অন্তরালে_আগুন
পর্ব:৪৭
তানিশা সুলতানা
অভিকে ডেকেছে নুপুর। জরুরি কিছু কথা আছে তার। বেওথা ব্রিজের উত্তর পাশে গাঙ নামের এক খানা রেস্টুরেন্ট রয়েছে৷ সেখানেই দুজন বসে আছে। অভির চোখ মুখ চিকচিক করছে। ঠোঁটের কোণা থেকে হাসি সরছে না। সে কখনোই ভাবে নি নুপুর তাকে ডাকবে। ভেবেছিলো “এই জীবনে আর নুপুরকে পাওয়া হলো না। তাদের পথচলা এখানেই সমাপ্ত।”
কিন্তু আজকে নুপুরের একটা ফোনকল অভির মনে ভরসা জোগায়। অসম্ভব সম্ভব হবে। নুপুর শিকদার তার হবে না ঠিকই।
তবে তাদের পরিচয় থাকবে।
ওয়েটার মেনুকার্ড দিয়ে অধিক আগ্রহে তাকিয়ে আছে অর্ডার পাওয়ার। দুপুর সময়ে রেস্টুরেন্ট পুরো ফাঁকা থাকে। কাস্টমার আসেই না। দুই একজন আসলে তাদের বেশ খাতির যত্ন করা হয়।
নুপুর মেনুকার্ডে নজর বুলিয়ে অভির দিকে এগিয়ে দেয়
“আমার জন্য শুধুই কফি
আপনি?
অভি মৃদু হেসে বলে
” আমিও কফি
ওয়েটার বোধহয় হতাশ হলো। কেমন গোমড়া মুখে চলে গেলো। এবার নুপুর দুই হাত টেবিলের ওপর রেখে অভির মুখের দিকে তাকায়।
“আমি নওয়ান তালুকদারের স্ত্রী। শুনতে খারাপ লাগলেও সত্যি কথা হচ্ছে আমি ওই বেয়াদবটাকে ভালোবাসি।
এক জীবনে সে ছাড়া দ্বিতীয় কোনো পুরুষকে কল্পনাও করি না।।
হতাশ হলো কি অভি? ঠিক বোঝা গেলো না। তবে চোখ মুখ স্বাভাবিক রেখে বলে
” আমি ভাগ্যে বিশ্বাসী।
আজ কি হচ্ছে দেখতে পাচ্ছি
কাল কি হবে জানি না। তবে এতটুকু বিশ্বাস করি কাল যা হবে তা আমার জন্য বরাদ্দ ছিলো। আমি হাজার চেষ্টা করেও সেই বরাদ্দ টুকু বদলাতে পারবো না৷
নুপুর বুঝতে পারে একে এসব কিছু বলে লাভ হবে না। তাই মেইন টপিক এ আসে।
“আপনার সাহায্য চাই আমার।
” বলো। যা বলবে তাই করবো।
“তবে একটা শর্ত
” সব শর্তে রাজি।
“জিজ্ঞেস করুন কি শর্ত।
” বলো
“আমার প্রতি এক্সপেকটেশন রাখা যাবে না
ভালোবাসার অনুভূতি রাখা যাবে না।
“কখনো প্রকাশ করবো না৷ তবে ভালোবাসবো। সারাজীবন
সারাক্ষণ
প্রতি মুহুর্তে
কফি এখনো আসে নি৷ তবে নুপুরের আর বসে থাকতে ভালো লাগছে না। তাই পার্স হাতে নিয়ে দাঁড়িয়ে পড়ে।
” হোয়াটসঅ্যাপ এ নক করে সব বলে দিবো।
বলেই গটগট পায়ে চলে যায় নুপুর। অভি তাকিয়ে থাকে। রেস্টুরেন্ট এর বাইরে গাড়ি এবং গার্ড দাঁড়িয়ে ছিলো। নুপুর সেখানে উপস্থিত হতেই গার্ড গাড়ির দরজা খুলে দেয়।
“আমি জানি তুমি আমার না
কখনো হবেও না
আর আমি চাই ও না তুমি আমার হও।
আমার নুপুর শিকদার পবিত্র।
সে যদি আমার হয় তাহলে কলঙ্কের দাগ লাগবে।
নিজের সুখের জন্য তোমায় কিভাবে কলঙ্কিত করব আমি?
প্রধানমন্ত্রীর জরুরি বৈঠকের পর থেকে তথ্য মন্ত্রী আব্বাস নিখোঁজ। তদন্ত করে জানা গেছে বৈঠকে সে ঢুকেছে তবে বের হয়।
আসলে কি হয়েছে? কেনোই বা সে বের হতে পারলো না সেই বৈঠক থেকে?
