Golpo romantic golpo অন্তরালে আগুন

অন্তরালে আগুন পর্ব ৪২


অন্তরালে_আগুন

পর্ব:৪২

তানিশা সুলতানা

মানিকগঞ্জ জেলার সব থেকে সুন্দর এই ব্রিজ। হরেক রকমের লাইটিং এবং সুন্দর সুন্দর কিছু রেস্টুরেন্ট এর জন্য বেওথা বিখ্যাত। বিভিন্ন জেলা থেকেও ভ্রমণ প্রিয় মানুষরা আসে এখানকার খাবার টেস্ট করতে।
তাছাড়াও এখানেই অবস্থিত প্রধানমন্ত্রীর তালুকদার মহল। একটু তো স্পেশাল হতেই হবে। আভিজাত্যে ভরপুর থাকতেই হতো
রাত বারোটা বেজে ১ মিনিট। তারিখ এবং দিন পাল্টে গিয়েছে। ৬০ সেকেন্ড আগে ছিলো Thu, 15 January
আর এখন দেখাচ্ছে Fri 16 January
৬০ সেকেন্ডে কয়বার শ্বাস টানা যায়?
বড়জোর ৪০ বার। আর চোখের পলক পড়বে ৪-৫ বার। গুনতে গেলে খুবই কম কিন্তু তার মূল্য অনুভব করতে গেলে বিশাল বড় ব্যাপার।
এই ৬০ সেকেন্ডের মূল্য সেই স্টুডেন্টকে জিজ্ঞেস করো যার রাত পোহালেই ফ্রম ফিলাপ করতে হবে অথচ হাতে একটা পয়সা নেই। ৬০ সেকেন্ডের ব্যবধানে নতুন তারিখের সূচনা হবে আর ফ্রম ফিলাপ এর ডেট চলে যাবে৷
যারা অর্থ সংকটে ভোগে তারাই জানে এক একটা নতুন দিনের কতো মূল্য।
আনু যখন পতিতালয়ে ছিলো বা রাঙামাটির সেই জঙ্গলে মৃ/ত্যুর লড়াই করছিলো। তখনই হারে হারে সময়ের মূল্য অনুভব করা গিয়েছে।
আর কিছু মুহুর্ত আগে সেখানে নওয়ান উপস্থিত হলে এতো কিছু হতোই না।

নুপুর এবং নওয়ান বেওথা ব্রিজের ওপরে চলে এসেছে৷ শুনশান নীরবতা বিরাজ করছে৷ তারা দুজন ছাড়া আশেপাশে একটা মাছিকেও দেখা যাচ্ছে না। তালুকদার মহল আলোয় ঝলমল করছে।মনে হচ্ছে পৃথিবীর সকল আলো সেখানে এসে জড়ো হয়েছে। আসমানে থালার মতো বিশাল বড় চাঁদ উঠেছে। সেই চাঁদের আলোতে নুপুরের সুন্দর মুখ খানা আরও সুন্দর দেখাচ্ছে। কপালের সাদা রংয়ের ব্যান্ডেজ খালা জ্বল জ্বল করছে। নওয়ানের ইচ্ছে করছে চাঁদকে একটু ছুঁয়ে দিতে। বুকের মধ্যে জাপ্টে জড়িয়ে ধরতে। আর সব সীমা পেরিয়ে ভালোবাসার অতল সাগরে ডুবে যেতে। এই সুন্দর রাতকে তাদের ভালোবাসার শাক্ষ্যি বানাতে।
নুপুর কি বুঝলো নওয়ান তালুকদারের মনের কথা? হয়ত তাই। সে নিজের তুলতুলে হাত খানা এগিয়ে নওয়ানের শক্তপোক্ত হাতে আলতো স্পর্শ করে এবং বলে
“নওয়ান আপনিই আবির ভাইয়ার ব্যাপারটা সামনে এনেছেন তাই না?
আমি জানতাম
আমার নওয়ান বদলে যাবে। সে সাহায্য করবে আমায়। সব পাপের হিসেব নিবে।

নুপুরের চোখ দুটো চকচক করছে। বড্ড বেশি খুশি হয়েছে যেনো।
নওয়ান জবাবে বলে
” তুমি খুশি হয়েছো?

