অন্তরালে_আগুন
পর্ব:৪৯
তানিশা সুলতান
“আমাকেই কেনো বিয়ে করতে চাচ্ছেন?
বড্ড অধৈর্য হলো স্নেহার। সে চোখ মুখ কুঁচকে জবাব দেয়
“বললাম তো
আপনার চাঁদের প্রতি উইকনেস রয়েছে। তাকে
বাকিটা শেষ করার আগেই অভি বলে
“আপনাকে বিয়ে করলেই উইকনেস কমে যাবে এটা কেনো মনে হলো?
“কমে না গেলেও আপনার ভাবনায় শুধু চাঁদ থাকবে না। আমিও থাকবো। তাকে নিয়ে কোনো স্বপ্ন দেখবেন না। পাওয়ার ইচ্ছেটা মরে যাবে।
তখন মনের সাথে যুদ্ধ করে হলেও মুখে হাসি ধরে আমার সঙ্গে সংসার করতে হবে।
“আপনি বড্ড বেহায়া স্নেহা। একটা মানুষের জন্য নিজের আত্মসম্মানবোধ বিসর্জন দিয়ে ফেলেছেন। পাগল হয়ে যাচ্ছেন।
স্নেহা দীর্ঘ শেষে ফেলে।
আখি পল্লব বন্ধ করে জবাব দেয়
“একটাই তো জীবন।
২৪ টা বসন্ত পেরিয়ে গিয়েছে। আর বড় জোর ২৪ বছর বাঁচবো। আত্মসম্মান ধরে রেখে, নিজেকে নিয়ে চিন্তা করে
একটা জীবন কাটিয়ে দেওয়াই যায়। কঠিন কোনো বিষয় নয়।
তবে আমার জন্য এটা সহজ নয়। 15 বছর বয়সে একটা পাষাণ পুরুষের মায়ায় পরি। এই নয় বছরে এমন একটা রাত নেই যে রাতে আমি শান্তিতে ঘুমিয়েছি। চোখ বন্ধ করলেই চোখের সামনে ভেসে উঠতো তার মুখ খানা।
একটু ঘুমিয়ে পড়লেই স্বপ্ন দেখতাম “সে অন্য কারো সঙ্গে” অসহ্য যন্ত্রণায় এক একটা রাত কাটাতাম।
কত হাজার বার, কত হাজার ভাবে আল্লাহর কাছে তাকে চেয়েছিলাম। কতবার বলেছিলাম “সে আমার নাহলে তাকে অন্য কারো সঙ্গে দেখার আগে যেনো আমার মৃত্যু হয়”
আমার এত ডাক, এত প্রার্থনা আল্লাহ শোনেনি।
তাকে অন্য কারো সঙ্গে দেখার যন্ত্রণা পেলাম
বিচ্ছেদের আগুনে পুড়লাম
হারানোর ব্যাথা বুঝলাম
মরণ যন্ত্রণা অনুভব করলাম
সবই সহ্য করে নিতে পেরেছি। কষ্ট হয়েছে তবে অসহ্যনীয় ছিলো না৷
তবে শেষ মুহূর্তে এসে দেখলাম আমি তার কষ্ট সহ্য করতে পারছি না।
তার মনে একটু দুঃখ লাগলেই আমি ছটফট করতে থাকি। মনে হয় কলিজায় কেউ আগুন জ্বালিয়ে দিয়েছে। অসহ্য যন্ত্রণায় হাঁসফাঁস করতে থাকে আমার বুকটা।
শেষ মুহূর্তে আমি বুঝিলাম
তাকে ভালো রাখার মধ্যেই আমার ভালো থাকা বিরাজ করে। তার খুশিতেই আমার বেঁচে থাকার সার্থকতা।
মেনে নিলাম নিজের ভাগ্য। অভিযোগ করা ছেড়ে দিলাম।
