অবাধ্য_হৃৎস্পন্দন (৩৮)
সোফিয়া_সাফা
রাত নামার আগেই নীলগিরি রিসোর্টে পৌঁছে গেল তারা সাতজন। পাহাড়ের ঢালু জমির ওপর নির্মিত বিলাসবহুল রিসোর্ট ভিলাটার পুরোটাই ভাড়া করে নিয়েছে এস্টেটবৃন্দ। ভিলার বাইরেটা জাঁকজমকপূর্ণ না দেখালেও ভেতরে ঢুকেই ফুল বুঝে গেছে জায়গাটা খুব সমৃদ্ধ। ক্লান্ত থাকায় বিশ্রাম নিতে সবাই যার যার রুমে চলে গেল।
পুনরায় একত্রিত হয়েছিল ডিনার করার উদ্দেশ্যে। ফুল খেতে বসে লক্ষ্য করেছে উদ্যান আগের মতোই তাকে এড়িয়ে যাচ্ছে। সেই ঘটনার পর একটা কথাও বলেনি তার সাথে। ফুল যেচে পড়ে উদ্যানকে ঘাটাতে গেল না আর। চুপচাপ খেয়েদেয়ে রুমের দিকে হাঁটা ধরল।
পরদিন সাতজন মিলে নীলগিরি ঘুরতে বেরিয়ে পড়ল। বিখ্যাত জায়গাগুলো একের পর এক চষে বেড়াল।
ঠিক সন্ধ্যা নামার আগে ফিরে এল রিসোর্টে। ফুল আর অনিলা কফি হাতে বসে আছে ফুলের রুমের ব্যালকনিতে। আকাশ ধীরে ধীরে সন্ধ্যার রঙ হারিয়ে আঁধারে নিমজ্জিত হচ্ছে। ফুল কফির কাপে ঠোঁট ছুইয়ে আকাশছোঁয়া নীলচে পাহাড়ের সৌন্দর্য অবলোকন করছে।
“আজ ঘুরে বেড়াতে আমার অনেক ভালো লেগেছে ফুল। তোমার কেমন লেগেছে?”
ফুল ঈষৎ হাসল। “আমিও সবকিছু খুব উপভোগ করেছি। সবচেয়ে রোমাঞ্চকর ছিল ক্লাইম্বিং করা আর দোলনায় দোল খাওয়া।”
ফুল আর অনিলা খুচরো আলাপে মেতে ছিল তন্মধ্যেই কেউ দরজায় কড়া নাড়ল। দরজা খুলতেই অনি হাসিমুখে বলল, “বাইরে চলো, ক্যাম্প-ফায়ারের আয়োজন করা হয়েছে।”
ফুল আর অনিলা তার পিছু পিছু চলে এল রিসোর্টের পেছনের খোলা জায়গায়। যেখানে চেয়ার-টেবিল সব পরিপাটি করে গুছিয়ে রাখা। দুজন মেইড বারবিকিউ গ্রিলে শিক কাবাব, চিকেন ড্রামস্টিক রান্না করছে। সেগুলোর গন্ধে পাহাড়ি বাতাবরণ ভারী হয়ে উঠছে। ফুল চোখ বুলিয়ে আশপাশ দেখে নিল। সোহম ক্যাম্প-ফায়ারে শুকনো কাঠ ঠেলে দিচ্ছে।
মেলোর হাতে নীল রঙের পানীয়, চেয়ারে বসে হেডফোনে মিউজিক শুনছে। অনি চেয়ার টেনে ইশারায় তাদের দুজনকে বসতে বলল। ফুল চেয়ারে বসে আগুনে হাত সেঁকতে লাগল। পাহাড়ি এলাকায় ঠান্ডা ঠান্ডা অনুভব করা অস্বাভাবিক ব্যাপার নয়; বরং চারপাশের সবকিছুই শীতকালের মতো কুয়াশাচ্ছন্ন মনে হচ্ছে।
আগুন পুরোপুরি জ্বলে উঠলে সোহম স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে অনির পাশে চেয়ার টেনে ধপ করে বসে পড়ল। ফুল সূক্ষ্মভাবে খেয়াল করে বুঝতে পারল উদ্যান আর লুহান এখানে অনুপস্থিত। তারা কেন এখানে নেই সেই প্রশ্ন মনের মধ্যে খচখচ করলেও মুখ ফুটে কিছু জিজ্ঞেস করল না সে। প্রত্যেকে নিজ নিজ ভাবনায় মগ্ন, সেই সুযোগে অনিলার আরও কাছে গিয়ে বসল অনি। অনিলা তাকে দেখেও না দেখার ভান করে শূন্যে তাকিয়ে রইল।
তৎক্ষণাৎ কথা খুঁজে না পেয়ে অনি প্রস্তাব রাখল, “চলো ট্রুথ অর সাইলেন্স খেলি।”
এই বাহানায় অনি অনিলার হাত ছুঁয়ে দিল। অনিলার চোখেমুখে বিস্ময় খেলে গেল। অবিশ্বাসী সুরে আওড়াল, “আমাকে দেখে কি তোমার পাগল বলে মনে হচ্ছে? আমি তোমার মতো চিতার সঙ্গে পাঞ্জা লড়ব? ভাবলে কী করে?”
