অন্তরালে_আগুন
পর্ব:৪৪
তানিশা সুলতানা
নতুন সূর্য নতুন দিনের সূচনা। এটা সুন্দর সুখের আবার কারো জন্য কষ্টের।
দুনিয়াটা মূলত এমনভাবে চলছে। কেউ সর্ব সুখে বসবাস করছে আবার কেউ সর্বহারা হয়ে দুখে দিনকাল পার করছে। কেউ অনন্তকাল পৃথিবীতে বেঁচে থাকতে চাচ্ছে। আবার কেউ প্রতিনিয়ত মৃত্যুর অপেক্ষায় প্রহর গুনছে। এভাবে মাসের পর মাস দিনের পর দিন বছরের পর বছর চলে যাচ্ছে। নুপুরও হিসেব করে ফেলে। তার জীবনের ষোলটা বসন্ত পেরিয়ে গিয়েছে। ১৭ নম্বর বসন্তের আগমন ঘটেছে। হয়তো এটাই জীবনের শেষ বসন্ত। নুপুরের অনন্ত কাল পৃথিবীতে বেঁচে থাকার কোন ইচ্ছে নেই। আবার খুব তাড়াতাড়ি এই দুনিয়ার সৌন্দর্য ছেড়ে বিদায় নিতে ইচ্ছুক নয়।
মাঝে মধ্যে মনে হয় যা হচ্ছে হোক না। আমি আমার মতো বাঁচি। আমার জীবনটা উপভোগ করি। সুখে শান্তিতে স্বামী সন্তান নিয়ে একটা জীবন কাটিয়ে দিলে মন্দ হয় না।
ওর মুহূর্তে আমার মনে হয় এভাবে বেঁচে থাকার কোনো মানেই হয় না। বাঁচতে হবে মাথা উঁচু করে। সত্যকে মোকাবেলা করতে হবে স্পষ্টভাষায়। থাকবে না কোনো জড়তা বা দ্বিধা।
সকাল সকাল নওয়ান তৈরি হচ্ছে। হয়ত কোথাও বেরুবে। নুপুরের ইচ্ছে করছে অধিকার নিয়ে তাকে জিজ্ঞেস করতে
“কোথায় যাচ্ছেন? কখন ফিরবেন?
তবে দ্বিধা কিংবা নিজের আত্মসম্মানবোধের জোরে জিজ্ঞেস করতে পারছে না। শুধু ছোট ছোট নয়নে তাকিয়ে আছে।
সিগারেট ছাড়া বোধহয় মানুষটা একটা সেকেন্ডও চলতে পারেনা। এই যে রেডি হচ্ছে আর সিগারেট খাচ্ছে। যেনো সেটাই অমৃত।
নওয়ান বোধহয় বুঝতে পারলো নুপুরের মনের কথা। হয়তো অনুভব করলো ওর মনে কি চলছে। তাইতো ওয়ালেট পকেটে পুরে ফোন খানা হাতে নিয়ে ঠোঁটের পাশে থাকা সিগারেট ফেলে দেয়। একটা স্পে দিয়ে মুখ ফ্রেশ করে এগিয়ে যায় নুপুরের কাছে। ডান হাতখানা গালে রেখে আলতো করে চুমু খায় নুপুরের কপালে। এবং মিষ্টি স্বরে বলে
“একটু বেরোবো
ইম্পট্যান্ট কোনো কাজ নেই। জলদি ফিরে আসার চেষ্টা করব। তুমি খেয়ে নিও
ব্যাসস নুপুরের থেকে কোনো জবাব পাওয়ার আগেই হন হন করে বেরিয়ে যায় কক্ষ থেকে। যেনো বড্ড তাড়ায় আছে সে। নুপুর ঠিক বুঝতে পারে কোনো একটা ভুলভাল কাজ করতেই যাচ্ছে সে।
আর মাত্র দুটো দিন। তারপরে স্নেহা চলে যাবে সিঙ্গাপুর বড় বোনের কাছে। বাকি জীবনটা সেখানেই কাটিয়ে দেবে। অনেকটা পরে হলেও সে বুঝতে পেরেছে
“যাকে মন প্রাণ উজাড় করে ভালোবাসা যায় তার কাছাকাছি থেকে কোনদিনও তাকে ভোলা সম্ভব নয়। ভালোবাসাকে ঘৃণা করা চ্যালেঞ্জিং বিষয়।
তাছাড়া তার ভালবাসা ছিল ওয়ান সাইড। নওয়ান কখনোই তাকে এতোটুকু গুরুত্ব দেয় নি। বরাবরই তুচ্ছ তাচ্ছিল্য আর অবহেলায় পেয়ে এসেছে।
কিন্তু অবুঝ মনটা তো দেহ খানার সঙ্গে বেইমানি করে। ভালো যে বাসেনা তার পেছনে ছুটতে ছুটতে ক্লান্ত হয়ে যায়।