সব গুলো টিভির চ্যানেলে এই নিউজ বেজে চলেছে। নায়েব তালুকদার বড়ই চিন্তিত। নওয়ান ভালোই ভালোই প্লেনে উঠে গেলেই তার চিন্তা মুক্ত৷ তারপর যা যা হবে সবই পরিকল্পনা মাফিক।
তালুকদার বাড়ির ড্রয়িং রুমে নিজ আসন দখল করে বসে আছে নায়েব তালুকদার।
মজনু তালুকদার তারই পাশে বসে পান চিবুচ্ছে।
রাশেদুল গিয়েছে নওয়ানকে এয়ারপোর্ট এ ড্রপ করতে।
আর নিরব সবেই বাড়ি ফিরেছে। সে স্পষ্ট ভাষায় জানিয়েছে এবার থেকে বাড়িতেই থাকবে। পড়াশোনায় মন দিবে। রাজনৈতিক কোনো ব্যাপারে তাকে ডিস্টার্ব করা চলবে না।
রাশেদুলেরও তেমন ইচ্ছে। সে চায় না তার ছেলে রাজনীতি করুক। এইচএসসি শেষ করলে সিঙ্গাপুর পাঠিয়ে দিবে। ছেলে মেয়ে বিদেশে একটা জীবন আরামসে কাটিয়ে দিবে।
এই মুহুর্তে হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমান বন্দরে দাঁড়িয়ে আছে নওয়ান বল্টু এবং রাশেদুল। আর মাত্র ২০ মিনিট পরেই ফ্লাইট।
এমন মুহূর্তে নওয়ান এর ফোনে টুংটাং আওয়াজ হয়। হোয়াটসঅ্যাপ এ কেউ কিছু পাঠিয়েছে।
বল্টুর হাতে থাকা ফোন খানা নওয়ান নেয়। এবং হোয়াটসঅ্যাপ এ ঢোকে।
আননন নাম্বার থেকে দুটো ফটো সেন্ট করা হয়েছে। নুপুর এবং অভি রেস্টুরেন্ট এ বসে আছে।
ব্যাসস মাথা গরম হয়ে যায় নওয়ান এর। সে হাতের ফোন খানা ছুঁড়ে ফেলে দেয়। দেয়ালে লেগে সেটা দুই টুকরো হয়ে যায়।
রাশেদুল বলে
“কি হয়েছে নওয়ান?
তোমার এবার ভেতরে যেতে হবে।
নওয়ান বোধহয় শুনলো না। সে উল্টো পথে পা বাড়িয়ে বলে
” বাসায় ফিরবো।
কোথাও যাবো না আমি।
ব্যাসস নওয়ান যখন একবার বলে ফেলেছে সে কোথাও যাবে না। তার মানে পৃথিবীর কারোর শক্তি নেই তাকে পাঠানোর।
রাশেদুল দীর্ঘ শ্বাস ফেলে এবং তখুনি কল করে নায়েব তালুকদারকে।
বল্টু নওয়ান এর পেছন পেছন দৌড় দেয়।
নওয়ান এর কক্ষের বেলকনিতে পায়ের পা তুলে বসে আছে নুপুর। ভীষণ খুশি সে। মাথার ব্যান্ডেজ খুলে ফেলা হয়েছে। এবং কতোদিন পরে গোসল করলো। প্রচন্ড ফ্রেশ লাগছে।
ডিসেম্বরের মাঝামাঝি। শীতের আমেজ আসতে শুরু করে দিয়েছে। রোদের তাপমাত্রা কমেছে। ফুরফুরে বাতাস গায়ে লাগতেই শরীর জারিয়ে ওঠে। আর পানির কথা কি বলবো। সব সময়ই ঠান্ডা থাকে। এই যে এই মুহূর্তে শীতে নুপুর কাঁপছে। তবুও তার ভালো লাগছে। গরম জামা গায়ে জড়াতে ইচ্ছে করছে না। ভেজা চুল হতে টপটপ করে পানি ঝরছে।
নুপুর আসমান পানি তাকিয়ে নওয়ান এর কথা চিন্তা করে।
এই মুহূর্তে মানুষ ওর পাশে বসে দুঃখ হাতে গিটারের টুংটাং আওয়াজ তুলে একখানা গান ধরতো।
চায়ের কাপে চুমুক দিতে দিতে গান খানা উপভোগ করতো নুপুর। আহা
ভালো থাকার জন্য আর কি চাই?
এতটুকুই যথেষ্ট।
“নওয়ান
আপনি একটা মরণব্যাধি অসুখ। যে অসুখ স্নেহাকে নিঃশেষ করে দিয়েছে। এবার আমার শরীরে বাসা বাঁধছে।
আমার ধ্বংস আর খুব বেশি দূরে নেই।
বিড়বিড় করে কথাগুলো আওড়ায় নুপুর।
তখনই সেখানে উপস্থিত হয় স্নেহা। প্রচন্ড রাগান্বিত হয়ে বলে
“তুমি কেনো অভি সাথে দেখা করেছো?