অনি দুষ্টু হেসে বলল, “ইউ নো না, হাত ছুঁয়ে দেওয়ার পর না খেললে, ধরে নেওয়া হয় তুমি তোমার প্রতিপক্ষের কাছে আত্মসমর্পণ করে তার বশ্যতা স্বীকার করেছো। নিজেকে দুর্বলদের কাতারে দাঁড় করাচ্ছো।”
মুহূর্তেই অনিলার চোখমুখ শক্ত হয়ে উঠল। মেক্সিকানরা সব রকম পরিস্থিতিতে নিজেকে অবিচল হিসেবে উপস্থাপন করতে পছন্দ করে। সেও সেই মূলমন্ত্রের ঊর্ধ্বে নয়। প্রতিপক্ষ যতই বলবান হোক না কেন সেই মূলমন্ত্র তার মনে রাখা উচিত। খেলায় হার-জিত থাকবেই, তাই বলে কি অনিলা ভয় পেয়ে আগেই হার মেনে নেবে? কখনো না! নিশ্চিত পরাজয় জেনেও অনিলা টেবিলের অন্যপ্রান্তে গিয়ে বসল।
সোহম বেশ উচ্ছ্বসিত হয়ে সিটি বাজিয়ে উঠল। ফুল গ্রীবা বাঁকিয়ে ভ্রু কুঁচকে তাকাল। সোহম একগাল হেসে তার উদ্দেশ্যে বলল, “আরে প্লেফুল, জলদি টেবিলের কাছে চলো। নইলে অনেক কিছু মিস করে ফেলবে।”
ফুল কৌতুহলবশত এগিয়ে গেল টেবিলের দিকে। অনিলা কটমট চোখে অনিকে ভয় দেখাতে চাইছে, আর হাতের আঙুল টেনে টেনে ব্যায়াম করছে। অনি মিটিমিটি হাসছে। ফুল প্রশ্নবিদ্ধ চোখে সোহমের দিকে প্রশ্ন ছুড়ল, “ওনারা কী করবেন?”
সোহম সবজান্তা কণ্ঠে উত্তর দিল, “ওরা দুজন ট্রুথ অর সাইলেন্স খেলবে।”
ফুল আগ্রহী হয়ে জানতে চাইল, “এটা কেমন খেলা? ট্রুথ অর ডেয়ার শুনেছি। ট্রুথ অর সাইলেন্স কখনো শুনিনি তো।”
সোহম বাড়তি ব্যাখ্যা দিয়ে ফিসফিসিয়ে বলল, “আমাদের গ্রুপে তাকেই সবচেয়ে শক্তিশালী হিসেবে মানা হয় যার সাথে পাঞ্জা লড়ে কেউ জিততে পারবে না। একদিন পার্টি চলাকালীন আমাদের বর্তমান মাস্টার মানে ‘তেহজিব’ পূর্ববর্তী মাস্টারকে বলে ফেলেছিল সে তার সাথে পাঞ্জা লড়তে চায়। লেট মাস্টার যাকে আমরা অবশ্য স্যার বলে ডাকতাম সে এক কথাতেই রাজি হয়ে গিয়েছিল। বলে রাখা ভালো, সেই পর্যন্ত কেউ তাকে হারাতে পারেনি। খেলার আগমুহূর্তে স্যার শর্ত রেখে বলেছিলেন, ‘যে হারবে তাকে প্রতিপক্ষ একটা প্রশ্ন করবে, তাকে সেই প্রশ্নের সঠিক উত্তর দিতে হবে। যদি উত্তর না দিয়ে চুপ থাকে, তাহলে গুনে গুনে একশত বেত্রাঘাত সহ্য করতে হবে। আর যদি মিথ্যা বলে, কর্মফল স্বরূপ তার বলা মিথ্যা কথাটাই ভয়ঙ্করভাবে তার উপরেই একদিন লঘু হবে।’ এই ছিল, ট্রুথ অর সাইলেন্স গেমের ইতিহাস।”
ফুল সম্পূর্ণ মনোযোগ দিয়ে ব্যাখ্যাটুকু অনুধাবন করল। “আপনারা আগের মাস্টার কর্মফলে এত বিশ্বাস করতেন?”
সোহম পুনরায় নিচু গলায় বলল, “হ্যাঁ, কারণ তিনি একজন বুদ্ধিস্ট ছিলেন। ধর্ম নিয়ে ততটা বাড়াবাড়ি না করলেও এই একটা বিষয় খুব মানতেন। তিনিই তেহুর জন্য give and take স্ট্র্যাটেজি বানিয়েছিলেন। যেটা আমরাও ফলো করার চেষ্টা করি। যাতে কর্মফলের ভারে চাপা পড়ে না যাই।”
ফুলের মাথায় একটার পর একটা প্রশ্ন প্রবল বেগে ছুটে চলেছে। কিন্তু তার উৎসুক নারীমন সব প্রশ্ন দাবিয়ে রেখে অপ্রাসঙ্গিক প্রশ্নটাই আগে করে বসল, “সেদিন লড়াইয়ে কে জিতেছিলেন?”
সোহম ফুলের প্রশ্নের উত্তর দিতে পেরে আনন্দে নেচে উঠল। ফুল তার সঙ্গে এত কথা বলছে ভাবতেই সুড়সুড়ি অনুভূত হচ্ছে। সে অত্যন্ত গর্ব করে বলল, “সবাইকে একদম হতবাক করে দিয়ে সেদিন আমাদের তেহ জিতে গিয়েছিল।”
চেপে রাখা দমটা ছেড়ে দিল ফুল। সে কখন যে অস্থির হয়ে গিয়েছিল নিজেই জানে না। “জিতে গিয়ে সে খুব খুশি হয়েছিল নিশ্চয়ই?”
সোহমের মুখের হাসি নিমিষেই মিলিয়ে গেল। বুঝতে পারল, সে অনেক কিছুই বলে ফেলেছে যেগুলো বলা ঠিক হয়নি। তবুও মানসপটে ভেসে উঠল সেদিনের স্মৃতির খণ্ডাংশ। উদ্যান মূলত রিহানের উসকানিতে পড়ে স্যারের সাথে লড়াই করার মনস্তাপ করেছিল। জেতার পর উদ্যান স্রেফ একটা প্রশ্নই ছুড়েছিল। সেটা হলো, “স্যার, আপনি আপনার পজিশনে নেক্সট কাকে দেখতে চান?”
উদ্যানের মুখ থেকে সত্য বের করতে গিয়ে এভাবে নিজের মনের কথা স্বীকার করতে হবে ভাবতেও পারেননি স্যার এল ট্রুয়েনো। তবুও অকপটে বলেছিলেন, “আমি তোকে দেখতে চাই তেহ। আমি হলফ করে বলতে পারি তুই আমার চেয়েও অনেক বড় পজিশনে যাবি একদিন।”
উদ্যানের মুখে খুশির ছিটেফোঁটাও পরিলক্ষিত হলো না। সে শুধু রিহানের দিকে তাচ্ছিল্যের দৃষ্টি ছুড়ে দিয়েছিল। বিপরীতে রিহান রাগে পারছিল না সবকিছু তছনছ করে দিতে।
“সোহম স্যার, কী হলো?” ফুলের ডাকে সোহমের হুঁশ ফিরল। বোকা বোকা হেসে বলল, “হ্যাঁ, হ্যাঁ বলো।”
ফুল গলার স্বরে ভার নামিয়ে শুধাল, “সেই মাস্টার এখন কোথায়? তার সাথে ওনার ঠিক কেমন সম্পর্ক ছিল?”
