Golpo romantic golpo অন্তরালে আগুন

অন্তরালে আগুন পর্ব ৫৩


অন্তরালে_আগুন

পর্ব:৫৩

তানিশা সুলতানা

মরণব্যাধি অসুখে আক্রান্ত আমিনা। তার দুটো কিডনি ড্যামেজ হয়ে গিয়েছে। ফুসফুসে ক্যান্সার এবং লেবারে পচন ধরেছে। ডাক্তাররা রীতিমতো অবাক হয়ে যায়।
এই মানুষটা এতো এতো অসুখ নিয়ে কি করে হেসে খেলে বেড়িয়েছে এতদিন? কিভাবেই বা নিজের যন্ত্রণা গুলো চেপে রেখেছে? কাউকে কিছু বুঝতে দেয়নি। এতো সহ্য শক্তি কোথায় পেলো সে?
মীরা আচলে মুখ ঢেকে ডুকরে কাঁদছে৷ মন্নু হাসপাতালের তিন তালার ৩০৬ নাম্বার কেবিন দখল করে রেখেছে তারা। কেবিনের বাইরে কত শত পুলিশ গার্ড দাঁড়ানো। শত্রুপক্ষ যাতে হামলা করতে না পারে বা বীণা অনুমতিতে কেউ ভেতরে প্রবেশ করতে না পারে। এইদিকে তারা প্রচুর সতর্ক। সকলের হাতে গান রয়েছে।
অথচ তাদের চোখ এড়িয়ে একগুচ্ছ অসুখ আমিনার ভেতরে ঢুকে গিয়েছে। সে অসুখ থেকে তাকে নিস্তার দেবে কে? কেউ বা গান দেখিয়ে অসুখ বিদায় করবে? কারই বা এতো ক্ষমতা রয়েছে।
আয়াশ মায়ের হাতটা চেপে ধরে আছে। কখনো কখনো চুমু খাচ্ছে তো কখনো আঙ্গুল নিয়ে খেলা করছে। স্যালাইন চলছে। সেখানে যাতে ব্যাথা না পায় সেদিকেও তার সতর্কতা রয়েছে। সকাল থেকে কিছু মুখে তোলে নি। ৯ বছরের ছোট্ট শিশুটি হয়ত বুঝতে পেরেছে এই মানুষটা ছাড়া গোটা দুনিয়ায় তার আর কেউ নেই।
এই মানুষটা হারিয়ে গেলে সেও হারাবে। পূণরায় এতিম হবে।
রাশেদুল ডাক্তারের সঙ্গে কথা বলছে। মন্নু হাসপাতালে কিডনি লেবার বা ফুসফুস কোনটাই চিকিৎসা নেই। ইমিডিয়েটলি তাকে ঢাকার কোনো বড় হাসপাতালে শিফট করতে হবে। এভার কেয়ারে নিতে পারলে বেশি ভালো হবে। সেই মোতাবেক ব্যবস্থা করছে রাশেদুল। কয়েকবার নিরবকে কল করেছে। স্নেহা একা একা থানায় কি করছে না করছে কিন্তু নিরব কল তুলছে না। সিনথিয়াও দেশে আসছে আজকে৷ মূলত নওয়ান জেলে গিয়েছে সেই খবর শুনেই তার ছুটে আসা।

এদিকে আমিনা জেদ ধরে বসে আছে সে কোথাও যাবে না৷ এখানেই থাকবে।।
তার কলিজার টুকরো পড়ে আছে জেলখানাতে। তাকে ফেলে সে কি করে দূরে দেশে চলে যাবে? সন্তানের থেকে কি আর অসুখ বড়? কখনোই না। নওয়ান এর মুখ খানা দেখতে পেলেই শান্তি পাবে আমিনা। সুস্থও হবে। সব অসুখ দৌড়ে পালাবে।

এমন মুহূর্তে কেবিনে প্রবেশ করে নায়েব তালুকদার।
ইতিমধ্যেই সে সব কিছু জেনেছে৷ চোখ মুখ দেখে বোঝার উপায় নেই খুশি হয়েছে নাকি দুঃখ পেয়েছে। সব সময়ের মতোই স্বাভাবিক লাগছে তাকে। আমিনা ওই স্বাভাবিক মুখপানে তাকিয়ে থাকে পলকহীন দৃষ্টিতে। প্রায় ৩২ বছর সংসার করলো মানুষটির সঙ্গে। কোনোদিনও একটু যত্ন করে নি৷ ভালোবেসে দুটো কথা বলে নি। নিজে হাতে একটা শাড়ি কিনে দেয় নি। কোনোদিনও জিজ্ঞেস করে নি “তুমি ভালো আছো? খেয়েছো?”
নিজের সঙ্গে করে কোনোদিনও ঘুরতে নিয়ে যায় নি। অথচ বিয়ের আগে আমিনার স্বপ্ন ছিলো স্বামীর সঙ্গে গোটা বাংলাদেশ ঘুরে দেখবে। বাবার অভাবের সংসারে যে স্বপ্ন পূরণ করতে পারে নি স্বামীর ঘরে পা রেখে সেই সব স্বপ্ন পূরণ করবে।
কিন্তু স্বপ্ন পূরণ হলো না। সংসার, ঘর, বর সবই হলো তবে কেনোটাই নিজের নয়৷

