অন্তরালে_আগুন
পর্ব:২৯
তানিশা সুলতানা
“আমার ভাইয়ের কি অপরাধ? তাকে কেনো অ্যারেস্ট করা হলো?
মানিকগঞ্জ সদর থানার এসিপি আশিক রহমানকে প্রশ্ন করে নুপুর। তোর চোখে ভয়ের ছিটেফোঁটাও নেই।
সারারাত থানার বাইরে দাঁড়িয়ে ছিলো। এক পা নড়েনি।
আশিক জবাব দেয়
“প্রধানমন্ত্রীর ছেলে অভি চৌধুরীর সুপারিশে এমপি সাহাবুদ্দিনকে হত্যা করেছে আপনার ভাই। যথাযোগ্য প্রমাণ রয়েছে আমাদের কাছে।
আশ্চর্য হয় নুপুর। কি বলছে এসব? হত্যা করলো কে? আর নাম দিচ্ছে কার?
এসব কিছু নায়েব তালুকদারের কারসাজি। চোয়াল শক্ত হয় নুপুরের। হাত মুষ্টিবদ্ধ করে।
” কি প্রমাণ রয়েছে আমাকে দেখান।
“একেবারে কোর্টেই প্রমাণ পেশ করা হবে। আপনি প্লিজজ আমাদের ডিস্টার্ব করবেন না।
” ওকেহহহ ডিস্টার্ব করবো না। নিজে হাতে লিখে একটা লিখিত দেন
আমার ভাইকে যদি গুম করে দেওয়া হয় তাহলে তার দায়ভার আপনার। আপনি নিজেই গুম করবেন।
আশিক ঘাবড়ায়। কপাল কুঁচকে বলে
“গুম করা কেনো হবে?
” কারণ আপনারা ঘুস খাওয়া কুকুর। নায়েব তালুকদার হাতে কিছু টাকা ধরিয়ে দিয়েছে আর আমার ভাইকে খুনের আসামি বানিয়ে ধরে নিয়ে এসেছেন। এরপর আরও কিছু টাকা দিবে আর আপনি গুম করে দিবেন।
আপনাদের খুব ভালো করে চিনি আমি। পা চাটা কুকুর
রেগে যায় আশিক। টেবিলের থাপ্পড় মেরে দাঁড়িয়ে পড়ে। চোখ পাকিয়ে নুপুরের পানি তাকিয়ে ফিসফিস করে বলে
“মাইন্ড ইউর ল্যাঙ্গুয়েজ।
ভুলে যাবেন না আপনি থানায় দাঁড়িয়ে আছেন। পুলিশের সাথে বেয়াদবি করার অপরাধে এক্ষুনি আপনাকে লকাপে এ পুড়তে পারি।
“পারবেন না।
আমাকে অবলা নারী ভাববেন না।
আপনি যদি লিখিত না দেন তাহলে এ থানা থেকে আমি নড়বো না। আর মানিকগঞ্জের যত মানুষ আছে সবাইকে জোর করে আন্দোলন বসাবো থানার সামনে।না হয় আপনাকে খুন করে আমিও লকাতে বসে থাকবো।
আশিক শুকনো ঢোক গিলে। টেবিল থেকে খাতা কলম নিয়ে লিখে দেয় নুপুর যা যা বলছে। লেখা শেষ হলে কাগজটা নুপুরের দিকে এগিয়ে যায়। ও সেটা নিয়ে থানা থেকে বের হয়।
স্নেহা নেহালকে ছাড়ানোর জন্য উকিল হায়ার করে নিয়ে এসেছে। সবেই থানায় ঢুকবে তখনই নুপুরকে বেরিয়ে আসতে দেখে।।
“চাঁদ দেখো এডভোকেট নিয়ে এসেছি আমি। তোমার ভাই কে এখন জামিন করিয়ে নিয়ে যেতে পারবে।
নুপুর বলে
“আমি এক্ষুনি নওয়ান তালুকদারের সঙ্গে দেখা করতে চাই।
“হ্যাঁ করবে তার আগে তোমার ভাইকে যেমন করানো দরকার
“দেবে না জামিন। যতক্ষণ না নায়েব তালুকদার ছাড়তে বলবে ততক্ষণ কোন উকিলই পারবেনা আমার ভাইকে ছাড়াতে।
বলেই বড় বড় পা ফেলে চলে যায় নুপুর। প্রথমে মুনু মেডিকেল হাসপাতলে যায়। সেখানে তার বাবাকে ভর্তি করে রাখা হয়েছে। অবস্থা খুব একটা ভালো না। যখন তখন যা খুশি ঘটে যেতে পারে।