অভি অবাক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে স্নেহার মুখপানে। কি সুন্দর মায়াবী মুখখানা। কথা বলতে বলতে চোখ দুটো চিকচিক করছে। যখন তখন দুগাল বেয়ে টপটপ করে গরিয়ে পড়বে অশ্রুকণা। দুগাল এবং নাকটা টকটকে লাল হয়ে গিয়েছে। ঠিক আপেলের মত।
গোলাপি রংয়ের অধর জোড়া শুকিয়ে চামড়া উঠছে।
স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে বহু দিন নিজে যত্ন নেয় না। অযত্নে মলিন হয়ে গিয়েছে।
“আমায় বিয়ে করুন অভি। আপনি আমি দুজন মিলে না হয় চাঁদ আর ওনাকে ভালো রাখার দায়িত্ব নিলাম।
“তোমার মতো এতো উদার মনের মানুষ আমি নই। আর এমন নিঃস্বার্থভাবে ভালোবাসতেও জানিনা।
তোমায় আমি বিয়ে করবো একটা শর্তে।
নিজের জন্য বাঁচতে হবে তোমায়। নিজের কথা ভাবতে হবে। আর নিজের যত্ন নিতে হবে।
স্নেহা জবাব দেয় না। যেখানে তার হৃদয় টা আর বেঁচে নেই সেখানে শরীরের যত্ন নিয়ে আর কি হবে?
“আচ্ছা বাদ দাও
তোমাকে ভালো রাখার দায়িত্ব আমি নিয়ে নিলাম।।
তুমি না হয় অন্যের জন্য বেঁচে।
আর আমি না হয় তোমার জন্য বাচবো।
” আপনার আমাকে পছন্দ?
“সেটা নাহয় পরে কখনো বলবো?”
“আর চাঁদ?
“থাকুক সে হৃদয়ে। সেখানে যত্নে রাখবো তাকে। আর ঠোঁটের কোণে হাসি ফুটিয়ে তোমার হাত ধরে কাটিয়ে দিবো।
নায়েব তালুকদার ফোনে কিছু দেখছিলেন। তখন নুপুর তার কক্ষে ঢোকে। তার হাতে এক কাপ চা। যেটা কিছু মুহূর্ত আগে নিজেই বানিয়ে এনেছে। রান্নাবান্নায় খুব বেশি পারদর্শী না হলেও চা টা বেশ ভালোই বানাতে জানে। শত্রুও তার হাতে চা খেয়ে নিন্দা করতে পারবে না। তবে মজার ব্যাপার হলো নুপুর খুব সহজে চা বানায় না। যাদের খুব বেশি পছন্দ শুধু তাদের জন্যই বরাদ্দ।
“বাবা আপনার জন্য চা এনেছি।
নায়েক তালুকদার চমকায়। তার হাত থেকে ফোন খানা পড়ে যায়। সাধারণত নওয়ান ছাড়া কেউ তাকে বাবা বলে ডাকে না। এই অধিকারটা শুধুমাত্র নওয়ানের জন্যই বরাদ্দ। আর নুপুর কখনোই তার সঙ্গে ভালো করে দুটো কথা বলেনি। অবশ্য বলার কথা ও না।
কিন্তু আজকে হঠাৎ চা নিয়ে এসে বাবা বলে ডাকা মোটেও সহজ বিষয় নয়।
” এ কি বাবা ভয় পেলেন কেনো?
আমি আপনার মতো খারাপ মানুষ নই।
নায়েব তালুকদার কিছু মুহূর্ত নুপুরের মুখপানে তাকিয়ে থাকে। তারপর গম্ভীর স্বরে বলে
“কি চাই?