“হবো না?
নায়েব তালুকদার জনসম্মুখে কি লজ্জাজনক পরিস্থিতিতে পড়লো। তার দাপট নরবরে হয়ে গেলো। এটাই তো চাই আমি। আপনার বাবার সকল কুকর্ম ধরা পড়ে যাক।

নওয়ান নুপুরের হাত দুটো মুঠোয় পুরে বলে
“যা চাইবে তাই হবে। গড প্রমিজ তোমার সকল ইচ্ছে পূরণ করবো।।
শুধু আমার কাছে থাকিও চাঁদ। যতক্ষণ আমি বেঁচে আছি আমায় ছেড়ে যেও না।

ইতিমধ্যেই বেওথা ব্রিজের রেলিং এর উপর বসে পড়েছে নুপুর। নওয়ান এর গলা জড়িয়ে ধরে ঠোঁটের ফাঁক থেকে সিগারেট নিয়ে নেয়। এবং সেটা ছুড়ে ফেলে শূন্যে। আগুনে পুড়ে কালচে হয়ে যাওয়ার ঠোঁটে আঙুল বুলিয়ে দিতে দিতে বলে
“জানিনা কি হলো
কেনোই বা হলো
আপনাকে আমার পছন্দ ছিলো না। কিন্তু আপনার গান প্রথম থেকেই ভীষণ প্রিয়। আর এখন আপনিও প্রিয় হয়ে উঠলেন। অথচ আপনাকে ভালোবাসার মতো একটা কারণও নেই।
ভীষণ বাজে একটা মানুষকে কারণ ছাড়া কি করে এতোটা ভালোবাসা যায় নওয়ান? কিভাবে ভরসা করতে পারছি আপনাকে?
কেনো মনে হয় আপনার কাছেই আমি সবচেয়ে বেশি নিরাপদ।
কেনোই বা আপনার বুকে মাথা রেখে কথা দিতে ইচ্ছে করছে “আপনাকে ছেড়ে আমি কোনোদিনও যাবো না। কখনো না। আপনাকে ছাড়া আমি নিজেই থাকতে পারি না।
এ কি জাদু করলেন আমায়?

নওয়ান হাসে। গোলগাল মুখখানা, উঁচু নাক, ছোট ছোট চোখ দুটো, ঘনো চাপ দাঁড়ির মাঝে গোলাপি রঙের ওষ্ঠ। হাসলে তাকে ভীষণ সুন্দর দেখায়। দৃষ্টি ফেরানো দায়।
তবে আজকের হাসিটা আরো একটু বেশি সুন্দর। চাঁদের আলো দুজনকে যেনো পাহারা দিচ্ছে। আসমানে অবস্থিত মিটিমিটি শত তারা তাদের ভালোবাসার সাক্ষী।
নওয়ান বলে
“ভালোবেসো না আমায়। দুর্বল হইও না।
আমি আগুন
তুমি পুরে ছাই হবে। আনুকে করা প্রতিজ্ঞা ভুলে যাবে।
পাগল হবে। নিজের অস্তিত্ব আর আত্মসম্মান বোধ বিলীন করে দিবে আমার মাঝে।

নুপুর বড্ড মায়া মেশানো কণ্ঠস্বরে বলে
“আপনি চান না আমি পাগল হই?

“না
আমি চাই আমার চাঁদ স্ট্রং থাকবে। ভালোবাসা ঘৃণা সংসার কিংবা মায়া কোনো কিছুই তাকে পিছু হাঁটাতে পারবে না।
আমার মাঝে নিজেকে সীমাবদ্ধ করবে প্রতিবাদ ভুলে যাবে, চোখে চোখ কথা বলতে পারবে না।
এমন চাঁদ আমার চাই না।
আমি আমার হয়ে থেকে, আমারই বুকে মাথা রেখে, এমনই তেজি স্বরে প্রতিবাদ করবে। ধ্বংস করবে সব।

প্রতিত্তরে নুপুর নওয়ানকে জড়িয়ে ধরে। তার প্রশস্ত বুকে মাথা রেখে আঁখি পল্লব বন্ধ করে ফেলে। দু ফোটা অশ্রু কণা গড়িয়ে পড়ে দু গাল বেয়ে।
” আমি কিচ্ছু করতে পারছি না। আম্মু বলে নুপুর নিজের জন্য বেঁচো না। অন্যায়ের সঙ্গে কখনোই আপোষ করিও না।
বিশ্বাস করুন আমি কোনদিনও নিজের কথা চিন্তা করিনি। কিন্তু অন্যের জন্য কিছু করতে পারিনি।
আনুকে বাঁচাতে পারলাম না। অবশ্য ও মরে যাওয়াতে আমি খুব বেশি দুঃখ পাইনি।
এভাবে বাঁচা যায় নাকি?
আমার আনু অনেক কষ্ট পেয়েছে। ও যতদিন বেঁচে থাকতো এই কলঙ্ক আর যন্ত্রণা নিয়ে বাঁচতে হতো।

