অন্তরালে_আগুন
পর্ব:৫২
তানিশা সুলতানা
“মানুষ মানুষের অভাবেই মরে যায়। দুঃখ কষ্ট অবহেলা আর দুরত্ব ক্যান্সারের থেকেও মরণব্যাধি অসুখ।
এই অসুখে কেউ একবার আক্রান্ত হলে তার বেঁচে থাকা অসম্ভব। বিজ্ঞান বড়ই উন্নত। সব অসুখের ঔষধ আবিষ্কার করে ফেলেছে।
মরণব্যাধি ক্যান্সার রোগেরও ঔষধ আছে। অহরহ মানুষ ভালো হয়ে যাচ্ছে। নতুন করে বেঁচে উঠছে। কিন্তু দুরত্ব রোগে আক্রান্ত হলে সে আর কখনোই বেঁচে ফিরে না। কারণ এই রোগের ঔষধ নেই।
পাশের বাসার রিতির মা সেবার মরণব্যাধি ক্যান্সার আক্রান্ত হলো। ডাক্তার স্পষ্ট জানিয়ে দিলো আর বেশি দিন বাঁচবে না। অথচ তিনি এখনো বেঁচে আছে। স্বামী এবং মেয়ের অসীম ভালোবাসা আর যত্ন তাকে বাঁচিয়ে রেখেছে।
অপরদিকে স্মৃতির কাকিমা। ভালো মানুষ কোনো রোগ ব্যাধি নেই। বছর তিনেক আগে জানতে পারলো তার স্বামী দ্বিতীয় বিয়ে করেছে। সেই থেকে তার কি হয়ে গেলো কে জানে। কোন অসুখ বিসুখ ছাড়াই ছোট্ট মেয়েটাকে রেখে পরপারে পাড়ি জমালো।
সর্বোপরি বলা চলে
ভালো থাকার থেকে ভালো ওষুধ পৃথিবীতে আর কিছু নেই। ক্যান্সারের মতো মরণব্যাথিও হার মানে ভালোবাসার কাছে।
এই মুহূর্তের নুপুরের মনে হচ্ছে সে বাঁচবে না। হাত পা থর থর করে কাঁপছে। সবকিছু ঠিকঠাক আছে। শুধু নেই একটা মানুষ। তাতেই যেনো গোটা পৃথিবী থমকে গেছে। এমনটা তো হওয়ার কথা ছিলো না।
গল্পটা অন্যরকম হলেও পারতো। কতইবা বয়স তার? ১৭ পেরিয়ে ১৮ তে পা রাখবে। ভালোবাসা এখন পর্যন্ত তার জীবনে আসেনি। এসেছিলো একটা পাষাণ পুরুষ। যার সাথে ওর পরিচয় জড়িয়ে গেলো। মানুষটা অপাদ মস্তক খারাপ জেনেও তার জন্য হৃদয়ে বিশাল বড় একটা জায়গা তৈরি হলো।
মায়ায় জড়িয়ে গেলো। এই মায়া কি আর এ জীবনে সেরে উঠবে?
হয়ত না
বা হয়ত হ্যাঁ
গোটা রাত দুচোখের পাতা এক করতে পারেনি নুপুর। চোখ বন্ধ করলেই চোখের সামনে ভেসে উঠেছে নওয়ান তালুকদারের মুখখানা। কই আগে তো মানুষটাকে এতো ফিল করে নি৷ তার মুখ খানা না দেখতে পেলে মরে যাবে এমনটা অনুভব করে নি। তবে এখন কি হলো?
” নুপুর জলদি আয়
খাবো।
বাইরে থেকে অনবরত নেহাল ডেকে চলেছে। নুপুরের খেতে ইচ্ছে করছে না। তবুও বেরোতে হবে। বাবা ভাই অপেক্ষা করছে যে।
অগত্য বিছানা ছেড়ে ওয়াশরুমের পানে ছোটে। সময় নিয়ে গোসল সেরে নেয়। কিছুদিন আগে নওয়ান একটা জামা কিনে দিয়েছিলো। নীল রংয়ের থ্রিপিস খানা বড়ই সুন্দর। এটা নুপুরের হাতে দিয়ে অনুরোধ করে বলেছিলো
“তোমাকে নীল রংয়ের দেখার বড্ড শখ। আমার চাঁদের গায়ে নীল রংটা কেমন মানাবে?
নুপুর প্যাকেট খানা ডাস্টবিনে ফেলে দিয়ে রাগান্বিত স্বরে বলেছিলো
” যেখানেই আপনাকেই পছন্দ নয় সেখানে আপনার কিনে দেওয়া ড্রেস গায়ে জড়াবো?