“আপাতত চাচ্ছি চা টা খেয়ে নিন।
নায়েব চায়ের কাপ হাতে তুলে নেয় এবং তাতে চুমুক দেয়। বেশ মজাদার। দুধ অনেকক্ষণ জাল দিয়ে তার মধ্যে চা দিয়ে আবারও বেশ খানিকক্ষণ জাল দিয়ে বানানো এই চায়ের স্বাদ অতুলনীয়। দু এক টুকরো এলাচি আদা এগুলোও বোধহয় দেওয়া হয়েছে। স্মেইল পাওয়া যাচ্ছে।
“বাহ
চা টা বেশ দারুণ বানাও তুমি।।
এরপর থেকে আমার চা বানানো দায়িত্বটা তুমি নিয়ে নাও
নুপুর একটু হাসে।
“ঠিক আছে নিলাম। প্রথমবার একমাত্র পুত্রবধূর হাতের চা খেলেন। সেটা ভালোও লাগলো। এবার আমাকে গিফট দেওয়া উচিত নয়?
” অবশ্যই উচিত।
বলো কি চাই? এখুনি কিনে দিচ্ছি।
“পাপের টাকায় কেনা কোনো জিনিস আমার চায় না।
কাল আমি আয়াশ আম্মু আর নওয়ান নানাবাড়ি যাবো। বড় মামা অসুস্থ।
আমি চাই আপনিও আমাদের সঙ্গে যাবেন।
“ঠিক আছে।
নুপুর প্রাপ্তির হাসি হেসে প্রস্থান করে। বুকের ভেতরটা কেমন কাঁপছে। বালি দিয়ে সে যে ঘড় বানানোর চেষ্টা করছে সেই ঘর যে বেশিদিন স্থায়ী হবে না সেটা বেশ ভালো করেই জানা আছে।
তবুও অবচেতন মনের একটুখানি ইচ্ছে পূরণ করতে এইটুকু তো করতেই হয়।
নাহলে যে একটা জীবন বৃথা।
রাত বারোটা বেজে তিন মিনিট। কিছু মুহূর্ত আগেই বাবা-মা এবং ভাইয়ের সঙ্গে কথা বলেছে নুপুর। ভাই বোনের সম্পর্কটা হয় মধুর। নুপুর এবং নেহালের সম্পর্কটা মধুর থেকেও বেশি মধুর। দুই ভাই বোন নিজেদের মনের কথা কখনো চেপে রাখতে পারে না। যত খারাপ কথায় হোক বা ভালো কথা হোক নেহাল বোনকে বলবে আর বোন নেহালকে বলবে।
ঠিক তেমনভাবেই স্নেহাকে ভালোলাগার বিষয়টি নুপুর কে জানিয়ে দেয় নেহাল।
এবং এটাও জানায় যে ” তাকে বিয়ে করতে চায়”
কিন্তু কোথায় চাঁদ আর কোথায় বামন।
স্নেহা কে বিয়ে করার কোনো যোগ্যতাই তার নেই এটা সে মানে। তবুও ভালোবাসা তো আর ধনী গরিব উঁচু-নিচু এসব দেখে হয় না। জাস্ট হয়ে যায়।
নুপুর ভাইয়ের কথার প্রতিত্তরে কিছু বলেনি। স্নেহা কে সে ভালোবাসে। ভাইকেও ভালবাসে।
দুজন ভালোবাসার মানুষ একসাথে থাকলে সে খুশি হবে। তবে স্নেহা তো স্বাভাবিক নয়। নুপুরের ভাষ্যমতে সে একটা পাগল।
আর এই পাগলের সাথে তার ভাইয়ের জীবনটা জড়িয়ে গেলে সে বাকিটা জীবন শুধু কষ্টই পাবে। এটা বোন হিসেবে কখনোই মেনে নিতে পারবে না।
তাই মনে মনে কঠিন একখানা সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছে। নেহালকে সে সব টা খুলে বলবে। তারপরও যদি ওর মনে হয় যে স্নেহের সাথে থাকতে পারবে, বা নিজের ভালোবাসা দিয়ে ওর মন থেকে নওয়ান নামটা মুছে দিতে পারবে। তাহলে ঠিক আছে।
নুপুরের এসব ভাবনার মাঝেই কক্ষে প্রবেশ করে নওয়ান। বড়ই ক্লান্ত সে। সিগারেট এর শেষ অংশ জানালা দিয়ে ফেলে বিছানায় গা এলিয়ে দেয়।
“চাঁদ
নুপুর চমকে পেছন ফিরে তাকায়। বেলকনি থেকে কক্ষে আসতে আসতে বলে
” আপনি কখন আসলেন?