সোহম বুঝতে পারল সে আর একটু মুখ খুললেই বাজেভাবে ফেঁসে যাবে। মূলত সে খুব সহজেই মিথ্যা বলে দিতে পারে না। আর না পারে চটজলদি মনগড়া কাহিনী বানিয়ে শুনিয়ে দিতে। এটা তার একধরনের উইক পয়েন্ট। তাই নিজের সুরক্ষার কথা ভেবে বাক্যহারা হয়ে প্রায়শই নিশ্চুপ হয়ে যায়।
হঠাৎই অনিলার অট্টহাসির শব্দ ভেসে এল। ফুল ঝাঁকুনি খেয়ে সেদিকে দৃষ্টি নিক্ষেপ করল। অনিলা অনবরত বলেই চলেছে, “জিতে গেছি, জিতে গেছি। ইয়াহু!”
সোহম হতবিহ্বল হয়ে চেঁচিয়ে উঠল, “কিহ? অনি তুই অনিলার কাছে হেরে গেছিস? লাইক সিরিয়াসলি?”
অনিলা গাল ফুলিয়ে বলল, “এত অবাক হওয়ার কী আছে? তুমি বরং কাউকে গিয়ে করলার জুস নিয়ে আসতে বলো।”
সোহম মুখ বিকৃত করে ফেলল সঙ্গে সঙ্গে। “করলার জুস দিয়ে কী করবে?”
অনিলা হাত নাড়িয়ে নাড়িয়ে বলল, “আমার প্রশ্নের উত্তর না দিলে ওকে করলার জুস খাওয়াব।”
সোহম তাজ্জব বনে গেল। “অ্যা?”
অনিলা নাক উঁচু করে বলল, “অ্যা নয় হ্যাঁ, যাও নিয়ে এসো।”
সোহম মেকি হেসে অনিকে শাসিয়ে বলল, “বউয়ের কাছে হেরে গিয়ে মান-সম্মান তেজপাতা বানিয়ে দিলি তো, পরেরবার আসিস আমার সঙ্গে টেক্কা দিতে তখনও যদি এভাবে হেরে না যাস খবর আছে তোর।”
সোহম মুখ ভেঙিয়ে করলার জুস আনতে চলে গেল।
অন্যদিকে উদ্যান ছাদের রেলিঙে হাত রেখে দাঁড়িয়ে তাদের কর্মকাণ্ড পর্যবেক্ষণ করছে। আঙুলের ফাঁকে ধরে রাখা সিগারেট নিজ গতিতে পুড়ে যাচ্ছে। লুহান মাথা নিচু করে চেয়ারে বসে আছে। উদ্যান সিগারেটে টান দিয়ে নির্লিপ্ত সুরে বলল, “তুই যাচ্ছিস না কেন?”
লুহান অনুশোচনার ভারে নুইয়ে গিয়ে বলল, “আমি দুইবার নিজের কাজে ব্যর্থ হয়েছি। একবার তোকে রিহানের আক্রমণ থেকে বাঁচাতে পারিনি, আরেকবার ফুলের প্রোটেকশন নিশ্চিত করতে পারিনি। তুই আমাকে চাইলে পানিশড করতে পারিস।”
“তোকে পানিশড করলেও কোনো লাভ হবে না। আমার মনে হয় তুই নিজের কাজে পুরোপুরি কনসেন্ট্রেশন করতে পারছিস না।”
লুহান দীর্ঘশ্বাস ফেলে উঠে দাঁড়াল। “হ্যাঁ, সেই ঘটনাটাই লাগাতার মনোযোগে বিঘ্ন ঘটাচ্ছে। রুমাকে কি কোনোভাবে দূরে কোথাও পাঠিয়ে দেওয়া যায় না?”
উদ্যান সিগারেট ফেলে দিয়ে দুহাত পকেটে ঢুকিয়ে নিল। ঘাড় কাত করে বলল, “আপাতত যাচ্ছে না। আমার সন্দেহের লিস্টে ওর নামও রয়েছে।”
লুহান হকচকিয়ে গেল। “ও কোনোভাবেই রিহানের সঙ্গে জড়িত থাকতে পারে না তেহ।”
উদ্যান তাকে পাশ কাটিয়ে হাঁটতে লাগল। বিড়বিড়িয়ে বলল, “জড়িত না থাকলেই ভালো। স্পাইকে খুঁজে পেয়ে গেলে তোর যেখানে ইচ্ছা ওকে সেখানে পাঠিয়ে দিস।”
এক জগ করলার জুস নিয়ে সোহমকে এগিয়ে আসতে দেখে মেলো কানের হেডফোন খুলে তাকে অনুসরণ করে টেবিলের কাছে চলে এল। তখনই উদ্যান আর লুহানও উপস্থিত হলো। ফুল হঠাৎ উদ্যানকে দেখে কেঁপে উঠল। উদ্যান চুইংগাম চিবোতে চিবোতে একনজর তাকে দেখে নিয়ে চেয়ারে বসে পড়ল।
“আরে করলার জুসের কোনো প্রয়োজন নেই। তুমি তাড়াতাড়ি যা প্রশ্ন করার করে ফেলো।” অনির কণ্ঠ শুনে মনে হচ্ছে অনিলার চেয়েও সে বেশি উৎসাহী। করলার জুস টেবিলের ওপর রেখে দিতেই অনিলা নড়েচড়ে বসল। বুক ভরে শ্বাস নিয়ে হুট করে প্রশ্ন করে ফেলল, “ঠিক কী করলে তুমি আমাকে মুক্ত করে দেবে? সত্যি করে বলো।”
সঙ্গে সঙ্গে অনির মুখ চুপসে গেল। সে ইচ্ছা করেই হেরে গেছে স্রেফ অনিলার প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার জন্য। কিন্তু এই মুহূর্তে এমন প্রশ্ন সে আশা করেনি। হতাশায় অনি চেয়ারে সমস্ত শক্তি ছেড়ে দিয়ে নিষ্প্রাণ হয়ে বসে রইল কিছুক্ষণ। অনিলা অভিমানী সুরে আওড়াল, “আমি জানতাম তুমি এই প্রশ্নের উত্তর দেবে না। সেই জন্যই করলার জুস আনিয়েছি।”