তাই বুঝি কবিতার ভাষায় কবি বলেছিলেন
“যাহার জন্য হৃদয় ব্যাকুল, কলিজা ছটফট করে
তাকে পেলে ধন্য হতাম সুখ জাগতো মনে
হায়য়য় আমার পোরা কপাল
আসলো সেই সুখের সকাল
ভালোবাসার প্রতিদানে কি বা আমি পেলাম
অন্তরালে জ্বলছে আগুন, তবুও দুঃখ পেতে আবার তাহার কাছে ফিরে এলাম”
এই যে স্নেহা চলে যাচ্ছে। অন্তরালে ধক ধক করে জ্বলছে অগ্নিশিখা। হাঁসফাঁশে কতো রাত কাটে নির্ঘুম। প্রিয় মানুষটার পাশে তার প্রিয় মানুষকে দেখে কান্না গুলো দলা পাকিয়ে আসছে।
এই দুঃখ থেকে মুক্তি পেতেই তো এত আয়োজন। কিন্তু শেষ মুহূর্তে কি হবে?
সুদূর বিদেশের মাটিতে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর একমাত্র ছেলে নওয়ান তালুকদার কে না দেখতে পেয়ে পূণরায় অস্থির হয়ে উঠবে না। এবং যেভাবে পোঁটলাপুটলি বেঁধে চলে যাচ্ছে ঠিক সেভাবেই পোঁটলাপুটলি বেঁধে পূণরায় ফিরে আসবে।
এই জীবনের সুখ মিলবে কোথায়?
কোথায় ই বা রয়েছে সে শান্তির খনি?
ইদানীং বড্ড স্বার্থপর হয়ে উঠছে স্নেহা। মাঝে মধ্যেই সে ভাবে “কোনো একটা মিরাক্কেল ঘটতো। সবকিছু বদলে যেতো। আর নওয়ান তার হতো”
এমনও তো হতে পারে
“কোনো এক গভীর রোগে আক্রান্ত হলো সে। জীবন প্রদীপ থেমে যাবে অতিশিঘ্রয়। এমনটা ঘোষণা দিয়ে দিলো ডাক্তার। যে কয়টা দিন বেঁচে থাকত ওই কয়টা দিন নওয়ান তাকে একটু ভালোবাসতো। মায়া নিয়ে তার সাথে কথা বলতো। তাকে হারানোর শোক সইতে না পেরে চিৎকার করে কাঁদতো।
তবুও তো বলতে পারতো জীবনের শেষ পর্যায়ে এসে হলেও নওয়ানের ভালোবাসা পেয়েছিলো স্নেহা।
এসব ভাবতেই বুক চিরে দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে আসে তার। মীরা বেগম অতি যত্নে ভাত মেখে স্নেহার গালে তুলে দিচ্ছে। মায়ের কত পরামর্শ। কত সুন্দর করে বোঝাচ্ছে ওকে
“স্নেহা জীবনটা ছোট নয়।
কারো জন্য নিজেকে এভাবে শেষ করে দিস না। নিজের জন্য বেঁচে থাক।
স্নেহার খুব করে বলতে ইচ্ছে করছে।
“আমিই তো আর আমার নেই মা। আমার হৃদয় পঁচে গিয়েছে। ফাঁটল ধরেছে মনে। এ পঁচা হৃদয় আর ভাঙ্গা মন নিয়ে কিভাবেই বা সুখে থাকি বলো।
এখানেই জীবনের সমাপ্তি।
তুমি বরং আমার কথা ভুলে যাও। মানিয়ে নিতে শিখো। আর মেনে নাও
তোমার স্নেহা আর জীবিত নেই।
মানিকগঞ্জ স্বাধীনতা চত্বরের পেছনে বিশাল বড় মাপের একটা বিল্ডিং রয়েছে। সেটা মূলত নওয়ান তালুকদারের। বাবার থেকে পাওয়া প্রথম উপহার। এখানে কেউ থাকেনা। তবে মাঝে মধ্যে নওয়ান আসে। তার যত প্ল্যানিং বা আড্ডা দেওয়া সবই এখানে।
এই বিল্ডিং এর পাঁচ তলায় পায়ের উপর পা তুলে বসে আছে নওয়ান। তার পাশেই বল্টু দাঁড়িয়ে আছে । বড্ড বিরক্ত সে। সকাল সকাল এখানে আসার কোন মানে হয়?