পতিতালয়ের ছোট্ট ছোট্ট ঘরের সামনে ছোট একটা উঠোন রয়েছে। সেই উঠোনের খেজুর পাতার পার্টি বিছিয়ে সুমিকে শুয়িয়ে রাখা হয়েছে। কিছু মুহূর্ত আগে দুনিয়ার মায়া ত্যাগ করেছেন সে। নায়েব তালুকদারের বডিগার্ডের অতিরিক্ত শারীরিক অত্যাচার সহ্য করতে না পেরে দেহ হতে প্রাণ খানা বেরিয়ে গেছে। কারো চোখে কোন পানি নেই। আফসোস নেই কারো মধ্যে। যেন যেটা হয়েছে ভালই হয়েছে। এ পৃথিবীটা তাদের জন্য না। এখান থেকে যত তাড়াতাড়ি বিদায় নিতে পারবে ততই ভালো।
আবির শুধু কাঁদছে। সুমির দেহখানা ধরে চিৎকার করে কাঁদছে। তার কান্নায় কলিজা কেঁপে উঠছে পতিতালয়ে থাকা প্রতিটা মেয়ের।
বৃষ্টি আনুর পাশে গিয়ে দাঁড়ায়। চোখ ভর্তি পানি তার। ভীষণ কষ্ট হচ্ছে। না না আবিরের জন্য না। এই জানোয়ারের কান্নায় বৃষ্টির একটুও খারাপ লাগছে না। এই নরকে যবে থেকে এসেছে তবে থেকেই সুমিকে দেখছে। ভীষণ কঠিন একজন মানুষ। তবে কেয়ারিং। মায়ের মতোই যত্ন করেছে সব গুলো মেয়ের। শুধু পারে নি এই নরক থেকে বাঁচাতে।
আজকে থেকে তাদের মাথার ওপরের ছাঁদ চলে গেলো। ভরসার মানুষটা চলে গেলো।
বড্ড একা হয়ে গেলো সব গুলো মেয়ে। তাদের আর আগলে রাখার মতো কেউ রইলো না।
আনু এক কোণায় দাঁড়িয়ে আছে। তার দৃষ্টি আবিরের মুখ পানে। এতিমের মতো কাঁদছে লোকটা। পাগলের মতো বিলাপ বকছে।
ঠিক যেমন ভাবে আনু কেঁদেছিলো। যতটা দুঃখ আনুর চোখে মুখে ফুঁটে উঠেছিলো ঠিক ততোটাই দুঃখ আবিরের চোখে মুখে।
মায়া হওয়া উচিত ছিলো কি?
নির্লজ্জ বেহায়ার মতো লোকটার সামনে দাঁড়িয়ে আঁচল দিয়ে তার চোখের পানি মুছিয়ে বলা উচিত ছিল
“কাঁদিয়েন না আপনার কান্না আমার সহ্য হয় না।
নিজের ভাবনায় হাসি পায় আনুর। মুখে হাত দিয়ে মৃদু শব্দে হেসে ওঠে।
বিরবির করে বলে
” “আমি এক আকাশ সমান ভালোবেসেও আপনাকে ধরে রাখতে পারি নি। অন্ধের মতো বিশ্বাস করেও আপনার মন পাই নি। পাগলের মতো আহাজারি করেও আপনার সঙ্গে থাকতে পারি নি।
আফসোস নেই।
তবে অভিযোগ আছে।
আর আমার অভিযোগই আপনাকে সারাজীবন কাঁদবে।
ঠিক এভাবেই।
আর পাঁচটা সাধারণ মানুষের মতো সুস্থ স্বাভাবিক জানায়া হয় না সুমির। পতিতালয়ের বেশ্যাদের জানাজাতে কেউ অংশগ্রহণ করবে না। কোনো গোরস্তানে তাকে কবর দেওয়া যাবে না।
আবির কয়েকটা গোরস্থানে ঘোরাঘুরি করে। মসজিদের ইমাম সাহেবের হাতে পায়ে ধরে। তারা জবাবই দেয় না আবিরের কথার।
শেষমেশ বাধ্য হয়েই সুমির লাশ ভাসিয়ে দিতে হয় পদ্মা নদীতে।।
এক মুঠো মাটি তার কপালে জোটে না।
এতোটাই খারাপ ভাগ্য নিয়ে দুনিয়াতে এসেছিলো সে।
আবিরের মুখোমুখি এসে দাঁড়ায় আনু। বুকে হাত গুঁজে চোখে চোখ রেখে বলে
“বউ বানানোর স্বপ্ন দেখিয়ে বেইশ্যা বানাই দিলা?