নওয়ান এই প্রশ্নের জবাব দেয় না। পলকহীন দৃষ্টিতে কিছু মুহুর্ত তাকিয়ে থাকে নুপুরের মুখ পানে। কলিজা ঠান্ডা হয়ে গেলো। এতোক্ষণ অন্তরালে জ্বলতে থাকা অনল মুহুর্তেই শীতল বাতাসে পরিণীত হয়। শুকনো ঠোঁটের কোণে এক চিলতে হাসি ফুটে উঠতে গিয়েও দমে যায়। বড্ড গম্ভীর স্বরে বলে
“তোমার এই পৃথিবীতে আমি ছাড়া আর কেউ নেই।
আমি যখন থাকবো না তখন বুঝবে জীবনটা সহজ নয়। তাই বলছি আমার হয়ে থাকো চাঁদ।
তোমায় আঘাত করার ক্ষমতা আমার নেই। হারানোর শক্তিও নেই।
তুমি যে খেলায় মেতে উঠেছে তাতে কিছুই হবে না। কারো কোনো ক্ষতি হবে না। তুমিই শুধু মাথার ওপরের ছায়া হারাবে।
তোমাকে অসম্ভব ভালোবাসার মতো একজন মানুষ হারাবে।
বড্ড বাজে ভাবে ঠকে যাবে চাঁদ।
নুপুর প্রতিত্তোরে জবাব দেয় না।
নওয়ান দীর্ঘ শ্বাস ফেলে প্রসঙ্গ বদলায়।
“একটুখানি জড়িয়ে ধরো চাঁদ।
ভালো লাগছে না।
একটুও দেরি করে না নুপুর। দৌড়ে গিয়ে নওয়ান এর বুকে মাথা রেখে শুয়ে পড়ে। ব্যস্ত ভঙ্গিমায় শার্টের বাটন খুলে উন্মুক্ত বুকে মুখ লুকায়।
উফফফ কি যে শান্তি লাগছে। মনে হচ্ছে পৃথিবীর সব সুখ এখানেই সীমাবদ্ধ।
” একটা গান শোনান নওয়ান।।
নওয়ান নুপুরের মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে দিতে গান ধরে
“ঘুমাও তুমি ঘুমাও গো জান
ঘুমাও আমার কোলে
ভালোবাসার নাও ভাসাবো
ভালোবাসি বলে
তোমার চুলে হাত বোলাবো
পূর্ণ চাঁদের তলে
কৃষ্ণচূড়া মুখ তোমার
জোছনা পড়ুক কোলে
আজকে তোমার মনকে জড়াই ধরবে আমার মন
চলবে
গল্প নিয়ে রিভিউ আলোচনা করতে ~তোমাতেইআসক্ত//অন্তরালেআগুন ( তানিশা সুলতানা) গ্রুপে যুক্ত হয়ে যাও
Share On:
TAGS: অন্তরালে আগুন, তানিশা সুলতানা
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
অন্তরালে আগুন পর্ব:৩৫
-
তোমাতেই আসক্ত ২ পর্ব ৫
-
অন্তরালে আগুন পর্ব ২৮
-
অন্তরালে আগুন পর্ব ৪০
-
অন্তরালে আগুন পর্ব ১২
-
অন্তরালে আগুন পর্ব ১৬
-
অন্তরালে আগুন পর্ব ৪৪
-
অন্তরালে আগুন পর্ব ১ (১ম অংশ+ শেষ অংশ)
-
তোমাতেই আসক্ত সিজন ২ পর্ব ২
-
অন্তরালে আগুন পর্ব ৩