ঠান্ডা ঠান্ডা মৌসুমে শীতের সময় একটু বেশি ঘুমোতে ভালই লাগে। তবে নওয়ানের জন্য সেটা কখনোই পসিবল হয়ে ওঠে না।
তামিম রীতিমতো ভয়ে কাঁপছে। সে খুব ভালো করে জানে নওয়ান তার কোনো ক্ষতি করবে না তবুও চোখে চোখ রেখে কথা বলতে বড্ড দ্বিধা তার।
নওয়ানের বিষয়টা বেশ ভালো লাগে।
গোটা দুনিয়া তাকে ভয় পাবে, তার চোখে চোখ রেখে কথা বলার সাহস কারো হবে না। এবং তার কথাই শেষ কথা হবে।
এমনটাই স্বপ্ন তার। আর অলওয়েজ এমনটাই হয়। স্বয়ং নায়েব তালুকদার তার চোখে চোখ রেখে কথা বলার সাহস পায় না।
তবে নুপুরের ব্যাপারটা আলাদা।
চাঁদ ০.১% ও পয়েন্ট জিরো পার্সেলও ভয় পায় না তাকে। এমনকি চাঁদের পরিবারের কেউই তাকে যথাযথ সম্মান করে না। এটা নিয়ে অবশ্যই মাথা ব্যথা নেই।
“যাকে ভালোবেসে হৃদয় করিয়াছি দান
সে দিন জান কেড়ে নেয় তবুও করিবো না প্রতিদান”
সে নুপুর হৃদয় খানা দিয়ে দিয়েছে। এখন তার সাত খুন মাপ।
সিগারেটের দীর্ঘটান দিয়ে নাক মুখে ধোঁয়া ওড়ায় নওয়ান। বাঁকা নয়নে তামিমের মুখ পানে তাকায়
“এই পর্যন্ত 27 টা মার্ডার করেছি আমি।
এমপি শাহাবুদ্দিন এবং তার মেয়ে ইরাবতী কে আমিই মেরেছি।
পতিতালয়ের সর্দার সুমি আক্তার। তাকে দুনিয়া থেকে বিদায় করার পরিকল্পনাও আমার।
শুধু মারি নি কাকে জানিস?
আনুকে। আমার চাঁদের বন্ধুকে। কেনো মারিনি?
কারণ তার কিছু হয়ে গেলে আমার চাঁদ কষ্ট পাবে।
এই গোটা দুনিয়া ধ্বংস করার ক্ষমতা রাখে নওয়ান তালুকদার।
আর সে ধ্বংস হয় চাঁদের চোখের পানিতে।
আমার কাছে সবকিছুর ঊর্ধ্বে চাঁদের ঠোঁটের কোণের ওই হাসি। তার জন্য নওয়ান তালুকদার মরতেও পারে আবার ভালোও হতে পারে।।
চলবে
Share On:
TAGS: অন্তরালে আগুন, তানিশা সুলতানা
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
অন্তরালে আগুন পর্ব ৭
-
অন্তরালে আগুন পর্ব ৩৬
-
অন্তরালে আগুন পর্ব ২
-
অন্তরালে আগুন পর্ব ৩২
-
অন্তরালে আগুন পর্ব ৬
-
অন্তরালে আগুন পর্ব ৪২
-
অন্তরালে আগুন পর্ব ৩৩
-
অন্তরালে আগুন পর্ব ৪১
-
অন্তরালে আগুন পর্ব ৫(৫.১+৫.২)
-
অন্তরালে আগুন পর্ব ২২