সুন্দর একটা ঘর উপহার দেওয়ার লোভ দেখিয়ে পতিতালয়ের সদস্য বানিয়ে দিলে?
দেখলে তো তোমার খালার পরিস্থিতি।
আমারও এমন অবস্থা হবে।।
একটএ জানায়া বা মাটি ভাগ্যে জুটবে না।
তুমিই আমার ভাগ্য থেকে এসব উঠিয়ে নিলে।।
তোমায় মাপ করে দেওয়া উচিত?
আবির জবাব দেয় না।
আনু আবার বলে
” আমি কোনো পাপ করি নি আবির। তাই আমাকে এখানে বেশিদিন থাকতে হবে না।।
আমি বেরবো।।
আমার ভালো দিন আসবে।
আমি আবার মাথা উঁচু করে বাঁচবো।।
তুমি দেখে নিও
মিলিয়ে নিও
তালুকদার বাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে আছে নুপুর। তাকে ভেতরে ঢুকতে দেওয়া হচ্ছে না। গার্ডরা কিছুতেই ভেতরে ঢুকতে দেবে না।।
নওয়ান নিজ কক্ষের বেলকনিতে দাঁড়িয়ে আছে। তার ঠোঁটের ভাজে সিগারেট। দৃষ্টি নুপুরের পানেই।
সে জানতো তার চাঁদ আসবে। তাকে আসতেই হতো।।
স্নেহা অনবরত ঝগড়া করে চলেছে দারোয়ানদের সাথে। তার কথা হচ্ছে নুপুরকে ভেতরে ঢুকতে দিতেই হবে।
তবে স্নেহার কথাও শুনছে না তারা।।
নুপুর মাথা উঁচু করে নওয়ানের দিকে তাকিয়ে আছে।।
নওয়ানও তাকিয়ে আছে। চোখে চোখে যেনো তাদের অনেক আলাপ চলছে।
“তাকে ভেতরে আসতে দিন।।
সী ইজ মাই বেড পার্টনার।
হঠাৎ নওয়ান বলে ওঠে।।
নুপুর অন্য দিনের মতো চুপ থাকে না। সেও তীব্র প্রতিবাদের সুরে বলে ওঠে
” স্ত্রীদের অসম্মান করা তালুকদার বাড়ির বংশগত রীতি।
বউকে বউ বলতে তাদের বিবেকে বাঁধে। কারণ বাইরে রক্ষিতা থাকে অনেক।
তবে আমি বউ পা বেড পার্টনার কোনো পরিচয়েই এখানে আসি নি।
এসেছি জানোয়ারদের মানুষ বানাতে।
চলবে
চলবে
Share On:
TAGS: অন্তরালে আগুন, তানিশা সুলতানা
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
অন্তরালে আগুন পর্ব ১৮
-
অন্তরালে আগুন পর্ব ৬
-
অন্তরালে আগুন পর্ব ৩৩
-
অন্তরালে আগুন পর্ব ২০
-
অন্তরালে আগুন পর্ব ৯
-
অন্তরালে আগুন পর্ব ২৮
-
অন্তরালে আগুন পর্ব ১৪
-
অন্তরালে আগুন পর্ব ২৩
-
অন্তরালে আগুন পর্ব ৩
-
অন্তরালে আগুন গল্পের লিংক