলের হাত চেপে ধরে দ্রুত পায়ে পাহাড় থেকে নেমে যেতে লাগল। ফুল বুঝতে পারল তখন মুখ ফিরিয়ে নেওয়াতে দানবটা রাগ করেছে।
উদ্যানের সঙ্গে তাল মিলিয়ে হাঁটতে গিয়ে ফুলকে রীতিমতো দৌড়াতে হচ্ছে। তার উপর বৃষ্টির পানিতে কাকভেজা হয়ে গেছে দুজনেই। ফুল জানেনা উদ্যান তাকে কোথায় নিয়ে যাচ্ছে কিন্তু এটা জানে তারা পেটাল এস্টেটের পথে যাচ্ছেনা। “আমরা বাড়ির পথে যাচ্ছিনা কেন?”
উদ্যান নিরুত্তাপ কণ্ঠে বলল, “বাড়িতে ফেরার পথ অনেক লম্বা, ঝড়বৃষ্টি মাথায় নিয়ে যাওয়া যাবেনা। তাই আমাদের অসম্পূর্ণ ডেট পূরণ করতে অন্য কোথাও যাচ্ছি।”
ফুল ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেল। “আপনি সত্যি সত্যিই আমাকে ভূতেদের ডেরায় রেখে আসতে যাচ্ছেন নাতো?”
উদ্যান উদাস গলায় বলল, “এমন ঠান্ডা আবহাওয়ায় ভূতেরাও হয়তো বউকে জড়িয়ে ধরে ঘুমোচ্ছে, আমার মতো দূর্ভাগা নিশ্চয়ই নয় তারা।”
ফুল ইতস্তত বোধ করে মুখে কুলুপ এঁটে নিল। চারদিক মুহূর্তেই যেন আঁধারে ডুবে গেছে। বিদ্যুৎ চমকানোর আলোয় উদ্যান পথ মাড়িয়ে সামনে অগ্রসর হচ্ছিল। আরও কয়েক মিনিট হাঁটার পর উদ্যান ফুলকে নিয়ে একটা ট্রি হাউজের সামনে এসে দাঁড়াল।
বিদ্যুতের ক্ষণিক আলোয় গাছটির দিকে তাকিয়ে ফুলের চোখ থমকে গেল। ওক গাছের উপর নির্মিত বনলতা আর বাঁশের নিপুণ কারুকাজে তৈরি এক চমৎকার ট্রি হাউজ। চারপাশটা পাতলা বাঁশের চাটাইয়ের বুনন আর স্বচ্ছ কাঁচ দ্বারা আবৃত। ট্রি-হাউসের রেলিং বেয়ে সাদা রঙের বুনো ফুল আর লতা জড়িয়ে আছে।
নিচ থেকে উপরে উঠে যাওয়া বাঁশের সিঁড়িটা বেশ মজবুত আর প্রশস্ত। সিঁড়ির দুই পাশে ছোট ছোট লণ্ঠন ঝুলছে, যার ভেতরে টিমটিম করে জ্বলছে হলদেটে আলো। উদ্যান ফুলকে নিয়ে সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠে গেল। চাবি ঘুরিয়ে বাঁশের দরজাটা আলতো করে ঠেলে দিল, ফুলের চোখ বিস্ময়ে বড় বড় হয়ে গেল।
বাইরের রুক্ষ ঝড় আর বৃষ্টির ঝাপটা মুহূর্তেই যেন উবে গিয়ে এক পরম উষ্ণতা তাকে ঘিরে ধরল। ভেতরে পা রাখতেই পায়ের নিচে নরম আর সতেজ এক আস্তরণ অনুভব করল সে। পুরো মেঝেজুড়ে বিছানো রয়েছে গাঢ় সবুজ জীবন্ত ঘাসের গালিচা। সেই ঘাসগুলো এতই কোমল আর পরিপাটি যে মনে হচ্ছে কোথাও থেকে একখণ্ড মখমল তুলে এনে এখানে বিছিয়ে দেওয়া হয়েছে।