অনি তড়াক করে সোজা হয়ে বসল। চোখেমুখে গাম্ভীর্য টেনে তৎক্ষণাৎ উত্তর দিয়ে দিল। “তুমি আমাকে মেরে ফেললে মুক্ত হয়ে যেতে পারবে।”
অনিলা মুহূর্তেই থমকে গেল। ফ্যালফ্যাল নয়নে চেয়ে রইল অনির থমথমে মুখপানে। উত্তরটা যে তার মনঃপূত হয়নি তা স্পষ্ট। অনিলা উঠে যেতে নিলে অনি খপ করে আবারও তার হাত ধরে ফেলে। “আমি আরেক রাউন্ড খেলতে চাই।”
অনিলার মন সায় দিল না। হাত ছাড়ানোর জন্য ছটফটিয়ে উঠল। কিন্তু অনিও নিজের কথায় অনড়। সে খেলবে মানে খেলবেই। নিরুপায় হয়ে অনিলাকেও খেলতে হলো। সেকেন্ডের মধ্যেই জিতে গেল অনি। সোহম সিটি বাজিয়ে অনির পিঠে ঠাস ঠাস করে বাহবা দিল। অনিলা মুখ বেজার করে পালিয়ে যাওয়ার পথ খুঁজতে লাগল, কিন্তু আত্মসম্মানের খাতিরে চলে যেতে পারল না।
লুহান তাড়া দিয়ে বলল, “রান্না কমপ্লিট হয়ে গেছে। দ্রুত খেলা শেষ কর। খিদে পেয়েছে খুব।”
অনি বাহু টানটান করে প্রশ্ন করল, “ঠিক কী করলে তুমি আমাকে ছেড়ে চলে যেতে চাইবে না নিলা?”
অনিলা বিস্ফোরিত নয়নে তাকাল। কয়েক সেকেন্ড ভেবেও কোনো উত্তর বের করতে পারল না। আসলে এই প্রশ্নের উত্তর তার জানা নেই। করলার জুস দেখে এবার তার কান্না পেয়ে গেল। এই জন্যই হয়তো বলে কারো জন্য কুয়ো খুঁড়লে সেই কুয়োয় নিজেকেই পড়তে হয়।
“কী হলো অনিলা? উত্তর দেবে নাকি করলার জুস খাবে?” সোহমের ঠেস লাগানো কথায় সত্যি সত্যিই অনিলার চোখজোড়া ছলছল করে উঠল। ফুলের খারাপ লাগল তার জন্য। সে আগ বাড়িয়ে বলল, “এই খেলায় অবিচার হয়েছে অনিলা আপুর সঙ্গে। সে একজন মেয়ে হয়ে অনি স্যারের বিপরীতে না পারাটাই স্বাভাবিক। তাই শুধু শুধু আপুকে এত বড় শাস্তি দেবেন না।”
লুহান অনির পক্ষ নিয়ে বলল, “অনিলাকে কেউ ওটা খেতে জোর করেনি। অনির প্রশ্নের উত্তর দিয়ে দিলেই হয়ে যায়।”
অনিলা ঠোঁট চেপে কান্না নিয়ন্ত্রণে নিয়ে গ্লাসের দিকে হাত বাড়িয়ে দিল, তখনই অনি বাধা দিয়ে সাবলীল গলায় বলল, “এগুলো খেতে হবে না। জাস্ট ‘দামে উন বেসো’। ব্যাপারটা মিটে যাবে।”
অনিলা ছিটকে দূরে সরে গেল। সোহম হো হো করে হেসে উঠল। লুহান হাসি আটকে খুক খুক করে কাশল। ফুল হা হয়ে অনির কথাটা বোঝার চেষ্টা করল। মনে পড়ে গেল এমন একটা কথাই উদ্যান একদিন বলেছিল তাকে; সে মানে বুঝতে পারেনি। রাগে অনিলার দিশেহারা অবস্থা; সে ফুঁসে উঠে ভিলার পথে হাঁটা ধরল।
অনি তপ্ত শ্বাস ফেলে কপাল চাপড়ে বলল, “সরি অনিলা, তোমাকে কিছু দিতেও হবে না আর করলার জুসও খেতে হবে না। শুধু রাগ করো না প্লিজ। তুমি যদি না খেয়ে চলে যাও আমি কিন্তু আরও বেশি রেগে যাব। নিজের জন্য পরিস্থিতি কঠিন করে ফেলো না।”
অনিলা পা ঘুরিয়ে ফিরে এল। অনির সাথে রাগ করে না খেয়ে থাকবে না সে। ফুল দোনোমোনো করে অনিলার পাশে গিয়ে থামল। মেইড দুজন খাবার সার্ভ করে দিচ্ছে। বাকিরাও যার যার মতো ব্যস্ত। অনিলার রাগ যে কমেনি তা তার কপালের ভাঁজ দেখেই বোঝা যাচ্ছে। ফুলকে আগেপিছে ঘুরঘুর করতে দেখে অনিলা জিজ্ঞেস করল, “কিছু কি বলবে ফুল?”
ফুল সরল হেসে ওপর-নিচ মাথা নাড়ল। “হ্যাঁ আপু, কিন্তু তুমি মনে হয় এখনো রেগে আছো তাই…”
“আমি তোমার ওপর রেগে নেই ফুল। যা বলতে চাও বলে ফেলো।”
ফুল ইতস্তত বোধ করে ভেঙে ভেঙে বলল, “আ…আপু তখন অনি স্যার তোমাকে অন্য ভাষায় কিছু একটা বলেছিল। তুমি কি আমাকে বলবে সে কী বলেছে?”