“ভুল বললে চাঁদ। কলঙ্ক বেশিদিন থাকে না। সঠিক মানুষ জীবনে আসলে কলঙ্ক মুছে যেতে সময় লাগে না। সিফাত ভালো মানুষ। সে আনুকে অসম্ভব ভালোবাসে। অনুর উচিত ছিলো তাকে আর কিছুদিন সময় দেওয়া।
স্নেহা বলল আমায়
“পরজনম হবে না। এ জনমেও আপনাকে পেলাম না।”
আসলেই পর জনম হবে না চাঁদ। কোনো ইচ্ছে অপূর্ণ রেখো না।

কথাখানা নুপুরের বুকে গিয়ে বিঁধে। বুকের ভেতরটা কাঁপতে শুরু করে। হাতের বাঁধন শক্ত করে। যেনো চামড়া ভেদ করে বুকের ভেতর ঢুকে পড়বে। জোরে জোরে শ্বাস টানতে শুরু করে। রাগ এবং জেলাসিতে অসয্য যন্ত্রণা হতে শুরু করে নুপুরের হৃদয়ে। নওয়ান বুঝলো কি?
সে নুপুরের চুলের ভাজে হাত ঢুকিয়ে ভরসার স্বরে বলে
“আমার জীবনে তুমি ছাড়া দ্বিতীয় কোনো নারীর অস্তিত্ব নেই।
নওয়ান তালুকদারের নুপুর শিকদার ছাড়া গোটা দুনিয়ায় আর কোনো দুর্বলতা নেই।
মৃত্যুর পরে ৭ মিনিট মানুষের মস্তিষ্ক সজাগ থাকে। আমি সেই ৭ মিনিটও আমার চাঁদের জন্য বরাদ্দ করে রেখেছি।

এবার একটু শান্তি লাগতে শুরু করে নুপুরের। হঠাৎ করে চোখ পড়ে বেওথা নদীর মাঝে। সুন্দর একটা নৌকা ভেসে আছে।

“মিস্টার বেয়াদব আমি ওই নৌকায় যেতে চাই।

নুপুর বললে তো নওয়ান আসমান হতে চাঁদটা নিয়ে আসতেও প্রস্তুত। আর এই নৌকায় নিবে না? এটা হতেই পারে না।।
তাই ও নুপুরের হাত ধরে ব্রিজ থেকে নিচে নেমে পড়ে। আসলেই নৌকাটা বেশ সুন্দর। ছাঁদ ওয়ালা নৌকা। ছোটখাটো একটা ঘরের মতো। লাল নীল লাইটিং এবং তরতাজা গাধা ফুল দিয়ে ডেকোরেশন করা।
খুশিতে নুপুরের চোখ দুটো চকচক করে ওঠে। তাড়াহুড়ো করে নৌকায় উঠে পড়ে। বাইরের দিকটা যতটা সুন্দর ভেতরটা তার থেকেও বেশি সুন্দর।


স্নেহা বিশাল বড় একটা সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছে। বাঁচতে হবে তাকে। ভালো থাকতে হবে। একটা জীবন এভাবে নষ্ট করা ঠিক হবে না। তাই বড় বোন সিনথিয়াকে কল করে।
” স্নেহা তুমি ভেবে বলছো তো?
আগে কতো বলতাম আমার কাছে চলে আসো। আসতে চাইতে না। কিন্তু এখন?

সিনথিয়ার কথার উত্তরে স্নেহা বলে
“আমি বাঁচতে চাই আপু। এভাবে আর পারছি না।

” তাকে না দেখে দুইটা ঘন্টা থাকতে পারো না তুমি। সারাজীবন থাকবে কিভাবে?

“আমরা যাকে সব থেকে বেশি ভালো বাসি। সেই আমাদের সবার আগে ছেড়ে চলে যায়। একটা জীবন কেটে যাবে। দিন গুলোও ফুরিয়ে যাবে। শুধু মনে থাকে আফসোস। দুইদিনের দুনিয়া আফসোস বিষন্নতা আর দীর্ঘ শ্বাসে পেরিয়ে যায়।
ঘুমানোর শান্তি ভুলে যেতে হয়
সুখ শব্দটার সঙ্গে বিচ্ছেদ হয়। একটা সময় চোখের পানিও শুকিয়ে চৌচির মরুভূমির ন্যায় হয়ে যায়।
শুধু দীর্ঘ শ্বাস ফুরায় না।
দিন শেষে কিংবা গভীর রাতে আনমনে আসমান পানে তাকিয়ে মনটা বড্ড আফসোস নিয়ে বলে ওঠে
” ইসসস যদি পেয়ে যেতাম।”

চলবে

Share On:

TAGS: ,



CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
Related Posts
 

0 Responses

Leave a Reply