অন্তরালে_আগুন
পর্ব:৪০
তানিশা সুলতানা
যে মরে যায় সে তো বেঁচে যায়। মুক্তি পায় নিষ্ঠুর পৃথিবীর নিষ্ঠুর মানুষদের নিষ্ঠুরতা থেকে। অথচ মৃত মানুষটি যাদের কাছে প্রিয় ছিলো, যারা তাকে বেঁচে থাকার অবলম্বন মনে করতো তারা জীবিত থাকতেই মৃ/ত্যুর স্বাদ গ্রহণ করে ফেলে। মৃ/ত্যু খুবই পরিচিত একটি শব্দ।
“জন্মিলে মরিতে হবে
অমর কে কোথা রবে?
মাইকেল মধুসূদন দত্ত তার কবিতায় লাইন দুটো উল্লেখ করেছিলেন।
এই দুই লাইনের সারমর্ম বা সারাংশ হচ্ছে “জন্ম যেহেতু নিয়েছো তোমাকে মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণ করতেই হবে”
তবে মৃত্যু ভয়ংকর। এই পৃথিবীর কোন মানুষই পুরোপুরি সুখী নয়। কোনো না কোনো দিক থেকে তাদের দুঃখ রয়েছেই। জীবনে একবার হলেও প্রতিটা মানুষেরই মনে হয় “সমস্ত সমস্যার সমাধান একমাত্র মৃ/ত্যু”
তবুও তারা স্বেচ্ছায় মৃত্যুবরণ করতে পারে না। এটা সু দিনের অপেক্ষায় প্রহর গুনতে থাকে।
আবার কিছু মানুষের সহ্য ক্ষমতা একেবারে কম। তারা ডিপ্রেশন বা দুঃখ থেকে বাঁচতে সুইসাইডের পথ বেছে নেয়। গলায় রশি ঝুলিয়ে যখন পায়ের তলা থেকে চেয়ার বা টুল সরিয়ে ফেলে তখন তারা বাঁচার জন্য ছটফট করে। বা কোন মানুষ বিষ খেলে তারাও বাঁচতে চায়।
মূলত মানুষ আবেগ দুঃখ বা ডিপ্রেশন থেকে সুইসাইড এর পথ বেছে নিলেও কোনো না কোনো সময়ে বেঁচে থাকতে চায় না।
আনুও বাঁচতে চেয়েছিলো। জীবনের সবগুলো কঠিন পরিস্থিতি মোকাবেলা করেছে শুধুমাত্র বেঁচে থাকার জন্যই তো। কিন্তু বেঁচে থাকতে আর পারলো কই?
সকাল দশটা বেজে ৫ মিনিট। অ্যাম্বুলেন্স এসে থামে ফায়ার সার্ভিস অফিসের সামনে। সিফাতের ঘুম ছুটে যায়। পিটপিট করে চোখ খুলতে অনুভব করে অ্যাম্বুলেন্স এর দরজা খুলে গেছে। মানুষের কোলাহল কানে লাগছে। মানে তারা তাদের গন্তব্যে পৌঁছে গিয়েছে। এবার নামতে হবে। শান্তির জীবন বা শান্তির ঘুম এখানেই সমাপ্ত। বুক চিরে দীর্ঘশ্বাস বেরিয়েছে সিফাতের। মৃত আলুর কপালে দীর্ঘ চুমু এঁকে দেয়।
কানের কাছে ঠোঁট নিয়ে বিড়বিড় করে বলে
“হাশরের ময়দানে আমার জন্য অপেক্ষা করিও।
আমি সেখানেও তোমাকে পাওয়ার দাবি নিয়ে দাঁড়াবো।
অ্যাম্বুলেন্স থেকে নামানল হয় আনুকে। বাড়ির উঠোন মসজিদের খাটিয়ায় শুয়িয়ে দেওয়া হয়। অনেক মানুষ আসছে শেষবারের মতো আনুর মুখটা দেখতে। একটা মহিলা সাদা চাদর সরিয়ে সবাইকে মুখ দেখাচ্ছে। সিফাত এক কোণায় দাঁড়িয়ে আছে। এখান থেকে আনুর খাটিয়া টা স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে। অভি এসে তার পাশে দাঁড়ায়।