বৃষ্টির দিনে সেই ভেজা ঘাসের সোঁদা গন্ধ আর বুনো ফুলের সুবাসে পুরো ঘরটা ম ম করছে। ঘরটির ঠিক মাঝখানে ছাদ থেকে নিচু হয়ে ঝুলে আছে কয়েকটি কাঁচের লণ্ঠন। লণ্ঠনের ভেতরে থাকা মোমের হলদেটে আলো ঘাসের ওপর পড়ে এক অলৌকিক আভা তৈরি করেছে। এক কোণে বাঁশের তৈরি একটি ছোট ডিভান। অন্যপাশে কাঁচের দেয়ালের ধার ঘেঁষে রাখা নিচু এক টেবিল, যেখানে রাখা মোমবাতিগুলো থেকে হালকা ধোঁয়া উঠছে।
সবচেয়ে অদ্ভুত বিষয় হলো, বৃষ্টির শব্দ বাইরে যতটা ভয়ংকর শোনাচ্ছিল, বাঁশের এই ঘরের ভেতরে তা যেন মৃদু এক ছন্দের মতো বাজছে। ছাদের এক পাশ কিছুটা স্বচ্ছ হওয়ায় ওপর থেকে বৃষ্টির ফোঁটাগুলো গড়িয়ে পড়তে দেখা যাচ্ছে, কিন্তু ভেতরে এক ফোঁটা পানিও প্রবেশ করছে না।
এই স্নিগ্ধ আর প্রশান্ত পরিবেশে ফুল আত্মহারা হয়ে ছিল। তখনই উদ্যান মৃদু গলায় বলল, “পছন্দ হয়েছে?”
ফুলের চোখ চিকচিক করে উঠল। বিনাবাক্যে উপর নিচ মাথা দোলালো। এমনিতেই বৃষ্টির পানিতে ভিজে তার মুখাবয়ব লাল বর্ণ ধারণ করেছে তার উপর এখন যেন সে হাউমাউ করে কেঁদেই ফেলবে। উদ্যান তা হতে দিল না, ফুলের বাহু ধরে তাকে ওয়াশরুমে পাঠিয়ে দিল। আওয়াজ দিয়ে বলল, “ভেতরে শুকনো কাপড় রাখা আছে মেবি। দ্রুত চেঞ্জ করে নাও। নয়তো ঠান্ডা লেগে যাবে।”
ফুল দেখল আয়নার পাশের তাকের ওপর রাখা আছে একটা গোলাপি রঙের শাড়ি। তার সাথে শুভ্র সাদা ব্লাউজ, আর শাড়ির পাড়জুড়ে ছোট ছোট মুক্তোর সূক্ষ্ম কারুকাজ। ফুল লাজুক হাসল, ভেজা কাপড় খুলে শাড়িটায় হাত রাখল। আপনমনে বিড়বিড়িয়ে বলল, “এই সবের ব্যাবস্থা সে আগেই করে রেখেছিল। আমি বুঝতে পারি সে ঠিক কী চায়। কিন্তু তাকেও তো বুঝতে হবে এসবে অভ্যস্ত হতে আমার একটু সময় লাগবে। যাকগে ফার্স্ট টাইম ডেটে এসেছি, তাও আবার হাজব্যান্ডের সাথে, সবকিছু ঘেটে ফেলতে চাইনা।”
ফুল দীর্ঘশ্বাস ফেলে শাড়িটা গায়ে জড়াতে শুরু করল। কিন্তু পরক্ষণেই তার নজর গেল মেঝেতে। এক কোণ থেকে গাঢ় বাদামী রঙের একটা ঘুনপোকা ধীরলয়ে ঘাসের দিকে এগিয়ে আসছে। পোকামাকড় নিয়ে ফুলের আজন্মের ভয়!