ভেবেছিলো মানুষটা এসে হাউমাউ করে কেঁদে উঠবে। আমিনার হাতটা ধরে বলবে “তুমি আমায় ছেড়ে যেও না”
ভেতরে ভেতরে শেষ হয়ে যাওয়া আমিনা তখন অনুসূচণায় ভুগবে। বেঁচে থাকার আশা জাগবে তার মনে।
কিন্তু সে সব কিছুই হলো না।
মানুষটা যেন বেঁচে গেল। ভীষণ খুশি হয়েছে কি? হয়তো হয়েছে। এতদিনে আপদ যে বিদায় হচ্ছে। খুশি না হয়ে উপায় আছে?
নায়েব এগিয়ে আসতেই মিরা তাকে টুল এগিয়ে দেয়। সেই টুলে বসে নায়েব৷
নিজের ডান হাত খানা এগিয়ে আমিনার মাথায় রাখে।

“এতো অসুখ বাঁধালে অথচ কখনো জানতেও দিলে না।

আমিনার দুচোখে টলমল করে আসে অশ্রুকণা। সে নায়েব তালুকদারের চোখে চোখ রেখে জবাব দেয়
” সময় আর পেলাম কই?
সন্ধ্যা কাটতে না কাটতেই বত্রিশটা বছর শেষ হয়ে গেলো।

“অনুসূচনায় ভোগাতে চাও?

” নাহহহ
আপনার থেকে একটু মায়া চাই। ভালোবাসা চাওয়ার মতো লোভী আমি নই। আর ভালোবাসা পাওয়ার মতো বড়লোকও নই।।
মায়া তো ভিক্ষুকদের জন্য বরাদ্দ থাকে।।
সেই ভিক্ষুক ভেবে যে কটা দিন বেঁচে থাকবো একটু মায়া করিয়েন।
বেশি না সামান্য।
এই ধরুন কখনো সময় বের করে আমার পাশে একটু বসলেন। অযত্নে কুঁচকে যাওয়া বৃদ্ধ হাত খানা একটু ছুঁয়ে দিলেন। বা কোনো এক নিঝুম রাতে বাসায় ফেরার পথে আমার জন্য একটা বেলি ফুলের মালা আনলেন
এই টুকুই
আর কিছু লাগবে না

নায়েব দীর্ঘ শ্বাস ফেলে বলে
“তোমার ছেলেদের যে তোমায় খুব প্রয়োজন। তাদের ফেলে কিভাবে যেতে চাও?

” আমার যে আপনাকে প্রয়োজন ছিলো।
আমি যে আপনার অভাবে শেষ হয়ে গেলাম। আমার একটা জীবন যে আফসোসে আফসোসে ফুরিয়ে গেলো।
তার বেলায়?
তার দায়ভার কে নিবে?

“আমাকেই নিতে হবে।
তোমায় সুস্থ করে তুলবো আমি। পৃথিবীর সব থেকে বেস্ট হাসপাতালে চিকিৎসা করাবো।

” সুস্থ হলে যে আবার আপনার অভাব অনুভব করবো। আবারও আপনার পিছু নিবো।
বিরক্তের কারণ হয়ে কাঁটার মতো বিঁধবো।
তার থেকে ভালো মরতে দিন৷ শুধু যে কটা দিন জীবিত আছি একটু মায়া করুন।।
ব্যাসসস আমার সব আফসোস মিটে যাবে।

নায়েব জবাব দিতে পারে না তার আগেই ফোন খানা বেজে ওঠে। তামিম রিসিভ করে নায়েব এর কানে দেয়।
থানা থেকে এসপি আশিক বলে ওঠে
“স্যার নওয়ান তালুকদারকে ঢাক

বাকিটা শেষ করার আগেই নায়েব হুঙ্কার দিয়ে বলে
” আমার ছেলেকে সম্মানে খালাস দিতে না পারলে আপনার গলা কে/টে সমুদ্রে ভাসিয়ে দিবে।
দশ মিনিটের মধ্যে নওয়ান তালুকদারকে তালুকদার মহলে দেখতে চাই আমি।

বলেই কল কাটে।
রাশেদুলকে হুকুম দিয়ে বলে
“এম্বুলেন্স রেডি কর। এখনই নওয়ানের আম্মুকে এভারকেয়ার হাসপাতালে নিয়ে যাবো।

আমিনা কিছু বলতে চায় তবে নায়েব শোনে না৷ সে আয়াশকে কোলে তুলে বড় বড় পা ফেলে বেরিয়ে যায়।


নওয়ান এর পাশে বসে আছে নুপুর। কেমন দম বন্ধ লাগছে তার। মাথা তুলে তাকাতে পারছে না। অথচ নওয়ান পলক হীন দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে নুপুরের মুখ পানে। স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছে চোখপ মুখে বিরহের ছাপ।

” এই চাঁদ রাতে ঘুমাও নি?
কেঁদেছো কেনো?