কাঁধে হাত রেখে বলে
“তুমি বেঁচে গেলে।
প্রিয় মানুষের মৃত্যু মেনে নেওয়া যায় কিন্তু তাকে অন্য কারো পাশে মানা যায় না। এখন আর ওকে অন্য কারো পাশে দেখতে হবে না।
সিফাত জবাব দেয় না। তবে মনে মনে বলে
” তুমি বুঝবে আমি হারালাম
তুমি জানবে না আমার কতোটা দুঃখ হচ্ছে।
ওকে আবিরের সাথে খুশি দেখলেই আমি খুশি হয়ে যেতাম। ওর মুখটা দেখলেই আমার চিন্তা দূর হয়ে যেতো। আমি অনেক ভালো ছিলাম।
ওকে অন্য কারো সাথে খুশি দেখে আমি অনায়াসে একটা জীবন কাটিয়ে দিতে পারতাম। কিন্তু এখন বোধহয় আর আমি বাঁচবো না।
নুপুর যখন এসে পৌঁছালো তখন আনুকে গোসল করানো হচ্ছে। প্রধানমন্ত্রীর ছেলে এবং ছেলের বউ এসেছে। সকলেই নিজেদের জায়গা ছেড়ে দিচ্ছে। পুলিশ আর্মি দেহ রক্ষি দিয়ে আনুদের ছোট্ট বাড়িটা ভরে যায়।
বরারের মতো সিগারেট নেই নওয়ান ঠোঁটের ভাজে। চোখ গুলো টকটকে লাল হয়ে আছে। নুপুর এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে নওয়ানের দিকে। বড্ড মায়া ভরা কন্ঠস্বরে বলে
“আমার আনুকে আমার থেকে কেড়ে নিলেন নওয়ান?
শূন্য হয়ে গেলাম আমি।
বল্টু শুকনল ঢোক গিলে। দু পা এগিয়ে এসে বলে
” আমার ভাই কিছু করে নি ভাবি। আপনি সব সময় তাকেই কেনো দোষারোপ করেন?
নুপুর জবাব দেয় না। সে হাঁটু মুরে বসে পড়ে। দুই হাতে মুখ ঢেকে চিৎকার করে কেঁদে ওঠে। নুপুরের কান্নার সাথে যুক্ত হয় আনুর মা এবং বোন। নওয়ান দুই হাতে কান চেপে ধরে। চাঁদের কান্না তার সহ্য হচ্ছে না। বুকের ভেতরে হাঁসফাঁস লাগছে। বল্টু বুঝতে পেরে তাড়াহুড়ো করে নওয়ানকে সিগারেট দেয়। তাতে দুটো টান দিয়ে ধোঁয়া ওড়ালেও শান্তি লাগে না তার।
শেষমেশ বল্টুকে বলে
“আ….আমি বাইরে আছি।
নেহাল সোনিয়া নাসিরও এসেছে। নিজের মেয়ের মতোই আনুকে ভলোবাসতো তারা।
পুরুষরা জুম্মার নামাজ আদায় করে চলে আসে। এখনই আনুর জানাযা পড়ানো হবে। কবর খোঁড়া হয়েছে তাদের বাড়ির উঠোনেই। আনুর বাবা মা মেয়েকে দূরে কবর দিতে রাজি নয়।
এখুনি কাফন দিয়ে আনুর মুখটাও ঢেকে দেওয়া হবে। আনুর বাবা আশেপাশে সিফাতকে খুঁজতে খুঁজতে বলে
” আমার মায়ের মুখটা বেঁধো না। সিফাতকে আরেকটু দেখতে দাও।
সিফাতের মা সায়লা বেগম ছেলেকে ধরে আনে আনুর খাটিয়ার সামনে। কান্না আটকে বলে
“শেষবার ওকে দেখ বাবা। আর কখনো দেখতে পাবি না।
সিফাত তাকায় না। চিৎকার করে বলে ওঠে
” ওকে দেখবো না আমি।
মুখটা ঢাকো তোমরা। আমি দেখতে চাই না।
ওর জন্য আমি সব করলাম
আর ও আমার জন্য কয়েকটা দিন বাঁচতে পারলো না?