যার জন্য ঘুনপোকাটাকেই এই মুহূর্তের আলো-আঁধারিতে কোনো এক অদ্ভুত কীট বলে বিভ্রম হলো তার। ফুলের হিতাহিত জ্ঞান লোপ পেল। কোনোমতে শাড়িটা শরীরে প্যাঁচিয়ে সে এক চিৎকার দিয়ে ওয়াশরুম থেকে বেরিয়ে এল।
বাইরে তখন উদ্যান কেবল তার প্যান্ট বদলে একটা সাদা শার্ট গায়ে চড়ানোর চেষ্টা করছিল। বোতামগুলো লাগানো তখনও বাকি। ফুল পেছন থেকে ঝড়ের বেগে এসে উদ্যানের পিঠে মুখ গুঁজে তাকে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ধরল। তার দুহাত উদ্যানের বুকের ওপর এসে শক্ত করে চেপে বসল।
ফুলের শরীরের শীতল কাঁপন মুহূর্তেই উদ্যানের তপ্ত শরীরে সঞ্চারিত হলো। সে স্তব্ধ হয়ে অনুভব করল ফুলের অনিয়মিত হৃৎস্পন্দনের শব্দ, যা তার পিঠের চামড়ায় এসে আছড়ে পড়ছে।
সে গভীর এক নিঃশ্বাস ফেলে শান্ত গলায় বলল, “কী হলো? এভাবে চিৎকার করলে কেন?”
ফুল আরও শক্ত করে উদ্যানকে আঁকড়ে ধরে ভীতসন্ত্রস্ত কণ্ঠে বলল, “পোকা… ভেতরে অনেক বড় একটা পোকা!”
উদ্যান ধীরস্থিরভাবে ফুলের হাত দুটোর ওপর নিজের হাত রাখল। সেই স্পর্শে ফুলের আতঙ্কিত মন শান্ত হলো ঠিকই কিন্তু লজ্জায় তার গাল শাড়ির চেয়েও বেশি গোলাপি হয়ে উঠল যখন সে বুঝতে পারল সে ঠিক কী অবস্থায় উদ্যানকে জড়িয়ে ধরে আছে।
উদ্যান ধীরগতিতে ঘুরে দাঁড়াল। ফুলের ঘাবড়ে যাওয়া মুখটা এখন তার একদম কাছে। ফুলের আধখোলা শাড়ির বাঁধন আর কাঁধের ওপর নেমে আসা ভেজা চুলের অবিন্যস্ত অবস্থা দেখে উদ্যানের চোখের মণি যেন আরও গাঢ় হয়ে উঠল।
বিব্রত ফুল নিজেকে সামলে নিয়ে তোতলামি করে বলল, “আ-আমি… ভয় পেয়ে শাড়িটা গোছাতে পারিনি… আমি আবার ভেতরে যাচ্ছি।”
সে এক পা পিছিয়ে ওয়াশরুমের দিকে যেতে চাইল, কিন্তু পারল না। উদ্যান এক ঝটকায় তার কোমর জড়িয়ে ধরে পথ আগলে দাঁড়াল। তার শক্ত হাতের বেষ্টনীতে ফুল যেন বন্দি হয়ে গেল। উদ্যান কোনো কথা বলল না, শুধু নিবিড়ভাবে ফুলের দিক তাকিয়ে রইল। ফুলের ভেজা চুল থেকে আসা স্নিগ্ধ কোমল ঘ্রাণে উদ্যানের ইন্দ্রিয়গুলো যেন বশে থাকছে না।
সে আলতো চাপে ফুলকে ঘুরিয়ে দিয়ে সামনের টেবিলের দিকে ঠেলে দিল। ফুল টেবিলের কিনারা আঁকড়ে ধরে দাঁড়াতেই অনুভব করল উদ্যানের তপ্ত উপস্থিতি তার ঠিক পেছনে। উদ্যান ঝুঁকে এল ফুলের ঘাড়ের ওপর। ভেজা চুলের গোছা সযত্নে সরিয়ে দিয়ে সে সেখানে তার মুখ গুঁজল।