নুপুর জবাব দেয় না। আবারও যে তার চোখে পানি চলে এসেছে।
জবাব না পেয়ে নওয়ান পূণরায় বলে
“খাইছো তুমি? চোখ মুখ শুকনো লাগছে। খাও নি। তাই না?

নুপুর এবার আর সহ্য করতে পারে না। শব্দ করে কেঁদে উঠে বলে
“এভাবে দুর্বল করে দিচ্ছেন কেনো? কেনোই বা মায়ায় জড়াচ্ছেন? আমাদের পথ যে আলাদা

” ধুরর
মায়ায় জড়াতল আর পারলাম কই? নওয়ান তালুকদার খারাপ মানুষ। তার মাঝে শুধু খারাপটাই রয়েছে।
মায়া নামক শব্দের সাথে তার পরিচয় নেই।
যাক সেসব
তুমি বরং ভালো থেকো।
আমি সব ব্যবস্থা করে গিয়েছি। কোনো অসুবিধা হবে না। কেউ তোমায় কিচ্ছু বলবে না। কোর্টে নির্ভয়ে আমার পাপের বিবরণ দিও।
কোনো প্রমাণ হারিয়ে গেলে আমায় বলিও। আমি জোগাড় করে দিবো।

“আপনি চাইলেই আমাদের একটা সংসার হতো।।
আর পাঁচটা মানুষের মতো সুন্দর জীবন হতো।

” হতো না
তুমি চাঁদ আমি আগুন
দুজনের সংসার হওয়া অসম্ভব ছিলো।

“আপনি কি পারতেন না নিজেকে বরফের মতো ঠান্ডা করতে?

” পারতাম না।
পাপ হচ্ছে জন্মদাগের মতো। একবার লেগে আর তুলে ফেলা যাবে না।
আমি সেই জন্মদাগ নিয়েই জন্ম নিয়েছি।
এই জীবনে ওই দাগ তুলতেও পারবো না। আর তোমাকেও পাবো না।

“তবে কেনো আমায় জড়ালেন?

“জড়াতে পারি নি।
পারলে তুমি আমায় বুঝতে। আমার হয়ে থাকতে।

নুপুর আর কিছু বলে না। বল্টু একটু দূরে বসে আছে। সব কথাই সে শুনেছে। অনেক কিছু বলতে ইচ্ছে করছে তবে পারছে না।
কিন্তু এখন আর চুপ থাকাও সম্ভব হচ্ছে না। তাই দাঁতে দাঁত চেপে বলে ওঠে
“কিছু মনে করবেন না। তবে সত্যি একটা কথা হচ্ছে আপনি আমার ভাইয়ের জীবনে অভিশাপ।
আপনি না

বাকিটা শেষ করার আগেই নওয়ান হুঙ্কার দিয়ে বলে ওঠে
” এই বল্টু আমার চাঁদকে আর একটা কিছু বললে তোর কল্লা কে/টে ফেলে দিবো আমি।

বল্টু ভয় পেয়ে পিছিয়ে যায়। নুপুর বলে
“ঠিকই বলেছেন ভাই।
আমি আপনার ভাইয়ের জীবনের অভিশাপ।
আর এই অভিশাপ সে নিজেই ডেকে এনেছে। এবার ধ্বংস অনিবার্য।

নওয়ান নুপুরের নরম তুলতুলে হাত খানা মুঠো করে ধরে নিজের বুকের সঙ্গে চেপে ধরে
” অভিশাপ যদি হয় তোমার মতো চাঁদ
তবে আমি হাজার বার তাকে ডেকে আনতে রাজি।
চাঁদ জানো

“এক জীবনে তোমায় ভালোবেসে তৃষ্ণা মিটবে না আমার।
পরজনমে আবারও আমার অভিশাপ হয়ে জন্ম নিও।
আমি তোমায় ভালোবেসে দ্বিতীয় জনমও শাস্তি সরূপ তোমার হাতে ফাঁসির দড়ি উপহার নিবো।”

নুপুর নিজের হাত খানা ছাড়িয়ে নেয় নওয়ানের থেকে। দু পা পিছিয়ে গিয়ে বলে
“দ্বিতীয় জনমে আপনাকে ভালোবাসতে চাই আমি।
ঠিক স্নেহা আপুর মতো করে।।
আপনার সাথে সংসার করতে চাই। আপনার বুকে মাথা রেখে শান্তিতে ঘুমাতে চাই।

চলবে

Share On:

TAGS: ,



CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
Related Posts
 

0 Responses

Leave a Reply