বেইমানের মতো আমায় একা করে চলে গেলো।
দেখতে চাই না ওকে
বলতে বলতে চলে যায় সিফাত। নুপুর আনুর মুখপানে তাকিয়ে প্রতিজ্ঞা করে
“আমি কাউকে ছাড়বো না আনু। সবাইকে তার পাপের শাস্তি দিবো। কথা দিলাম তোকে।
বেলা সাড়ে তিনটায় আনুর দাফন কার্যক্রম শেষ হয়। সিফাত কবরের সামনেই বসে আছে বাকি সবাই যার যার বাড়ি ফিরে গিয়েছে।
নুপুর বেওথা ব্রিজের ওপর বসে আছে। তার পাশে রয়েছে মা বাবা আর ভাই। নওয়ান কিছুটা দূরে বসে সিগারেট খাচ্ছে।
গোটা ব্রিজটা পুলিশ আর্মি দিয়ে ভর্তি। সাধারণ মানুষেরও ভীড় জমেছে।
কেউ কেউ নিজ গন্তব্য স্থানে রওনা দিয়েছে কিন্তু পুলিশ আর্মির কারণে যেতে পারছে না। বাধ্য হয়ে সেখানে দাঁড়িয়ে থাকতে হচ্ছে।
আবার কেউ কেউ মন্ত্রী ছেলেকে দেখার জন্য স্বেচ্ছায় দাঁড়িয়েছে।
তবে এই বিষয়গুলো নুপুরের ভালো লাগছে না। মাত্র একজন মানুষের জন্য এতগুলো পুলিশ আর্মির কি দরকার? যদি নিজেকে নিজে প্রটেক্ট করতে না পারে তাহলে ঘর থেকে বের হতে বলে কে?
সোনিয়া বেগম বিরক্তির স্বরে বলে
“নুপুর আপাতত ঘরে ফিরে যাও। কখনো সময় করে বাড়িতে এসো। অনেক কথা বলার আছে তোমায়।
“আসবো আম্মু
খুব তাড়াতাড়ি চলে আসবে আমি।
নাসির বলে
“আনুর শেষ পরিণতি দেখলে তো? এই বেয়াদবটার সাথে সংসার করলে তোমারও এমনই পরিণতি হবে। এরা মানুষকে সম্মান করতে জানে না কি? জানোয়ারের
বাকিটা শেষ করার আগেই নওয়ান দাঁতে দাঁত চেপে বলে ওঠে
“বাবা নিয়ে একটা কথা বললে জিভ টেঁনে ছিড়ে দেবো। মাইন্ড ইট
নেহাল কিছু মুহূর্ত তাকিয়ে থাকে নওয়ানের মুখ পানে। তারপর বলে ওঠে
“তোমাকে নিয়ে কথা বলা যাবে তো?
একদম মা/রা যাবে এতোটা অসুস্থ আনু ছিলো না। আর অপারেশনের জন্য তার মৃ/ত্যু ঘটেনি। ওর শরীর থেকে বিষ পাওয়া গিয়েছে। পোস্টমর্টেম রিপোর্ট তাই বলছে।
তোমার বাবা ভালো মানুষ।
তুমি খারাপ।
তবে কি তুমি আনুকে খু/ন করলে?