ফুলের সারা শরীরে এক তীব্র শিহরণ খেলে গেল। উদ্যানের উষ্ণ নিঃশ্বাস তার ঘাড়ের কোমল ভাঁজে আছড়ে পড়ছে। ফুল বুঝতে পারল উদ্যানকে এর চেয়ে বেশি আশকারা দেওয়া ঠিক হবেনা।
কথা খুঁজে না পেয়ে ফুল প্রায় ফিসফিসিয়ে বলল, “আমাকে অগোছালো দেখাচ্ছে, শাড়িটা ঠিক করে আসতে দিন।”
উদ্যান তৎক্ষনাৎ ফুলকে ঘুরিয়ে নিয়ে তার সরু মসৃণ কোমর আলতো হাতে চেপে ধরল। ফুল দৃষ্টি নামিয়ে ফ্লোরে নিক্ষেপ করল। উদ্যান ঠোঁট নেড়ে হাস্কিটোনে গেয়ে উঠল,
“Baby, I’m dancin’ in the dark
With you between my arms
Barefoot on the grass
Listenin’ to our favourite song
When you said you looked a mess
I whispered underneath my breath
But you heard it
Darling, you look perfect tonight”
উদ্যান তার ভরাট আর নেশাক্ত কণ্ঠে পুরোটা গান গেয়ে শোনালো। সে কোনো পেশাদার গায়ক নয়, কিন্তু এই বৃষ্টিভেজা রাতে তার কণ্ঠের প্রতিটি ওঠা-নামা ফুলের কানে শ্রুতিমধুর লাগছিল। গানের তালে তালে তারা দুজন মৃদু ছন্দে দুলছিল, ঠিক যেমনটা বসন্তের বাতাসে কোনো লতা দুলতে থাকে।
ফুল কখন যে উদ্যানের চোখের সেই অতল কৃষ্ণগহ্বরে হারিয়ে গিয়েছিল, সে নিজেও জানে না। তার সমস্ত পৃথিবী এখন কেবল সামনে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষটাকে ঘিরেই আবর্তিত হচ্ছে। গানের শেষ রেশটুকু যখন বাতাসের ঝাপটায় মিলিয়ে গেল, ঘরজুড়ে নেমে এল এক নিস্তব্ধতা। উদ্যান গান থামিয়ে দিলেও তার চোখের চাহনি থেকে ফুল এক মুহূর্তের জন্যও রেহাই পেল না।
সে ফুলের দুই গাল আলতো করে হাতের মুঠোয় তুলে নিল। উদ্যানের হাতের তপ্ত স্পর্শ ফুলের গালের শীতলতাকে নিমেষেই শুষে নিল। ফুল এক অদ্ভুত ঘোরে তার চোখের পাতা বন্ধ করে ফেলল। সে অনুভব করল উদ্যানের তপ্ত নিঃশ্বাস তার ঠোঁটের খুব কাছে এসে থমকে দাঁড়িয়েছে। পরক্ষণেই কোনো রকম সংকোচ বা অনুমতির অপেক্ষা না করে উদ্যান খুব নিবিড়ভাবে ফুলের ঠোঁটজোড়া নিজের দখলে নিয়ে নিল।
চলবে,,,
শব্দসংখ্যা: ৪৪৫০+
Share On:
TAGS: অবাধ্য হৃৎস্পন্দন, সোফিয়া সাফা
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
অবাধ্য হৃৎস্পন্দন পর্ব ২১
-
অবাধ্য হৃৎস্পন্দন পর্ব ১০
-
অবাধ্য হৃৎস্পন্দন পর্ব ২৫(প্রথমাংশ+শেষাংশ)
-
অবাধ্য হৃৎস্পন্দন পর্ব ২৯
-
অবাধ্য হৃৎস্পন্দন পর্ব ১২
-
অবাধ্য হৃৎস্পন্দন পর্ব ৩৬
-
অবাধ্য হৃৎস্পন্দন পর্ব ৯
-
অবাধ্য হৃৎস্পন্দন পর্ব ৩২
-
অবাধ্য হৃৎস্পন্দন পর্ব ২৭
-
অবাধ্য হৃৎস্পন্দন পর্ব ২৬