নুপুর ভ্রু কুঁচকায়।
” সেটা তোমায় বলতে হবে?
“হবে চাঁদ।
তুমি বুঝতে পারো না? তোমাকে অন্য কারো সাথে দেখলে ওনার কষ্ট হবে। আমার বুকের ভেতরটা যেমন কাঁপে ঠিক তেমন ভাবে উনিও দুঃখ পাবে।
চাঁদ
তুমি অভির সঙ্গে দেখা করিও না আর।
নুপুর আশ্চর্য হয়। ওর চোখ দুটো টলমল করে।
এরকম ভয়ংকর ভাবে মেয়েটা কেনো ভালোবাসে নওয়ানকে? কি পাচ্ছে সে? কেনো মুভঅন করছে না? কেনো নিজের বাঁচছে না?
কেনো?
“তুমি তাকে হারিয়ে যতটা দুঃখ পেয়েছো
তার থেকে দ্বীগুণ দুঃখ পাও তার দুঃখ দেখে।
এমন ভয়ংকর ভাবে ভালোবাসতে শিখলে কি করে?
কিভাবে পারো তুমি?
“ভালোবাসি তাকে। পাওয়ার জন্য নয়। তাকে ভালো রাখার জন্য।
আমার যদি সাধ্য থাকতো নিজেকে বিক্রি করে এই পৃথিবীর সব সুখ তার পায়ের কাছে এনে দিতাম।
সে আমার বড্ড শখের।
সব সময় মনে রাখবা
আমি যাকে মোনাজাতে চেয়েও পাই নি। তুমি তাকে বীণা সাধনায় পেয়েছো।
দুঃখ দিও না চাঁদ।
তাকে একটুও দুঃখ দিও না।
স্নেহা চলে যায়।
নুপুর স্তব্ধ হয়ে বসে থাকে। এই মুহূর্তে চিৎকার করে কাঁদতে ইচ্ছে করছে তার। বুকের ভিতর দুঃখ জমতে জমতে পাহাড় তৈরি হয়ে গিয়েছে। স্নেহার দুঃখ শোনার মতো মানুষ আছে।
গোটা দুনিয়া জানে সে দুঃখী মানুষ। শখের মানুষটাকে হারিয়ে নিজের অস্তিত্ব হারিয়ে ফেলেছে।
তাই তার দুঃখগুলো সবাই মনোযোগ দিয়ে শুনতে চায়। অনুভব করতে চায়। এবং আফসোস করে।
আর নুপুর
গোটা দুনিয়া জানে স্নেহার শখের পুরুষ কে পেয়ে যে বিশ্ব পেয়ে গিয়েছে।
দুঃখ তাকে আর স্পর্শ করতে পারেনা।
অথচ এই পৃথিবী জানলো না
“ভয়ংকর ভাবে ঠকে গিয়েছে নুপুর।
শখের জিনিস দূর থেকে সুন্দর।
যত কাছাকাছি আসবে তত অসুন্দর হয়ে যাবে।
ভাবনার মাঝেই ঝড়ের গতিতে কেউ ছুটে আসে। বসে থাকা নূপুরকে টেনে দার করিয়ে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে বহুডোরে।
তার বুকের ভেতরটা কাঁপছে৷ সে কাঁপন স্পষ্ট শুনতে পাচ্ছে নুপুর।
মানুষটা আহাজারি করতে বলতে থাকে
” আমার চাঁদ
তুমি শুধু আমার। তোমাকে অন্য কারো পাশে সহ্য করতে পারি না আমি। তুমি কেনো অভির সাথে দেখা করেছো?
কেনো চাঁদ।
ও চাঁদ
চাঁদ
তুমি আর অভির সাথে কন্টাক্ট রাখবা না। কোনো কথা বলবে না তার সাথে।
আমি ভুলভাল কিছু করে ফেলবো। মে/রে ফেলবো অভিকে। তোমাকেও আঘাত করে ফেলতে পারি।
বলো চাঁদ
আর দেখা করবা না।
“করবো।
তার সঙ্গে আবারও দেখা করতে হবে আমার।
চলবে
Share On:
TAGS: অন্তরালে আগুন, তানিশা সুলতানা
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
অন্তরালে আগুন পর্ব ১৭
-
অন্তরালে আগুন গল্পের লিংক
-
অন্তরালে আগুন পর্ব ৩২
-
অন্তরালে আগুন পর্ব ২২
-
অন্তরালে আগুন পর্ব ২৬+২৭
-
অন্তরালে আগুন পর্ব ২৮
-
অন্তরালে আগুন পর্ব ৫০
-
অন্তরালে আগুন পর্ব ৫১
-
অন্তরালে আগুন পর্ব ৪০
-
তোমাতেই আসক্ত সিজন ২ পর্ব ৪