নওয়ান সিগারেটে দীর্ঘ টান দিয়ে নাক মুখে ধোঁয়া ওড়ায়। এবং বড্ড আদূরে স্বরে বলে
“আমি যদি চাঁদের বন্ধু না হতো তবে অবশ্যই আমি তাকে খু/ন করতাম।
আমার চাঁদ যাদের ভালবাসে নওয়ান তালুকদার কখনোই তাদের কোনো ক্ষতি করবে না।
নুপুরের ঠোঁটের কোণে হাসি ফুটে উঠে। সে বাবা মা আর ভাইকে উদ্দেশ্য করে বলে
“তোমরা বাসায় ফিরে যাও। কালকে নওয়ান তার বউকে নিয়ে শশুর বাড়ি বেড়াতে যাবে৷
বাবা পারলে আমার শ্বশুরকে কল করে দাওয়াত দিও।
ওনারা চলে যায়। বল্টু এতক্ষণ মাথা নিচু করে নওয়ানের পাশে দাঁড়িয়ে ছিলো। ওনারা চলে যেতেই সে মুখ খোলে।
“ওনারা সব সময় ভাইকে ছোট করে কথা বলে কেনো? যত দোষ ভাই ঘোষ।
নেহাৎ ওনাদের মেয়েকে ভাই ভালোবাসে। নাহলে কি যে করতো।
নুপুর বল্টুকে বলে
” আমাদের জীবনের একটা অংশ ছিলো আনু। তাকে তোমার ভাই আমার কাছে এনে দিতে পারে নি। অথচ সে ঠিকই জানতো আনু কোথায় রয়েছে।
নুপুর একটু থেমে আবার বলে
“তোমার ভাই আমাকে ভালোবাসে না। আমি তার জেদ। গোটা দুনিয়া ধ্বংস করে হলেও সে আমাকে তার সাথে রাখতে চায়। কারণ সে মনে করে আমি ছেড়ে তার জীবন চলবে না।
অথচ সে জানেও না
আমি তার জীবনের প্রদীপটা নিভিয়ে দিবো।
সে চাইলেই পারতো
আমাকে সরিয়ে দিতে। স্নেহা আপুর সঙ্গে অনায়াসে একটা জীবন কাটিয়ে দিতো।
তারা দুজনই সুখে থাকতো। বেঁচে থাকতো।
নওয়ান হাসে। নুপুরের কানের কাছে ঠোঁট নিয়ে ফিসফিস করে বলে
” চাঁদ আমার ধ্বংসের কথা ভাবলেই তোমার কলিজা কাঁপছে। আমায় ধ্বংস করতে গিয়ে নিজেই ধ্বংস হয়ে যাচ্ছো।
ইটস নট ফেয়ার জান।
সবগুলো টিভির চ্যানেল নিউজ দেখাচ্ছে “সদ্য নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী নাযেব তালুকদারের ছোট ছেলে আবির তালুকদার ইন্তেকাল করেছে। ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না-লিল্লাহির রাজিউন”
রাঙা মাটির ঝুলন্ত ব্রিজের নিচে অবস্থিত জঙ্গল থেকে তার লা/শ উদ্ধার করা হয়েছে।
চলবে
Share On:
TAGS: অন্তরালে আগুন, তানিশা সুলতানা
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
অন্তরালে আগুন পর্ব ৩৩
-
অন্তরালে আগুন পর্ব ১৯
-
অন্তরালে আগুন পর্ব ৬
-
অন্তরালে আগুন পর্ব ৩৮
-
অন্তরালে আগুন পর্ব ৩২
-
অন্তরালে আগুন পর্ব:৩৫
-
অন্তরালে আগুন পর্ব ১৪
-
অন্তরালে আগুন পর্ব ৩৬
-
অন্তরালে আগুন পর্ব ২০
-
অন্তরালে আগুন পর্ব ১৮