অনিলা নীরব রইল। ফুল হাত কচলাতে কচলাতে বলল, “বলো না আপু, আমার কাছে ফোন থাকলে ট্রান্সলেট করে নিতাম কিন্তু ফোন নেই তো।”
অনিলা দৃষ্টি নামিয়ে মিনমিনিয়ে বলল, “জাউরাটা স্প্যানিশে বলেছিল, ‘দামে উন বেসো’। যার মানে আমাকে একটা চুমু দাও।”
ফুল হা হয়ে গেল। উদ্যানের সেদিনের কথার অর্থ আন্দাজ করতে পেরে চোয়াল খসে পড়ে যাওয়ার উপক্রম। তাকে স্তব্ধ হয়ে যেতে দেখে অনিলার লজ্জা লজ্জা লাগল। “খেতে চলো, ফুল।”
অনিলা উল্টো ঘুরে চলে গেল। কিন্তু ফুল বেকুবের মতো ঠায় দাঁড়িয়ে আছে এখনো। সোহম দেখল উদ্যান একটা ফোনকল রিসিভ করে কথা বলতে একটু দূরে সরে গেছে।
এই অবকাশটুকু কাজে লাগিয়ে সোহম ফুলের পাশে গিয়ে দাঁড়াল। থিতু স্বরে বলল, “আমি তোমাকে ট্রুথ অর সাইলেন্স গেমের ব্যাপারে যা কিছু বলেছি তা আবার তেহকে বলে দিও না।”
হঠাৎ সোহমের কথায় ফুল ধরফরিয়ে উঠল। ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেল সোহমও। বুকে থুতু দিয়ে ফুল চোখ ফেরাল তার দিকে। ঠোঁট নেড়ে চালাকি করে বলল, “আমি একটা শর্তে বিষয়টা গোপন রাখব।”
সোহম মুখ কুঁচকে বলল, “তোমাকে একটু বেশি বলে ফেলা কি আমার অপরাধ ছিল, ডাউটফুল? তুমি এখন আমাকে বিষয়টা নিয়ে ব্ল্যাকমেইল করবে?”
ফুল মাথা চেপে ধরে অসহায় গলায় বলল, “আমি ব্ল্যাকমেইল করছি না, সোহম স্যার। আপনার সাহায্যের খুব প্রয়োজন। সেই জন্যই একটু ট্রিকি হওয়ার চেষ্টা করলাম।”
সোহম উৎসাহ দমিয়ে রেখে জানতে চাইল, “একটু ভালোভাবে সাহায্য চাইলেই আমি করে দেব। এতে ট্রিকস অ্যাপ্লাই করতে হবে না, স্কিলফুল।”
ফুল ঠোঁট যুগল প্রসারিত করে জোরপূর্বক হাসল। সোহমের দেওয়া নামগুলো তার কাছে বিরক্তিকর লাগে, কিন্তু পরিস্থিতি এমন যে সে চাইলেও কিছু বলতে পারবে না। সোহম ভ্রু উঁচিয়ে হাসিমুখে জিজ্ঞেস করল, “বলো মাইন্ডফুল, তোমাকে কীভাবে সাহায্য করতে পারি।”
ফুল সতর্ক চোখে আশপাশে চোখ ঘুরিয়ে ঠোঁট চেপে বলল, “আপনি আপনাদের তেহকে পাঞ্জা লড়াইয়ে চ্যালেঞ্জ করবেন। কোনোভাবে জিতে গেলে আমি যেই প্রশ্ন করতে বলব সেই প্রশ্নটা করবেন।”
সোহম আঁতকে উঠে পিছিয়ে গেল। মাথা নেড়ে বলল, “মনস্টারের শক্তি সম্পর্কে তোমার কোনো ধারণা নেই, ফিয়ারফুল। যদি থাকত তাহলে আমাকে এটা করতে বলতে না।”
ফুল একটু সাহস জুগিয়ে বলল, “আপনাকে দেখেও কোনো অংশে কমজোর বলে মনে হচ্ছে না। আপনি সবটুকু দিয়ে লড়লে ঠিক তাকে হারিয়ে দিতে পারবেন। একবার চেষ্টা করে তো দেখুন।”
সোহমের ঘাম ছুটে গেল। কিন্তু ফুলের সামনে নিজেকে ভীতু বলে প্রমাণ করতে চায় না সে। ‘ভীতু?’ সোহম কি সত্যিই ভীতু? আহা! সে ভীতু নয়, কিন্তু মাস্টারকে চ্যালেঞ্জ ছোড়ার মতো এক্সট্রিম লেভেলের সাহসীও নয়। সে জানে স্রেফ চ্যালেঞ্জ ছোড়ার কারণেও তাকে পানিশমেন্ট দেওয়া হতে পারে।
সোহম মেকি হেসে কেটে পড়তে চাইল কিন্তু ফুলও নাছোড়বান্দা। তার পেছনে আঠার মতো লেগে রইল।
“সোহম স্যার, ওনার হাতে ব্যথা। কোনোভাবেই আপনাকে হারাতে পারবে না। বিলিভ ইওরসেল্ফ, আপনিই জিতবেন।” ফুলের চোখ চকচক করছে। যেন সে ভবিষ্যদ্বাণী করে বলে দিচ্ছে সোহমই জিতবে। ফুলকে সোহমের পেছন পেছন ঘুরঘুর করতে দেখে উদ্যানের সম্পূর্ণ মনোযোগ ফোন থেকে সরে গেল।
সোহম আগাম সতর্ক সংকেত আঁচ করতে পেরে ফুলকে থামিয়ে দিয়ে বলল, “তেহ আমাকে চোখ দিয়ে ভস্ম করে দেওয়ার আগে তুমি নিরাপদ দূরত্বে পিছিয়ে যাও।”
ফুল জেদ ধরে বলল, “আপনি রাজি না হওয়া পর্যন্ত যাব না আমি।”
সোহম বিমর্ষচিত্তে শ্বাস ফেলে বলল, “আমি রাজি হয়ে যাব। কিন্তু তোমার জন্য আমাকে পানিশড হতে হলে তোমার কি একটুও খারাপ লাগবে না?”