এতোটাও খারাপ সময় নুপুর শিকদারের আসে নি।
প্রতিত্তোরে নওয়ান কোনো কথা বলেনি। চুপচাপ তাকিয়ে ছিলো নুপুরের মুখ পানে। কি ছিলো সে দৃষ্টিতে জানা নেই তবে আজও হৃদয় কাঁপিয়ে তোলে।
অনাদরে ফেলে দেওয়া সেই জামাখানায় গায়ে জড়ায় নুপুর। চাঁদর মতোই কি সুন্দর সে? হয়তো তাই
এই যে এই মুহূর্তে আয়নায় নিজেকে দেখছে। অপরূপ সৌন্দর্যের অধিকারিনী সে নয়। তবুও নওয়ান তালুকদারের ভাষ্যমতে সেই পৃথিবীর সেরা সুন্দরী। তার থেকে সুন্দর মানুষ পৃথিবীতে দুটো নেই।।
নুপুরের ডাগর ডাগর আঁখি পল্লবে অশ্রুকণা জমে। দুই হাতে মুখ ঢেকে চিৎকার করে কেঁদে ওঠে। নেহাল এবং নাসির ছুটে আসে।
নুপুরকে এভাবে কাঁদতে দেখে তারাও বেশ ঘাবড়ে যায়।
নেহাল দুইহাতে জড়িয়ে নিয়ে বলে
“কি হয়েছে বোনু? খারাপ লাগছে? কষ্ট হচ্ছে? ডাক্তার ডাকবো?
নুপুর অনবরত মাথা নেরে অসম্মতি প্রকাশ করে এবং নেহালের দুই হাত মুঠোয় ধরে বলে
“ভাইয়া আমি সহ্য করতে পারছি না। ওই বেয়াদব কে ছাড়া আমি বাঁচতে পারব না। তাকে শাস্তি দিতে গেলে আমিই আগে মরে যাবো।
নেহাল আগেই আন্দাজ করেছিলো এমন কিছু। তাই এখন আর অবাক হয় না। নাসিরেরও কিছু বলার থাকে না। এই মেয়ে তার কলিজা। মেয়ে সুখের জন্য সে নিজেকে শেষ করে দিতে প্রস্তুত। আর সামান্য শত্রুকে ক্ষমা করতে পারবেনা?
নেহাল বোনের মাথায় হাত বুলিয়ে বলে
“ঠিক আছে
তুই গিয়ে নওয়ানকে বল। বাকিটা সেই দেখে নেবে।
“আপনি বড্ড অধৈর্য স্নেহা। একটু ধৈর্য ধরলেই সবটা ঠিক হয়ে যাবে।
এসপি আশিক এর কথা শুনে হাসি পায় স্নেহার। সে শব্দ করে হেসে ওঠে। চোখে চোখ রেখে জবাব দেয়
“আমাকে ধৈর্য শেখান?
আমার থেকে বড় ধৈর্যশীল এই পৃথিবীতে আছে না কি?
১০ টা বছর যাবত সৃষ্টি কর্তার কাছে একটামাত্র মানুষকে চেয়ে এসেছি। বাড়ি গাড়ি টাকা পয়সা ধনসম্পদ কিচ্ছু চাইনি।
শুধু ওই একটা মানুষ ছাড়া। শুনেছি ভাগ্য পরিবর্তন হয়। মোনাজাতে চাইলে আল্লাহ কাউকেই খালি হাতে ফেরায় না। বিশ্বাস করুন যতভাবে চাওয়া যায়। আমি চেয়েছি। কাঁদতে কাঁদতে জায়নামাজ ভিজিয়েছি।
দিনশেষে সৃষ্টিকর্তা আমায় শূন্য হাতে ফিরিয়ে দিয়েছে। তবুও কোনো অভিযোগ করিনি, অভিমানও নেই।
মেনে নিয়েছি নিজের ভাগ্যকে। তার বিনিময়ে শুধু চেয়েছি “যে মানুষটিকে আমি পেলাম না সে ভালো থাকুক। এই পৃথিবীর সব সুখ তার হোক”
সৃষ্টিকর্তা আমার এই দোয়াও কবুল করছে না।
হয়তো এই পৃথিবীর সব থেকে বড় পাপী ব্যক্তি আমি। এমন কোনো পাপ করে ফেলেছি যার কোনো ক্ষমা নেই। আর আমার পাপের শাস্তি তাকে দিচ্ছে।
জবাব দেয়ার মতো কোনো ভাষা খুঁজে পায় না আশিক। তার সামনে খাবার রাখা। সকাল ১১ টা বেজে পঁচিশ মিনিট। আরো দুই ঘন্টা আগে খাবার দিয়ে গেছে কনস্টেবল। স্নেহা কে কয়েকবার খাবার খেতে অনুরোধ করেছে আশিক।।তবে মেয়েটা খাচ্ছে না। খাবেও না।
সামনে এক অনাহারি ব্যক্তিকে রেখে নিজে খাবে এতোটাও অমানবিক আশিক নয়।
তবে এই মুহূর্তে স্নেহের কথাগুলো শুনে তার ক্ষুধা মরে গেছে।
শুধু অবাক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকতে ইচ্ছে করে মেয়েটার মুখপানে।
একটা মানুষ আরেকটা মানুষকে এতটা ভালো কি করে বাসতে পারে?