ফুল ফটাফট বলল, “আমি আপনাকে পানিশমেন্টের হাত থেকে বাঁচাব।”
ফুলের প্ররোচনায় সোহম ইচ্ছার বিরুদ্ধে গিয়ে রাজি হয়ে গেল। রোবটিক পায়ে উদ্যানের সামনাসামনি গিয়ে দাঁড়াল। ফুল চেতনার স্ফুলিঙ্গে জ্বলজ্বল করে উঠল। বাকিরা খাবার খেতে বসেছিল সবেমাত্র, তখনই সোহম উদ্যানের ডান হাত ধরে ঘোষণা করে দিল, “আমি তেহুর সঙ্গে পাঞ্জা লড়তে চাই।”
সবার খাওয়া-দাওয়া থেমে গেল মুহূর্তেই। উদ্যান তীক্ষ্ণ চোখে তাকাল সোহমের হাতের পানে—যেই হাত দিয়ে সে তার হাত ধরে রেখেছিল।
টেবিলের এক প্রান্তে বসে আছে উদ্যান, আরেক পাশে সোহম। অন্যরা তটস্থ হয়ে চারপাশে দাঁড়ানো। উদ্যান শার্টের হাতা গোটাতে গোটাতে অনর্থক তাকিয়ে আছে একদিকে।
লুহান বিচলিত কণ্ঠে বলল, “ইউ ক্লিয়ারলি মেসড আপ, নইলে তেহকে খেলতে নামাতি না।”
সোহম ওর দিকে ফিরে চাপা স্বরে বলল, “তুই আবার মেসড আপ করিস না। নইলে তোর পরিণতিও আমার মতোই হবে। ভালো হবে কোথাও গিয়ে লুকিয়ে পড়। আমার কেন জানিনা মনে হচ্ছে, ওর নেক্সট বলির পাঁঠা তুই।”
লুহান বুঝে উঠতে পারল না ঠিক কোন বিষয়ে সোহম তাকে সতর্ক করল। মেলো আপত্তি জানিয়ে আওড়াল, “তেহুর হাতের ক্ষত পুরোপুরি শুকায়নি। আজই তোর পাঞ্জা লড়তে মন চাইল? ওর ঘায়েল হওয়ার সুযোগ এভাবে হাতিয়ে নিচ্ছিস?”
সোহমের মন খারাপ হয়ে গেল। তবুও কোনো প্রত্যুত্তর করল না। খেলা শুরু হলো, সবাই লক্ষ্য করল ফুল হাততালি দিয়ে সোহমকে চিয়ার-আপ করছে। প্রথম দিকে উদ্যান হাত নাড়াচ্ছিল না; মাঝবরাবর দাঁড় করিয়ে রেখেছিল।
ফুল ভেবেছিল সোহম হয়তো জেতার সন্নিকটে। কিন্তু সোহম হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছিল উদ্যান জেনে-বুঝে তার হাত দুমড়ে-মুচড়ে ফেলছে। ফুলের সামনে সে গুঙিয়ে উঠতেও পারছে না। দাঁতে দাঁত পিষে সহ্য করে নিচ্ছে। একপর্যায়ে না পেরে সে হেরে যেতে চাইল, কিন্তু উদ্যান তাও হতে দিল না। তার হাত স্থির করে ধরে রাখল। ফুলের দিকে না তাকিয়েও যেন দানবটা ফুলের চিয়ার-আপ গভীর মনোযোগ দিয়ে শুনছিল। ব্যথা অসহনীয় হয়ে উঠলে সোহম না পেরে বাম হাত দিয়ে টেবিলের ওপর বাড়ি মারতে লাগল।
সবাই বুঝতে পারল সে সংকেতে বোঝাতে চাইছে—‘পরাজয় স্বীকার করে নিয়েছে’। কিন্তু উদ্যান বিন্দুমাত্র পরোয়া করল না। সোহম ব্যথায় ককিয়ে উঠতেই ফুল থমকে গেল। সাথে সাথেই উদ্যান সোহমের হাত টেবিলে ঠেকিয়ে ছেড়ে দিল।
সোহম নিজের হাত গুটিয়ে নিয়ে ফুঁ দিতে লাগল। যন্ত্রণায় তার প্রাণ ওষ্ঠাগত। গলা ফাটিয়ে ব্যথাতুর কণ্ঠে খেঁকিয়ে উঠল, “কে কোথায় আছিস? বরফ আন জলদি।”
একজন মেইড ছুটে গেল বরফ আনতে। বরফে হাত চুবিয়ে যেন প্রাণে পানি পেল সোহম। মেলো ফিচেল হেসে বলল, “তেহ, এবার তোর যা মন চায় ওকে জিজ্ঞেস কর।”
ফুল মুখ কালো করে তাকিয়ে আছে। সোহমের জন্য খারাপ লাগছে তার। কিন্তু সে হার মানেনি এখনো। চোখ ঘোরাতেই লুহান নজরে এল। সে পা টিপে টিপে তার দিকে এগিয়ে গেল।
কোমল সুরে ডাকল, “লুহান স্যার, শুনুন না।”
লুহান ভ্রু কুঁচকে চোখ ফেরাল। “হ্যাঁ বলো।”
ফুল উচ্ছ্বসিত হয়ে তাকে নিজের পিছে পিছে যেতে ইশারা করল। লুহান সাদাসিধা মনে চলে গেল খানিকটা দূরে। ফুল সৌজন্যমূলক হেসে বলতে শুরু করল, “এখানে উপস্থিত সবার মধ্যে আপনাকে সবচেয়ে শক্তিশালী বলে মনে হচ্ছে। তার ওপর আপনি নাকি প্রোটেকশন চিফ। আপনি কেন খেলছেন না ওনার সাথে? নিজের শক্তি যাচাই করার সুবর্ণ সুযোগ হাতছাড়া করলে পাপ হবে।”
লুহান তৎক্ষণাৎ বুঝে গেল সোহম এই প্রলুব্ধতার পূর্বাভাসই দিয়েছিল তাকে। সে মিছেমিছি বাহানা দিয়ে বলল, “তেহুর হাতের অবস্থা ভালো নেই। এখন ওকে জ্বালানো ঠিক হবে না।”
ফুল মুখ বাঁকিয়ে বলল, “হাতের অবস্থা ভালো না থাকার পরেও সোহম স্যার জিততে পারেননি। ভালো থাকলে নিশ্চয়ই জিতে উল্টিয়ে ফেলতেন, তাই না?”
লুহান উল্টো ফুলকে আবেগে ভাসিয়ে দেওয়ার লক্ষ্যে বলল, “ওয়াইফ হয়ে হাজব্যান্ডের দুর্বলতার ফায়দা নিতে বলছো? খারাপ লাগছে না ওর জন্য?”
ফুলের বুকের ভেতর ধক করে উঠল। অস্থিরতা আগ্রাসী হয়ে ওঠার আগেই অনুভূতি দমিয়ে রেখে বলল, “আপনারা কেউ বুঝতে পারবেন না তাকে ঘিরে আমার মনে কতগুলো প্রশ্ন জমে আছে, যেগুলোর উত্তর পাওয়া আমার জন্য অপরিহার্য হয়ে উঠেছে।”
লুহান ঠাট্টা করে বলল, “তাহলে তুমি কেন লড়ছো না?”
ফুল হড়বড়িয়ে গেল। “আ…মি?”
“হ্যাঁ তুমি, তুমি ট্রাই করে দেখো।”
লুহান চলে যেতে নিলে ফুল রেগেমেগে বলে ফেলে, “আমি তখন আপনাকে পানিশমেন্টের হাত থেকে বাঁচিয়েছিলাম, তাই আপনি এখন আমার হয়ে ওনার সঙ্গে পাঞ্জা লড়বেন।”
লুহান বিরক্ত হয়ে বলল, “আর আমি এমন না করলে তুমি কী করবে?”
“আমি ওনার কাছে গিয়ে বলব, আমাকে পর্যাপ্ত প্রোটেকশন দিতে না পারার কারণে আপনাকে পানিশমেন্ট দিতে।”
লুহান অবিচল কণ্ঠে বলল, “যাও গিয়ে বলো। আমি পানিশড হতে এতটাও ভয় পাই না।”
ফুল বুঝতে পারল যেই কথাটা সে বলতে চায় না, সেই কথাটাই এই মুহূর্তে বলতে হবে। ফুল দৌড়ে এসে তার পথরোধ করে ফেলল। “আপনি যদি আমার হয়ে তার সঙ্গে না লড়েন, তাহলে আমি সেই কথাটা সবাইকে বলে দেব যেটা আপনি সবসময় লুকিয়ে রাখতে চেয়েছেন।”
লুহানের শরীর থেকে যেন আত্মাটা এক মুহূর্তের জন্য বেরিয়ে গেল। “কী বলে দেবে তুমি?”
ফুল দৃষ্টি মাটিতে নিক্ষেপ করে শীতল গলায় বলল, “আপনার সঙ্গে রুমা আপুর চক্কর চলছে। আপনি তার সাথে যা করেছেন আমি বিস্তারিতভাবে বাকিদের খুলে বলব।”
এই একটা বাক্যই যথেষ্ট ছিল লুহানকে হাতির বাচ্চা থেকে ভেজা বিড়ালে রূপান্তর করে দেওয়ার জন্য। ফুল সেদিন তাদের কথা শুনে ফেলেছে ভাবতেই গলা শুকিয়ে গেল। দমবন্ধ হয়ে এল। তবুও ভাবমূর্তি অক্ষুণ্ণ রেখে বলল, “তুমি সেদিন কতটুকু শুনেছো? আগে বলো, তারপর আমি ভেবে দেখব।”
ফুল কুটিল হেসে বলল, “আমি যা যা শুনেছি পুরোটা কেবল বাকিদের সামনেই বলব। আপনি বরং তখনই শুনে নিয়েন।”
ফুল হাঁটা ধরতেই লুহান উপায়হীন হয়ে বলে উঠল, “দয়া করে কাউকে সেই প্রসঙ্গে কিছু বলো না ফুলপরী, বিশেষ করে মেলোকে। দেখো আমি কত সুন্দর করে তোমাকে বলেছি, কতটা অসহায় শোনাচ্ছে আমার কণ্ঠ। আমি জানি তুমি অনেক দয়ালু। আমাকে বিপদে ফেলবে না।”
ফুলের পা থেমে গেল। ম্লান কণ্ঠে বলল, “আপনি আমার প্রশ্নের উত্তর খুঁজে পেতে সাহায্য করুন। আমি কাউকে কিছু বলব না।”
ফুল চলে গেল বাকিদের কাছে। উদ্যান নির্লিপ্ত ভঙ্গিতে বসে বসে শিক কাবাব খাচ্ছে। অনিলার থেকে ফুল জানতে পারল সোহমকে উদ্যান কোনো প্রশ্নই করেনি, আর না তো কোনো পানিশমেন্ট দিয়েছে। কথাটা শুনে ফুল স্বস্তির নিঃশ্বাস ত্যাগ করল। লুহান হঠাৎ উদ্যানের সামনে গিয়ে দাঁড়াল। খপ করে হাত ধরে বলল, “আমিও তোকে চ্যালেঞ্জ করছি।”
উদ্যান ঘাড় কাত করে কাবাবটুকু মুখে পুরে বলল, “ওকে, লেটস প্লে। ইটস গোয়িং টু বি ইন্টারেস্টিং।”
খেলা শুরু হতেই ফুল চিয়ার-আপ করতে লাগল। সোহম পাশে এসে বলল, “এভাবে চেঁচিও না। তুমি যতক্ষণ চেঁচিয়েছ, ততক্ষণ ও আমার হাতে বলপ্রয়োগ করে গেছে; হার মানার পরেও ছাড়েনি। সো চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকো।”
ফুল থেমে গেল। মিনমিনিয়ে বলল, “সরি সোহম স্যার। আমি বুঝতে পারিনি আমার এই সামান্য খুশিতে সিচুয়েশন এত খারাপ হয়ে যাবে। তবে আজ আমি বুঝতে পারলাম আপনি ততটাও খারাপ নন যতটা আমি ভেবেছিলাম।”