কি করে পারে সুন্দর একটা জীবন উপভোগ না করে যে তাকে মূল্য দেয় না তার পেছনে দৌড়ে কাটাতে?
“আপনি য়তো ভাবছেন এ কেমন নির্লজ্জ মেয়ে।
এর কি আত্মসম্মানবোধ বলতে কিছু নেই?
আসলেই নেই।
আমার কাছে গোটা দুনিয়া একদিকে নওয়ান তালুকদার এক দিকে।
বাবা-মা পরিবার আমি সবাইকে ছেড়ে যেতে পারি। কিন্তু তার খারাপ সময়ে তার সঙ্গ কখনোই ছাড়তে পারবো না।
আমাকে এখানেই বসে থাকতে হবে। যতক্ষণ না সে বাড়ি ফিরবে আমিও ফিরবো না।
কিছুতেই না কোনো মতেই না।
“আমার পুরো রাজনৈতিক রেপুটেশন নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। তোরা দুই ভাই এখনো হাত পা গুটিয়ে বসে আছিস? দাদুভাইকে ছাড়িয়েন। ওই মেয়েকে খু/ন করে মাটি চাপা দিয়ে দে। আর রইলো বাকি অভিরাজ। তাকে আমি দেখে নিবো।
মজনু তালুকদারের কথায় ও কোন ভাবান্তর হয় না রাশেদুল এবং নায়েব তালুকদারে। ইতিমধ্যেই এসিপির সাথে কথা হয়ে গেছে। নওয়ান চাইলেই তাকে এখন ছিড়ে দেবে। তার উপরে নিয়ে আসা অভিযোগগুলো মিথ্যে সেটা প্রমাণ করতে ২ সেকেন্ড ও লাগবে না।
কিন্তু তবুও কিছু করতে পারছে না ওরা।
কারণ নওয়ান তালুকদার চায় না ছাড়া পেতে।
সবিতা পান চিবুতে চিবুতে বলে
“আমি তে আগেই বলেছিলাম
ওই মেয়ে তোমাদের ধ্বংস না করে ছাড়বে না।
ধ্বংসের কথা মাথায় আসতেই নায়েব তালুকদারের চোখের সামনে ভেসে উঠে আমিনার মুখখানা। গতকাল রাত থেকেই সে হাসপাতালে ভর্তি। একটাবার খোঁজ নেয়া হয়নি যে কেমন আছে?
দেখতে যাওয়া তো দূরের কথা।
নায়েব দাঁড়িয়ে পড়ে। টি-টেবিলের উপরে থাকা ফোন খানা হাতে নিয়ে হনহনিয়ে বেরিয়ে যায় বাড়ি থেকে। গেইটের কাছেই গাড়ি এবং গার্ড রেডি ছিলো।
উনি গাড়িতে বসে বলে
” মুন্নু হাসপাতালে চলো।
ড্রাইভারও সেই মোতাবেক ড্রাইভ করা শুরু করে।
ছোট আয়াশ এটুকু বুঝে গেছে যে এ পৃথিবীতে আমিনা ছাড়া তার দ্বিতীয় কোনো আশ্রয় নেই। তাইতো অসুস্থ আমিনার পাশে গুটিসুটি মেরে বসে আছে। মীরা কয়েকবার খাবার খেতে বলেছে তবে খায় নি। তার এক কথা “আম্মু সুস্থ হয়ে তাকে খাইয়ে দিবে”
চলবে
Share On:
TAGS: অন্তরালে আগুন, তানিশা সুলতানা
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
অন্তরালে আগুন পর্ব ১৭
-
অন্তরালে আগুন পর্ব ১৩
-
তোমাতেই আসক্ত সিজন ২ পর্ব ৭
-
অন্তরালে আগুন পর্ব ৪২
-
অন্তরালে আগুন পর্ব ৩৮
-
অন্তরালে আগুন পর্ব ৩১
-
অন্তরালে আগুন পর্ব ৫(৫.১+৫.২)
-
তোমাতেই আসক্ত ২ পর্ব ৫
-
অন্তরালে আগুন পর্ব ১৮
-
অন্তরালে আগুন পর্ব ৮