এই স্বল্প প্রশংসাতেই সোহম যেন ব্যাপক খুশি হলো। লুহানের সাথে লড়তে গিয়ে উদ্যানকে কিছুটা বেগ পেতে হলেও শেষমেশ জয়ের শিরোপা উদ্যানের হাতেই উঠল। লুহান ফুলের দিকে তাকিয়ে মলিন হাসল। ফুল ঠোঁট ফুলিয়ে বলল, “কোনো ব্যাপার না। আপনি চেষ্টা করেছেন এটাই অনেক।”
ফুলের শেষ ভরসা ছিল অনি। অবশ্য তাকে রাজি করাতে বেশি কসরত করতে হয়নি। ফুল শুধু বলেছিল, “আপনি ওনার সঙ্গে খেলতে রাজি হলে আমি আপনাকে এমন কিছু টিপস দেব যা ফলো করে আপনি অনিলা আপুর মনে জায়গা করে নিতে পারবেন।”
ব্যাস, এটুকুতেই কাজ হয়েছে। উপরন্তু উদ্যান কাউকে পানিশমেন্ট দিচ্ছিল না এমনকি কোনো প্রশ্নও করছিল না, তাই অনি রাজি হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু উদ্যান তাকেও হারিয়ে দিয়েছে।
খেলা শেষে ফুল এক কোণায় চুপচাপ দাঁড়িয়ে ছিল। এত চেষ্টা করেও সে উদ্যানকে প্রশ্ন করার একটা চান্সও পেল না। বিষয়টা তাকে নৈরাশ করেছে। সে নিজের ভাবনায় ডুবে ছিল, তখনই কারো হাতের অকস্মাৎ স্পর্শে সে ঝাঁকুনি খেয়ে পেছনে ফেরে। দেখতে পায় উদ্যান তার হাত ধরে ফেলেছে। তাকে কিছু বলার অবকাশ না দিয়েই উদ্যান নিস্পৃহ কণ্ঠে বলে ওঠে, “আই ওয়ান্ট টু প্লে উইথ ইউ। আমি তোমাকে চ্যালেঞ্জ করছি।”
তার অকপট আর্জিতে ফুলের রন্ধ্রে রন্ধ্রে বিদ্যুৎ তাড়িত হলো। ঢোক গিলে বলল, “আমি খেলব না আপনার সাথে। হাত ছাড়ুন।”
উদ্যান ঠোঁট প্রসারিত করে হালকা হাসল। পরপরই ফুল নিঃশ্বাস নিতে ভুলে গেল। উদ্যান তার কানের কাছে মুখ নামিয়ে বলল, “তুমি যদি না খেলো, আমি ওদের তিনজনকে এমন এমন প্রশ্ন করব যার উত্তর ওরা কেউ দিতে পারবে না। আর তারপর সাইলেন্ট থাকার অপরাধে তিনজনকেই পানিশমেন্ট দেব।”
ফুল টলমলে নয়নে ক্যাম্প-ফায়ারের নিকট বসে থাকা বাকিদের দিকে তাকাল। প্রত্যেকে নিজেদের মতো করে এনজয় করছে।
“কী? তুমি খেলবে নাকি আমি…”
ফুল ঠোঁট কাঁপিয়ে বলল, “আপনি ওনাদের কোনো প্রকার শাস্তি দেবেন না। আমি খেলব আপনার সাথে।”
উদ্যান ফুলের সম্মতি পেয়ে তাকে টেনে নিয়ে গেল টেবিলের দিকে। সবাই অবাক হয়ে তাদের পানে দৃষ্টি নিক্ষেপ করল। যখন বুঝতে পারল ফুল উদ্যানের চ্যালেঞ্জ অ্যাকসেপ্ট করেছে, তখন তারা একজন আরেকজনের দিকে তাকিয়ে শুকনো ঢোক গিলল। ফুলের শরীর থরথর করে কাঁপছে। সে একদম তৈরি নয় উদ্যানের সঙ্গে পাঞ্জা লড়তে। প্রচণ্ড আতঙ্কিত হয়ে সে বলে ফেলল, “আপনি একজন পুরুষ, বয়সেও আমার চেয়ে অনেক বড়। আমাদের এই খেলাটা আনফেয়ার হবে। ফেয়ারলি খেলতে চাইলে আমাকে দুহাত ব্যবহার করার অনুমতি দিন।”
উদ্যান জিভের অগ্রভাগ গালের ভেতরের ত্বকে ঠেকিয়ে অত্যন্ত খাপছাড়া গলায় উচ্চারণ করল, “অনুমতি দিলাম। তুমি চাইলে হাতের পাশাপাশি পা-ও ইউজ করতে পারো। কিন্তু মনে রেখো, আমি তোমার ওপর বিন্দুমাত্র দয়া করব না। বস্তুত আমি দয়া করতেও জানি না।”
চলবে,,,
শব্দসংখ্যা: ৩৮০০+
(নেক্সট পর্বে উদ্যানের হারার চান্স কতটুকু? অনুমান করে কমেন্টে লিখুন। দেখি কে কে সঠিক অনুমান করতে পারে। আর হ্যাঁ লাইক করতে ভুলবেন না।)
Share On:
TAGS: অবাধ্য হৃৎস্পন্দন, সোফিয়া সাফা
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
অবাধ্য হৃৎস্পন্দন পর্ব ৩৫
-
অবাধ্য হৃৎস্পন্দন পর্ব ৯
-
অবাধ্য হৃৎস্পন্দন পর্ব ৩৯
-
অবাধ্য হৃৎস্পন্দন পর্ব ১০
-
অবাধ্য হৃৎস্পন্দন পর্ব ৩
-
অবাধ্য হৃৎস্পন্দন পর্ব ১৬
-
অবাধ্য হৃৎস্পন্দন পর্ব ২২
-
অবাধ্য হৃৎস্পন্দন পর্ব ১১
-
অবাধ্য হৃৎস্পন্দন পর্ব ৩০
-
অবাধ্য হৃৎস্পন্দন পর্ব ১